রক্ত রেখার আড়ালে

পর্ব - ১৯

🟢

আরাফের বয়স এখন ২০ দিন । শান্ত প্রথমে বেবি সিটার রাখতে চাইলেও,এখন ন্যানি রেখেছে।অনুভা আর ন্যানি মিলেই আরাফকে গোসল করিয়ে দিচ্ছিল,এর মধ্যেই হঠাৎ শান্তর কল আসল।অনুভা আরাফকে ন্যানির কাছে রেখে কল ধরতেই,ওপাশ থেকে শান্ত তারাহুরো করে বলল,

_“ নিচে আসো..ফাস্ট।”

শান্তর এমন কন্ঠস্বরে ভরকে উঠলো অনুভা। কৌতূহলী গলায় বলল,

_“কেন?”

শান্ত এবারও তাড়া দেখিয়ে বলল,

_“আগে আসো তো।তাড়াতাড়িইই..”

অনুভা কল কেটে, দ্রুত পায়ে লিফ্টে গিয়ে উঠল।গ্রাউন্ড ফ্লোরে পৌঁছে এদিক ওদিক তাকিয়ে শান্তকে খুঁজল।পরক্ষণেই আবারও কল এলো।

_“গেইট খুলে বাহিয়ে আসো।” শান্ত বলল।

_“কী হয়েছে বলবেন তো!” অনুভা অধৈর্য গলায় বলতে বলতে গেইটের দিকে এগিয়ে গেল।

_“ বলতে পারব না,এসেই দেখ।” শান্ত কল কেটে দেয়।

অনুভা গেইটের ওপাশে গিয়ে একটু থমকাল। হেলমেট পড়া ছেলেটাকে দেখে তৎক্ষনাৎ চিনতে পারল না।কিন্তু পড়নে থাকা কালো কোট ও এর ভেতর ধুসর রঙের শার্ট এবং হেলমেটের ভেতর থাকা দু চোখ দেখে বুঝল এটা শান্ত।সকালে এগুলো পড়েই অফিসে গিয়েছিল।শান্ত অনুভাকে দেখে দু হাত তুলে hi জানানোর মতো করে নাড়াল।কিছুর সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে।অনুভা মুখে রাজ্যের কৌতূহল নিয়ে শান্তর কাছে এগিয়ে গেল।

_“ কী হয়েছে? এবার বলুন..আর মাথায় এটা পড়ে আছেন কেন?”

শান্ত কোনো জবাব না দিয়ে, যেটার সঙ্গে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে ছিল সেটার উপর থাকা চাদর এক টানে তুলে ফেলল।সঙ্গে সঙ্গে অনুভার মুখ বিস্ময়ে হা হয়ে গেল। এক মুহুর্ত কিছু বুঝে উঠতেই পারল না।সামনে থাকা কালোর মাঝে নিল রঙের বাইকের দিকে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।শান্ত অনুভাকে এমন রোবটের মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে,চোখের সামনে হাত নাড়িয়ে বলল,

_“ তোমার জন্য এটা।পছন্দ হয়নি?”

অনুভা নড়েচড়ে, নিজেকে স্বাভাবিক করে শান্তর দিকে তাকায়।

_“আমি শুধু বলেছিলাম আমাকে বাইক চালানো শিখতে সাহায্য করুন,এখনি বাইক কিনে আনতে বলিনি।আমি তো এখনো শিখিই নি!”

_“শিখে যাবে।তুমি তো সাইকেল চালাতে পারো,বাইক চালানো শিখতে কয়েকদিন লাগবে মাত্র। এখন বলো পছন্দ হয়েছে?”

অনুভা বাইকটার দিকে এগিয়ে গেল।বিশাল আকৃতির বাইক।নামের দিকে খেয়াল করে দেখল Yamaha YZF-R1M ।যদিও সে এটার দাম জানে না তবু বাইকের ধরণ দেখে অনুমান করল কয়েক লক্ষ্য টাকা তো হবেই।নিশ্চিত হওয়ার জন্য শান্তর দিকে তাকিয়ে বলল,

_“ কত এটার দাম?”

