রক্ত রেখার আড়ালে

পর্ব - ১

🟢

প্লেইনের জানালার কাচে চোখ রেখে বাইরের মেঘের সাগরের দিকে তাকিয়ে আছে যুবক। তার দৃষ্টি সুদূরপ্রসারী, কিন্তু মন পড়ে আছে অন্য কোথাও। চোখের কোণে জমে আছে লালচে আভা। মুখে গোজা এক ললিপপ।

‘তায়ান, তোমাদের বাড়িটা কেমন? আমি কিন্তু এসি ছাড়া একদম থাকতে পারব না, আগেই বলে রাখছি!’

​পাশ থেকে অস্পষ্ট বাংলায় বলে উঠল এক বিদেশি যুবক। তায়ান জানালার বাইরে থেকে ধীরস্থিরভাবে মুখ ফিরিয়ে রিকোর দিকে তাকাল। রিকো, খাঁটি আর্জেন্টাইন সে। ​তারা দুজনে আর্জেন্টিনা থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এখন বাংলাদেশের সীমানায়। তার এই আর্জেন্টাইন বন্ধু রিকোকে সাথে নিয়েই বাড়ি ফিরছে সে। এই দীর্ঘ চৌদ্দটি বছর নিজের পরিবারের কারও সাথেই তার বিন্দুমাত্র কোনো যোগাযোগ ছিল না। আজ, অবশেষে সে তাদের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।

প্লেইন থেকে নেমেই ক্যাপ আর কালো মাস্ক পড়ে নিলো দু’জনেই। এয়ার্পোর্ট থেকে একটা গাড়ি নিয়ে সোজা এসে নামল আহসানী বাড়ির ফটকের সামনে। ভেতরে গেল না তায়ান। কিছুক্ষন দাড়িয়ে রইল নিরবে। তার পড়নে মেরুন রঙের শার্ট। কালো প্যান্ট।

লম্বা, সুঠাম দেহি, উজ্জ্বল শ্যামলা এক যুবক। বাম হাতের কুনইতে কালো ওভার কোটটি ঝুলানো। ডান হাতে লাগেজ। নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে আছে সামনে থাকা বিশাল বাড়িটার দিকে। সেদিকেই একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে পাশে থাকা রিকোকে উদ্দেশ্য করে ঠান্ডা কন্ঠে বলল,

‘Bienvenido a mi casa.’

(আমার বাড়িতে তোমাকে স্বাগতম।)

রিকো ফর্সা, তার চুল গুলো হালকা বাদামী। সে একটু হেসে চোখ থেকে চশমা খুলল। চোখ দু'টোও চুল গুলোর মতো বাদামী ধাঁচের। তার হাতেও লাগেজ। বাড়িটার দিকে আবেশিত নয়নে তাকিয়ে বলল,

‘Gracias.(ধন্যবাদ।)..ইউর হাউস লুকস অ্যাবসোলিউটলি বিউটিফুল।’

তায়ানের ঠোঁটে মৃদু হাসি খেলে গেল। রিকো আবারও অস্পষ্ট বাংলা ভাষায় বলল,

‘চলো, তোমায় বাসার ভেতরে।’

মাথা ঝাঁকাল তায়ান। লাগেজ টেনে লোহার ফটকে হাত দিতেই পেছন থেকে এক মেয়েলি কন্ঠস্বর ভেসে এলো।

‘কে আপনারা?আমাদের বাসার সামনে কী করছেন?’মেয়েটার কাঁধে ব্যাগ। পড়নে স্কুলের ইউনিফর্ম।

ছেলে দু'টো পেছন ঘুরল একসঙ্গে। রিকো হেসে বলল,

‘হ্যালো! এটা আপনার বা-সা মানে?’ছেলেটার অস্পষ্ট বাংলা উচ্চারণ শুনে মেয়েটা কৌতুক শোনার মতো করে হেঁসে ফেলল। বলল,

‘কে ভাই আপনারা? এটা আমাদেরই বাসা। এখানে কী চাই সেটা বলুন।’ পাশে থাকা উজ্জ্বল শ্যামলা রঙের ছেলেটাকে দেখল। মুখের এক কোনে ললিপপ গেঁথে রেখেছে। চোখে থাকা রোদ চশমা-টি জ্বলজ্বল করছে।

মেয়েটার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে রিকোর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল তায়ান,

