রক্ত রেখার আড়ালে

পর্ব - ২৯

🟢

ফজরের আযান কানে পৌঁছাতেই ঘুম ভেঙে যায় অনুভার। ফ্রেশ হয়ে নামাজ পড়ে নেয়। আজকে তার জন্য বিশেষ দিন। এত এত অপেক্ষার পর আজকে সেই ফাইনাল রেস। কখনোই ভাবেনি এমন দিনও আসবে তার জীবনে। প্রথম থেকে ভাবলে তার নিজের কাছেই সব কাল্পনিক লাগে। সে ছোট্ট থেকে যেমন নিজের জীবনে মিরাকল চাইত,তেমনই লাগে সব। বিশেষ করে আরাফ তার জীবনে আসার পর থেকে আর কোনো কিছুর জন্য তার আফসোস নেই।

এখন তার একটাই ইচ্ছে,তার ছেলেটার জীবনটা সুন্দর করে তোলা।

নামাজ শেষে দু’হাত তুলে দোয়া করল অনুভা। মন ভরে দোয়া করল তার ছোট্ট আরাফের জন্য। আর সাথে এটাও চাইল, আজকের এই প্রতিযোগিতায় যেন সে সফল হতে পারে।

নামাজ শেষ করে লিভিং রুমে আসতেই অনুভা একটু চকিত হলো। শান্ত সোফায় গা এলিয়ে, চোখ বন্ধ করে নিশ্চুপ পড়ে আছে।

_“এখানেই ঘুমিয়েছিলেন?” শান্ত এখনও ঘুমিয়ে আছে কি-না, অনুভা নিজেও ঠিক বুঝতে পারল না। তবু আস্তে করে প্রশ্নটা করে ফেলল।

শান্ত চোখ মেলে তাকাল। একটু হেঁসে বলল,

_“ রুমেই ঘুমিয়েছিলাম। একটু আগে ঘুম ভেঙে গেছে তাই এখানে এসে বসেছিলাম।”

অনুভা শান্তর সামনেই অন্য একটা সোফায় বসল।

_“ নামাজ পড়েছেন?”

_“পড়েছি।” শান্ত সংক্ষিপ্ত জবাব দিল।

তারপর দু'জনেই নিশ্চুপ। কিছুক্ষণ পর শান্ত কিছু একটা ভেবে বলল,

_“ তোমার…সেই ডিভোর্স পেপারটা কোথায়?”

কথাটা শুনে অনুভা খানিকটা থমকে গেল। এমন প্রশ্ন শান্ত অনেকদিন ধরেই আর তোলেনি। হঠাৎ আজ কেন জিজ্ঞেস করল, বুঝে উঠতে পারল না সে। ভ্রু কুঁচকে শান্তর দিকে তাকাল অনুভা।

_“হঠাৎ এই প্রশ্ন?”

শান্ত সরাসরি কিছু বলল না। শুধু স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। কিছু বলবে তখনই অনুভা বলল,

_“ ওটা আছে আমার কাছেই। কেন?”

_“ ব্যস, এমনি। মানে.. তুমি কী ওটায় আর সাইন করবে না?”

_“ করব। কেন করব না? কিন্তু তার আগে নিশ্চিত হওয়া দরকার সেটা সেই পাঠিয়েছিল কি-না।”

_“ যদি সে না পাঠায় তাহলে কী তুমি…” শান্তকে বাক্য শেষ করতে দিলো না অনুভা। তার আগেই চটজলদি বলে উঠল,

_“ আমি নতুন করে ডিভোর্স লেটার বানিয়ে তারপর ডিভোর্স দেব।”

শান্ত অল্প করে হাসল। অনুভা শান্তর দিকে পূর্ণনজর দিয়ে বলল,

_“ আপনি কী কোনো কারণে চিন্তিত?”

