রক্ত রেখার আড়ালে

পর্ব - ২

🟢

__“ওহ।”

শুকনো কন্ঠে বলল অনুভা। যেন আকর্ষনীয় কিছুই শুনেনি। অবাক হলো আরিজ।

হাতে থাকা বিড়াল লাফিয়ে আবারও সেই তায়ানের হাঁটুর উপর উঠে গা এলিয়ে দিলো।তায়ান এবার সরাল না,সে স্থির দৃষ্টিতে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে।কখন থেকে তাকিয়ে আছে,সে নিজেও জানে না।তার দৃষ্টিতে ঠিক কী আছে,কেউ বুঝতে পারে না। অনুভা বিড়ালটাকে তায়ানের কাছ থেকে নিতে নিতে বলল,

__“সরি আমি ভেবেছি অন্য কেউ।” তার স্বর জোরালো।কে জানে তায়ান এসব শুনলো কিনা, সে তো একই ভাবে তাকিয়ে আছে। অনুভা গিয়ে অলির পাশে বসল।

“ওকে চিনতে পেরেছিস,তায়ান?” আমীরা বেগম কফি বানিয়ে নিয়ে আসতে আসতে বলল।

তায়ান এবার নড়েচড়ে বসে।মায়ের কাছে জানতে চায়,

__“কী বললে?শুনিনি।”

__“বললাম ওকে চিনতে পেরেছিস?” অনুভাকে ইশারা করেন তিনি।

তায়ান আবারও অনুভার দিকে তাকাল।মেয়েটার চোখমুখে ঘুমের ক্লান্তি।সামান্য ফুলে থাকা মুখ, আধো তন্দ্রার ছাপ।

__“অনুভা!” মায়ের প্রশ্নের উত্তর দিলো।তার স্বর শান্ত।

আমীরা বেগম সন্তুষ্টির হাসি দিলেন।অনুভা বিড়ালের গায়ে হাত বোলাচ্ছিল তায়ানের মুখে নিজের নাম শুনেই চট করে তার দিকে তাকাল।দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই নজর সরিয়ে নেয় অনুভা।

__“তুমিও না আমীরা!কী সব জিজ্ঞেস করছ,তায়ান ছোট বেলায় অনু কে কত আদর করতো ভুলে গেলে? আর এখন বলছো চিনতে পারছে কিনা।” আরমান আহসানি আপত্তি জানালেন স্ত্রী কে।