‘ভেতরে চলো।’ বলেই লোহার ফটক খুলে ফেলল। এগিয়ে গেল বাড়ির সদর দরজার দিকে। এবার দারোয়ান দু'টোও এগিয়ে আসল। মেয়েটা পেছন পেছন যাচ্ছে আর চেঁচাচ্ছে।

‘আরে..আরে..এভাবে বাসায় ঢুকে যাচ্ছেন কেন?থামুন বলছি! শুনতে পাচ্ছেন না কী বলছি?আরেহহ…’

দারোয়ান দু'টো এটা সেটা বলে আটকানোর চেষ্টা করল। চেচামেচি শুনে ভেতর থেকে একজন মহিলা এসে দরজা খুলে দিলো। দরজা খুলতেই দেখল দু'জন অচেনা ছেলে দাঁড়িয়ে। দু'টো ছেলেই অত্যন্ত সুদর্শন। একজনকে দেখে বোঝা যাচ্ছে না বাংলাদেশি নাকি বিদেশি তবে ফর্সা ছেলেটাকে দেখেই মনে হচ্ছে পশ্চিমাদের সন্তান। মেয়েটা এসে বলল,

‘এরা কে, মা? না বলে বাসায় ঢুকে যাচ্ছে।’

মহিলাটি পর্যবেক্ষন দৃষ্টিতে ছেলে দুটোকে দেখে বলল,

‘কে তোমরা বাবা?’

এবার তায়ান চশমা খুলে বলল,

‘আমাকে চিনতে পারছো না চাচী?’

চাচী ডাক শুনতেই মহিলাটার যেন কিছু মনে পড়ল। তার চাহনি করুন হয়ে উঠল। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে দ্রুত কাউকে ডাকতে লাগল।

‘ভ-ভাবি, ভাবি দেখুন দেখুন কে এসেছে। আপনার বুকের ধন ফিরে এসেছে। তাড়াতাড়ি আসুন ভাবি।’ মেয়েটারও চোখ কপালে উঠে গেল। এই দু'জনকে তো সে চেনে! প্রায়ই টিভিতে দেখে। তাহলে সামনে থেকে দেখে চিনতে পারল না কেন? নিজের মাথায় নিজেই গাঁট্টা মারল।

রান্না ঘর থেকে তড়িঘড়ি করে বের হয়ে আসলো আমিরা বেগম। সে সন্ধার নাস্তা বানাচ্ছিল। নিজের ছোট জা’য়ের ডাক শুনে বের হয়ে এসে কিছু বলবে সেই মুহুর্তে উর্মিলা বেগম আঙুলের ইশারায় ছেলে দু'টোকে দেখাল। আমিরা বেগম তাদের দেখতেই থমকে গেল। বিশেষ করে মেরুন শার্ট পড়া ছেলেকে দেখে। তার হাতে থাকা রান্নার খুন্তিটা মেঝেতে পড়ে গেল। সে নিজেও দু'পা পিছিয়ে যায়। এক পর্যায়ে পড়ে যেতে নিলে মেয়েটা এবং উর্মিলা বেগম দ্রুত এসে তাকে ধরে। তায়ানও তড়িৎগতিতে এসে তাকে ধরে বলে,

‘কী হয়েছে মা?’

আমিরা বেগম নিজেকে সামলে দাঁড়ায়। ছেলেটার গালে তার কম্পিত হাত রেখে নিস্তেজ স্বরে বলে,

‘আমি স্বপ্ন দেখছি উর্মিলা? আমার তায়ান আমার সামনে! এটা স্বপ্ন? অলি! অলি এটা স্বপ্ন বল?’

মেয়েটা ও উর্মিলা বেগমের চোখ টলমল করে উঠে। তায়ান মুখে থাকা ললিপপ ভেঙে মুখে রেখে কাঠি ফেলে দিয়ে, আমিরা বেগমকে বুকে নিয়ে জড়িয়ে ধরে।

‘স্বপ্ন না, মা। আমি এসেছি। শান্ত হও প্লিজ।’

আমিরা বেগম ছেলেকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নেয়। দু'হাতে তায়ানের শার্টের বুকের অংশ খামচে ধরে বলে,

