রক্ত রেখার আড়ালে

পর্ব - ২৮

🟢

সামনে ইন্টারন্যাশনাল বাইক রেস হওয়ায় অনুভার এখন ক্লাবে ব্যস্ত সময় পার করতে হচ্ছে। সে এই প্রথমবার ইন্টারন্যাশালি রেস করবে। তাই একটু বেশিই এক্সাইটমেন্ট কাজ করছে। আরাফের পেছনেও এখন বেশি সময় দিতে পারছে না। সকালে প্যাক্টিসে গেলে সন্ধার দিকে অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে। অনেক সময় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রস্তুতি চলতে থাকে। বাকি সময় আরাফ শান্তর কাছেই থাকে।

স্বপ্নের মঞ্চে নিজেকে প্রমাণ করার সেই মুহূর্ত আর মাত্র দু’দিন পরই। ঝমের মতো চলে যাচ্ছে যেন। অনুভার মতে আরও ক’টাদিন সময় বেশি পেলে ভালো হতো। প্রস্তুতিটা হয়তো আরও নিখুঁত করে নেওয়া যেত।

লেগ প্রেস মেশিনের পাশে দাঁড়িয়ে হাফ ছেড়ে শ্বাস নিলো অনুভা। একটু আগেই কয়েক সেট শেষ করেছে, তাই পায়ের পেশিগুলো এখনও টানটান লাগছে। কপালের ঘাম হাতের পিঠ দিয়ে মুছে সামনে রাখা যন্ত্রটার দিকেই কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে।

এই ইভেন্টের পর এগুলো থেকে কিছুদিনের বিরতি নেবে সে। আরাফকে যথাযথ সময় দিতে হবে। নাহলে ছেলেটা বড় হয়ে অভিযোগ করবে মায়ের উপর।

অনুভার গায়ে কালো ফুল-স্লিভ স্পোর্টস টপ আর ঢিলেঢালা গাঢ় ধূসর ট্র্যাক প্যান্ট। জিমরুমটা শুধু মেয়েদের জন্যই নির্দিষ্ট, তাই পোশাক নিয়ে কোনো বাড়তি সংকোচ ছিল না তার। টানা প্র্যাক্টিসের কারণে শরীরের গড়নটা আরও দৃঢ় আর ছিমছাম দেখাচ্ছিল। চুলগুলো উঁচু করে পনিটেইল করে বাঁধা, যাতে ব্যায়ামের সময় কোনো ঝামেলা না হয়। পায়ে সাদা-কালো স্পোর্টস শু, আর হাতে পাতলা জিম গ্লাভস। জিমে সে খুব কমই আসে। কিন্তু সামনের ইভেন্টের জন্য শরীরটা একটু প্রস্তুত করার দরকার ছিল। যতবার এই ইভেন্টের কথা মনে হয় ততবার তার বুকের ভেতর কেমন ধক করে ওঠে। সেই প্রথমবার বাইক রেস করার ফিলিংস। সে যখন প্রথম প্রথম ক্লাবে রেস করত তখনও এমন ভয় কাজ করত। এখনও এমনই হচ্ছে। হওয়াটা স্বাভাবিক। সেগুলো শুধু মাত্র ক্লাবের হলেও এটা আন্তর্জাতিক। এখানে তার মতো আরও প্রতিযোগী আছে। তারাও তো জেতার জন্য আসবে।

ফোনের রিংটোন পেয়ে ভ্রম কাটলো অনুভার। শান্ত কল করেছে।

_“ বলুন।” কল রিসিভ করে বলল অনুভা।

_“ আমি আরাফকে নিয়ে পার্কে আছি। তোমার শেষ হলে চলে এসো।” অপরপাশ থেকে শান্ত বলল।

_“ কখন বের হয়েছেন?”

