__“তায়ান ভাই,আপনি কী আবারও চলে যাবেন?”
__“হয়তো।”
বিকেলে কিছু একটা ভেবে অনুভা তায়ানের রুমে যায়,আর এই প্রশ্ন করে।তায়ান ল্যাপটপে কিছু একটা করছিলো।সেদিকে নজর রেখেই জবাব দেয়।অনুভা ভাবল তায়ান ভাই হয়তো ব্যস্ত তাই ধীর পায়ে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়।যাওয়ার পথে দরজার পাশে ফেডেরিকোর সাথে ধাক্কা খেয়েও খেলো না।ফেডেরিকো দ্রুত পায়ে তায়ানের রুমের দিকে আসছিলো।তাকে দেখে চিন্তিত মনে হচ্ছে।অনুভা কে দেখে জোর পূর্বক হাসার চেষ্টা করল।তারপর দ্রুত তায়ানের রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো।অনুভা বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টে চলে গেল।অনুভা চলে যেতেই তায়ানের দরজার সামনে আরশাদ সাহেব এসে দাড়ায়।কাওকে কল করেন তিনি।
অলি মাত্রই কলেজ থেকে আসে।অনুভাকে সোফায় বসে থাকতে দেখে বলে,
__“কলেজে গেলে না কেন আজকে আপু?
__“ইচ্ছে করছিলো না,কেন?”
__“শান্ত ভাইয়া তোমার খোঁজ করছিলো।”
অনুভার বিরক্ত লাগলো। ছেলেটা তাদের ভার্সিটির সিনিয়র, ফোর্থ ইয়ারের।অনুভা ফাস্ট ইয়ারের।অবশ্য স্কুল,কলেজ,ভার্সিটি একটাই। ছোট থেকে সেখানেই পড়েছে।ক্লাস নাইন থেকে ছেলেটা তার পেছন পরে আছে।আর কত ভাবে বোঝাবে ছেলেটাকে বুঝতে পারে না অনুভা।
বিরক্ত স্বরে বলে,
__“ছেলেটা অনেক বিরক্ত করছে ইদানীং।”
__“চাচা কে বলো।” অলি বলল।
__“না থাক আমি আর ঝামেলা বাড়াতে চাই না।এমনিতেই ঝামেলার শেষ নেই।”
__“যদি ছেলেটা ঝামেলা করে?”
__“আমি আবারও বুঝিয়ে বলব।”
অলি মাথা নাড়িয়ে নিজের রুমে চলে যায়।অনুভা রান্না ঘরের দিকে গেল।বিড়ালটার জন্য মাছ সেদ্ধ করতে হবে।সেখানে উর্মিলা বেগম ও আমীরা বেগম রাতের খাবার বানাচ্ছিল।বাসায় কাজের লোক থাকতেও রান্নার কাজ তারাই করে।নাফিসা বেগম বাড়ির কোনো কাজেই হাত দেয় না।হতে পারে এখন কোনো বান্ধবী নিয়ে শপিংয়ে গিয়ে কেনাকাটা করছে।দুই চাচীকে রান্না ঘরে দেখে তার মনে হলো,তার মা বেঁচে থাকলেও তো একই ভাবে তাদের সাথে রান্না করত।তার মা অবশ্যই নাফিসা বেগমের মতো হতো না।অনুভাকে চুপচাপ দরজার সামনে দাড়িয়ে থাকতে দেখে আমীরা বেগম ডাকলেন,
