রক্ত রেখার আড়ালে

পর্ব - ৩৮

🟢

তায়ানের পেছন পেছন শান্ত আর আরিজও আসে। কারণ অনুভা সন্ধা থেকেই বাড়িতে ছিল না। আর রাত গভীর হওয়ার পরও যখন অনুভা ফিরছিল না, তখন বাসার সবাই অনুভাকে নিয়ে চিন্তায় পড়ে যায়। সাথে মায়ের জন্য আরাফের কান্নাকাটি তো আছেই। অনুভাকে না পেয়ে শান্তর প্রথম সন্দেহটা যাকে হলো সেটা তায়ান। শান্তর ধারণা ছিল তায়ানই অনুভাকে কোথাও নিয়ে গেছে। তাই আরিজ আর শান্ত দুজনে মিলে আগে তায়ানের খোঁজ করে। রিকোর নাম্বার আরিজের ছিল তাই কল করে তায়ান কোথায় জানতে চায়। রিকো তখন জানায় তায়ান হোটেলে নিজের রুমে ঘুমাচ্ছিল।

আরিজ প্রথমে বিশ্বাস না করলে রিকো ভিডিও কলে দেখায়। তায়ান আসলেই নিজের বেডে উপর হয়ে ঘুমাচ্ছিল। তারপর রিকো তায়ানের খোঁজ করার কারণ আরিজকে জিজ্ঞেস করলে, যখন বলে অনুভা নিখোঁজ, রিকো কল কেটে সঙ্গে সঙ্গে তায়ানকে ডেকে তোলে। তায়ান আজ সারাদিন কোথাও একটা ছিল। তাই ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমিয়েছিল। কিন্ত রিকোর কথা কানে পৌঁছাতেই বুঝে ফেলে এটা কার কাজ হতে পারে। আর সে জানতও এমন কিছু ঘটবে।

ডন রিকার্ডোর অনুভাকে মা’রার কোনো ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু সেদিন তার মেয়ে এলেনাকে অপমান করায়, সেটা মেনে নিতে পারেনি। এলেনাই তার বাবার কাছে অনুভাকে ও তার ছেলেকে মেরে ফেলার কথা বলে। এছাড়াও এই একটা মেয়ের জন্য তার এতদিনের গড়ে তোলা তায়ান পুরোটাই তার নাগালের বাহিরে চলে গেছে। তাই ডন রিকার্ডো প্যারিসে পৌঁছানোর আগে রিকোকে জানিয়ে রাখে সব। এদিকে রিকো যে তায়ানকে সব বলে দিতে পারে, সেটা তার ভাবনার বাহিরে ছিল। রিকো বলার পর তায়ান অনুভা আর শান্তর অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে জানতে পারে ওরা আজকেই প্যারিস থেকে চলে গেছে। তায়ান সেখানে এক মুহূর্ত দেরি না করে তৎক্ষনাত এয়ারপোর্টে যায়। কিন্তু তাতেও লাভ হয় না। সে পৌঁছাতে পৌঁছাতে

বোর্ডিং গেট বন্ধ হয়ে যায়। তায়ান তার গার্ডদের বলে সেই মুহূর্তেই ইমার্জেন্সি জেট ভারা করায়। অনুভাদের ফ্লাইট বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স হওয়ায় সহজেই বুঝতে পারে ওরা বাংলাদেশে যাচ্ছে।

একই ভাবে ডন রিকার্ডোও অনুভাকে সেখানে না পেয়ে বাংলাদেশে চলে আসে।

এজন্যই তায়ান বারবার চেয়েছে অনুভা আর তার ছেলে যেন তার সঙ্গে যায়। বাংলাদেশে আসার পর থেকেই সব সময় তায়ান অনুভার নানা বাড়ি আর ডন রিকার্ডোর উপর নজর রাখত। কিন্তু আজ কীভাবে যেন কী হলো। কিন্তু খুৃজে পেতে তায়ানের খুব বেশি সময়ও লাগেনি। কারণ রিকার্ডোর সঙ্গে তায়ান আরও অনেকবার এখানে এসেছে।