শান্ত বলল,

_“ ২৮ লক্ষ ৫০ হাজার।”

_“কিইহহ!” অনুভার চোখ কপালে উঠে গেল।

অনুভাকে অবাক হতে দেখে শান্ত আরও স্বাভাবিক স্বরে বলল,

_“ এগুলোর প্রাইজ এমনই।অবাক হচ্ছো কেন?”

_“তাই বলে এতো?”

_“ এতো? মাত্র ২৮ লাখ মাহভিন!”

_“ আপনি পাগল হয়ে গেছেন? আমি এতো টাকা কোথায় পাব?”

এবার শান্তও বিস্মিত স্বরে বলল,

_“হোয়াট!তুমি কী বলছ?

_“বলেছি আমার কাছে এতো টাকা নেই।”

শান্ত মাথা থেকে হেলমেট খুলে ফেলল,

_“ আমি তোমার কাছে টাকা চেয়েছি? আশ্চর্য! I gifted this to you!” শান্ত একটু উচ্চস্বরে বলল।

_“ আমি আপনাকে কিছু বলেছিলাম,শান্ত! আমি এটা নিতে পারব না,আপনি এমনিতেই যা করেছেন এতেই আমি অনেক ঋণি।”

_“এজ আ ফ্রেন্ড আমি তোমাকে কিছু গিফট করতেই পারি।”

_“ না পারেন না।ছোটো খাটো কিছু হলে নেওয়া যায়, কিন্তু এগুলো বাড়াবাড়ি!” অনুভা খানিকটা রাগী স্বরে বলল।

_“ তার মানে তুমি নেবে না?” শান্ত প্রশ্ন করল।

অনুভা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

_“ না।”

_“ নেবে না?”

অনুভা শান্তর দিকে ভালোভাবে তাকাল,যে এখন কপালে সুক্ষ্ম ভাজ ফেলে অনুভার দিকে তাকিয়ে আছে।

_“ না বলেছি না?”

_“ ওকে, নিতে হবে না যাও। যাও,অ্যাপার্টমেন্টে চলে যাও।”

আকস্মিক এমন আচরণে আহাম্মক বনে গেল অনুভা।শান্ত আবারও বলল,

_“ কী হলো যাও।দাঁড়িয়ে আছো কেন?”

অনুভা ফোঁস করে শ্বাস ফেলে, গেইটের দিকে ঘুরে চলে আসার জন্য উদ্যত হলো।পরক্ষণেই পেছন থেকে অদ্ভুত আওয়াজ শুনে আবার সেদিকে তাকাল।শান্ত নিজের বুট দিয়ে নতুন বাইকের মধ্যে একের পর এক লা’থি দিয়ে যাচ্ছে।অনুভা হতভম্ব হয়ে দ্রুত শান্তর বাহু ধরে থামানোর চেষ্টা করল,

_“ কী করছেন এসব,পা’গল হয়ে গেছেন? কিছু একটা নষ্ট হয়ে গেলে তো আর ফেরত নেবে না,থামুন।”

শান্ত থামল না।নিজের পায়ের কাজ চলমান রেখে চা’পা রাগ নিয়ে বলল,

_“ তুমি কী ভেবেছ, এটা আমি আবার ফেরত দেব? যার জন্য কিনেছি সে যখন নেবে না,সেটা আর রাখারও দরকার নেই।”

অনুভা শান্তর বাহু শক্ত করে চে'পে ধরে টেনে সরিয়ে আনল।

_“ সব সময় পা’গলামো করবেন না। আমি আগেই আপনাকে শর্ত দিয়েছিলাম, আমার পেছনে অহেতুক টাকা খরচ করবেন না।”

