রক্ত রেখার আড়ালে

পর্ব - ১০

🟢

অনুভা রাজি হওয়ার পর স্বাভাবিক ভাবেই বিয়ের আয়োজন শুরু হয়ে যায়।কেউ আর এখানে বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। আরশাদ সাহেব একটু ঝামেলা করতে চেয়েছিলেন তবে নাফিসা বেগম তাকে থামিয়ে রেখেছেন।এর মধ্যে শান্তও অনেকবার চেষ্টা করেছে অনুভার সঙ্গে যোগাযোগ করতে।কিন্তু অনুভার ফ্রেন্ডের থেকে যখন শুনেছে তার বিয়ে রাফিদের সঙ্গে না বরং বিদেশ থেকে আসা তারই চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে,তখন আর যোগাযোগ করার চেষ্টা করেনি।হ্যাঁ,হয়তো তবুও করতো কিন্তু অনুভার ফ্রেন্ড জানায় অনুভা এই বিয়েতে অনেক খুশি।খুশি বললে ভুল হবে শান্তকে মেনে না নেওয়ার কারণই সেই চাচাতো ভাই।

রাফিদও এসে ঝামেলা করেছিলো সেটাও নাফিসা বেগম সামলে নিয়েছে। নাফিসা বেগমের হঠাৎ এমন পরিবর্তন দেখে হতভম্ব সবাই।আবার অনেক খুশিও।আরমান সাহেবের ধারনা মহিলাটা হয়তো নিজের ভুল বুঝতে পারছে।সব বাঁধা বিপত্তি পেরিয়ে আজ সন্ধায় অনুভা আর তায়ানের গাঁয়ে হলুদ।বিয়েটা কমিউনিটি সেন্টারে হলেও গাঁয়ে হলুদ ঘরোয়া ভাবেই হবে।এতে আবার তায়ানের কিছু শর্তও আছে।সে ক্যাপ,মাস্ক পড়ে বিয়ে করবে।তাকে দেখে ফেললে নাকি মানুষ বিরক্ত করবে।এটা শুনে সবাই প্রথমে অবাক হলেও,দ্বিমত করলেও, তায়ান বুঝিয়ে বলার পর মেনে নেয়।কিন্তু আরশাদ সাহেব বলে,

_“এটা কেমন কথা?লোকজন আসলে নতুন জামাইয়ের মুখ দেখতে চাইবে তখন কী ও মাস্ক পড়ে থাকবে?”

_“ও যেহেতু চাইছে তাহলে থাকুক।তোর কী?আমরা বলব আমাদের ছেলে এমন-ই।” আরমান সাহেব বলল।

আরশাদ সাহেব আরও কিছু যুক্তি দেয়।তবে আরমান সাহেব এটা সেটা বুঝিয়ে তাকে মানান।তায়ানের আরও একটা কথা শুনে সবার চোখ কপালে উঠে যায়।তা হলো,

_“আমার এখানে আলাদা বাড়ি আছে।অনুভাকে বিয়ে করে সেখানেই নিয়ে যাবো।” তায়ান বসার ঘরে এসে সবার উদ্দেশ্যে বলে।

_“তোর এখানে বাড়ি আছে মানে?কোথায় সেই বাড়ি?” আমীরা বেগম অবাক স্বরে বললেন।

_“আছে ঢাকাতেই।”

_“কবে কিনেছিস,কিছুই তো জানাস নি।” আমীরা বেগম বললেন।

_“এসেই কিনেছি।তোমাদের সার্প্রাইজ দেব বলে জানাইনি।”

_“কেমন বাড়ি তায়ান ভাই?নিশ্চয় অনেক সুন্দর?” অলি উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল।

_“উমম,তোমাদের পছন্দ নাও হতে পারে।” তায়ান ঠোঁট উল্টে বলল।

অনুভাও সেখানে উপস্থিত ছিলো কিন্তু কিছু বলেনি।তায়ান ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকে সবার সামনে তার সঙ্গে কথা বলতে লজ্জা পায় অনুভা।সেদিন তায়ানের ওমন আচরণের পর থেকে তায়ানের সঙ্গে কথা বলতেও তার অস্বস্তি হয়।অনুভা চুপচাপ খাচ্ছিল আর

ভাবছিলো। তায়ান অনুভার দিকে তাকিয়ে বলে,

_“যাবি না আমার সঙ্গে?”