__“ ওভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?ভেতরে আয়।”
উর্মিলা বেগম একটু তরকারির ঝোল চামচ দিয়ে এগিয়ে বললেন,
__“দেখ তো অনু সব ঠিকঠাক আছে কিনা?”
অনুভা দেখল সব ঠিক আছে।আমীরা বেগম অনুভার দিকে তাকিয়ে রইলেন।রাফিদের সাথে বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকেই মেয়েটা চুপচাপ থাকে।এমনিতেই শান্ত স্বভাবের মেয়ে অনু এখন যেন আরও বেশি চুপচাপ হয়ে গেছে।অলি ও অনু দুজনেই সুন্দর তবে অনুর মুখটা তার মায়ের মতোই মায়াবী।মায়াবী মুখটা দেখলেই আমীরা বেগমের মনে হয় মেয়েটা কেন তার হলো না?ভাবতে ভাবতেই সে অনুভার দু গালে আলতো করে হাত রেখে বলে,
__“তুই যদি আমার মেয়ে হতিস,তোর জীবনে চুল পরিমাণ দুঃখও স্পর্শ করতে দিতাম না।”
__“কেন বড় আম্মু?আমি বুঝি তোমার মেয়ে না?”
__“এটা বলে লজ্জা দিস না রে মা।তোর এমন পরিস্থিতিতেও কিছু করতে পারছি না।তোর বাবাকে তো চিনিস কিছু হলেই আলাদা হয়ে যাওয়ার হুমকি দেয়।তোর বড় আব্বু এজন্যই সব দেখেও চুপ আছে।”
__“চিন্তা করো না বড় আম্মু।কপালে থাকা কোনো কিছু হাজার চাইলেও তোমরা বদলাতে পারবে না।শুধু দোয়া করো আমার জন্য।”
__“তোর জন্য আমি সব সময় দোয়া করি মা।”
আমীরা বেগমের চোখ বেয়ে এক ফোটা পানি পড়লো।তা দেখে অনুভা সরে গিয়ে মাছ চুলোয় বসাতে বসাতে বলল,
__“ কাঁদবে না বড় আম্মু এজন্য তোমার সাথে আমার কথা বলতে ভালো লাগে না।”
উর্মিলা বেগম অসহায় চোখে তাদের দেখল।তারও খারাপ লাগে মেয়েটার জন্য।
কিছুক্ষণ পর অলি এলো রান্না ঘরে তার খুব খিদে পেয়েছে। এসেই উর্মিলা বেগমকে তাড়া দিলো খাবার দেওয়ার জন্য।উর্মিলা বেগম একটু রেগে গিয়ে বললেন,
__“ এতো দেরি হলো কেন আসতে?আরেকটু পর-ই মাগরিবের আজান দিবে।”
__“ এমনি এমনি তো আর লেট করিনি।ছুটির পর স্যার’রা কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলছিল।”
অনুভা আড়চোখে অলিকে দেখলো।কেমন অনায়াসে মিথ্যে বলছে মেয়েটা।নিশ্চয়ই ফ্রেন্ডের সাথে ঘুরে এসেছে।মাছ সিদ্ধ করে রান্না ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে।তার বিড়াল বসার ঘরেই এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে।তার হাতে খাবার দেখে দৌড়ে এলো তার কাছে।অলিও খাবার নিয়ে ডাইনিংয়ে বসলো।তাকে দেখে অনুভা মুচকি হেসে বলল,
__“মিথ্যে বলা কবে ছাড়বি তুই?”
অলি খেতে খেতেই বলল,
__“তুমি কীভাবে বুঝে ফেল আপু?”
__“ না বোঝার কী আছে? তোর চোখমুখ দেখেই বোঝা যায় তুই মিথ্যে বলছিস।চাচীকে বোকা বানাতে পারলেও আমাকে পারবি না।”
__“ কী আর করবো ফ্রেন্ডরা ছাড়লো না তাই একটু ঘুরে আসলাম।তুমি আবার বলে দিও না যেন।”
__“এই চুপ বাবা আসছে।”
আরশাদ সাহেবকে নিচে নামতে দেখে অনুভা সতর্ক কন্ঠে বলল।
আরশাদ সাহেব সোফায় বসে ফোন ঘাটতে ঘাটতে অনুভাকে বললেন,
__“ তোমাকে জানানো হয়নি,বিয়েটা তোমার পরিক্ষার আগেই হবে এমনকি এক মাস পরেই।”
বাবার কথায় অনুভার পায়ের তলার মাটি সরে যায়।এক মাস পর বিয়ে মানে কী?মস্তিষ্ক ফাঁকা ফাঁকা লাগে তার।সে বিয়েতে রাজি হওয়ার সময় একটা শর্ত দিয়েছিল তা হলো বিয়ে করলে প্রথম বর্ষের পরিক্ষার পর।ততদিনে কিছু একটা করে বিয়েটা আটকানোর চেষ্টা করতো।কিন্তু বাবা এখন এটা কী বলল?
