রক্ত রেখার আড়ালে

পর্ব - ১৫

🟢

সকালে ঘুম থেকে উঠে অনুভাকে বাড়িতে না পেয়ে আরশাদ সাহেব চিৎকার করে বাড়ি ঘর মাথায় তুলছেন।সে কালকে রাতে যখন শুনেছে সবাই অনুভার নানা বাড়িতে উঠেছে, এক মুহুর্ত দেরি না করে নাফিসা বেগম আর অনুভবকে নিয়ে এ বাড়িতে ফিরে এসেছে।যখন এসেছে তখন অনুভা ঘুমিয়েছিল।আরমান সাহেব ডাকার জন্য নিষেধ করেছিলেন।সে ভেবেছিলো সকালে অনুভা ঘুম থেকে উঠলে ব্যাংকের চেক গুলো নেবে।অনুভার কাছে যা আছে, তা দিয়ে নতুন ব্যবসা শুরু করলেও হাতে প্রচুর টাকা থেকে যাবে,এই হিসাবেই সারা রাত কেটেছে। নাফিসা বেগমের সঙ্গে বসে তিনি একের পর এক অঙ্ক কষেছেন, ভবিষ্যতের লাভ-লোকসানের হিসাব মিলিয়েছেন।কিন্তু ঘুম থেকে উঠেই দেখেন অনুভা নেই।অনুভার লাগেজ সহ সে উধাও।সারারাত হিসাব করল পাহাড়সম, সকালে ফলাফল শুন্য!

বাসার সকলে অনুভাকে নিয়ে চিন্তা করলেও আরশাদ সাহেব ও নাফিসা বেগম টাকা আর সম্পত্তি নিয়ে পড়ে আছেন।আরমান সাহেব একটা চিঠি নিয়ে এসে আরশাদ সাহেবের কাছে দিলো।

চিঠি দেখতেই চেচামেচি থামিয়ে পড়তে শুরু করল।

“আমাকে খুঁজবেন না।আমি ইচ্ছে করেই বাড়ি ছেড়েছি।আমাকে এতদিন লালন-পালন করার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ।আমার বাবাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।সে না থাকলে বাবা নামক শব্দ কেমন হয় তা জানা হতো না।আমি আমার সব নিয়েই চলে এসেছি।সার্থপর হয়েছি একটু।কী আর করব? বাবার শিক্ষা যে! তবু তার মতো সার্থপর হতে পারিনি।হলে বাড়িটায় আপনাদের জায়গা হতো না।আপনারা থাকুন সেখানে।আমার জন্য দোয়া করতে হবে না।আমার জীবনে ভালো কিছু হওয়ার আশা আমি আর করি না।আপনারা ভালো থাকুন।যদিও এখন সেই পরিস্থিতি নেই।তবে আশা করি শীঘ্রই এই ঝড় সামলিয়ে উঠতে পারবেন। আবারও বলছি আমাকে খুঁজবেন না।

ইতি আমার আব্বুর

বড্ড আদরের মেয়ে।”

চিঠিটা পড়েও আরশাদ সাহেবের মন চুল পরিমানও নরম হলো না।সে কাগজ মুচড়ে ফেলে দিলো অদুরে।অনুভা বলে চিৎকার করে উঠলো।নাফিসা বেগম চিঠি তুলে শব্দ করে পড়ল।

_“ কতবড় বেইমান মেয়ে দেখেছেন?আমাদের কীভাবে জলে ফেলে চলে গেল!”