_“ একটু আগেই।”

_“ আচ্ছা, আসছি।” অনুভা ফোনের স্ক্রিনে দেখল সন্ধ্যা ছয়টা। বাইরের আকাশ এখনও উজ্জ্বল, দিনের আলো ধীরে ধীরে সোনালি রঙে মিশতে শুরু করেছে। প্যারিসে গ্রীষ্মের সময় সূর্য দেরিতে ডোবে, রাত আটটার কাছাকাছি হলেও আকাশে বেশ আলো থাকে। অনুভা ড্রেস চেঞ্জ করে সব কিছু গুছিয়ে বেড়িয়ে পড়ল।

শান্ত ফোন পকেটে ঢুকিয়ে আরাফের আরাফের স্ট্রোলার ঠেলতে শুরু করল আবারও। আরাফের গায়ে হালকা হলুদ কটন বডি সুট, কোমরের দিকে ছোট বোতাম দিয়ে বাঁধা। পায়ে ছোট মোজা। মাথার উপর কটন ক্যাপ পড়ানো, যাতে বাতাস থেকে রক্ষা পায়। স্ট্রোলারের ভিতরে আরামসে বসে আছে সে, কৌতূহলী চোখে চারপাশ দেখছে। শান্ত স্ট্রোলার ঠেলতে ঠেলতে একটু উঁচু জায়গায় গেল। নিচে ছোট্ট নদীর জল আর তার পার্শ্ববর্তী রেলিং-এর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো নদীর ভিউ উপভোগ করছে। শান্ত খানিকটা ঝুঁকে আরাফের দিকে তাকিয়ে বলল,

_“ প্রিন্স! ভালো লাগছে এখানে?”

আরাফ বুঝলো কি-না সে কথার মানে। বোঝার চেষ্টা করল তার পাপা কী বোঝাতে চাচ্ছে, যেহেতু তার পাপা হাসছে তাই সেও হালকা হাসি দিল। তখনই শান্তর ফোন বেজে উঠলো। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ফোন বের করল আবার। আননোন নম্বর দেখে ভ্রু কুঁচকাল। তারপর কল ধরতেই অপর পাশ থেকে জেরিনের কন্ঠস্বর ভেসে এলো। শান্ত কিছু না বলেই কল কেটে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে আবার কল করে। শান্ত পূনরায় কেটে দেয়। এভাবে একাধিক বার কল করতে থাকলে বিরক্ত হয় শান্ত। শেষবার আর কল কাটেনি। আরাফের দিকে একপলক তাকিয়ে একটু দুরে সরে এলো। শান্ত ফোন ধরল, কিন্তু চোখ পুরোপুরি স্ট্রোলারের দিকে। কন্ঠে বিরক্তির রেশ নিয়ে বলল,

_“ কী সমস্যা,জেরিন? এভাবে বিরক্ত করছ কেন?”

_“ শান্ত! কোথায় তুমি? আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই।” ফোনের ওপাশ থেকে জেরিন বলল।

শান্ত ঠোঁটের কোণে হালকা এক ব্যঙ্গচিহ্ন ফেলে বলল,

_“ ম’রে গেছি আমি। গিয়ে কবরের সামনে থেকে দেখা করে এসো।”

ওপাশে জেরিন কিছু একটা বলতে শুরু করতেই শান্ত বিরক্ত গলায় বলল,

_“জেরিন, আমি তো আগেই বলেছি এইসব নিয়ে আমাকে আর কল করো না।” ওর সঙ্গে কথা বলতে বলতে শান্ত অনেকটা অন্যমনস্ক হয়ে উঠলো। কখন যে তার দৃষ্টি আরাফের স্ট্রোলার থেকে সরে গেছে, সে নিজেই খেয়াল করেনি।

এদিকে আরাফ জানেই না, তার পেছন থেকে যে পাপা সরে গেছে।

ছোট্ট মুখ তুলে সে মুগ্ধ চোখে সামনে তাকিয়ে আছে। নদীর শান্ত পানির দিকে, আর আকাশে ভেসে বেড়ানো পাখিদের দিকে।