__“হ্যাঁ বাবা ঠিকই বলেছে।আমি সবাইকেই চিনতে পেরেছি।আমি তোমাদের থেকে দুরে ছিলাম কিন্তু তোমাদের ভুলে যাইনি।” তায়ান বলল।

অলি তায়ানের দিকে গভীর দৃষ্টি দিয়ে বলে,

__“তাহলে বাহিরে যখন আমি আপনাদের চিনতে পারলাম না তখন কেন বললেন না আমি তোমাদের ভাই?বললেই তো আমি ওমন করতাম না।”

__“তোমাকে চিনতে পারিনি।” সোজাসাপটা উত্তর তায়ানের।আরিজ ফিক করে হেসে দিলো।অলিকে লজ্জায় পড়তে দেখে বলল,

__“তুই তখন অনেক ছোট ছিলি তাই হয়তো চেহারা ভুলে গিয়েছে।”

অলি নাক কুঁচকে বলল,

__“অনু আপু কে তো ঠিকই মনে আছে।”

আরমান সাহেব একটু বিরক্ত হলেন,

__“আহ থাম তোরা।” অনুভার দিকে তাকিয়ে বললেন,

__“অনু! মা যাও তো, আমাদের রুম থেকে ফোনটা নিয়ে আসো।একটু বের হবো।”

অনুভা মাথা নাড়িয়ে উঠে গেল।আমীরা বেগম কপাল কুঁচকে বললেন,

__“রাত করে আবার কোথায় যাবেন?”

__“যাই দেখি একটু বাজারে।তায়ানের তো চিতল মাছ পছন্দ ছিলো,নিয়ে আসি গিয়ে কাল সকাল সকাল রান্না করবে।”

__“রাত আটটা বাজতে চলল,এখন আপনি মাছ পাবেন?”

__“তবুও ঘুরে আসি একবার পেলেও পেতে পারি।”

আরিজ যেতে চাইলো,

__“তুমি থাকো বাবা আমি নিয়ে আসি।”

আরমান আহসানি আপত্তি করল,

__“না,দরকার নেই।আমি গিয়ে দেখে শুনে নিয়ে আসবো। আমার ছেলেকে তো আর যেমন সেমন মাছ খাওয়াতে পারি না।”

__“আমি এখন এসব খাইনা বাবা।কোথাও যেতে হবে না।” তায়ানের কথায় আরমান আহসানি অসন্তুষ্ট হলেন বোধহয়।

__“ এতদিন দুরে ছিলে।সেখানে কী খেয়েছো না খেয়েছো কে জানে।এবার আমরা যা বলব তাই শুনবে।”

__“আচ্ছা ঠিক আছে তবে কাল যেও।”

এতক্ষণে অনুভা ফোন এনে আরমান সাহেবের হাতে দিলো। সে ফোন নিয়ে উঠে যেতে যেতে বললেন,

__“কালও যাবো আর সাথে তুমিও যাবে।” এই বলে তিনি বের হয়ে গেলেন।

আমীরা বেগম বারবার নিজের স্বামীর উপর মুগ্ধ হন। এই মানুষটার ঋন সে কখনো শোধ করতে পারবে বলে মনে হয় না। জীবনের যখন এক ভয়াবহ অন্ধকার মোড়ে দাঁড়িয়ে, ঠিক তখন সৃষ্টিকর্তা যেন আশীর্বাদস্বরূপ তার জীবনে পাঠিয়েছিলেন আরমান সাহেবকে। এতগুলো বছর পেরিয়ে গেছে,তবু মানুষটা বিন্দুমাত্র বদলায়নি।সে নিজে তায়ানকে যতটা ভালোবাসে তার চেয়েও বেশি ভালোবাসে তার স্বামী।তায়ান হারিয়ে যাওয়ার পর দিশাহারা পাগলের মতো ঘর-দুয়ার ছেড়ে পথে পথে ছেলেকে খুঁজেছেন তিনি। নিজের ভাইদের থেকে পাওয়া কটূক্তি, অপমান,কিছুই তাঁকে দমাতে পারেনি।তায়ানের জন্য তার মমতা ছিল এক গভীর সাগর,যার ঢেউ কখনো ক্লান্ত হয়নি,কখনো শুকায়নি।ছেলেকে হারানোর পর লোকটা কতটুকু ভেঙে পড়েছিল তা একমাত্র আমীরা বেগমই জানে।

__“বড় ম্যাডাম তায়ান বাবার ঘর পরিস্কার হয়ে গেছে।” বাড়ির কাজের লোকের কথায় ধ্যান ভাঙলো আমীরা বেগমের। সে ছেলেকে বললেন,

__“যা বাবা এবার একটু রেস্ট নে।”

তায়ান মাথা নাড়িয়ে উঠে পা বাড়াতেই,হঠাৎ রুক্ষ কাটা-মাখা এক নারী কন্ঠ ভেষে আসে।তার পদযুগল থেমে যায়।পেছন ফিরে তাকায়।

__“সারাদিন বাড়ি ভরে বেড়ানো ছাড়া তো তোমার আর কোনো কাজ নেই।তাহলে আমার বোনের ছেলে যে তোমাকে এ-তো বার কল করছে কল ধরছো না কেন?”নাফিসা বেগমের কথায় উপস্থিত সবাই বিরক্ত হলো।

অনু ধীর গলায় বলল,

__“আমার তার সাথে কথা বলতে ভালোলাগে না,মা।”

নাফিসা বেগম আরও রেগে গেলেন।কর্কশ গলায় বললেন,

__“তোমার ভালো না লাগায় আমার কিছু আসে যায়না অনু।দু'দিন পর তোমার ওর সাথে বিয়ে হবে।তুমি ওর বাগদত্তা,ভুলে যেও না।”

অনুভা মেঝের দিকে চোখ নামিয়ে নিজের কান্না আটকে রাখার চেষ্টা করল।তার নিজের মা বেঁচে থাকলে হয়তো আজ এমন দিন দেখতে হতো না।আর না এভাবে একটা ছেলের সাথে জোর করে বিয়ে দিতে চাইতো।