_“ হ্যাঁ।” শান্ত উপর নিচ মাথা নেড়ে স্বীকার করেও,পরপর আবার দু'পাশে মাথা নেড়ে বলল,

_“ না,চিন্তিত না।”

_“ কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, আপনি চিন্তিত।”

_“ হ্যাঁ, একটু তো চিন্তিতই কারণ, আজ তোমার ফাইনাল রেস। কী যে হবে…”

_“ এটা নিয়ে এত ভাবনার কিছু নেই। জিততেই হবে তার কোনো মানে নেই।”

_“ তোমাকে জিততেই হবে মাহভিন। তুমি জিতবে।” শান্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলল।

_“ আপনি মেয়েটাকে বারবার ফিরিয়ে দিচ্ছেন। আমার মনে হয় সে সত্যিই আপনাকে ভালোবাসে।” অনুভা কথা অন্য দিকে ঘোরালো।

শান্ত অবাক হলো। কারণ তার ধারণা ছিল না অনুভা জেরিনের কথা এভাবে বলতে পারে বা বিষয়টা জানে।

_“ তুমি কীভাবে জানলে?”

_“ ও আমার সঙ্গে দেখা করেছিল।” অনুভা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল।

শান্ত থমকে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ অনুভার দিকে তাকিয়ে রইল। জেরিনের উপর রাগ হচ্ছে। মেয়েটা এখন বেশি বাড়াবাড়ি করছে।

_“ কবে? কোথায়?” কিছুক্ষণ থেমে থেকে একসঙ্গে বলল।

_“ সে সব বাদ। ও তো আপনাকে সত্যিই ভালোবাসে, তাহলে কেন ওকে এড়িয়ে চলছেন?” অনুভা সরাসরি বলল, চোখে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই তার।

_“ “তুমি কী বলতে চাচ্ছ?” আগ্রহ আর অস্থিরতার মিশ্রণে,শান্ত ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করল।

_“বলছি… আপনার জীবনের মোড় এখন অন্য দিকে ঘোরানো দরকার। একজন সত্যিই আপনাকে চাইছে, তাকে এভাবে ফিরিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।” অনুভা দৃঢ় স্বরে বলল।

_“ এই কথা কেন আসছে?”

_“ আপনাকে একজন মন থেকে চাচ্ছে, তাকে এভাবে ফিরিয়ে দিতে পারেন না।”

_“আমিও তো তোমাকে মন থেকে চাই… তুমি আমাকে কেন ফিরিয়ে রেখেছ?” শান্ত একটু কেঁপে উঠল, চোখে ফটে উঠলো মৃদু হতাশা, কিন্তু কণ্ঠে কেবল সোজাসাপ্টা স্বীকার।

অনুভা কিছু বলতে পারল না। আজ অনেক দিন পর শান্ত এভাবে সরাসরি এই কথা বলছে।

_“ তুমি যেমন আমাকে মেনে নিতে পারছো না,তেমন আমিও তোমার জায়গায় অন্য কাউকে মানতে পারব না।” শান্ত বলল। একটু থেমে আবার বলল,

_“ আমাকে না হয় ভালোবেসো না, কিন্তু আমি যে ভালোবাসি এতে বাঁধা দিও না। আমার ভালোবাসা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো, যা অবিরাম চলতেই থাকবে।”

_“ আপনারও তো একটা ভবিষ্যৎ আছে!” অনুভা খুব ধীর গলায় বলল।

_“ আমার ভবিষ্যৎ আমার আরাফ। ওকে দেবে না আমায়?”

