রক্ত রেখার আড়ালে

পর্ব - ১৩

🟢

_“আমি আগেই বলেছিলাম।আগেই সতর্ক করেছিলাম।২৭ বছর ধরে একই কথা বলে আসছি।ওই ছেলে একদিন আমাদের সর্বনাশ করবে।ওই ছেলে আমাদের খেয়ে আমাদের পেটেই ছুরি ধরবে।দেখলেন তো ভাইজান?আজ আপনাকেই খু*নের অপবাদ দিচ্ছে!আমার মেয়ের সর্বনাশ করেছে!” আরশাদ আহসানি হুংকার করে বললেন।

তায়ান আরমান আহসানির ছেলে না এটা শুধু আরশাদ সাহেব, আসাদুর সাহেব জানতেন।আরমান আহসানি কখনও এমন কিছু হতেই দেয় নি।সে তায়ানকে এমন ভাবে বড় করেছে সবার ধারনা ছিল তায়ান তার সব থেকে প্রিয় ছেলে।সেখানে তায়ান এই বাড়ির ছেলে নয় এটা ভাবা তাদের কাছে অকল্পনীয়-ই ছিল। তারপর যখন ১৫ বয়সে বাড়ি থেকে চলে যায়,কী না করেছে তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য!

আরশাদ সাহেব আরও অনেক কিছুই বলে যাচ্ছেন।আরিজ প্রথমে অনুভার কথা তেমন গুরুত্ব না দিলেও আরশাদ সাহেবের কথায় বার-বার বিস্ফারিত হচ্ছে।তার বড় ভাই তার বাবার সন্তান না মানে?তার মায়ের আগে অন্য সংসার ছিল?তারা এতো কিছু লুকিয়েছে?বছরের পর বছর তারা মিথ্যা বলে এসেছে!এতো সত্য চাপা ছিল!এজন্যই কী মেজো চাচা,আর ছোট চাচা তায়ান ভাইকে পছন্দ করত না?আর খু'ন!বাবা তায়ান ভাইয়ের বাবা কে খু'ন করেছে মানে?কী বলছে অনুভা? আরিজ অস্থির হয়ে উঠলো।তায়ানের পর সেই এ বাড়ির বড় ছেলে।বাবা,চাচার ব্যবসায়িক কাজকর্মের বেশিরভাগ দায়িত্ব-ই সে পালন করে।তার থেকে এতো কিছু লুকানো হয়েছে?সে আরমান সাহেবের কাছে গিয়ে দাঁড়াল,

_“বাবা,অনুভা আর চাচা যা বলছে সত্যি?”

_“সত্যি।” আরমান আহসানি অনুভার দিকে তাকিয়ে বললেন।

_“তায়ান ভাইয়া আমার ভাই নয়?”

_“অবশ্যই সে তোমার ভাই!”

_“আপনার রক্ত নয়?”

_“না।”

_“আমার মায়ের এর আগেও বিয়ে হয়েছিল?”

_“হয়েছিল।”

_“তার আগের স্বামীকে আপনি খু'ন করেছেন?”

_“করিনি।”

_“তাহলে অনুভা কেন বলছে?কেন সত্য লুকিয়েছেন?কেন অনুভার আজকে এই অবস্থা?” আরিজ এতক্ষণ শান্ত ভঙ্গিতে সব প্রশ্ন করলেও এখন চিৎকার করে ওঠে।উপস্থিত সবাই চমকে যায়।শুধু আরমান সাহেব আর অনুভা আগের মতোই দাঁড়িয়ে।আরমান সাহেব একেবারের জন্যেও অনুভার থেকে চোখ ফেরায়নি।সে দেখছে।অনুভার ঠোঁট ফেটে শুকিয়ে ওঠা র*ক্ত দেখছে।কান্না ভেজা ফোলা,লাল চোখ দেখছে।আরিজের চিৎকারেও সে কোনো প্রতুত্তর করছে না।

অনুভা আরমান সাহেবের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,

_“আপনার অতিরিক্ত ভালোবাসা আজ আমার জন্য অভিশাপ হয়ে নেমে এসেছে। আপনি কেন আমাকে অলির থেকে বেশি ভালোবাসলেন বড় আব্বু?নাহলে তো আপনার পাপের শাস্তি হিসেবে আমাকে বেছে নিতো না।”

নাফিসা বেগম হঠাৎ এসেই অনুভার চুল মুঠো করে টেনে ধরলেন।আচমকা টানে অনুভার মাথাটা পেছনে হেলে গেল।

চোখেমুখে জমে থাকা জল আরও গড়িয়ে পড়ল।নাফিসা বেগমের চোখে জ্বলে ওঠা আগুন নিয়ে কন্ঠে বিষ মিশিয়ে বললেন,

_“খুব তো নাচতে নাচতে বিয়ে করেছিলি।এখন কী হলো? এক রাতেই শখ মিটে গেছে?”