অনুভা থতমত খায়,

_“ক-কোথায়?”

_“আমার বাড়িতে।”

আরমান সাহেব বলে উঠেন,

_“বাড়ি কিনেছ খুশি হয়েছি,তবে এখনই সেখানে থাকার দরকার নেই।”

তায়ান বাকি কথা বলতে না দিয়েই বলে,

_“না বাবা!আমার বউ আমার বাড়িতেই থাকবে।এখানে আসার পর তাকে অনেক কিছু সহ্য করতে দেখেছি।”

অলি অনুভাকে ছোট্ট করে চি*মটি কেটে ফিসফিস করে বলল,

_“বাব্বাহ্ বউউউউ!এখনি এত্ত ভালোবাসা!”

অনুভা টেবিলের নিচে পা দিয়ে খোট্টা মে'রে থামিয়ে দেয় অলি কে।অনুভা তখন আড়চোখে তায়ানকে দেখছিল একটু পর পর।সে আরও আগে কেন আসেনি?তাহলে হয়তো তার দুঃখ আগেই ফুরিয়ে যেতো।

—

অনুভাকে অলি হলুদের জন্য সাজিয়ে দিচ্ছে।তায়ানও নিজের রুমে তৈরি হচ্ছে।ফেডেরিকো তায়ানের বিছানায় শুয়ে তায়ানকে দেখছে।তায়ান গোল্ডেন কালারের একটা পাঞ্জাবি পড়ে চুল সেট করে নিচ্ছিলো।আয়নার মধ্যে রিকো কে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল,কী দেখছে।

রিকো শোঁয়া থেকে উঠে বসল।উদাস ভঙ্গিতে বলল,

_“বিয়ে করেই নিচ্ছো তাহলে?”

_“এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না?” তায়ান পেছন ঘুরে বলল।

_“হচ্ছে না।”

_“না হলে কিছু করার নেই।”

_“মাস্ক পড়বে না?”

_“আজকে বাহিরের কেউ থাকবে না।” তায়ান শরীরে পারফিউম দিতে দিতে বলল।

_“বিয়ে যে করছ..আমাদের যে ফিরতে হবে সেটা ভুলে গেছো?নাকি তুমি আর ফিরবে না?”

_“আফসোস রিকো তুমি এতোদিন আমার সঙ্গে থেকেও আমাকে চিনলে না।” তায়ান অসহায় কন্ঠে বলল।তারপর ড্রয়ার থেকে একটা ললিপপ মুখে গুজে রুম থেকে বের হয়ে যেতে যেতে বলল,

_“চলো দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

রিকো উঠে তায়ানের পিছু পিছু ছাঁদে গেল। ছাঁদে ছোট করে স্টেজ সাজানো হয়েছে।বাড়ির লোক ছাড়া কেউ সেখানে উপস্থিত নেই।বাড়ির সবাই উপস্থিত থাকলেও অনুভা ও অলি এখনো এখানে আসেনি।

নীলা তায়ানের মুখের ললিপপ দেখে বলল,

_“একদিনো ললিপপ দিলেন না তায়ান ভাইয়া।”

_“দেবও না।যাও গিয়ে খেলো।”

নীলা ভেঙচি কেটে চলে গেল।তায়ানকে দেখে আমীরা বেগমও উর্মিলা বেগম স্টেজের সোফায় নিয়ে বসিয়ে দিলো।

_“অনুভা আসুক তারপর এসব শুরু করো।” তায়ান বিরক্তি সুরে বলল।

_“ও এক্ষুনি আসবে।তুই বসে থাক।”

আরশাদ সাহেব একবার নিচে যাচ্ছেন,একবার ছাঁদে আসছেন।সে যেমন এই বিয়ে মানতে পারছে না,তেমনি না মেনেও উপায় নেই।তার স্ত্রী কেন এমন সিদ্ধান্ত নিলো জানা নেই তার।বিয়েটা মিটলে তারপর নাফিসা বেগমের সঙ্গে বোঝাপড়া হবে তার।

