রক্ত রেখার আড়ালে

পর্ব - ৩২

🟢

সারারাত নির্ঘুম কাটানোর পর ভোরের ম্লান আলোয় এসে তায়ানের চোখে হালকা ঘুম নেমে এসেছিল। চেয়ারে বসেই কখন যে সে তন্দ্রার ঘোরে ঢলে পড়েছিল, সে নিজেও টের পায়নি। হঠাৎই খুব ক্ষীণ এক কান্নার শব্দ কানে ভেসে আসতেই তার ঘুম ভেঙে যায়। চোখ মেলে প্রথমেই বেডের দিকে তাকায় সে,আর তাতেই কপালে ভাঁজ পড়ে তার। বিছানাটা ফাঁকা। বাচ্চাটা নেই! মুহূর্তেই বুকের ভেতর ধক করে ওঠে। তায়ান আর দেরি না করে হুড়মুড়িয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। লিভিং রুমে পা রাখতেই দেখতে সোফার ওপর বসে থাকা আরাফকে দেখতে পায়। সামনে অনুভার ছোট্ট বিড়ালটা নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে, আর পাশে পড়ে আছে একটা ফুটবল। আরাফ সেই ফুটবলটা নিয়ে খেলার ছলে গুনগুন করে কাঁদছে বা কান্নার তালে তালে খেলছে। গায়ে শুধু একটা ক্রিম রঙের নতুন বেবি টি-শার্ট, মাথায় ছোট্ট একটা ক্যাপ। প্যান্ট নেই। গোলগাল হাত-পা, কিন্তু পেটটা যেন একেবারে পিঠের সঙ্গে লেগে যাওয়ার উপক্রম। ক্ষুধার ছাপ স্পষ্ট। তায়ান ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। কিছু একটা বলবে, ঠিক তখনই ফিডার হাতে রিকো এসে আরাফের পাশে বসে পড়ে। ফিডারটা বাচ্চাটার মুখের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে হালকা ঠাট্টার সুরে বলে,

_“এই নাও, তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। তোমার সৎ বাবাটা আবার চলে আসবে কিন্তু।”

আরাফ একবার বড় বড় চোখ তুলে রিকোর দিকে তাকায়। কান্নায় ফুলে থাকা চোখ আর গাল দুটো কেমন লালচে হয়ে আছে। কিন্তু সামনে খাবার দেখে তার মুখে একটুখানি উজ্জ্বলতা ফুটে ওঠে, সামনের মানুষটা অচেনা, তবু ক্ষুধার টান সব দ্বিধা ভুলিয়ে দিলো যেন। ছোট্ট জিভটা অজান্তেই ঠোঁট ছুঁয়ে যায়। সে ফুটবলটা হাত থেকে ছেড়ে দিয়ে দুই হাত সামনে বাড়িয়ে দেয় একদম অসহায়, তাড়াহুড়ো ভরা ভঙ্গিতে। শরীরটা সামান্য সামনে ঝুঁকিয়ে, টলতে টলতে রিকোর দিকে এগিয়ে আসে সে। ছোট্ট আঙুলগুলো ফিডারের দিকে ছুঁতে চায়। মুখটা নিজে থেকেই ফিডারের দিকে এগিয়ে আসে, ঠোঁট কাঁপছে হালকা করে। তারপর আর অপেক্ষা না করে, একদম লোভী তাড়নায় ফিডারটা মুখে নিয়ে নেয়। কিন্তু তার ঠোঁট ফিডারে স্পর্শ করতে না করতেই তায়ান এসে ছো মে'রে সেটা নিয়ে ফেলে দেয় অদূরে। আরাফ ও রিকো দু'জনেই চমকে উঠে তার দিকে তাকায়। তায়ানের চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। জেগে থাকা রাতের ক্লান্তি ,আর জমে থাকা রাগ সেখানে স্পষ্ট। চোয়াল শক্ত,কপালের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে।