অনুভা কাঁপা কণ্ঠে কিছু বলতে চাইতেই নাফিসা বেগম চুলের মুঠি আরও শক্ত করলেন।

_“চুপ! অনেক অহংকার তোর!” নাফিসা বেগম দাঁত চেপে বললেন।

_“রাফিদের সঙ্গে বিয়ে দিতে চেয়েছিলাম।সে নাকি খারাপ! চরিত্রহীন!তাহলে তোর সেই ‘নিষ্পাপ’ তায়ান ভাই তোকে এক রাতের পরেই ছুঁড়ে ফেললো কেন?”

নাফিসা বেগম আচমকা অনুভার গলার কাছে শাড়ির আঁচলটা সরিয়ে দিলেন। ঘাড়ের পাশে লালচে দাগগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল।

তিনি আঙুল তুলে সেগুলোর দিকে ইঙ্গিত করলেন, কণ্ঠে ঘৃণা আর বিদ্রুপ একসাথে নিয়ে বললেন,

_“লজ্জা করছে না?এভাবে বাপ-চাচার সামনে এসে দাঁড়াতে? এই দাগ নিয়ে কোন মুখে এ বাড়িতে পা রেখেছিস?”

অনুভার মনে হলো এই মুহুর্তে যদি মাটি ফেটে দু’ভাগ হয়ে যেত,সে নিঃশব্দে তার ভেতর ঢুকে পড়ত।কেউ তাকে না দেখুক,কেউ প্রশ্ন না করুক,কেউ আর তার দিকে এই চোখে না তাকাক।সে আসতো না এই বাড়িতে।দেখাতো না এই মুখ,এই শরীর।কিন্তু তার যে জানার ছিলো বড় আব্বুর পাপ কেন তাকে স্পর্শ করল।তার পাপের সাজা কেন তাকে ভোগ করতে হলো।

আমীরা বেগম এসে নাফিসা বেগমকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিলেন অনুভার থেকে।অনুভাকে নিজের বুকে টেনে বললেন,

_“আমার মেয়েকে আর একটা বাজে কথা বললে তোকে সবার আগে এই বাড়ি থেকে বের করব।”

_“চোরের মায়ের বড় গলা!ভুলে যাবেন না আপনার ছেলেই ওর এই হাল করেছে।”

আরশাদ সাহেব কাঁধের শক্তি ঝরিয়ে নাফিসা বেগমের গালে চ'ড় বসিয়ে দেন।অপ্রত্যাশিত আঘাতে নাফিসা বেগম কিংকর্তব্যবিমূঢ়।আরিজ যেন এটাই চাইছিল।আরশাদ সাহেব কিছু না বললে সেই হয়ত অনুভাকে এত কথা শোনানোর জন্য গাঁয়ে হাত তুলে বসত।

আরশাদ সাহেব রাগে গর্জে উঠে বললেন,

_“তোর জন্য সব হয়েছে।তুই যদি রাফিদের সঙ্গে বিয়ে বন্ধ না করতি এইসব কোনো কিছুই হতো না।”

নাফিসা বেগম চ'ড় খেয়ে স্বামীর দিকে অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে আছে।বিয়ের পর সব সময় সে আরশাদ সাহেব কে নিজের মন মতো চালিয়েছে।আরশাদ সাহেবও নাফিসা বেগমের কথা মতোই সব কিছু করেছে।আজ প্রথম বার সেই মানুষের হাতে চ'ড় খেয়ে হজম করতে পারল না।রাগে,দুঃখে কেঁদে ফেলল।কন্ঠে তেজ আর অসহায়ত্ব নিয়ে বললেন,

_“আপনার ভাইয়ের ছেলে আমাকে হুমকি দিয়েছে।বন্দুক ঠেকিয়ে ভয় দেখিয়েছে।আমি যদি এই বিয়ে বন্ধ না করতাম আমার বাপের বাড়ির এক জনকেও জীবিত রাখত না।ওই ছেলে আস্থা একটা গু*ন্ডা।রাফিদকে ওই মে'রে হসপিটাল পাঠিয়েছিল।আমার বাপের বাড়ির চারপাশে ছদ্ম লোক রেখেছিল,আর বলেছিল আমি মুখ খুললেই সবাইকে মে'রে ফেলবে।আমি কী করতাম? এই অপয়া মেয়ের জন্য নিজের পরিবার হারাতাম?”

আমীরা বেগম নিজের ছেলের একের পর এক কুকীর্তি শুনে বাকরূদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।আরশাদ সাহেবও স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন। হলরুমে উপস্থিত সবার মধ্যেই নিরবতা নেমে এলো।নিরবতা ভেঙে নাফিসা বেগম আবারও বললেন,

_“ওই ছেলে অনেক বড় সন্ত্রাস।নাহলে…”

_“উহহু!আ'ম আ গ্যাংস্টার...গ্যাংস্টার অফ বুয়েনোস আইরেস।”

পুরুষালী, ধারালো কণ্ঠ শুনতেই হলরুমের সবাই সদর দরজার দিকে তাকাল।দরজার পাশে পকেটে দু’হাত চেপে সটান দাঁড়িয়ে আছে তায়ান।পেছনে এক পাশে এলেনা,আরেক পাশে রিকো।তাদের আরও পেছনে কালো পোশাকধারী কয়েকজন গার্ড।তায়ান নাফিসা বেগমের কথার উত্তর দিলেও তার দৃষ্টি অটল সরাসরি আরমান আহসানির দিকে।চাহনি কাঁচের মত শীতল,স্থির নিরব।অনুভা একবার পেছন ঘুরে তায়ানকে দেখল।যার চোখে প্রতিশোধের বিভীষিকাময় আগুন ছাড়া আর কিছু নেই।