তায়ান বিরক্ত হয়ে সোফায় বসে আছে।পাশে আরিজ,রিকো,অনুভব এটা সেটা বলে গল্প করছে। ছাঁদের দরজার দিকে তাকাতেই তায়ানের বুকে ধক করে উঠলো।চোখ সরাতে চেয়েও পারল না।অনুভা আসছে।পাশের মেয়েটা বোধহয় অলি।তায়ান অলিকে দেখার প্রয়োজন মনে করল না।

এতো সুন্দর লাগছে অনুভাকে?এত্ত সুন্দর!না,বেশি সাজেনি।একদমই সাজেনি।শুধু লিপস্টিক,কাজল,আর কাঁচা ফুল।হলুদ আর টিয়া রঙের মিশ্রণে শাড়িটায় আরও বেশি ফুটিয়ে তুলেছে।সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হলে মেয়েটা হাসছে।তায়ান আসার পর থেকে অনুভাকে এমন ভাবে হাসতে দেখেনি।অনুভার কোলে তার বিড়াল।

তায়ান ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বুঝতেই পারল না অনুভা কখন তার পাশের সোফায় বসেছে।অলি তায়ানকে ডেকে বলল,

_“তায়ান ভাইয়া?ওদিকে কী দেখছেন,আপু তো এদিকে।”

তায়ান নড়েচড়ে উঠে পাশে তাকাল।গলা খাঁকারি দিলো।পাশে থাকা আরিজ,রিকো এক সঙ্গে হেঁসে উঠলো। অনুভাও মিটি মিটি হাসছে।তায়ানের দিকে তাকাতে পারছে না লজ্জায়।

একটু পর আরমান সাহেব ও আমীরা বেগম এসে হলুদ ছুঁয়ে দিলো তাদের দুজনকে।এরপর আরশাদ সাহেব ও নাফিসা বেগম। তারপর উর্মিলা বেগম ও আসাদুর আহসানি।

আরিজ আর রিকো এক সঙ্গে হলুদ দিতে চাচ্ছিল।তখন অলি রিকোকে সরিয়ে দিয়ে নিজে আরিজের সঙ্গে হলুদ দেয় তায়ান আর অনুভাকে।

ঘরোয়া ভাবে ছোট করে হলুদের আয়োজন শেষ হয়।

__

রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সবাই যে যার রুমে চলে যায়।অনুভাও নিজের রুমে চলে আসে।শাড়ি চেঞ্জ করার আগে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।কিছুই তো বলল না তায়ান ভাই তাকে দেখে।তাকে কী আজ সুন্দর লাগছে না?

নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলো অনুভা।এভাবে সে কখনো এর আগে দেখেছিল কিনা মনে পড়ে না তার।নিজের জীবন নিয়ে এতটা বিতৃষ্ণা ধরে গিয়েছিল যে কখনো চুলটাও ভালো ভাবে বাধতো না।

কে জানতো, তার নিস্তেজ আর বেরঙ জীবনে তায়ান এসে এক মুহুর্তে ভালোবাসার রঙ মিশিয়ে দেবে।তার কল্পনাতেও সে এমন কিছু ভাবেনি।সে ভেবেছিল তায়ান ভাই তার সপ্নের পুরুষ হয়ে দুরের খেলার ম্যাচ পর্যন্তই থেকে যাবে।আর সে টিভির পর্দার সামনে বসে বুকের গভীরে অজানা এক ব্যথা নিয়ে দেখে যাবে।

তার ভাবনার মাঝেই রুমের লাইট বন্ধ হয়ে গেল।আকস্মিক ঘটনায় অনুভা হকচকিয়ে পেছনে ঘোরে দেখে দরজা খোলা।বারান্দায় থেকে আসা মৃদু আলোয় পুরুষালী অবয়ব দেখে ভরকে ওঠে।

_“ক-কে?”

