অনুভা রুমে এসে দরজা লাগানোর আগেই তায়ান রুমে ঢুকে পড়ে।দরজা লাগিয়ে দেয় তায়ান।অনুভা আবারও দরজার দিকে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়,যেন চলে যেতে পারে। তায়ান ওর বাহু ধরে টেনে আনে নিজের দিকে। দু'হাতে অনুভার দু বাহু ধরে চোখ রাঙিয়ে বলল,
_“অনুভা! এমন করছিস কেন তুই?”
_“ আপনি কেন আমাকে বিয়ে করবেন? দয়া দেখিয়ে? বাড়ির সম্মান বাঁচাতে? প্রয়োজন নেই এসবের। আমি এই বিয়ে করতে পারব না…” বাক্য থেমে যায় অনুভার আকস্মিক আক্রমণে।তায়ান অনুভার দু গাল চে’পে ধরে, অনুভার ঠোঁট নিজ আয়ত্বে নিয়ে নেয়। ঠোঁটে অপ্রত্যাশিত স্পর্শ পেতেই বুকের ভেতর ধক করে ওঠে অনুভার। ভয়,আড়ষ্টতা, বিস্ময় এক সাথে ভির করল তার মধ্যে । হাত দুটো কী করবে বুঝতে না পেরে কাঁপতে থাকে। অবশ হয়ে আসা শরীর ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল তার । তায়ান চুম্বনরত অবস্থায়ই অনুভার পেছানোর সাথে তাল মিলিয়ে এগোলো। অনুভা আরও পেছাল, পেছাতে পেছাতে বেডের সঙ্গে ধা”ক্কা খেতেই তায়ানের টি-শার্টের কলার আঁকড়ে ধরলো । ভারসাম্য রাখতে না পেরে আধশোয়া হয়ে পড়ে গেল বিছানায়। অনুভার পিঠ বিছানার হেডবোর্ডে গিয়ে ঠেকল। তবু তায়ান ছাড়ল না বরং অনুভার দিকে আরও ঝুঁকে ঠোঁটের স্পর্শের গভীরতা বাড়ালো। দু'টি ওষ্ঠাধরের মিলনে রুমজুড়ে চুম্বনের ক্ষীণ শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই।
অনুভার দম ফুরিয়ে আসে। দু'হাতে তায়ানকে ঠেলে দুরে সরাতে চায়। তায়ান ঠোঁটের স্পর্শ না ভাঙিয়েই এক হাতে বালিশের নিচ থেকে কয়েকটি ফ্রেমে বাঁধা ছবি বের করে তুলে ধরে। সঙ্গে সঙ্গে অনুভার ঠোঁট ছেড়ে দেয়। অনুভা হা-হুতাশ করে কিছু বলতে যাবে তখনই ছবি গুলো দেখে থমকে যায়। বিস্মিত চোখে একবার তায়ান ভাইয়ের দিকে তাকায়, আবার ছবি গুলো দেখে।তায়ান নিজের ঠোঁট মুছতে মুছতে বলে,
_“নিজের অনুভূতি আর কত দিন লুকিয়ে রাখবি?”
অনুভা মুখের ভঙিমা বলছে যে, তায়ান ভাই কীভাবে জানল? কবে থেকেই বা জানে এসব! ছবি গুলো যে এখানে সেটাই বা কীভাবে খুজে পেল? কারণ ছবি গুলো তায়ানের। কিছু ছবি ছোট বেলার আর কিছু ছবি জার্সি পরিহিত। কিছু খেলার মাঠের। কয়েক রকমের ছবি অনুভা নিজের কাছে যত্নে রেখে দিয়েছে।
_“কী হলো বল।” তায়ান আবারও বলল।
_“আগে আমার উপর থেকে সরুন। দম আটকে আসছে।” অনুভা দ্রুত শ্বাস ফেলে বলল।
তায়ান সরলো না ঘুরে অনুভাকে ঘুড়িয়ে নিজের উপর নিয়ে, বিছানায় নিজের পিঠ ঠেকাল। এক হাত অনুভার পিঠে অন্য হাত কোমরে রেখে বলল,
_“এখন বল।”
অনুভা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। তায়ানের চোখে চোখ রাখতে পারছে না। কয়েকবার উঠে যেতে চেয়েও ব্যর্থ হলো।
_“দেখুন এ..এটা ঠিক হচ্ছে না।”
_“ আমার প্রশ্নের উত্তর দে অনুভা! ভালোবাসিস আমাকে?” তায়ান নরম স্বরে বলল।