আরিজ যেন চিনতে পারল না নিজের ভাইকে।কালকে রাতের সেই উষ্ণ,কোমল চাহনির মানুষটার চাহনি আজ এত অচেনা কেন লাগছে তার কাছে!এত ভয়ানক কেন তার মুখের ভঙ্গিমা?সে তায়ানের কাছে যাওয়ার আগেই আরমান সাহেব ছুটে গেল তায়ানের কাছে।

_“কে তোমার মাথায় এগুলো ঢুকিয়েছে?কার কথায় তুমি এই ভয়ংকর খেলায় নেমেছ?”

_“আমি এখন সেই দু'বছরের ছেলে নেই যে, যে যা বোঝাবে সেটাই করব। বা’পের খুনি কে বাপ ডাকব!” কথাটা বলেই বিদ্রুপ হাসল তায়ান।

আমীরা বেগম হনহনিয়ে এসে তায়ানে গালে চ'ড় বসিয়ে দেয়।তায়ানের মুখ হালকা পাশের দিকে ঘুরে যায়।চোখ বন্ধ করে রাগ সংযত রাখার চেষ্টা করে।

_“কাকে কী বলছিস তুই?যে তোকে কোনো দিন বাপের অভাব বুঝতে দেয়নি তাকে খু'নি বলছিস?” আমীরা বেগম চি*ৎকার করে উঠলেন।

_“হ্যাঁ,হ্যাঁ বলছি।কারণ এই মহান লোকই আমার বাবা এবং আমার পরিবারের খু'নি।নরপিশাচ উনি!”

আমীরা বেগম আবারও তায়ানকে আঘাত করার জন্য হাত উঠায়।কিন্তু তার হাত তায়ানের গাল পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই তায়ান মায়ের হাত শক্ত করে ধরে ফেলে।ধা’ক্কা মেরে সরিয়ে দেয় তাকে।পেছনে আরমান আহসানি থাকায় মেঝেতে পড়ে যায়নি।তায়ান মায়ের দিকে বিদ্রুপ করে বলল,

_“তুমি তো আরেক দুশ্চরিত্রা, মা!নাহলে নিজের স্বামীর বন্ধুর সঙ্গে সংসার সাজাতে?”

তায়ানের কথায় আরেক দফা বিস্ফোরিত হলো হলরুমের সবাই।হ্যাঁ,এই সব আরশাদ আর আসাদুর সাহেব জানাতেন।কিন্তু আরিজ, অলি, নাফিসা বেগম, উর্মিলা বেগম তারা জানাতেন না।তারা আজ এমন সত্যের মুখোমুখি হয়ে হতবাক হয়ে উঠছে।

আমীরা বেগম অবিশ্বাস্য চোখে তায়ানের দিকে তাকিয়ে আছে।নিজের ছেলের থেকে সে এমন জঘন্য কথা শুনবে কখনো স্বপ্নেও ভাবে নি।স্ত্রী কে অসম্মান করে কথা বলায় আরমান সাহেব এবার রেগে গেলেন।সে গর্জন করে বললেন,

_“তায়ান!তুমি ভুলে যাচ্ছ উনি তোমার মা।তোমার বাবা কে আমি খু'ন করিনি সে আমার বন্ধু ছিল…”

_“বন্ধুকে খু'ন করে তার স্ত্রী সন্তানকে কেড়ে নিয়েছেন তাই তো?” তায়ান আরমান সাহেবের কথা থামিয়ে দিয়ে বলল।

_“ভুল জানো তুমি,যে বা যারা তোমাকে এসব বলেছে মিথ্যা বলেছে।না আমি আমার বন্ধুকে খু'ন করেছি,না তার পরিবার কে কেড়ে নিয়েছি।সে তো আমার সব ছিল।আমার জানের বন্ধু!”

শেষের কথায় আরমান সাহেবের কন্ঠ কাপল।সে আবারও বললেন,

_“তোর বাবাকে অজ্ঞাত কোনো শত্রুরা মে'রে ফেলে।সেদিন ছিল তোর মা আর বাবার বিবাহ বার্ষিকি।সেখানে…”

_“আহহ…থামুন!বন্ধ করুন এই মিথ্যা নাটক।” তায়ান দু'হাতে নিজের চুল খামচে ধরে বলল।

_“আপনি আমার বাবাকে খু'ন করেছেন।আপনি করেছেন। আপনি।”

এলেনা এসে তায়ানের কাঁধ ধরে বলল,

_“এতো হাইপার হোস না ভিকি।এদের তাড়াতাড়ি বাড়ি থেকে বের কর।”

_“বাড়ি থেকে বের করবে মানে?তোমরা বের হও এখান থেকে।” আরশাদ সাহেব বললেন।

_“আমরা না আপনারা বের হবেন।এই মুহুর্তে বের হবেন।কারণ বাড়িটা এখন আর আপনাদের নেই।” তায়ান বলল।