অবয়বটি কোনো রকম পূর্বাভাস না দিয়েই অনুভাকে নিজের সঙ্গে জড়িয়ে নিলো।ভারি শ্বাস ফেলতে ফেলতে অনুভার গলায় নাক,মুখ ডুবিয়ে দিলো।অনুভা প্রথমে চি*ৎকার করে উঠতে চেয়েছিল কিন্তু আগন্তুকের শরীরের ঘ্রান পেয়ে চিনতে পারে এটা তায়ান।সে কাঁপা কাঁপা হাতে তায়ানের পিঠে হাত রেখে বলল,

_“কী করছেন তায়ান ভাই।” তার স্বরও কাপছে।

তায়ান অনুভার কোমর জড়িয়ে আরও কাছে নিয়ে নেয়।অনুভার সর্বাঙ্গে বিদ্যুৎপৃষ্ঠের মত ঝাঁকুনি খেলে যায়।তায়ান অনুভার গলায় মুখ রেখেই হাস্কিটনে বলে,

_“তোকে আজকে এত সুন্দর লাগছে কেন?”

অনুভার কথা গলায় আটকে আছে।এটা বলার জন্য এভাবে আসতে হবে?

_“আপনি এটা বলতে এসেছেন?”

_“উমমম নাহ।”

_“তাহলে?”

_“তোকে আদর করতে এসেছি।আদর করতে দে।” তায়ানের শ্বাসজড়ানো কথা গুলো অস্পষ্ট শোনাচ্ছে।

অনুভা তায়ানকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে।মিছে রাগ দেখিয়ে বলল,

_“আমার এখন এসব লাগবে না।আপনি এখান থেকে যান তো।”

তায়ান অনুভার গলা থেকে মুখ তুলে অনুভার পানে তাকায়।

বিজ্ঞাপন

_“কিন্তু আমার লাগবে।আদর করবি না আমায় একটু?”

অল্প আলোতে তায়ানের মোলায়েম চুম্বকীয় চাহনি কত আকর্ষনীয় লাগছে তা কী সে জানে?অনুভা তায়ানের থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল,

_“আমাদের এখনো বিয়ে হয়নি তায়ান ভাই।কালকে হবে।চলে যান প্লিজ।”

_“তো কিহ?এডভান্স আদর করবি আজকে।” বলেই অনুভা কে পাজাকোলে তুলে নেয়।অনুভা তৎক্ষনাৎ তায়ানের গলা জড়িয়ে ধরে।তার চোখে মুখে আতংক ফুটে ওঠে।

ধীর কদমে অনুভার বিছানার কাছে এসে অনুভাকে সেখানে বসায়।তায়ান ঘন ঘন শ্বাস ফেলতে ফেলতে শার্টের বোতাম খুলতে হাত লাগায়।অনুভা তায়ানের পরবর্তী পদক্ষেপ বুঝতে পেরে।এক লাফে বেড থেকে নেমে তায়ানের হাত শার্টের বোতাম থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে,

_“না..না,এমন করবেন না।এটা ঠিক হবে না।” অনুভা অসহায় কন্ঠে বলল।

তায়ান আকুতি ভরা চোখে অনুভার দিকে তাকিয়ে আছে।বাংলাদেশের মেয়ের থেকে এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করাও যায় না।সে যেখানে এত বছর ছিলো,সেখানকার মেয়ে হলে তায়ান বলার আগেই স্বেচ্ছায় নিজের শরীর বিলিয়ে দিতো।অবশ্য সে সব মেয়ে তায়ানের পছন্দ না।

তায়ান কিছুক্ষন নিরব থেকে লম্বা শ্বাস ছেড়ে অনুভার গালে হাত রেখে বলল,

_“আচ্ছা ইটস্ ওকে।কিছু করব না।বোতাম দু'টো লাগিয়ে দে।” শার্টের দিকে ইশারা করে বলল।সে ইতিমধ্যে দুটো বোতাম খুলে ফেলেছিল।

অনুভা সম্মতি স্বরুপ মাথা নাড়িয়ে শার্টের বোতাম লাগিয়ে দিতে নেয়।তায়ান সুযোগ বুঝে অনুভার ঘাড়ের পেছন দিয়ে হাত রেখে মুহুর্তেই অনুভার ঠোঁট জোড়া নিজ আয়ত্বে নিয়ে নেয়।সঙ্গে সঙ্গে অনুভার বোতাম লাগানো হাত থেমে যায়।খা*মচে ধরে শার্টের সেই অংশ।তায়ান বেশি সময় নেয় না।ছেড়ে দেয় অনুভার ঠোঁট।অনুভা হাঁপিয়ে ওঠা শ্বাস ছেড়ে,চোখ রাঙিয়ে তায়ানের দিকে তাকায়।

