রক্ত রেখার আড়ালে

পর্ব - ৮

🟢

দু'টি অর্ধ*ন*গ্ন তরুনী ডন রিকার্ডোর দু'পাশে হাঁটু গেরে বসে ধীর হাতে তার শরীর টিপে দিচ্ছে।আর্জেন্টিনার বুয়েনোস আইরেসের পুরোনো বন্দরের ধারে,ধোয়ায় মোড়া এক প্রাইভেট লাউঞ্জে বসে আছে ডন রিকার্ডো।রাজকীয় ভঙ্গিতে সোফায় গা এলিয়ে চোখ বুঁজে আছে সে।আর্জেন্টিনাতে তাকে গ্যাংস্টারদের গ্যাংস্টার বলা হয়।এ শহরের আন্ডারওয়ার্ল্ডের একমাত্র নিয়ন্ত্রক সে।বয়স তার পঞ্চান্ন ছাড়লেও মুখ থেকে সৌন্দর্য কাড়েনি।বলিষ্ঠ, পেটানো শরীর।তবে তার স্টাইল,ভঙ্গি,পোশাক-আশাক,পশ্চিমা আভিজাত্যের হলেও চেহারায় স্পষ্ট বাঙালী ছাপ ফুটে ওঠে।

_“ইউ অল লিভ ফ্রম হিয়ার।” রুক্ষ মেয়েলি কন্ঠ শুনতেই চোখ মেলে তাকাল ডন রিকার্ডো।হাঁটুর দু'পাশের মেয়ে দু'টোকে ইশারা করল চলে যাওয়ার জন্য।তারা ধীর পায়ে উঠে চলে যায়।

ডন রিকার্ডো নিজের মেয়ের দিকে প্রশ্নাবোধক তাকিয়ে বলল,

_“হোয়াট্‌স রং উইথ ইউ, মাই এঞ্জেল?”

মেয়েটা খেঁকিয়ে উঠে বলল,

_“একদম নাটক করবে না,তুমি জানো আমি কেন এমন করছি।ভিকি’কে যেতে দিলে কেন আবার?”

_“কাম ডাউন, মাই এঞ্জেল।সে চলে আসবে খুব শীঘ্রই।”

_“আমিও যেতে চাই।”মেয়েটা বলল।

_“নো,তুমি কোথাও যাচ্ছ না।” ডন রিকার্ডো গম্ভীর স্বরে বলল।

_“পাপা!আমি সেখানে যাবোই।এখানে বসে আমি আর অপেক্ষা করতে পারব না।”

_“জেদ করবে না,এলেনা!” ডন রিকার্ডো বলল।

_“জেদ করছি না।তুমি আমাকে বাঁধা দেবে না।”এলেনাও জোর গলায় বলল।

_“ঠিক আছে আমি ওর সঙ্গে কথা বলব।সে চাইলে তবেই যাবে।”

এলেনা চলে গেল লাউঞ্জ ছেড়ে।ডন রিকার্ডোর একমাত্র মেয়ে এলেনা রিকার্ডো।আর্জেন্টিায় লেডি গ্যাংস্টার হিসেবে সে বেশ পরিচিত।সাথে একজন নামকরা লেডি বাইকার।বাইক রেস থেকে শুরু করে আন্ডারগ্রাউন্ড ফাইট,স্ট্র্যাটেজিক গ্যাং ওয়ার সব ক্ষেত্রেই তার নাম শীর্ষে।

বাইরে অপেক্ষা করছিল তার লাল রঙের ডুকাটি। হেলমেটটা মাথায় চাপিয়ে,ইঞ্জিন স্টার্ট করেই ঝরের গতিতে চলে গেল অজানা গন্তব্যে।