_“ দিয়েই তো দিয়েছি। ও তো আমার থেকেও আপনার উপর বেশি ভরসা পায়।”

_“ সেটাই… তাহলে আর আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেবো না।” পরক্ষণেই রুম থেকে আরাফের কান্নার শব্দ ভেসে এলো। ঘুম থেকে উঠে মা'কে পাশে না পেয়েই কান্না জুড়ে দিয়েছে। অনুভা তড়িঘড়ি করে উঠে রুমের দিকে ছুটে গেল। বিছানায় উঠে বসে কাঁদতে থাকা আরাফকে কোলে তুলে নিল। বুকের কাছে টেনে কাঁধে মাথা রাখিয়ে আলতো করে তার পিঠে হাত বোলাতে লাগল। তৎক্ষনাৎ কান্না থামিয়ে আধো ঘুম জড়ানো কণ্ঠে আরাফ ডেকে উঠল,

_“মা…”

_“ বলো, সোনা।” অনুভার কথায় সে ভুজুংভাজুং কী বলল তা আর অনুভা বুঝলো না।

বিজ্ঞাপন

———

একটু বেলা হতেই অনুভা হালকা কিছু নাশতা বানিয়ে নেয়। ভোরের ঠান্ডা হাওয়া আর নরম রোদে শান্ত ছোট্ট আরাফকে নিয়ে বাইরে একটু হেঁটে আসে। ফিরে এসে তিনজন একসঙ্গে বসে নাশতা করে। যদিও অনুভার টেনশনে কিছুই খেতে ইচ্ছে করছে না, তবু শান্তর জোরাজোরিতে কয়েক লোকমা খেয়ে নেয়। আরাফকেও কোলে বসিয়ে শান্ত নিজেই ধীরে ধীরে খাইয়ে দেয়। দু'টোর দিকে কম্পিটিশন শুরু হবে। তাই অনুভা সবসময় যেমন পরিপাটি হয়ে প্রস্তুত হয়, আজও তেমন করেই তৈরি হয়ে নেয়। এদিকে শান্তও নেভি ব্লু স্লিম ফিট কোট,কোটের ভেতরে সিম্পল পোলো শার্ট, সাথে ডার্ক জিন্স প্যান্ট পড়ে দ্রুত তৈরি হয়ে নেয়। তারপর যত্ন করে ছোট্ট আরাফকে রেডি করায়। আরাফের গায়ে পরিয়ে দেয় একটা ছোট্ট কালো বাইকার জ্যাকেট, ভেতরে সাদা টি-শার্ট, সঙ্গে ছোট্ট ডেনিম প্যান্ট। পায়ে নরম কালো বেবি বুট আর মাথায় খুব যত্ন করে পরিয়ে দেয় একটা ছোট্ট খেলনা বাইকার হেলমেট। ঠিক যেমন অনুভা নিজেকে তৈরি করেছে তেমন ভাবে। সবকিছু পরে আরাফকে দেখতে একেবারে ছোট্ট বাইকারের মতো লাগছিল। অনুভা তৈরি হয়ে শান্তর রুমের দরজায় এসে দাড়িয়েছে। একদম আরাফের পেছনে। শান্ত মুচকি হেসে আরাফের গাল টিপে বলে,

_“ লুকস লাইক মাম্মি’স বয়। আজ মা রেস করবে, আর আমাদের ছোট্ট বাইকার তাকে চিয়ার করবে। তাইনা,বাবু?”

মায়ের সঙ্গে মিলিয়ে ড্রেস পরে প্রথমে আরাফ বেশ খুশিই ছিল। ছোট্ট হাত-পা নেড়ে নিজের মতো করে আনন্দও প্রকাশ করছিল।

কিন্তু কিছুক্ষণ পরই মাথায় দেওয়া ছোট্ট হেলমেটটা তার একদমই ভালো লাগল না। বারবার হাত তুলে সেটা খুলে ফেলার চেষ্টা করতে লাগল। মুখ কুঁচকে মোচড়ামুচড়ি শুরু করে দিল। আরাফের এমন অবস্থা দেখে শান্ত হেসে ফেলে। তারপর আর জোর না করে আলতো করে হেলমেটটা খুলে নেয়। হেলমেট খুলে দিতেই আরাফ যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে শান্ত হয়ে যায়। তারা তখন চলন্ত গাড়িতে। ক্লাব থেকে অনুভাকে রেসিংয়ের জন্য স্পোর্টস বাইক দিবে, তাই নিজেরটা নেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। শান্ত গাড়ি চালাচ্ছিল। পাশে অনুভা আর তার কোলে আরাফ। আরাফ মায়ের কোলে বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে দু হাত তুলে মুঠো করে বাইক চালানোর ভঙ্গি করছিল। সাথে ঠোঁট গোল করে বুম বুম করতেছিল।

