রক্ত রেখার আড়ালে

পর্ব - ৩৬

🟢

দুই বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, আজ আবার সে বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখল, সেই চেনা অথচ অচেনা হয়ে যাওয়া ভূমিতে। এয়ারপোর্টের কোলাহল পেরিয়ে গাড়ি এখন ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে তার পুরোনো ঠিকানার দিকে। নিজের বাড়ি, তার নানার রেখে যাওয়া সেই স্মৃতিভারাক্রান্ত আশ্রয়। গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে অনুভার মনে হলো, যেন এই দেশ ছেড়ে সে গেছে মাত্র দু’দিন আগে। সবকিছুই একই রকম, চেনা রাস্তা, পরিচিত গাছপালা, বাতাসে মাটির সেই চিরচেনা গন্ধ। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন; এই দু’বছর তার জীবনের ভেতর কত কিছু বদলে দিয়েছে, যখন সে গিয়েছিলো তখন তার নিজের বলতে কিচ্ছু ছিলো না। না কোনো দায়িত্ব ছিলো। কিন্তু আজ সে একজন মা। একটা নিষ্পাপ শিশুর গোটা জীবনের দায়িত্ব স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা তার উপর দিয়েছেন। তখনও সবকিছু অগোছালো ছিলো। জীবন, অনুভূতি, সম্পর্ক সবই এলোমেলো এক জটিল জালে আটকে ছিল। আর আজ? আজও সেই অগোছালোত্বের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। বরং সময়ের সাথে তা যেন আরও ঘন, আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

তার জীবনটা এক বিশৃঙ্খল ক্যানভাস, যেখানে তার একটা পরিচিতি আছে, সুনাম আছে একজন বিখ্যাত বাইকার হিসেবে। কিন্তু কোনো সুশৃঙ্খল ছবি নেই। তবুও, এখন সে শুধু একজন নারী নয়, সে একজন মা। তার ছোট্ট ছেলের জন্য হলেও তাকে নিজেকে সামলে নিতে হবে, নিজের ভেতরের ঝড় থামিয়ে একটি স্থির আশ্রয় হয়ে উঠতে হবে।

শান্ত পাশে বসে আছে। নিরব, স্থির, যেন নামের মতোই শান্ত। কিন্তু অনুভা জানে, এই নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অস্থির আগ্নেয়গিরি। শান্তকে সঙ্গে নিয়ে আসার কোনো ইচ্ছাই ছিল না তার। সে চেয়েছিল এই ফেরা হোক একান্ত তার নিজের, নিজের অতীতের সঙ্গে একান্ত মুখোমুখি হওয়ার সময়। কিন্তু শান্তকে নিষেধ করার সাহস সে পায়নি। কারণ জানে, শান্ত যতটা শান্ত দেখায়, তার রাগ ততটাই হঠাৎ, ততটাই তীব্র, এক নিমেষেই সবকিছু উলটপালট করে দেওয়ার মতো। তাই সঙ্গে না আসার কথা কয়েকবার বলতে চেয়েও বলে উঠতে পারেনি। আর বলবেই বা কীভাবে? আরাফের জীবনটা তো অর্ধেকাংশ শান্তর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে। তার ছেলেটাও তো এই মানুষটাকে ছাড়া থাকতে পারে না।

নিজের কাছেই নিজের প্রতি এক গভীর অপরাধবোধ বয়ে বেড়ায় অনুভা। মনে হয়, তার কারণেই তো শান্ত আজ নিজের বাবা-মা থেকে বিচ্ছিন্ন, তার জন্যই সে সবকিছু ছেড়ে এসে অনুভার জীবনের পাশে দাঁড়িয়েছে, এক বিশাল বটগাছের মতো আশ্রয় হয়ে। এই ভাবনাটা কখনো কখনো তাকে ভীষণ কষ্ট দেয়, সঙ্গে অস্বস্তিও। মনে হয়, যেন সে শান্তকে তার নিজের পৃথিবী থেকে ছিনিয়ে এনেছে, তার প্রাপ্য জীবনটাকে কেড়ে নিয়েছে নিঃশব্দে।

