রাত নয়টা পেরিয়ে গেছে, অথচ অনুভা এখনও অ্যাপার্টমেন্টে ফিরেনি। সন্ধ্যার মধ্যেই ফিরে আসার কথা ছিল তার। সময় যত এগোচ্ছে, শান্তর অস্বস্তিও তত বাড়ছে। আরাফ এতক্ষণ মায়ের কথা বলতে বলতে একসময় ঘুমিয়ে পড়েছে। ছোট্ট ছেলেটা ঘুমের মধ্যেও মাকে খুঁজছে। ন্যানি আজ আসেনি, তাই আরাফকে একা রেখে বের হওয়ারও উপায় নেই শান্তর। ঘড়ির দিকে একটু পরপরই তাকাচ্ছে সে। প্রতিবার সময়টা দেখার সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতর অকারণ এক দুশ্চিন্তা জমে উঠছে,কোথায় গেল অনুভা? আর দেরি যখন হবে জানিয়ে দিলেও তো পারত।
ধীরে ধীরে দুশ্চিন্তা এতটাই বেড়ে যাচ্ছে যে শান্ত আর স্থির হয়ে বসে থাকতে পারল না। বারবার ফোনের স্ক্রিন জ্বালিয়ে সময় দেখা, যেন আরও অস্থির করে তুলছিল। মনে হচ্ছিল প্রতিটা মিনিট এখন অস্বাভাবিকভাবে ধীরে এগোচ্ছে। সে ধীরে ধীরে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা আরাফের দিকে তাকাল একবার। ছোট্ট ছেলেটা নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে, কিন্তু ঘুমের মধ্যেও মাঝে মাঝে ঠোঁট নড়ছে,মনে হয় যেন এখনও মাকে ডাকছে। শান্তর বুকটা হালকা করে মোচড় দিয়ে উঠল। আর অপেক্ষা করা যাচ্ছে না। শান্ত সাবধানে আরাফকে কোলে তুলে নিল। ছেলেটার ছোট্ট মাথাটা এসে ঠেকল তার কাঁধে। এক হাতে তাকে আগলে ধরে অন্য হাতে দরজার লক খুলল শান্ত। দরজা খুলে বাইরে পা রাখতেই তার চোখ প্রথমেই চলে গেল বাম পাশের লিফটের দিকে। দেখল অনুভা দ্রুত গতিতে লিফট থেকে বের হয়ে এদিকেই আসছে। এক ঝটকায় যেন শান্তর বুকের জমে থাকা দুশ্চিন্তার একটা বড় অংশ নেমে গেল। এতক্ষণ যে অজানা আশঙ্কা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল, অনুভাকে চোখের সামনে দেখতেই সেটা কিছুটা হলেও থেমে গেল। তবে অনুভার ড্রেস জ্যাকেটে ধুলোবালি দেখে অবাক হলো। কিন্তু এত তাড়াহুড়ো করে ভেতরে আসল যে শান্ত কোনো প্রশ্নই করতে পারল না। শান্ত বা আরাফকে দেখেও সে কিছু বলল না। সোজা নিজের রুমে চলে গেল।
শান্তও মেইন দরজা লাগিয়ে দিয়ে আরাফকে দোলনার মাঝে শুইয়ে দেয়। অনুভার দরজার দিকে এক পলক তাকিয়ে কিচেন রুম থেকে খাবার গরম করে টেবিলে রাখে। কিছুক্ষণ পর অনুভা ফ্রেশ হয়ে, কাপড় চেঞ্জ করে রুম থেকে বের হয়। প্রথমেই টেবিলের কাছে এসে গ্লাসে পানি নিয়ে খেতে থাকে। শান্ত আড়চোখে দেখে। পরপর দু-গ্লাস পানি খেয়ে তারপর সোফায় গিয়ে বসে অনুভা। শান্তকে খাবার বাড়তে দেখে বলল,
_“ আপনাকে বাসায় রেস্ট করতে বলা হয়েছে, এগুলো করতে না।”
_“ তার আগে বলো এতো লেট কেন হলো আসতে? আর কাপড়েই বা ধুলোবালি কেন ছিল?” শান্ত এবার প্রশ্ন করার সুযোগ পেল।
অনুভা নিশ্চুপ। মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে। শান্ত উত্তরের আশায় অনুভার দিকে তাকানো।
_“ কী জিজ্ঞেস করেছি?” শান্ত আবারও বলল।
অনুভা শান্তর দিকে তাকায়।
_“ আপনি না প্যারিসে যেতে চাচ্ছেন? আসুন কালকেই চলে যাই।”
_“ কালকে? কালকেই কেন?” শান্ত বিস্মিত কন্ঠে বলল।
_“ আমি বলেছি তাই। এতদিন তো নিজেই যেতে চেয়েছেন।”
_“ হ্যাঁ, চেয়েছি। আর যাবোও তো,তুমি না চাইলেও যাবো। কিন্তু কালকেই কেন?” শান্ত পূনরায় একই প্রশ্ন করল।
অনুভা একটু বিরক্ত হলো।
_“ এত প্রশ্ন না করে আপনি আজই ফ্লাইটের টিকেট কাটুন। কাল সকালেই যেন আমরা প্যারিসে রউনা হতে পারি।”
_“ এত প্রশ্ন করার পরও তো তুমি একটারও উত্তর দিচ্ছো না। কোথায় ছিলে,এই অবস্থায় কেন এলে,আর হঠাৎ কালকেই কেন প্যারিসে যেতে চাচ্ছো?”
