রক্ত রেখার আড়ালে

পর্ব - ৪

🟢

_“ছাড়ুন আমায়।পড়ে যাইনি আমি, ঠিক আছি।তায়ান ভাই….!”

কয়েকদিনের ভেতর ভার্সিটিতে যায়নি অনুভা।আরশাদ সাহেবেরও বারন ছিল আর অনুভারও যাওয়ার ইচ্ছা হয়নি।কিন্তু আজকে ইম্পর্টেন্ট ক্লাস আছে, না গেলেই নয়।ব্যাগ পত্র গুছিয়ে তৈরি হয়ে নিলো সে।এমনিতে বাহিরে বের হলে হিজাব ব্যবহার করে কিন্তু মুখ ঢাকে না।শ্বাসকষ্ট হয়।তৈরি হয়ে রুম থেকে বের হওয়ার আগে একটা ছবির ফ্রেম হাতে নিয়ে নজর বোলালো তাতে।কিছুক্ষণ পর বের হলো নিজের রুম থেকে।ব্যাগে সব বই ঠিকঠাক নিয়েছে কিনা তা দেখতে দেখতে সিঁড়ি ডিঙিয়ে নামছিলো সে।এর মধ্যেই কারও সাথে ধা’ক্কা খেয়ে পড়ে যেতে নিলেই ধরে ফেলে কেউ। নিজেকে সামলে সামনে থাকা মানুষটার দিকে কটমটিয়ে তাকাল।তাকাতেই তায়ানকে দেখে ভরকে যায় সে।সে তো ভেবেছিলো অলি বা অনুভব হবে।তায়ান ভাইকে মোটেই আশা করেনি এখানে।তায়ান এখনো তার দু'বাহু শক্ত করে ধরে আছে।তাকিয়ে আছে অনুভার দিকে।অনুভা এদিক ওদিক তাকাচ্ছে,বাসার কেউ দেখে ফেললে লজ্জায় পড়বে।তখন থেকে একই ভাবে তাকিয়ে আছে।আশ্চর্য এভাবে তাকিয়ে কী এমন দেখছে?আবারও ডাকল অনুভা,

_“তায়ান ভাই,শুনতে পাচ্ছেন?”

এতক্ষণে যেন স্তম্ভিত ফিরল তায়ানের।এক ঝটকায় অনুর বাহু ছেড়ে বলল,

_“হু? ও হ্যাঁ,কোথায় যাচ্ছিস তুই?”

_“কলেজে!”

_“আচ্ছা যা।” বলেই তায়ান অনুভা কে পাশ কাটিয়ে চলে যায়।

অনুভা একটু অবাক হয়ে তায়ানকে দেখে বাসা থেকে বের হয়ে যায়।মাঝেমধ্যে তায়ানের ভাবভঙ্গি অস্বাভাবিক লাগে তার কাছে।নিজ থেকে কিছু বলবে না আবার কিছু জিজ্ঞেস করলেও ভালোভাবে উত্তর দেবে না।সেদিন রাতে বারোটার দিকে তায়ান হুট করেই অনুভার রুমে গিয়েছিল।অনুভা তখন পড়ছিলো।হঠাৎ তায়ানকে এভাবে রুমে আসতে দেখে একটু অবাক হয়েছিল।

“আপনি এখানে?কোনো দরকার তায়ান ভাই?”

তায়ান কিছুক্ষন চুপ থেকে বলেছিলো “ দেখতে এসেছিলাম ঘুমিয়েছিস কিনা।”

“না ঘুৃমাইনি পড়ছিলাম।”

তায়ান মাথা নাড়িয়ে চলে যায়।অনুভা ডাকতে চেয়েও ডাকে না।কিছুক্ষণ থম মেরে তাকিয়ে থাকে তায়ানের যাওয়ার পানে।

–

তায়ানকে নিয়ে ভাবতেই ভাবতেই কলেজে চলে আসে।নিজের ক্লাসে দিকে যেতেই কেউ হেঁচকা টানে পেছন দিকে নিয়ে আসে অনুভাকে।

_“এইসব কী হচ্ছে শান্ত ভাইয়া?” চোখ গরম করে বলে অনুভা।

_“কী হচ্ছে?কলেজে কেন আসছ না তুমি?” শান্ত বলল।

_“কেন আসছি না সেটা আমার ব্যাপার।”

_“সত্যি করে বলো তোমার বিয়ে সামনের মাসে?”

