One day I'm gonna fly away
One day when heaven call's my name.
I lay down,I close my eyes at night..
I can see morning light.
পাহাড়ের উঁচু ঢাল বেয়ে আসা শীতল সমীরণে অনুভার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উড়ছিল।অবাধ, মুক্ত, ঠিক তার গলার সুরের মতোই। গায়ে জড়ানো শুভ্র রঙের মিডি ড্রেসটি বাতাসে দুলে উঠছিল।
পাহাড়ের একদম কিনারায় দু’হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে আছে অনুভা। চোখ দুটো আলতো করে বন্ধ, ঠোঁটের কোণে নীরব একটুকরো হাসি। চারপাশে কেবল বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ, নিচে অসীম গভীরতা, আর ওপরে নীল আকাশের অন্তহীন বিস্তার।এই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল সে সত্যিই উড়ে যেতে পারে। সব বাঁধন, সব ভয়, সব ক্লান্তি পেছনে ফেলে। তার কণ্ঠে ভেসে আসা ইংরেজি গান আর পাহাড়ি হাওয়ার সুর মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। অনুভা এবার সেখানে বসলো। নিজের ফর্সা, নগ্ন পা ঝুলিয়ে দিলো পাহাড়ের কোনায়।নিচে এতো গভীর খাদ, তবু মেয়েটার মধ্যে কোনো ভয় নেই।পেছনে তার বাইকটা রাখা।
এই কয়েক মাসের ভেতর এখানে সে কতো বার এসেছে হিসেব নেই। শুধু মাত্র এই জায়গাটার জন্যই শান্তর কথা অমান্য করে মার্সেই তে রয়ে গেছে। নাহলে কবেই প্যারিসে স্থায়ী ভাবে চলে যেত।
দূর থেকে সরু পাহাড়ি রাস্তাটা সাপের মতো এঁকেবেঁকে উঠে এসেছে চূড়ার দিকে। এক পাশে খাড়া পাথুরে ঢাল, অন্য পাশে গভীর খাদ।তার মাঝখান দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে একটি গাড়ি।স্টিয়ারিংয়ে শান্ত। মুখে চাপা দৃঢ়তা, চোখে অদ্ভুত এক টান। তার কোলের কাছে সুরক্ষিত ভাবে বসে আছে এক বছর বয়সি ছোট্ট ছেলে আরাফ। এক মাস আগেই তার প্রথম জন্মদিন গিয়েছে।
জানালার বাইরে তাকিয়ে সে হাওয়ার শব্দে চমকে ওঠে, আবার পাশে থাকা বাবার দিকে তাকিয়ে নিশ্চিন্ত হয়।কিন্তু দীর্ঘ সময় কান্নার তোরে মুখখানি লাল হয়ে আছে।
গাড়িটা যত উপরে ওঠে, তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে পাহাড়ের কিনারায় বসে থাকা সাদা পোশাকের অবয়ব। হিমেল বাতাসে উড়তে থাকা কালো চুল, পা ঝুলিয়ে বসে থাকা অনুভাকে।দূর থেকেও তাকে চিনে ফেলে শান্ত।সে জানে এখানে ছাড়া আর কোথাও আসবে না।তাই সকাল সকাল অ্যাপার্টমেন্টে না পেয়েই আরাফকে নিয়ে চলে এসেছে এখানে।ছেলেটাকে একা রুমে ফেলে চলে এসেছে।
আরাফের কান্না আওয়াজে ঘুম ভাঙে শান্তর।তারপর অনুভার রুমে গিয়ে দেখে বিছানার মাঝখানে বসে গলা ফাটিয়ে “মা…মা…” ধরনের অস্পষ্ট শব্দ বের করে কান্না করছিল। ছোট বুকটা কাঁপছিল, শ্বাস টেনে টেনে কাঁদতে কাঁদতে মাঝে মাঝে হেঁচকি উঠে যাচ্ছিল। শান্তর দেখা পেতেই জোরে চিৎকার করে উঠে, হাত বাড়িয়ে কোলে উঠতে চায়।
গাড়ি থামার শব্দে পেছন ঘুরে তাকায় অনুভা। দেখে শান্ত গাড়ি থেকে নেমে আরাফকে কোলে নিয়ে এদিকেই আসছে। অনুভা আবারও সামনে ঘুরে তাকায়, যেন তারা আসাতে খুব বেশি অবাক হয়নি। শান্ত অনুভাকে পাহাড়ের কিনারার একদম ধারে বসে থাকতে দেখে রাগিত কন্ঠে বলল,
_“তোমাকে কতবার বলেছি কিনারায় যাবে না!”