কোনো ভাবে গলায় আটকে থাকা কান্না গিলে মৃদু স্বরে বলল,

__“আমি কিছুই ভুলিনি মা।সব কিছু মেনে নিতে আমার সময় লাগবে।”

নাফিসা বেগম এবার তেড়ে গেল অনুভার দিকে।শক্ত হাতে গাল চেপে ধরে বললেন,

__“এতো পাওয়ার তোমার কই থেকে আসে?মেনে নিতে সময় লাগবে মানে?এমন ভাব করছো যেন তোমাকে পানিতে ফেলে দিচ্ছি।”

আরিজ তড়িৎ বেগে এসে অনুভাকে ছাড়িয়ে নেয়।

__“আপনার সাহস কি করে হয় আমাদের সামনে অনুভার সাথে এমন আচরণ করার।আপনাকে যত দেখছি ততই অবাক হচ্ছি,চাচি!”

__“তোমরা এর মধ্যে কথা বলতে আসবে না একদম।”

__“অনুভা আমাদের বোন,ওর সাথে আপনি যা-তা ব্যবহার করবেন আর আমরা চুপ থাকব?”

আমীরা বেগমও তিরস্কার করলেন,

__“আজ নিজের মেয়ে হলে এমন করতিস তুই?”

__“কেন করতাম না?আমার বোনের ছেলে খারাপ কোথায়?”

অনুভার ছোট ভাই অনুভব এসে বলল,

__“রাফিদ ভাইয়ের মধ্যে সব রকমের খারাপ অভ্যাস আছে,আম্মু।আর তুমি বলছো খারাপ কোথায়,হাউ ফানি!”

নাফিসা বেগম ধমকে ছেলেকে থামিয়ে দেন,

__“এই তুই একদম বড়দের মাঝখানে কথা বলবি না।”

__“অবস্যই বলবো।আমার বোন আরও ভালো ছেলে ডিজার্ব করে।” অনুভব জোর গলায় বলল।

__“এই সিদ্ধান্ত শুধু আমার না তোর বাবারও।আর আমরা ওর খারাপের জন্য কিছু করছি না।এতে কারও আপত্তি থাকলে আমাদের কিছু যায় আসে না।”

আমীরা বেগম বললেন,

__“তোদের মেয়ে তোরাই সব করবি।তাই বলে এমন একটা ছেলের সাথে জোর করে বিয়ে দিবি?”

__“রাফিদের ওকে অনেক পছন্দ।ওকে ছাড়া অন্য কাওকে বিয়ে করবে না।আর এখন সব ঠিক হয়ে গেছে ওর পরিক্ষা শেষ হলেই বিয়ের আয়োজন শুরু হবে।এখন এগুলো বলে কোনো লাভ হবে?”

অনুভার দিকে তাকিয়ে বলল,

__“এরপর যেন কল না ধরার অভিযোগ না পাই আমি।নাহলে জানোই তোমার কী হাল করব আমি।”

অনুভা কিছু বলল না।হাতের পিঠ দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে দ্রুত পায়ে চলে এলো সেখান থেকে।সিঁড়ির পাশে দাড়িয়ে থাকা তায়ানের দিকে ভেজা চোখে একটু তাকাল।সঙ্গে সঙ্গে আবারও প্রস্থান করল।

তায়ান এতক্ষণ পুরো দৃশ্যটাই থম মেরে দেখছিল।সে নিজেও সিঁড়ি ডিঙিয়ে নিজের রুমে চলে গেল।

অনুভা দৌড়ে গিয়ে নিজের বিছানার উপর ছিটকে পড়ে।অঝোরে কাঁদতে থাকে।আজকাল মায়ের কথা মনে পড়ে খুব।সেই মা যাকে সে কখনো দেখেনি,যিনি তার জন্মের সময়ই মা-রা যান।অনুভা জানতো নাফিসা বেগমই তার নিজের মা।তবে ধীরে ধীরে উপলব্ধি করে মায়ের মমতা কখনো এমন হয় না।তার বাবাটাও কেমন দিন দিন বদলে যাচ্ছে।অনুভবকে তারা যতটুকু ভালোবাসে তার এক আনাও যদি তাকে ভালোবাসতো তাহলে এ জীবনে তার কিছু চাওয়ার থাকতো না।এ বাড়িতে সবাই অনুভাকে ভালোবাসে।আরমান সাহেব,আমীরা বেগম সর্বাধিক যত্ন ও মমতা দিয়ে তাকে ঘিরে রেখেছেন।তারা কখনোই মায়ের অভাব বুঝতে দেননি তবু অনুভার মন যেন মায়ের শুন্যতাকে মুছে দিতে পারে না।মায়ের মমতা,মায়ের শরীরের ঘ্রান,মায়ের স্পর্শ কেমন হয় সে তো তাও জানে না।