_“কে বলেছে ওকে এটা দিতে?” তায়ান চিৎকার করে উঠলো। আরাফের ছোট্ট শরীরটা বিদ্যুতের মতো কেঁপে ওঠে ভয়ে। রিকো একটু থমকে যায়, তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে,

_“ক্ষুধায় কাঁদছিল। তাই…”

তার কথা শেষ হওয়ার আগেই তায়ান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় তার দিকে। সেই দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল, যা বাকিটা গিলে ফেলতে বাধ্য করে রিকোকে। এদিকে হঠাৎ করে ফিডার হারিয়ে যাওয়ায় আরাফের ছোট্ট মুখটা কুঁচকে যায়। ঠোঁট কাঁপতে থাকে, চোখে আবার পানি জমে ওঠে। এরপরই ফেটে পড়ে কান্নায়।

— “আম..মাআআআ…”

কান্নাটা এবার আগের চেয়ে অনেক বেশি তীব্র, অনেক বেশি অসহায়। ছোট্ট হাত দুটো শূন্যে ছুঁড়তে থাকে সে, যেন কিছু একটা খুঁজছে,যেটা ঠিক একটু আগেও তার ছিল।

তায়ানের বুকের ভেতরটা আচমকা মোচড় দিয়ে ওঠে। সে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বাচ্চাটার দিকে। সেই কান্না, সেই ছটফটানি,কেমন যেন অস্বস্তিকরভাবে বিঁধে যাচ্ছে তার ভেতরে।

রিকো নিচু গলায় বলে ওঠে,

_“ দু'দিন হবে ওকে কিছু খেতে দিচ্ছো না। ও কষ্ট পাচ্ছে বুঝতে পারছে না?”

_“ পাক কষ্ট! কষ্ট দেওয়ার জন্যই তো এনেছি!” তায়ান জেদ দেখিয়ে বলল।

_“ তায়ান! এসবের জন্য না আবার নিজেই পস্তাও।”

তায়ান কিছু বলে না। কিন্তু তার চোখে অদ্ভুত এক টানাপোড়েন খেলা করে। রাগ, জেদ… আর কোথাও যেন অজানা এক ব্যথা। অসহ্য লাগছিল এই বাচ্চাটার কান্না। হঠাৎই সে ঝুঁকে পড়ে মেঝেতে পড়ে থাকা ফিডারটা তুলে নেয়। রিকো অবাক হয়ে তাকায় তার দিকে। তায়ান এক কয়েক সেকেন্ড ফিডারটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে আরাফের দিকে এগিয়ে যায়। আরাফ তখনো কাঁদছে। হাঁপাতে হাঁপাতে, গলা ভেঙে আসছে প্রায়। তায়ান তাকে কোলে তুলে নেয়। প্রথমে আরাফ ছটফট করে, কান্না থামে না। কিন্তু ফিডারটা আবার তার ঠোঁটের কাছে আসতেই সে যেন হঠাৎ থেমে যায়। এক সেকেন্ড দেরি না করে,‘ চুকচুক ’ শব্দ তুলে খেতে শুরু করল। তায়ান চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। তার বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আছে,কিন্তু মুখে সেই আগের মতোই কঠোরতা। এই ছোট্ট প্রাণটার জন্যই তো অনু তার কাছে ফিরছে না। চেহারাটাও একদম অনুর মতোই বানিয়ে এসেছে। একই চোখ, একই মুখের আদল। তাই হয়তো এটাকে কাঁদতে দেখলেই তার ভেতরটা এমন অস্থির হয়ে ওঠে… মনে হয় অনুকেই কাঁদতে দেখছে সে।