তার কথায় আরিজ বিদ্রুপ হেঁসে বলল,

_“ সত্যি? জলে ফেলে গেছে? আপনি ওর সঙ্গে যা যা করেছেন মনে পড়ে সেগুলো? আপনার মনে হয় না, অনুভার উচিত ছিলো এই বাড়িতে আপনাকে ঢুকতে না দেওয়া?বিশ্বাস করুন আমি হলে সেটাই করতাম।ঘাড় ধা’ক্কা মে'রে বের করতাম।”আরিজের মেজাজ বিগড়ে আছে।মুখের উপর কথা গুলো বলে চলে গেল।

আরিজের কথা শুনতেই নাফিসা বেগম তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল।

_“এ বাড়ির সব গুলো বেয়াদব হয়েছে। এখন কিছু বলছেন না কেন? আমি বললেই তো খারাপ হয়ে যাই।” নাফিসা বেগম আমীরা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন।

_“ আমার ছেলে একটাও মানুষ হয় নি।এটা আমি স্বীকার করি।” আমীরা বেগম বললেন।

তাদের কথার মাঝেই অলির বাবা আসাদুর সাহেব বললেন,

_“ তাহলে এখন আমরা কী করব? ওকে কোথায় খুঁজব?”

_“ খুঁজব না। যে ইচ্ছে করে চলে গিয়েছে তাকে খুঁজে লাভ নেই। ওকে এবার নিজের মতো ছেড়ে দে।”

আরমান সাহেবের কথায় আমীরা বেগম অবাক হলেন।তার মুখে যেন এমন কথা মানাচ্ছে না।

_“ আপনি এই কথা বলছেন? একটা মেয়ে হয়ে কীভাবে কী করবে? কোথায় যাবে..”

আমীরা বেগম কথা শেষ করার আগেই আরমান সাহেব বললেন,

_“ওকে পারতে হবে।আমরা তো ছিলাম এতোদিন, এতে কি করতে পেরেছি ওর জন্য? ওর নানা কে কথা দিয়েছিলাম কখনও কোনো কষ্ট ওকে স্পর্শ করতে দেব না।রাখতে পেরেছি? এবার নিজের ভবিষ্যৎ নিজে গড়ে তুলক।”

আমীরা বেগম তবু নিশ্চিত হতে পারলেন না।অনুভা চলে গেছে তারপরও কীভাবে শক্ত আছেন আরমান সাহেব? আরশাদ সাহেবেরও নিজের ভাইয়ের কথা হজম হলো না।

_“ এতবড় কাজ করার মতো সাহস ওর হয়নি, ভাইজান!আমি আমার মেয়েকে ঠিকই খোঁজে বের করব।”

আরশাদ সাহেব হনহনিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল।আমীরা বেগম চিঠিটা আবারও পড়ে নিরবে চোখের জল ফেললেন।তার মেয়ে ছিলোনা বলে অনুভা,অলি,নীলা তাদেরকেই মেয়ে হিসেবে বড় করেছেন। তাদের মধ্যে অনুভার প্রতি ছিল তাঁর আলাদা টান, আলাদা আদর।মেয়েটা কীভাবে পারল এভাবে তাঁর মাকে ফেলে চলে যেতে?তার ছেলের ওপর অভিমান করে মায়ের বুক ভরা ভালোবাসা কেন উপেক্ষা করে চলে গেল!

__

রাতে সবাই খাবার টেবিলে উপস্থিত থাকলেও আরিজ নেই।অলি খেতে গিয়ে আরিজকে দেখতে না পেয়ে নিঃশব্দে সেখান থেকে চলে এলো। আরিজের রুমে উঁকিঝুঁকি দিয়ে কোথাও দেখল না।ছাদে থাকতে পারে ভেবে অন্ধকারের মাঝেই সিঁড়ির দিকে গেল।যদিও তার অন্ধকারে ভয় লাগে তবুও কীভাবে যেন গেল।গিয়েই দেখল ছাঁদের রেলিং ঘেঁসে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে আরিজ।ধীর পায়ে এগিয়ে গেল সেদিকে।মিনমিনে স্বরে বলল,

_“ আরিজ ভাইয়া! খাবেন না?”

আরিজ পেছন ঘুরল না।

_“ উহুম!”

_“কেন?”