সে ড্রয়ার থেকে একটা ছবি বের করল।ছবিটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল।চোখের জলের কারনে সব কিছু ঘোলাটে হয়ে আসছে।ছবিতে তার মা,স্নিগ্ধ এক হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছেন।অনুভা ছবিটা আঁকড়ে ধরল।তার কম্পিত কন্ঠ থেকে গানের কিছু সুর ভেসে আসল,

❝সব শুধু বলে যেতে চায়

শোনে না কেউ,শোনে না কেউ..।

সব শুধু নিয়ে যেতে চায়

দেবে না কেউ,দেবে না কেউ..।

এ শহরে মন খুলে গান গাওয়া পাখি নেই,নেই পিছুটান।

মায়া দয়া নেই,আছে ব্যবধান..তোমার-আমা..র

এ শহরে নেই,মায়ের মতো চাঁদ।

জোনাকি পোকা,তাসনিম রাত

যোগাযোগ নেই,আছে অযুহাত।

——

গভীর রাত। নিস্তব্ধ চারপাশে শুধু দূরের পেঁচার ডাক ভেসে আসছে। পুরো বাড়ি ঘুমে ডুবে আছে।আরমান সাহেব আর আমীরা বেগমের অন্ধকার রুমের ভেতর, এক পুরুষলী অবয়ব দেখা যাচ্ছে। হাতে কিছু আছে, তবে ঠিক কী তা বোঝা যাচ্ছে না।অবয়বটি আরমান সাহেবের দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল।অবয়বটির চোখের কোনে অগ্নি শিখার মতো উত্তপ্ত আক্রোশ যা রুমের ক্ষীণ আলোতেও স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।ক্রোদে কাঁপতে থাকা হাত ধীরে ধীরে আরমান সাহেবের গলার কাছে নিতে থাকে।আরমান সাহেব একটু নড়েচড়ে উঠে।মুহুর্তেই অবয়বটি বের হয়ে প্রস্থান করে।আরমান সাবেক মৃদু কন্ঠে চিৎকার করে উঠে বসে।এসির মধ্যেও তার শরীর প্রায় ঘেমে একাকার।পাশে থাকা আমীরা বেগমও ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলেন।আরমান আহসানি বুকে হাত রেখে জোরে শ্বাস নিচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

__“কী হয়েছে আপনার?এমন করছেন কেন?” আমীরা বেগমের কপালে চিন্তার ভাজ।

__“তেমন কিছু না।ভয় পেও না তুমি।একটু পানি দাও গলাটা শুকিয়ে গেছে।”

আমীরা বেগম পাশের টেবিলে থাকা পানির বোতল এগিয়ে দিলেন।এক চুমুকে বোতলের পানি শেষ করলেন তিনি।

__“কী হয়েছে বলছেন না কেন?খারাপ কোনো স্বপ্ন দেখেছেন?” আবারও প্রশ্ন করলেন আমীরা বেগম।

__“আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না আমাদের তায়ান ফিরে এসেছে।”

__“আপনি তায়ানকে এতো ভালোবাসেন কেন?”

__“ভালোবাসতে আর পারলাম কই?মাঝে মাঝে মনে হয় আমি এক ব্যর্থ বাবা।কিছুই করতে পারলাম না ওর জন্য।”

__“আপনি এই কথা বলছেন?অথচ আপনি যা করেছেন তার কোনো কিছুই করার কথা ছিলো না।”

আরমান সাহেব আর কিছু বললেন না।আগের মতো করে শুয়ে পড়লেন।কপালের উপর ডান হাতের কুনই ভাজ করে,চোখ বন্ধ করে স্ত্রীকে বললেন ঘুমিয়ে পড়তে।