অনুভা একই ভাবে বসে থেকে বলল,
_“এত ভয় পান কেন?”
_“ভয় পাবো না? যদি পড়ে যাও,আমার আর আরাফের কী হবে?” শান্ত বলল।
অনুভা উঠে আসল।বাতাসে উড়তে থাকা চুলগুলো মুখে এসে পড়ছিল, তবুও তার চোখ ছিল শুধু আরাফের দিকে।মা’কে দেখতেই ছোট্ট আরাফের ঠোঁট কেঁপে উঠল,তারপর আবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে। দু’হাত বাড়িয়ে দিল শান্তর কোল থেকে, শরীরটা সামনে ঝুঁকিয়ে মায়ের কাছে যেতে চাইলো।অনুভা তড়িঘড়ি এগিয়ে এসে কোলে নিতে চাইতেই শান্ত এক পা সরে গেল।রাগ দেখিয়ে বলল,
_“ না,তুমি ওকে নেবে না।”
অনুভা অবাক কন্ঠে বলল,
_“ওমা,কেন? দিন কাঁদছে তো!”
শান্ত দাঁত চে'পে জেদ দেখিয়ে বলল,
_“কাঁদছে? ও একা ঘরে কাঁদছিল, মাহভিন! তুমি কোথায় ছিলে তখন?”
অনুভা মুচকি হাসলো।শান্ত আবারও বলল,
_“বারবার একই কাজ করো! তুমি কী বোঝো না বাচ্চারা মায়েদের দেখতে না পেলে কেমন অসহায়দের মতো করে কাঁদে?”
_“ বুঝি তো,এজন্যই তো এখন ওকে নিয়ে আদর করতে চাচ্ছি। আপনিই তো দিচ্ছেন না!”
_“ তাহলে ওকে একা রেখে এসেছ কেন?”
_“একা কোথায়? পাশের রুমে ওর বাবা ছিল।” অনুভা বলল।
শান্ত প্রথমে অনুভার কথা বুঝে উঠতে না পাড়ায় ভ্রু কুঁচকে গেল।কয়েক সেকেন্ড পর বুঝলো বাবা বলে শান্তকেই বুঝিয়েছে।শান্তর কুঁচকে যাওয়া ভ্রু আবার সমান হয়ে এলো। এতক্ষণের চে'পে রাখা জেদ আগুনে ফেলা বরফের মতো গলে গেল।শান্ত লম্বা শ্বাস ফেলে আরাফকে দিয়ে দেয় অনুভার কোলে।ছেলেটাও আর শান্তর কোলে থাকতে চাইছে না কোনো ভাবেই।
অনুভা আরাফকে কোলে নিতেই শিশুটি চুপ হয়ে গেল। ছোট্ট চোখগুলো ভরপুর বিশ্বাস আর আরাম দেখাচ্ছিল। সে মা বলে ডাকল।আরাফ এখন ধীরে ধীরে স্বস্তি পেয়েছে। সে অনুভার কোলে হালকা জড়ো হয়ে বসে আছে, ছোট্ট হাতগুলো ধীরে ধীরে মা’কে আঁকড়ে ধরেছে।অনুভা আরাফকে মা বলাই শিখিয়েছে। তেমন ভাবে কথা শেখেনি এখনও। অনুভাকে মা, আর শান্তকে পাপা সহ টুকটাক ছোটছোট শব্দ অস্পষ্ট ভাবে উচ্চারণ করতে পারে।
_“এভাবে না বলে আর বের হয়ে আসবে না।” শান্ত বলল।
_“ আসলে,আমি ভেবেছিলাম ও জেগে ওঠার আগেই আমি ফিরে যেতে পারব।” অনুভা নিজের ভাবনা প্রকাশ করল।
_“ এই অযুহাত আর কতবার দেখাবে?” শান্ত এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল।
_“কী করব,আমার এখানে ভালো লাগে।”
_“কিন্ত এবার আমাদের প্যারিসে যেতেই হবে। এখানে থাকলে চলবে না।সেখানকার ক্লাব গুলোতে সুযোগ সুবিধা বেশি,আর লাস্ট সেখানকার রেসের পর ক্লাবের পরিচালক চাইছে তুমি তাদের ক্লাবের হয়ে রেস করো।”
_“ আবার শুরু করলেন?”