তায়ান আবারও অনুভার গালে হাত রেখে একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলে,

_“এতোটুকু না পেলে ঘুম হতো না আজ।”

অনুভার দৃষ্টি নরম হয়ে যায়।সে তায়ানকে জড়িয়ে ধরে বলে,

_“আপনি আমাকে কখনো ছেড়ে যাবেন না তো তায়ান ভাই?”

_“উমম..যেতেও পারি বলা যায় না।” তায়ান সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলো।

_“মানে!” অনুভা তায়ানকে ছেড়ে দিয়ে অবাক স্বরে বলল।

_“এইযে এখন তোকে ছেড়ে নিজের রুমে যাবো।ছেড়েই তো যাচ্ছি।তুই তো আর আজ আমাকে কিছু দিবি না।” তায়ান ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে বলল।

তায়ানের ইঙ্গিতপূর্ন কথা শুনে অনুভার কান গরম হলে এলো।সে তায়ানের কথা শেষ হতেই বলল,

_“চলে যান এক্ষুনি।” তায়ানকে ঠেলে ঠুলে দরজার ওপাশে পাঠিয়ে দরজা লক করে দিলো।

___

পরদিন সন্ধায় সবাই কমিউনিটি সেন্টারে গেল।সেখানে শহরের বিভিন্ন বিজনেস পারসন সহ আহসানি বাড়ির সকল আত্মীয় স্বজনরা উপস্থিত।কিন্তু এমন জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশেও অনেকে একে অপরের সঙ্গে কানাঘুঁষা করছে।কারণ তায়ান নিজের শর্তানুযায়ী ক্যাপ মাস্ক পড়ে বিয়ে করতে এসেছে।সাথে কালো কোট,প্যান্ট।কোটের নিচের শার্টটাও কালো।নিজেকে কালোয় মুড়িয়ে সে বিয়ের মতো শুভকাজ করতে এসেছে।বাড়ির সবাই এটা স্বাভাবিক ভাবে নিলেও আত্মীয় স্বজনরা ভালো চোখে দেখছে না।সব থেকে বড় ব্যাপার হলো সে নিজের মুখটাও মাস্কের ভেতর লুকিয়ে রেখেছে।

কেউ তায়ানকে কিছু না বললেও অনুভা এবং আহসানি বাড়ির সবাইকে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।তায়ানের সে সবে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।সে ওয়েডিং স্টেজের রাজকীয় সোফাতে বসে ফোন চাপছে।অনেকেই এসে তায়ানের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছে।তায়ান ভেতরে ভেতরে বিরক্ত হলেও তা বুঝতে দিচ্ছে না।তার পাশেই অনুভা।পড়নে লাল রঙের ব্রাইডাল শাড়ি।সাথে ভারি ভাড়ি গহনা।তাদের এনগেজমেন্ট হয়েছিলো না,তাই এখানে এসে সবার আগে আংটি পড়ানোর পর্ব শেষ করে।অনুভা তায়ানের হাবভাব দেখে ধীর গলায় বলল,

_“ফোন রাখুন সবাই কী ভাবছে।” তায়ানকে উদ্দেশ্য করে বললেও অনুভার দৃষ্টি সামনে।

তায়ান ফোনে নজর রেখেই বলল,

_“তুই নিজের চিন্তা কর।”

_“কেন?”

_“এতো সেজেছিস কেন?এখন আমি এতক্ষণ নিজেকে কীভাবে সামলাবো?”