———

বাংলাদেশ,ঢাকা—

সকালে তায়ান অনুভাকে তার সঙ্গে এসে খেতে বললেও অনুভা আর রুম থেকে বের হয়নি।এর মধ্যে অলি গিয়ে ডেকেছে,উর্মিলা বেগম ডেকেছে কারও ডাকেই সারা দেয়নি।দুপুরে আমীরা বেগমের ডাকে দরজা খোলে আর তখনই আমীরা বেগম খাবার নিজ হাতে খাইয়ে দেয়।তবু অনুভা রুম থেকে বের হয় না।তার সঙ্গী হিসেবে বর্তমানে তার বিড়ালটাই আছে।রুমের মধ্যে এদিক ওদিক হেঁটে,হেঁটে লেজ নাড়াচ্ছে।আবার এসে অনুভার উরুর উপর বসে গাঁ এলিয়ে দিচ্ছে।

অনুভা সেটিকে জড়িয়ে নিয়ে বলল,

_“তোর আর আমার মধ্যে তেমন মিল না থাকলেও,এক দিকে আমাদের খুব মিল।”

বিড়ালটা মিউউ করে উঠলো।অনুভা মলিন হেসে বলল,

_“তোরও মা নেই,আমারও নেই।”

বিড়ালটা আবারও মিউ করে ওঠে।এই বিড়ালটা তার জন্য শুধু বিড়াল না।তার একমাত্র একাকিত্বের সঙ্গী।সে যেন অনুভার সব রকম অনুভূতি বোঝে।অনুভার মন খারাপ থাকলে তার পাশ থেকেই সরতে চায় না।

তার বিয়ের প্রোগ্রামের জন্য সকল কিছুর আয়োজন মোটামুটি শুরু হয়ে গেছে।অনেক আত্মীয় স্বজনদেরও দাওয়াত দেওয়া হয়ে গেছে।সাথে ডেকোরেশনের লোকদের বলা হয়েছে দু'দিনের মধ্যে কাজ শেষ করতে।এসব ভাবলেই তার বুক ভারি হয়ে আসে।

অনুভা বালিশের নিচ থেকে ফ্রেমে বাঁধানো সেই ছবিটা বের করল।সাথে নিজের মায়ের ছবিও।দেখতে থাকল।চোখ ঘোলাটে হয়ে ওঠে।দরজায় কারও করাঘাত পেয়ে তড়িৎ বেগে ছবি আবার আগের যায়গায় রেখে দেয়।আরমান আহসানি আসে তার রুমে।আরমান সাহেবকে দেখেই কেন যেন ঠোঁট ভেঙ্গে কেঁদে ফেলে মেয়েটা।হয়তো অতি আপন জনের কাছে মানুষ সব থেকে দূর্বল হয়ে পড়ে!

আরমান সাহেব কোনো বাক্য বিনিময় না করে অনুভার মাথায় হাত রাখে।শুধু মাত্র ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চান না বলে মেয়েটার অসহায়ত্ব দেখতে হচ্ছে তাকে।সে অনুভাকে কোনো কিছু বলল না।আমীরা বেগমের থেকে সব শুনেছে।

_“চলো রাতের খাবার আমাদের সাথে খাবে।”

_“বড় আব্বু আমি…”

_“আমি যেতে বলেছি অনু!চলো।”

অনুভা আর না করতে পারল না।অন্য কেউ হলে হয়তো এত সহজে মেনে নিতো না।কিন্তু এই ব্যাক্তির সঙ্গে তর্ক করা তার পক্ষে সম্ভব না। প্রতিবারই তার রাগ অভিমান এই বড় আব্বুর কাছে এসে হেরে যায়।

—

_“তুমি আসছো থেকে আমার কোনো খোঁজ খবর নিচ্ছ না তায়ান!” ফেডেরিকো তায়ানের রুমে এসে অভিযোগ করল।

তায়ান আই প্যাডে কিছু একটা করতে করতে বলল,

_“কেন তুমি কী খুব বিপদে আছো?”

_“সেটা না তবে সেখানে কী কী হলো কিছুই জানালে না।ঝামেলা শেষ করে এসেছ তো?”

