তায়ানের হাত থেকে ছুরিটা নিচে পড়ে যায়। এলোমেলো পায়ে অনুভার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আরাফের মাথায় ধরে রাখা বন্দুকটা ঝটকা মেরে সরিয়ে নিয়ে বলল,
_“ আমার সন্তান! আমার…” কথাগুলো ঠোঁট থেকে বেরোয় ঠিকই, কিন্তু সেগুলো এতটাই নিস্তেজ, এতটাই ভাঙা,যেন নিজের কণ্ঠই নিজের কানে পৌঁছাচ্ছে না। তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। কাঁপতে থাকা হাত দুটো ধীরে ধীরে আরাফের দিকে বাড়ায়…আবার থেমে যায়। পিছু টেনে নেয় নিজেকে। মুখজুড়ে ঘাম, আর রক্তের দাগ। শান্তর সঙ্গে ধস্তাধস্তির চিহ্ন এখনো লেগে আছে। দু’হাতে সেগুলো মুছে ফেলে সে, যেন নিজেকে স্বাভাবিক করতে চাইছে। একটা দীর্ঘ, ভারী শ্বাস টেনে নেয়। তারপর ঢক গিলে আবারও দু হাত এগিয়ে দিলো। আরাফ তাকিয়ে আছে। সে এসবের কিছু বুঝতে পারছে না। তার মা যে তার মাথায় বন্দুক ধরে এত বড় কথা বলে ফেলেছে তাতেও তার কিছু যায় আসছে না। সে শুধু জানে, সে এখন তার মায়ের কোলে আছে,তার কিচ্ছু হবে না। সামনে থাকা লোকটাকে হাত বাড়িয়ে থাকতে দেখে আরাফ বেশ দ্বিধায় পড়ে গেল। যেতেও ইচ্ছা করছে আবার করছেও না। অবুঝ মনটা ভয় পাচ্ছে। যদি তার কাছে গেলে আবারও মা'কে হারিয়ে ফেলে? যদি আবারও না দেখতে পায়? মুখ ঘুড়িয়ে ওর মায়ের কাঁধে মাথা রাখল আরাফ। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আবারও মাথা তুলে তায়ানের দিকে তাকাল। এবার কোনো ভাবনা ছাড়াই লোকটার দিকে নিজের ছোট্ট শরীরটা এগিয়ে দিলো। তায়ানের হাত তখনও জীর্ণ রোগির মতো কাঁপছিল। তার দুটো আঙ্গুল বাচ্চাটার শরীরে স্পর্শ লাগার সঙ্গে সঙ্গে অনুভা আরাফকে বুকে জড়িয়ে সরে দাঁড়াল। চোখে তীব্র আগুন ফুটে উঠলো মেয়েটার।
_“ থামুন। আর এক ইঞ্চি এগোবেন না।”
একদিকে কাঁপতে থাকা পিতৃত্ব…অন্যদিকে আঁকড়ে ধরা মাতৃত্ব। মাঝখানে একটা ছোট্ট প্রাণ। অনুভা আরাফকে আরও শক্তে করে জড়িয়ে নিয়ে বলল,
_“ ওকে ছোঁয়ার অধিকার আপনার নেই!”
তায়ান স্থীর চোখে অনুভার বুকে জড়ানো আরাফের দিকে তাকিয়ে যন্ত্রের মতো বলল,
_“ ও আমার…”
_“ কক্ষনও না!” অনুভা চিৎকার করে বলল।
_“ তুই একটু আগেও বলেছিস ও আমার ছেলে!”
_“ হ্যাঁ, বলেছি কিন্তু… কিন্তু ওকে কাছে পাওয়ার অধিকার আপনি হারিয়ে ফেলেছেন। ও আমার…শুধুই আমার।”
তায়ান অনুভার চোখের দিকে তাকাল। এরকম ভাবেই তো দেখত। স্বপ্নে যখন আসত সে, ঠিক এমনই চাহনি থাকত। এজন্যই কী ওর পেটটা বড় লাগত? তায়ানের কেন মনে হয়নি ওই পেটে ওর অস্তিত্ব আছে, তাই সৃষ্টিকর্তা বারবার তাকে একই স্বপ্ন দেখাচ্ছে! কেন অনুভব করতে পারেনি? তারপর… তারপর নিজের ছেলেকে দেখেও একবারের জন্যও মনে জাগেনি এটা তার রক্ত। তাকে কষ্ট দেওয়া পাপ। কেন বুঝতে পারেনি?