‘কী ভুল করেছিলাম আমি? কেন চলে গিয়েছিলি? বল! কেন আমার কথা ভাবলি না? মায়ের কথা একটাবার কেন ভাবলি না, বাপ!’ কান্নার গতি বাড়ল তার।

উর্মিলা বেগম বললেন,

‘এগুলো কথা এখন থাক ভাবি। ছেলেটা অনেক দুর থেকে এসেছে। ওদের একটু রেস্টের প্রয়োজন।’ ইউনিফর্ম পড়া মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

‘অলি তাড়াতাড়ি গিয়ে শরবত বানিয়ে আন।’

অলি ব্যাগ সোফায় রেখে শরবত বানাতে চলে গেল। আমিরা বেগমের কান্না যেন থামার নামই নিচ্ছে না। ছেলের বুক আঁকড়ে ধরে আছেন। তায়ান একটু কড়া স্বরে বলল,

‘মা! আর না। এভাবে কাঁদতে থাকলে কিন্তু আবার চলে যাব। আগে কিছু খেতে দাও।’

রিকো এগিয়ে এসে বলল,

‘হেই, তায়ান! চলে যাবে মানে? আমি যাচ্ছি না একা যা-ও।”এবারেও তার বাংলা উচ্চারণ সঠিক হলো না।

আমিরা বেগম মাথা তুলে তাকালেন। ছেলেকে পাওয়ার আনন্দে সাথে আসা ছেলেটাকে খেয়ালই করেনি। উর্মিলা বেগমও লজ্জা বোধ করলেন। সে ছেলেটার দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন,

‘এখানেই দাঁড়িয়ে আছো কেন?সোফায় গিয়ে বসো। আসো।’

আমিরা বেগমও এগিয়ে গেল ফর্সা ছেলেটার সামনে। সন্দিহান গলায় বলল,

‘তুমি তো ফেদেরিকো জাইদান তাইনা? কেউ কোথাও যাবে না।” উর্মিলা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,

‘উর্মি লাগেজ দু'টো ভেতরে নেওয়ার ব্যবস্থা করো।’

তায়ান অবাকের স্বরে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,

‘তুমি ওকে চেনো, মা?’

ছেলের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগেই অলি রান্না ঘর থেকে আসতে আসতে বলে,

‘চিনবে না আবার? আমরা সবাই চিনি। এমনকি আমরা সবাই আপনাদের বিশাল বড় ফ্যান। টিভিতে আপনাদের কোনো ম্যাচ দেখাই বাদ দিই না।”

‘তাহলে বাহিরে ওমন না চেনার ভঙ্গি করলে কেন?’

থতমত খেল অলি। তারই বা কী দোষ? হঠাৎ সামনে থেকে দেখেছে কিনা! অলি এ বাড়ির মেজো মেয়ে। মাহজাবিন আহসানি অলি। সে আমতা আমতা করে বলল,

‘সরি তায়ান ভাইয়া। আমি এভাবে আপনাকে সামনে থেকে দেখতে পাবো স্বপ্নেও ভাবিনি। শুধু টিভিতে দেখতাম আর বড় চাচীর মুখে আপনার গল্প শুনতাম।’ হাতে থাকা শরবত এগিয়ে দিয়ে বলল,

‘এটা খেয়ে নিন।’

তায়ান এক গ্লাস ফেদেরিকোর দিকে এগিয়ে দিয়ে নিজে একটা নিলো। শরবতের গ্লাসটি ঠোঁটের কাছে তুলতেই হঠাৎ পুরুষালী হাত এসে এক ঝটকায় গ্লাসটি তার থেকে নিয়ে মেঝেতে ফেলে দিলো।

সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল তায়ান। অভিব্যাক্তি শান্ত তার। শুন্য মুখ ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে সামনে থাকা লোকটার দিকে। আমিরা বেগম দৌড়ে এসে ক্ষিপ্ত স্বরে বললেন,

‘স্পর্ধা বেড়ে গেছে তোমার আরশাদ!’

বিজ্ঞাপন

‘স্পর্ধা আপনাদের বেড়ে গেছে ভাবি! এই ছেলে এখানে কোন সাহসে এসেছে?’