__“এটা কার সিদ্ধান্ত বাবা?”
__“ আমার।”
__“ কিন্তু এটা তো কথা ছিলো না।কথা ছিলো পরিক্ষার পর…”
আরশাদ আহসানি অনুভাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,
__“হ্যাঁ,কথা ছিলো তবে এখন সিদ্ধান্ত বদলেছে।বিয়ে যখন হবেই দেরি করে লাভ কী? পরিক্ষা পড়াশোনা বিয়ের পরও একই ভাবে চলবে কেউ আটকাবে না।এসব নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না।তোমাকে জানালাম তুমি সেই হিসেবে প্রস্তুত থেকো।” একদমে কথা গুলো বলে থামলেন তিনি।মেয়ের দিকে গভীর দৃষ্টি দিয়ে বললেন,
__“ আর আমার সিদ্ধান্তের নড়চড় হবে না।রাফিদেরও কোনো আপত্তি নেই।”
অনুভা আর কান্না চে'পে রাখতে পারলো না।অশ্রুরুদ্ধ কন্ঠে বলল,
__“ আমার সাথে আপনি কেন এমন করছেন বাবা?”
আরশাদ সাহেব অবাক কন্ঠে বলে।
__“তোমার সাথে আমি কী করেছি অনু? তুমি আমার মেয়ে তোমাকে বিয়ে দেওয়া আমার দায়িত্ব।”
__“আপনি সত্যিই আপনার দায়িত্ব পালন করছেন বাবা?”
__“ তোমার কী মনে হয়?”
__“ কেমন দায়িত্ব পালন করো তুমি যেটা তোমার মেয়েকে মানসিক ভাবে মে'রে ফেলছে?”অনুভা কিছু বলার আগেই আমীরা বেগম এসে বললেন।_“এটাকে দায়িত্ব বলে নাকি এর অপব্যবহার বলে?”
__“আমাকে দায়িত্ব শেখাতে আসবেন না,ভাবি।অন্তত আপনার থেকে ভালো বুঝি এসব।আর আমার মেয়ের ব্যপারে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আমার আছে।” আরশাদ আহসানি বললেন।
__“অবশ্যই তোমার অধিকার আছে কিন্তু তোমার মেয়ের এতে মতামত আছে কিনা সেটাও দেখা তোমার কর্তব্য।” আমীরা বেগম বোঝাতে চাইলেন তাকে।
আরশাদ আহসানি মেজাজ দেখিয়ে বলেন,
_“মতামত না থাকার কী আছে? আমি যা সিদ্ধান্ত নেব ওর ভালোর জন্যই। ও ছোট মানুষ… ও এখনই ভালো মন্দের কী বোঝে? এখন কী ওর মত একটা বাচ্চা মেয়ের মতামত নিয়ে আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে বলছেন?”
_“ সিদ্ধান্তটা যদি ওর জীবনের সাথে জরানো হয় তাহলে অবশ্যই ওর মতামত সবার আগে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।”
আরশাদ আহসানির আর তর্ক করার ইচ্ছে নেই।
_“ এখন সব ফাইনাল হয়ে গেছে বিয়ে আগামী মাসের মাঝামাঝি সময়েই হবে।খুব তাড়াতাড়িই ওরা বিয়ের ডেট ফাইনাল করতে আসবে।এটা নিয়ে আমি আর কারও কোনো মতামত নেওয়ার প্রয়োজন মনে করছি না।”
অনুভা এতক্ষণ অবিশ্বাস্য চোখে নিজের জন্মদাতাকে দেখছিল।
যদিও অবিশ্বাস্য চোখে দেখার কিছু নেই তার বাবা সর্বদাই এমনই ছিলো।বাবার সব সিদ্ধান্ত মেনে নিলেও এটা কেন যেন সে মানতে পারছে না।সে নিরবে চোখের জল ফেলছে।আমীরা বেগমও আর কিছু বললেন না।জানেন আরশাদ সাহেবকে কিছু বলা মানে পাথরের সাথে কথা বলা।আর এটাও জানেন এসব নাফিসা বেগমের কথায়ই হচ্ছে।
কিছুক্ষণ পরেই আরমান আহসানি আর আরিজ এলো।এসে অনুভাকে কাঁদতে দেখে আরমান সাহেবের কপালে ভাজ পড়ল।কৌতূহলী গলায় বলল,
_“ কী হয়েছে অনু? কাঁদছো কেন তুমি?”