অনুভা অবাক চোখে শান্তর দিকে তাকায়।নিশ্চয় অলি বলেছে এসব।অনুভাকে চুপ থাকতে দেখে শান্ত অনুভার বাহু চেপে ধরে অস্থির গলায় বলে,

_“মাহভিন প্লিজ চুপ থেকো না।পাগল হয়ে যাব আমি!”

অনুভা নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় শান্তর থেকে।সে জানে এমনটাই করবে শান্ত।তাই চায়নি এসব ব্যাপারে জানুক সে।

_“যা শুনেছেন ঠিক শুনেছেন।আর এটা হবেই। এবার আমাকে যেতে দিন….”

অনুভা কথা শেষ করতে না করতেই শান্ত অনুভার চোয়াল শক্ত করে চে'পে ধরে।দাঁত খিঁচে বলে,

_“চার বছর ধরে কুত্তার মত পরে আছি তোর পিছে।আর তুই…তুই অন্য কাওকে বিয়ে করার গান নিয়ে হাজির হয়েছিস।এইই কী ভাবিস তুই নিজেকে?”

অনুভা দু'হাতে শান্তর হাত সরানোর চেষ্টা করে।সে যতই সরাতে চাচ্ছে শান্ত ততোই হাতের বাঁধন দৃঢ় করছে।ক্লাস শুরু হওয়ায় বাহিরে স্টুডেন্ট নেই বললেই চলে।শান্তর কয়েক জন বন্ধু এসে অনুভাকে শান্তর থেকে ছাড়িয়ে নেয়।

_“শান্ত,ছেড়ে দে মেয়েটাকে।” বন্ধুদের মধ্যে একজন বলে।

অনুভার চোখ টলমল করছে।তার ফর্সা নরম গাল লাল হয়ে উঠেছে।শান্ত সেদিকে নজর দিতেই বুক কেঁপে উঠে তার।সে কষ্ট দিতে চায়নি কিন্তু হঠাৎ কী হয়ে গেল।ব্যাকুল হয়ে অনুভার গালে হাত রাখতে চায়,

_“আ’ম সরি মাহভিন।আমি বুঝতে পারিনি…”

গালে হাত রাখার আগেই অনুভা পিছিয়ে যায়।ডান হাত উচিয়ে বলে,

_“প্লিজ শান্ত ভাই আমার থেকে দুরে থাকুন।আমি আপনাকে বলিনি চার বছর ধরে আমার পিছু পরে থাকতে।কেন পরে আছেন?জানেন কোনো লাভ নেই!”

_“বিকজ আই লাভ ইউ মাহভিন।তুমি শুধু একবার বলো এই বিয়েতে তোমার মত নেই। বাকি সব আমি সামলে নেব।”

অনুভা চেচিয়ে উঠল,

_“আমার মত আছে।আমি রাজি।আমার বাসার সবাই রাজি।আপনি ঝামেলা করবেন না প্লিজ। আমি রিকোয়েস্ট করছি আপনাকে।” বলেই অনুভা ক্লাসের দিকে চলে যায়।শান্ত পেছন থেকে চিৎকার করে বলতে থাকে,

_“ঠিক আছে আমিও দেখব কিভাবে হয় এই বিয়ে।”

অনুভা কোনোরকমে নিজেকে কনট্রল করে ক্লাসে গেল।সবার পেছন সিটে বসে দু'হাতে মুখ ঢেকে ব্যাগের উপর মাথা নুইয়ে রাখল।রুশা কলম মুখে দিয়ে অনুভাকে দেখে নিজের ব্যাগ নিয়ে তার পাশে গিয়ে বসল।

_“আমি কাওকে বসতে না দিয়ে তোর জন্য জায়গা রাখলাম আর তুই পেছনে এসে বসলি।”

অনুভা মাথা তুললো না পড়ে রইলো আগের মত করেই।রুশা এবার সন্দিহান গলায় বলল,

_“অনু! কী হয়েছে?বাসায় আবার ঝামেলা হয়েছে?অনুউউ!”