_“পুরোপুরি না।”

_“অনুভার প্রতি তোমার ভালোই মায়া দেখছি।”ফেডেরিকো অন্য টপিকে চলে গেল।

তায়ান ভ্রু কুঁচকে রিকোর দিকে তাকায়।

_“থাকতেই পারে!”

_“হ্যাঁ,আমারও মায়া হয় মেয়েটার জন্য।” বলে তায়ানের বিছানায় গাঁ এলিয়ে দেয়।

_“আর ওই মহিলাটার উপরেও ভিষণ রাগ হয়।”

রিকোর কথা শুনে তায়ান কিছু একটা ভেবে তায়ানের ঠোঁটের এক কোন বেঁকে যায়।তায়ানকে চুপচাপ থাকতে দেখে রিকো তার দিকে তাকিয়ে বলল,

_“আমরা আবার কবে ফিরব?”

_“এখনি ফিরে যাও।” তায়ান বলল।

_“ইউ আর ইনস্যালটিং মি!” রিকো মুখ কুঁচকে বলল।

তায়ান দেখল দরজার পাশে ঘাপটি মেরে দাড়িয়ে আছে নীলা।তাকে দেখে সেখানে এগিয়ে গিয়ে বলল,

_“চকলেট লাগবে?”

ছোট্ট নীলা চমকে ওঠে।একটু আনাগোনা করে বলে,

_“বড় চাচ্চু খাবার খাওয়ার জন্য ডাকছে।”

_“আমি তো আমাদের খাবার রুমে দিতে বলেছিলাম।” তায়ান বলল।

_“জানি না বলেছে সবাইকে এক সঙ্গে খেতে।”

তায়ান মাথা নাড়িয়ে বলল,

_“ঠিক আছে আসছি তুমি যাও।”

নীলা গেল না।দাঁড়িয়ে আছে এখনো।তায়ান যেন বুঝলো কেন যাচ্ছে না।ড্রয়ার থেকে কিছু চকলেট বের করে দিলো।নীলা সেগুলো দেখেই ঠোঁট প্রসারিত করে হাসল।হাতে নিয়ে বলল,

_“থ্যাংকিউ ভাইয়া।”

তায়ান গম্ভীর স্বরে বলল,

_“হুম।”

—

ডাইনিং টেবিলে সবাই উপস্থিত।সবাই খাবার খেতে ব্যস্ত।তায়ান আর রিকোও এসে বসলো।তাদের দেখে নাফিসা বেগম একটু নড়েচড়ে বসে।অলি আরিজের পাশে বসা।অলির পাশে অনুভা।অনুভব, নীলা এক পাশে।নাফিসা বেগম তখন থেকেই খাবারের প্লেটে আঙুল ঘোরাচ্ছে।কেন যেন খাবার তার গলা দিয়ে নামছে না।আরশাদ সাহেব একটু পরপর আড়চোখে স্ত্রী কে দেখছে।এবার নাফিসা বেগম ছটফটিয়ে উঠে বলেই উঠলেন,

_“আমার কিছু বলার আছে।”

হঠাৎ নাফিসা বেগমের কথায় সবাই তার দিকে তাকাল।শুধু তায়ান নিজের মত খাচ্ছে।অনুভাও একবার দেখে আবার চোখ নামিয়ে খেতে লাগল।কিন্তু এই মুহুর্তে নাফিসা বেগম যা বললেন অনুভা এক ঝটকায় আবারও নাফিসা বেগমের দিকে তাকাল।সাথে এখানে উপস্থিত সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।তবে তায়ানের মধ্যেই কোনো হেলদোল দেখা গেল না।

_“হ্যাঁ,যা শুনেছ সবাই ঠিকই শুনেছ।রাফিদের সঙ্গে অনুভার বিয়ে হবে না।” নাফিসা বেগম আবারও বলল।

আরশাদ সাহেব বলল,

বিজ্ঞাপন

_“এটা মজা করার সময় না।”