তায়ানের কথায় সবাই প্রশ্নচোখে তার দিকে তাকাল।এলেনা কিছু কাগজ বের করে আরশাদ সাহেবের দিকে ছুরে মারে।সেগুলোতে ভালো ভাবে নজর বোলাতেই আরশাদ সাহেবের মুখের রঙ বদলে যায়।শ্বাস ভারি হয়ে ওঠে তার।একবার তায়ান, একবার কাগজ গুলো দেখছিল সে।তাকে এভাবে স্তব্ধ হয়ে থাকতে দেখে আরিজ এসে কাগজ গুলো নিয়ে নেয়।দেখা মাত্র সে নিজেও থমকে যায়।

_“দেখা শেষ? এবার বেড়িয়ে যা এই বাড়ি থেকে।” তায়ান বলল।

_“ভাইয়া!” আরিজের কন্ঠে বিস্ময়।

_“বের হ।”

—--------

তায়ান আহসানি বাড়ির যত সম্পত্তি,তাদের বিজনেসের সকল মালিকানা নিজের নামে করে নিয়েছে। কীভাবে করল, কবে,কখন এ বাড়ির কেউ টের পায়নি।আহসানি বাড়ির যত গুলো অফিস ছিল সব গুলোই এখন তায়ানের নিয়ন্ত্রণে চলবে।এ বাড়ি সহ আরও দুটো বাংলো ছিলো সেগুলোও এখন তায়ানের অধিনে।তায়ান তখন সেগুলোর কাগজই দেখাচ্ছিল।

তায়ান এখন চলে গেছে।বিকালের মধ্যে এ বাড়ি ছাড়ার কথা বলে গিয়েছে।আরশাদ ও আসাদুর সাহেব এগুলো নিয়ে তর্ক করলেও আরমান সাহেব আর আরিজ কোনো তর্ক করেনি।তায়ান যাওয়ার আগে আরমান সাহেব শুধু এতটুকু জিজ্ঞেস করেছিল,

_“আচ্ছা,তোর রাগ তো আমার উপর তাহলে আমার মেয়ের সাথে কেন এমন করলি?কেন ওর ভাঙ্গা হৃদয় পূনরায় ভাঙলি?ও তো এসব কিছু জানতোও না।”

_“সত্যিই ওর কোনো ভুল নেই।ভুল তো আপনার।ছোট বেলায় দেখতাম ওর প্রতি আপনার একটু বেশিই টান ছিল।বাড়ির বাচ্চাদের মধ্যে ওকেই বেশি প্রায়োরিটি দিয়েছেন।আজকের পর থেকে যত বার ওর দিকে তাকাবেন ততবার নিকের কুকীর্তির কথা মনে পড়বে।

আমি আইন মানি না।আমি আমার প্রতিশোধ আইনের মাধ্যমে নেব না।আপনাদের এতো সহজে মে'রেও ফেলব না।দুনিয়াতে রেখেই যন্ত্রণা ভোগ করাব।আপনি আমার পরিবার একদিনে আমার বংশ নির্বংশ করেছেন, আমি বছরের পর বছর এই যন্ত্রণা ভোগ করাব।”

_“তুই যা খুশি করতে পারিস।কিন্তু এটাই সত্য যে আমি আমার বন্ধুকে খু’ন করিনি।আমরা তিন বন্ধু ছিলাম, একজন এখনও নিখোঁজ।সে থাকলে আজ তোর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতো।আফসোস তোর বাবার মৃত্যুর পর তাকেও আমি হারিয়ে ফেলেছি।খোদা একদিন না একদিন সত্যিটা সবার সামনে আনবে।আমি ভাবছি সেই ভয়ংকর দিনের কথা,সহ্য করতে পারবি তো?”

আরমানের সাহেবের কথায় তায়ান রহস্যময়ী হাসি দেয়,

_“আমার সহ্য করার ক্ষমতা অনেক বেশি আঙ্কেলল।আপনি আপনার মেয়ে সমতুল্য ভাতিজীর এই করুন দসা কীভাবে সহ্য করবেন সেটা ভাবুন।আর বিকালের মধ্যে এই বাড়ি আমি খালি দেখতে চাই।”

তায়ানের মুখে প্রথম বার আঙ্কেল শুনে বোধহয় কষ্ট হলো আরমান সাহেবের।বুঝতে দিলো না সে।আজ তার হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত।

বিজ্ঞাপন

তার দুটো দায়িত্ব ছিল।একজন তায়ান, অন্য জন অনুভা।তায়ানের বাবা মারা যাওয়ার সময় দু'বছর বয়সি তায়ানের দায়িত্ব সে আরমান সাহেবের কাছে রেখে যায়।বন্ধুর কথা রাখতেই সে তায়ানকে কখনো নিজের অতীত বুঝতেও দেয়নি। নিজের ভাইদের শত রকমের কথা শুনে সে তায়ানকে বড় করেছে।সেই ছেলে বাড়ি থেকে হারিয়ে যাওয়ার পর পাগলের মতো খুঁজেছে।তায়ানকে শুধু ছেলে হিসেবে নয় নিজের বন্ধু সৃতি হিসেবে দেখত।ছেলেটা যে দেখতে তারই কিশোর বয়সি বন্ধুর প্রতিছবি।