অনুভা মুখ তুলে তাকাল।তার ভেজা চোখ দেখে রুশা বলল,

_“এই মেয়ে কাঁদছিস কেন?তাকা আমার দিকে।”

_“কী বলব বল?আমার তো ঝামেলার শেষ নেই কোনটা রেখে কোনটা বলব?তুই নিজেও এসব শুনে শুনে বিরক্ত।” অনুভা বলল।

_“আমি বিরক্ত কে বলল তোকে?এই রকমই মনে করিস আমায়?”

অনুভা কিছু বলল না।ব্যাগ থেকে টিস্যু বের করে চোখ মুছল।রুশা আবারও বলল,

_“আচ্ছা একটা একটা করে বল,কী হয়েছে।”

অনুভা তার বিয়ের কথা,শান্তর পাগলামি এছাড়াও যত রকমের দুঃখ ছিলো সব এক এক করে বলল।রুশা কপালে চিন্তার ভাজ ফেলে বলল,

_“এখন কী করবি?বিয়ে কীভাবে আটকাবি?

_“আর সম্ভব না। আটকানো।ভেবেছিলাম পরিক্ষার পর হলে কিছু একটা করে আটকে দেব কিন্তু এখন কীভাবে কী করব?”

_“শান্তকে ভাইয়াকে বল কিছু একটা করতে।”

_“ভুলেও ওকে বলিস না, আমার যে মত নেই বিয়েতে।রাফিদের হাত অনেক লম্বা সাথে বাবারও।দুজন মিলে ওর কোনো ক্ষতি করুক আমি চাই না।আমার ফালতু জীবনের সাথে ওকে জরাতে চাই না আমি।”

_“কিন্তু ও তো তোকে ভালোভাসে।তোর জন্য যেকোনো কিছুই করতে পারবে। বলে দেখ যদি কোনো ভাবে বিয়েটা আটকায়।”

_“আটকালেই বা কী?এরপর ও চাইবে আমি ওকে বিয়ে করি আমার পক্ষে শান্তকেও বিয়ে করা সম্ভব না।” অনুভা বলল।

রুশা চোখ উল্টে বলল,

_“অ্যাটলিস্ট ওই রাফিদের থেকে শান্ত বেটার।”

অনুভা দীর্ঘ শ্বাস ফেলল।রাফিদকে হয়ত চাপে পড়ে বিয়ে করতে হবে,কিন্তু রাফিদ শান্ত কাউকেই মন থেকে মেনে নিয়ে বিয়ে করা সম্ভব না তার কাছে।

__

_“অনেক দিন তো হলো এসেছ।আজকে চলো আমাদের অফিসে,ঘুরে দেখে আসবে।আর আরিজের মত তোমারও তো সব বুঝে নিতে হবে।”

খাবার টেবিলে বসে আরমান সাহেব তায়ানকে উদ্দেশ্য করে বললেন।তায়ান কিছু বলার আগেই আরশাদ আহসানি খেঁকিয়ে উঠলো,

_“ওকে সব বুঝে নিতে হবে মানে? ও কে? এতদিন কই ছিলো?এত বছর কোনো খবর ছিলো না,এখন হুট করে এসে ভাগ বসাবে?”

আসাদুর সাহেবও তাল মেলালেন,

_“হ্যাঁ,ভাইজান…আমরা এতো বছর খেটেখুটে সব গুছিয়ে নিয়েছি এখন…” তার কথা শেষ হওয়ার আগেই তায়ান নিজের প্লেটের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বলল,

_“বাবা আমি মা'কে আগেই বলেছি আমি কোথাও যাবো না,আর না আমার এসব বিষয়ে কোনো ইন্টারেস্ট আছে।আপনার ভাইয়েরা হয়তো জানেনা আর্জেন্টিনাতে প্রতি ম্যাচের জন্য কত টাকা আর্ন হয় আমার।এইসব বিজনেস ফিজনেস এর ধারে কাছেও যেতে পারবে না।”

