রক্ত রেখার আড়ালে

পর্ব - ৫

🟢

_“আপনি এখানে? তা-তায়ান ভাই আপনি এখানে কী করছেন….”

বাকি কথা বলার আগেই তায়ান এসে এক হাতে অনুভার মুখ চে'পে ধরল।তায়ান সতর্ক করল অনুভাকে,

_“চুপ..চিৎকার করবি না।”

হঠাৎ তায়ান এতো কাছে আসায় হকচকিয়ে গেল অনুভা।চোখ বড়ো করে তায়ানকে দেখল।পরপর রাস্তায় পরে থাকা রাফিদের অবচেতন,আহত দেহোর দিকে তাকাল। ফেডেরিকো এখনো পা দিয়ে লা’থি দিচ্ছে রাফিদের শরীরে।নিজের মুখ থেকে তায়ানের হাত সরিয়ে আতংকিত কন্ঠে বলল,

_“ওনাকে মা'রতে নিষেধ করুন ম'রে যাবে।”

_“ও ম'রে গেলে তোর কী?” তায়ান একটু বিরক্তি স্বরে বলল।

অনুভা যেন বুঝল না তায়ানের কথা।প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।তায়ান চোখ বন্ধ করে তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল।

_“তুই তো ওকে বিয়ে করতে চাস না,মে'রে ফেলি ওকে?” তায়ান এতো সহজ ভাবে বলল যেন মাছি মা'রার কথা বলছে।

অনুভা বিস্মিত কন্ঠে বলে,

_“কিহহ… কি বলছেন এগুলো?মে'রে ফেলবেন মানে?”

_“ওকে মে'রে ফেললেই তো তোকে এই বিয়ে করতে হবে না।”

অনুভার গা শিউরে ওঠে। কাউকে মে'রে ফেলা এতো সহজ? যতটা সহজে তায়ান ভাই বলছে? হ্যাঁ,অনুভা লোকটাকে বিয়ে করতে চায়না,তাই বলে ম'রে যাক এটাও চায় না।আর সেই খু'ন তায়ান ভাই করুক একটা আরও আগে চায় না।সে তায়ানের হাত ধরে অস্থির হয়ে বলল,

_“না..নাহ চলুন এখান থেকে।কেউ দেখে ফেলার আগে চলুন।”

তায়ান তবুও দাড়িয়ে রইল।অনুভা আবারও বলল,

_“আমি তাকে বিয়ে করতে চাইনা,কিন্তু আপনি তাকে মে'রে ফেলুন এটাও চাই না। অনেক অন্যায় হবে যাবে।”

তায়ান কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,

_“ঠিক আছে মা’রব না।” ফেডেরিকোকে ডেকে বলল,

_“রিকো,কাম কুইক।যেতে হবে আমাদের।”

ফেডেরিকো রাফিদের কাছ থেকে সরে আসলো,নিজের ফক্স মাস্ক খুলে বলল,

_“He is not dead yet.”

_“ এতটুকুই যথেষ্ট,চলো এখন।” তায়ান বলল।

ফেডেরিকো অবাক চোখে তায়ানকে দেখল,

_“তুমি এই কথা বলছ?”

_“এখন এতোকিছু বলার সময় নেই।তাড়াতাড়ি বাইকের কাছে চলো।” বলেই তায়ান অনুভার হাত চে'পে ছুটে গেল।অনুভাকে কিছু বলার সুযোগ দিলো না। তবে একটু সামনে যেতেই দুটো কালো রঙের বাইক দেখে অবাক হলো।আরও বেশি অবাক হলো যখন তায়ান বাইকে বসে অনুভাকে বসতে বলল।

_“ এই বাইক গুলো কোথায় পেলেন আপনারা,মানে কাদের এগুলো?” অনুভার কন্ঠে বিস্ময়।

তায়ান নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল,

_“আমাদের।তোকে বসতে বলেছি বস এসে।”

অনুভা একবার রাফিদের দিকে তাকাল।নড়াচড়া করছে হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরবে।দ্রুত গতিতে বাইকে চড়ে বসল।অনুভা বসতেই তায়ান বাইক স্টার্ট করল।বাইকের গতি সর্বচ্চো থাকায় তাল সামলাতে না পেরে অনুভা তায়ানের ওভার কোট চে'পে ধরল।

তায়ান ভাই তো দেশে ছিলো না তাহলে বাইক কোথায় পেল?শুধু তায়ান না রিকোও।দু'টো বাইকই ‘বি.এম.ডাব্লিউ s1000rr’।অনেক দামী বাইক এগুলো। কোথায় পেল তারা? কিনলই বা কবে?তারা তো বাসা থেকেই বের হয়নি দেশে আসার পর।আর অনুভাকেই বা এখানে কীভাবে খুজে পেল?বাসায় গিয়ে কী বলবে অনুভা?রাফিদ যদি জেনে যায় তাকে তায়ান আর রিকো আঘাত করেছে কী হবে তখন?কিন্তু এমনি এমনিই তো আঘাত করেনি।আজকে তারা না আসলে কী হতো অনুভার?