_“ তুমি বোঝার চেষ্টা করো,মাহভিন। ওখান থেকে তুমি ইন্টারন্যাশনালি রেস করতে পারবে।”
_“ প্যারিস শহর আমার ভালো লাগে না। লাস্ট বার সেখানে আমার দমবন্ধ হয়ে আসছিল। আর সেখানে এই প্রশান্তিময় জায়গাও নেই।” তারপর অনুভা মুখটা ছোট করে বলল,
_“ আসলে আমি এই জায়গাটার মায়ায় পড়ে গেছি।”
শান্ত বোঝানোর চেষ্টা করল।
_“তবুও যেতে হবে। বললাম না ওখান থেকে তুমি ইন্টারন্যাশনালি রেস করতে পারবে।”
_“ আমার এতো কিছুর দরকার নেই,শান্ত। শুধু বাইক চালানো শখ ছিলো, আর আপনি আমাকে কতো উপরে উঠিয়ে দিয়েছেন,এটাই অনেক।” অনুভা বলল।
শান্ত গভীর, দৃঢ় স্বরে,অনুভার দিকে অটল দৃষ্টি ফেলে বলল,
_“প্রতিভা লুকিয়ে রাখার জিনিস না, কাজে লাগানোর জিনিস,বুঝলে? প্রত্যেকটা মানুষের ভেতরেই কোনো না কোনো আলাদা আলো থাকে। কেউ সেটা চিনতে পারে, কেউ পারে না। কিন্তু খুঁজে বের করার দায়িত্বটা নিজেরই। যতদিন না নিজেকে চ্যালেঞ্জ করবে, ততদিন জানবেই না ভেতরে কী শক্তি লুকিয়ে আছে।তোমাকে আগেও বলেছি স্বপ্ন দেখতে ভয় পেও না।”
অনুভা শান্তকে যত দেখে ততই মুগ্ধ হয়। এই দু'বছরে কত পরিবর্তন, দায়িত্বশীল হয়ে গেছে লোকটা! অথচ সে-ই এক সময় বখাটে ছেলের মতো অনুভাকে জ্বালাতন করত। মায়া হয় ছেলেটার জন্য অনুভার। তাকালেই কেমন মায়া মায়া লাগে।
অনুভার ভাবনার মাঝেই আরাফ আধো কন্ঠে বলল,
_“ মা, বাসায়।”
_“ বাসায় যাবে,বাবা?”
_“উমম!”