স্তব্ধ খেয়ে যায় অনুভা। কী বলবে সে? সে তো জানে না এটা ভালোবাসা কি-না। তায়ান চলে যাওয়ার সময় সে খুব ছোট ছিলো। সে বোঝেওনি তায়ান ভাই যে আর ফিরবে না। তায়ান ভাইকে তার মনে পরলেও তেমন একটা গুরুত্ব দিতো না। কিন্তু যখন থেকে তাকে টিভির স্ক্রিনে দেখল কে জানে কী হলো! যে মেয়ের কখনো ক্রিকেট,ফুটবল এসব খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ ছিলো না, সে তায়ানকে নতুন ভাবে দেখার পর কোনো ম্যাচই দেখা মিস যেত না তার। তায়ানের সব রকম ছবি সে নিজের কাছে যোগার করে রাখতো। কীভাবে যেন মানুষটা দুরে থেকেও অনুভার মনে জায়গা করে নিয়েছে।
তায়ান দেখল অনুভার ঠোঁট হালকা ফুলে উঠেছে। তার ইচ্ছা করল আবারও চুমু খেতে।অনুভার কাঁধ ধরে ধীরে ধীরে নিজের দিকে নিয়ে এলো। এতে অনুভা ভ্রম কেটে যায়, তায়ানের দিকে তাকিয়ে দেখল সে তার ঠোঁটের দিকে মোহময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এক মুহুর্ত দেরি না করে,তায়ানের বুকে হাত ভর করে উঠে এল। বেড থেকে নেমে বলল,
_“আপনি ভুল ভাবছেন। ছবি রেখে দিলেই কী কেউ কাওকে ভালোবেসে ফেলে?আপনি ফুটবলার,সেই হিসেবে ভালো লাগতেই পারে। তাই বলে যে আপনি দয়া দেখিয়ে বিয়ে করবেন আর আমি সেটা মেনে নেব তা নয়।”
তায়ান বিছানা থেকে উঠে এসে কিছু না বলে অনুভার ক্লোজেটের দিকে গেল। ক্লোজেট খোলার আওয়াজ হতেই অনুভা লাফিয়ে ওঠে। চেঁচিয়ে বলে ওঠে,
_“এটা খুলছেন কেন, এখানে কিছু নেই।”
তায়ান সে সব কানে না নিয়ে ক্লোজেটের হিডেন ড্রয়ার থেকে মাঝারি সাইজের একটি ডায়েরি বের করে। ডায়েরির পুরো কভার সুতোর কাজ করা। সাদা রঙের সুতোর কাজের ওপর লাল রঙের সুতো দিয়ে লেখা ‘অপেক্ষার নাম তুমি।’ আরেকটু নিচে ছোট করে লেখা ‘তায়ান ভাই’।তায়ানের হাতে ডায়েরিটি দেখতেই অনুভার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। তড়িৎ বেগে তায়ানের কাছে গিয়ে কেঁড়ে নিতে চাইল সেই ডায়েরি। তায়ান ডায়েরি সমেত হাত উপরে উঠিয়ে ফেলে।ছয় ফুট তিন উচ্চতার অধিকারি তায়ান ভাইয়ের হাতে সেই ডায়েরির নাগাল পাওয়া অনুভার কাছে অসম্ভবই। কারণ অনুভা পাঁচ ফুট তিনের বেশি হবে না। অনুভা অসহায় হয়ে বলল,
_“ওটা দিন তায়ান ভাই। কিছুই নেই ওখানে।”
_“এই ডায়েরির পাতায় যতবার আপনার নাম লেখা আছে, ঠিক তার থেকেও বেশি আপনাকে ভালোবাসি।” তায়ান অদ্ভুদ ভঙ্গিতে বলল।
তায়ানের মুখে হটাৎ এই বাক্য শুনতেই অনুভার লজ্জায় মাটির নিচে চলে যেতে ইচ্ছা করল।এই লাইনটা এই ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা।তার মানে তায়ান ভাই আগেই ডায়েরি পড়ে ফেলেছে?কী লজ্জা! ইসস! কত কিছু লেখা আছে সেখানে! এইসব আরও ছোটো বেলায় লিখেছিল। ক্লাস নাইন কী টেন হবে। সে বয়সে কত কিছুই লিখেছে। সেগুলো পড়লে নিজেরই বিরক্ত লাগে।এখনও সেই ভালোবাসা আছে তবে সে এখন নিজের আবেগ কন্ট্রোল করা শিখে গেছে। তাই আগের করা পাগলামি মনে হলে ভিষণ বিরক্তি অনুভব হয় তার।
_“কী হলো কিছু বল।” তায়ান দুই ভ্রু নাচিয়ে বলল।
অনুভা থম মে'রে দাড়িয়ে তাকিয়ে আছে তায়ানের দিকে। পাশ কাটিয়ে রুম থেকে বের হয়ে যেতে চাইলো।তায়ান এক লাফে ওর সামনে গিয়ে বলল,
_“কোত্থাও যাবি না।এখনো অস্বীকার করবি?” গরু গম্ভীর স্বরে বলল।
অনুভা কঠোর দৃষ্টিতে তাকাল,
_“মেয়েদের জিনিসে হাত দিতে হয় না সেটা বোধহয় জানেন না!”