_“এত প্রশ্ন করিস কেন,অলি?তোরা খেয়ে নে।” আরিজ পেছন ঘুরে তাকাল।

অলির মুখটা চুপসে গেল। ঠোঁট দুটো শক্ত করে কামড়ে ধরে সে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল।চোখে জমে ওঠা অভিমান আর অপমান একসঙ্গে লুকোবার ব্যর্থ চেষ্টা। আরিজ আর কিছু না বলে আবার সামনের দিকে ফিরে সিগারেটে টান দিল। তখনই নিস্তব্ধতাটা চিরে ভেসে এলো ফ্যাঁচফ্যাঁচে, মেয়েলি কান্নার শব্দ।

আরিজের ভ্রু কুঁচকে উঠল। বিভ্রান্তি আর বিরক্তি মিলিয়ে সে ফের পেছন ঘুরে তাকাল।অলিকে কাঁদতে দেখে কী হয়েছে জিজ্ঞেস করার আগেই অলি কান্না জড়ানো কণ্ঠে বলতে লাগল,

_“ ভালো লাগে না আর।সবাই কেমন বদলে যাচ্ছে।কাউকে ভালো কিছু জিজ্ঞেস করলেও রেগে যায়। কোত্থেকে তায়ান ভাইয়া এলো,সব কিছু এলোমেলো করে দিয়ে চলে গেল।অনু আপাও কোথায় যেন চলে গেল। অনু আপার মত আমিও চলে যাব…”

বাক্যটা শেষ হওয়ার আগেই আরিজ ঝট করে হাত বাড়িয়ে তার তালু দিয়ে অলির মুখ চেপে ধরল। অন্য হাতে ধরা সিগারেটটা অবহেলায় মেঝেতে ফেলে দিয়ে সে আরও কাছে ঝুঁকে এল।কন্ঠে কঠোরতা নিয়ে বলল,

_“সাহস বেশি হয়ে গেছে?”

অলি আরিজের হাত সরিয়ে দিয়ে বলল,

_“তাহলে আপনি এমন করেন কেন?”

_“কেমন করেছি?”

_“খাবার খান না।চুপচাপ থাকেন।”

_“ এটা কী স্বাভাবিক নয়,অলি? তুই কী একবারও আমার জায়গায় দাঁড়িয়ে চিন্তা করেছিস?”

অলি চুপচাপ তাকিয়ে আছে আরিজের দিকে।আরিজ আর কিছু বলতে চেয়েও বলল না।এই ছোট্ট মেয়েকে বলেও লাভ নেই।অনেক সময় অনেক কিছু বলেও বোঝানো যায় না। ভাইয়ের থেকে বিশ্বাস ঘাতকতা।মা,ভাই সম্পর্কে অজানা অতীত।সেই অতীতের জের ধরে নিজের বাবাকে খু'নি শোনা।যা এতদিন সাজানো গোছানো একটা পরিবার ছিল আজ তা শুধু ধ্বংসস্তূপ।।আর সবশেষ যাকে ছোটবেলা থেকে নিজের বোনের মতো আগলে রেখেছিল,

সেই বোনটাই প্রতারিত হলো নিজেরই ভাইয়ের হাতে।

আরমান সাহেব যতই বলুক অনুভাকে খোঁজার দরকার নেই।তাই বলে কী নিশ্চিন্ত থাকা সম্ভব?কোথায় যাবে ও? ওর কী আর কোথাও যাওয়ার জায়গা আছে? খারাপ কিছুও তো হতে পারে ওর সঙ্গে। এগুলো ভেবেই আরিজের কোনো কিছুতে মন বসছে না।তায়ান যেভাবে ওদের নিঃস্ব করে দিয়ে গেছে, আরিজের এখন একটা চাকরি না করলেই নয়। তবুও কোনো কিছুতে ফোকাস করতে পারছে না।

_“ চলুন না।দুপুরেও খাননি।” এতক্ষণের নিরবতা ভেঙ্গে অলি আবারও মিনমিনে স্বরে বলল।

_“তুই খেয়ে ঘুমিয়ে পর।” আরিজ বলল।

_“আপনি না খেলে খাবো না।”

আরিজ এবার বিরক্ত হয়ে বলল,

_“কেন আমি তোর খাবার আটকে রেখেছি?”