-

তায়ান মাঙ্কি ক্যাপ খুলে অনুভার বাবাকে দেখতেই বিদ্রুপ করে বলে ওঠে,

_“ আই নিউ ইট! আই নিউ দ্যাট, এর পেছনে তুইও আছিস।”

আরশাদ সাহেব চমকে ওঠে। তাকে আর ডন রিকার্ডোকে ইতমধ্যে গার্ডেরা চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে। তায়ানের পেছনে আরিজ, শান্তকে দেখে ঘাব্রে যায় আরও আরশাদ। অনুভা নিজের বাবাকে দেখে যেন সে পৃথিবীতেই নেই। তার বাবা সম্পত্তির লোভে এমন জঘন্য কাজ করতে পারল? কিন্তু সেটা নিয়ে ভাবার আগেই আরাফের কান্না কানে এলো। তায়ান, অনুভা দুজনেই সেদিকে তাকায়। শান্তর কোল থেকে অনুভার দিকে হাত বাড়িয়ে কাঁদছে শিশুটা। তায়ান গিয়ে শান্তর কাছ থেকে নিজের ছেলেকে নিতে চায়। কিন্ত তার আগেই অনুভা উঠে এসে আরাফকে নিজের কাছে নিয়ে নেয়। শান্তর উদ্দেশ্যে বলে,

_“ ওকে কেন এনেছেন?”

শান্ত কিছু বলার আগেই আরিজ বলল,

_“ আমিই আনতে বলেছি। তোর জন্য বাড়ি ঘর মাথায় তুলে কাঁদছিল। তারপর শান্তকে কাছে না পেলে আরও কাঁদবে। এছাড়াও একা রেখে আসার সাহস পাচ্ছিলাম না।” আরিজ শেষ কথা বলার সময় তায়ানের দিকে তাকায়। কারণ তখন আরিজ আর শান্তর ধারণা ছিল তায়ান অনুভাকে নিয়ে গেছে। আরাফকে বাসায় রেখে গেলে যদি তাকেও নিয়ে যায়? বাসায় তো তেমন কেউ নেই যে আরাফকে রক্ষা করবে।

তায়ান নিজের ভাইয়ের দিকে একবার গম্ভীর দৃষ্টি ফেলে আরশাদ

সাহেবকে এক ঝটকায় গোডাউনের ধুলো ময়লার মেঝেতে ফেলে শক্ত হাতে ঘু’ষাতে শুরু করে। আরশাদ সাহেব প্রতিরোধ করার আগেই একের পর এক আঘাতে দিশেহারা হয়ে পড়লেন।

অনুভা চমকে উঠে ছুটে এল।

_“থামুন! মারবেন না! ওনার সম্পত্তি দরকার, আমি দিয়ে দেব… সব দিয়ে দেব!”

তায়ান তো সে-সব শুনলই না, সাথে শান্তও গিয়ে তায়ানকে সরিয়ে দিয়ে অনুভার বাবাকে মা’র শুরু করে।

_“ নিজের মেয়েকে এভাবে অপহরন করতে লজ্জা করল না? জা*নোয়ার কথাকার!”

তায়ানও একই ভাবে শান্তকে সরিয়ে দেয়।

_“ তুই ওকে কখনোই ভালো রাখিসনি! অথচ আমাকে এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাড়ি থেকে বের হতে বাধ্য করেছিলি!”

এখানে থাকা কেউ-ই তায়ানের কথার মানে বুঝতে পারে না। তায়ান এমন আরও নানা রকমের কথা গর্জন করে করে বলতে থাকে। আরশাদ সাহেবের মুখ রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে। ডন রিকার্ডো সেসব ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে। এমন তায়ানকে সে গড়েই তোলেনি। শুধু মাত্র এই মেয়ের জন্য তার সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। ডন রিকার্ডো অনুভার দিকে তাকায়। তার দৃষ্টিতে কী আছে সেটা বোঝার উপায় নেই।