আরশাদ আহসানির পেছন পেছন তার স্ত্রী নাফিসা আহসানি এসে দাঁড়াল। তায়ানকে দেখে সেও স্তব্ধ।

‘ও আমার ছেলে আরশাদ!’আমীরা বেগম চিৎকার করে উঠলেন।

‘তোমার ভাই আসার আগে এটা নিয়ে যেন আমি একটা কথাও না শুনি।’

উর্মিলা বেগম এতক্ষণ এই ভয়টাই পাচ্ছিল। অলিও ভয়ে কুঁচকে গেছে। তার চাচা আরশাদ আহসানি তায়ানকে পছন্দ করেন না। টিভিতে তাদের খেলা দেখলেও যখন সে বাসায় থাকে কেউ দেখায় সাহস পায় না। ফেদেরিকো কখন সোফার পেছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়েছে কেউ খেয়ালই করেনি।

এতো কিছুর পড়ও তায়ান আরশাদ আহসানির দিকে তাকিয়ে বলল,

‘আপনি আমার উপর এখনো রেগে আছেন চাচ্চু? কিন্তু কেন?’

আরশাদ আহসানি এবার আরও রেগে গেলেন। আঙুল উঁচিয়ে বলতে চাইলেন,

‘তোমার ভুল তুমি....’

‘ওর ভুল ও আমার ছেলে এই জন্য?’ সদর দরজায় দাঁড়িয়ে থেকে আরমান আহসানি বললেন। সাথে রয়েছেন তার ছোট ভাই আসাদ। এবং আরমান আহসানির ছোট ছেলে আরিজ আসহানি। তারা ব্যবসায়ীক কাজে চট্টগ্রামে গিয়েছিল। মাত্রই ফিরলেন। বাসায় শুধু আরশাদ আহসানি ছিলেন। তায়ানকে হঠাৎ এতো বছর পর এ বাসায় দেখে আরশাদ সাহেবের মাথায় প্রায় রক্ত উঠে গেছে। বড় ভাইয়ের এমন কথায় সে অবাকের স্বরে বলে,

‘ভাইজান আপনি এখনও এগুলো বলবেন?ভুলে যাবেন না চৌদ্দ বছর আগে এই ছেলেই আপনার ভালোবাসা পায়ে ঠেলে চলে গিয়েছিলো…’

হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিলেন আরমান আহসানি,

‘থাম তুই আরশাদ! তোর কারনেই এতো কিছু হয়েছিলো। আশা করি তুইও ভুলে যাবি না সেই দিন গুলো।”

আরিজ ইতিমধ্যে তার ভাইকে এসে ঝাপটে ধরেছে। তার যখন এগারো বছর তখন তার ভাই বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। আট বছর পর্যন্ত কোনো খোঁজ খবরই পাওয়া যায় নি। সারাদেশের মধ্যে এমন কোনো যায়গা নেই যেখানে খোঁজা হয়নি। এক সময় তারা হাল ছেড়ে দিয়ে মেনেই নেয় তায়ান হয়তো আর বেঁচে নেই। তারপর একদিন..আরিজের বয়স তখন উনিশ। ল্যাপটপে কোপা আমেরিকার ম্যাচ দেখছিল। হঠাৎ স্ক্রিনে একজন খেলোয়াড়কে দেখেই তার বুক কেঁপে ওঠে। চেহারাটা, হাঁটার ভঙ্গি, চোখের দৃষ্টি… সবই তার ভাই তায়ানের মতো! এক মুহূর্ত দেরি না করে আরিজ দৌড়ে বসার ঘরে ছুটে আসে। প্রথমে আরিজের কথা কেউ বিশ্বাসই করেনি। এমনকি স্ক্রিনেও তায়ানের নাম ছিলো টি.এইচ.ভি। তবে খেলা শেষে যখন প্রেজেন্টার ইন্টারভিউ নিচ্ছিলো তখন তার পুরো নাম জিজ্ঞেস করলে সে বলে,

‘তায়ান_হারিস।’

শব্দ দুটো শোনা মাত্রই পুরো বাড়িতে নিস্তব্ধতা নেমে আসে। যাকে মৃত ভেবে হাল ছেড়ে দিয়েছিলো এতো বছর পর তাকে সম্পূর্ণ নতুন ভাবে দেখছে! আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে পড়ে সেই দেশের হয়ে খেলছে! আমিরা বেগম তো ছেলেকে দেখে চেতনাই হারিয়ে ফেলেছিল। সেদিন থেকে আরিজ দিনরাত সোশাল মিডিয়াতে তার ভাইয়ের সব রকম খবরাখবর নেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এমন একজন বিখ্যাত ফুটবলারের ব্যক্তিগত তথ্য পেতে গেলে সাধারণ মানুষের চেষ্টায় খুব একটা ফল মেলে না। আরমান সাহেব তাকে ফিরিয়ে আনার অনেক চেষ্টা করেছিলেন। বিভিন্ন সূত্রে যোগাযোগ করেছেন, খোঁজ নিয়েছেন। কিন্তু আমিরা বেগম একদিন জানিয়ে দেয়,