শান্ত একপলক সেদিকে তাকিয়ে বলল,

_“ এখনই ট্রেনিং করছে। বড় হয়ে তোমার থেকেও ভালো বাইকার হবে।”

অনুভা শান্তর কথা পাত্তা দিলো না।

_“ এভাবে দুষ্টমি করে অযথা ক্লান্ত হচ্ছে। তারপর আপনাকে জালাবে।”

ওরা পৌঁছাতে পৌঁছাতে আরাফ ঘুমিয়ে পড়ে। শান্ত ওকে নিজের কাঁধের এক পাশে শুইয়ে দেয়। আরাফের ছোট্ট মাথা শান্তের কাঁধে ঠেস দিয়ে শান্তির নিঃশ্বাস ফেলে। দর্শকরা ভিড় জমিয়েছে চারপাশে। লাউঞ্জের আলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে মিডিয়া, ফ্যানরা, এবং ক্লাবের সদস্যরা,কেউ শীতল পানীয় হাতে নিয়ে, কেউ ব্যাকগ্রাউন্ডে ফ্যানফেয়ার শুনছে। প্রত্যেকের চোখে রেস দেখার তৃষ্ণা। ক্লাবের ভিতরে প্রবেশ করলে বাতাসে আসে পেট্রোল আর গরম রবারের হালকা গন্ধ। দেয়ালে বড় বড় লাইভ মনিটর ঝলমল করছে। প্রতিটি স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে রেস ট্র্যাক,স্পোর্টস বাইকের সারি, প্রতিযোগীরা হাই স্পিডে ঘুরছে, ধুলো উড়িয়ে দিচ্ছে। এখনও অনেকে নিজেদের মতো প্র্যাক্টিস করছে।

দর্শকরা ট্র্যাকের চারপাশে অবস্থান নিয়েছে। ক্লাবের ভিতরে যারা আছে তারা লাইভ স্ক্রিনে রেস দেখবে। মিডিয়া রুম থেকে ক্যামেরা ক্যাচ করছে প্রতিটি মুহূর্ত।

অনুভা চলে যাওয়ার পর শান্ত আরাফকে নিয়ে আরাম করে বসার জন্য ট্র্যাকের পাশের VIP spectator লাউঞ্জে গিয়ে বসে। চারদিক কাঁচ দিয়ে ঘেরা, সেই গ্যালারি থেকে পুরো ট্র্যাকটাই পরিষ্কার দেখা যায়। সামনে বিশাল কাঁচের দেয়ালের ওপাশে কালো অ্যাসফল্টের রাস্তা সাপের মতো পেঁচিয়ে দূরে চলে গেছে। লাউঞ্জের ভেতর নরম সোফা সাজানো, আর দেয়ালে বড় বড় লাইভ মনিটর লাগানো। সেখানে ট্র্যাকের বিভিন্ন অংশের লাইভ ফুটেজ ভেসে উঠছে।

—

লাউঞ্জে আরও অনেক দর্শক বসে আছে। অনেকেই ট্র্যাকের দিকে তাকিয়ে, আবার অনেকে মনিটরে চোখ আটকে রেখেছে। রিকোও মনিটরের দিকে তাকানো। তার দৃষ্টি মেরুন রঙের লেদার জ্যাকেট ও লাল রঙের হেলমেট পড়া এলেনার দিকে। মুখে খানিক চিন্তিত ভাব ফুটে উঠেছে। তার পাশেই তায়ান বসা। কোলের একপাশে বিড়াল নিয়ে ফোনের স্ক্রিনে চোখ বোলাচ্ছে। তারাও VIP spectator লাউঞ্জে। তায়ান এখানেও আসতে চায়নি। রিকোর পীড়াপীড়িতে আসতে হয়েছে।