একটা ভারী শ্বাস বুক চিরে বেরিয়ে আসে তার। দু’টো দিন…পুরো দু’টো দিন সে এই বাচ্চাটাকে অনাহারে রেখেছে। ক্ষুধায় কেঁদেছে সে…খাবারের জন্য ছোট্ট মুখটা তুলে ডেকেছে, তায়ান শুনেও শুনেনি। রাতে কাউকে পাশে না পেয়ে ভয়ে চিৎকার করেছে। তায়ান গিয়ে ছোট্ট শরীরটাকে জড়িয়ে নেয়নি। সেই প্রতিটা কান্না… প্রতিটা আর্তনাদ…আজ যেন একসাথে ফিরে এসে তায়ানের বুকের ভেতর আঘাত করতে থাকে। হয়তো এজন্যই এত অস্থির লাগত তার…
অকারণ এক টান, এক অজানা অস্বস্তি। তারই অংশ ছিল বলে। তারই রক্ত…তারই সন্তান। সবকিছুর সামনে রেখেও কেন তাকে অন্ধ করে রেখেছিল সৃষ্টিকর্তা? ভাবতে ভাবতে তায়ান হাঁটুগেড়ে মাটিতে বসে পরে।
আরাফ হঠাৎই অনুভার কোলে অস্থির হয়ে ওঠে। ছোট্ট শরীরটা মুচড়িয়ে ওঠে বারবার। মায়ের বুক থেকে মুখ তুলে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকায়। চোখ দুটো বিস্ময়ে ভরা, অচেনা এক টান যেন তাকে ডাকছে। সে আবার ছটফট করতে থাকে, নামতে চায়। অনুভা শক্ত করে ধরে রাখে তাকে। যেন ছেড়ে দিলেই কিছু হারিয়ে যাবে। কিন্তু আরাফ যখন কেঁদে ওঠে, তখন তার হাত অজান্তেই আলগা হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত নামিয়ে দিতে হয় তাকে।
ছেলেটা এখনো ঠিকমতো হাঁটতে পারে না। তবু টলমল পায়ে, হোঁচট খেতে খেতে, অগোছালোভাবে এগিয়ে যেতে থাকে সামনে। কোনো এক অজ্ঞাত টান তাকে এগিয়ে নেয়। অনুভা তড়িঘড়ি করে এগিয়ে যেতে যায় ছেলেকে থামাতে। কিন্তু রিকো এসে তার পথ আটকে দেয়। শান্ত এখনো গার্ডদের হাতে আটকে আছে। নড়ারও উপায় নেই তার। আর সামনে তায়ান। যে হাঁটু গেড়ে বসে নিস্তেজ, শূন্য চোখে তাকিয়ে আছে সেই ছোট্ট প্রাণটার দিকে। ধীরে ধীরে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। প্রতিটি ছোট্ট পা ফেলা… যেন তার বুকের ভেতর একেকটা সামুদ্রিক ঢেউ তুলছে। আরাফ যখন একেবারে কাছে চলে আসে, মাত্র এক হাত দূরত্ব। তায়ান এক টানে ছেলেটাকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে চোখ বন্ধ করে ফেলে। তার বুকটা অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করছে। কিছু একটা যেন গলায় আটকে গেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। সে মাথা নিচু করে, দাঁত চেপে ধরে নিজেকে সামলাতে চায়। কিন্তু চোখের কোণ ভিজে ওঠে। নিজের কান্না চে'পে রাখার বৃথা চেষ্টা চালায়। এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে আরাফের ছোট্ট কাঁধে। তায়ান তড়িঘড়ি করে চোখ মুছে ফেলে, যেন কেউ দেখে ফেললে লজ্জা পাবে। তবু থামাতে পারে না। শেষমেশ ফুপিয়ে ওঠে সে। গলা দিয়ে একরকম ভাঙা, দম আটকে যাওয়া শব্দ বেরোয়। যেন এতদিনের জমে থাকা সব অনুতাপ, সব যন্ত্রণা, সব না-বলা ভালোবাসা একসাথে ভেঙে পড়েছে এই ছোট্ট শরীরটার ওপর। আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে নিজের অস্তিত্বকে। আরাফ প্রথমে চমকে ওঠে। তারপর ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে যায়। ছোট্ট হাত দুটো তুলে আলতো করে জড়িয়ে ধরে তায়ানের গলা। কোনো ভাষা নেই…তবু একটা অদ্ভুত বন্ধন তৈরি হয়ে যায় সেই মুহূর্তে। তায়ান খুব ব্যথিত কন্ঠে ছেলের উদ্দেশ্যে বলল,
_“ আমি তোমার এতটাই নির্বোধ পিতা যে,নিজের সন্তানকে এতো কাছে রেখেও বুঝতে পারিনি, তুমি আমার নিজেরই রক্ত। দু’দিন যাবৎ কতই না কষ্ট দিয়েছি তোমাকে,বাবা!”