___

মাঝ রাতে ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে অনুভা।আকাশে আধা লুকিয়ে থাকা স্লান চাঁদের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে সে।নিঃশ্বব্দ বাতাসেরা তার চুল গুলো এদিক ওদিক সরিয়ে দেয়, যেন তার ভেতরে থাকা অস্থিরতা শান্ত করতে চায়।

অদ্ভুত এক শিরশিরানি নেমে আসে অনুভার ঘাড় বেয়ে।কিন্তু সে পেছন ফিরতে সাহস পায় না।মনে হয়, ঠিক তার কয়েক কদম দূরে নির্বাক দাঁড়িয়ে আছে কোনো একটি অবয়ব।সে অন্ধকারে ভয় পায় না এমন না।কিন্তু হৃদয়ের ব্যথা বেড়ে গেলে ভয়ও দুরে পালিয়ে যায়।তবে এখন গা ছমছম করে উঠছে।মাঝরাতে ছাদে নাকি খারাপ জ্বিন থাকে।তেমন কিছু নেই তো পেছনে.....নাহ আর ভাবতে পারে না।ছমছম করে উঠে সর্বাঙ্গ।চোখ খিচে পেছন ঘুরবে,সে মুহুর্তেই স্বল্প পরিচিত এক গম্ভীর কন্ঠ ভেসে আসে।

__“বড় হয়ে গেছিস অনেক।”

অনুভা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে।সে আর পেছন ফিরে না।আগের মতো করে দাঁড়িয়ে থেকে বলে,

__“কেন?কী ভেবেছিলেন এখনো ছোট থাকবো,আর আপনি আমাকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে আমার নাক-মুখ চেপে ধরে শ্বাস আটকে মে'রে ফেলার চেষ্টা করবেন?”

তায়ান একটু থতমত খেল।অনুভার পাশে গিয়ে সেও চাঁদের দিকে তাকিয়ে বলল,

__“তোর মনে আছে ওগুলো?”

__“কেন করতেন ওমন?”তায়ানের প্রশ্ন উপেক্ষা করে সে ঠান্ডা স্বরে জানতে চাইল।

তায়ান ভাবলেশহীন বলল,

__“জানি না...তোর বাবার ওপর যে রাগ থাকতো,সেটা অজান্তেই তোর ওপর ঝাড়তাম।”

__“এভাবে?”কাঁধ থেকে জামার একটু অংশ সরিয়ে দেখাল পুরনো ক্ষত।মানুষের দাঁতের গভীর কামড়ের দাগ।ধুসর হয়ে আছে যায়গাটা।

__“এই জায়গাটায় আপনি কামড় দিয়েছিলেন আর দোষ দিয়েছিলেন অলির।”

তায়ানের চোখ মুহূর্তে স্থির হয়ে গেল ক্ষত-র উপর।মনে পড়ে চৌদ্দ বছর আগের কথা।সেদিন আরশাদ আহসানি তায়ানের ছোট এক ভুলের জন্য যা নয় তাই বলে কথা শুনিয়েছিলেন তায়ানকে।শুধু গায়ে হাত তোলাই বাকি ছিল তার।অপমান আর ক্ষোভে তায়ানের ভেতরটা ফুঁসছিল।ঠিক সেই সময় অনুভা অলিকে কোলে নিয়ে তায়ানের ঘরে ঢোকে। হাতে চকলেটের প্যাকেট, ছোট্ট মুখে হাসি।এসে বলে ‘তায়ান ভাই চকলেটটা খুলে দাও না..’ চকলেটটা খুলে দিতে গিয়েই মুহূর্তের এক অদ্ভুত তাড়নায় তায়ান এমন কিছু করে বসে।পরমুহূর্তেই অনুভার ব্যথার চিৎকারে কেঁপে ওঠে ঘর। সবাই ছুটে আসে।তায়ান অনুকে অবাক করে দিয়ে সব দোষ চাপিয়ে দেয় অলির ঘাড়ে। বেচারা অলির তখন নতুন দাঁত উঠছে, তাই গল্পটা বিশ্বাসযোগ্যও হয়ে ওঠে সবার কাছে।আর অনুভা… সে-ও কেন যেন সত্যিটা বলতে পারেনি।সেদিন থেকে অনুভা তায়ানের থেকে দুরে দুরে থেকেছে।