কিন্তু সে তো কখনোই চায়নি শান্ত তার সঙ্গে থেকে এভাবে নিজের জীবনকে বেঁধে ফেলুক। সবসময় চেয়ে এসেছে, শান্ত নিজের মতো করে বাঁচুক, তার একটা সংসার হোক, যে শান্তকে শান্তর মতো করে ভালোবাসবে। অথচ নিয়তি এমনভাবে সবকিছু জড়িয়ে দিয়েছে, যেন তারা দু’জন একে অপরের অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠেছে। অনুভা এটাও অস্বীকার করতে পারবে না, শান্ত না থাকলে তার জীবনটা আরও কঠিন হতো, হয়তো অনেক কিছুই সে এভাবে পেত না, সামলাতে পারত না। ছেলেটা তার জীবনে এক নীরব শক্তি, এক অদৃশ্য ভরসা। তবুও, এই নির্ভরতার মধ্যেও অনুভার মনে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব কাজ করে। সে কারও ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে চায় না, নিজের ভাঙা-গড়া জীবনটা নিজের মতো করেই গুছিয়ে নিতে চায়। কখনো কখনো তার মনে হয়…যদি পারত, তবে সে শান্তর থেকেও দূরে সরে যেত, নিজেকে মুক্ত করত এই অদৃশ্য বন্ধন থেকে। শান্তকেও মুক্তি দিতো এই দায়িত্ববোধ থেকে। কিন্তু একই সঙ্গে, আরাফের প্রতি তার দায়বদ্ধতাও কম নয়। এই টানাপোড়া, এই দ্বিধা, অনুভার ভেতরটাকে প্রতিনিয়ত ছিন্নভিন্ন করে। সিদ্ধান্ত হীনতায় ভোগে খুব।

আর সেই দিনের কথা… মনে পড়তেই তার শরীর শিউরে ওঠে। যেদিন সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তার অনাগত সন্তানকে এই পৃথিবীর আলো দেখাবে না। সেই কঠিন মুহূর্তে শান্ত তার পাশে ছিল। অটল, অবিচল। সেই দিনটার কথা ভাবলেই অনুভার বুকটা ভারী হয়ে আসে। মনে হয়, সেই এক সিদ্ধান্তের ঋণ সে কোনোদিন শোধ করতে পারবে না। হয়তো এ কারণেই, জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাসে অনুভা নিঃশব্দে শান্তকে কৃতজ্ঞতা জানায়। এক এমন কৃতজ্ঞতা, যা কখনো উচ্চারণ করা হয় না, কিন্তু গভীরভাবে বয়ে চলে তার অন্তরের অতল গহীনে।

তবুও, এই কৃতজ্ঞতার মাঝেও এক অমোচনীয় দাগ রয়ে গেছে। অনুভা কখনো ভুলতে পারবে না, এতটা বিশ্বস্ত হয়েও শান্তও একদিন তাকে মিথ্যা বলেছিল। সেই একটুকরো মিথ্যা যেন বিশ্বাসের নির্মল আয়নায় চিরে যাওয়া এক সূক্ষ্ম ফাটল, যা বাইরে থেকে স্পষ্ট না হলেও, ভেতরটা নীরবে ভেঙে দেয়। হয়তো মানুষ মানেই, ভালোবাসা আর প্রতারণার এক অসমাপ্ত মিশ্রণ।

_“ নেমে আসো…এসে পড়েছি তো!”

শান্তর ডাকে ভ্রম কাটে অনুভার। তাকিয়ে দেখে দরজা মেলে দাঁড়িয়ে আছে সে। আরাফ ঘুমে লেপ্টে আছে অনুভার কোলে। এই ছেলে এত ঘুমাতে পারে! সুযোগ পেলেই ঘুম। অনুভা ডাকতে চাইলো, তার আগেই শান্ত বলল,

_“ ডেকো না। আমার কাছে দাও ওকে।”

অনুভা তাই করল। আরাফকে দিয়ে নিজে বের হলো। বের হতেই বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে অনুভার। কোনো ভাবেই যেতে ইচ্ছে করছে না এখানে তার। ছুটে চলে যেতে ইচ্ছে করছে যেখান থেকে এসেছিল সেখানে। দু'টো বছর কত সুন্দর ভাবে কেটেছে তার! কিন্তু সেটাও ওই লোকটার সহ্য হলো না। আবার এসেছে অনুভার জীবনটা ওলটপালট করে দিতে। সেখানে থাকলে কখনোই অনুভাকে সে ভালো থাকতে দেবে না। এখানেও যে আসবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবু এখানে আলাদা একটা ভরসা পাবে। এছাড়াও কেন যেন মনে হলো অনুভার এখানে আসা উচিত।