এলেনা অনেক বছর ধরেই একজন নামকরা লেডি বাইকার। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার পরিচিতি কম নয়। এর আগেও একাধিকবার আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতে সে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছে। তাই আজকের রেস নিয়েও রিকোর মনে কোনো সন্দেহ নেই। তার বিশ্বাস, শেষ পর্যন্ত বিজয়ের মুকুট আবারও এলেনার মাথাতেই উঠবে। সামনের টেবিল থেকে একটা সফট ড্রিংসের গ্লাস তুলে নিয়ে রিকো সোফায় হেলান দিয়ে বসল। কাঁচঘেরা ভিআইপি লাউঞ্জের ভেতর থেকে বড় লাইভ মনিটরে চোখ রেখে সে দেখতে লাগল চলমান সেই ইভেন্ট। এই রেসে অংশ নেওয়া প্রত্যেক প্রতিযোগীই সেরা। সবাই দক্ষ, সবাই অভিজ্ঞ। এখানে কেউ কারও চেয়ে কম নয়। তবুও রিকোর আত্মবিশ্বাসে কোনো ঘাটতি নেই। সে জানে, এলেনা শেষ পর্যন্ত সবার থেকে এগিয়েই থাকবে।

মনিটরের পর্দায় দেখা যাচ্ছে, বাইকগুলো বজ্রগতিতে ট্র্যাক ছুটে যাচ্ছে। কখনো কেউ এলেনাকে ক্রস করে সামনে চলে আসছে, আবার পরের মুহূর্তেই এলেনা নিখুঁত কন্ট্রোল আর গতিতে তাদের পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। রিকো ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে গ্লাসে চুমুক দিল।

কিন্তু এক মুহুর্ত পর তার মুখের হাসি মিলিয়ে যায়,যখন দেখে এলেনাকে ক্রস করে একটু আগে কালো হেলমেট ও বাইকার জ্যাকেট পড়া বাইকারটা এখনও এগিয়েই আছে। ভ্রু কুঁচকে যায় তার। মনিটরের দিকে একটু ঝুঁকে তাকায়, সে যেন চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না।

তবে পরের বাঁকেই আবার এলেনা নিজের দক্ষতায় সেই রাইডারকে পেছনে ফেলে সামনে চলে আসে। এলেনার বাইকটা নিখুঁতভাবে কর্নার কাটতেই সে আবার লিড নিয়ে নেয়। রিকোর বুকের ভেতর জমে থাকা অস্বস্তিটা একটু নরম হয়ে আসে। ঠোঁটের কোণে আবারও হালকা হাসি ফুটে ওঠে। কিন্তু সেই স্বস্তিটাও বেশিক্ষণ টিকে না। কারণ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মনিটরে দেখা যায়,কালো জ্যাকেট পরা সেই রহস্যময় বাইকারটা আবারও এলেনাকে ক্রস করে সামনে চলে যাচ্ছে। একবার…দু’বার…বারবার একই দৃশ্য। এলেনা তাকে পেছনে ফেলছে, আবার সেই রাইডার মুহূর্তের মধ্যেই স্পিড বাড়িয়ে তাকে ক্রস করে সামনে চলে যাচ্ছে। রিকোর ভ্রু আরও কুঁচকে যায়। এবার তার চোখে স্পষ্ট অস্বস্তি। সে ধীরে ধীরে গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রাখে। থুতনিতে হাত রেখে মনিটরের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তায়ান সেদিকে একবারও তাকায় না। সে শুধু শুনতে পায় তাদের সামনের সোফা থেকে ভেসে আসা ছোটো বাচ্চার কান্না। আর বাচ্চা কোলে নেওয়া লোকটা কান্না থামানোর জন্য ধীর গলায় বাংলা ভাষায় এটা সেটা বলে যাচ্ছে। অনেক্ষন ধরেই খেয়াল করছিল। এবার বিরক্ত হয়ে চোখ তুলে তাকায়। লোকটা তার সামনের সোফাতেই বসে আছে। তাই তায়ানের চোখে শুধু তার পেছন দিকটাই ধরা পড়ে,যার গায়ে নেভি ব্লু কোট পড়া। কয়েক সেকেন্ড সেদিকে তাকিয়ে থেকে সে ঠান্ডা গলায়, কিন্তু স্পষ্ট বিরক্তি নিয়ে বাংলা ভাষাতেই বলে ওঠে,