অনুভার মনে শত শত প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে কখন বাসার কাছে চলে এসেছে টেরই পায়নি।কিন্তু এটা আহসানি বাড়ির পেছন দিক। অনুভা বাইক থেকে নেমে বলল,

_“এইদিক দিয়ে কেন আসলেন?”

তায়ান নিজের হেলমেট খুলল না।অনুভার প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে বলল,

_“তুই সামনের গেইট দিয়ে বাসায় ঢুকে যা।বাসায় কাওকে কিছু বলার দরকার নেই।”

_“আপনারা আসবেন না?আপনারা কোথায় যাবেন?”

তায়ান বোধহয় বিরক্ত হলো,

_“এতো প্রশ্ন করিস কেন তুই?তোকে যা বলেছি সেটা কর।” হেলমেটের ফাঁক দিয়েই তায়ানের বিরক্তি ভরা চোখ দেখে আর কোনো প্রশ্ন করল না অনুভা।

__

আহসানি ভিলার বসার ঘরে আরমান সাহেব বসে আছেন।তার কপালে চিন্তার ভাজ।সাথে তার দু'ভাইও উপস্থিত।আমীরা বেগম ও উর্মিলা বেগম দু'জন মিলে রাতের খাবার এনে টেবিলে রাখছেন।আরমান সাহেব তার ভাই আরশাদ আহসানিকে বললেন,

_“রাত তো অনেক হলো অনু এখনো আসছে না কেন?”

_“হয়তো কিছুক্ষণের ভেতর চলে আসবে।রাফিদ আছে তো সাথে চিন্তার কিছু নেই।” আরশাদ সাহেব বললেন।

আরমান সাহেব মনে মনে বললেন,

_“সেটাই আরও বেশি চিন্তা।না জানি কেমন অবস্থায় আছে অনু।”

_“কল করেছিলেন?” আমীরা বেগম আরমান সাহেবকে বললেন।

_“করেছিলাম ফোন বন্ধ।” আরমান সাহেব দীর্ঘ শ্বাস ফেললেন।

আরশাদ সাহেবকে আবারও বললেন,

_“বিয়ের আগে এভাবে এক সাথে যেতে দেওয়া ঠিক হয়নি তোমার।”

আরশাদ আহসানি ভ্রু কুঁচকে বললেন,

_“এখন আর আগের যুগ নেই ভাইজান।”

_“আমাদের বাসার নিয়ম-কানুন তুমি জানো!” আরমান সাহেব মেজাজ দেখিয়ে বললেন।

_“অনেক নিয়ম-কানুনই মানা হচ্ছে না এ বাড়িতে।” নাফিসা বেগম সিড়ি ডিঙিয়ে নিচে আসতে আসতে বললেন।

_“তুই কিসের কথা বলছিস?” আমীরা বেগম বললেন।

নাফিসা বেগম উপরে তায়ান আর রিকোর রুম ইশারা করে বলে,

_“তোমার ছেলে অচেনা একটা ছেলে নিয়ে এ বাড়িতে এসেছে।আর এসে থেকেই সারাদিন রুমে পড়ে থাকে।কী করে না করে কে জানে।”

আমীরা বেগম নাফিসা বেগমের কথায় একটু অবাক হয়ে বললেন,

বিজ্ঞাপন

_“ তুই এটাকে নিয়ম ভাঙ্গার কথা বলছিস?আরিজ আর অনুভব তাদের কোনো বন্ধু নিয়ে এলে এগুলো বলতে পারতি?আর ওরা ওদের রুমে যাই করুক তাতে তোর কী?”

নাফিসা বেগম কিছু বললেন না।মুখ বাঁকিয়ে অন্য দিকে তাকালেন।আরিজ আরমান সাহেবের চিন্তিত মুখ দেখে বলল,

_“তুমি চিন্তা করো না বাবা।আমি গিয়ে অনুকে নিয়ে আসছি।” এতটুকু বলে সদর দরজার দিকে যেতেই অনুভা ভেতরে প্রবেশ করল।বাসার সবাইকে এখানে দেখে একটু ভরকে গেল।অনুভাকে দেখেই আরিজ স্বস্তির শ্বাস ফেলে বলল,

_“এতো লেট হলো কেন?রাফিদ ভাই কোথায়?”