আরমান সাহেব এক এক করে সবার কথা শুনলেন।হাতে থাকা চামচ শব্দ করে প্লেটে ছুঁড়ে বললেন,

_“সবাই এখন মতামত দিতে শিখে গেছ।এখন আর আমার কথার কোনো দাম নেই।যা ইচ্ছে কর তোমরা।” এতটুকু বলে সে উঠে চলে গেল।আমীরা বেগম ডাকলেন পেছন থেকে তবু সে আর দাঁড়ালো না বের হয়ে গেল সদর দরজা পেরিয়ে।

আরিজও রেগে গেল।খাবার ছেড়ে দাড়িয়ে দু-চাচার উদ্দেশ্যে বলল,

_“আপনাদের তুলনা হয়না চাচ্চু! বাড়িতে অশান্তি করার জন্য পি.এইচ.ডি করে এসেছেন।”

_“আরিজ!বড়দের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় শেখনি?” ধমকে উঠলেন আরশাদ সাহেব।

_“যা শেখার আপনাদের থেকেই শিখছি।দয়াকরে এ বাড়ির বাচ্চাদেরকেও আপনাদের মত হতে বাধ্য করবেন না।”

আরিজও চলে গেল অফিসে।এখানে শুধু তায়ান,রিকো আছে।তাদেরও খাওয়া শেষ।তায়ান রিকো কে বলল,

_“চলো রিকো এখানে থেকে কিছু মানুষের বিরক্তির কারন হতে চাই না।” আমীরা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

_“মা এরপর থেকে আমাদের রুমে খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা করবে।”

তায়ান আর রিকোও নিজেদের রুমে চলে গেল।আরশাদ কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বিরবির করল,

_“বেয়াদব ছেলে আমিও খুজে বের করব তুমি কোন উদ্দেশ্যে এ বাড়িতে এসেছ।”

আসাদুর আহসানি বোধহয় শুনতে পেলেন আরশাদ সাহেবের কথা,

_“কীসের উদ্দেশ্য ভাইজান?” ফিসফিসিয়ে বললেন।

_“সেটাই তো বুঝতে পারছি না!” ভাবুক হয়ে বললেন,

_“তবে খুব শিগরই জানতে হবে।”

রুমে এসে ফেডেরিকো গা দুলিয়ে হাসতে লাগল।তায়ান নিজের ড্রয়ার থেকে একটা ললিপপ বের করে মুখে নিলো।ফেডেরিকো কে এভাবে হাসতে দেখে বিরক্তি স্বরে বলল,

_“এভাবে পাগলের মতো হাসছো কেন?

তায়ানের দেখাদেখি রিকোও একটা ললিপপ নিলো।হাসি থামিয়ে বলল,

_“তুমি যেমনটা বলেছিলে তোমার ফ্যামিলি তার চেয়েও বাজে।”

তায়ান ঠোঁট বাকিয়ে হাসল।এসব নিয়ে তার কোনো চিন্তা ভাবনা নেই।সে গম্ভীর স্বরে বলল,

_“হাসাহাসি বাদ দাও।আমাকে দু'চার দিনের জন্য আর্জেন্টিনায় ফিরতে হবে।তুমি এদিকটায় নজর রাখবে।”

ফেডেরিকোর হাসি মিলিয়ে গেল।ভ্রু কুঁচকে বলল,

_“বাট হোয়াই? আই মিন…এখনি কেন যাচ্ছ?”

_“প্রয়োজন ছাড়া আমি কিছু করি না ইউ্য নো।সো আমি যা বলেছি তাই করো।এন্ড…”

রিকো প্রশ্নাত্বক দৃষ্টি দিয়ে বলল,

_“এন্ড?”