আরাফ খেতে খেতে ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে। ছোট্ট চোখ দুটো আধবোজা হয়। কান্নার দাগ এখনো গালে শুকিয়ে আছে। খাওয়ার মাঝেই সে তায়ানের শার্ট মুঠো করে ধরে। তায়ানের দৃষ্টি সেই ছোট্ট হাতের ওপর গিয়ে আটকে যায়। কিছু একটা যেন ভেঙে যাচ্ছে ভেতরে। সে চোখ সরিয়ে নেয় সঙ্গে সঙ্গে। তায়ান এখনও ফিডারটা ধরে আছে আরাফের মুখে। সেটা শেষ হয়ে আসতে না আসতেই তায়ান শরীরে গরম কিছু অনুভব করে,তারপর ভেজা। ধীরে ধীরে তার পায়ের উপর তরল কিছু পড়তে থাকে। ভ্রু কুঁচকে ধীরে ধীরে নিচের দিকে তাকায় সে। পরের মুহূর্তেই তার চোখ বড় হয়ে যায়।

আরাফ নির্দ্বিধায় তার কোলে বসেই হি’সু করে দিয়েছে। ছোট্ট শরীরটা একদম নিশ্চিন্ত, যেন এটা স্বাভাবিক। তায়ান তৎক্ষণাৎ ওকে সোফায় বসিয়ে দেয়, মুখে বিরক্তি আর বিস্ময়ের অদ্ভুত মিশ্রণ। তারপর পিছিয়ে আসতে নিলেই পায়ের আবারও তরল কিছুতে আটকে যায় তার পা। নিচে তাকিয়ে দেখে সেখানেও হি’সু লেগে আছে। পা সরিয়ে নেয় দ্রুত। অবাক হয়ে রিকোর দিকে তাকিয়ে দেখে সে ঠোঁট টিপে হাসি চেপে রাখার চেষ্টা করছে,চোখে স্পষ্ট মজা। শেষমেশ সে বলেই ফেলে,

_“ আরও কয়েক জায়গায় এগুলো করেছে।”

_“ সব তো কিনে এনেছ! ডায়াপার কোথায়?” তায়ান বলল।

রিকো কাঁধ ঝাঁকায়, একদম নির্লজ্জ ভঙ্গিতে।

_“ভুলে গিয়েছি, ইয়ার! আমি কি দু’একটা বাচ্চা জন্ম দিয়েছি, যে ওদের কী লাগে না লাগে এসব জানব?”

তারপর তায়ান গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলে। চোখ ঘুরিয়ে আবার আরাফের দিকে তাকায়। বাচ্চাটা নির্দোষ মুখে বসে আছে, যেন কিছুই হয়নি। পেট ভরা শান্তি তার চোখেমুখে। তায়ান কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। তারপর আরাফের দু বাহুতে চে'পে ধরে বলল,

_“ কী করেছ এগুলো? পুরো ঘর বাথরুম বানিয়ে ফেলেছ একদম!”

আরাফ ঠোঁট ভেঙে দিয়ে ডানে বামে মাথা নাড়াল। তারপর হঠাৎই ছোট্ট আঙুল তুলে রিকোর দিকে ইশারা করে। রিকো একদম থমকে যায়।

_“কি!” অবিশ্বাসে চোখ বড় বড় হয়ে যায় তার। তারপর তায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,

_“ ও কী বোঝাতে চাইছে এগুলো আমি করেছি? একদম তোমার মতো মিথ্যাবাদী আর জেদি হয়েছে এই ছেলে!” তায়ান কে ইঙ্গিত করে বলতে লাগল সে।

_“ হবে না? একে তো মামা তার উপর আবার স্টেপ ফাদার! তোমার…”

_“স্টপ!” তায়ান হঠাৎই থামিয়ে দেয়, চোখ রীতিমতো জ্বলে উঠছে। _“আমি মিথ্যাবাদী মানে?”

রিকো ঠোঁট বাঁকায়,

_“ ওর মা'কে কীভাবে ফাঁসিয়ে বিয়ে করেছিলে, ভুলে গেলে সব?”

_“ থামবে তুমি? বাজে কথা না বলে পরিষ্কার করো এগুলো।”

তায়ানের মুখের রেখা আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

_“ হোয়াট? এমন ভাবে হুকুম করছো যেন ছেলেটাকে আমি এনেছি! তুমি এনেছ, তুমিই ক্লিন করো। নাহলে থাকুক এরকমই।” রিকোও জোর গলায় বলল।

তায়ান বিরক্তিতে কপাল চেপে ধরে,

_ “আমি পারব না এসব।”

_“ কেন পারবে না? একটা মাত্র ভাগ্নে তোমার! এতটুকু পারবে না?”