_“ হ্যাঁ,রেখেছেনই।এখন চলুন।” এই বলে অলি টানতে টানতে আরিজকে নিচে নিয়ে আসে।

___

১৫ দিন কেটে গিয়েছে এর মধ্যে অনুভার পরিবারের কেউই তার কোনো খোঁজ পায়নি। আরশাদ সাহেব অবশ্য খুঁজেছে অনেক জায়গায়। কিন্তু থানায় কোনো রিপোর্ট করতে পারেনি।যে চিঠি লিখে ইচ্ছাকৃত ভাবে চলে গিয়েছে, আর আরমান সাহেবও পুলিশকে বলেছে না খুঁজতে, তাই পুলিশ আরশাদ সাহেবের কোনো রিপোর্ট গ্রহন করেনি।

—

এদিকে এই ১৫ দিন ধরে অনুভা শান্তর বাসাতেই।শান্তর বাসায় থাকলেও অনুভা নিজের রুম থেকে বের হয় না।খাবার সময় হলে শান্ত তার জন্য খাবার দিয়ে আসে।কখনও অল্প একটু খায়, আবার কখনও যেমন ছিল তেমনই পড়ে থাকে থালাটা।।শান্ত এর জন্য কিছু বললেও অনুভা কোনো উত্তর দেয় না। আবার বেশি জোরও করে না শান্ত,যদি রাগ করে,বিরক্ত হয়ে চলে যায়?তখন তো আবার শান্ত একা হয়ে যাবে।মাহভিন কথা না বলুক,নাা হাসুক তবুও তো আছে।তার বাসায়, তার পাশের রুমেই আছে। কখনও কী ভেবেছিলো এত কাছে থাকবে?

কয়েকদিন আগেও তার দিন গুলো কীভাবে গিয়েছে ভাবলেই দমবন্ধ হয়ে আসে।খাবার গলায় আটকে থাকত।গিলতে পারত না, ফেলেও দিতে পারত না।ঘুমাতে গেলে বুকের ভেতরটা অদ্ভুত শূন্যতায় ভরে উঠত, চোখ বন্ধ করলেই ভেসে উঠত সেই পরিচিত মুখটা,যে মুখটা আর তার দিকে ফিরবে না জেনেও মন মানতে চাইত না।প্রতি সকাল শুরু হতো ভারী হয়ে ওঠা মাথা আর শূন্য বুক নিয়ে, আর রাত নামলেই ভয় হতো,আরেকটা দীর্ঘ রাত কীভাবে পার করবে সেই ভেবে।নিজের স্বস্তিটুকু হারিয়ে ফেলেছিল।

যতদিন এখানে আছে থাক এভাবে।এ দেশ থেকে চলে গেলেই অনুভাকে সে নতুন করে গড়ে তুলবে। এর জন্য যত সময় লাগে লাগুক।

এইসব ভাবনায় ডুবে শান্ত এতক্ষণ রাস্তা ধরে হাঁটছিল। তার হাতে শক্ত করে ধরা অনুভার পাসপোর্ট আর রাতের জন্য খাবার। এতদিন দেরি হওয়ার একমাত্র কারণ এটিই। অনুভার কোনো পাসপোর্ট করা ছিল না,নইলে কবেই তো তারা চলে যেত।

বিজ্ঞাপন

ফ্লাটে এসে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে শান্ত।খাবার গুলো প্লেটে সাজিয়ে কিছু নিজের জন্য রেখে বাকিটা নিয়ে অনুভার রুমের সামনে গিয়ে নক করে।

_“মাহভিন! ঘুমিয়ে পড়েছ?”