অনুভার নানাও একই ভাবে অনুভাকে তার হাতে তুলে দিয়ে যায়।যদিও অনুভার মা মা-রা যাওয়ায় মেয়েটাকে সে বেশিই ভালোবাসত, তবে তার নানা আরশাদ সাহেবকে রেখে আরমান সাহেবকে ভর্ষা করে সব কিছুর দায়িত্ব তাকে দিয়ে যান।তার শেষ কথা ছিল ‘আমার নাতনির চোখের পানি আমার সহ্য হয় না।তুমি বেঁচে থাকতে ওর চোখে পানি ঝরতে দিও না।’

আজ সেই তায়ানের জন্য অনুভা বেঁচে থেকেও ম'রে গেল।সে কিছুই করতে পারেনি, সে কোনো দায়িত্বই পালন করতে পারেনি।না, তায়ানকে মানুষ করতে পেরেছে,না অনুভাকে ভালো রাখতে পেরেছে।

—

ওয়াশরুমের ঝর্ণা হতে অনবরত পানি পড়ছে।মেঝেতে হাঁটুর উপর মুখ গুঁজে বসে আছে অনুভা।লম্বা চুল গুলো মেঝেতে ছড়িয়ে আছে।চোখ থেকে ঝরে আসা জল আরেকটি ঝর্ণার মতো,কিন্তু এটি অন্তরের।প্রতিটি ফোঁটা অন্তরের ব্যথা নিয়ে গড়িয়ে আনছে।ভিষণ শব্দ করেই কাঁদছে সে।কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠছে।যেন সে চাইছে ঝর্ণার পানিতে শরীর থেকে সকল সৃতি মুছে যাক,আর চোখের পানির মাধ্যমে ভেতরের সকল কষ্ট ফুরিয়ে যাক।

কাঁদতে কাঁদতে দম আটকে আসে তার।চোখের পাতা ফুলে ভাড়ি হয়ে উঠেছে।কতক্ষণ ধরে এভাবে বসে আছে জানা নেই।যেতে হবে এখন।বিকেলের মধ্যে এই বাড়ি ছাড়তে হবে তাদের।তারপর কোথায় যাবে,কী করবে কেউ জানে না।তায়ান ইতিমধ্যে তাদের নিঃস্ব করে দিয়েছে।

অনুভা ধীর গতিতে উঠে দাঁড়াল।শাড়ী বদলে একটা চুড়িদার পড়ে নিলো।নীল শাড়ী সে আর কোনো দিন পড়বে না।এটা তার জন্য অভিশাপ।নীল শাড়ী কেন কোনো শাড়ীই সে আর পড়বে না।সে কাপড় বদলে ওয়াশরুম থেকে বেড়িয়ে এলো।লাগেজে যা না নিলেই নয় তা তুলে নিলো।নার নড়চড় আত্মা বিহীন রোবটের মতো।নিস্তেজ শরীর,নিস্তেজ চোখের দৃষ্টি।না চাইতেও চোখ দিয়ে জল বেয়ে পড়ছে।

সে ধীরে ধীরে বালিশের নিচে হাত দিলো, বের করল তায়ানের সব ছবি। তারপর ক্লজেটের খোঁজে আরও কিছু ছবি বের করল। তায়ানকে নিয়ে লেখা সেই ব্যক্তিগত ডায়েরিটাও হাতে এল। রুমের প্রতিটি কোণ থেকে লুকানো সব ছবি সে খুঁজে খুঁজে একত্র করল।

মেঝেতে ছড়িয়ে দিয়ে সে এক মুহূর্তও সময় নিলো না। আগুন জ্বালিয়ে দিল চুপচাপ।ধূম্রজ্বালার মতো ছড়িয়ে গেল শিখাগুলো। সব ছবি, সব স্মৃতি, সব মুহূর্ত,একসাথে জ্বলে গেল। শিখার সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়ল দীর্ঘদিন ধরে আঁকড়ে ধরা অনুভূতিগুলোও। ছবির সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে গেল সমস্ত ভুল বিশ্বাস।অথচ এই ছবি গুলোই একসময় তার দিনের শুরু আর রাতের শেষ ছিল।

আগুন নিভে গেলে মেঝেতে পড়ে রইল শুধু ছাই। সেই ছাইয়ের ভেতর ছড়িয়ে আছে তার অপেক্ষাগুলো।ছাইয়ের দিকে তাকিয়েই অনুভা আবার ফুপিয়ে ওঠে। যদি তায়ান তাকে স্বপ্ন না দেখাত, যদি বিশ্বাসের হাত বাড়িয়ে না দিত, তবে হয়তো এই কষ্টের ভার বইতে হতো না।সে তো কখনও কিছু চায়নি। কোনো দাবি ছিল না, কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষাও না। যে আশা সে করেনি, সে আশা ভেঙে যাওয়ার ভয়ও ছিল না।চুপচাপ অপেক্ষা করেই হয়তো পুরো জীবন কাটিয়ে দিতে পারত।কিন্তু সে কেন তাকে আলো দেখাল ? কেন বিশ্বাসের প্রদীপ জ্বালিয়ে আবার নিজ হাতেই নিভিয়ে দিলো?কেন সে একটা খেলার গুটি হলো?অনুভা আবারও হেঁচকি তুলে কাঁদতে থাকে।মেঝেতে পড়ে থাকা ছাইয়ের দিকে নিস্তেজ চোখে তাকিয়ে আছে সে।ঠিক তখনই, নীরবতার ফাঁক গলে দূর থেকে মৃদু আওয়াজে একটি গান ভেসে আসে,