শান্ত ঘন ঘন শ্বাস ফেলতে ফেলতে বলল,

_“ গিফট আর এমনি খরচের মধ্যে পার্থক্য বোঝো তুমি? বুঝতে হবে না।যাও এখান থেকে।” বলেই আবার ধেয়ে গেল বাইকের দিকে।দু'হাতে ধা’ক্কা মে'রে ফেলে দেওয়া জন্য হাত বাড়াতেই,অনুভা শান্তর সামনে গিয়ে তার বুকে ধা’ক্কা মে'রে বলল,

_“ হয়েছে..আচ্ছা। থামুন…নেব আমি।এবার থামুন।”

শান্ত দু’কদম পিছিয়ে গেল। কিন্তু অনুভার বলা কথা শুনে ঠোঁট প্রসারিত করে হেঁসে বলল,

_“ সত্যি বলছ?”

অনুভা রাগ দেখিয়ে বলল,

_“ হ্যাঁ, সত্যি বলছি।”

শান্তর বুকের ভেতর জমে থাকা শ্বাস ছেড়ে দিয়ে বলল,

_“ঠিক আছে,ধন্যবাদ।”

অনুভা অবাক না হয়ে পারে না।উপহার দিয়েছে সে আবার সে ই ধন্যবাদ জানাচ্ছে!এগুলো করে অনুভাকে শান্ত আরও লজ্জায় ফেলে দেয়। হঠাৎ হঠাৎ ই শান্ত এমন রেগে যায়,আর তখন না চাইতেও অনুভাকে তার কথা মেনে নিতে হয়।আর যেই অনুভা তার কথা মেনে নেবে সঙ্গে সঙ্গে তার রাগ মিলিয়ে যায়।যেন কিছুই হয়নি।যেমন এখন, একটু আগেই রাগে যে মুখখানি লাল হয়ে উঠেছিল, সেই মুখেই এখন উজ্জ্বলতা ফুটে উঠেছে।

অনুভার ভাবনার মাঝেই শান্ত হেলমেটটি নিয়ে অনুভার মাথায় পড়িয়ে দেয়।

_“এইবার পার্ফেক্ট লাগছে।”

অনুভা আবারও তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,

_“ এতো টাকা কোথায় পেলেন আপনি?”

_“ আমার অ্যাকাউন্টে ছিল।”

_“ আপনি না বলেছিলেন, আপনার বাবার থেকে আর টাকা নেন না।”

_“ তবু মম পাঠায়।এ নিয়ে কয়েকবার তার সঙ্গে আমি তর্ক করেছি।তারপর বুঝলাম সে পাঠাবেই।এছাড়াও বাংলাদেশে থাকতেও পাঠাতো,আমার একা আর কতই বা খরচ হতো,সব জমা থাকত।”

অনুভা চুপচাপ শান্তর দিকে তাকিয়ে থাকল।মাঝেমধ্যে শান্তর কিছু কাজ অনুভাকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। এক সময় এই ছেলেটাকে সে কত ভাবে ইগনোর করত! তার সঙ্গে একটা বার কথা বলার জন্য কত ছলচাতুরী করত! অনুভা এসবে বিরক্ত হয়ে কত কথা শুনিয়ে দিতো। ভালো-মন্দ সব ভাবেই কথা শুনাতো। আর আজ এই মানুষটাকেই ছাড়া সে এক পা এগোতে পারে না। ধীরে ধীরে তার উপরই নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।ভাবনাটা বুকের ভেতর কেমন কাঁটা হয়ে বিঁধে থাকে অনুভার।

শান্ত অনুভার নিরবতা লক্ষ করে, চাবি বের করে অনুভার সামনে তুলে ধরল।

বিজ্ঞাপন

_“ স্বপ্ন দেখতে ভয় পেও না,এই নাও।”

__

_“মে আই কাম ইন?”