‘যে নিজে থেকে দূরে থাকতে চায়, তাকে টেনে আনার বৃথা চেষ্টা করে কোনো লাভ নেই। ও ফিরবে… তার মতো করে একদিন অবশ্যই ফিরবে।’

তারপর থেকে তায়ানকে সবসময় টিভিতেই দেখতে পায়। আরশাদ এবং আসাদ আহসানি বাদে বাকি সবাই এক সঙ্গে আর্জেন্টিনার সব ম্যাচ দেখত। এ বাড়ির সকলে তখন তায়ানকে একজন খেলোয়ার হিসেবে টিভিতে দেখত। তাদের বিশ্বাস ছিল সে নিশ্চয়ই একদিন ফিরবে।

——

আরিজ মুখ তুলে তায়ানের দিকে তাকিয়ে ভাঙ্গা গলায় বলে,

‘আমাদের কথা কী একটুও মনে পড়েনি ভাইয়া?’ আরিজের চোখ দুটো লালচে হয়ে গেছে। সে ছোট বেলা থেকেই ভাইয়ের পাগল ছিলো। তায়ান চলে যাওয়ার পর প্রথম দু বছর যখনই ভাইয়ের কথা মনে পড়েছে তখনই কান্না করেছে।

তায়ান আরিজকে আবারও জরিয়ে ধরে বলল,

‘মনে পড়েছে,খুব মনে পড়েছে। এই জন্যেই তো চলে এসেছি। কাঁদবি না কান্না-কাটি দেখার জন্য আসিনি আমি।’

‘কেন চলে গিয়েছিলে তবে?’

তায়ান আরশাদ সাহেবের দিকে তাকাল। গম্ভীর স্বরে বলল,

‘আমার জন্য এই বাসায় অনেক প্রবলেম হতো। প্রবলেম গুলো দিন দিন বাড়তেই থাকে, তাই চলে গিয়েছিলাম। আশা করি চলে যাওয়ার পর আর কোনো সমস্যা হয়নি।’

আরশাদ সাহেব এবারও রেগে গেলেন। গলায় চাপা ক্রোধ নিয়ে বললেন,

‘ চুপ করো বেয়াদব ছেলে! তোমার জন্য তোমার বাবা মা আমাদের দু'ভাইকে কত হয়রানি করেছে জানো? আমাদের বিপদে ফেলে গিয়ে বলছো কোনো সমস্যা হয়নি!’

আরমান আহসানির চোখ টলমল করছে। না, সে পারছে না ছেলেকে জরিয়ে ধরতে। ছেলের প্রতি চাপা একটা অভিমান কাজ করছে কেমন যেন। কম ভালোবাসেনি সে তার ছেলেকে। কীভাবে পারল এভাবে এতো গুলো বছর দুরে থাকতে? তায়ান তার বাবার দিকে তাকাতেই বুক ভারি হয়ে উঠল তার। বাবা মা দুজনেরই মুখে কেমন বয়সের ছাপ পড়ে গেছে! আরমান সাহেব এড়িয়ে যেতে চাইলেন। সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতেই তায়ান গিয়ে জড়িয়ে ধরল তাকে।

‘সরি, বাবা…! সরি…! ভুল হয়ে গেছে আমার, ক্ষমা করবে না তোমার ছেলেকে?’

এক মুহূর্ত দাঁত চেপে স্তব্ধ হয়ে রইলেন আরমান সাহেব। পর মুহূর্তে নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে সে-ও ছেলেকে জড়িয়ে নিয়ে বললেন,

‘আমার ভালোবাসার কী এতোই কমতি ছিল? কোন ভুলের শাস্তি দিয়েছিস এতগুলো বছর?’