অনুভা সঙ্গে সঙ্গে দরজা খোলেনি।কয়েক মিনিট পর দরজা খুলতেই দেখল অনুভার চোখ লাল হয়ে আছে।মুখটাও ফোলা লাগছিল।শান্ত একটু বিরক্ত হয়ে বলল,

_“মাহভিন আবারও?”

_“কেন ডেকেছিলেন?” অনুভা শান্তর কথা এড়িয়ে গিয়ে বলল।

_“খাবার খেয়ে নাও।আর পাসপোর্ট হয়ে গেছে।এবার যত দ্রুত সম্ভব চলে যাব আমরা।”

_“সেখানে আপনার বাবা-মাকে কী বলবেন? তাদের কাছে আমার পরিচয় কী হবে?”

_“ সেটা ভেবে দেখতে হবে।”

_“ দেখুন আবারও বলছি আমার জন্য কোনো ঝামেলা করবেন না।”

_“ তোমাকে আবারও বলতে বলিনি।খাবার খেয়ে নাও।” অনুভার হাতে খাবার দিয়ে চলে আসল সেখান থেকে।

অনুভা খাবার হাতে নিয়ে নিজের রুমে ঢুকবে তখনই কলিং বেল বেজে উঠল।অনুভা এক মুহুর্তের জন্য আতংকে পড়ে গেল।যদি তার বাবা তার খোঁজ পেয়ে এখানে চলে আসে?সে শান্তকে ডাকল।শান্ত রুম থেকে বের হয়ে প্রশ্ন চোখে অনুভার দিকে তাকাল।তবে অনুভার কিছু বলার প্রয়োজন পড়ল না।কলিংবেলের শব্দ শুনেই বুঝল অনুভার আতংকে ভরা চাহনির কারণ।

_“তুমি রুমে যাও আমি দেখছি কে।” শান্ত বলল।

অনুভা মাথা নাড়িয়ে দরজা লাগিয়ে দিলো।শান্ত দরজা খুলতেই দেখল এই বিল্ডিংয়ের দারোয়ান দাঁড়িয়ে।ভেতরে ভেতরে স্বস্তির শ্বাস ফেলল সে।দারোয়ানকে শুধালো,

_“কিছু বলবেন চাচা?”

দারোয়ানের হাতে একটা খাম। সেটা শান্তর দিকে এগিয়ে দিলো।শান্ত ভ্রু জোরা সামান্য কুঁচকে সেটা হাতে নিলো।দারোয়ান কে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় দেয়।তারপর খামটি এপিঠ ওপিঠ করে ঘুরিয়ে দেখে ছিঁড়ে বের করল খামের ভেররের কাগজ।কাগজে ভালোভাবে নজর বোলাতেই স্তব্ধ খেয়ে যায় সে।আইনি ভাষা, ঠান্ডা আর নির্দয় কিছু লাইন।অনুভা আর তায়ানের নাম পাশাপাশি লেখা।

নিচে ধারা, শর্ত, তারিখ,সবকিছু নিখুঁত নিয়মে সাজানো।

অনুভা রুমের ভেতর থেকে বাহিরের কারও কোনো আওয়াজ না পেয়ে বেড়িয়ে এলো।অনুভা বের হয়ে আসতেই শান্ত চমকে উঠে কাগজটা পেছনে নিয়ে লুকিয়ে ফেলল।অনুভা সেদিকে খেয়াল করে ভ্রু কুঁচকিয়ে বলল,

_“কী লুকালেন?”