রিকোর চোখদুটো টলমল করে ওঠে। কত গুলো বছর ধরে এক সাথে আছে তারা। কখনোই তায়ানকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখেনি। কাঁদা তো দূরের কথা। তার চেনা সেই পাথরে গড়া মানুষটা…আজ যেন নিজেরই ভেতরে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। রিকোর বুকের ভেতরটা হালকা করে কেঁপে ওঠে। চোখের কোণে জমে ওঠা পানি হাতের পিঠ দিয়ে মুছে ফেলে সে। তারপর দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাকায় শান্তর দিকে। যে এখন আহত চোখে তায়ান আর বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে আছে। গার্ডদের এখনও ওকে ধরে থাকতে দেখে চোখ গরম করে তাকায়। সঙ্গে সঙ্গে গার্ড গুলো ছেড়ে দেয় শান্তকে। কিন্তু শান্ত সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। মুক্ত হয়েও শান্ত নড়ে না।
তায়ান নিজের চোখের পানি মুছে আরাফের দু গালে আলত করে হাত রেখে বলল,
_“ আই'ম নট ইয়োর গুড ফাদার। তবু, একবার…শুধু একবার বাবা বলে ডাক। একবার ‘বাবা’ বল আমায়। যেমন করে তুই তোর মা'কে ডাকিস।”
আরাফ ডাকল না। সে পেছনে তার মায়ের দিকে দৃষ্টি ফেলল। অনুভা অবিচল দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ভেতরে সে মোটেও স্থির না। ছেলেকে হারিয়ে ফেলার ভয়। তার বুকের ভেতরটা যেন থরথর করে কাঁপছে। ছেলের সেই নির্ভরশীল দৃষ্টি। সবসময় যেমনটা থাকে,আজও ঠিক তেমনই।
_“আমি কী করব, মা?”
অকথিত সেই প্রশ্নটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে আরাফের চোখে। অনুভার গলা শুকিয়ে আসে। ঠোঁট কেঁপে ওঠে হালকা করে। সে তাকিয়ে থাকে,একবার ছেলের দিকে, একবার তায়ানের দিকে। এই মানুষটা…যার ওপর সে এতদিন ঘৃণা, অভিমান, অভিযোগ জমিয়ে রেখেছে, আজ সেই মানুষটাই তার সন্তানের কাছে একটা শব্দ ভিক্ষা করছে। “বাবা”…শব্দটা যেন তার বুকের ভেতর ছুরির মতো আঘাত করে। আঙুলগুলো শক্ত হয়ে আসে তার। মুঠো করে ধরে নিজের ওড়নার প্রান্ত। চোখে পানি জমে ওঠলেও সে জোর করে তা আটকে রাখে। না… সে এই মানুষের প্রতি কক্ষনও নরম হবে না। অসম্ভব! দু'বছর আগে সেও ভিক্ষা চেয়েছিলো। পায়ে পড়তেও ভুলেনি সেদিন। ফিরেও তাকায়নি এই লোকটা। বরং তাকে ঘার ধা’ক্কা মে'রে বের করে দিয়েছিল।
তায়ান আরাফকে নিজের দিকে ফেরাল।
_“ ডাকো… বাবাকে বকো। তোমাকে কষ্ট দিয়েছি নাহ? এবার মারো আমায়।”