_“ আপনি প্লেইনের টিকেট কাটুন। কালকে প্লেইনে বসেই সব বলব।”
শান্ত আর প্রশ্ন করল না। রাতের খাবার খেয়ে অনুভার কথা মতো টিকেট বুক করল। অনুভা দোলনা থেকে আরাফকে তুলে নিয়ে নিজের রুমে চলে গেল। শান্তর ফোনে একের পর এক নোটিফিকেশন আসছে। জেরিন প্রায়ই তাকে কল মেসেজ দিয়ে বিরক্ত করে। এজন্য সে তার কয়েকটা নম্বরও ব্লক করেছে। কিন্তু এতে কোনো লাভ নেই, নতুন নতুন নম্বর দিয়ে সব সময় শান্তকে জালাতন করতে থাকে। এবারও শান্ত ফোন হাতে নিয়ে টুপ করে ব্লক করে দিলো।
____
যত দিন যাচ্ছে আরমান সাহেবের শরীর খারাপের দিকে এগোচ্ছে। হঠাৎ হঠাৎ প্রেশার বেড়ে যায়। স্ট্রোক করার উপক্রম হয়ে যায়। বাড়ি থেকে বের হয় না বললেই চলে। বর্তমানে অলির বাবা আর আরিজের টাকায়ই এই ভাঙা সংসার চলছে। আরিজ মাঝখানে আলাদা থাকতে চাইলেও সেখানকার আলাদা খরচের জন্য আবার অনুভার নানার বাড়িতেই চলে এসেছে। আর অনুভার বাপ যে সেই ছেলে আর নিজের বউ নিয়ে বাড়ি ছেড়েছে আর কোনো খবর নেই৷
অলি রাতের খাবারের পরের ঔষধ খাওয়ানোর জন্য পানি নিয়ে আরমান সাহেবের রুমে আসে। আরমান সাহেব বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। কারও আসার শব্দ পেতেই দরজার দিকে তাকায়।
_“ ঔষধ খেয়ে নাও,চাচা।” অলি মেডিসিন বক্স থেকে টেবলেট বের করতে করতে বলল।
আরমান সাহেব উঠে বসলেন। ঔষধ খেয়ে বললেন,
_“ তোর চাচী কোথায়?”
_“ মায়ের সঙ্গে কাজ করছে।”
_“ আরিজ এসেছে?”
_“ দেখিনি। এসেছে হয়ত।”
আরমান সাহেব আর কিছু বললেন না। অলিও কিছুক্ষন চুপ থেকে কন্ঠ নামিয়ে বলল,
_“ চাচা! একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
_“ কর।”
_“ অনুভা আপুকে আপনিই বাসা থেকে চলে যেতে বলেছিলেন, তাইনা?”
_“ তোর এখন কেন এমনটা মনে হচ্ছে?” আরমান সাহেব বললেন।
অলির শুধু এখন না। সেদিনই মনে হয়েছিল, যেদিন অনুভা চলে গিয়েছে। সেদিন তার বড় চাচা যতটা শক্ত ছিল ততটা থাকার কথা ছিল না। কারণ এ বাড়িতে বড় চাচাই অনুভাকে বেশি ভালোবাসে,আর সেই অনুভা চলে যাওয়ার পর এতটা স্থির কীভাবে থাকতে পারে? এখন অনুভাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করলেও সেদিন খুব শান্ত ছিল। অলি এত কিছু বলল না। শুধু বলল,
_“ আমার কেন যেন মনে হয়। আমার ধারণা কী ঠিক, চাচা?”