_“আমি মজা করছি না।যা হয়েছে হয়েছেই বিয়ে পর্যন্ত আর এগুতে চাই না।সব কিছু এখানেই বন্ধ করে দিন।”

_“হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত কেন নিলে?” আরমান সাহেব বললেন।

নাফিসা বেগম অনুভার দিকে তাকাল।চোখে ঘৃণা ফুটিয়ে তুলে বলল,

_“আমার বোনের ছেলের সঙ্গে এই অবাধ্য মেয়ের বিয়ে দিতে চাই না।আপনাদের মেয়ে আপনারাই যার সঙ্গে ইচ্ছা হয় বিয়ে দিয়েন।আমি আর এই সম্পর্ক সামনে টানতে চাই না।”

অলি ও অনুভব আনন্দে হেঁসে উঠলো।কিন্তু আরিজ সন্দিহান গলায় বলল,

_“আপনার মতলব কী চাচী…মানে…”

_“বাজে কথা বলবে না।অনেক ভেবে দেখেছি আমার বোনের ছেলের যোগ্য না এই মেয়ে।” নাফিসা বেগম খেঁকিয়ে ওঠে।তার কথায় আরিজসহ, অলি, অনুভব ঠোঁট টিপে হাসে।রিকোও ঠোঁট উল্টে চোখ কপালে তোলে যেন কত মজার কৌতুক শুনছে সে।

আরশাদ সাহেব জ্বলন্ত চোখে নাফিসা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,

_“ছেলে খেলা পেয়েছ?কত আত্মীয় স্বজনদের দাওয়াত দেওয়া শেষ।অফিসের লোকসহ,শহরের বিজনেস পারসনদেরও বলা হয়েছে,আর এখন তুমি নাটকীয় কথা নিয়ে এসেছ?” আরশাদ আহসানির মুখের রঙ বদলে গেছে।

আরমান আহসানিও তাল মেলালেন।

_“হ্যাঁ,আরশাদ ঠিকি বলছে।তোমার এমন সিদ্ধান্তের জন্য আমাদের কতটুকু বদনাম হবে ভাবতে পারছ?” যদিও সে ভেতরে ভেরতে খুশি এই কথা শুনে তবুও প্রকাশ করলেন না।আমীরা বেগম ও উর্মিলা বেগমেরও একই অবস্থা।আসাদুর সাহেবও বললেন,

_“আমাদের অফিসও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এই বিয়ের জন্য।এছাড়া রাফিদ কী এটা মেনে নেবে?”

_“রাফিদের মানা,না মানা আমার ওপর ছেড়ে দাও।”নাফিসা বেগম আসাদুর সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন।

আরশাদ সাহেব এবার নাফিসা বেগমের চুল মুঠো করে ধরে বললেন,

_“ফাজলামো হচ্ছে?সব তোর কথায় হবে?অনুর বিয়ে রাফিদের সঙ্গেই হবে।” অনুভা এতক্ষণ স্তব্ধ খেয়ে সব কিছু দেখছিল।নিজের বাবার উপর সে বারবার অবাক হয়।একটা চরিত্রহীন,লম্পটের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার জন্য কত তাড়া তার কাছে!

আসাদুর আহসানি এসে নিজের ভাইকে নাফিসা বেগমের থেকে ছাড়িয়ে নিলেন।

_“ভাইজান শান্ত হও।এভাবে কিছু সমাধান হবে না।ভাবীর সঙ্গে ঠান্ডা মাথায় কথা বলো।”

_“ঠান্ডা মাথায় কথা বলে লাভ নেই, আমার সিদ্ধান্ত বদলাবে না।এ বিয়ে কোনো ভাবেই হবে না।এতে যা খুশি হোক আমার কিছু যায় আসে না।” নাফিসা বেগম নিজের রুমে চলে গেলেন।