সবাই অনুভার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, তার প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায়।সে আড়ালে ঢোক গিলে বলল,

_“গাড়ি জ্যামে পড়েছিলো তাই…” কথা শেষ হওয়ার আগেই নাফিসা বেগম বললেন,

_“রাফিদ কোথায়,ওকে দেখছি না কেন?”

আরশাদ সাহেবও তাল মেলালেন,

_“হ্যাঁ,ও কী আসেনি?”

_“উনি আমাকে রেখে মাত্রই চলে গেল।আসতে বললাম।বলল কিসের যেন কাজ আছে।” অনুভা তোলাচ্ছিল একটু।

_“কোথায় নিয়ে গিয়েছিল ও তোকে?” আরমান সাহেব গম্ভীর স্বরে বললেন।

_“শহরেরই এক রেস্টুরেন্টে বসেছিলাম।”

আমীরা বেগম এসে বললেন,

_“হয়েছে এখন গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আয়।খাবার বারছি।এতক্ষণ তোর জন্য তোর বড়ো আব্বু টেনশনে ছিলেন।”

অনুভা মাথা নাড়িয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায়।যাই হোক আপাতত কিছু একটা বলে বেঁচে গেল।কিন্তু রাফিদ যদি তায়ান ভাইকে চিনে থাকে তাহলে?

_“তায়ান বলেছিল ওদের খাবার ওদের রুমে দিয়ে আসতে।তুই এদিকে খেয়াল রাখ।আমি গিয়ে ওদের খাবারটা দিয়ে আসি।” আমীরা বেগম উর্মিলা বেগমকে বলছিলেন।

এতটুকু শুনেই অনুভার পদযুগল থেমে যায়।অর্ধেক সিঁড়িতে উঠে দাঁড়িয়ে থাকে।তায়ান ভাই তো ঘরে নেই।শুধু তায়ান না রিকোও তো নেই।রুমে গেলে তো কাওকে পাবে না।তখন সবাই সব কিছু জেনে যাবে।অনুভা আর ভাবতে পারল না।সে দ্রুত গতিতে সিঁড়ি থেকে নেমে আমীরা বেগমলে বললেন,

_“আমায় দাও বড়ো আম্মু,খাবার গুলো আমি দিয়ে আসি।”

আরশাদ সাহেব বললেন,

_“তুমি মাত্র বাহিরে থেকে এসেছ।তোমার এগুলো করার প্রয়োজন নেই।”

_“সমস্যা নেই বাবা।দিয়ে এসে আমি নিজের রুমে চলে যাবো।”

আরশাদ সাহেবকে আর কিছু বলতে না দিয়ে আমীরা বেগম বললেন,

_“আচ্ছা দিয়ে আয় তাহলে।আমার রান্না ঘরে কিছু কাজ আছে।”

অনুভা মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে। খাবারের ট্রে আমীরা বেগমের থেকে নিয়ে তড়িঘড়ি করে উপরে চলে যায়।সে জানে তায়ান রুমে নেই তবুও নিচে বসে থাকা সবাইকে বোঝানোর জন্য দরজায় নক করে।দু'চার বার তায়ান ভাই বলে ডাকেও।কোনো সাড়াশব্দ নেই।আসবেও না।এবার নিজেই দরজা খোলার জন্য এক হাতে খাবারের ট্রে ভালোভাবে ধরে অন্য হাত বাড়ায়।তৎক্ষনাৎ দরজা খুলে যায়।চমকে ওঠে অনুভা।হাতে থাকা খাবার পড়ে যেতে নিলে তায়ান ধরে ফেলে।অনুভা যেন ভুত দেখছে।তেমনি করেই তাকিয়ে আছে সামনে থাকা তায়ানের দিকে।কিভাবে?কিভাবে সম্ভব? এ লোক নিজের রুমে কিভাবে এলো?সে তো অনুভাকে বাসার পেছন দিকে রেখে কোথাও একটা গেল!

_“ভেতরে আয়।” তায়ানের কথা শুনে স্তম্ভিত ফেরে অনুভার।

তায়ান অনুভার হাত থেকে খাবার নিয়ে টেবিলে রাখতে রাখতে বলে,

_“এভাবে দেখার কিছু নেই।ভেতরে এলে আয়,নাহলে দরজা আটকে চলে যা।”

অনুভা দরজা আটকে দিলো তবে চলে গেল না ভেতরে এলো,

_“রুমে এলেন কিভাবে?এটা কিভাবে সম্ভব?”