কিন্তু হুট করে এই ভীরের মাঝে আরাফের ছোট ছোট অবুঝ চোখ দু'টো পড়ল,পাশে দাঁড়ানো একজনের কালো প্যান্টের পকেটের দিকে।পকেট থেকে উঁকি দিচ্ছে কয়েকটা রঙিন ললিপপ। আরাফের কৌতূহলী চোখ মুহূর্তেই ঝলমল করে উঠল। সে সঙ্গে সঙ্গে তার ছোট্ট হাত বাড়িয়ে দিলো। ললিপপ গুলো নেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু সেগুলো তার ছোট্ট হাতের নাগালের বাহিরে। আরাফ সামনের দিকে ঝুঁকে সেগুলো ধরার চেষ্টা করল। তবু নাগাল পাচ্ছিল না। ঠোঁট দু'টো ভেঙে কপাল কুঁচকে উঠলো তার। অবশেষে অনেক চেষ্টার পর সে লোকটার প্যান্টের কাপড়টাই খামচে ধরতে পারল। ছোট্ট হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে নিজের দিকে টানল। প্রথমে লোকটা অন্যমনস্কই ছিল। না তাকিয়েই বিরক্ত ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে আরাফের হাতটা সরিয়ে দিল। এতে বাচ্চাটার গোলগাল গাল দুটো আরও ফুলে উঠল। কোমল ঠোঁট কাঁপতে লাগল। তবুও সে হার মানল না। আবারও ছোট্ট হাত বাড়িয়ে লোকটার প্যান্টের কাপড় টেনে ধরল, যেন জোর করেই ললিপপগুলো নিজের দিকে নিয়ে আসতে চাচ্ছে।

লোকটা এবার বিরক্ত হয়ে নিচে তাকাল। সামনে স্ট্রোলারে বসে থাকা ছোট্ট বাচ্চাটাকে দেখে তার ভ্রু কুঁচকে গেল।

_“হেই! স্টপ ইট..” নিচু গলায় বলেই সে আবারও আরাফের হাতটা সরিয়ে দিল। তার মুখে মাস্ক লাগানো। মাথায়ও ক্যাপ পড়া। কিন্তু আরাফ থামার ছেলে নয়। তার চোখ এখনও সেই ললিপপগুলোর দিকেই। আবারও সে ছোট্ট হাত বাড়িয়ে লোকটার প্যান্টের কাপড় শক্ত করে টেনে ধরল। ললিপপ না পাওয়ায় ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে উঠলো। লোকটাও এবার বেশিই বিরক্ত হয়ে যায়। চারপাশে মানুষের ভিড়, কেউ কেউ নদীর দিকে তাকিয়ে আছে, কেউ আবার নিজেদের কথায় ব্যস্ত ছিল। হঠাৎ করেই লোকটা পা সরাতে গিয়ে বিরক্ত ভঙ্গিতে স্ট্রোলারটাকে এক ধা’ক্কা দিল। ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটল যে কেউ বুঝে ওঠার আগেই স্ট্রোলারটা ঢালের দিকে গড়িয়ে নিচের দিকে যাচ্ছে। আরাফ উচ্চস্বরে কেঁদে ওঠে। স্ট্রোলার নিচু দিকে চলে যায়। ধীরে ধীরে গতি বাড়তে থাকে। শান্ত যেদিক দিয়ে উঁচু দিকে এসেছিল ঠিক সেই দিকে চলে যাচ্ছে। নিচে নেমে সমান জায়গায় গেলেই স্ট্রোলার উল্টে যাবে। ব্যাপারটা বুঝে আসতেই লোকটার ভেতরে কেমন অপরাধবোধ হলো। ঝটপট দৌড়ে গেল স্ট্রোলার ধরার জন্য। কিন্তু সেটা এখন অনেকটাই দুরে চলে গেছে। লোকটা আরও গতি বাড়ালো। আশেপাশের লোকগুলোও আতঙ্কিত চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইল। তখনও শান্তরও কথা বলার মাঝখানে সেদিকে চোখ যায়। আরাফের স্ট্রোলার দেখতেই বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে তার। সেও দৌড়ে যায় নিচের দিকে গড়িয়ে যাওয়া স্ট্রোলার ধরার জন্য।