অনুভার কেন যেন শ্বাস আটকে আসছে।আটকে রাখা শ্বাস ফেলল সে।সত্যিই কী আল্লাহ মুখ তুলে চেয়েছে?মিরাকল হয়েছে তাহলে?অলি অনুভার উরুর উপর চি*মটি কাটলো,

_“এতো ভাবার কিছু নেই।এটা সত্যিই।” ফিসফিসিয়ে বলল অলি।

আরশাদ সাহেব খাবারের প্লেট মেঝেতে ফেলে দিলো।রেগেমেগে চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলল।কেউ কিছু বলল না।কী বলবে?তাদের সবার কাছে অনুভার থেকে সম্মান বেশি হয়ে যায়নি।হ্যাঁ তবে আরমান সাহেবও চিন্তায় পড়ে গেছেন এখন এর সমাধান কী?সবাইকে কী বলবে?

নাফিসা বেগম রুমে এসে দরজা লাগিয়ে দেন।বাহির থেকে আরশাদ সাহেবের চিৎকার চেচামেচি ভেসে আসছে।রাফিদও এই কথায় রেগে যাবে।মানতে চাইবে না,কিন্তু সে কোনো ভাবেই এই বিয়ে হতে দেবে না কক্ষনও না।অনুভাকে তার বোনের ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিতে চেয়েছিল তার কারণ,অনুভার নানা-নানুর একমাত্র মেয়ে ছিলো অনুভার মা।অনুভার নানা শহরের প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন।জায়গা-সম্পত্তি,স্বর্ন,বাড়ি-গাড়ি,টাকার কোনো কমতি ছিলো না।অনুভার জন্মের পর তার মায়ের হঠাৎ মৃত্যু।তারপর অনুভার নানা তার নিজের স্থাবর-অস্থাবর সকল সম্পদ অনুভার নামে করে দেয়।এত বছরে তার নানা-নানুও একজন,একজন করে মা'রা যায়।আর সব কিছুর মালিকানা অনুভা পেয়ে যায়।এতে অনুভা এক জীবন পায়ের উপর পা তুলে কাটিয়ে দিয়েও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্যও রেখে যেতে পারবে।আরশাদ সাহেব অনেক চেষ্টা করেছিলেন এসব নিজের নামে করে নিতে,কিন্তু অনুভার নানা এত নিখুঁত ভাবে সব কিছু করেছে যে একমাত্র সে না চাইলে কোনো ভাবেই এটা সম্ভব না।এছাড়াও আরমান সাহেবও কখনো এতে সম্মতি জানায়নি।

সেই সব কাগজপত্র,দলিল,সব কিছুই অনুভার কাছে রয়েছে।অনুভার এসবের কোনো আগ্রহ নেই তবে আরমান সাহেব সবসময় তাকে এগুলো স্বযত্নে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।সে হিসেবে অনুভার সঙ্গে যার বিয়ে হবে সেই এসবের মালিকানা পেয়ে যাবে।এত কিছু জেনেও নাফিসা বেগম কীভাবে অন্য ঘরের ছেলের সঙ্গে অনুভার বিয়ে দিতো?এসব ভেবেই নাফিসা বেগম চেয়েছিলেন তার বোনের ছেলে রাফিদের সঙ্গে অনুভার বিয়ে দিতে।আরশাদ সাহেবকেও নানান যুক্তি দিয়ে বুঝিয়েছিলেন।তবে অজ্ঞাত এক কারণে এখন এই বিয়ে সম্ভব না,কোনো ভাবেই সম্ভব না।

__

রাত প্রায় একটার কাছাকাছি এখনো আরমান সাহেব, আরশাদ সাহেব লিভিং রুমে বসে আছেন।আসাদুর সাহেব সহ, উর্মিলা বেগম,আমীরা বেগমও এখানেই।আরশাদ সাহেবকে কোনো ভাবেই শান্ত করা যাচ্ছে না।তখন থেকে বুঝিয়ে যাচ্ছে সবাই।তায়ান আর রিকো রুমে চলে গেছে।অনুভা,অলি,অনুভবও নিজেদের রুমে।