তায়ান চুপ রইলো।অনুভা ছটফটিয়ে ওঠে যেন এটা না শোনা পর্যন্ত শান্তি পাবে না।তায়ানের পেছনে আরও এগিয়ে এসে বলে,

_“কী হলো বলুন?কিভাবে…”

হঠাৎ তায়ানের আক্রমণে বাকি কথা বলতে পারল না।অনুভা কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক ঝটকায় তাকে বিছানায় বসিয়ে দুপাশে নিজের পেশিবহুল বাহু দ্বারা আবদ্ধ করে।তায়ান একটু ঝুঁকে অনুভার চোখের দিকে চোখ রাখে।অনুভা দৃষ্টি নামিয়ে ফেলে।তায়ানের শরীর থেকে শাওয়ার জেলের স্ট্রং স্মেল আসছে। চুল গুলোও ভেজা।রুমে এসে এত তাড়াতাড়ি শাওয়ারও নিয়ে ফেলেছে?আশ্চর্য!

_“আজকে বেশি প্রশ্ন করছিস।আমি তোর এত কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই।” তায়ানের হিমশীতল কন্ঠ শুনে চোখ তুলে তাকায়।আজ একদম কাছ থেকে তায়ানকে দেখছে।কত পরিবর্তন এসেছে চৌদ্দ বছর আগের তায়ানের থেকে!যদিও সেদিনের দিন গুলো অনুভার ভালোভাবে মনে নেই।সে তখন অনেক ছোট।

তায়ান এখনো আগের মত করেই তাকিয়ে আছে। অস্বস্তি হচ্ছে অনুভার।তায়ানের চোখে বেশিক্ষন চোখ রাখতে পারল না।অন্য দিকে তাকিয়ে মিনমিনে স্বরে বলল,

_“আপনাকে আমি রুমে আশা করিনি তাই চমকে গিয়েছিলাম।”

_“কোথায় আশা করেছিলি?”

_“জানি না তবে এখানে তো না ই।”

অনুভা অন্য দিকে তাকিয়ে কথা বলছে ব্যাপারটা বুঝতেই গাল চে'পে নিজের দিকে ফেরাল।

_“আমার দিকে তাকিয়ে কথা বল।”

_“ক-কী বলব?” হকচকিয়ে ওঠে অনুভা।

_“আর কী কী প্রশ্ন আছে বল,শুনি।”

অনুভার গলা শুকিয়ে আসে।

_“আমার আর কোনো প্রশ্ন নেই।আর কখনো প্রশ্ন করব না।সরুন। যেতে দিন আমায়।”

তায়ান সরে যাবে ঠিক সেই সময়ই দরজা খোলার শব্দ ভেসে আসে।তায়ান,অনুভা দু'জনেই বিদ্যুৎ গতিতে সেদিকে তাকায়।রিকো এসে তায়ানকে অনুভার উপর ঝুঁকে থাকতে দেখে চোখ ছোট ছোট করে বলল,

_“What were you doing with her?”

রিকোর মুখে এমন কথা শুনে লজ্জায় লাল হয়ে গেল অনুভা।কী ভাবছে সে..ছিঃ।তায়ান এবার অনুভার থেকে সরে এলো।রিকোর বলা কথায় কোনো প্রতুত্তর না করে অনুভাকে বলল,

_“যা এখন কাজ আছে আমাদের।”

চলেই তো যাবে থাকবে এখানে?এভাবে বলার কী আছে?সে এমনিতেও এখন চলে যেতো।অনুভা দরজার দিকে এগুতেই পেছন থেকে রিকোর কন্ঠ স্বর ভেসে আসে,

_“আনুভা,আর ইউ্য ওকে?”

অনুভা পেছন ফিরে কিছু বলার আগেই।তায়ান গমগম কন্ঠে বলল,

_“ She is fine…অনুভা তুই যা।”

অনুভা আর এক মুহুর্তও দাঁড়াল না।অনুভা চলে যেতেই রিকো ডান ভ্রু উঁচিয়ে বলল,

_“তোমার মতলব কী তায়ান হারিস?”

_“চিন্তা ভাবনার অনেকটা পরিবর্তন এসেছে।সব জানতে পারবে অপেক্ষা করো।”

বিজ্ঞাপন
রক্ত রেখার আড়ালে গল্পটি আয়েশা শেখ রিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে মোড়ানো থ্রিলার উপন্যাস