একটু এগিয়ে আসতেই অনুভার দৃষ্টি থমকে গেল। বাড়ির মেইন গেটটা খোলা। ভেতর থেকে একের পর এক মানুষ বেরিয়ে আসছে, আবার কেউ কেউ ভেতরে ঢুকছে। সবার মুখে এক অদ্ভুত বিষণ্নতা, যেন কোনো অঘটনের ভার তাদের চোখেমুখে জমাট বেঁধে আছে।

কয়েকজন লোক বাড়ির ভেরত ঢুকলো কাঁধে করে বাঁশের খণ্ড নিয়ে। অনুভার পা যেন মাটিতে গেঁথে গেল। বুকের ভেতর ধকধক শব্দটা হঠাৎই বেড়ে উঠল, শরীরটরা কাঁপুনি দিয়ে উঠলো অজানা আশঙ্কায় । সে শান্তর দিকে তাকাল। শান্তও তাকিয়ে আছে। নিজেকে আর থামাতে পারল না অনুভা। গভীর একটা শ্বাস নিয়ে দ্রুত পায়ে বাড়ির ভেতরের দিকে ছুটল সে। তার পেছনে শান্তও দ্রুত এগিয়ে এল। উঠোনে পা রাখতেই অনুভা যেন দ্বিতীয়বারের মতো ধা’ক্কা খেলো। চারপাশে মানুষে মানুষে ভরে গেছে। সবার চোখে সেই একই শোকের ছায়া। ভিড়ের ফাঁক দিয়ে কেবলমাত্র দেখা যাচ্ছে স্টিলের খাটের একটি পায়া… আর তার ওপর ঢাকা এক টুকরো সাদা কাপড়। দৃশ্যটা চোখে পড়তেই অনুভার শরীর থেকে যেন এক মুহূর্তে সব শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেল। বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে এল দু’হাতের তালু আর পা দুটো। শ্বাসটা কোথায় যেন আটকে গেল, বুকটা ভার হয়ে উঠল অসহ্যভাবে। এ বাড়ির তো তার সবাই আপন। সাদা কাপড়ে থাকা মানুষটা যেই হোক…নাহ এ বাড়ির কেউ না হোক। অনুভা তার নিস্তেজ, ভারি পা জোরা নিয়ে সামনে এগোচ্ছে। আরিজ, অনুভব, নীলা সবাই আছে এখানে। অনুভার বাবা আর অলির বাবা একসঙ্গেই। গম্ভীর মুখে মানুষদের সঙ্গে কথা বলছে। বড় আব্বু কোথায়? অনুভার ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। আরেকটু সামনে এগোতেই দেখে বিশাল বাড়িটার বারান্দায় আমিরা বেগম ফ্যাকাশে মুখে বসে আছে। তার এক পাশে অলি, এক পাশে উর্মিলা বেগম। কাঁদছে ওরা। অলির নানা বাড়ির ক'জন আছে এখানে। তার বড় আম্মু ফ্যাকাশে মুখটা দেখতেই দৌড়ে ভির ঠেলে সেই স্টিলের খাটটির পাশে গিয়ে দাঁড়াল। খাটটার পাশে এসে দাঁড়াতেই তার হাত কাঁপতে শুরু করল। শ্বাসটাও কাঁপছিল, বুকের ভেতরটা যেন ভেঙে যাচ্ছে প্রতিটি ধাপে। তবুও, এক অদ্ভুত শক্তিতে সে হাত বাড়াল। ধীরে, কাঁপা কাঁপা আঙুলে সরিয়ে দিল সেই সাদা কাপড়টা। একটা হৃদয়বিদারক চিৎকার ছিঁড়ে বেরিয়ে এলো অনুভার বুক থেকে।