❝আমার সবটুকু বিশ্বাস,যে দিয়েছে ভেঙে..

তাকে কৃতজ্ঞতা জানাই..সে যে দিয়েছে আমায়…

অন্ধ চোখে আলো।

যার বিশালতার মাঝে,আমি একটুকু পাইনি ঠাই…

তাকে কৃতজ্ঞতা জানাই..সে যে দিয়েছে আমায়…

মহাশূন্যে আশ্রয়।❞

গানের কথাগুলো যেন সরাসরি অনুভার বুকের ভেতর আঘাত করে।ছাই হয়ে পড়ে থাকা অপেক্ষাগুলোর ওপর দিয়ে শব্দগুলো গড়িয়ে যায়। প্রতিটি লাইন তার ভাঙা বিশ্বাসের ভাষা হয়ে ওঠে, প্রতিটি সুর তার নিঃশ্বাসের সঙ্গে মিশে যায়। অনুভা ঠোঁট কামড়ে চোখ বন্ধ করে।কিছুক্ষন সেভাবে বসে থেকে লাগেজ নিয়ে বের হয়ে আসে।

–

নিচে হলরুমে সবাই অনুভার জন্য অপেক্ষা করছে।নাফিসা বেগম আরশাদ সাহেব ও অনুভবকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেছে।অনুভাকে নিচে নামতে দেখেই আরমান সাহেব সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলেন,

_“চলো এখন।” বলে সে সদর দরজার দিকে আগায়।

আমীরা বেগম ছলছল চোখে পুরো বাড়িটা পরখ করেন।কত সৃতি এখানে!তার সাজানো সংসার।যেটা কিনা তার নিজের পেটের সন্তানই কেঁড়ে নিলো।উর্মিলা বেগম গুনগুন করে কাঁদছে।এজন্য আসাদুর সাহেব কয়েকবার ধমকেছেও।অলিও কাঁদছিল।কিন্তু অনুভাকে দেখে কান্না থামিয়ে তার হাত ধরে।অনুভার বিড়ালটা অলির হাতে।নীলা এ বাড়ি ছেড়ে যেতে চাইছে না।অবুঝের মত কান্না কাটি করে এটা ওটা বলে যাচ্ছে।আরিজ তখনই বের হয়ে গেছে, যখন তায়ান মুখের উপর বের হয়ে যেতে বলেছে।

আরমান সাহেবের কী কষ্ট হচ্ছে না?সবার সামনে শক্ত থাকলেও আমীরা বেগম জানে লোকটা ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছে।তার কষ্ট গড়া সব কিছু আজ শেষ হয়ে যাচ্ছে।তবু লোকটা কাউকে কিছু বুঝতে দিচ্ছে না।

আরমান সাহেব আবারও তাড়া দিতেই আমীরা তারা বের হয়ে যায়।কিন্তু অনুভা আগের মতই দাঁড়িয়ে থাকে।অলি অনুভাকে বলে,

_“চলো আপু ওরা আবার চলে আসলে অপমান করবে।”

_“তোর কষ্ট হচ্ছে না, অলি?” অনুভা খুব ধীর গলায় বলল।

_“তোমার তুলনায় তা কম।”

অনুভা বাড়িরটার দিকে ভালো ভাবে নজর বোলালো।এ বাড়িতে তার সুখের চেয়ে দুঃখের সৃতি বেশি আছে।বড় আব্বু তাকে আগলে রাখলেও নিজের বাবা আর সৎ মায়ের অবহেলা থেকে তাকে কেউ বাঁচাতে পারেনি।সে এগুলো ভেবে তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,

_“চল।”

দু'জনে সামনে এগুতেই তায়ান সামনে পড়ল।সে মাত্রই এসেছে।তায়ানের দৃষ্টি অনুভার দিকে।অনুভা চোখ তুলে তায়ানের দিকে তাকাতেই সে চোখ সরিয়ে নেয়।তবু অনুভা তায়ানের মুখোমুখি হয়।এগিয়ে যায় তার দিকে।অলি ওদের পাশ কাটিয়ে চলে যায়।

অনুভা তায়ানের সামনে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে।তার দৃষ্টিতে কোনো কোমলতা নেই,উজ্জ্বলতা,ঘৃণা কিচ্ছু নেই।অনুভা সামনে এসে দাঁড়াতে তায়ানের বোধহয় অস্বস্তি হচ্ছে।চোখে চোখ রাখতে পারছে না সে।

_“সরে যা সামনে থেকে।”

_“আমার দিকে তাকাচ্ছেন না কেন?অনুশোচনার ভয়ে?” অনুভা বলল।

_“তায়ানের কখনও কোনো কিছু নিয়ে অনুশোচনা হয় না।”

_“জানোয়াররা তো এমনই হয়!”