_“ এটা শিশুপার্ক না ৷ হয় কান্না থামান,না হয় বাহিরে গিয়ে বসুন। This is irritating.” শেষে ইংরেজিতে যোগ করল। তায়ানের এমন কথায় লাউঞ্জে থাকা কয়েকজন অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। সামনে থাকা লোকটা শুধু হালকা ঘাড় ঘুড়িয়ে পাশে তাকায়। কিন্তু পুরোপুরি পেছনে তাকায় না। বাচ্চা সমেত দাঁড়িয়ে সত্যি সত্যিই বের হয়ে যায়।

পাশে থাকা রিকো এগুলোর বেশি গুরুত্ব দিলো না। সে এখনো মনোযোগ দিয়ে স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে।

_“ তায়ান! মনে হচ্ছে আজ এলেনা হেরে যাবে।” সেদিকে তাকিয়ে থেকেই হতাশা ভরা কন্ঠে বলল। তায়ান একবার স্ক্রিনে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়। ফোনের স্ক্রিন অন করতে করতে বলে,

_“ তাতে আমার কী? শেষ হলে জানিও। ভালো লাগছে না।”

_“ উফফ! তোমার এই ডায়লগ আর শুনতে ইচ্ছা করে না।” রিকো বলল।

তায়ান উঠে দাঁড়ায়।

_“ ওকে,আমি চলে যাচ্ছি।”

রিকো তড়িঘড়ি করে তায়ানের হাত টেনে আবার বসিয়ে দিয়ে বলল,

_“ আশ্চর্য! তুমি এমন কেন?”

তায়ান সে কথার উত্তর দিলো না।

_“ এখানে কেন এসেছ?”

_“ ইভেন্ট দেখতে।”

_“ তাহলে সেটাই দেখো।” তায়ান বলল।

রিকো বড় করে শ্বাস ফেলে আবার লাইভ স্ক্রিনে তাকায়। পুরো লাউঞ্জের বাতাস কিছুক্ষণের জন্য স্থির হয়ে গেছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই ভেসে আসে সকলের চিৎকার আর উচ্ছ্বাসময় হাসির শব্দ,দর্শকরা, টিম মেম্বাররা, সবাই রেসারদের জয় উদযাপন করছে।

রিকোর চোখ বড় বড় হয়ে যায়। তার মন তখন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেছে। যা সে ভেবেছিল,তাই হলো! লাইভ স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে, কালো জ্যাকেট আর হেলমেট পড়া সেই রহস্যময় বাইকারটাই সবার ওপরে, পেছনে সবাইকে ফেলে জিতে গেছে! এটা কীভাবে সম্ভব? সে জানে বর্তমানে এলেনা কত রেগে গেছে। রিকো বিস্মিত চোখে তায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,

_“ সত্যিই হেরে গেল এলেনা!”

_“ কী করব আমি এখন? কাঁদব? আসো কাদি?” তায়ান অবাক ও বিরক্তি দু'টো নিয়েই বলল। তায়ানের সত্যিই এসবে কিন্তু যায় আসে না। কোনো ইন্টারেস্ট নেই তার এসবে। এলেনার ব্যাপারে তো একদমই না। সে চোখ তুলে দেখেও নি একবারও। কিন্তু চোখ তুলল তখন,যখন হঠাৎ এক জন ইভেন্ট হোস্টের উচ্ছ্বাসপূর্ণ কণ্ঠ ভেসে আসে,

_“And the winner of today’s international race… Mahvin Anuva!”