শান্ত তখন সেখান থেকেই আবার অফিসে চলে আসে।সারা বিকেল, সন্ধা কাজ করে রাতে বাসায় ফেরার জন্য সব কিছু গোছগাছ করে নিচ্ছিল। তখনই কারো মেয়েলি কন্ঠ স্বর পেয়ে চোখ তুলে দরজার দিকে তাকায়।প্রথম দেখাতেই চিনে ফেলে মেয়েটাকে।

_“জেরিন?”

_“ মনে রেখেছ তাহলে?” মেয়েটা এগিয়ে আসতে আসতে বলল।

_“ মনে না রাখার তো কিছু নেই।” শান্ত আবারও জিনিস পত্র গোছানোতে মন দিল।

_“ শান্ত! তুমি এটা কীভাবে করলে?” মেয়েটা উদ্বিগ্ন হয়ে বলল।

_“ কী করেছি?”

_“ তুমি বিয়ে,বউ,বাচ্চা!”

শান্ত জেরিনের কথায় বাঁধা দিয়ে বলল,

_“হ্যাঁ তো? তোমার কাছে ওয়াদাবদ্ধ ছিলাম?”

_“ তোমার বাবা ছিল!”

_“সেটা তার সঙ্গেই বোঝাপড়া করো। আমি এসব জানতাম না,আর যখন জেনেছি তখনই না করেছি।” শান্ত ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে উঠে দাঁড়াল।

_“ আমি তোমাকে ভালোবাসি শান্ত! এতদিন তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি, তুমি জানো কত ছেলেকে তোমার জন্য রিজেক্ট করেছি? শুধু তুমি আসবে বলে?” জেরিন কাঁপা স্বরে বলল।

_“ আমি কখনও তোমাকে বলেছিলাম আমি আসব? তোমার সঙ্গে আমার দেখাই হয়েছে দু এক বার।” শান্ত একবার জেরিনের পা থেকে মাথা অব্দি পরখ করল।পড়নে গভীর কালো রঙের ফিটেড টপ, তার ওপর হালকা ঢিলেঢালা কালো ব্লেজার। নিচে গাঢ় মেরুন রঙের প্যান্ট।টপ টা গলার অনেক খানিক নিচে ঝুলে আছে। শান্ত দৃষ্টি সরিয়ে নিল।ছোট করে বলল,

_“ আমাকে এখন যেতে হবে।”

_“ আমি যে এতদিন অপেক্ষা করলাম তার কী হবে?”

_“ করেছ কেন? আর এতোই যখন ভালোবাসতে এখানে কেন ছিলে? চলে যেতে আমার কাছে।” শান্ত বিদ্রুপ করে বলল।

_“যেতে চেয়েছিলাম তোমার বাবা বাঁধা দিয়েছে।”

_“ তাহলে এখন আমাকে বলে লাভ কী? আমার বউ, বাচ্চা আছে।”

_“ তুমি কেন করলে এটা?” জেরিন কেঁদে উঠলো।

শান্ত আবারও জেরিনের মুখের দিকে তাকায়। বিরক্তি নিয়ে বলে,

_“দেখো, না আমি তোমাকে কখনো কথা দিয়েছিলাম,আর না তুমি এর আগে কখনো ভালোবাসার কথা আমাকে জানিয়েছিলে। তাহলে এখন এমন করছো কেন?” আগে জানালেও শান্ত কখনো রাজি হতো না,তবু বলল।

_“ এটা জানানোর কী আছে? আমাদের বিয়ের কথা পারিবারিক ভাবেই ঠিক করা ছিল!”

_“ তুমি কী একবারও জানতে চেয়েছ আমি রাজি কিনা?”