অনুভা চুমু খেলো আরাফের গালে।ছেলেটা একদম হুবহু তার মতো হয়েছে।গায়ের রঙ,মুখের আকৃতি। কিন্তু অনুভার মতো শান্ত স্বভাবের না,ভীষণ দুষ্ট। বাসায় এক মুহুর্তও স্থীর থাকে না।অনুভা শান্তর দিকে তাকিয়ে বলল,
_“ বাসায় চলুন, বাকিটা পরে ভেবে দেখব।”
শান্ত ধীরে মাথা নাড়ল। আর কোনো কথা বলল না। শুধু আরাফকে একটু শক্ত করে বুকে টেনে নিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। ছোট্ট ছেলেটা বাবার কাঁধে মাথা রেখে চুপচাপ হয়ে আছে, মাঝে মাঝে অস্পষ্ট স্বরে কিছু বলছে। আরাফের মতে শান্তই তার বাবা। রক্তের সম্পর্ক নেই,তবু আগলে রাখার ভঙ্গিতে, যত্নের সূক্ষ্মতায়, রাত জেগে পাশে বসে থাকার অভ্যাসে,শান্তই যেন তার পুরো পৃথিবী।হয়তো নিজের বাবাও এতো আগলে রাখত না, শান্ত যেভাবে রাখে। আরাফ যেমন অনুভার জন্য পাগল, তেমনি শান্তর জন্যেও। শান্তকে যখন আধো আধো কন্ঠে পাপা বলে ডাকে অনুভার ভালো লাগে না। অস্বস্তি লাগে, কারণ সত্যিটা অন্যরকম। শান্ত তার স্বামী নয়। আরাফের জন্মদাতাও নয়। তবুও কখনও সে আরাফকে থামায়নি। নিজের অবুঝ ছেলেকে সত্যের বোঝা চাপিয়ে দিতে মন সায় দেয় না।
এইযে অনুভা দাঁড়িয়ে দেখছে ওরা যাওয়ার মাঝেই শান্ত কয়েকবার আরাফের গালে চুমু খাচ্ছে,আহ্লাদি স্বরে এটা ওটা বলছে। শান্ত দরজা খুলে আরাফকে সিটে বসিয়ে সিটবেল্ট ঠিক করে দিল। তারপর নিজেও ড্রাইভারের সিটে বসল। একবার কাঁচের ভেতর দিয়ে বাইরে তাকাল,অনুভার দিকে।
ওদিকে অনুভা নিজের বাইকের পাশে দাঁড়িয়ে। কালো লেদার জ্যাকেটটা বাইকের উপর থেকে নিয়ে গায়ে চড়াল। হাতের গ্লাভস ঠিক করল।নিচু হয়ে বুটজোড়া ঠিক করে পায়ে গলাল, ফিতেগুলো শক্ত করে বাঁধল।তারপর হেলমেটটা তুলে মাথায় পরল। এক টানে বাইক স্টার্ট করল সে। ইঞ্জিনের গর্জন পাহাড়ি নীরবতাকে চিরে দিল। শান্ত গাড়ি স্টার্ট দিতেই দু’জনের যান আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে পাশাপাশি এগোতে শুরু করল। এক পাশে পাহাড়ের ঢাল, অন্য পাশে গভীর খাদ,তার মাঝখানে পাশাপাশি চলেছে গাড়ি আর বাইক।
গাড়ির ভেতর বসে আরাফ কাঁচে ছোট্ট হাত ঠেকিয়ে রেখেছে। বাইকের গর্জন শুনলেই তার চোখ চকচক করে ওঠে। বাইকের শব্দ মানেই তার মা।পাশে ছুটে চলা হেলমেট পরা অবয়বটা দেখেই সে খুশিতে অস্পষ্ট স্বরে বলে ওঠে, “মা… মা…”। বাইকটা একটু দূরে সরে যেতেই সে অস্থির হয়ে শান্তর জামা আঁকড়ে ধরে। শান্ত একটু হেসে, হালকা খেলাচ্ছলে বলল,
_“দেখো তো, মা কত ফাস্ট! আমাদের হারাতে পারবে নাকি?” বলেই শান্ত গাড়ির স্পীড বাড়িয়ে দিলো। আবারও দু'জনের যান পাশাপাশি হলো। তা দেখে আরাফ খুশিতে হাততালি দেয়। শান্ত তার পাশের কাচ নামিয়ে অনুভাকে উচ্চস্বরে বলল,
_“ ধীরে চালাও, রাইডার। আমাদের হারানোর প্ল্যান করেছ?”
অনুভার চোখ দুটোতে দুষ্টুমি ঝিলিক দিল। হাসি চে'পে রেখে বলল,
_“ আসুন একটা রেস হয়ে যাক। কার vs বাইক।”
_“ নাহ থাক হেরে গেলে আবার কাঁদবে৷” পাশে আরাফের দিকে তাকিয়ে হেঁসে বলল,
_“ কী বলো, পাপা?”