স্ট্রোলারটা যেই সমান জায়গায় পৌঁছে উল্টে যাবে যাবে ঠিক সেই সময় লোকটা ছো মে'রে আরাফকে স্ট্রোলার থেকে তুলে নিজের বুকের সঙ্গে আঁকড়ে ধরল। তৎক্ষনাৎ স্ট্রোলার গিয়ে উল্টে পড়ল।

আরাফ সঙ্গে সঙ্গে কান্নাকাটি থামিয়ে একদম নিশ্চুপ হয়ে গেল। লোকটার বুকের অংশের কাপড় শক্ত করে চে'পে ধরে আছে। ভয়ে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে স্থির হয়ে মানুষটার পেশীবহুল বুকে পড়ে রইল। ছোট্ট বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। লোকটা কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে রইল, তার শ্বাসের গতিও দ্রুত হয়ে উঠেছে। মনটা এখন পুরোপুরি এই অচেনা বাচ্চাটার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিকে কেন্দ্রীভূত। কেন যেন এই ছোট্ট শরীরের কোমলতা, নরম নিঃশ্বাসের ওঠানামা, তার ভিতরে এক অদ্ভুত উষ্ণতা সৃষ্টি করছে। তার হাত অচেতনভাবেই অচেনা শিশুটাকে আরও নিবিড়ভাবে ধরে রাখল।

আশেপাশের মানুষ গুলো এখন নিশ্চিত ভঙ্গিতে নিজেদের কাজে মন দিলো। পরক্ষনেই শান্ত এসে হাঁটুতে হাত রেখে ঝুঁকে অস্থির ভঙ্গিতে শ্বাস ফেলতে ফেলতে লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল,

_“ Thank you… thanks a lot,man!” চোখে প্রশান্তি আর কৃতজ্ঞতা মিশে আছে শান্তর।

লোকটা শুধু হালকা মাথা নেড়ে গলার স্বর গম্ভীর রেখে বলল,

_“ Is this your son?”

শান্ত সোজা হয়ে মাথা নাড়িয়ে বলল,

_“ ইয়েস…” সাথে আর কিছু বলার আগেই লোকটা সঙ্গে সঙ্গে লোকটা একটু তীক্ষ্ণ ভঙ্গিতে, গলায় কঠিন স্বর রেখেই বলল,

_“As a father, you’ve been very irresponsible.” বলেই আরাফকে ঠেলে শান্তর কাছে দিয়ে দিলো। শান্ত কিছুই বলতে পারল না। মুখের উপর এমন সম্বোধনে অপ্রস্তত হয়ে পড়লো সে। সত্যিই আজকে তার জন্যই এইসব হয়েছে। না সে কথা বলার জন্য আরাফকে একা রেখে দুরে সরে আসত, না অন্যমনস্ক হয়ে উঠত,

আর না এমন কিছু ঘটতো। আরাফ শান্তর কোলে আসতেই লোকটাী পকেটের দিকে তাকিয়ে আবার কেঁদে উঠলো। হাত বাড়িয়ে সেই ললিপপ গুলোই ধরতে চাইল। কিন্তু লোকটা আর দাঁড়াল না। চলে গেল। এতে তীব্র হয় ছেলেটার কান্না । শান্ত অদ্ভুত ভঙ্গিতে লোকটার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টাল। তারপর নিজের পকেট থেকে চকলেট বের করে আরাফের হাতে ধরিয়ে দিলো। চকলেট পেয়ে ছেলেটা সেই লোকটার কথা এবং ললিপপের কথা ভুলেই গেল।