“And the winner is… মাহভিন অনুভা!” তায়ানের কানে বারবার বাজতে থাকে একই শব্দ। “And the winner is… মাহভিন অনুভা!”

মাথার ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছে এই শব্দ। বিস্ময়ে চোখ বড় হয় তার। লাউঞ্জের উচ্ছ্বাস, দর্শকদের চিৎকার, মনিটরের ঝলক,সবকিছুই হঠাৎ থমকে গেছে। চেহারা বদলে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে মুহুর্তেই। সে মনিটরে দেখল, মেয়েটা হেলমেট খুলছিল। তায়ানের হার্টবিট বেড়ে যায়। মনে হচ্ছিল লাফিয়ে বেড়িয়ে আসবে হৃদপিণ্ড। মেয়েটার হেলমেট যখন পুরোপুরি খুলে যায় তায়ানের সমগ্র শরীরে কারেন্টের মতো বয়ে যায়। ঠোঁট শুকনো, গলা খাটখাট করছে। শুকনো গলায় ঢোক গেলে সে। নিজের চোখকে কোনো ভাবেই বিশ্বাস করাতে পারছিল না। এই মেয়ে, যাকে সে দুই বছর ধরে খুঁজছে, সে তার সামনে লাইভ স্ক্রিনে! এটা অনু! এটা আদৌও সম্ভব? আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে আছে মেয়েটার মুখ। পাশে থাকা রিকো স্তব্ধ। সে নিজেও বিশ্বাস করতে পারছিল না। বর্তমানে তায়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। বোঝার চেষ্টা করতে তায়ানের অভিব্যক্তি।

অনুভা নিজের জয় উদযাপন করছে। হেলমেট খুলায় তার উজ্জ্বল মুখ উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। এদিকে এলেনাও যখন অনুভার মুখ দেখতে পায় সেও নিজের হেলমেট খুলে বিস্ফারিত চোখে অনুভাকে দেখতে থাকে। রেসিংয়ের সময় কয়েকবার নামটা শুনেছে কিন্তু গুরুত্ব দেয়নি সে। বুঝতে পারল না তার উপর আকাশ ভেঙে পড়ল কিনা। তবে এটা বুঝলো তায়ানকে প্যারিসে এনে সবথেকে বড় ভুল সে করেছে। আর পরবর্তী ভুল এই ইভেন্টে এনে। কারণ এটাই সেই মেয়ে, যার জন্য তায়ান আজ এলোমেলো।

হোস্টরা হাসি মুখে মাহভিনের দিকে এগিয়ে আসে, মাইকের কাছে টেনে তাকে বলছে, “How does it feel to win?” অনুভার চোখ তখন তার সবচেয়ে কাছের দুজনকে খুজছিল। শান্ত আর আরাফ। কোথায় তারা? পাশ থেকে আবারও হোস্টের ডাকে মাইকের কাছে গিয়ে নিজের অনুভূতি বলার জন্য প্রস্তুতি নেয়। ঠিক সেই সময় তার কব্জিতে ধরে কেউ হেঁচকা টান মারে। অনুভা হকচকিয়ে ওঠে, সাথে আশেপাশের সবাই অবাক বনে যায়। অনুভা নিজেকে সামলে কব্জিতে টান মা'রা লোকটার দিকে তাকাতেই তার পায়ের তলার মাটি সরে যায়। মুখের রঙ এক মুহুর্তেই বদলে যায়।