_“অনুভা!” তায়ান জেদ দেখিয়ে অনুভার দিকে তাকাল।তার নিভে যাওয়া আগুন আবার জ্বলে উঠে।

অনুভা সেগুলোর পরোয়া না করে বলল,

_“আমি আপনার জীবনের একমাত্র অধ্যায়,যেটা আপনি ইচ্ছে করেই অসম্পূর্ণ রেখে গেলেন।আর সেই অপূর্নতার দায়ে একদিন আমার চেয়েও বেশি ছটফট করবেন।" বলে আর এক মুহুর্ত দাড়াল না।তায়ানকে পাশ কাটিয়ে লাগেজ হাতে বেড়িয়ে এলো।তায়ান ঘাড় ঘুড়িয়ে অনুভার যাওয়ার পানে তাকায়।তার দৃষ্টি গম্ভীর,থমথমে। অনুভা একটু সামনে যেতেই তার পা জোড়া থেমে যায়।শেষ বারের জন্য নিজের স্বামী নামক বিশ্বাস ঘাতককে দেখার প্রয়াসে পেছনে তাকায়।তায়ান নিজেও পেছনে তাকিয়ে ছিল, তাই দুজনের চোখে চোখ পড়ল।অনুভার হৃদয় জীর্ণ বেদনায় কেঁপে উঠল।তার কান্না ভেজা, ফুলে ওঠা, লাল চোখ দিয়ে আবারও জল গড়িয়ে পড়ল।অনুভার হৃদয় চিৎকার করে বলতে চাইছে,

❝আমি রাধা মইরা যাইমু..

কৃষ্ণ হারা হইয়া রে..

ভ্রমর কইও গিয়া।❞

অনুভা ডান হাতের পিঠ দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে আবারও হাটা ধরল।

_আপনাকে তো আমি আমার জীবনের আলো হিসেবে গ্রহন

করেছিলাম।আপনি কেন সেই আলোর সাথে আগুন বয়ে নিয়ে এলেন?যে আগুনে আমাকে পোড়ালেন,সেই আগুনের তাপ আপনি সহ্য করতে পারবেন তো?যে তাপে আমার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেল, সে তাপ কি এক মুহূর্তও আপনাকে ছুঁয়ে যাবে না?আপনার বিবেক কি একটিবারও কেঁপে উঠবে না?নাকি সব ছাই হয়ে গেলে, আপনি নির্বিকার হয়ে বলবেন,এ তো আমারই প্রাপ্য ছিল?

এসব অগণিত প্রশ্ন বুকে চেপে রেখে অনুভা আহসানি বাড়ির ফটক পেরিয়ে বের হয়ে এলো।

—-----

মাঝখানে দু’দিন কেটে গেছে।রাতের তখন মধ্য প্রহর।স্ট্রিট লাইটের আলোতে এলোমেলো পায়ে হাটছে শান্ত।হাঁটছে বললে ভুল হবে।রাস্তায় পড়ে থাকা একটা পরিত্যক্ত বোতলে পা দিয়ে ঠেস দিচ্ছে।আর এগিয়ে যাচ্ছে।বোতল যেদিকে যাচ্ছে সেও সেদিকে এগোচ্ছে।হাতে জলন্ত সিগারেট।চুলগুলো উষ্কখুষ্ক।চোখের নিচের কালো দাগ আরও বেড়ে গিয়েছে।গালেও কয়েকটা ব্রন বেড়িয়েছে।যে কেউ দেখলে বুঝবে নির্ঘুম রাত কাটায় সে।হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল শান্ত।রাস্তার চারপাশে চোখ ঘুরিয়ে দেখল।দুরে একটা কুকুর ছাড়া আসে পাশে কিচ্ছু নেই।পাশের বিল্ডিংয়েরই এক ফ্লাটে সে থাকে।

সিগারেটে লম্বা একটা টান নিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করল।রাত তিনটা পয়ত্রিশ বাজে।তার মায়ের নাম্বার থেকে কয়েকটা মিসড্ কল এসে আছে।সন্ধা বেলায় দিয়েছিল ইচ্ছে করেই ধরেনি সে।এখন নিজেই কল করল।

ফ্রান্সে তখন সম্ভবত রাত এগারোটা পয়ত্রিশ বাজে।একবার রিং হতেই কল ধরেন শান্তর মা শাহানা বেগম।কল ধরতেই ওপাশ থেকে শাহানা বেগমের উদ্বিগ্ন কন্ঠ ভেসে আসে,

_“কল ধরিস না কেন,শান্ত?কী হয়েছে তোর আজকাল?মা-বাপকে কী দিন দিন ভুলে যাচ্ছিস?”

_“সরি মম!ব্যস্ত ছিলাম।” শান্ত ছোট করে বলল।

_“এত রাতে কী করছিস,ঘুমাস নি?”