_“আমি কালই অনুভার জন্য ভালো ছেলে দেখব।বিয়ে ওই তারিখেই হবে।” আরমান সাহেব বললেন।

_“এত সহজ?এত কম সময়ে কোথায় ছেলে খুঁজবো?এটা কী গরু,ছাগল যে হাঁটে গেলাম আর পেয়ে গেলাম।” আরশাদ সাহেব গর্জে উঠলেন।

_“অবশ্যই পাবো।আমাদের মেয়ে কী কোনো অংশে কম?কত ভালো ভালো সমন্ধ ফিরিয়ে দিয়েছি।” আরমান সাহেব নরম স্বরে বলল।

_“সে না হয় পেলাম,কিন্তু এই দু'দিনে কে বিয়ে করবে?এই মেয়ের জন্য আমার সব শেষ হবে।”

_“এখানেও অনুভার দোষ দিচ্ছেন,চাচা?ওর কী দোষ? যা বলার চাচীকে গিয়ে বলুন।”আরিজ প্রতিবাদ করে বলল।

_“তোর চাচীর এমন সিদ্ধান্তে অবশ্যই কারণ আছে।নিশ্চয়ই ওই মেয়ে কোনো কিছু করেছে।” আরশাদ সাহেব বললেন।

_“আপনি সত্যিই বদলাবেন না চাচা।” আরিজ এতটুকু বলে চলে যাচ্ছিলো।তখনই তায়ান আর ফেডেরিকো নেমে আসল উপর থেকে।তায়ান আরিজকে চোখে ইশারা করে থামিয়ে দিলো।তারপর আরমান সাহেবের কাছে গিয়ে বলল,

_“দু’দিনের মধ্যে বিয়ে না হলে কী খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে,বাবা?”

তায়ানের কথায় আরেক দফায় রেগে গেলেন আরশাদ আহসানি,

_“আরেক জন এসেছে আরেক নাটক নিয়ে।ক্ষতি না হলে রাতের ঘুম হারাম করে এখানে বসে আছি?” তায়ান সে সব শুনেও শুনলো না।সে আরমান সাহেবের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।আরমান সাহেব মাথা নাড়িয়ে বললেন,

_“ক্ষতি তো হবেই বাবা।আত্মীয় স্বজনদের কথা বাদ দিলাম,বিজনেস পারসনদের কীভাবে এই খবর জানাব?” আরমান সাহেবের কপালে চিন্তার ভাজ।

তায়ান বোঝার মত করে মাথা নাড়াল।ফেডেরিকো তায়ানের হাবভাব বোঝার চেষ্টা করছে।আরশাদ সাহেব সোফায় বসে দু'হাতে মাথা চে'পে ধরেছেন।এমনিতেই ঝামেলার শেষ নেই এখন আবার এই ছেলের নাটক দেখতে হচ্ছে তাকে।

তায়ান আরিজকে ডেকে বলল,

_“আরিজ অনুভাকে ডেকে নিয়ে আয়।”

আরিজ একটু অবাক হয়ে তায়ানের দিকে তাকায়,পরপর সম্মতি জানিয়ে চলে যায়।ডেকে নিয়ে আসে অনুভাকে।অনুভার সঙ্গে অলিও ছিলো তার রুমে।সেও অনুভার সঙ্গে আসে।

অনুভা এসে সবার দিকে প্রশ্নচোখে তাকায়।আর সবাই তায়ানের দিকে প্রশ্নচোখে তাকিয়ে আছে।নিরবতার সমাপ্তি ঘটিয়ে তায়ান কোনো রকম অভিব্যক্তি ছাড়াই,অন্তত স্বাভাবিক ভাবে বলল,

_“আমি অনুভাকে বিয়ে করব।”