জেরিন নিরব রইল। সে জানতে চায়নি, এর প্রয়োজনও মনে করেনি।যেখানে তাদের দুই পরিবারের মাধ্যমে সব ঠিক হয়েছিল সেখানে শান্তর অনুভুতি জানার জরুরী ছিল না।জেরিন ছোট থেকেই দেখত ওর বাবা আর ইয়াসির আঙ্কেল মিলে তাদের কথা বার্তার মধ্যে হুটহাট শান্ত আর জেরিনকে নিয়ে কথা বলত। শান্তকে জেরিন যতবার দেখেছে ততবারই মুগ্ধ হয়েছে। কিন্তু শান্তর গম্ভীর্যতার কারণে কখনো কথা বলেনি।

কিন্তু আজ শান্তর মধ্যে এমন ম্যাচিউর ভাব দেখে প্রথমে একটু অবাক হয়েছে। আগের শান্ত আর এখনকার শান্তর মধ্যে রাত-দিন তফাৎ। শুধু কথার ধরণ আগের মতোই।

শান্ত ছোট করে শ্বাস ফেলে বলল,

_“ যেতে হবে।আর কিছু বলবে?”

_“ ভালোবাসি।” জেরিনের কন্ঠ ভেঙে এলো।

_“ আর?”

জেরিন নিজের চোখ মুছে কন্ঠ একটু শক্ত করে বলল,

_“ আমি তোমার বউ,বাচ্চাকে দেখতে যাই।”

_“ দেখে কী লাভ?”

_“দেখতে চাই।”

শান্ত একটু হাসল।

_“ সে খুব সাধারণ,জেরিন! তোমার মতো এত স্টাইলিস্ট না।যদি কাব্যিক ভাষায় বলি,

‘সে গোলাপের মতো ঝলমলে নয়,

বেলি ফুলের মতো নীরব, নিস্তব্ধ,

তবু বুকের ভেতর চুপচাপ ঘ্রাণ ছড়িয়ে যায়।’ ”

___

পরদিন বিকেলে ওরা সবাই পার্কে যায়। শান্ত বাইক নিয়ে আগেই চলে গেছে।অনুভা আর ন্যানি হেঁটে যাচ্ছে।কোলে ছোট্ট আরাফ।অনুভার পড়নে হাটু সমান প্রিন্টের কুর্তি।নিচে সাদামাটা কালো প্যান্ট।মায়ের কোল থেকে চোখ খানিক বড় বড় করে চারপাশ দেখছিল আরাফ ।প্রথমবার বাইরের আলোয় ওর দৃষ্টি থমকে থমকে ঘুরে বেড়ায়।একটু পরপর ঠোঁটের কোণ ক্ষীণ নড়াচড়া করে মৃদু হাসি দিচ্ছে অনুভার ছোট্ট বাচ্চা।অনুভা খুব সাবধানতার সঙ্গে ছেলেকে নিয়ে বের হয়েছে। দু'টো মোটা মোটা তোয়ালের ভেতর জড়িয়ে রেখেছে। অনুভার সাথে তাল মিলিয়ে তার পাশে ন্যানি দু'হাতে আরাফের Baby carriage ঠেলে নিচ্ছিল,যেটা কাল রাতে শান্ত কিনে এনেছিল। ন্যাটিটা অনেক ভালো,অনুভার সঙ্গে খুব মিশে গেছে।তার বয়স শান্ত আর অনুভার চেয়ে বেশিই হবে।

অ্যাপার্টমেন্ট থেকে পার্ক কাছে হওয়ায় তাড়াতাড়িই পৌঁছে গেল তাড়া। শান্ত এক পাশে বাইকের সঙ্গে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।অনুভাকে দেখতেই এগিয়ে এসে আরাফকে নিজের কাছে নিলো।অনুভার দিকে নজর বুলিয়ে বলল,

_“ এটা পড়ে সামলাতে পারবে?”