অনুভা আর দাঁড়িয়ে থাকল না। দ্রুত গতিতে কদম ফেলে আরাফকে কোলে নিয়ে বলল,
_“ ডাকবে না। ওর কোনো বাবা নেই। এসব করে আমার ছেলেকে কেঁড়ে নিতে পারবেন না।”
তায়ান উঠে দাড়িয়ে অনুভার দিকে তাকিয়ে বলল,
_“ আমি কেঁড়ে নিচ্ছি না, ও আমার অধিকার।”
_“ নেই…নেই কোনো অধিকার নেই।” অনুভা বলল।
_“ তুই অস্বীকার করলেও ওর শরীরে আমারই রক্ত বইছে। আমিই ওর জন্মদাতা।” তায়ানের কন্ঠে কোনো রাগ নেই। খুব শান্ত ভাবে অনুভার দিকে তাকিয়ে বলছিলো।
অনুভার ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি ফুটে উঠলো।
_“ জন্ম দিলেই মানুষ বাবা হয়ে যায়? জন্ম দিলেই যদি বাবা হওয়া যেত, তাহলে এতো এতো শিশু ডা*স্টবিনে পড়ে থাকত না। আমি ভাগ্যবতী ছিলাম বলে আমার সন্তানের পাশে কাউকে পেছেছিলাম। না হলে আমার সন্তানও হয়তো ডাস্টবিনে পড়ে থাকা শিশুদের মধ্যে একজন হতো। আমি কখনোই জানতে দেব না আপনার মতো কা’পুরুষ একজন তার বাবা।” একটু থেমে গলার আওয়াজ নামিয়ে
শান্তর দিকে আঙুল তুলে বলল।
_“ ওই মানুষটা না থাকলে… আমিও আমার সন্তানকে ডাস্টবিনেই ফেলে আসতাম। সেই মুহুর্তে আপনার প্রতি ঘৃণা আমাকে এই কাজ করতে বাধ্য করত।” আরাফের দিকে তাকাল অনুভা। চোখ দিয়ে এখন অনিচ্ছাকৃত ভাবেই জল গড়াচ্ছে। সেদিন হসপিটালে শান্ত অনুভাকে না বোঝালে সত্যিই তো এই বাচ্চাটার উপর অন্যায় করে ফেলত সে।
তায়ান একবার শান্তর দিকে তাকাল। তারপর অনুভার কাছে গিয়ে বলল,
_“ বিশ্বাস কর…আমি তোকে খুঁজেছি। তোকে ছেড়ে আসার কয়েকদিন পরই আমি…”
_“ বিশ্বাস? করেছিলাম বিশ্বাস…বরং এটা অবিশ্বাস্য ছিলো আপনি আমাকে ছেড়ে যাবেন। কিন্তু আপনি সেটাই করেছেন। ভেঙে দিয়েছেন আমার বিশ্বাস। বিশ্বাস কাচের মতোই হয় , যেটা ভেঙে গেলে আর জোরা লাগে না। যা-ও একটু আশা ছিলো সেটা আপনি ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে শেষ করে দিয়েছেন। সব শেষ করেছেন।”
অনুভা বলল।
_“ ওয়েট!!” রিকো অনুভাকে আরও কিছু বলার আগেই রিকো তাকে থামিয়ে দেয়। অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বের হয়ে আসে। হাতে একটা কাগজ। কাগজটা দেখে শান্ত অনুভা দু'জনেই অবাক হয়। কারণ ওটাই সেই ডিভোর্স পেপারটা। রিকো ওটা তায়ানের হাতে দিয়ে দেয়।
তায়ান সেটা হাতে নিয়ে শান্তর দিকে তাকায়। ডিভোর্স পেপারটা শান্তর সামনে এপিঠ ওপিঠ করে তুলে ধরে খুব গম্ভীর, ঠান্ডা গলায় বলল,
_“ তুমি বলবে, নাকি আমি বলব?”