কিছু বলল তায়ান।ফেডেরিকো বুঝার মতো করে মাথা ঝাঁকাল।

___

একটু ঘুমিয়ে ছিলো তায়ান।ঘুম থেকে ওঠে দুপুরের পর।শাওয়ার নেওয়ার জন্য ওয়াশ রুমে যায়।আয়নার সামনে দাড়িয়ে নিজেকে কিছুক্ষণ দেখে।দৃষ্টি গভীর।ডান ভ্রুর একদম শেষের দিকে একটা আঘাতের চিহ্ন।যদিও কেউ ভালো ভাবে নজর না দিলে কেউ বুঝতে পারবে না। বিভিন্ন রকমের অতীতের সব সৃতি ভেসে ওঠে।সে ভাবতে চাইল না আর।পনের মিনিট লাগিয়ে শাওয়ার নিলো।ওয়াশ রুমের দরজা খুলতেই সাথে সাথে লাগিয়ে দেয়।পরপর দরজা হালকা ফাঁক করে দেখে।ছোট ছোট কদমে এগিয়ে আসছে কেউ।বেডের পাশে থাকা ড্রয়ারের দিকে যাচ্ছে।তায়ান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকল।এই মানুষের এখানে কী কাজ সেটাই বোঝার চেষ্টা করছে।ড্রয়ার খুলে কিছু হাতে নিতেই তায়ান বেরিয়ে আসে।

_“কী করছ তুমি?”

কারেন্টে শক খাওয়ার মতো কেঁপে ওঠে নীলা।হাতে গুঁজে রাখা জিনিস গুলো লুকিয়ে ফেলার বৃথা চেষ্টা করে।তায়ানের দিকে বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে রইল।চোখেমুখে আতংক স্পষ্ট।তার ছোট্ট হৃদপিণ্ড ধক ধক করে কাঁপতে থাকে।তায়ান ভ্রু উঁচিয়ে জানতে চায় আবারও।নীলা জোর পূর্বক হেঁসে বলে,

_“ক-কিছু না ভাইয়া।তোমাকে ডাকতে এসেছিলাম।আমি যাই।” যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় সে।

তায়ান গম্ভীর গলায় ডাকে,

_“দাড়াও।”

আরেক দফা চমকে ওঠে নীলা।পেছন ঘুরে তায়ানের দিকে চোরা চাহনি দিতেই তায়ান প্রশ্ন করে।

বিজ্ঞাপন

_“হাতে কী দেখি?”

বের করে না নীলা।আমতাআমতা করে বলে,

_“কী আবার… কিছুনা তো ভাইয়া..”

_“আমি দেখেছি তুমি বের করো,ফাস্ট!”

নীলা এবার ধীরে ধীরে পেছনে থাকা হাত বের করল। দু'হাত ভরতি ললিপপ।তায়ান এবার নীলার দিকে তাকিয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করে এগুলো কেন করেছে।মুখে কিছু বলার আগেই নীলা ঠোঁট ভেঙে কেঁদে উঠে।

_“আপনি আসার পর থেকেই এগুলো একা একাই খান।আমাকে একটাও দেননি।রাহার ভাইয়া বিদেশ থেকে আসার সময় কত্তো চকলেট নিয়ে আসে।আপনি তো কিছুই আনেন নি।তাই চুরি করতে এসেছিলাম।এগুলা আমাকে দিয়ে দিন না ভাইয়া।”

তায়ান কপাল কুঁচকে নীলার সব কথা শুনলো।ঠোঁট উল্টে বলল,

_“রাহা কে?”

_“আমার স্কুলের বান্ধবী।” নাক টেনে বলল।

_“এগুলো ফেরত দাও,আমি তোমাকে অন্য চকলেট দিচ্ছি।”

নীলা আবারও দু'হাত পেছনে লুকিয়ে বলল,

_“এগুলো এখন আমার।দেব না।”

_“বললাম তো অন্য চকলেট দিচ্ছি,ফেরত দাও এগুলো।” তায়ান নিজের লাগেজ থেকে কয়েক রকমের চকলেট বের করে নীলার দিকে দিলো।

_“এগুলা নাও।ললিপপ গুলো দাও এখন।”

_“কেন?এগুলো নিলে কী এমন হবে,আমার এগুলাও খেতে ইচ্ছা করছে।”

_“একবার বললে শুনো না?দিতে বলেছি আমি!” ধমকে উঠল তায়ান।নীলা এবার একটু জোরে কেঁদে উঠলো।

অনুভা একটু আগেই কলেজ থেকে এসেছে।তায়ানের ঘরে নীলার কান্না শুনতেই দৌড়ে আসে।

_“এ-কী ও কাঁদছে কেন?আপনি বকেছেন ওকে?”