তায়ান আঘাত করতে করতে হঠাৎ থেমে গেল। তার চোখ গিয়ে আটকাল পাশে পড়ে থাকা কুড়ালটার দিকে। এক সেকেন্ডও দেরি করল না। দ্রুত পা বাড়িয়ে সেটা তুলে নিল হাতে। লোহার ধারালো অংশটা হালকা আলোয় চকচক করে উঠল। অনুভা কেঁপে ওঠে। রিকো এসে তায়ানকে বাঁধা দিতে চাইলে ধা’ক্কা মে’রে সরিয়ে দেয়। আরিজের এত সাহস নেই। শান্ত ইচ্ছে করেই বাঁধা দিবে না। সেও চায়না লোকটা বেঁচে থাকুক। অনুভা আরাফ সমেত ই দৌড়ে এগিয়ে গেল। তায়ান কুড়াল তুলতেই অনুভা হাত বাড়িয়ে সেটা শক্ত করে চেপে ধরে শক্ত গলায় বলল,

_“ আমার বাবা আমার সঙ্গে কী করেছে না করেছে সেসব নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। এটা আমাদের দু’জনের ব্যাপার, আমাদেরই বুঝতে দিন।”

তায়ানের চোখ জ্বলন্ত আগুনের মতো টগবগ করছে। কিন্তু অনুভার কোলে থাকা তার ছোট্ট অংশটার দিকে তাকাতেই দৃষ্টি কিছুটা নরম হলো। ছেলেটা তার ভয়ে কুঁকড়ে গেছে।

_“ ওকে নিয়ে চলে যা এখান থেকে।”

_“ তার আগে আপনি চলে যান এখান থেকে।”

_“ ওকে আজ শেষ না করে যাবো না।” তায়ান বলল।

অনুভা গর্জে উঠলো।

_“ আপনি শেষ করার কে? আপনার কী?”

_“ আমার কী? এই কু’ত্তারবাচ্চা আমার সব নষ্ট করে দিয়েছে!” তায়ান এতটুকু বলে আবারও ধেঁয়ে গেল কুড়াল নিয়ে। কিন্তু আরাফের কান্না কানে আসতেই থেমে যায়। বাচ্চাটার কান্না কানে এলেই তায়ানের বুকটা কেমন যেন পুড়ে যায়। মনে পড়ে যায় সে কীভাবে নিজের ছেলেকে আটকে রেখে না খাইয়ে রেখেছিল। তখনও তো এভাবেই কেঁদেছিল। তায়ান কুড়াল ফেলে দিয়ে,অনুভার কাছ থেকে থাবা মে’রে নিয়ে, বুকে জড়িয়ে নেয় আরাফকে। শরীরটা ঘেমে গেছে তায়ানের। শ্বাসপ্রশ্বাস অস্থির। সে আরাফের গালে একটা চুমু খেয়ে আরিজের কাছে দিয়ে বলল,

_“ ওদের নিয়ে চলে যা। এক্ষুনি যা।”

অনুভা বলল,

_“ আমরা কোত্থাও যাবো না। আপনি আগে চলে যান।”

শান্ত অনুভার হাত ধরে বলল,

_“ চলো এখান থেকে। এমন বাবার জন্য আবার দরদ দেখাচ্ছো কী মনে করে?”

তায়ান একবার অনুভার হাতের দিকে তাকায়। যেটা শান্ত ধরে আছে। চোখ সরিয়ে নেয় সঙ্গে সঙ্গে। অন্যদিকে তাকিয়ে বলে,

_“ চলে যা এখান থেকে নাহলে সব ক’টাকে মে’রে ফেলব আমি।”

অনুভা তায়ানের অস্থিরতা দেখছে। তার বাবা শুধু তাকে এখানে অপহরণই করে এনেছে। কোনো ক্ষতি করারও সুযোগ পায়নি, এতেই এত রেগে গেল কেন মানুষটা?

আরশাদ সাহেব ধীরে ধীরে একটু একটু করে উঠে বসে। মুখে ভেসে ওঠা রক্ত শার্ট দিয়ে মোছার চেষ্টা করে। তায়ান সামনে এগিয়ে এসে প্রচণ্ড জোরে একটা লাথি মারল তার মুখের দিকে। আঘাতে আরশাদ সাহেব আবারও ছিটকে পড়ে গেলেন মেঝেতে। মাথা ঝাঁকিয়ে উঠল, শরীরটা কুঁকড়ে গেল ব্যথায়।