আরমান সাহেব হালকা ভাবে উপর নিচ মাথা নাড়ায়। অলির চোখ বড় বড় হয়ে যায়। উচ্চস্বরে বলে উঠে,
_“ তাহলে…তাহলে তো আপনি জানেন আপু কোথায়। কোথায় আছে সে? কেমন আছে?”
_“ সে-সব কিচ্ছু জানি না। সেদিনের পর ও আমার সাথেও আর যোগাযোগ করেনি।” আরমান সাহেব সেদিন অনুভাকে চলে যেতে বলেও যেন ভুল করেছে। কিন্তু তখনকার পরিস্থিতিতে ও এ বাড়িতে থাকলে আরও কষ্ট ভোগ করতে হতো।
_“ চাচা! ও ভালো আছে তো? আমাদের আরও খোঁজা উচিত।”
_“ তায়ান কতবার বাংলাদেশে এসেছে তুই জানিস? শুধু মাত্র ওকে খুঁজতে। ও নেই কোথাও। কোথায় আছে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। আমি বরাবরই ওর বেলায় ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” বলতে বলতে কন্ঠ কেঁপে উঠলো তার।
অলিরও মন খারাপ হলো। কবে যে সব আগের মতো হবে। হয়তো হবেই না। এভাবেই চলতে থাকবে। কেউ হাসবে না আর এই বাড়িতে। কোনো কিছুই আর আগের মতো স্বাভাবিক হবে না। অনুভা ফিরে আসলেও আরশাদ সাহেব এসে ঝামেলা করবে। দুরে আছে থাকুক কিন্তু ও ভালো থাকুক।
অলি আরমান সাহেবের রুম থেকে বের হয়ে আসে। নিজের রুমে চলে যায়। রুমের বেলকনিতে যেতেই দেখে আরিজ দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমে চমকে যায়।
_“ আপনি এভাবে ভুতের মতো এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”
_“ আচ্ছা চলে যাচ্ছি।” বলেই বের হয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় আরিজ।
অলি দ্রত গিয়ে ওর হাত টেনে ধরে।
_“ আরেইহ! আপনাকে কিছুই বলা যায়। মেয়েদের মতো করেন কেন?”
_“ কী বললি?” আরিজ ভ্রু কুঁচকায়।
_“ কিছু না। আপনার উচিৎ চাচার সঙ্গে গিয়ে কথা বলা।” অলি বলল।
_“ পারব না।” আরিজের সোজাসাপটা উত্তর।
অলি আর কিছু বলার আগেই আরিজ চট করে ফোনটা পকেট থেকে বের করল। কোনো কথা না বলেই স্ক্রিনটা অন করে একটা ছবি অলির সামনে ধরল। অলি প্রথমে খুব স্বাভাবিক ভাবেই তাকিয়েছিল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল স্ক্রিনের উপর। ছবিটায় দেখা যাচ্ছে, বাইকের উপর বসে আছে একটা মেয়ে। হেলমেট খুলে রাখা, চুলগুলো হালকা এলোমেলো হয়ে কাঁধে ছড়িয়ে আছে। আর তার কোলে জড়িয়ে বসে আছে ছোট্ট একটা ছেলে। ছেলেটা দু’হাতে মেয়েটাকে আঁকড়ে ধরে আছে। ছবিটা দেখার সঙ্গে সঙ্গেই অলি থমকে গেল। তার মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তেই বদলে গেল,বিস্ময়, অবিশ্বাস আর অদ্ভুত এক ধাক্কার ছাপ একসাথে ফুটে উঠল চোখেমুখে। অবিশ্বাস্য চোখে আরিজের দিকে তাকিয়ে বলল,
_“ আপু? অনু আপু?” যদিও দু'বছরে অনুভার মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে। চুলের স্টাইল, চোখের দৃষ্টি, মুখের গড়নেও যেন একটু কঠোরতা এসেছে। তবু এক দেখায়ই চিনে ফেলেছে অলি।
আরিজ উপর নিচ মাথায় নাড়ায়। অলি লাফিয়ে ওঠে,
_“ সত্যি বলছেন…এটা”
কিন্তু বাকিটা শেষ করার আগেই আরিজ দ্রুত হাত বাড়িয়ে অলির মুখ চেপে ধরল। কড়া চোখে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
_“ চিৎকার করবি না। আর আমি যে তোকে এটা দেখিয়েছি কাউকে বলবি না।”
অলি বিস্ময়ে চোখ পিটপিট করল। আরিজ হাত সরাতেই সে গলার স্বর নিচু করে জিজ্ঞেস করল,
_“ কিন্তু কেন?”