আরিজ চোখ বন্ধ করে ফেলে। তার অনুভার সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও বাড়ির ব্যাপারে তেমন কিছু জানাত না। নিজের বাবার অসুস্থতার কথাও জানাত না। ক’দিন ধরেই আরমান সাহেবের শরীরটা খারাপ যাচ্ছিল। ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছিলেন তিনি, কিন্তু কারও সামনে তা স্পষ্ট হতে দেননি। আর এই ক’দিনে… কতবার যে তিনি অনুর নাম নিয়েছেন! কতবার যে তাকে দেখতে চেয়েছেন, তার হিসাব নেই। গত রাতেই, হঠাৎ… ঘুমের মধ্যেই তিনি স্ট্রোক করেন।

_“ বড় আব্বু! তাকান। দেখুন, আমি এসেছি। ফিরে এসেছি আমি…চোখটা খুলুন …!” অনুভা ধীরে ধীরে বসে পড়ল মাটিতে।

বুকের ভেতর জমে থাকা সব কথাগুলো হুড়মুড় করে বেরিয়ে আসতে চাইছে।

_“ আমি এত দেরি করলাম কেন ? কেন আগে আসলাম না? আপনি কি আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন, বড় আব্বু? আমার যে আপনার সঙ্গে অনেক কথা আছে। উঠুন না…আপনি না থাকলে আমি কার কাছে যাবো…? আমাকে একবার ক্ষমা করে দিন। আমি তো আপনাকে কিছুই বলতে পারলাম না… কিছুই না…” চোখের জলে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে তার। বড় আব্বুর মুখটা অস্পষ্ট হয়ে উঠেছে তার।

ঠিক তখনই আরিজ এসে নিঃশব্দে তার পাশে বসে পড়ে। ধীরে করে অনুভার কাঁপতে থাকা হাতটা নিজের হাতে তুলে নেয়। কণ্ঠে একরাশ ক্লান্তি, আর চাপা বেদনা।

_“ কাঁদিস না অনু। ম'রে গিয়ে বেঁচে গেছে সে।”

কথাটা যেন ছুরির মতো বিঁধল অনুভার বুকে। সে মাথা তুলে তাকাল আরিজের দিকে। চোখ দুটো লাল, ভেজা, ভাঙা অভিযোগে ভরা।

_“ আপনি আমাকে এতদিন মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে এসেছেন, ভাইয়া?

আমি কার ভরসায় এখানে এলাম…? কী ভেবে এলাম…? আর কী পেলাম…?”

আরিজ কোনো উত্তর দিলো না। অনুভা তার বড় আব্বুর দিকে আবারও তাকাল। চোখটা না চাইতেও ভিজে উঠছে বারবার। নিথর মুখটা শুকনো হয়ে আছে। যেন এই মুখের উজ্জ্বলতা কবেই ফুরিয়ে গেছে।

_“ বড় আব্বু ভালো ছিলো না। আর আপনি বলেছিলেন তারা সবাই খুব ভালো আছে। কেন এমন করলেন ভাইয়া? কেন শেষবার কথা বলার সুযোগ দিলেন না?”

বিজ্ঞাপন

আরিজ বোবার মতো বসে আছে। সে ইচ্ছে করেই কিছু বলেনি। সে চায়নি অনু কখনো এখানে আসুক। কেন আসবে? এখানের কেউ তাকে ভালো রাখতে পারেনি। অনুভার সঙ্গে যা হয়েছে তার জন্য তো তার ভাই আর বাবাই দায়ী। তার বাবা কী করেছে না করেছে সে-সব স্পষ্ট না। কিন্তু নির্দোষ সেটাও তো স্পষ্ট নয়। আর এই ক্ষোভে তো আরিজও তার সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলত না।

অনুভা খাটিয়ার মাঝে মাথা ঠেকাল।

_“ আমি তো ভেবেছিলাম… এসে আপনাকে জড়িয়ে ধরব… বলব, আমি ভালো আছি… যেমন ভালো আপনি দেখতে চেয়েছিলেন ঠিক তেমন ভালো আছি… আপনি কেন আমাকে সেই সুযোগটা দিলেন না…? আমার সঙ্গে এভাবে অভিমান করে থাকবেন না… উঠুন… আমার দিকে তাকান…”