রিকো তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল।

_“ শাট ইয়োর ফা*কিং মাউথ,রিকো! তায়ানের পুরো রুম কাঁপিয়ে

গর্জে ওঠে।

_“নাহলে আমি তোমাকে এক্ষুনি গুলি করে দেব!”

তায়ানের চিৎকারে চুপচাপ থাকা আরাফ আবারও ভয়ে কেঁদে উঠলো। রিকো আরাফকে কোলে তুলে বলল,

_“ ওকে, ওকে রিল্যাক্স! বাট আই কান্ট ডু দিস।” রিকো বোঝাল সে এগুলো পরিষ্কার করতে পারবে না। এলেনা পাশের রুমেই ঘুমাচ্ছিল। আরাফের কান্নায় ঘুম ভেঙে যায় তার। কাল থেকে এই বাচ্চার কান্না তাকে বিরক্ত করে তুলেছে।

দরজাটা ঝটকা মেরে খুলে সে বেরিয়ে আসে। সরাসরি রিকোর কোলে থাকা আরাফের সামনে এসে রুক্ষ কন্ঠে বলল,

_“ এই তোমার সমস্যা কী? শান্তি দেবে না আমাদের? কথায় কথায় এতো কাঁদো কেন?”

আরাফ এক মুহূর্তের জন্য কান্না থামিয়ে দেয়। তারপর এলেনার মুখে ঠাস করে থাপ্পড় লাগিয়ে জেদ দেখিয়ে বলল,

_“ যাহহহহহ!”

রিকো উচ্চস্বরে হাসতে হাসতে বলল,

_“ গুড! গুড বয়! এভাবে তোমার মামাকেও মা'রা উচিৎ।”

তায়ান ত্যাছড়া নজরে রিকোর দিকে তাকাল। এদিকে এলেনা হতভম্ব। গালটা ইতিমধ্যে লাল হয়ে উঠেছে,এই ছোট্ট হাতের চড়েও এমন জোর! রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সে রিকোর কাছ থেকে আরাফকে জোর করে ছিনিয়ে নিতে যায়। কিন্তু আরাফও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র না। সে দুই হাতে শক্ত করে এলেনার চুল মুঠো করে ধরে ফেলে,একেবারে আঁকড়ে ধরে।

_“আহ! লিভ ইট!” এলেনা চেঁচিয়ে ওঠে। আরাফ আরও জোরে টানে, যেন এক্ষুনি গোছা গোছা চুল তুলে ফেলবে সে। পরিস্থিতি মুহূর্তেই বেসামাল হয়ে ওঠে। তায়ান দ্রুত এগিয়ে এসে এলেনাকে টেনে সরিয়ে দেয়। রিকো এখনো হাসছে,

_“সরালে কেন? আর একটু থাকলে ভালো মতো মার খেত!”

তায়ান কড়া চোখে তাকায়,

_“চুপ করো!”

এদিকে আরাফ আবার কাঁদতে শুরু করেছে। এই টানাহেঁচড়ায় ভয় পেয়ে গেছে সে। তায়ান এক সেকেন্ড দেরি না করে তাকে নিজের কোলে তুলে নেয়। তায়ানের কোলে যেতেই আরাফ ‘মা’ ‘মা’ শব্দ তুলে তায়ানের গলা আকড়ে ধরে। নিজের মা আর পাপার পরিচিত মুখ ছেড়ে কোথায় এসে পড়ল সে!

তায়ান এলেনার দিকে তাকিয়ে বলল,

_“ তুই আর্জেন্টিনা ফিরে যা। এখানে থেকে ঝামেলা বাড়াস না।”

_“ গেলে তোদের নিয়েই ফিরব। কেন করছিস এগুলো তুই,তায়ান? বাচ্চাটাকে ওর বাবা মায়ের কাছে ফিরিয়ে দে। সব ভুলে ফিরে চল, প্লিজ।”

_“ কী ভুলে যাবো? কাকে ভুলব আমি?”