_“ ওর বিয়ে সামনের মাসে ঠিক করেছে।” উত্তরটা আমীরা বেগম দিলেন।
_“ কে?” আরমান আহসানি অবাক হয়ে বললেন।
আমীরা বেগম আরশাদ সাহেবকে ইশারা করলেন।যে এখন খবরের কাগজে মনোযোগ দিয়ে বসে আছে। আরমান সাহেব শক্ত কন্ঠে বললেন,
_“ এসব কী শুনছি আরশাদ? আর আজকে অফিস থেকে এতো আগে কেন চলে আসলে? কোথায় গিয়েছিলে?”
_“ রাফিদ’দের বাসায়।” আরশাদ সাহেব বললেন।
_“ তুমি কী পা’গল হয়ে গেছ? বিয়ে আরও ছয়/সাত মাস পর হওয়ার কথা।এখন এগুলো কী?” আরমান সাহেবের মুখের রঙ বদলে গেছে।বাড়ির মেয়েদের মধ্যে অনুভাকে সে বেশি ভালোবাসেন। শুধু সে না আমীরা বেগমও।হয়তো মেয়েটা ছোট বেলায়ই মা হারিয়েছে তাই।নিজের দুই ছেলের মতোই অনুভাকে দেখেন তিনি।
তায়ান ও রিকো মাত্রই নিচে আসল।তারা পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছিলো।যেহেতু তায়ান এতো বছর বাড়িতে ছিলো না তাই কোনো ব্যাপারে কথা বলা ঠিক হবে না তাই চুপচাপ সবার কথা শুনছিলো।
আরশাদ সাহেবও রেগে গেলেন,
_“আমি আগেই বলেছি ভাই’জান আমার মেয়ের ব্যাপারে আমার সিদ্ধান্তই ফাইনাল। এতে আমি কারও মতামত নেব না।আপনি হলেও সেটা সম্ভব না।”
_“তুমি হয়তো ভুলে যাচ্ছ অনুভাকে আমি নিজের সন্তানের মতোই দেখি।চাচা হিসেবে ওর উপর আমারও দায়িত্ব,কর্তব্য এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে।” আরমান সাহেব বললেন।
_“ অবশ্যই আছে অধিকার,তবে আমি বাবা হিসেবে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সেটা দ্বিমত করার কোনো অধিকার নেই।”
_“ আরশাদ!” আরমান সাহেব গর্জন করে উঠলেন।এখানে ছোট বড় অনেকেই উপস্থিত কিন্তু তাদের দু'ভাইয়ের মধ্যে কথা বলার কারও সাহস নেই।তবু অনুভা এবার চিৎকার করে উঠল,
_“অনেক হয়েছে থামুন আপনারা।দয়া করে আমাকে নিয়ে আর কোনো তর্ক করবেন না।বাবা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাই হোক।” শেষের কথাটুকু একটু ধীর স্বরে বললেন।
অনুভার হঠাৎ এমন চিৎকারে সবাই স্তব্ধ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।শুধু মাত্র তায়ান নির্বাক।যদিও এতক্ষণ মুখে থাকা ললিপপ জিহ্বার সাহায্যে মুখের এক পাশ থেকে অন্য পাশে নিচ্ছিল, সেটা এখন থেমে গেছে।
অনুভা আরমান আহসানির দিকে তাকিয়ে বলল,
_“ অনেক হয়েছে বড় আব্বু!আমাকে নিয়ে তোমরা আর ঝামেলা করো না।আমাকে সেখানে বিয়ে দিলে যদি আমার বাবার সব সমস্যা সমাধান হয় তাহলে তাই হোক।আমি সব মেনে নেব।”
আরমান সাহেব অবাক চোখে অনুভার দিকে তাকিয়ে আছে।মেয়েটা শান্ত স্বভাবের,রেগে কথা বলা তো দুরের কথা কথাই কম বলে সে।কিন্তু তার ভাই মেয়েটার সহ্যের সীমা পার করে ফেলছে।আরশাদ সাহেব চলে গেলেন নিজের রুমে।যাই হয়ে যাক না কেন তার সিদ্ধান্ত নড়চড় হবে না।আরিজ অনুভার পাশে এসে বলল,
_“মাথা ঠিক আছে তোর? ওই লোকটার সাথে কীভাবে থাকবি তুই?”