অনুভা কিছু বলতে চাইলো,কিন্তু সামনে থেকে এগিয়ে আসা অনাকাঙ্ক্ষিত একজনকে দেখে কথা আটকে গেল।শান্ত সহ সাথে তার দু'জন বন্ধু আসছে।অনুভা বিস্মিত চোখে তাদের দেখছিল।শান্তর সাথে দু'টো ছেলেকে অনুভাই আসতে বলেছিল।ভার্সিটির সিনিয়র হিসেবে।এছাড়াও তারা একই কোচিং-এ পড়তও।অনুভাকে পড়াশোনার দিক দিয়ে অনেক সাহায্যও করেছে।শান্তকে ইচ্ছে করেই বলেনি সে।বললেও আসবে না এই ভেবে।কিন্তু হঠাৎ তাদের দেখে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল অনুভা।অনুভাকে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে তায়ানও মাথা তুলে সামনের দিকে তাকাল।

শান্তর সাথে আসা ছেলে দু'টো অনুভার হাতে ফুলের বুকেট ধরিয়ে দিয়ে অভিনন্দন জানাল।শান্ত অনুভাকে বলল,

_“যদিও আমাকে আসতে বলোনি তবুও বেহায়ার মতো চলে এলাম।তোমাকে বউ রুপে দেখার সুযোগ মিস করব কেন?”

অনুভার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠলো।শান্তর প্রতি অনুভার কোনো ভালোবাসা নেই, কিন্তু কেন যেন মায়া কাজ করে ছেলেটার জন্য।দেখেই বোঝা যাচ্ছে ঠিকমতো খাওয়া,ঘুম তার হচ্ছে না।ভার্সিটির সবথেকে সুদর্শন যুবকটা সে আর নেই,সব উজ্জ্বলতা যেন ফুরিয়ে গেছে।

অনুভা জোরপূর্বক হেঁসে বলল,

_“ভেবেছিলাম বললেও আসবেন না।তাই বলিনি।এসেছেন অনেক খুশি হয়েছি।”

_“তুমি আমাকে বুঝতে পারলে তো হতোই মেয়ে।সে যাই হোক,তোমাদের দু'জনকে মানিয়েছে অনেক।”

অনুভা তায়ানের দিকে তাকাল।তায়ানও অনুভার সঙ্গে দাড়িয়ে পড়েছে।বোঝার চেষ্টা করছে শান্তর কথাবার্তা।শান্ত তায়ানের দিকে হ্যান্ডসেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে,

_“অভিনন্দন বড় ভাই।মাহভিনকে যত্নে রাখবেন,সে অনেক কোমল,তাকে কষ্ট দেবেন না।”

তায়ান হাত মিলিয়ে বলল,

_“বড় ভাইদের এসব শেখাতে হয় না।তারা জানে সব।তুমি অনুভার কী হও?”

_“তেমন কিছু না।” শান্ত বলল

তায়ান না বোঝার মত করে শান্তর দিকে তাকাল।শান্ত কিছু বলার আগেই অনুভা বলল,

_“উনি আমার ভাইয়া হন।শুধু উনি না সাথের দু'জনও।” পাশে থাকা দু'জনকে ইশারা করে বলল।সেই দুজনও তায়ানের সঙ্গে হাত মেলালো।

শান্ত অনুভার মুখে ভাইয়া সম্মোধন শুনতেই মনে মনে তাচ্ছিল্য হাসল।তারপর তায়ানকে ভালো ভাবে পরখ করে বলল,

_“তা বড় ভাই আপনি এরকম ভাবে বিয়ে করবেন নাকি?”

_“হ্যাঁ,তোমার সমস্যা আছে কোনো?”

_“এমদমই না।” এদিক ওদিক মাথা নাড়িয়ে বলল শান্ত।

শান্ত পকেট থেকে একটা ছোট্ট বক্স বের করে অনুভা আর তায়ানের সঙ্গে মেলে ধরল।বক্সের মধ্যে হীরের আংটিটা জ্বলজ্বল করছে।সেটা দেখে অনুভা প্রশ্ন চোখে শান্তর দিকে তাকায়।শান্ত মুচকি হেসে বলে,

_“এটা তোমার জন্য।কবে কিনেছিলাম মনে নেই।পড়লে খুশি হবো।”

অনুভা আড়চোখে তায়ানের দিকে তাকায়।মাস্কের ভেতর থেকে তায়ানের বিরক্ত ভরা চাহনি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।তা দেখে শান্ত বলল,

_“আরেহ আমি চাই এটা আপনি মাহভিনকে পড়িয়ে দিন।”