_“ঘুম আসে না।”

_“কেন ঘুম আসে না? কী নিয়ে দুশ্চিন্তা করিস?” শাহানা বেগম বললেন।

_“দুশ্চিন্তা করার জিনিসটাই যে হারিয়ে গেছে।” শান্ত আনমনে বলল।

শাহানা বেগম বুঝল না শান্তর কথা।

_“কী বললি শুনিনি?”

_“কিছু না মম।আমি ফ্রান্সে চলে যেতে চাই।পাপাকে ব্যবস্থা করতে বলো।”

শাহানা বেগম বোধহয় খুশি হয়ে গেলেন।শান্তর বাবা অনেক বছর ধরেই ফ্রান্সে, শাহানা বেগম গিয়েছে তিন বছর ধরে।এছাড়াও তাদের নিকট আত্মীয়রা একেকজন ইউরোপ বা আমেরিকার একেক দেশে আছেন।শুধু মাত্র তার ছেলে শান্ত বাংলাদেশে রয়ে গেছে।শাহানা বেগম ও শান্তর পাপা ইয়াসির খান বোঝাতে বোঝাতে ক্লান্ত হয়ে গেছে তবু শান্ত নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিল।আজকে হঠাৎ ছেলের মুখে এই কথা শুনে অবাক হবে নাকি খুশি হবে বুঝতে পারছে না।

_“সত্যি বলছিস?কিন্তু তোর তো ইউনিভার্সিটির এক্সাম আছে।দু’বার ফেইল করেছিস এবার এক্সাম না দিয়েই চলে আসবি?”

_“বাদ দাও সেগুলো।আমি ইচ্ছে করেই ফেইল করেছিলাম।” শান্ত নির্বিকার বলল।

_“কিহহ!ইচ্ছে করে ফেইল করেছিস মানে?”

_“হ্যাঁ ইচ্ছে করেই করেছি নাহলে ফ্রান্সে যাওয়ার জন্য জোর করতে।”

_“তোর ওখানে কী এমন কাজ যে এগুলো করেছিস?”

_“তখন কারণ ছিল এখন আর নেই।”

কারণটা ছিল মাহভিন।তাকে চোখের সামনে সবসময় দেখার জন্যই দু'বছর ধরে ইচ্ছে করে ফেইল করে আসছে।নাহলে সে আরও দু'বছর আগেই ভার্সিটি থেকে বের হয়ে আসত।

সে তার মম কে আবারও বলল,

_“আমার কিছু ভালো লাগে না, মম।ভিষণ একা,একা লাগে।ঘুমাতে পারি না।রুমে গেলে দম আটকে আসে।খাবার খেতে পারি না পেট গুলিয়ে আসে।বাবাকে বলো তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা করতে। আমি এদেশ থেকে যেতে চাই।”

শেষের দিকে শান্তর কন্ঠ ভেঙে এলো।শাহানা বেগম হতভম্ব হয়ে গেলেন ছেলের কথা শুনে।

_“কী হয়েছে তোর?আমার সঙ্গে শেয়ার করছিস না কেন?কী নিয়ে কষ্ট পাচ্ছিস তুই?....”

শাহানা বেগম আরও কিছু বললেন কিন্তু শান্তর সেসবে মন নেই।তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে সামনে দাড়িয়ে থাকা আকাশি রঙের সালোয়ার কামিজ পড়া মেয়ের দিকে।হয়তো তার ভ্রম হচ্ছে তাই চোখ বন্ধ করে আবারও তাকাল।নাহ…এখনো আছে!তাহলে এটা সত্যি মাহভিন?এ কয়েকদিন তো অনেকবার হ্যালোসিনেশন হয়েছে।মাহভিনকে কতবার নিজের সামনে,পাশে,ঘুমালে স্বপ্নে দেখেছে।যার কারণে চোখ বন্ধ করতেও তার ভয় হতো।ছুতে গেলেই পালিয়ে গেছে।আজকেও কী চলে যাবে?

শান্ত ফোন পকেটে রেখে আনমনে সামনে এগিয়ে গেল।অন্য দিন তো সামনে এগিয়ে গেলেই মাহভিন হারিয়ে যেত।আজ এখনও কেন যাচ্ছে না?সে আরও এগিয়ে গেল।এবার খুব দ্রুত পায়েই গেল।মাহভিনের গালে বুড়ো আঙুল ঠেকাল।তৎক্ষনাৎ অনুভা শান্তর শার্টের কলার চে'পে ধরে চিৎকার করে উঠে বলল,

_“অভিশাপ দিয়েছেন তাইনা?আপনার অভিশাপেই আমার আজ এই অবস্থা?আমি আপনাকে ফিরিয়ে দিয়েছি বলে অভিশাপ দিয়েছেন?আপনার অভিশাপে আজ আমার সবকিছু শেষ করে দিয়েছে।আমার জীবনটাই ধ্বংস হয়ে গেছে,শান্ত!”

বিজ্ঞাপন
রক্ত রেখার আড়ালে গল্পটি আয়েশা শেখ রিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে মোড়ানো থ্রিলার উপন্যাস