অনুভা আরও অনেক কিছুই বলছিলো। তার কান্না দেখে আশেপাশের মানুষ গুলোও চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না। অলি আর উর্মিলা বেগম এগিয়ে আসল তার কান্নার শব্দে। দু'জনেই তাকে জড়িয়ে বুকভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়ল। কিছুক্ষণ পর, যেন নিজের ভেতরের সব শক্তিটুকু জড়ো করে, অনুভা ধীরে ধীরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল সে। এক অদৃশ্য টানে পা বাড়াল বারান্দার দিকে। আমিরা বেগমের কাছে। মানুষটা ঠিক আগের মতোই বসে আছেন। নিস্তব্ধ, নিস্পন্দ, যেন সব অনুভূতি কোথাও হারিয়ে ফেলেছেন। কোনো জল নেই চোখে, মুখে কোনো শব্দ নেই। শুধু এক শূন্য দৃষ্টি, যা সবকিছু পেরিয়ে কোথাও দূরে তাকিয়ে আছে। অনুভাকে এগিয়ে আসতে দেখে তিনি একবার তাকালেন। সেই দৃষ্টিতে কোনো প্রশ্ন নেই, অভিযোগ নেই, এমনকি স্পষ্ট কোনো আবেগও নেই। তারপর আবার দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন।

অনুভার বুকটা হঠাৎ করে মোচড় দিয়ে উঠল। ধীরে ধীরে গিয়ে তার সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল সে। কাঁপতে থাকা হাতদুটো বাড়িয়ে আমিরা বেগমের দু’হাত নিজের মুঠোয় নিল। ঠান্ডা, নিস্তেজ হাত তার। পরের মুহূর্তেই আবার ভেঙে পড়ল অনুভা।

_“বড় আম্মু…”

শব্দটা উচ্চারণ করতেই তার গলা বন্ধ হয়ে এলো। মাথাটা ঝুঁকে পড়ল আমিরা বেগমের কোলে, অঝোরে কান্নায় ভেঙে পড়ল আবারও।

_“ সে চলে গেছে আমার তাতে কোনো আফসোস নেই জানিস? একবার শুধু আসতি। দেখা দিতি। তোকে চোখের দেখাটা দেখত।”

আমিরা বেগম সেই দূরে থাকা খাটিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল।

শান্ত এসব দেখে বাকরূদ্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। এই মুহুর্তে তার মাহভিনকে সান্ত্বনা দেবার মতো কোনো ভাষা বা পরিস্থিতি কিছুই নেই। মানুষের কোলাহলে আরাফ ঘুম থেকে উঠে গেছে। আশেপাশে এত মানুষের আনাগোনা দেখে ঘাবড়ে গেছে বাচ্চাটা। চোখ দু'টো নিজের মা'কে খুঁজছে। শান্তর মুখের দিকে তাকিয়ে পরিচিত মুখ দেখে কিছুটা স্বস্তি পায় অবুঝ ছেলে। গলা জড়িয়ে আবারও শুয়ে পড়ে তার পাপার কাঁধে।

——

যোহরের নামাজ শেষে ধীরে, ভারী পদক্ষেপে আরমান সাহেবের মরদেহ উঠোন থেকে বের করে আনা হলো। চারপাশে নিস্তব্ধতা। খাটিয়ার চার কোণ শক্ত করে ধরে আছে চারজন। সামনের দু’পাশে আরিজ আর আরশাদ সাহেব, পেছনের দু’পাশে অলির বাবা ও অনুভব। তাদের চোখে-মুখে চাপা বেদনা, তবুও দায়িত্বের দৃঢ়তা। পেছনে সারি বেঁধে এগিয়ে চলেছে আরও অনেক চেনা-অচেনা মুখ