তায়ান ঠোঁট কামড়ে নীলাকে ইশারা করে বলে,

_“ওকে বলো ললিপপ গুলো ফেরত দিতে।”

_“মানে?” অনুভা বুঝল না।

নীলা কাঁদতে কাঁদতে নিজের হাতে থাকা ললিপপ দেখিয়ে বলল,

_“দেখোনা আপু এই কয়েকটা মাত্র ললিপপ নিয়েছি।তা-ও দিচ্ছে না।”

অনুভা অবাক কন্ঠে বলে,

_“তুই চুরি করে নিয়েছিস এগুলো?”

_“কী করব ভাইয়া তো একা একাই খায়।”

তায়ান আবারও গম্ভীর স্বরে বলল,

_“ললিপপ গুলো ফেরত দিতে বলেছি।” হাতে থাকা অন্য চকলেট এগিয়ে দিয়ে বলে,

_“এগুলো খাও।”

নীলা অনুভার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকায়।তায়ানও অনুভাকে চোখে ইশারা করে বোঝায় ললিপপ ফেরত নেওয়ার জন্য।অনুভা নীলার হাত থেকে ললিপপ গুলো নিতে নিতে বলে,

_“দিয়ে দে এগুলো।আমি তোর জন্য এর থেকেও বেশি ললিপপ এনে দেব।”

নীলা আর কিছু বলে না।ললিপপ গুলো ড্রয়ারে রেখে,মুখটা মলিন বানিয়ে রুম থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়ায়।তায়ান ডাকে তাকে,

_“এগুলো নিয়ে যাও।” হাতে থাকা চকলেট ইশারা করে বলে।নীলা এগিয়ে এসে চকলেট গুলো নিয়ে এক দৌড়ে চলে যায়।

নীলা চলে যেতেই অনুভা বলল,

_“সামান্য ললিপপই তো,মেয়েটাকে দিলেই পারতেন।”

_“আমি আমার জিনিস কাউকে দিই না।” তায়ান বলল।

_“তাহলে চকলেট গুলো দিলেন কেন?”

_“চকলেট গুলো তোদের জন্যই এনেছিলাম দিতে ভুলে গেছি।খেয়াল ছিলো না একদমই।”

অনুভা তপ্ত শ্বাস ফেলে চলে যেতে নেয়।সঙ্গে সঙ্গে তায়ান হাত চে'পে ধরে নিজের কাছে নিয়ে আসে।অনুভা একটু ভড়কে যায়।তায়ানের চোখের ভাষা বুঝার চেষ্টা করে।কিন্তু তার দৃষ্টি তো অনুভূতিহীন।কিছুই বোঝার নেই এতে।

_“কী হয়েছে,আটকালেন কেন?”

তায়ান হাত ছেড়ে দিলো।লাগেজ থেকে চকলেটের কিছু বক্স অনুভার হাতে দিয়ে বলল,

_“সবাইকে দিয়ে দিস,এগুলো আমার আগেই দেওয়া উচিত ছিলো।”

এটা তো মুখে বলেই দিতে পারত।এভাবে হাত টেনে ধরার কী আছে?মনে মনে ভাবল অনুভা।

চকলেটের বক্স গুলো নিয়ে দ্রুতপায়ে রুম ছেড়ে বের হলো।যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল সে।

__

রাতের বেলা শহরের খুব দামি একটা রেস্টুরেন্টে বসে আছে অনুভা।রেস্টুরেন্টের প্রতি কোনে আভিজাত্যের ছোঁয়া।খুব বড়লোক না হলে এমন রেস্টুরেন্টে কেউ আসে না।অনুভার সামনে থাকা লোকটা একের পর এক কোক মেশানো ওয়াইন খাচ্ছে আর গ্লাস খালি করছে।অনুভার সামনেও বিভিন্ন রকমের খাবার কিন্তু খাওয়ার রুচি নেই তার।আরও একটি গ্লাস শেষ করে রাফিদ বলল,

_“খাচ্ছ না কেন,সুইটহার্ট?খাইয়ে দিতে হবে?” ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল।

_“খাচ্ছি আমি।” বলে কাঁপা হাতে একটা চিকেন বল তুলে নিলো।

সন্ধায় হঠাৎ রাফিদ তাদের বাসায় যায়।সরাসরি অনুভার রুমে ঢুকে বলে,

_“কল দিলে তো ধরো না।তাই চলে এলাম, তৈরি হও তোমাকে নিয়ে বের হবো।”

_“কোথায়?”