শান্তর তার মুখের রং ফ্যাকাসে হয়ে ওঠে। সে খুব ভালো করেই জানে তায়ান কী বোঝাতে চেয়েছে। তার হাত পা কেমন শীতল হয়ে উঠছে । তবু নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল। অনুভা থমকে তাকিয়ে আছে তার দিকে। চোখে সন্দেহ তবু চাইছে না তার সন্দেহ সত্য হোক। শান্ত এমন কিছু না বলুক, যেটা তার এই মুহুর্তে সন্দেহ হচ্ছে। কিন্তু অনুভার ভাবনাকে ভুল প্রমান করে শান্ত বলেই ফেলল,
_“ ডিভোর্স পেপারটা আমি… আমি সাজিয়ে ছিলাম।” শান্তর দৃষ্টি নিচে। গলাটা শুকিয়ে গেছে তার। এই মুহুর্তে তার অনুভার চোখের দিকে তাকানোর সাহস নেই। অনুভার দু-চোখ দিয়েই নিঃশব্দে জল গড়তে থাকে। চোখের পাতা নড়ে না।
_“ মাহভিন বিশ্বাস করো…” শান্ত ভাঙা গলায় বলতে চাইল।
_“ থাক! প্লিজ…আর কিছু শোনার আগ্রহ বা শক্তি কোনোটাই নেই আমার।” তার চোখে তখন আর রাগ নেই, শুধু ভাঙা বিশ্বাসের নিঃশব্দ মৃত্যু।
_“ মনে পড়ে সেদিনের কথা? এই কাগজ আমাকে কতটুকু পুড়িয়েছিল মনে পড়ে আপনার? বলুন…”
শান্ত কথা বলতে পারে না। সেদিন সে ভাবেনি তার এই একটা কাজে মাহভিন এতটা ভেঙে পড়তে পারে। সে তো শুধু এই কাজগের মাধ্যমে তায়ান নামের জা*নোয়ারটাকে মানভিনের মন থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল। যেন ওর কোনো পিছুটান না থাকে। যেন সে সামনে এগোতে পারে। কিন্তু সেদিন সেই ঘটনার পরই জানতে পারল মানভিন অন্তঃসত্ত্বা। আগে জানলে কখনোই এমন কিছু করত না। আর করে ফেলার পর সেই সত্য বলার সাহস তখন ছিলো না। এই দু’টো বছর, এই একটা ভুল, এই একটা মিথ্যে, এই একটা গোপন সত্য, সবকিছু নিয়ে সে বেঁচে আছে। একটা অদৃশ্য অপরাধের বোঝা
কাঁধে নিয়ে ঘুরছে সে।
অনুভা আরাফকে নিয়ে অ্যাপার্টমেন্টের গেটের দিকে হাঁটা ধরে। তার পদক্ষেপগুলো ভারী,তবু থামে না। পেছনে ফেলে যেতে চায় সবকিছু। শান্ত দৌড়ে গিয়ে অনুভার সামনে দাঁড়ায়।
_“ প্লিজ আমায় ভুল বুঝো না। আমি তোমার ভালোর জন্য এমন করেছিলাম। কোনো খারাপ উদ্দেশ্য ছিলো না…বিশ্বাস করো।”
অনুভা শান্তর চোখের দিকে তাকায়। একটা ক্ষীণ, তিক্ত হাসি ফুটে ওঠে তার ঠোঁটে।
_“ ভালো? মিথ্যা বলে! কেন মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছিলেন? একবার ভাবুন তো, স্বামীর থেকে আসা ডিভোর্স পেপার পাওয়ার পর যখন মেয়েটা জানতে পারে সেই স্বামীর অস্তিত্বই তার গর্ভে এসেছে, তখন সেই মেয়েটার অবস্থা কী হতে পারে? বুঝতে পারবেন সেই দহন? পারবেন না…কেউ পারবে না। একজনের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ অন্যজনের হৃদয়ে দাগ কাটতে পারে না।”
শান্ত নিঃশব্দ হয়ে যায়। তার চোখে স্পষ্ট যন্ত্রণা।
_“ আমি তোমার কষ্ট দেখতে চাইনি বলেই এমন করেছিলাম, আমি বুঝিনি তুমি সেদিন এতটা ভেঙে পড়বে।” শান্ত আহত কন্ঠে বলল।
তায়ান এসে শান্তকে ধা’ক্কা মে'রে সরিয়ে দেয়।