সামান্য একটা বাক্য অথচ চারপাশ নিস্তব্ধ করে তুলল।সাথে অনুভার বুকে ঝড় তুলে দিলো।কানে একাধিকবার তায়ান ভাইয়ের বলা বাক্যটি রিপিট হতে থাকল ‘আমি অনুভাকে বিয়ে করব’।আরশাদ সাহেবসহ উপস্থিত সবাই এক মুহুর্তের জন্য থমকে যায়।আরিজ সন্তুষ্ট হাঁসে।নিজের বড়ো ভাইয়ের জন্য গর্ভ হয়।অলির এতক্ষণে ভাবা শেষ দুজনকে পাশাপাশি কতটুকু মানাবে।ভিষণ মানাবে তাদের।অনুভা অসীম সৌন্দর্যের অধিকারী,তেমনি তায়ান ভাইও মাত্রাতিরিক্ত সুদর্শন।

রিকো যেন আকাশ থেকে টপকে পড়ল।অবিশ্বাস্য চোখে দেখছে তায়ানকে।তার ইচ্ছে করছে তায়ানকে রুমে নিয়ে এক্ষুনি এসবের কারণ জিজ্ঞেস করুক।আমীরা বেগম ও উর্মিলা বেগম খুশিতে একে অপরের দিকে তাকালেন।আরমান সাহেব বললেন,

_“তুমি ভেবে বলছ?”

_“ভেবেই বলছি।কেন বাবা তুমি কী তোমার আদরের ভাতিজীকে আমার হাতে তুলে দিতে চাও না?” তায়ান বলল।

_“কী বলছিস বাবা?কেন চাইবো না?ওর জন্য তোর চেয়ে যোগ্য ছেলে কোথায় পাবো?” আরমান সাহেবের আনন্দে চোখ ভরে ওঠে।এর চেয়ে খুশির কিছু হয়ে পারে?সে কখনোই তায়ানকে এমন কিছু প্রস্তাব দিতে পারত না। তার এই ছেলে নামকরা ফুটবলার,অনুভার মত সাধারণ মেয়েকে বিয়ে করতে চাওয়া ভাবনার বাহিরে ছিল তাদের।

আরশাদ সাহেব আগেই রাগ দেখালেন না শান্ত ভাবেই বললেন,

_“তুমি ওকে কেন বিয়ে করবে?এর পেছনে রহস্য কী?”

অনুভা তায়ানের দিকে তাকায়,কারণটা সে নিজেও জানতে চায়।তায়ান নির্বাক ভঙ্গিতে বলে,

_“এই বাড়ির সম্মান রক্ষা করা আমারও দায়িত্ব।আমি থাকতে তা নষ্ট হতে দিতে পারি না।”

আরমান সাহেব ছেলের কাঁধে হাত রেখে বলল,

_“আমার যোগ্য ছেলে তুমি।” আমীরা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,

_“তুমি শুধু বলো না?কেন আমি আমার ছেলেকে এত ভালোবাসি…দেখো সেই কারণ।” আমীরা বেগম ঠোঁটে সন্তষ্টির হাসি ঝুলিয়ে উপর নিচ মাথা নাড়ে।

_“না…নাহ।আমি এই বিয়ে মানি না।আমি কারও করুণা নিয়ে বাঁচতে চাই না।বড় আব্বু আমি আপনাদের এই সিদ্ধান্ত মানতে পারব না।” বলতে বলতে চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয় অনুভা।আরিজ টেনে ধরে অনুভাকে,

_“পা*গলের মত কথা বলছিস কেন অনুভা?কে তোকে করুণা করছে?”

অনুভা আরিজের থেকে নিজেকে ছাড়াতে ছাড়াতে বলে,

_“সবাই,তোমরা সবাই আমাকে করুণা করছ।” অনুভা চলে গেল।

তায়ানও গেল তার পিছু।আরিজ ও অলি যেতে চাইলে আরমান সাহেব বাঁধা দেন।তাদের একা কথা বলা প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন
রক্ত রেখার আড়ালে গল্পটি আয়েশা শেখ রিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে মোড়ানো থ্রিলার উপন্যাস