_“ এর চেয়ে শর্ট কিছু পড়তে পারব না।”

_“ ওকে ফাইন,চলবে।”

শান্ত ন্যানির কাছে গিয়ে বলল,

_“ আরাফকে এখন রাখুন,সায়রা আপু।ঘুমালে ক্যারিজে শুইয়ে দেবেন।”

অনুভা আরেকবার আরাফের কাছে গিয়ে তার গালে ছোট করে চুমু খেয়ে এলো। তারপর বাইকে এসে বসে হ্যান্ডেলে হাত রাখতেই তার হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়। শান্তর দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকায়। শান্ত পাশ থেকে সাবধানে অনুভার হাতের পাশে হাত রাখল, যেন ব্যালেন্স ঠিক রাখতে পারে। চাকা ঘুরতে শুরু করলেই শান্ত মৃদু,স্থির কন্ঠে বলল,

_“ধীরে, হাত শক্ত রাখো। ঠিক আছে?”

অনুভা মাথা নাড়িয়ে সামনে এগোতে চাইলেই পা মাটিতে টেনে ধরে। বাইকের ওজন অনুভার চেয়ে দ্বিগুন হওয়ায় ভারসাম্য রাখা কঠিন হয়ে পড়ছিল ।পরপর কয়েকবার এমন হয়।শান্ত পাশে দাড়িয়ে চমৎকার ধৈর্য সহকারে তাকে উৎসাহ দিচ্ছিল।

_“ঠিক আছে, এবার আরেকবার চেষ্টা করো, বেশি তাড়াহুড়া করো না, শুধু ভারসাম্য বজায় রাখো।আমি আছি।” অনুভা আবার চেষ্টা করল। এভাবে কয়েকবার চেষ্টার ফলে একটু একটু সফল হচ্ছিল, কিন্তু বেশি দুর যাওয়ার আগেই বারবার থেমে যাচ্ছিল।

এভাবেই শান্ত ওকে প্রতিদিন গাইড করছিল। প্রতিদিন বিকেলেই পার্কে এসে প্র্যাকটিস করা হতো।আজকে সাত দিনের মাথায় অনুভা খুব ভালোভাবেই শিখে ফেলেছে।আজ আর পাশে শান্তকে দাঁড়াতে হয় নি। শান্তর থেকে একটু দুরে অনুভা নিজ মনে বাইক চালাচ্ছে।

বাতাসে তার চুল খেলছে, চোখে-মুখে উচ্ছ্বাস স্পষ্ট, আর মনে হচ্ছে সে এই ছোট জয়ের আনন্দের মধ্যেই ভেসে চলেছে। শান্ত দূর থেকে তাকিয়ে খুশি হয়,মৃদু হাসি ফোটে তার মুখে।

পার্কের অন্য পাশে, ন্যানি আরাফকে ক্যারিজে শুয়ে রেখে দাঁড়িয়ে আছে, আর চোখে সহমর্মিতা আর হাসি মিশে আছে।শান্ত সেদিকে গিয়ে ক্যারিজ ঠেলে আরাফকে নিয়ে হাঁটা শুরু করল।একবার ঘুমন্ত আরাফের দিকে দেখে আবার দুরে থাকা অনুভার দিকে তাকায়।কে বলবে এই বাচ্চার মা ওই মেয়ে? মনে মনে ভাবল শান্ত। কয়েক মাসের ব্যবধানে কত কিছু হয়ে গেল মেয়েটার সাথে! যদিও এখন অনুভার মধ্যে সে-সব বিষয় নিয়ে কোনো অস্থিরতা দেখতে পায় না। এইযে এখন হাসছে,এটাই তো দেখতে চেয়েছিল।অনুভার মুখে যখন তার ইচ্ছার ব্যাপারে শুনল শান্ত প্রথমে অবাক হয়েছিল। অনুভার মতো সাদাসিধে মেয়ের মধ্যেও এমন কোনো শখ লুকিয়ে থাকতে পারে তার কল্পনাতেও ছিল না।