‘কোনো ভুলের না, বাবা। যা হয়েছে ভুলে যাও। আবার নতুন করে সব শুরু করি চলো।’

আমিরা বেগম বললেন,

‘আপনি দয়াকরে উত্তেজিত হবেন না। ডক্টর আপনাকে সতর্ক থাকতে বলেছেন। আমি বলেছিলাম আপনাকে আমাদের ছেলে আসবে। দেখুন আজ ঠিকই আমার কথা সত্যি হয়েছে।’

উর্মিলা বেগম খাবার টেবিলে দুজনের জন্য খাবার বারছেন। আরশাদ আহসানি চলে গেলেন নিজের রুমে। তার এখানে থাকা মানেই নিজের সাথে যুদ্ধ করা। স্বামীকে চলে যেতে দেখে নাফিসা বেগমও চলে গেলেন। আসাদ সাহেবও চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই তায়ান তাকে ডাকল,

‘ছোট চাচ্চু ভালো আছো?’

আসাদ সাহেব একটু থেমে তায়ানকে দেখলেন। কিন্তু কোন জবাব দিলেন না। চলে গেলেন নিজের রুমে।

উর্মিলা বেগম তায়ানের কাছে এসে বললেন,

‘বাদ দাও বাবা। এরা কোনোদিন ঠিক হবে না। তোমরা এবার খেয়ে নাও তো দেখি।’ এদিক ওদিক তাকিয়ে কাওকে খুজলেন,

‘তোমার সাথের সেই ছেলেটা কোথায়? কী যেন নাম ছেলেটার.....”

সঙ্গে সঙ্গে তায়ান ডেকে উঠলো,

‘রিকোওও! সোফার পেছন থেকে বের হয়ে আসো।’

ফেডেরিকো এবার মাথা বের করে বোকার মতো হাসল। চারপাশে নজর দিয়ে দেখল সেই বদ রাগী লোকটা আছে কিনা। তাকে দেখে আরিজের চোখ কপালে উঠে গেছে। ফুটবলার ফেদেরিকো জাইদান তাদের বাসায়! হ্যাঁ, সে দেখেছিলো তার ভাইয়ের সাথে ফেদেরিকোর বন্ডিং খুব ভালো। তাই বলে নিজের বাসায় তাকে দেখবে ভাবেইনি।

‘মাইই গড! ফেদেরিকো এখানে?’

রিকো হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসলো। আরিজের সাথে হাত মিলিয়ে বলল,

‘ইয়াহ, আই এম। হোয়াটস-আপ?’

‘আ'ম গুড। হোয়াট এবাউট ইউ?’

রিকো আবারও এদিক ওদিক তাকাল। ছোট করে বলল,

‘বেটার নাউ।’

রিকো সবার সাথেই টুকিটাকি কথা বলল। আরমান সাহেব বাসার কাজের লোকদের বলে দিলেন উপরের রুম দুটো পরিষ্কার করে দিতে। তায়ান ও রিকো দুজনেই খেতে বসেছে ,সাথে আরিজও। খাওয়ার সময় এটা ওটা নিয়ে আলোচনা করছে তারা। অলি এতক্ষণে ফ্রেশ হয়ে চলে এসেছে। উর্মিলা বেগম আড়চোখে দেখলেন মেয়ের কান্ড। নিজের খাবার নিজে নিয়ে খায়না আজকে একদম ভাইদের বেড়ে খাওয়াচ্ছে। আমিরা বেগম দুর থেকে দেখলেন বড় ছেলের হাসি। খুব বেশি হাসে না ছেলেটা।

——

সন্ধা সাতটার দিকে ঘুম ভাঙ্গে এ বাড়ির বড় মেয়ে মাহভিন আহসানি অনুভার। সে আরমান আহসানি এবং আমিরা বেগমের রুমেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। হাতে এখনও একটি ছবির ফ্রেম, যেখানে আরমান সাহেব ও আমিরা বেগমের সাথে তাদের ছোট্ট দুই ছেলে। সে বেশির ভাগ সময়ই নিজের রুম, আর আমিরা বেগমদের রুমেই কাটায়। দুপুরে খেয়ে এসেছিলো। ড্রেসিংটেবিল গোছাতে গোছাতে ছবির ফ্রেমটা হাতে নেয়। কখন ঘুমিয়ে পড়ে বুঝতেও পারে না। শুধু আজ না, এমন আরো অনেক হয়েছে। সে উঠে বসে ছবিটা আরেকবার দেখে টেবিলে রেখে দেয়। পাশেই আরেকটি ফ্রেম, যার মধ্যে আরমান সাহেব তার দুই পুরনো বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছেন।