_“ নাটক করবে না একদম। আমার স্ত্রী আর সন্তানের থেকে দূরে থাকো।”
শান্ত সামলে দাঁড়ায়। চোয়াল শক্ত হয়ে যায় তার। চোখে ব্যথা, কিন্তু ভয় নেই। ধীরে ধীরে মাথা তোলে, তায়ানের চোখে চোখ রাখে।
_ “স্ত্রী?” বিদ্রুপ হাসল সে।
_“ ডিভোর্স পেপারের নাটক আমি সাজালেও, ছেড়ে তুমিই গিয়েছিলে। তোমার জন্যই এসব করতে হয়েছিল। চোখের সামনে তো আর নিজের ভালোবাসাকে তোমার মতো অমানুষের জন্য কষ্ট পেতে দেখতে পারি না।”
তায়ান হাত শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করল। শান্ত আরও বলল,
_“ আর সন্তানের কথা বলছ? যে সন্তানের অস্তিত্ব তুমি টেরও পাওনি এতদিন,আজ হঠাৎ করে তার বাবা হয়ে গেলে?” একটু থামে শান্ত। তার দৃষ্টি একবার অনুভা আর আরাফের দিকে যায়, তারপর আবার তায়ানের দিকে ফিরে আসে।
_“ আমি ভুল করেছি মানছি। কিন্তু আমি ওদের ছেড়ে যাইনি।”
তায়ান শান্তর বুকের অংশের কাপড় ধরে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
_“ এগুলো বলে নিজের ভুল ঢাকতে পারবে না। তোমার কারণে অনু আমাকে এতদিন ভুল বুঝেছে!”
_“ মোটেও আমি তার জন্য আপনাকে ভুল বুঝিনি।” অনুভার কণ্ঠ ছেদ ফেলে দু’জনের মাঝখানে। সে এক পা এগিয়ে আসে।
_“যদি আমি বিশ্বাস করতাম পেপারটা আপনার পাঠানো তাহলে সেই মুহুর্তেই আমি সেখানে সাইন করে দিতাম। এটা নকল ছিল,ঠিকই। কিন্তু আসলটা আমি নিজেই বানাব। তারপর আপনাকে ডিভোর্স দিয়ে…সারাজীবনের জন্য মুক্ত হয়ে যাব।” শেষ কথাটা বলার সময় তার চোখে একফোঁটা জল চিকচিক করে ওঠে। কিন্তু কন্ঠ ছিলো চাবুকের মতো ধারালো।
শান্তকে ছেড়ে এবার তায়ান অনুভার চোয়ালে চে'পে ধরল।
_“ এমন কিছু ভাবিসও না অনু! যদি এমন কিছু করার সাহস করিস সেদিনই পৃথিবীতে তোর শেষদিন হবে। তোর নামের পাশে আমার নাম ব্যতিত আর কারো নাম বসবে না। অন্তত আমি বেঁচে থাকা অবস্থায় না।”
_“ আমার নামের পাশে অন্য কারো নাম বসবে না ঠিকই, কিন্তু আপনার নামও আমি রাখব না।” অনুভা বলল।
তায়ানের চোখ লাল হয়ে উঠল, কণ্ঠ ঝাঁজিয়ে উঠল,
_“ যেদিন তুই আমার নাম মুছে ফেলার জন্য ডিভোর্স পেপার তৈরি করবি… আই প্রমিস আমি তোকে মে’রে ফেলব। আই রিপিট, একদম মে’রে ফেলব।”
আরাফ এতক্ষণ চুপচাপই ছিলো কিন্তু শেষ মুহুর্তে নিজের মা'য়ের সঙ্গে কাউকে এভাবে কথা বলতে দেখে ভয়ে কেঁদে উঠলো। তায়ানের দৃষ্টি নরম হয়ে আসে। আরাফকে কোলে নিতে চায়।
_“ ওর থেকে দূরে থাকবেন।” অনুভা সরে গিয়ে বলল।
_“ কেন দূরে থাকব? ও শুধু তোর একার নয়।”
_“ ও আমার অন্ধকার জীবনের এক টুকরো আলো। আর এই আলোর ভাগ আমি কাউকে দেব না। কাউকে না, কক্ষনও না…” অনুভা আরাফকে আঁকড়ে ধরে বলল। অনুভা তাদের পাশ কেটে চলে যেতে চায়। এমন অসুস্থ পরিবেশে আরাফকে নিয়ে আর এক মুহুর্তও থাকতে চায় না। কিন্ত তায়ান ওর বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়।
_“ কোত্থাও যাবি না। ভুলে যাস না তুই আমার স্ত্রী!”