_“ ওই মেয়েকে ভুলবি। আমি আর এগুলো দেখতে পারছি না।” এলেনা দাঁতে দাঁত চেপে বলল।

_“ যার স্মৃতি আমি চৌদ্দ বছরেও মুছে ফেলতে পারিনি, তাকে এই দু'বছরে ভুলে যাবো?”একটু থামে তায়ান, চোখ সরু করে এলেনার দিকে তাকায়,

_“তাও তোর মতো মেয়ের কথায়?”

তায়ানের বাক্যে রিকো মনোযোগী চোখে তায়ানের দিকে তাকাল।

_“ মানে?” এলেনা তায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল।

_“ এখান থেকে চলে যা।”

_“ যাবো না আমি। আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব।” এই বলে এলেনা চলে যায় বাহিরে। এলেনা যেতেই রিকো তায়ানের কাঁধে হাত রেখে বলল,

_“ এখনও বোধহয় তোমার অনেক কিছুই আমাকে জানাওনি। আমি কী তোমার ভালো বন্ধু হতে পারিনি?”

বিজ্ঞাপন

তায়ান চোখ সরিয়ে নেয়।

_“যেটুকু জানানো দরকার ছিল, জানানো হয়েছে। বাকিটা… প্রয়োজন মনে করিনি।”

_“ আচ্ছা, বেশ। জানিও না। কিন্তু ওকে এখানে রেখে লাভ কী? ফিরিয়ে দিয়ে আসো ওর মা বাবার কাছে।”

তায়ানের চোয়ালটা আবারও টানটান হয়ে গেল।

_“ ও নিজেই আসবে। শীগ্রই আসবে।”

_“ কীভাবে আসবে ও কী জানে আমরা এখানে?”

_“ ক্লু পাঠিয়ে দাও।”

রিকো মাথা নাড়াল। তারপর আবার মেঝের দিকে তাকিয়ে বলল,

_“ আচ্ছা, আমি ডায়াপার কিনে আনি। তুমি ততক্ষণে এগুলো পরিষ্কার করো।” বলেই বেড়িয়ে যায় সে। তায়ান আর কিছু বলার সুযোগই পায় না। তায়ান আর কি বা করবে।

তারপর বিরক্ত নিঃশ্বাস ফেলে আরাফকে ধীরে ধীরে নিজের রুমে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয়। আরাফ তখন ঘুমিয়ে পড়েছে। তায়ান কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে থাকে তার দিকে। তারপর সরে আসতে নিয়েও থেমে যায় সে। নিজের কাঁধের দিকে তাকায়। ছোট্ট হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে তার শার্ট,ঘুমের মাঝেও ছাড়েনি। তায়ানের বুকের ভেতরটা কেমন যেন চুপচাপ কেঁপে ওঠে।

সে ধীরে ধীরে বসে পড়ে বিছানার পাশে। একটু ঝুঁকে সেই ছোট্ট হাতটার দিকে তাকিয়ে থাকে। খুব আস্তে হাতটা ছাড়াতে নেয়…যেন জেগে না যায়। তারপর রুম থেকে বের হয়ে আরাফ নোংরা করা জায়গা গুলো পরিষ্কার করে। এখানে কোনো হ্যাল্পিং হ্যান্ড নেই। তাই তাকেই সব করতে হবে। এলেনা ম'রে গেলেও করবে না এগুলো।

———

সন্ধায় লাগতেই অনুভা হুড়মুড়িয়ে তায়ানের অ্যাপার্টমেন্টে আসল। সঙ্গে শান্ত। পুরো অ্যাপার্টমেন্টটাই কিনে নিয়েছে তায়ান। তাই এখানে তাদের আর গার্ড ছাড়া অন্য কারো প্রবেশ নেই। অনুভা আর শান্তকে আসতে দেখেই গার্ডরা আটকে দেয় দু'জনকে।