শান্ত দেখল অনুভা আসছে। কান্নাকাটি করাতে আরাফের চোখের পাপড়ি গুলো ভিজে আছে। মুখটাও লালচে। শান্ত দ্রুত আরাফের চোখের লেগে থাকা পানি মুছে দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু ততক্ষণে অনুভা চলেই এসেছে। এসেই আরাফকে কোলে নিয়ে চিন্তিত স্বরে বলল,

_“ কেঁদেছে কেন?” বলেই আরাফকে স্নেহ মেশানো চুমু খেতে লাগল।

শান্ত একটু হেঁসে বলল,

_“ তোমার জন্যই তো। সারাদিন দেখতে পায় নি…তাই কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছিল।” একটু আগের ঘটনাটা চে'পে গেল অনুভার কাছে।

অনুভা আরাফের দিকে তাকিয়ে বলল,

_“ মা'কে মিস করেছ, আব্বু?”

আরাফ কিছু না বলে অনুভার গলা জড়িয়ে কাঁধে মাথা রাখল।

রিকো দু'হাতে দু'টো বাবল টি হাতে তায়ানের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

_“ না বলেই চলে এসেছ কেন?”

_“ ভালো লাগছিল না।” তায়ান রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে নদীর পানির দিকে নির্বাক তাকিয়ে আছে। সেভাবে থেকেই ধীর গলায় বলল।

_“ তোমার ভালোলাগে কখন? ধরো, এটা নাও।’’ বাবল টি এগিয়ে দিয়ে বলল।

বিজ্ঞাপন

তায়ান চোখে একটু বিস্ময় ফুটিয়ে রিকোর দিকে তাকাল। অবাক আর বিরক্ত ভাব দিয়ে বলল,

_“ তুমি জানো না…আমি এগুলো খাই না?”

_“ আজ না হয় খেলে। নাও…”

তায়ান হাতে নিলো। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তা নদীর পানিতে ফেলে দিলো। রিকোর চোয়াল ঝুলে এলো।

_“ তুমি কী কখনও ঠিক হবে না?”

_“ আমি কবে বেঠিক ছিলাম?” তায়ান বলল।

রিকো আর কিছু বলল না। তায়ান একবার পেছন ঘুরে তাকাল। চোখ পড়ল একটু আগের সেই বাচ্চা আর বাচ্চাটার বাবার উপর। হেটে হেটে চলে যাচ্ছে, কিন্তু এখন সঙ্গে একটা মেয়ে আছে। মেয়েটার কোলেই সেই বাচ্চাটা। কাঁধে মাথা দিয়ে রেখেছে। ছেলেটা আর মেয়েটা পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছে। হয়ত মেয়েটা বাচ্চাটার মা হবে। তায়ান ভাবল। যদিও অনেকটা দুরে তবু বুঝতে সমস্যা হলো না তার। কেন যেন বাচ্চাটার মুখটা অনেকটা পরিচিত মনে হচ্ছিল। তায়ান আবার সামনের দিকে ফিরে তাকায়।

___

রাতে নিজের রুমে বসে পড়ছিল অলি। আগামীকাল পরিক্ষা থাকায় গভীর রাত হওয়ায়ও ঘুমায়নি সে। পুরো রুমের লাইট বন্ধ, শুধু টেবিলের উপর রাখা ছোট্ট একটা ল্যাম্পের নরম আলো বই আর খাতার উপর পড়ে আছে। আগামীকাল পরীক্ষা, আর মন-মস্তিষ্ক দুইটাই এক অদ্ভুত বিশৃঙ্খলতায় ভরা। নিজের ডেস্কে বসে খাতা আর বই তাকিয়ে থাকলেও চোখে আর মন কোথাও আটকে নেই। সেদিন, আরিজের ফোনে অনুভা আর তার ছোট্ট বাচ্চাটিকে দেখার পর থেকেই কোনো কিছুতেই মন বসে না অলির। প্রতিটি মুহূর্তে সেই ছবি তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে । বুক ভারী হয়ে আসে তার।কবে সব ঠিক হবে, কখন তাদের কাছে পৌঁছাবে, কবে তার মন শান্ত হবে,এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানে না সে।