_“ কিছু না…তেমন কিছু না..” তোতলালো শান্ত।

অনুভার তবু সন্দেহ হলো।শান্তকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষন করল।শান্ত একটু অস্বস্তিবোধ করে বলল,

_“কী দেখছ? বললাম তো কিছু না।যাও খেয়ে ঘুমাও।”

অনুভা খানিক মাথা দুলিয়ে ফিরে যাওয়ার ভঙ্গি করল।।অনুভা চলে যাবে ভেবে শান্তও কাগজ পেছন থেকে সামনে আনে।কিন্তু অনুভার মন সায় দিলো না।চলে আসতে নিয়েও আবারও পেছন ঘুরে ঝট করে শান্তর কাছ থেকে কাগজটা কেঁড়ে নিলো।শান্তর মুখের রঙ ফ্যাকাসে হয়ে যায়।অনুভার হাত থেকে কাগজ কেঁড়ে নিতে চেয়েও মাঝপথে হাত থেমে যায়।

এদিকে কাগজে থাকা প্রতিটা শব্দের সঙ্গে অনুভার বুকের ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে।চোখ ঘোলা হয়ে আসে তার।ডিভোর্স পেপারের নিচে তায়ানের নামটা জ্বলজ্বল করছে।স্বাভাবিক কিছু অক্ষর,শব্দ,বাক্য আজ পড়তে এতো কঠিন লাগছে কেন?ভয়ংকর ভারী লাগছে!ঝাপসা চোখে একবার,কয়েকবার বারবার পড়ল।তবুও সব গুলিয়ে যাচ্ছে।চোখ থেকে অনবরত জল গড়িয়ে কাগজের উপর পড়ল।ভিজে উঠলো কাগজ।হাতটা অস্বাভাবিক ভাবেই কাঁপতে থাকে।মনে হচ্ছিল কোনো আইনি দলিল না,নিজের মৃত্যুসনদ ধরে আছে।

অনুভা শান্তর দিকে তাকাতেই শান্ত চোখ সরিয়ে নিলো।কেন যেন চোখে চোখ রাখতে পারল না।অনুভা আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে মেঝেতে বসে পড়ে।ফুপিয়ে ওঠে।এটাই কী বাকি ছিল তার জন্য? শান্ত এসে অনুভার দু কাঁধে হাত রেখে ঝাপটে ধরে।

_“ না, মাহভিন! তুমি কাঁদবে না।এ জন্যই তোমাকে দেখাতে চাইনি।তুমি কাঁদবে না…নিষেধ করেছি.. মাহভিন প্লিজ..” শান্ত একের পর এক বাক্য ছুঁড়ে বোঝাতে লাগল।

অনুভা নিজের সর্বশক্তি ব্যয় করে শান্তকে দুরে সরিয়ে দেয়।চিৎকার করে ওঠে।

_“ আপনি না দেখালেই কী হতো? বদলে যেত এটা? বদলে যেত বলুন?” অনুভা কাগজটা তুলে ধরে বলল,

_“ দেখুন সব শেষ হয়ে গেছে, সব। সে তো বলেছিল আমাকে তালাক দেবে না।তাহলে এটা কী?আমাকে তালাক দেবে না,গ্রহনও করবে না। আচ্ছা, না করুক।তাহলে এই কাগজ কীসের?স্বপ্ন দেখছি আমি,স্বপ্ন?” কান্না মিশ্রিত গলায় বলা শব্দ গুলো অস্পষ্ট শোনালো।

শান্তর শ্বাস ভারী হয়ে এলো। সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষাই খুঁজে পেল না সে। অনুভার প্রতিটা কথা যেন তার বুকের ভেতর তীরের ফলার মতো বিঁধে যাচ্ছে। তবুও সে আবারও অনুভাকে নিজের সঙ্গে জড়িয়ে ধরল।অনুভা আরও বলল,

_“ সে আমার সঙ্গে না থাকুক…আমাকে না মানুক।তবু তো আমি তার স্ত্রী হয়ে থাকতাম।এতটুকু আশা আমি এতদিন করে গেছি।এই দুনিয়ায় না হলেও, পরকালে অন্তত আমি তাকে পাব।সেখানে অন্তত সৃষ্টিকর্তার কাছে বলতে পারতাম এবার আমার স্বামীকে আমার করে দিন। কিন্তু এখন কী বলে চাইব? যার সঙ্গে আমার সব দোয়া, সব স্বপ্ন জড়িয়ে ছিল।আজ তাকে চাইবার অধিকারটুকুও তো সে কেঁড়ে নিলো।” একটু থেমে নিস্তেজ হয়ে আসা কন্ঠে বলল,

_“এতটা নিঃস্ব করে দিলো? কী বলে এবার আমি আল্লাহর দরবারে তাকে চাইব?”