_“ দাঁড়ান! ভেতরে যাওয়ার অনুমতি নেই।”

অনুভার চোখে আগুন জ্বলে ওঠে।

_“ পথ ছাড়ুন আমাদের।”

_“ বলেছি তো, অনুমতি নেই।”

শান্ত এগিয়ে এসে ঠান্ডা গলায় বলে,

_“ যে অনুমতি দিতে পারবে, তাকে ডাকুন।”

একজন গার্ড কানে ব্লটুথ কানেক্ট করে স্প্যানিশ ভাষায় কিছু বলল। কয়েক মিনিটের ভেতরেই তায়ান এসে দাঁড়ায়। তার পড়নে সাধারণ একটা টি-শার্ট আর ফোর কোয়ার্টার প্যান্ট। এখন আর মুখে কোনো মাস্ক বা ক্যাপ নেই। সে অনুভা আর শান্তর দিকে তাকিয়ে বলল,

_“ আসতে দাও ওদের।”

তায়ানের কথায় গার্ড গুলো সরে দাঁড়াল। পথ খালি হতেই অনুভা আর এক সেকেন্ড দেরি করে না। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে তায়ানের টি-শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরে।

_“ কোথায় আমার ছেলে? কী করেছিস ওর সঙ্গে? আমি…আমি আমার ছেলেকে দেখতে চাই। কোথায় বল…”

তায়ান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার দিকে।

_“ আগে বল ও তোর ছেলে নয়।”

অনুভার চোখ ভিজে ওঠে, তবুও কণ্ঠ শক্ত,

_“ ও আমার ছেলে। নিজের গর্ভের সন্তান ও আমার।”

তায়ানের ঠোঁটের কোণে ঠান্ডা হাসি ফুটে ওঠে,

_“ তাহলে ওকে দেখার আশা ছেড়ে দে।”

অনুভা আরও শক্ত করে ধরল তায়ানের কলার।

_“ কেন এমন করছেন? তার কণ্ঠ ভেঙে যায়,

_কী দোষ করেছে ও ? আমার এইটুকু শান্তি আপনি কেড়ে নিয়েন না… ফিরিয়ে দিন ওকে আমার বুকে…”

_“ তুই কেন এমন করলি?” তায়ান বলল।

_“ আমি আপনার কোনো বয়ান শুনতে চাই না। আমার ছেলেকে দেখতে চাই। কোথায় বলুনন!” শেষে চিৎকার করে উঠলো অনুভা।

শান্ত অনুভাকে তায়ানের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে আসে। রিকো তাদের কোনো ক্লু পাঠায় না সরাসরিই কল করে বলে দেয় ওদের ঠিকানা। তখনই সময় নষ্ট না করে চলে আসে এখানে।

_“ থামো তুমি। এভাবে বলে কিছু হবে না।” শান্ত বলল। তারপর সে সোজা তায়ানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।চোখে চোখ রেখে বলল,

_“যদি কাপুরুষ না হয়ে থাকো, আরাফকে ফিরিয়ে দাও। যদিও… তুমি কাপুরুষের চেয়েও অধম।” এক সেকেন্ড। দু’সেকেন্ড। তারপর কোনো কথা না বলেই তায়ান হঠাৎ এগিয়ে এসে সজোরে ঘুসি বসিয়ে দেয় শান্তর চোয়ালে। শান্তর মুখটা ঝটকা খেয়ে একপাশে ঘুরে যায়। চারপাশে গার্ডরা নড়েচড়ে ওঠে। শান্ত একবার গভীর নিঃশ্বাস নেয়। তারপর ধীরে মুখটা সোজা করে…আর পরের মুহূর্তেই সেও তায়ানের দিকে ঘুসি ছুঁড়ে দেয়। শান্তর ঘুসিটা সোজা গিয়ে লাগে তায়ানের মুখে। তায়ান এক পা পিছিয়ে যায়, ঠোঁটের কোণে লেগে যায় হালকা রক্ত। এক সেকেন্ডের জন্য চারপাশ স্তব্ধ।

তারপরই তায়ানের চোখে যেন আগুন জ্বলে ওঠে। কিন্তু সে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই অনুভা গিয়ে শান্তর সামনে দাঁড়ায়। তায়ানের হাত থেমে যায়।

_“ সরে যা সামনে থেকে।”

অনুভা একচুলও নড়ে না। দৃঢ় কণ্ঠে বলে,

_“ ওনার গায়ে হাত তোলার সাহসও করবেন না।”

তায়ানের চোখ সরু হয়ে আসে,

_“ সাহস করলে কী করবি?”