মেয়ে হয়ে নিজের বাবাকে এভাবে মা’র খেতে দেখতে পারে না অনুভা। হোক সে হাজার খারাপ। সে নিজের বাবার কাছে বসে তাকে ঝাপটে ধরে তায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,

_“ আর একটা আঘাতও তাকে করবেন না। সে আমার বাবা… তার বিচার আমি করব। আপনি যদি আর একবার হাত তোলেন, তাহলে আগে আমাকে সরাতে হবে।”

আরাফকে আরিজের কাছে দিলেও সে ঘুরেফিরে শান্তর কাছেই চলে গেছে। শান্ত তাকে নিজের কাঁধে চেপে ধরে রেখেছে। অনুভার কথায় বিরক্ত হলো তায়ান।

তায়ান ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে অনুভার সামনে বসে পড়ল। মুখটা কাছে এনে দাঁতে দাঁত চেপে, বিষাক্ত স্বরে বলল,

_“ মায়ের খু’নিকে বাঁচাতে এত তাড়া?”

অনুভা ভ্রু কুঁচকে তাকাল। চোখের পাপড়ি কেঁপে ওঠে। সেই কাঁপা দৃষ্টিতে বিভ্রান্তি নিয়ে বলল,

_“ ক-কার মা?”

তায়ান নিজের কপালের এক পাশের ঘাম মুছলো। চোখ সরাসরি অনুভার চোখে গেঁথে দিয়ে বলতে নিতেই আরশাদ সাহেব হাত এগিয়ে দিয়ে তায়ানকে ধা*ক্কা মারার চেষ্টা করে। তায়ান সেদিকে না তাকিয়েই আরশাদের হাত ডান হাতে চে’পে ধরে। দৃষ্টি এখনও অনুভার দিকে।

_“ তোর মা। জেসমিন মামুনি!”

অনুভার মাথায় যেন বাজ পড়লো এসে। জেসমিন তার মায়ের নাম৷ অনুভার মা। যে অনুভার হওয়ার এক ঘন্টা পরই মা’রা যায়। কিন্তু সে কী বলল মাত্র? কয়েক মুহূর্ত থমকে থেকে অনুভা বলল,

_“কী বলছেন আপনি?” বলার সময় অনুভার ঠোঁট কাঁপছিল।

তায়ান আরশাদের দিকে তাকিয়ে চোয়াল শক্ত করে বলল,

_“ তোর মা’য়ের খু’নি তোর নিজেরই বাবা।”

এখানে থাকা সবাই এটা শুনলেও অনুভা শুনল,

‘তোকে এতিম করেছে তোর নিজেরই বাবা।’ বারবার কানে এসে বাজতে লাগল একই বাক্য। মুখটা রক্তশূন্য হয়ে গেছে অনুভার। অজান্তেই তার হাত ঢিলে হয়ে এল। যে হাত দিয়ে এতক্ষণ নিজের বাবাকে আঁকড়ে ধরে ছিল, সেই হাতটাই ধীরে ধীরে সরে গেল। শান্ত, আরিজ, রিকো তিনজনই স্তব্ধ। চোখ বিস্ফারিত। রিকোর চোখে বিস্ময় থাকলেও বিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু আরিজের বিশ্বাস হলো না একটুও। সে এগিয়ে গিয়ে বলল,

_“ কী যা-তা বলছো এসব? মেজো চাচিকে চাচ্চু খু’ন করেছে মানে?”

_“ কী প্রমান আছে আপনার কাছে?” তার চোখ ফাঁকা। কোনো অনুভূতি নেই।

_“প্রমান তোর বাবাই।” তায়ান বলল।

তায়ান নিজে কিছু বলবে না আজ। ও বললেও ওর কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। আরশাদ সাহেবের কলার টেনে তুলল।

_“ আজ নিজে সব বলবি। প্রথম থেকে। শুধু মাত্র সম্পত্তির লোভে নিজেকে কত বড় পশু বানিয়েছিস, সব বল।”

রিকার্ডোর মুখে কোনো বিস্ময় ফুটে না উঠলেও সে ভেতরে ভেতরে আজ ভীষন অবাক। আরশাদ সাহেব যতক্ষন না মুখ খুলল ততক্ষন তায়ান আঘাত করতেই থাকল। শেষ মেস ক্লান্ত হয়ে বলল,

_“ বলছি…আমাকে মারিস না আর।” বলে অনুভা দিকে তাকিয়ে বলল,

_“ বিশ্বাস কর অনুভা মা আমার। আমি তোর মাকে মারিনি।”

বলতে না বলতেই তায়ান একটা শিকল নিয়ে আরশাদের গলায় চে’পে ধরল।

_“ সত্য বলতে বলেছি আমি!”