শান্ত কেবল দেখে গেল অনুভার ভেঙে পড়া।প্রতিটা ফোঁটা,চোখের জল যেন শান্তর বুকের ওপর আছড়ে পড়ছে । অনুভার কাঁপতে থাকা কণ্ঠ, থেমে থেমে নেওয়া শ্বাস,সবকিছু তার নিজের শরীরেও কষ্ট হয়ে ফিরে আসছে।নিজের ভালোবাসার মানুষকে অন্য কারও জন্য কাঁদতে দেখার চেয়ে বড় কোনো যন্ত্রণা আছে কি না, শান্ত জানে না।বোধহয় খুব যন্ত্রণা হয়।শান্তর বেলায়ও ব্যতিক্রম নয়।

তার মাহভিন অন্য একজনকে হারানোর শোকে ভেঙে পড়ছে।এটা কী যন্ত্রণা না? কিন্তু আজ মাহভিনের কষ্ট তার কাছে নিজের কষ্টের চেয়েও বেশি ভারী লাগছে।সে বুঝতে পারছে, এই মুহূর্তে কোনো কথা, কোনো সান্ত্বনা কাজ করবে না। তবুও ধীর গলায় অনুভার দু গাল ধরে, থেমে থেমে বলল,

_“ এভাবে ভেঙে পড়ো না।আমি আছি…প্লিজ কেঁদো না।আমি সহ্য করতে পারছি না..প্লিজ মাহভিন।”

_“আমি ম’রে যাবো।আমার বেঁচে থাকার আর কোনো উৎস নেই।আমি আর পারছি না।” হেঁচকি উঠে এলো।

_“কোনো অপরাধ না করেই আমি সব হারালাম।একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেলাম।সব শেষ…”

শান্ত গলা চড়া করল। এতক্ষণ যে কণ্ঠটা ভাঙা ছিল, সেটা এবার শক্ত হয়ে উঠল,

_“মা’র খাবে এবার আমার হাতে। এইই.. এদিকে তাকাও…আমার দিকে তাকাও।” অনুভার চোয়ালে আলত করে ধরে নিজের দিকে ফেরাল।অনুভা তাকাল।শান্তর চোখের দিকে তাকাল।শান্ত বলল,

_“ ম'রে যাবে?এই কথাগুলো শুনে আমার কী হয়, জানো?সব শেষ হয়নি।তুমি একা নও।আমি আছি তো।আমি শেষ হতে দেব না।” অনুভার চোখে চোখ স্থির রেখে বলল,

_“তুমি কিচ্ছু হারাওনি মাহভিন,তোমার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে।আর সেটার জন্য কেন তুমি নিজেকে নিঃস্ব ভাববে? নিজেকে নিঃস্ব ভাবা বন্ধ করো।”

বলতে বলতে শান্তর স্বর ব্যাকুল হয়ে উঠলো,

_“তুমি কী জানো না,আল্লাহ আমাদের থেকে যা কেঁড়ে নেয় তা আমাদের মঙ্গলের জন্য? তুমি কী অবুঝ? কেন এমন করছ?যেটা চলে গেছে, সেটা হয়তো তোমার ছিলই না।” একটু থেমে আবার বলল,

_“ সৃষ্টিকর্তা আমাদের এত বেশি কষ্ট দেন না,যেটা আমাদের সহ্য ক্ষমতার বাইরে।কষ্টের পরেই স্বস্তি, মাহভিন!সব ভুলে যাও..প্লিজ।”