অনুভার চোখে বিদ্যুৎ ঝলকে ওঠে,

_“ মে'রে ফেলব।”

_“ মে'রে কী ফেলিসনি? মে'রেই তো ফেলেছিস!” তায়ান ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের রেখা টানে।

_“ মে'রে ফেলতে পারলে তো ভালোই ছিল। আই উইস,আমি সত্যিই আপনাকে মে'রে ফেলতে পারতাম!” অনুভা কথা শেষ করতে না করতেই তায়ান অনুভার বাহুতে ধাক্কা মে'রে সরিয়ে দেয়। তারপর আবারও শান্তর গায়ে হাত তুলতে নেয়। তবে এবারও তার হাত থেমে যায়। রিকো এসে চে'পে ধরে ওর হাত। তার কোলে আরাফ।

_“ মারামারি করা ছাড়া কী আর কিছু পারো না?”

তায়ানের চোখ লাল হয়ে উঠেছে। রিকোকে তার এখন চিবিয়ে খেতে মন চাচ্ছে। ছেলেটা সব সময় তার কাজে বাঁধা দেয়। এদিকে আরাফ শান্ত আর অনুভাকে দেখতেই লাফিয়ে ওঠে। ছোট্ট শরীরটা ছটফট করতে থাকে, তাদের কাছে যাওয়ার জন্য হাত বাড়ায়।

শান্ত দ্রুত আরাফকে রিকোর কাছ থেকে নিয়ে নেয়। রিকোও জোর করে না। দিয়ে দেয় সহজেই। শান্ত আরাফকে জড়িয়ে নিয়ে তার পুরো মুখ জুড়ে চুমু খেতে থাকে।

_“ পাপাকে মিস করেছ,সোনা?”

আরাফ অবুঝের মতো নিজের ভাষায় কী যেন বলতে থাকে, ভাঙা ভাঙা শব্দে। অনুভা স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে। নিজের ছেলেকে যেন চিনতেই পারছে না। তার গুলুমুলু ছেলেটা কেমন হয়ে গেছে দু'দিনেই! তার সেই গোলগাল, হাসিখুশি ছেলেটা যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। যে মা তার ছেলের খাওয়া-দাওয়া নিয়ে এতটা সচেতন, এতটা যত্নশীল… সেই ছেলেটাকেই না জানি কতক্ষণ না খাইয়ে রাখা হয়েছে! চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারে না অনুভা। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে শান্তর কাছ থেকে আরাফকে নিজের কোলে নিয়ে নেয়। আরাফ মায়ের কোলে আসতেই যেন সব খুঁজে পায়। পরিচিত সেই মা মা ঘ্রাণটা ফিরে আসে। ছোট্ট হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার গলা, মাথা গুঁজে দেয় কাঁধে।

_“ মা…”

অনুভা চোখ দু'টো বন্ধ করে ফেলে। কত গুলো ঘন্টা পর সে এই আদুরে কন্ঠে মা ডাক শুনছে!

_“ ওরা তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে তাইনা, বাবা?” কাঁপা হাতে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় সে।

এতকিছু তায়ানের সহ্য হয় না। গাল ফুলিয়ে শ্বাস নেয়। হঠাৎই সে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ে শান্তর দিকে। সজোরে ধাক্কা দিয়ে তাকে পেছনে সরিয়ে দেয়।

_ “তোর জন্যই সব হয়েছে!” গর্জে ওঠে সে,

_“তুই সবকিছু নষ্ট করে দিয়েছিস!”