আরশাদ সাহেবের দম আটকে আসার উপক্রম। সে ফ্যাসফ্যাসে আওয়াজে বলল,

_“বলছি… বলছি ছাড় আমাকে!”

শিথিল করল শিকলের বাধন। কিন্তু পুরোপুরি সরিয়ে আনল না। আরশাদ সাহেব হাঁপাতে হাঁপাতে সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। বহুক্ষণ ধরে মারধরের চোটে তার শরীর ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা। ধীরে ধীরে, কষ্টে কষ্টে দেয়ালের পাশে গিয়ে বসল সে। পিঠটা দেয়ালে ঠেকাতেই চোখ বন্ধ হয়ে এলো। মুখে রক্ত, শরীরে ব্যথার অসহ্য যন্ত্রণা, তবুও বেঁচে থাকার মতো নিঃশ্বাস টেনে নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে সে চলে গেল চব্বিশ বছর পুরোনো স্মৃতিতে।

——————————————

ইশতিয়াক আহমেদের একমাত্র মেয়ে হলো জেসমিন আহমেদ। ইশতিয়াক আহমেদ ও নাজিয়া আহমেদের একমাত্র সন্তান। প্রথম সন্তান হারানোর পর এই মেয়েটিই হয়ে উঠেছিল তাদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। জন্মের পর থেকেই তাকে ঘিরে ছিল অতিরিক্ত যত্ন, অতিরিক্ত ভালোবাসা, আর এক অদ্ভুত স্নেহের আবরণ। প্রথম সন্তান হারিয়ে জেসমিনকে পেয়ে ইশতিয়াক যেন চাঁদের টুকরো পেয়েছিল।

জেসমিন ছিল অপূর্ব সুন্দর। তার মুখে এক ধরনের নরম কোমলতা ছিল, বড় বড় চোখে ছিল এক অদ্ভুত শান্ত আলো, আর তার উপস্থিতি সহজেই কারও দৃষ্টি থামিয়ে দিত। তাকে দেখলে মনে হতো সে নিখুঁত এক রাজকন্যা। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক ভিন্ন বাস্তবতা। জেসমিন মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী ছিল। বিষয়টা বাইরে সেটা সহজেই কেউ বুঝত না। তবে আচরণে অনেক সময় প্রকাশ পেত। এজন্য জেসমিন সুন্দরি হয়েও, বড়লোক বাপের একমাত্র মেয়ে হয়েও মানুষের ভিরে নিজেকে তুচ্ছ মনে হতো তার। ইশতিয়াক আহমেদের টাকা পয়সা চোখে পড়ার মতোই ছিল। তখনকার সময়ের সেই এলাকার সবচেয়ে প্রভাবশালী, সবচেয়ে ধনী মানুষগুলোর একজন ছিলেন তিনি। সে নিজেও তার বাবার এক মাত্র ছেলে থাকায় কোনো ভাগীদার ছিল না। তার জীবনে কোনো কিছুর অভাব ছিল না, না ক্ষমতার, না প্রাচুর্যের। কোনো কিছুর কমতি না থাকলেও নিজের মেয়ের এই অবস্থা তাকে অসহায় করে রাখত।

তার মত নামিদামি পরিবার থেকে জেসমিনের বিয়ের প্রস্তাব আসলেও, জেসমিনের আচরণের কারণে তা ভেঙে যেত। তার রূপ সাধারণ সৌন্দর্যের সীমা ছাড়িয়ে গেলেও জেসমিনের অস্বাভাবিক