---

__“তোর তো দেখছি সব মনে আছে!”

__“হ্যাঁ,সব।”

__“তাহলে আয় আরেকটা দেই।”

__“কিহ..”

তায়ান মৃদু হাসল,

__“কিছুনা,ঘুমাসনি কেন?

অনুভা এবার তায়ানের দিকে ভালো ভাবে তাকাল। সামনে থেকে অনেক বছর পর দেখলেও টিভিতে প্রায়ই দেখা হতো।তবে সামনে থেকে দিগুণ আকর্ষনীয় লাগছে।চুল গুলো বেশি ছোটোও না আবার বড়োও।পাশ দু'দিক নিখুঁত ভাবে ফেড করা।হালকা বাতাসে চুল গুলো নড়াচড়া করছে।

তায়ানের মুখে থাকা ললিপপটা মুখের এক কোন থেকে অন্য কোনে নিয়ে বলল,

__“আর কত দেখবি আমাকে?এখন গিয়ে ঘুমা।”

অনুভা ভালো ভাবে লক্ষ্য করে দেখল তায়ানের মুখে ললিপপ,যেটা মাঠে খেলার সময়ও টিভিতে দেখত।

__“আপনি এটা কেন খান?”

তায়ান বলল,

__“অভ্যাস।”

অনুভা আবারও আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।বলল,

__“কেন ফিরলেন?”

__“না ফিরলে খুশি হতিস?”

__“খুশি না হলেই বা কী?”

__“কিছু না এমনি ফিরেছি।”পরপর আবারও বলল,

__“বাই দ্যা ওয়ে,কনগ্র্যাচুলেশন ফর ইয়্যোর এনগেজমেন্ট।”

অনুভা কোনো ভাবে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে আসতে চাইল।পা বাড়াতেই তায়ান হাত চেপে ধরল।নিজের দিকে ঘুরাল।অনুভার চোখে পানি টলমল করছে।

__“কেন রাজী হয়েছিস?”সেই চোখের দিকে গভীর দৃষ্টি দিয়ে জিজ্ঞেস করল তায়ান।

__“এছাড়া উপায় ছিলো না...ছাড়ুন ঘুমাব।” হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছে।

তায়ান ছেড়ে দিলো। অনুভা দ্রুত পায়ে ছাদ থেকে নেমে গেল।

------

পরদিন তায়ান অনেক দেরিতে ঘুম থেকে উঠল।ফেডেরিকো আগেই উঠে নিচে চলে এসেছে।বাসায় তেমন কেউ নেই। সবাই যে যার কাজে চলে গেছে। বাড়ির মহিলারা রান্নার কাজে ব্যস্ত।আজকে তায়ানের সব পছন্দের খাবার রান্না করা হবে। ফেডেরিকো নিচে আসতেই অনুভার ছোট ভাই অনুভব এসে ওকে বাগানের দিকে নিয়ে যায় ফটবল খেলতে।তবে এক ঘন্টার বেশি বাগানে টিকতে পারেনি।এতো গরমে ফেডেরিকো তেমন অভ্যস্ত না।হাঁপাতে হাঁপাতে এসে সোফায় বসে।

ফেডেরিকো কে এভাবে ঘামতে দেখে উর্মিলা বেগম অনুভাকে বলে ঠান্ডা কিছু দিতে।অনুভা ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা মাঠা বের করে ফেডেরিকোর দিকে এগিয়ে দেয়।ফেডেরিকো অনুভাকে এক নজর দেখে মাঠার গ্লাস হাতে নেয়।কৌতূহলি গলায় জিজ্ঞেস করে,

__“হোয়াট ইজ দিস?”

__“দিস ইজ আ কাইন্ড অব লিকুইড মিল্ক ডেজার্ট।” আরও বলল,

__“ইট ইজ কুয়াইট রিফ্রেশিং টু হ্যাভ ডিস ইন হট ওয়েদার।”

ফেডেরিকো খেয়ে মাথা নাড়িয়ে বলল,

__“ওয়াও এটার স্বাদ ভিন্ন।খুব ভালো লাগল।”

অনুভা খানিক অবাক স্বরে বলল,

__“আপনি তো ভালোই বাংলা বলতে পারেন!”

__“ইয়েস, আই হ্যাভ লার্ন্ড ইট বাই স্টেইং উইথ তায়ান।”ফেডেরিকো বলল।

অনুভব ফেডেরিকোর পাশে বসে অনুভাকে বলল,

__“আমার জন্যেও এক গ্লাস এনে দাও আপু।”

অনুভা তাই করল।ভাইয়ের কথা মতো ফ্রিজ থেকে আরেক গ্লাস মাঠা এনে দিলো।তায়ান সিঁড়ি ডিঙিয়ে নিচে এসে তাদের দেখে সেও বলে,