আজ সে দুবছর পর আবারও সেই মানুষটাকে দেখল। যে দু'বছর আগে তার দুঃস্বপ্ন হওয়ার জন্য আহসানি বাড়িতে পা রেখেছিল। সে এখন তার সামনে। ঠিক সেই ভাবে মাস্ক,ক্যাপ পড়া। অনুভা তো এই চোখ কখনও ভুলবে না। এই নিষ্ঠুরতম চোখ সে ভুলতেই পারে না। কখনোই না। কিন্তু অনুভা সেদিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকল না। সে জানে সামনে থাকা মানুষটা তার কোনো ভ্রম নয়। সত্যিই এটা সেই প্রতারক। কারণ একটু আগেই সে এলেনাকে দেখেছে,যে তখন অনুভাকে বিস্ফোরিত নয়নে দেখছিল। অনুভা নিজের সব শক্তি প্রয়োগ করে তায়ানের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয়। তায়ান সময় নষ্ট করে না। সে আবারও অনুভার হাত শক্ত করে চে'পে ধরে টানতে টানতে পুরো ক্লাবের বাহিরের দিকে যেতে থাকে। অনুভা নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রান চেষ্টা করে। এলেনা আর রিকোও সেদিকে যায়। পেছনে পড়ে থাকে শুধু বিস্মিত হয়ে থাকা ট্র্যাকের লোকজন।

তায়ান অনুভাকে নিয়ে বেশিদুর যেতে পারে না। শান্ত এসে সামনে দাড়ায়। সে তখন আরাফ ঘুম থেকে উঠে কান্নাকাটি করায় লাউঞ্জ থেকে বেড়িয়ে গিয়েছিল।

_“ আপনি? ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?” শান্ত তায়ানকে চিনতে পারে। কিন্তু তায়ান হিসেবে নয়। কালকের সেই আরাফকে বাঁচানো লোকটা হিসেবে।

তায়ান কপাল কুঁচকে শান্তকে দেখে। সেও চিনতে পারে এটা কালকের সেই দায়িত্বহীন বাবাটা। যার কোলে এখনও সেই বাচ্চাটা।

_“ সেই কৈফিয়ত আপনাকে দেব?”

এরি মধ্যে আরাফ শান্তর কোল থেকে অনুভার দিকে দু'হাত বাড়িয়ে দেয়। সঙ্গে কাঁপা কন্ঠে বলে ওঠে,

_“ মা! কোলে…” ঠোঁট ভেঙে দেয় ছেলেটা। সে অনেকক্ষণ ধরেই মায়ের খোঁজ করছিল। শান্ত এটা ওটা বলে থামিয়ে রেখেছিল।

কিন্তু বাচ্চাটার এমন সম্মধনে তায়ানের পৃথিবী যেন তখনই থেমে যায়। এক মুহুর্তের জন্য শ্বাস নিতে ভুলে যায় সে । মাস্ক খুলে ফেলে সে। নাহলে দম আটকে ম'রেই যাবে বোধহয়। অনুভাকে মা ডাকছে? মা! অনু মা হয়ে গেছে? এই লোকটার বাচ্চার মা? যার কোলে এই বাচ্চাটা? তায়ান ভাবতেই পারে না আর। শরীর অচল হয়ে আসছে তার। অনুভা আবারও ঝটকা মে'রে তায়ানের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। তায়ান আর ধরতে পারে না। তার হাত অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছে।

অনুভা শান্তর কাছে গিয়ে আরাফকে কোলে তুলে নেয়। কোনো রকম বাক্য বিনিময় না করেই শান্তকে যাওয়ার জন্য তাড়া দেয়। এদিকে আরাফ বারবার অনুভাকে মা বলে ডাকছিল,যা তায়ানের বুকে তীরের ফলার মতো গিয়ে বিঁধতে থাকে। সে তার কাঁপতে থাকা পা দিয়ে অনুভা আর শান্তর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। অনুভার চোয়ালে শক্ত করে চে'পে ধরে বলে,

_“ আমি প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য বিয়ে করেছিলাম ঠিকই…কিন্তু অন্য কারও সঙ্গে দেখার জন্য নয়। আর…আর তুই কিনা অন্যের সন্তানের মা হয়ে গেলি? Are you f*ucking serious right now?”

বিজ্ঞাপন
রক্ত রেখার আড়ালে গল্পটি আয়েশা শেখ রিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে মোড়ানো থ্রিলার উপন্যাস