আচরণের জন্য অনেক সম্পর্ক নষ্ট হতো। এ নিয়ে অবশ্য ইশতিয়াক আহমেদের কোনো সমস্যা ছিল না। কারণ তার যা ছিল তার মেয়েসহ পরবর্তী প্রজন্ম বসে খেতে পারত। কিন্তু তার আর তার স্ত্রীর অনুউপস্থিতিতে যেন মেয়েটা কেউ আগলে রাখে সেই মানুষটাই সব সময় খুঁজত।

বিজ্ঞাপন

তেমন সময়ই সে পেয়ে যায় আরশাদকে। আহসানি বাড়ি আর আহমেদ বাড়ির দুরত্ব তেমন বেশি ছিল না। ব্যবসায়িক কাজে প্রায়ই একে অপরের বাড়িতে যাওয়া আসা হতো তাদের। আরশাদের বড় ভাই আরমান সাহেবের সঙ্গে ইশতিয়াক আহমেদের সম্পর্ক অনেকটা ভালো ছিল। আরমান সাহেব তখন নতুনে ব্যবসায় পা দিয়েছিল তাই ইশতিয়াক আহমেদ তাকে এসবে অনেক সাহায্য করত। কিন্তু তাদের তুলনায় আহসানি পরিবার তেমন একটা প্রভাবশালী ছিল না তখন।

ঠিক এমনই এক ব্যবসায়িক কথাবার্তার মধ্যে আরশাদের বড় ভাই আরমান সাহেব জানায় তার ছোট ভাই তার মেয়ে জেসমিনকে পছন্দ করে। তাকে বিয়ে করতে চায়। ইশতিয়াক আহমেদ কিছুক্ষন চুপ থেকে মুচকি হেসে বলে,

_“ আমার মেয়ে সুন্দরী হলেও মানসিক ভাবে সুস্থ নয়।”

আরমান সাহেব জানায়,

_“ আরশাদ এবং আমরা সবাই সেটা জানি। এমনকি সব জেনেই আমরা আপনাকে প্রস্তাব দিয়েছি।”

_“ দেখ, আমি আমার মেয়েকে নিয়ে অনেক জায়গায় অপমানিত হয়েছি। তাই আর এখন এসব বিষয় নিয়ে এগোই না”

ইশতিয়াক আহমেদের কথায় আরমান সাহেব হেঁসে উত্তর দেয়,

_“আমি আপনার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট। কিন্তু আমার পরিবারে আমিই একমাত্র অভিবাবক। যেখানে আমি আছি সেখানে আপনারা অপমানিত হওয়া অসম্ভব।”

ইশতিয়াক আহমেদ একটু সংকোচবোধ করে বললেন,

_“ কিন্তু তোমার ভাইকে আমার খুব একটা ভালোলাগে না। মানে, ও তোমার মত নয়।”

_“ আশা করি ও বিয়ের পর নিজেকে পরিবর্তন করবে।”

সেদিনের সেই কথোপকথনের পরই তাদের বিয়ের আয়োজন শুরু হয়। কিন্তু এ কথা আহমেদ বাড়ির কাজের বুয়ার ছেলে রামিন জানতে পারলে সেদিনই সাহস সঞ্চয় করে ইশতিয়াক আহমেদের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে। কণ্ঠটা কাঁপছিল, তবুও চোখে ছিল এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।

_“আপনি ওকে কোথাও বিয়ে দেবেন না, প্লিজ।”

ইশতিয়াক আহমেদ ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করলেন,

_“কেন? তুমি হঠাৎ এমন কথা বলছ কেন?”

_“কারণ… কারণ আমি ওকে ভালোবাসি।”

ইশতিয়াক আহমেদের মুখ শক্ত হয়ে উঠল।

_“তুমি কি নিজের জায়গা ভুলে গেছ?”

_“আমি আমার জায়গা জানি। কিন্তু আমি আমার পরিচয় বদলাব। খুব শীঘ্রই আমি একজন ডক্টর হয়ে বের হবো।”

ইশতিয়াক আহমেদ ঠোঁট বাঁকিয়ে কটাক্ষ করলেন,

_“বললেই হলো? সম্পত্তি দেখে লোভ সামলাতে পারছ না? এসব তোমার মায়ের পরিকল্পনা, তাই না?”