আরাফ কিছু বুঝলো কি-না কে জানে, সেও বাবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে হেঁসে মাথা নাড়াল।
_“ আমাকে কী আপনার এতো দুর্বল মনে হয়?” অনুভা বলল।
_“ না, না, তুমি অনেক স্ট্রং।” শান্ত একটু ঠাট্টার ভঙ্গিতে বলল।
অনুভা বুঝলো শান্ত মজা করছে। তাই দুষ্টুমি চালিয়ে বলল,
_“ তাহলে ভয় কিসের? স্ট্রং রাইডারকে চ্যালেঞ্জ দিন দেখি।”
_“ ওকে চ্যালেঞ্জ, দেখি কে জয়ী হয়।”
অনুভা মাথা নাড়িয়ে বাইকের স্পীড বাড়াল। শান্তও বাড়াল তবে এক মুহুর্তের মধ্যেই স্পীড স্বাভাবিক করে ফেলে। নাহলে তার ছেলে আবার ভয় পাবে। ছেলেটার ছোট্ট শরীরটা সামান্য দুলে উঠেছিল স্পিডে। অনুভা এতক্ষণে অনেক সামনে চলে গেছে। শান্ত ছেলের দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বলল,
_“ এই যে, দেখলে? আরাফের মা কিন্তু দারুণ ফাস্ট রাইডার। আমাদের কীভাবে হারিয়ে দিলো।” তার গলায় ছিল গর্ব মেশানো মজা।
আরাফ আদৌও বুঝলো কি-না সে কথা কে জানে। সে তখন পুরো মন দিয়ে সামনে তাকিয়ে আছে। বড় বড় কৌতূহলী চোখ, ভ্রু কুঁচকে,যেন দূরের হেলমেট পরা অবয়বটার এক ঝলকও মিস করতে চায় না। বাইকটা একটু বেশি দূরে যেতেই তার ঠোঁট কেঁপে উঠে। চোখদুটো টলমল, অস্থির,মা’কে চোখের সামনে রাখার একরোখা চেষ্টা। শান্তর দিকে তাকিয়ে ফুপিয়ে উঠে বলল,
_“ পাপা! মা..” বলেই ছলছলে চোখে সামনে তাকিয়ে আঙুল দিয়ে দেখাল। হয়তো বোঝাতে চাইল তার মা চলে যাচ্ছে। ছেলের এমন অসহায় ভঙ্গি দেখতেই শান্তর হৃদয়টা নরম মাটির মতো গলে গেল। বুকের ভেতর কেমন টান মেরে উঠল। সে আলত হাতে আরাফের বাহু ধরে নিজের উরুতে এনে বসায়, মাথায় চুমু খেয়ে নরম স্বরে বলল,
_“ এই তো…মা সামনেই আছে, মাই বয়। কোথাও যায়নি..আর আমি আছি না? পাপা আছে তো। আমরা এখনি মা’কে ধরে ফেলব।” সে এক হাতে আরাফকে নিজের সঙ্গে চে'পে ধরে অন্য হাতে গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেয়।
অনুভা এতক্ষণে অ্যাপার্টমেন্টের গ্রাউন্ড ফ্লোরে পৌঁছে যায়। শান্ত গাড়ি থেকেই দেখতে পায় শান্তকে হারিয়ে নিজে জয়ী হওয়ার উচ্ছ্বাসে মেয়েটার মুখটা কেমন দীপ্ত হয়ে উঠেছে। হেলমেটের আড়ালেও সেই আনন্দ লুকোনো যায় না। চোখদুটো যেন আলো ছড়াচ্ছে।তার কাছে যাওয়া মাত্রই খুশিতে এটা ওটা বলে শান্তকে খোঁচা মারবে। এমন তো নতুন কিছু নয়। এর আগেও কতবার এমন হয়েছে।কিন্তু শান্ত কি এতে মন খারাপ করে?