অনুভা খেয়াল করল রুমের দরজা খোলা। আরমান সাহেবের জুতা জোড়া দেখে বুঝল তার বড় আব্বু চট্টগ্রাম থেকে চলে এসেছে। ভাগ্যিস ছবির ফ্রেমটা ওড়নার নিচে ছিলো,নাহলে দেখে ফেলত।তার বিড়ালটা রুমের মধ্যে ছোটাছুটি করছে। এটা আরেক বেহায়া! সে যতক্ষণ বাহিরে না যাবে এটাও যাবে না। আবার তাকে বের হতে দেখলে তার আগে গিয়ে বসার ঘরে হাজির হবে। হলোও তাই। অনুভাকে বের হতে দেখেই এক দৌড়ে গেল বসার ঘরে।

বসার ঘরে তখন আরশাদ সাহেব ও নাফিসা বেগম বাদে সবাই উপস্থিত। উপরের দুই রুম পরিষ্কার করা হচ্ছে তাই তায়ান এখানেই বসে আছে। আরিজ বলেছে তার রুমে গিয়ে রেস্ট নিতে কিন্তু তায়ান রাজি হয়নি। তবে রিকোর ক্লান্ত লাগছে বলে আরিজের রুমে চলে গেছে।

তায়ান তখন সবার সাথে কথা বলায় ব্যস্ত। আচমকা একটি বিড়াল লাফিয়ে উঠে বসে তার হাটুর উপর। এমন কাণ্ডে কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই তায়ান বিড়ালটিকে ধরে এক ঝটকায় দূরে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। মেঝেতে পড়ে বিড়ালটা একটি চাপা কঁকানি দেয়। ঘটনাটা একদম সেকেন্ডের ভেতর ঘটে যায়। অনুভা দৌড়ে এসে বিড়ালটাকে কোলে তুলে নেয়। হাপাতে থাকা ছোট্ট শরীর দু'হাতে আগলে ধরে। সামনের দিকে না তাকিয়েই, নিজের বিড়ালের দিকে দৃষ্টি রেখে বলে,

‘আপনার তো সাহস কম নয়! আমার টিনটিনকে এভাবে ছুঁড়ে মারলেন কেন…’

বলতে বলতে থেমে গেল অনুভা। সম্মুখে বসে থাকা যুবকটির দিকে চোখ পড়তেই থমকে গেল রমনী! শিরশির করে উঠলো মেয়েটার শরীর। হৃদস্পন্দন যেন অকারণেই দ্রুততর হয়ে উঠলো। আজ অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছে সে। হয়তো সেই কারণেই চোখ তাকে ধোঁকা দিচ্ছে। ডান হাত দিয়ে চোখ দুটো আলতো করে কচলে আবার তাকাল সামনে। অদ্ভুত, এখনো একই ব্যক্তিকে দেখছে! কিন্তু এটা তো অসম্ভব! অনুভার ভ্রু কুঞ্চিত হলো। বিস্ময় আর অবিশ্বাসে তার দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল যুবকটির ওপর।

আরিজ বুঝতে পারলো মেয়েটা এখন কী ভাবছে। সে তার বিস্ময় ভাব কাটাতে এগিয়ে এসে বলল,

‘ঠিকই দেখছিস তুই। ফুটবলার টি.এইচ.ভি ওরফে তায়ান হারিস এখন আমাদের বাসায়। তায়ান ভাই ফিরে এসেছে অনু!’

✦ রাইটার'স নোট ✦


গল্পে তায়ান শুধুই একটি কাল্পনিক ক্যারেক্টার। বাস্তব কোনো ফুটবলারের সাথে মেলাতে যাবেন না। অন্যান্য গল্পে যেমন বিখ্যাত বিজনেস ম্যান, সিঙ্গার, নেতা, ইত্যাদি প্রফেশন থাকে তেমনি এখানে শুরুতে তায়ান'কে ফুটবলার হিসেবে দেখানো হবে।
বিজ্ঞাপন
রক্ত রেখার আড়ালে গল্পটি আয়েশা শেখ রিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে মোড়ানো থ্রিলার উপন্যাস