_“ ভুলে যায়নি একটা কাপুরষ, জা*নোয়ার আমার স্বামী!” অনুভা সঙ্গে সঙ্গে বলল।
_“ যা খুশি বলার বল। কিন্তু এখান থেকে এক পা নড়বি না।”
অনুভা এক হাতে আরাফকে ঝাপটে ধরে অন্য হাতে তায়ানের বুকে ধাক্কা মারল।
_“ কী করবেন নড়লে? ভয় পাই আমি আপনাকে? যদি ভেবে থাকেন ভয় পেয়ে এবং আমার ছেলের বাবার দোহাই দিয়ে আমাকে ধরে রাখার চেষ্টা করবেন, তাহলে ভুল ভাবছেন।” বাকি কথা বলার আগে তায়ান আর শান্ত দুজনের দিকেই তাকাল।
_“ আমার আর আমার ছেলের উপর যে অধিকার দেখাতে আসবে, হয় তাকে মা’রব, নয়ত আমার ছেলেকে মে'রে নিজে ম’রব। তবু কোনো বিশ্বাস ঘাতক আর মিথ্যাবাদির ছায়া, আমার সন্তানের গায়ে পড়তে দেব না।”
শান্তর বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে। তবে কী যে ভয় পেয়েছিল সেটাই হবে? মাহভিন আজ থেকে তাকেও অবিশ্বাস করবে? আরাফকে হারিয়ে ফেলবে? হারিয়ে যাবে ছেলেটির চোখে দেখা সেই ছোট্ট ভরসার রেখা? শান্ত নিজেকে আটকাতে চাইলেও হৃদয়টি যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে, প্রতিটি শ্বাসে এক অদৃশ্য যন্ত্রণার ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। মাহভিন গেট পেরিয়ে চলে যাচ্ছে। তবু আটকানোর সাহস পাচ্ছে না শান্ত। তায়ানও থামানোর সাহস করল না। অনুভার কোল থেকে আরাফ তাদের দেখছিল। মায়ের সঙ্গে পাপাকে আসতে না দেখে বোধহয় অবাকই হচ্ছিল। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারল না ছেলেটা। শান্ত তায়ানের হাত থেকে ডিভোর্স পেপারটা ছো মে'রে নিয়ে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়তে শুরু করল। কেন সেদিন সে এটা বানিয়েছিল? কেন!!! সে কেন বোঝেনি সত্য কখনও চাপা থাকে না!
তায়ান শুন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। আরাফকে যেদিন নিজের কাছে নিয়ে এসেছে সেদিন এই পেপারটাও এনেছিল। ওখানে করা তায়ানের সাইনটা পুরোটাই নকল। যদি তায়ানের হতো তাহলে ভেবে নিতো এটা এলেনার কাজ। আর অনুর খোঁজ এলেনা কেন, তায়ান নিজেই এতো খুজে বের করতে পারেনি। সেখানে এলেনা জানা দূরের কথা। আর যে খোঁজ জানত সে একমাত্র এই শান্ত। তাই তার বুঝতে সময় লাগেনি এটা যে এই ছেলের কাজ।
অনুভা নিজের বিশ্বাস ঘাতক স্বামী, নিজের সন্তানের বাবা আর এতদিন ভরসা করা মানুষটাকে পেছন ফেলে এগিয়ে যায়। অসহায় লাগে খুব নিজেকে। ছেলেটা বড় হলে বোধহয় জড়িয়ে ধরে কাঁদত খুব। এছাড়া তো আর কেউ নেই। সবাই কোনো না কোনো ভাবে তাকে ঠকালো।