_“লাগবে না।আই অলরেডি ডিড ইট।” তায়ান গম্ভীর স্বরে বলল।

শান্ত দীর্ঘ শ্বাস ফেলে একটু হেসে বলল,

_“আচ্ছাহ…তাহলে আর কী করার।” বলে আংটি সমেত বক্স পকেটে রেখে দেবে তখনই অনুভা সেটা ছো মে'রে নিজের হাতে নিয়ে,তায়ানকে নিয়ে বলল,

_“এটাও পড়িয়ে দিন না তায়ান ভাই।”

তায়ান অবাক ও বিরক্ত চোখে অনুভাকে দেখল।কিন্তু কিছু বলল না।অনুভার কথা মতো পড়িয়ে দিলো আংটিটা।

___

অনুভা আর তায়ানের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। চারপাশ জুড়ে শুভেচ্ছা আর আনন্দের কোলাহল। সবাই ব্যস্ত নতুন দম্পতিকে অভিনন্দন জানাতে। অনুভা এক হাতে তায়ানের বাহু জড়িয়ে, হাসিমুখে একের পর এক ধন্যবাদ জানাচ্ছে সবার উদ্দেশে।

একটু দূরে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য একদৃষ্টে দেখছিল শান্ত। চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো তার। দৃষ্টি সরাতে চেয়েও পারল না। এদিক-ওদিক তাকিয়ে, ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল সে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার বন্ধু কাঁধে ভরসার হাত রাখল।

হঠাৎ করেই যেন ভেতরের জমে থাকা অনুভূতিগুলো আর ধরে রাখতে পারল না শান্ত। পাশ থেকে একটা গিটার তুলে নিল হাতে। আঙুল ছুঁতেই সুর ভেসে উঠল,

❝উথালি-পাতালি বুকে,

কী নেশা ধরালি চোখে।

কাপেরে কাপেরে বুক,

ধুকপুক ধুকপুক করে।

তোর পিরিতে পাগল হইলাম রে…

ওরে, তোর পিরিতে পাগল হইলাম রে…❞

শান্তর হঠাৎ এমন গানে সবাই অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে।তায়ান বারবার ছেলেটার উপর বিরক্ত হচ্ছে।তার আর বুঝতে বাকি নেই সে অনুভাকে পছন্দ করে।শুধু মাত্র এখানে কোনো ঝামেলা চায়না বলে কিছু বলছে না।

শান্ত নিজের মনে আকাশ সম যন্ত্রণা নিয়ে গানটা গাইলেও অনুভা আর তার বন্ধুরা ছাড়া কেউ বুঝল না তা।তার গান গাওয়া শেষে উপস্থিত সবার করতালির শব্দে মুখরিত হলো চারপাশ।শান্ত আর এক মুহুর্ত দেরি না করে বেড়িয়ে এলো সেখান থেকে।তার পেছন পেছন তার বন্ধুরাও গেল।শান্ত কমিউনিটি সেন্টার থেকে বেড়িয়ে এসে রাস্তায় থাকা গাছের মধ্যে ঘু*ষাতে ঘু*ষাতে পা*গলের মতো বলতে লাগল,

_“আজ ও অন্য কারও হয়ে গেল।ওর শরীর,মনের দখলদার অন্য কেউ নিয়ে নিলো।আমার মাহভিনকে আমি চিরতরে হারিয়ে ফেললাম।হারিয়ে ফেললাম আমার এতদিনের ভালোবাসা।আমার খুব কষ্ট হচ্ছে রে।আমি কীভাবে থাকব ওকে ছাড়া?”

শান্তর এক বন্ধু তর হাত ধরে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,

_“শান্ত হ তুই।তোকে এজন্যই আসতে নিষেধ করেছিলাম।”

আরেকজন সাথে তাল মিলিয়ে বলল,

_“তুই কিন্তু বলেছিলি কোনো রকম পা*গলামি করবি না।তাহলে এসব কেন করছিস?ও তোকে কখনো চায়ই নি।”

বিজ্ঞাপন
রক্ত রেখার আড়ালে গল্পটি আয়েশা শেখ রিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে মোড়ানো থ্রিলার উপন্যাস