_“গেলেই দেখতে পারবে।কথা না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি তৈরি হও।আমি নিচে অপেক্ষা করছি।”

_“আমি কোথাও যাবো না।পড়তে বসতে হবে,আপনি একাই যান।”

_“তুমি আমার ফিয়েন্সে। আর কিছুদিন বাদেই আমাদের বিয়ে হবে,তোমাকে রেখে আমি একা ঘুরবো?এমনিতেই কাজের জন্য সময় পাই না,আজকে পেয়েছি চলো।”

_“আমি…”

অনুভাকে থামিয়ে দেয় রাফিদ,

_“হুশশ…তৈরি হয়ে নিচে আসো।আমি তোমার বাবার অনুমতি নিয়েই এসেছি।নাহলে যেভাবে আছ সেভাবেই নিয়ে যাবো।”

এতটুকু বলেই নিচে চলে যায় রাফিদ।রাফিদ বের হয়ে যেতেই অনুভা শব্দ করে দরজা লাগিয়ে দেয়।শুধু মাত্র জামা টা পাল্টে নিচে চলে যায়। নিচে রাফিদের সাথে নাফিসা বেগম ছিলেন।অনুভাকে এভাবে দেখে নাক সিটকে বললেন,

_“একটু সেজেগুজে থাকলেও তো পারো।মুখটা সবসময় পেঁচা মতো করে রাখতে হবে তোমার।”

রাফিদ একটু বিরক্ত হয়ে বলল,

_“খালামনি বাদ দাও তো।না সাজলেও ও সুন্দর।” অনুভার দিকে তাকিয়ে বলল,

_“চলো বের হই।”

এর মধ্যেই অলি দৌড়ে এসে বলল,

_“কোথায় যাচ্ছ তোমরা? আমিও যাবো।”

অনুভা যেন এমন কিছুই চাইছিলো,

_“হ্যাঁ,হ্যাঁ চল। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে আয়,আমরা অপেক্ষা করছি।”

রাফিদ বাঁধ সাধলো।

_“আজকে আমরা দুজনেই যাই।তোমাদের নিয়ে পরে ঘুরব।”

নাফিসা বেগম অলির কাছাকাছি গিয়ে বিরবির করে বলল,

_“ওরা দুজন একটু আলাদা সময় কাটাবে,তুই এখানে গিয়ে কী করবি?ওরা যাক তুই পরে যাস।”

অলি চোখ উল্টালো।তার কী এই রাফাইদ্দার সাথে যাওয়ার ইচ্ছা আছে নাকি?অনুভার একা যাতে অস্বস্তি না লাগে লোকটার সাথে, তাই যেতে চেয়েছিলো।

–

তখন চিকেন বল তুলে আর মুখে নেয়নি অনুভা।হাতে নিয়ে বসে আছে চুপচাপ।রাফিদ এবার অনুভার হাত ধরে দাড় করাল।বলল,

_“চলো খেতে হবে না কিছু। বাহিরে গিয়ে একটু হাঁটি।”

অনুভা আলগোছে হাত ছাড়িয়ে নেয়।মিনমিনিয়ে বলে,

_“অনেক রাত হয়েছে বাসায় যাবো আমি।”

_“হোক রাত তাতে কী?আমি তোমার সাথে আছি বাসায় যাওয়ার জন্য এতো তাড়া কেন?”