এভাবেই যদি মেয়েটা কোনো একদিন শান্তকে ভালোবাসত।উষ্ণতা নিয়ে তার চোখে চোখ রাখত,হাতে হাত রাখত,কাঁধে মাথা রেখে নিজের স্বপ্ন বুনত। ভাবতে ভাবতে শান্ত আরাফকে ক্যারিজ থেকে কোলে তুলে নেয়। হেঁসে কপালে চুমু খেয়ে হাঁটতে হাটতে আনমনে গেয়ে ওঠে,

_“ রোজ বিকেলে,আতর ঢেলে,

তোকে সাজাবোই…

মেলায় যাব,রিক্সায় চড়ে,

বসবি পাশে তুই…

বন্দী আছে,হাজার আশা,

বুকের মাঝে দেখ…

একটু চিনে নিলেই হবো,

দু'জন মিলে এক…”

___

_“অনুভা! দাড়া..একটু শোন।অনুভা!”

তায়ানের দু’পা লোহার শিকলের সঙ্গে আটকে আছে। দু'হাত শক্ত দরি দিয়ে বাঁধা। কিন্তু অনুভা তো চলে যাচ্ছে। আবছা অন্ধকারে নীল শাড়ি পড়ে ধীর পায়ে পিছিয়ে যাচ্ছে।চোখে মুখে ভীষন ক্লান্তি, মায়াভরা সুন্দর মুখটা একেবারে রুক্ষ। বাতাসে চুল গুলো এলোমেলো ভাবে সেই নিস্প্রান মুখে এসে পড়ছে। চারপাশের এই গভীর অন্ধকারে শুধু অনুভার অস্তিত্বটুকু স্পষ্ট।বাকি সব স্পষ্ট, আবছা।ভেজা চোখ দুটোর চাহনি ঠেসমার মতো কঠোর।তায়ানের মনে হলো হাত বাড়ালেই ছুতে পারবে, কিন্তু কোনোভাবেই ছুয়ে দেখতে পারছে না। সে কোনো এক অদৃশ্য বাধা যেন তাকে বার বার আটকে দিচ্ছে।

_“অনু!”

তায়ান ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে।নিশ্বাস দ্রুত ওঠানামা করে।গলা শুকিয়ে আসে তার।শরীর ভিজে উঠেছে। নীল শাড়ি!সেই নীল শাড়ি, কয়েকমাস আগে যেই শাড়ি পড়া অবস্থায় তায়ান মেয়েটাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল।শুধু বাড়ি থেকে না,জীবন থেকে। আচ্ছা অনুভার পেটে ওটা কী ছিল? উঁচু হয়ে আছে যে! কী ওটা? এর আগেও দেখেছে। একই ভাবে একই স্বপ্ন বার-বার দেখছে! সে তো এগুলো নিয়ে ভাবতে চায় না। সে কোনো ভুল করেনি,তাহলে কেন সেই মুখ ভেসে ওঠে,কেন ঘুমোতে পারে না?

তায়ান হাফসাফ করে।পাশ থেকে ফোন হাতরে নিয়ে দেখে ভোর হয়ে গেছে। একটু আগেই এলেনার বাবার সঙ্গে একটা মিশন সেরে এসে ঘুমিয়েছিল।ক্লান্ত থাকায় চোখ লেগে এসেছিল।তায়ান চুল খামচে ধরল।পাশের টেবিলে থাকা ম’দের বোতলটা ছুঁড়ে মেরে চি’ৎকার করে উঠলো।

_“ ওরা ভুল করেছে।ও ওর চাচার ভুলের মাশুল দিয়েছে।আমি ওর চাচার শাস্তি ওকে দিয়েছি। কারণ ওই বংশের রক্ত ওর শরীরেও বোইছে। আমি কোনো ভুল করিনি,নো।” তায়ান আরেকটা গ্লাস ছুঁড়ে মারে।

_“I hate my past and want to f/ucking forget it.”

বিজ্ঞাপন
রক্ত রেখার আড়ালে গল্পটি আয়েশা শেখ রিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে মোড়ানো থ্রিলার উপন্যাস