__“আমাকেও দিস অনু।”

__“আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে মাত্রই শাওয়ার নিয়েছেন।এখন এগুলো খাবেন?”

__“হ্যাঁ,খাব নিয়ে আয় যা।” গম্ভীর কন্ঠে বলল।

অনুভা পা বাড়াতেই আমীরা বেগম এসে বললেন,

__“এখন এগুলো খাওয়ার কোনো দরকার নেই,খাবার দিচ্ছি তাড়াতাড়ি খেয়ে নে।কালকে সন্ধায় খেয়েছিস দুপুর হয়ে গেছে এখনও কিছুই খাওয়া হয়নি।”

ফেডেরিকো নিজের পেটে হাত দিয়ে বলল,

__“হ্যাঁ,আন্টি আমারও খিদে পেয়েছে অনেক।”

আমীরা বেগম হেসে বললেন,

__“পাবেই তো কখন থেকে না খাওয়া।এক্ষুনি দিচ্ছি।”

তায়ান আর বাঁধা দিলো না।মায়ের কথা মতো খাবার টেবিলে গিয়ে বসলো।হরেক রকমের খাবার তায়ানের সামনে।সে এগুলো দেখে বিস্মিত কন্ঠে বলল,

__“এতো খাবার কে খাবে?”

__“তুই খাবি।তোর বাবা সব তোর পছন্দের জিনিস রান্না করতে বলেছে।”

__“বাবা কোথায়?” তায়ান বলল।

__“অফিসে।রাতে ফিরবে,আরিজও সেখানে।খেয়ে তোরাও গিয়ে ঘুরে আয় একবার অফিসে।”

তায়ান না বোধক মাথা নাড়ল।

__“আজ না,মা।আর একটা কথা তোমাদের বলা হয়নি।আমি বা রিকো যে এখানে এসেছি তা কাউকে জানানোর প্রয়োজন নেই।মানে...এ বাড়ির লোক ছাড়া আর কেউ যেন না জানতে পারে।এবং আমরা বাহিরে গেলেও নিজেদের আড়াল করে যাব।”

তায়ানের কথা শুনে পাশে থাকা আমীরা বেগম,উর্মিলা বেগম,অনুভব,অনুভা সবাই অবাক হলো।সবার আগে অনুভাই বলে উঠলো।

__“কিন্তু কেন,তায়ান ভাই?” না মানে জানলে কী সমস্যা?”

তায়ান খেতে খেতেই বলল,

__“বিখ্যাতো ফুটবলার দেশে এসেছে জানলে মানুষ ভির করবে, আর আমার এসব বিরক্ত লাগে।” আমীরা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,

__“বাবাকে জানিয়ে দিও।”

তায়ান ঠিকই বলেছে।বিখ্যাত মানুষদের পেলে সাধারণ মানুষ ঝাপিয়ে পড়ে।আর্জেন্টিনা'র বিখ্যাত ফুটবলারের খোঁজ পেলে বাড়ি ঘর মাথায় তুলে ফেলবে লোকজন।'আমীরা বেগম ভাবলেন।' এছাড়াও সাংবাদিক গুলো তো আছেই এরা থাকেই এমন সুযোগে।

__“আচ্ছা চিন্তা করিস না।তুই এখানে আছিস কেউ জানবে না।কিন্তু এভাবে কতদিন?”

__“যতদিন সম্ভব হয়।কী বলো রিকো?”

ফেডেরিকো তায়ানের চোখের দিকে তাকাল।তায়ানের চোখে ফুটে ওঠা হাসি দেখে সেও একই ভাবে রহস্যময় হাসল।

বিজ্ঞাপন
রক্ত রেখার আড়ালে গল্পটি আয়েশা শেখ রিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে মোড়ানো থ্রিলার উপন্যাস