_“আমার মাথা ঠিক আছে ভাইয়া।তোমরা আর তাকে বোঝাতে যেও না এটা আমার অনুরোধ।” অনুভা নরম স্বরে মিনতি করার মত করে বলল।
আরমান সাহেব বুকে হাত দিয়ে সোফায় বসে পড়লেন। আমীরা বেগম ও অনু দৌড়ে তার পাশে গেল।
_“বড় আব্বু ঠিক আছেন আপনি?”
উর্মিলা বেগম গ্লাসে করে পানি এগিয়ে দিলেন আরমান আহসানিকে।পানি খেয়ে অনুভাকে এক হাতে জড়িয়ে নিয়ে অসহায় কন্ঠে বললেন,
_“তুই আমাকে বড় আব্বু ডাকিস অথচ বাবার মতো কিছুই করতে পারিনি তোর জন্য।”
_“এভাবে বলো না বড় আব্বু তুমি যা করেছ নিজের বাবাও তা করেনি।”
_“একটা কথা মনে রাখিস মা,তোকে আমি কখনোই ভাইয়ের মেয়ে হিসেবে দেখিনি।কখনো দেখবোও না।তুই যেহেতু তোর বাবার সিদ্ধান্ত মেনে নিচ্ছিস আমি এখানে আর কিছু বলব না।তবে যখন যেভাবে তোর আমার সাহায্য লাগবে শুধু একবার বলবি।আমি নির্দ্বিধায় তোর হয়ে লড়াই করব।”
অনুভা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো।সদর দরজা দিয়ে মাত্রই নাফিসা বেগম ঢুকলেন।তার হাতে কিছু শপিং ব্যাগ সাথে অনুভার ভাই অনুভবও আছে।অনুভার ক্রন্দনরত মুখশ্রী দেখে অনুভব বোনের কাছে এসে বলল,
_“কেন কাঁদছো আপু? কেউ কিছু বলেছে?”
নাফিসা বেগম ব্যাগ সোফায় রাখতে রাখতে বললেন,
_“তোর আপুর কাঁদতে কোনো কারন লাগে? সুযোগ পেলেই কাঁদে এই মেয়ে।যত্তসব নেকামি।”
আরিজ দাতে দাত চেপে হাত মুষ্টিবদ্ধ করল।চাচী হলেও এই মহিলাকে সে সহ্য করতে পারে না।অলি চোখে ইশারা করল যেন কিছু না বলে।আরমান সাহেবও কিছু বললেন না।যার কথার ধরনই এমন তাকে আর কী বলবেন? আমীরা বেগম শুধু জিজ্ঞেস করলেন,
_“কোথায় গিয়েছিলি?”
_“অনুর বিয়ে সামনের মাসেই তাই টুকটাক কেনাকাটা এখনই শুরু করতে হবে।”
_“এগুলো তোরই প্লান? মানে তুই-ই বলেছিস বিয়ের ডেট এগিয়ে আনতে?”
নাফিসা বেগম অবাক হয়ে বলেন,
_“আল্লাহ’র দোহাই লাগে ভাবি! সব কিছুতে আমাকে কেন টানেন?আমিও আজকেই জানতে পারি বিয়েটা যে সামনের মাসেই হচ্ছে।আর বিয়ে যেহেতু হবেই এখন হলেই বা কী?”