না। বরং সে তো ইচ্ছে করেই হেরে যায়। কারণ এই সামান্য হার মানে যদি তার মুখে ওই স্নিগ্ধ, বিজয়ী হাসিটা ফুটে ওঠে,তবে এমন হার সে বারবার মেনে নিতে রাজি। প্রতি মুহূর্তে, প্রতি খেলায়। মাহভিন হাসুক। এভাবেই উজ্জ্বল হয়ে, নির্ভার হয়ে। আজ, কাল, আর সারাজীবন।
__
সকাল সকাল ঘুম ভেঙে গিয়েছিল আরাফের, তাই বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে আরাফ ঘুমিয়ে পড়েছে। অনুভা রুমে এসে শুইয়ে দিলো। চলে আসবে তখন দেখল অনুভার জামা ছোট ছোট হাতে আকরে ধরে আছে। অনুভা নিচু হয়ে তাকাতেই দেখল, আরাফের চোখের পাতা কাঁপছে। ঘুম আর জাগরণের মাঝামাঝি এক মায়াভরা অবস্থা। অনুভা মুচকি হেসে আরাফের পেটে কাতুকুতু দেওয়ার মতো করে বলল,
_“ খুব দুষ্ট হয়েছেন তাইনা?”
আরাফ এবার চোখ মেলে তাকাল। আধো ঘুম জড়ানো স্বরে বলল,
_“মা…”
_“ বলো সোনা। মা সাথে ঘুমোবে?” অনুভা মিহি কন্ঠে বলল।
আরাফ কিছু না বলে শুধু হাত বাড়িয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরল। মাথা নাড়িয়ে ইশারা করল। অনুভা পাশে শুয়ে আরাফের ছোট্ট শরীরটা নিজের সঙ্গে জড়িয়ে নিল। আরাফ মুখ গুঁজে দিল মায়ের বুকে, এক হাত এখনো জামা আঁকড়ে ধরা। মুহূর্তের মধ্যেই তার নিঃশ্বাস ধীর হয়ে এলো। মায়ের উষ্ণতায় জড়িয়ে, নিশ্চিন্ত ঘুমে ডুবে গেল সে। অনুভা আরাফের গুলুমুলু গালটায় হাত বুলিয়ে দেয়। সে কী কখনো এভাবে নিজের মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়েছিল? তার মা তো তার জন্মের সময়ই চলে যায়। অনুভা পুরোনো দিনের কোনো কিছুই সে মনে করতে চায় না। কিন্তু কয়েক মাস আগের নেওয়া সেই জঘন্য, ভুল সিদ্ধান্ত তাকে আজও পোড়ায়। সে কীভাবে নিজের ছেলেকে দুনিয়াতে না আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল? এই ছেলেকে,যে এখন তার বুকের সঙ্গে মিশে আছে! অনুভার একমাত্র নিজের অস্তিত্ব, নিজের গর্ভের সন্তান। কত নিষ্ঠুরতম কাজ সে করতে চেয়েছিল। সেদিন শান্ত না বোঝালে আজ এই উষ্ণ নিঃশ্বাস, এই ছোট্ট বুকের স্পন্দন কী সে অনুভব করতে পারত? এই-যে এত মায়া করে মা ডাকে তাকে, এক মুহুর্ত না দেখলেই অস্থির হয়ে পড়ে, সে কী জানে তার ভরসার মানুষটাই তাকে অস্বীকার করতে চেয়েছিল? অনুভার বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। যাকে সে পৃথিবীর আলো দেখাতে চায়নি সেই আজ তার পুরো পৃথিবী।
আরাফ শুধু তার সন্তান নয়,তার বেঁচে থাকার কারণ, তার শেকড়, তার শ্বাসপ্রশ্বাস। অনুভা চোখ বন্ধ করে ছেলেকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। তার এ জীবনে আর কিছুর প্রয়োজন নেই। এটাই অনুভার পূর্ণতা। এটাই তার সবটুকু।
__
কাঁধে ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তায়ান। আজ এতগুলো মাস পর সে আবারও বাংলাদেশে এসেছে। সব সময়ের মত মুখে মাস্ক,ক্যাপ পড়েই এসেছে। চোখে থাকা রোদ চশমা খুলে ফেলে। অনুভা এখানে নেই জেনেও এসেছে। তার আর্জেন্টিনাতে দম বন্ধ হয়ে আসে। কিন্তু এখানে এসে আজ আরও বেশি দম আটকে আসছে। সে নিজের বাড়ির সদর দরজায় দাঁড়িয়ে। যেখানে দু'বছর আগে সে নিজের স্ত্রীকে ঘার ধা’ক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছিল। তায়ান দু চোখ বন্ধ করে ফেলে। এর আগেও সে এ বাড়িতে এসেছে কিন্তু আজকের মতো অস্থির লাগেনি। এমন কেন লাগে তার? কোথায় গেলে সে শান্তি পাবে? কোথাও কী একটু স্বস্তির জায়গা নেই? বের হয়ে যায় সে এ বাড়ি থেকে। ফেক আইডি কার্ড দিয়ে সে একটা হোটেলে উঠে। তবু হোটেলের এক ছেলে বলে,
_“ স্যার, আপনাকে অনেকটা চেনা চেনা লাগছে। কিছু মনে না করলে মাস্ক আর সানগ্লাসটি খুলবেন? মানে ক্যাপটাও যদি খুলতেন..”