আরিজ এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর খুব সংক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
_“ ও বারণ করেছে।”
অলির ভেতরের বিস্ময় যেন আবারও বিস্ফোরিত হলো।
_“ ওর সঙ্গে আপনার কথা হয়?”
_“কয়েক মাস ধরে।” শান্ত স্বরে উত্তর দিল আরিজ।
_“ও এখন ফ্রান্সে আছে। এবং… অনেক ভালো আছে। আর এই বাচ্চাটাও ওর।”
এবার সত্যিই অলির চোখ কপালে ওঠার উপক্রম হলো।
_“ কার সঙ্গে আছে? মানে কে নিয়ে গেল ওখানে? কার মাধ্যমে?”
_“ শান্তর সঙ্গে।”
আজ যেন অলির অবাক হওয়ারই দিন। একের পর এক খবর তার মাথার ভেতর বিস্ফোরণের মতো ফেটে পড়ছে।
_“ শান্ত ভাইয়া তো আপুকে…তার মানে ওরা বিয়ে করেছে আর এই বাচ্চা…ওদের?” বলতে বলতেই অলির মুখে ধীরে ধীরে একটা স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। এতদিন ধরে অনুভাকে নিয়ে যে অজস্র ভয়, দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তা তার মনে জমে ছিল,এখন সবটা মিলিয়ে যেতে লাগল।
কিন্তু আরিজের মুখের অভিব্যক্তি সেই হাসিটাকে বেশিক্ষণ টিকতে দিল না।
_“ না,ওদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। আর বাচ্চা…” আরিজ থেমে গেল। কেন জানি সেই মানুষটার কথা মনে পড়লেই বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা বিরক্তি আর অস্বস্তি জমে ওঠে তার।
_“ বাচ্চাটা তায়ান ভাইয়ার।”
_“কীহ!”
অলি নিস্তেজ স্বরে বলল। আরিজ কিছু বলে না। অলি ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে আরিজের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে নিল। তারপর স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছবিটা আঙুল দিয়ে বড় করে দেখল।
ছবিটায় ছোট্ট ছেলেটা অনুভার কোলে বসে আছে। গোলগাল ফর্সা মুখ মায়ের গা ঘেঁষে বসে আছে এমনভাবে, যেন পৃথিবীতে তার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাটা এই কোলে। তায়ানের ছেলে হলেও দেখতে সম্পূর্ণ অনুভার মতোই। বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল অলির। তার চোখের কোণে পানি। অনুভার কথা ভাবে। কতটুকু জটিল হয়েছিল তার বোনের জীবন? মেয়েদের জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সময়, যখন সে মা হয়। সেই সময়টাতেই তো একজন মেয়ের সবচেয়ে বেশি দরকার হয় নিজের মানুষদের; নিজের পরিবার, নিজের স্বামীকে। কিন্তু অনুভা…সে সেই সময়টাতেই কাউকে পায়নি। না নিজের পরিবার, না নিজের স্বামী। অলির বুক আরও ভারী হয়ে উঠল। তাহলে সেই সময়টা অনুভার জন্য কতটা কঠিন ছিল! কতটা একা ছিল সে! টুপ করে ফোনের স্ক্রিনে এক ফোটা পানি পড়ল। তখনই অলির ভেতরে আরেকটা অনুভূতি মাথা তুলে দাঁড়াল,তিক্ত, তীব্র একটা ঘৃণার ঢেউ উঠল তায়ানের প্রতি। অমানুষ! এই অমানুষের জন্যই এই বাচ্চাটা আজকে আপন কাউকে পাচ্ছে না। কতো আদরে থাকতো ও? সবার ভালোবাসা পেতো। সবাই মাথায় করে রাখত। কিন্তু সব থেকেও কেউ নেই। সে অমানুষের মত কাজ না করলে বাবা,মা সহ সুন্দর একটা পরিবার পেতো!
আরিজ কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল অলির দিকে। অলি এখনও ফোনের স্ক্রিনের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। চোখের কোণে জমে থাকা পানি ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু সে যেন তা টেরই পাচ্ছে না। আরিজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর শান্ত স্বরে বলল,
_“কাঁদছিস কেন?”