লম্বা সময় নিয়ে শান্ত অনুভাকে বোঝাল।যা মাথায় এসেছে তাই বলে বোঝালো।আরও বলল।তবুও অনুভা দু'হাতে নিজের চোখ-মুখ চে'পে দমবন্ধ করা কান্নায় ভেঙে পড়ল।দুপাশে মাথা নাড়িয়ে বলল,

_“ আপনি বুঝবেন না, শান্ত!পেয়ে হারানোর বেদনা, আপনি বুঝবেন না।”

শান্ত কেমন যেন বাকরূদ্ধ হয়ে গেল।ক'দিন আগেও শান্তর অবস্থা কেমন ছিল তা মনে পড়ল। এই যে এতক্ষণ অনুভাকে যা বোঝালো,তা কী সে নিজেও বোঝে? ক'দিন আগে বুঝেছিল? সে কী অবুঝের মতো করেনি? তার বন্ধুরা তাকে কত কী বুঝিয়েছে!কীভাবে ছটফট করত তার মন মাহভিনের জন্য! সে কী মানতে পেরেছিল মাহভিনকে আল্লাহ তার কল্যানের জন্যই কেঁড়ে নিয়েছেন?সে কী তখন সৃষ্টিকর্তার কাছে অভিযোগ করেনি?

মাহভিন তো ঠিকি বলে।সে তো মাহভিনকে কোনো দিন পায়-ই নি।আর না তো, মাহভিন তাকে একসঙ্গে থাকার স্বপ্ন দেখিয়েছিল।তেমন কিছুই ছিল না তাদের মাঝে।না পেয়ে হারিয়েই শান্ত সম্পূর্ণ চুরমার হয়ে গিয়েছে।আর সেখানে মাহভিন সব পেয়েও হারাল।মেয়েটার কষ্ট কী তার চেয়ে দ্বিগুণ তবে? নাকি এর চেয়েও বেশি?

শান্ত যখন এসব নিয়ে ভাবনায় ব্যস্ত তখন দেখল,অনুভার শরীর কুঁচকে উঠছে।সে একবার পেটে আরেকবার মুখে হাত রাখছে।শান্ত অস্থির গলায় বলল,

_“কী হয়েছে? এমন করছো কেন?”

অনুভা কিছু বলল না।মুখে হাত চে'পে উঠে দাঁড়াল। পেটে অস্বস্তি হচ্ছে তার।যেন সব গুলিয়ে বের হয়ে আসবে।নিঃশ্বাস থেমে থেমে উঠছে, শরীরও কেঁপে উঠছে। অনুভা লম্বা, লম্বা শ্বাস ফেলে পেটের অস্বস্তি কমাতে চাইল।কিন্তু সম্ভব হলো না। ঠোঁটের চারপাশের অংশ দু'হাতে চে'পে ধরে হুড়মুড়িয়ে ওয়াশরুমের দিকে গিয়ে গলাগলিয়ে পেটের ভেতর থাকা সব বের করে দিলো।তার পেট এমনিতেই ফাঁকা। শরীর দূর্বল।তার মধ্যে ব’মি হওয়ায় আরও দূর্বল হয়ে উঠল।

বুকের ভেতর চাপ অনুভব হলো। শ্বাস গুলো নেওয়ার মতোও শক্তি কাজ করছিল না।

ধীরে ধীরে শরীর শিথিল হয়।এত বেশি শিথিল হয় যেন শুন্য হয়ে যাচ্ছে সব। মাথা ঝিমিয়ে ওঠে।ওয়াশরুমের চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসে।ফ্লোরে পড়ে যাবে সেই মুহূর্তে শান্ত এসে ঝাপটে ধরে।মাহভিন বলে চিৎকার করে ওঠে।নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নেয়।

বিজ্ঞাপন
রক্ত রেখার আড়ালে গল্পটি আয়েশা শেখ রিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে মোড়ানো থ্রিলার উপন্যাস