সবার উদ্দেশ্য একটাই শেষবারের মতো তাকে তার চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া। ধীরে ধীরে মিছিলটা বাড়ির সীমানা পেরিয়ে রাস্তায় নেমে এলো। বাড়ির সামনের রাস্তায়, একটু দূরে, একটি গাড়ির ভেতরে বসে আছে তায়ান। ড্রাইভারের সিটে স্থির হয়ে বসে, নিঃশব্দে সবকিছু দেখছে সে। চোখের সামনে দিয়ে যখন খাটিয়াটা এগিয়ে গেল, তখন আর বুঝতে বাকি রইল না, কি ঘটে গেছে। তার বুক চিরে বেরিয়ে এলো এক দীর্ঘ, ভারী শ্বাস। কষ্ট হচ্ছে না তার একদমই। মা’রা না গেলেও হয়তো তায়ান নিজেই একদিন মা’রত তাকে। কিন্তু এই দুটো বছর তো অনুকে খুঁজতেই পেরিয়ে গেল তার। কিন্তু তবু…কিছু দৃশ্য, কিছু স্মৃতি অবাঞ্ছিতভাবে চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল। ছোটবেলার সেই দিনগুলো…নিজ হাতে খাইয়ে দেওয়া, স্কুলে পৌঁছে দেওয়া, তায়ানকে জোর করে হাত ধরে মসজিদে নিয়ে যাওয়া…তাকে কেউ কিছু বললে আগুনের মতো জ্বলে উঠে তার হয়ে প্রতিবাদ করা…সবকিছু যেন একের পর এক ছবির মতো ফুটে উঠছে তার সামনে। তায়ান হঠাৎই ভ্রু কুঁচকে ফেলল। তার ভেতরে অদ্ভুত এক শূন্যতা জন্ম নিচ্ছে, যার নাম সে জানে না, মানতেও চায় না। সে নিজের হাত শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করল। ফুলে উঠল শিরাগুলো, চোয়াল শক্ত হলো। কেন সে এসব ভাবছে? কেন এই স্মৃতিগুলো ফিরে আসছে? না, না, সে ভুলে যেতে চায়। এই মানুষটা কে?

তার বাবার খু’নি।

তার চাচার খু’নি।

তার দাদার খু’নি।

তার পুরো পরিবারের সর্বনাশের কারণ! তাহলে কেন…কেন সেই খু’নির মুখটা তার চোখের সামনে এভাবে ভেসে উঠছে? কেন সেই মুখের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে এতগুলো স্নেহের, এতগুলো অদ্ভুত কোমল স্মৃতি? তায়ানের বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই ভার হয়ে উঠল এক অচেনা, অস্বীকার করা অনুভূতিতে। তার ভাবনার মাঝেই খাটিয়া নিয়ে লোকজন বেশ দূরে চলে গেছে। তায়ান চোখ সরিয়ে নেয়। তার বাবার খু’নির জন্য মনটা অজান্তেই পুড়ছে তার। এই অনুভূতি হওয়াও অন্যায়। চাইলেও সেই অনুভূতি থেকে নিজেকে বের করতে পারছে না।

তায়ান আর নিজের ভেতরের সেই অস্থিরতাকে ধরে রাখতে পারল না। ঝাঁপিয়ে পড়ে দু’হাতে শক্ত করে স্টিয়ারিংটা চেপে ধরল, আর পরের মুহূর্তেই প্রচণ্ড জোরে এক ঘুষি বসাল তাতে। শব্দটা গাড়ির ভেতরে প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল। কিন্তু তাতেও থামল না সে। বারবার আঘাত করতে লাগল, যেন নিজের ভেতরের সব দ্বন্দ্ব, সব অস্বীকার, সব যন্ত্রণা ওই স্টিয়ারিংয়ের ওপর ঝেড়ে ফেলতে চাইছে। তার শ্বাস দ্রুত হয়ে উঠেছে, অস্বাভাবিক ছন্দে বুক উঠানামা করছে

চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে, রাগে, না কি অজানা কষ্টে, তা বোঝা দায়।

_“ওহ গড…!” দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে উঠল সে।

_“তুমি কেন এমন করছো! কেন এমন অনুভূতি দিচ্ছো!”

সে মাথা চেপে নিজের ভেতরের সেই ছবিগুলো সরাতে চাইলো।

_ “ সে আমার সব কেড়ে নিয়েছে… আমার পরিবার… আমার জীবন… সব!”

তায়ান স্টিয়ারিংয়ে কপাল ঠেকিয়ে আরও নিচু গলায় বলল,

_“কোথাও একটা ভুল হচ্ছে…এটা কী হচ্ছে আমার সাথে… কেন আমি থামাতে পারছি না এই অনুভূতিগুলো, কেন মনে হচ্ছে কোথাও কিছু মিসিং…? আমাকে সত্যিটা জানাও আল্লাহ…আমি আর সহ্য করতে পারছি নাহ! আমি সত্যিটা জানতে চাই… পুরো সত্যটা… না হলে আমি পাগল হয়ে যাব…”

বিজ্ঞাপন
রক্ত রেখার আড়ালে গল্পটি আয়েশা শেখ রিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে মোড়ানো থ্রিলার উপন্যাস