অলি কোনো উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি এখনও সেই ছবির উপরেই স্থির।আরিজ একটু থেমে আবার বলল,
_“অনুভা অনেক ভালো আছে। শান্ত ওকে খুব ভালো রেখেছে।”
কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠে এক ধরনের স্বীকারোক্তির ভার ছিল।
_“খারাপ শোনালেও এটাই সত্য… আমরা কেউই ওকে এত ভালো রাখতে পারিনি। কখনও কখনও নিজের মানুষদের কাছ থেকেও একজন মানুষ সেই নিরাপত্তাটা পায় না, যেটা কোনো অচেনা মানুষ তাকে দিয়ে দেয়।”
অলি হাসল। শান্ত অচেনা কেউ না। শান্ত অনুভাকে কতটুকু চায় সেটা অলি ছাড়া কেউ জানে না।
_“ আপনি ভুল বলছেন । শান্ত কোনো অচেনা মানুষ না…অন্তত অনুভার জন্য তো একদমই না।”
আরিজ অলির কথা কিছু বুঝল না। আরিজ একটু একটু জানত শান্তর কথা কিন্তু তার ধারণা এত গভীর ছিল না। কিন্তু অলি তো জানত শান্ত কেমন। আজ তার প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গেল। মানুষটা চাইলে সবকিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারত। কিন্তু সে তা করেনি। এত কিছু হওয়ার পরও অনুভাকে একা ফেলে যায়নি। বরং তাকে আর তার বাচ্চাকে আগলে রেখেছে।
অলি আরিজের দিকে তাকিয়ে কাঁপা কন্ঠে বলল,
_“ আমি আপুর সঙ্গে কথা বলতে চাই,আরিজ ভাইয়া।”
_“ বলিস।” আরিজ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল।
_“ আর…আর এই তুলতুলেটা এটাকে কী কখনও কোলে নিতে পারব না?” আরাফের ছবি দেখিয়ে বলল।
_“ হয়ত পারবি। কিন্তু অনেক অপেক্ষা করতে হবে।”
___
_“ এখন তো বলো..কেন হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত নিলে?” প্লেইনটা রানওয়ে ছেড়ে আকাশে উড়তে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে শান্ত অনুভাকে প্রশ্ন করে। অনুভা এতক্ষণ স্বাভাবিক ভাবে থাকলেও শান্তর প্রশ্নে মুখের ভঙ্গি বদলে গেল। চোখে এক ঝলক দ্বিধা ভেসে উঠল। শান্তর কোলে থাকা আরাফের দিকে একবার তাকাল। ভোরের আলো এখনও ভালো ভাবে না ফোটায় ছেলেটা এখনও ঘুমিয়ে আছে। ছোট্ট মুখটা শান্তর বুকের সঙ্গে ঠেসে আছে।
কয়েক সেকেন্ড কেটে গেল। অনুভা এখনও চুপ। শান্ত ভ্রু কুঁচকে আবার বলল,
_“ তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করেছি!”
অনুভা ঠোঁট ভিজিয়ে নিল। তারপর একটু থেমে থেমেই বলল,
_“ আসলে…আসলে আমি এলজনকে মে'রে আধামরা বানিয়ে ফেলেছি।”
_“ হোয়াটট!” শান্ত যেন ঝটকা খেল। তড়িৎ গতিতে সে অনুভার দিকে ঘুরে তাকাল। তার কণ্ঠের হঠাৎ উচ্চ স্বরে বলা শব্দটা আশেপাশের কয়েকজন যাত্রীর দৃষ্টি টেনে নিল। তারা কৌতূহলী চোখে এদিকে তাকাতে লাগল।
শান্ত তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিল। কাঁধ সোজা করে আবার নিচু স্বরে বলল,
_“ কী বলছ তুমি? কাকে মেরেছ?”
_“ আপনার রাফিদের কথা মনে আছে?” অনুভা বলল।
শান্ত মনে করার চেষ্টা করল। অনুভা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য আরও বলল,
_“ ঐ-যে ওর সঙ্গেই আমার সৎ মা আমাকে বিয়ে দিতে চেয়েছিল!”
শান্তের চোখ বড় হয়ে গেল। মনে পড়ল সেই দিনগুলো।
_“ চিনতে পেরেছি। কিন্তু ওর কথা আসছে কোত্থেকে?”