দরজায় টোকা পড়তেই চমকে ওঠে পেছন ফিরে তাকায় অলি। হকচকিয়ে টেবিল ছেড়ে উঠে দাড়ায়। গভীর রাতের এই নিস্তব্ধতায় হঠাৎ এমন শব্দে অকারণ একটা ভয় কাজ করছিল তার ভেতরে। ধীর পায়ে দরজার কাছে গিয়ে আস্তে করে খুলতেই আলো-আঁধারির মাঝে পরিচিত একটা মুখ ভেসে উঠল। স্বস্তির শ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বলল,

_“ আপনি এত রাতে?”

আরিজ কোনো উত্তর না দিয়ে সোজা রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে অলি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ভ্রু কুঁচকে আরিজের দিকে তাকাল সে। তার আচরণে অদ্ভুত একটা গম্ভীরতা ছিল। অলি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,

_“কী হয়েছে? এত রাতে… কিছু বলবেন?”

তার কণ্ঠে স্পষ্ট কৌতূহল আর হালকা অস্বস্তি মিশে ছিল। অকারণেই কেমন ধকধক করছে বুকের ভেতর। আরিজ অলির ভরকে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল,

_“আমি এত রাতে আসায় এত ঘাবড়ে যাচ্ছিস কেন? আমি কি তোকে খেয়ে ফেলব নাকি?”

অলি তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে বলল,

_“ ঘাবড়ে যাচ্ছি কোথায়? মানে… এত রাতে এসেছেন, নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে।”

আরিজ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল।

_“ কোনো কারণ নেই এমনি এসেছি।”

_“ মানে?” বিস্মিত কন্ঠে বলল অলি।

_“মানে আবার কী? ঘুম আসছিল না… ভাবলাম তোকে একটু দেখে আসি।”

অলি কিছু বলল না। অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে রইল আরিজের দিকে। আরিজ একটু হেসে অলির দু বাহু ধরে বিছানার উপর বসিয়ে দিলো।

_“ তোর জন্য সারপ্রাইজ আছে।”

_“ কী সারপ্রাইজ?” অলি ভ্রু তুলে বলল।

আরিজ রুমের লাইট জ্বালিয়ে দিলো। তারপর ফোন বের করে ইনস্টাগ্রামে ঢুকে কাউকে কল করল। কয়েক মুহুর্ত পর কল রিসিভ হতেই আরিজ অলির সামনে ফোন ধরল। অলি শ্বাস নিতে ভুলে গেল। সামনে তার অনু আপু। হাসছে সে। একদম লাইভ। তার মানে ভিডিও কল! থমকে তাকিয়ে আছে অলি। চোখ দু’টো বিস্ফারিত, ঠোঁট দুটো বাচ্চাদের মত কাঁপছে। আরিজ অলির সেই থমকে থাকা মুখটার দিকে তাকিয়ে ভ্রু তুলল। তারপর হালকা বিরক্তির সুরে বলল,

_“ কী হলো কথা বল!”

অলি কাঁপা হাতে ফোনটা ধরে কোনো রকমে আওড়াল,

_“ আ-আপু!”

_“ কেমন আছিস?” অনুভা মুচকি হেসে বলল।

_“ ভালো না। তুমি যাওয়ার পর থেকে একদিনও ভালো থাকিনি।” অলি অনেক চেষ্টা করছে কান্না চে'পে রাখার।

_“ বড় আব্বুর দিকে খেয়াল রাখিস। শুনেছি অসুস্থ।” অনুভার হাসিটা একটু ম্লান হয়ে এল। তবু নিজেকে সামলে নিয়ে বলল।

অলি সে-সব কথা এড়িয়ে গিয়ে বলল,

_“ তুমি ফিরে আসো,প্লিজ। আমার এখানে আর একা ভালো লাগে না।” অলির চোখ মুহূর্তেই ভিজে উঠল। কান্নাটা আর আটকে রাখতে পারল না।