_“ভালোবাসিস আমায়?” তায়ান আবারও বলল।
অনুভার দৃষ্টি নরম হয়ে গেল। চোখের পাতা কাঁপল। এক মুহুর্ত চুপ থেকে বলল,
_“হ্যাঁ বাসি কিন্তু…”
_“তাহলে বিয়েতে দ্বিমত করছিস কেন?” তায়ান অনুভাকে থামিয়ে দিয়ে বলল।
_“কারণ আপনি করুণা করে,বাধ্য হয়ে বিয়ে করতে চাইছেন।”
_“যদি বলি আমিও তোকে চাই?” তায়ান গভীর দৃষ্টি ফেলে বলল।
অনুভা আবারও থমকে গেল।তায়ান ভাই তাকে চায়?নাহ…কীভাবে সম্ভব।তার মত একটা সাধারণ মেয়েকে!
_“মিথ্যা বলছেন আপনি।”
_“আমি মিথ্যা বলছি না।আমি সত্যিই তোকে চাই।”
_“আপনার মত একজন বিখ্যাত মানুষ আমাকে চাইবে?কখনই বিশ্বাস করব না এটা।”
_“যখন থেকে চাই তখন আমি বিখ্যাত কেউ ছিলাম না।”
_“কখন থেকে?” অনুভা প্রশ্ন চোখে তাকিয়ে বলে।
_“যখন এই বাড়ি ছেড়েছি।”
অনুভা আবারও থম মে'রে তায়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। তায়ান অনুভার কাছে এসে তার কপালে কপাল ঠেকাল। তারপর বলল,
_“বিশ্বাস করিস না আমায়?এই বাড়ির সম্মান নিয়ে আমার একদমই মাথা ব্যাথা নেই।তোকে চাই বলেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
অনুভা কেঁদে উঠে।তার চোখে আনন্দ,অবিশ্বাস।তায়ান ভাই সত্যিই তাকে চায়!তাহলে কী তার ভালোবাসাও পূর্নতা পেল?সে যেমন মিরাকল চেয়েছিল তেমনটাই হলো?অনুভার চোখ থেকে পানি পড়তে দেখে তায়ান বুড়ো আঙুল দিয়ে মুছে দিলো তা। অনুভাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলল,
_“আমি তোকে চাই এটা প্রমানের জন্য বিয়ে ছাড়া আর কী হতে পারে? বল…সেটাই করব।”
অনুভা দু'দিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,
_“আর কিছু না…কিচ্ছু না।”
_“তাহলে বল বিয়ে করবি না আমায়?”
অনুভা চোখের জল সমেত উপর নিচ মাথা নাড়াল।বলল,
_“করব তায়ান ভাই…করব।”
তায়ান ঠোঁট প্রসারিত করে হেঁসে অনুভার কপালে ঠোঁট ছোঁয়।অনুভার এই মুহুর্তটা স্বপ্নের মত মনে হলো।কেনই বা হবে না?সামনে থাকা এই মানুষটা তো স্বপ্নের মতোই।স্বপ্নের মত তার জীবন থেকে হারিয়ে গিয়ে,স্বপ্নের মতই করেই এলো।তার তো কোনো দিনও নিজের অনুভূতি, ভালোবাসা প্রকাশ করার সাহসই হতো না।অন্তত তায়ান ভাইকে তো না-ই।এইতো এখন তায়ান ভাই তাকে জড়িয়ে ধরে আছে।তার শরীরের পুরুষালী মাদকীয় ঘ্রান অনুভার শরীর জুড়ে মিশে যাচ্ছে।