অনুভার বিরক্ত লাগলো এসব কথা।মাথাও ধরেছে অনেক তাই নিজের রুমে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়।তায়ান আজও সিড়ির পাশেই দাঁড়ানো।সাথে রিকোও আছে।দুজনেই এমন ভাবে দাড়ানো যে উপরে যাওয়ার জন্য জায়গা’ই নেই।কিছুক্ষণ চুপচাপ তাদের দিকে তাকিয়ে থাকল যেন পাশে সরে গিয়ে জায়গা করে দেয়।তবু সরলো না।তায়ান শুন্য দৃষ্টিতে অনুভাকে দেখছে,আর রিকো একবার তায়ান আরেকবার অনুকে দেখছে।কেন যেন এই মুহুর্তে দুজনকেই বিরক্ত লাগছে অনুভার কাছে।সে একটু মেজাজ দেখিয়ে বলল,
_“ আপনারা এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?দেখতে পাচ্ছেন না আমি উপরে যাব?সরুন এখান থেকে।” সঙ্গে সঙ্গেই রিকো সরে দাড়ালো।তায়ান সরলো না একই ভাবে আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলো।অনুভা ওইটুকু জায়গা দিয়েই দু'জনকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল।রিকো একটু অবাক হয়ে অনুভার যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকল।সে যেদিন থেকে এসেছে অনুভাকে সব সময় নরম ভাবেই কথা বলতে দেখেছে।এমন রেগে যেতে দেখেনি এর আগে।সে তায়ানকে বিরবির করে বলল,
_“Tu prima hermana está muy enojada.”
(তোমার চাচাতো বোন খুব রেগে আছে।)
তায়ান মুখ থেকে ললিপপের কাঠিটা বের করে ফেলে দিলো।নির্বাক ভঙ্গিতে বলল,
_“She is not my cousin.”
_“What?” রিকো অবাক স্বরে বলল।
_“ভেবে দেখো ঠিক বলেছি কিনা।ভুলে গেলে?” তায়ান বলল।
_“No,but…” কিছু একটা মেলানোর চেষ্টা করল।কিন্তু তার আগেই রিকো বলল,
_“বাদ দাও তুমি এগুলো বুঝবে না।”
____
রাতের খাবার খেতে অনুভা আর নিচে আসলো না।অলিও সন্ধার দিকে খেয়েছে তাই সেও আসেনি।এছাড়া বাসার সবাই উপস্থিত।তায়ান আর রিকোও চুপচাপ খাচ্ছে।দুজনের কানেই ব্লুটুথ গুজে রাখা।তায়ান আসার পর থেকে রান্না গুলো ওর পছন্দ মতোই করা হয়।যদিও তায়ানের এমন কিছুতে তেমন আগ্রহ নেই।আরমান সাহেব অনুভবকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
_“অনু কোথায়? খাবে না ও?”