_“ রুমের চাবি দাও আমার সময় কম।” তায়ান গভীর স্বরে বলল।
_“ ইয়ে মানে..স্যার আপনাকে একজনের মতো লাগছে।”
_“ কার মতো?” তায়ান জানে কার কথা বলবে তবু জিজ্ঞেস করল।
ছেলেটি খুব আগ্রহ নিয়ে বলল,
_“ ওই-যে.. ফুটবলার। আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের ফুটবলার টি.এইচ.ভি! শুনেছিলাম তার জাতীয়তা বাংলাদেশি। সে অনেক ভালো খেলতো, তবে বর্তমানে এসব প্রায় ছেড়েই দিয়েছে।”
_“ ওহ.. যাইহোক, আমি সে নই। চাবি দিন।”
ছেলেটা বোধহয় তায়ানের উপর বিরক্তই হলো। একে তো ভুতের মতো এসেছে তার উপর আবার এমন বেরসিক মানুষ! কাকে কী বলল। অযথাই..
তায়ান তখন নিজের রুমে চলে যায়। কিন্তু সেখানেও মন না টেকায় বেড়িয়ে পড়ে বাহিরে। হাটতে হাটতে কোথায় চলে এসেছে তার খেয়াল নেই। রাস্তার মানুষজন তার এই অদ্ভুদ ভঙ্গিতে অবাকই হচ্ছে। তায়ান এসবের ধার ধারল না। কারণ সে জানে বাঙালি এমনই, অল্প কিছুতেই অবাক হয় এরা। তায়ান এর আগে বাংলাদেশে এসে চলাফেরা করলেও বেশির ভাগ সময় গাড়ি বা বাইকেই চলাফেরা করত, তাও রাতে। হাটার মাঝেই একটা বিড়াল চোখে পড়তেই তার হৃদয় তীব্র ভাবে কম্পিত হয়। তার পা থেমে যায় আচমকা। চোখ থেকে চশমা খোলে। দেখে বিড়ালটার সাথে ছোট্ট একটা মেয়ে খেলছে। তারপর দ্রুত কদমে সেদিকে এগিয়ে যায়। বিড়ালটাকে ছো মে'রে নিজের হাতে নিয়ে নেয়। খুব গভীর চোখে নরজ বোলায় সেদিকে। আকাড়ে একটু বড় হলেও এটাই যে অনুভার সেই বিড়াল তা বুঝতে বাকি নেই তায়ানের। কী যেন নামে ডাকত অনুভা? তায়ান মনে করার চেষ্টা করে। একটা কন্ঠ মনে পড়ে,
‘ আমার টিনটিনকে এভাবে ছুঁড়ে মারলেন কেন’ অনুভা বলেছিল সেদিন। প্রথম দিন। তায়ানের মনে পড়ে। হালকা ঠোঁট নেড়ে বিরবির করে,
_“ টিনটিন!”
এদিকে পিচ্চি মেয়েটা তার শখের বিড়াল নিয়ে নেওয়ায় দু’পায়ে লাফিয়ে কান্না শুরু করে দিয়েছে। মেয়ের কান্নার আওয়াজ পেয়ে, মেয়ের মা ছুটে এসে তায়ানের উদ্দেশ্যে বলল,
_“ কী সমস্যা ভাই? মেয়েটা কাঁদছে দেখতে পাচ্ছেন না?” বলে তায়ানকে গভীর দৃষ্টিতে পরখ করল। কিডন্যাপার নয় তো? এমন কালোয় মোড়ানো কেন? চোখটাও তো দেখা যাচ্ছে না চশমার জন্য! মহিলার ভাবনার মাঝেই তায়ান বলল,
_“ বিড়ালটা কার? কোথায় পেয়েছেন?”