_“না মানে…”

রাফিদ অনুভার হাত ধরে বাহিরে চলে আসে।হাঁটতে হাঁটতে একটি নির্জন জায়গায় চলে এসেছে তারা।রাফিদ কোকের সাথে এতো গুলো গ্লাস ওয়াইন খাওয়ায় হালকা নেশা চড়ে গেছে তার।অনুভা তার থেকে একটু সামনে এগিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।হঠাৎ খেয়াল করল অনেকটা দুরে চলে এসেছে তারা।পেছন ঘুরে অনুভা বলল,

_“আর সামনে যাবো না,চলুন ফিরে যাই।”

রাফিদের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল অনুভা।তার চোখেমুখে অন্য রকম ছাপ।রাফিদ অনুভার পা থেকে মাথা পর্যন্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে।অস্বস্তি লাগছে অনুভার।কেমন লালসাপূর্ন দৃষ্টি সামনে থাকা লোকটার।ভয়ে শুকনো ঢোক গিলল।

_“শুনতে পাচ্ছেন?আমি বাসায় যেতে চাই।”

রাফিদ এগিয়ে অনুভার একদম কাছে গেল।অস্থির দৃষ্টিতে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল।অনুভার গালে হাত রাখতেই ঘৃণায় শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে।দু’পা পিছিয়ে যায় সে।পিছিয়ে যেতেই রাফিদ শক্ত করে হাত চে'পে ধরে বলে,

_“কী হয়েছে?লজ্জা পাচ্ছ কেন?কিছুদিন পর তো আমাদের বিয়ে হবেই…”বলতে বলতেই অনুভাকে কাছে টেনে চুমু খেতে চায়।অনুভা এক ঝটকায় রাফিদের বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে, রাফিদকে দু'হাতে ধা’ক্কা মে'রে ফেলে দেয়।

রাফিদ গর্জে ওঠে বলে,

_“তোমার সাহস হয় কী করে আমাকে ফেলে দেওয়ার!” রাফিদ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে অনুভা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে।তবে খুব কম সময়ের মধ্যেই ধরে ফেলে তাকে রাফিদ।অনুভাকে চে'পে ধরে তার গলায় মুখ ডোবাতে চায়।অনুভা কাঁদতে কাঁদতে বলে,

_“ছাড়ুন আমাকে অসভ্য লোক।ছাড়ুন বলছি।”

_“কেন?দু'দিন বাদে তুমি আমার বউ হবে,এত সংকোচ কীসের তোমার?”

দস্তাদোস্তির ফলে অনুভার ওড়না এলোমেলো হয়ে যায়।অনুভা রাফিদকে ছাড়ানোর আপ্রান চেষ্টা করে,

_“আমি তোর মতো অসভ্য লোককে কখনোই বিয়ে করব না…ছাড় বলছি।”

_“সে জন্যই আজকে তোমার সাথে এমন কিছু করব,যাতে আমাকে বিয়ে করা ছাড়া তোমার আর কোনো পথ না থাকে।”পৈশাচিক হাসে রাফিদ।

অনুভার ওড়না চে'পে ধরে রাফিদ,তবে সেটা খুলে ফেলার আগেই দু'হাতে নিজের মাথা চে'পে ধরে রাস্তায় লুটিয়ে পরে।অনুভা বিস্মিত চোখে রাফিদের পরে যাওয়া দেখে সঙ্গে সঙ্গে সামনে তাকায়।সামনে থাকা দুজনকে দেখতেই তার পিলে চমকে যায়।দুজনের মুখেই ‘গাই ফক্স মাস্ক’।একজন রাফিদকে এলোপাতাড়ি ঘু'সাতে থাকে।আরেক জনের হাতে রড যেটা দিয়ে রাফিদের মাথায় আ*ঘাত করা হয়েছে।এদের দেখে অনুভার ভয়ের মাত্রা আরও বেড়ে যায়।তাদের থেকে বাঁচার জন্য আবারও দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে।রড হাতে থাকা লোকটা ধরে ফেলে তাকে।

_“কারা আপনারা ছাড়ুন আমায়।”

অনুভাকে এক হাতে চে'পে ধরে অন্য হাতে নিজের ফক্স মাস্ক খুলে ফেলে লোকটা।লোকটার মুখ দেখতেই বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে ফেলে অনুভা।

বিজ্ঞাপন
রক্ত রেখার আড়ালে গল্পটি আয়েশা শেখ রিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে মোড়ানো থ্রিলার উপন্যাস