এর উত্তরে বাড়ির সবার ছোট সদস্য নীলা বলল,
_“বড় চাচ্ছু আমি আপুকে ডাকতে গিয়েছিলাম বলল খাবে না।”
_“খাবে না কেন?এমনি দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে মেয়েটা।আমীরা যাও গিয়ে নিয়ে আসো।” আরমান সাহেব চিন্তিত হয়ে বললেন।আরশাদ সাহেবের দিকে একবার তাকালেন,যে কোনো দিকে না তাকিয়ে নির্বিঘ্নে খেয়ে যাচ্ছে।
_“আমি গিয়েছিলাম বলল ক্ষিদে নেই।বেশি জোর করলে আবার কান্নাকাটি করবে।” আমীরা বেগম বললেন।
_“এগুলো আল্লাদ দেখিয়েই মেয়েটাকে মাথায় তুলছেন।তারপর শ্বশুর বাড়িতেও এইসব আচরণ করবে।” নাফিসা বেগম বিরক্তির স্বরে বললেন।
আরমান আহসানি কন্ঠ শক্ত করে বললেন,
_“আমার বাড়ির মেয়েকে আমি কীভাবে বড় করব সেটা তোমার থেকে শিখবো না, নাফিসা!”পরপর অনুভবের দিকে তাকিয়ে আদেশ করলেন,
_“অনুভব যাও গিয়ে বোনকে ডেকে আনো।বলবে বড় আব্বু রেগে আছেন।”
অনুভব মাথা নাড়িয়ে উঠে যেতে নিলে তায়ান থামায় তাকে।
_“তুই বোস আমি যাচ্ছি।”
সবাই একটু অবাক হলো।আরশাদ সাহেব যে এতক্ষণ সব কিছু নিরবে শুনছিলেন সেও মাথা তুলে তাকালেন।তায়ান বাসায় কারও সাথে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে না।আমীরা বেগম এটা নিয়ে তায়ানের সাথে কথা বলতে চাইলে আরমান সাহেব বাঁধা দেন।তিনি বলেন,“অনেক বছর পর এসেছে তাই এমন।স্বাভাবিক হতে একটু সময় দাও ওকে।তারপর আমি নিজেই কথা বলব ওর সাথে।”
তাই এমন হুট করে তায়ানের কথায় আমীরা বেগমও খানিক অবাক হলেন।তায়ান সবাইকে এমন তাকিয়ে থাকতে দেখে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বলল,
_“ মা গিয়েছিল আসেনি।অনুভব গেলেও আসবে না।আমি বুঝিয়ে বললে আসতে পারে।তাই আরকি…” এতটুকু বলাতেই আরমান সাহেব মাথা দোলালেন।বললেন,
_“ হ্যাঁ,তুমিই বরং গিয়ে নিয়ে আসো।
___
অনুভার রুমের দরজা খোলাই ছিলো।তায়ান নক না করেই রুমে ঢুকে পরল।অনুভা দ্রুত কিছু একটা লুকিয়ে ফেলল।কোনো রকমে চোখের পানি মুছে নিজেকে সামলে তায়ানকে বলল,
_“আপনি এ-এখানে?”
তায়ান বুঝল অনুভা কাঁদছিলো।তবে জিজ্ঞেস করল না কিছু শুধু বলল,
_“নিচে চল।”
_“কেন?”
_“এমনি চল।”
_“আমি খাব না। খিদে নেই…”
_“খেতে হবে না চল আমার সাথে।”
_“অযথা গিয়ে কী করব?” অনুভা বলল।
তায়ান একটু রাগ মিশ্রিত স্বরে বলল,
_“আমি তোকে যেতে বলছি এটা তোর কাছে অযথা মনে হচ্ছে?”
_“আপনিই তো বললেন এমনি যেতে তাই বললাম।”অনুভা একটু ঘাবড়ালো।
_“বিকেলে আমার রুমে গিয়েছিলি কেন?”
_“ কখন? ও হ্যাঁ…এমনি গিয়েছিলাম তেমন কোনো কারন ছিলো না।”
দুজনের মাঝে নিরবতা নেমে এলো।অনুভা মাথা নিচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে আর তায়ান অনুভার দিকে।তায়ানই নিরবতা ভাঙলো,
_“গুলাব জামুন খেয়েছি আমি।চল এখন।” অনুভা অবাক হয়ে কিছু বলবে তার আগেই তায়ান তার হাত আলতো করে চে'পে ধরে নিচে নিয়ে যায়।তায়ান ভাই কীভাবে জানলো সে তার জন্য গুলাব জামুন মিষ্টি বানিয়েছে? হ্যাঁ বিকেলে সেজন্যই তার রুমে গিয়েছিল তবে তার ব্যস্ততা দেখে বলার সাহস পায়নি।তাহলে বুঝলো কিভাবে?
তায়ান ছোট বেলায় গুলাব জামুন অনেক পছন্দ করতো।এখানে আসার পর আমীরা বেগম সব কিছু রান্না করলেও এটা হয়তো ভুলেই গিয়েছিল।তাই অনুভা বানিয়েছিল।