মহিলাটি বিরক্ত হয়ে বলল,
_“ কোথায় পাব আবার? এটা আমার মেয়েরই বিড়াল। আপনি ফেরত দিন তো!”
_“ আপনি মিথ্যা বলছেন।” তায়ান বলল। তার অনুমান ভুল হতে পারে না।
_“ আমি সত্যিই বলছি,এটা আমাদেরই বিড়াল।” মহিলাটি জোর গলায় বলল।
তায়ান নিজের পকেট থেকে একটা ডুয়েল কারেন্সি কার্ড বের করে মহিলার দিকে এগিয়ে দিলো। তারপর বলল,
_“ এখানে প্রায় ৫,৫০০ ডলার আছে। বাংলাদেশি মোট ছয় লক্ষ টাকা। ব্যাংক অথবা এটিএম থেকে তুলে নেবেন। আমি পিন নাম্বার দিয়ে দিচ্ছি। বিনিময়ে বিড়ালটা আমাকে দিন,আর এটা কোথায় পেয়েছেন বলুন।”
মহিলাটি হতভম্ব, বাকরুদ্ধ। এই সামান্য বিড়ালের জন্য ছয় লক্ষ টাকা দিবে? বিস্মিত চোখে তায়ানকে দেখছে। সে সন্দিহান গলায় বলল,
_“ আপনি কে? আর আপনার কথা যে সত্যি তা কীভাবে বুঝব?’
_“ আমার পরিচয় জেনে আপনার লাভ নেই। এই কার্ড আপনার অনেক উপকারে আসবে। বাকিটা আপনার ইচ্ছা।” তায়ানের এত কথা বলার ধৈর্য্য নেই। নির্জন জায়গা হলে পকেট থেকে রিবল বার বের করে এক সেকেন্ডে সব কথা বের করে নিতো।
তায়ান চলে যাবে সেই মুহুর্তে মহিলাটি থাবা মে'রে কার্ডটা হাতে নিলো। বলল,
_“পিন নাম্বার দিন আগে।”
তায়ান বলল পিন নাম্বার, মহিলাটি তা ফোনে সেভ করে নিলো। তারপর বলল,
_“ বিড়ালটা একটা মেয়ে দিয়েছে। আমার মেয়ের পছন্দ হয়েছিল তাই..”
তায়ান ধৈর্য্য ধরে এত কিছু শুনল না। তার হার্টবিট বেড়ে গেছে। সে অধৈর্য্য কন্ঠে বলল,
_“ কোন মেয়ে? কতদিন আগে দিয়েছে?”
_“ দু'বছরের মত হবে। আমাদের ফ্লাটের পাশের ইউনিটেই থাকত। ছাদে এই বিড়াল নিয়ে বসে থাকতে দেখি একদিন তাকে। আমার মেয়েটা এত পছন্দ করে, সেই মেয়েটাও দিয়ে দিলো। বলেছিল যত্নে রাখতে। তারপর তারা বিদেশে চলে গেছে।’
_“ তারা মানে? আর কে?” তায়ানের কন্ঠে অস্থিরতা।
_“ সে আর একটা ছেলে।”
_“ তাদের নাম বলুন।’’
_“ তা তো জানি না। আমরা তখন নতুন উঠেছিলাম এই ফ্লাটে।” মহিলাটি হেঁসে বলল,
_“ কিন্তু মেয়েটা খুব মিষ্টি।”
তায়ান আর দাঁড়াল না। বিড়ালটা নিয়ে প্রস্থান করল। মহিলাটির মুখ থেকে কৌতূহল গেল না। তার মেয়েটা বিড়ালের শোকে এখনো কাঁদছে, সে এই পর্যায়ে মেয়ে ধমকে বাড়ির ভেতর নিয়ে গেল।