_“ সবকিছু এত সহজ না। আমি এখন ফিরতে চাই না। এখানেই ভালো আছি।”

অলি জানে সে ওখানে ভালো আছে। সেটা অনুভার চেহারায়ই ফুটে ওঠেছে। আগে এতো হাসত না,এখন হাসে। আগে নিজের খুব একটা যত্ন নিতো না,এখন নেয়। চেহারায় এত পরিবর্তন এসেছে যে অনেকেই চিনতে ভুল করবে। অলি চুপচাপ তাকিয়ে রইল। এত পরিবর্তন, এত বৃদ্ধি, এত নিখুঁত চেহারা!

অলি হেঁচকি তুলতে তুলতে বলল,

_“ তুলতুলেটা কোথায়?”

অনুভা পেছনের ক্যামেরা ধরে দেখালো আরাফকে। যে এখন হাত-পা ছড়িয়ে গভীর ঘুমে মগ্ন। স্ক্রিনের মধ্যে আরাফকে দেখতেই অলির বুকটা চাপা একটা ধাক্কা খেয়ে উঠল। করে সে চোখ বন্ধ করে শ্বাস ফেলল। এই ছোট্ট প্রাণটা তার চোখের সামনে। ফোনের স্ক্রিনেই চুমু খেলো সে।

_“ কাঁদবি না। কাঁদছিস কেন? কাঁদলে আর কল করব না।” অনুভা একটু রাগ দেখিয়ে বলল।

_“ কাঁদব না। কাঁদতে চাই না। কান্না চলে আসে।”

_“ শক্ত হ। আর…আমার ভাইটার একটু খেয়াল রাখিস, দিন দিন অনেক শুকিয়ে যাচ্ছে।”

অলি আরিজের দিকে তাকাল। এই পর্যায়ে এসে একটু লজ্জা পেল সে। ফোন দিয়ে দিলো আরিজের কাছে। আরিজ অনুভার সঙ্গে কথা শেষ করে ফোন রেখে দেয়। অলিকে বলে,

_“ ঘুমিয়ে পড়। আর পড়তে হবে না।” বলেই চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। তৎক্ষনাৎ অলি পেছন থেকে গিয়ে আরিজের হাত টেনে ধরে। আরিজ পেছন ঘুরতেই তাকে জড়িয়ে ধরে অলি। হঠাৎ এমন করাতে আরিজ যেন সব ভুলে গেল। চুপ করে রইল এক মুহুর্ত। অলিও চুপ করে আছে। দু'জনের মধ্যেই নিরবতা। শুধু অলির একটু পর পর নাক টানার শব্দ। অলি ধীরে ধীরে আরিজের বুকের কাছে মাথা ঠেকাল, শান্তি অনুভব করল। আরিজ কাঁপা হাতে অলির পিঠে হাত রাখল।

_“ তোর বাবা কিন্তু আমার সঙ্গে তোর বিয়ে দেবে না।”

_“ না দিলে পালিয়ে যাবো।” অলি বলল।

_“ কার সঙ্গে পালাবি?” আরিজ একটু হেঁসে বলল।

_“ আপনার সঙ্গে। আপনি আমাকে নিয়ে পালাবেন।”

আরিজ অলির বাহু ধরে নিজের থেকে একটু ছাড়িয়ে নিলো। তারপর থুতনিতে আলত করে ধরে মুখ নিজের দিকে তুলে ধরল। তারপর খুব ছোট্ট একটা চুমু খেলো অলির থুতনিতে।

_“ আজেবাজে চিন্তা বাদ দিয়ে ঘুমা। কালকে সকাল সকাল উঠতে হবে।”

বিজ্ঞাপন
রক্ত রেখার আড়ালে গল্পটি আয়েশা শেখ রিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে মোড়ানো থ্রিলার উপন্যাস