শান্ত নিজেকে শান্ত রাখল না। সে তায়ানের শার্ট চেপে ধরে, চোখে চোখ রেখে বলল,

_“ নিজের দোষে সব হারিয়েছ।”

তায়ান নিজের কপাল দিয়ে শান্তর কপালে আঘাত করে। এতে অবশ্য তায়ান নিজেও ব্যথা পায়। দু’জনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে যায়। ঘুসি, ধাক্কা,একটার পর একটা আঘাতে পরিবেশ পুরো বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে। গার্ডরা এগিয়ে আসতে চায়, কিন্তু তায়ান হাত তুলে থামিয়ে দেয় তাদের।

_“নো ওয়ান ইন্টারফেয়ার!”

শান্তও ছাড় দেওয়ার মানুষ না। সে তায়ানের শার্ট চেপে ধরে আবারও আঘাত করে। গার্ড গুলো এবার আর থেমে থাকে না। শান্তকে চারপাশ থেকে চে'পে ধরে কয়েকজন। তায়ান সেই সুযোগে শান্তকে নিখুত ভাবে আঘাত করতে থাকে। কয়েক মুহুর্তেই শান্তর মুখ রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। রিকো থামাতে আসলে তাকে ধাক্কা মে'রে দূরে সরিয়ে দেয়। পরিস্থিতি অপ্রতিরোধ্য, ভয়াবহ। শান্ত কখনোই এতগুলো মানুষের সঙ্গে পেরে উঠবে না। আর অনুভাও এভাবে শান্তকে মার খেতে দেখতে পারে না। তায়ানের মাথা ঠিক নেই। সে ইতিমধ্যে বড় ছুরি হাতে শান্তর দিকে এগোচ্ছে। শান্তকে মে'রে ফেলতেও দুবার ভাববে না। এসময় অনুভা একজন গার্ডের কাছ থেকে রিভলবার ছিনিয়ে নিয়ে আরাফের মাথায়,নিজের ছেলের মাথায় তাক করল।

_“ ওনার গায়ে আর একটা আঘাত পড়লে, আমি তোর ছেলেকে মে'রে ফেলব!”

শব্দটা তায়ানের কানে পৌঁছাতেই বিস্ফোরণ ঘটে তার মাথায়। এক মুহূর্তের জন্য সব কিছু থেমে যায়। তার বুকটা অচেনাভাবে চাপা দিয়ে ওঠে। প্রথমে অনুভা, তারপর তার কোলে থাকা বাচ্চাটার দিকে তাকায়, যার মাথায় বন্দুক ধরে তায়ানের দিকেই অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অনু। কি বলল সে মাত্র? তোর ছেলেকে মে'রে ফেলব? তায়ানকে বলল? তার শরীর অচেতনভাবে কাঁপতে থাকে। গরম রক্ত যেন ভেতর থেকে ফেটে পড়ছে। হাতের শক্তি ধীরে ধীরে ঝরে যাচ্ছে। কিন্তু চোখের পাতা ফাঁপিয়ে সে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে থাকে,এই ছোট্ট প্রাণ, এই অবুঝ শিশু, যার জন্য এত রাগ, এত হিংসা, এত প্রতিশোধ,সবই মুহূর্তের মধ্যে অর্থ হারিয়ে ফেলেছে। কী শোনাল অনু তাকে? তার ছেলে? তার সন্তান? তার রক্ত!

সে কী করেছে? হায় আল্লাহ! কী করেছে এই দুদিন? দু'দিনের সব কিছু তার চোখে ঝাপসা হয়ে ভেসে ওঠে। তার ভেতরের বিস্ফোরণ এখনও জ্বলছে, কিন্তু এখন সঙ্গে এসেছে হঠাৎই অপরাধবোধের দহন।

বিজ্ঞাপন
রক্ত রেখার আড়ালে গল্পটি আয়েশা শেখ রিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে মোড়ানো থ্রিলার উপন্যাস