_“ ওকেই তো মে'রেছি।”
অনুভার চোখে কালেসন্ধা বেলার স্মৃতি ভেসে উঠল। কালকে সেই তেলের পাম্পের ওখানে হঠাৎ তার কবজিতে চাপ পড়ায় পাশ ফিরে তাকিয়ে রাফিদকে দেখে। প্রথমে তার আত্মা চমকে ওঠে। লোকটার মুখের নোংরা পৈশাচিক হাসি অনুভাকে ভয় পাইয়ে দেয়। কিন্তু চোখে মুখে তা প্রকাশ করে না। অনুভা রাফিদের থেকে ঝটকা মে'রে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয়। রাফিদ ঠোঁটের কোণ হালকা টান দিয়ে অনুভার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দাপিয়ে দেখল,এক অশ্লীল প্রহরীর মত।
_“ আরেহহ…আমার না হওয়া বউ দেখছি!”
অনুভা কেবল নিজের শীতলতা বজায় রাখার চেষ্টা করছিল। আতঙ্কে হৃদয় দ্রুত স্পন্দিত হলেও, বুঝতে দিলো না। উল্টো হেঁসে ফেলল,
_“ কেমন আছেন? অনেক দিন পর দেখলাম।”
রাফিদ মনে মনে অবাক হলো। তারপর ঠোঁট বাকিয়ে হেঁসে বলল,
_“ শুনেছিলাম তোমার স্বামী তোমাকে ধোঁকা মে'রে চলে গেছে?”
অনুভা দাঁতে দাঁত চাপল। জোরপূর্বক হেঁসে বলল,
_“ আপনি এখনো সে-সব কথা মনে রেখেছেন? বাদ দিন। অনেক দিন পর আমাদের দেখা হলো। আসুন একটু গল্প করা যাক।”
রাফিদের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
_“ তুমি অনেক বদলে গিয়েছ।”
_“ হ্যাঁ,মাঝেমধ্যে নিজেকে বদলাতে হয়। তা, আপনি এখানে কেন এসেছেন?”
_“ ব্যবসার কাজে এসেছি। ক'দিন থেকে ফিরে যাবো।”
অনুভা এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল বারবার। রাফিদ ভ্রু কুঁচকে বলে,
_“ তুমি এখানে কীভাবে এলে?”
অনুভা কথা ঘুরায়,
_“ আপনি বোধহয় একটু আড়ালে গিয়ে কথা বলতে বেশি পছন্দ করেন তাইনা?”
রাফিদের চোখ ঝলমল করে উঠে।
_“ বাহ! এতো বোঝো আমায় তুমি?”
_“ তাহলে চলুন।” পাশের নির্জন এক রাস্তা ইশারা করল।
_“ ওদিকে মানুষজন কম।”
রাফিদ ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে সেদিকে এগিয়ে যায়। অনুভাও পেছন পেছন যায়। মানুষের চোখের আড়ালে গিয়ে সেই রাস্তায় পৌঁছাতেই রাফিদ ঘুরে পেছন ফিরে তাকায় ওমনি অনুভা রাফিদের মুখে একের পর এক ঘুষি বসিয়ে দিতে থাকে। প্রতিটি ঘুষি নিখুঁত গতিতে রাফিদের মুখে গিয়ে আঘাত করে। রাফিদের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। আক্রোশ নিয়ে অনুভার দিকে এগিয়ে আসতে নিতেই অনুভা নিজের পা বাড়িয়ে দেয়। রাফিদ পায়ের সঙ্গে হোটচ খেয়ে পড়ে যায় মাটিতে। অনুভা সময় নষ্ট না করে ঝুঁকে গিয়ে আবারও রাফিদের নাকেমুখে আ'ঘাত করে। লোকটা একসময় অনুভার হাত ধরে ফেলে। অনুভা তখন ভরকে যায়। আশপাশে নরজ বুলিয়ে একটা লাঠি চোখে পড়তেই রাফিদের হাতে কামড় মে'রে সেটা নিয়ে এসে চোখ বন্ধ করে বারি শুরু করে। পা দিয়ে লাথি মারে। রাফিদ ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যায়। নাক দিয়ে অনবরত লাল তরল গড়িয়ে পড়ছিল। সে ভাবতে পারছিল না একটা মেয়ে তাও কি-না অনুভার হাতে সে এভাবে মা'র খাচ্ছে। শেষে আর থাকতে না পেরে অবচেতন হয়ে যায়। অনুভার একদমই এসবের ইচ্ছা ছিল না কিন্তু রাফিদ ওকে কখনই একা পেয়ে ছেড়ে দিতো না। অবচেতন হওয়ার পরও রাফিদকে লাঠি দিয়ে আঘাত করতে থাকে।