_“আমার মা কিছুই জানে না আমি এখানে কী বলতে এসেছি।”

ইশতিয়াক আহমেদ তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললেন,

_“তুমি ভাবলে তোমার মতো এক ভিকারির কাছে আমি আমার মেয়েকে বিয়ে দেব?”

রামিনের শ্বাস ভারী হয়ে গেল। তবুও সে থামল না।

_“আমার মা ভিকারি না। হ্যাঁ, আমরা গরীব… টাকার অভাবে তিনি এখানে কাজ করেন। কিন্তু তাই বলে তাকে ভিকারি বলতে পারেন না। আর সম্পত্তির কথা বলছেন…আমার কাছে জেসমিনই সবচেয়ে বড় সম্পদ। ও ছাড়া আমার আর কিছু চাই না। কখনো চাইবোও না।”

এসব শুনে জেসমিনের বাবা হাসবে নাকি রাগ করবে বুঝতে পারে না।

_“ তোমার ভয় হচ্ছে না, আমার সামনে দাড়িয়ে এসব বলছো?”

_“ আমি সব শোনার প্রস্ততি নিয়েই এসেছি। আপনি আমাকে অপমান করার করুন। কিন্তু ওর বিয়েটা অন্য কোথাও দেবেন না। আমাকে একটু সময় দিন।”

রামিনের মা এ বাড়িতে কাজ করলেও, রামিন এখানে থাকে না। সে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করা অবস্থায় মাকে এসে মাঝেমধ্যে দেখে যেত। এর মাঝেই জেসমিনকে কখন ভালোবেসে ফেলে বুঝতেও পারেনি। সে জানত এটা অসম্ভব৷ দুজন দু মেরুর তারা। এটা হওয়ার নয়। এজন্য নিজের অনুভূতিকে সবসময় চাপা দিয়েই রাখত। কিন্তু যখন দেখল জেসমিন বারবার পাত্রপক্ষের সামনে অপমানিত হচ্ছে তখন থেকেই নিজেকে ইশতিয়াক আহমেদের সামনে দাড় করানোর প্রস্ততি নেয়।

কিন্তু এতে কোনো লাভ হয় না। ইশতিয়াক আহমেদ রাজি তো হয়-ই না, উল্টো রামিনের মাকে সে বাড়ির কাজ থেকে বের করে দেয়। জেসমিনের বিয়ে হয়ে যায় আরশাদের সঙ্গে। বিয়ের আগের দিন রাতেও রামিন এসে ইশতিয়াক আহমেদের সামনে এসে দাড়ায়। পায়েও পড়ে তার। কিন্তু জেসমিনের বাবার কাছে এটা অসম্ভব ছিল। সে আর যাইহোক নিজের বাড়ির কাজের লোকের ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে পারে না। রামিনের এত কান্না, আহাজারি কোনো কিছুতেই লাভ হয় না।

সেই তাকে আহমেদ বাড়ির সামনের এক কোণায় দাড়িয়ে দেখতে হয় জেসমিন বিয়ে করে অন্যের বাড়ি চলে যাচ্ছে। বুকটা জ্বলে পুড়ে ওঠে তার। মাটি খাবলে ধরে অঝোরে কাঁদে সেদিন সে। ফর্সা না হলেও শ্যামলা রঙের লম্বা শুকনা গড়নের ছেলে ছিল। ফেসকাট দেখে যে কারোর কাছেই ভদ্র ছেলে মনে হতো। জেসমিন কী কখনও জানবে এসব? সে তো প্রেমের মর্মই বোঝেনা।

জেসমিন আরশাদ সাহেবের রুমে বসে আছে। রুমে সে ছাড়া কেউ নেই। নিজের বাবা-মাকে ছেড়ে এসে এখনও বসে বসে কাঁদছে। একটু পর খেয়াল একটা ছোট্ট ছেলে বারবার দরজার পাশ থেকে উঁকি দিচ্ছে। জেসমিন চোখের জল মুছে বলল,

_“ আমি তোমাকে দেখে ফেলেছি।”

ছেলেটা এগিয়ে আসল। খুব গম্ভীর হয়ে বলল,

_“ তুমি কে? এভাবে কাঁদছো কেন?”

_“ আমি জেসমিন। তুমি কে?” জেসমিন ছেলেটাকে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখল। এত ছোট ছেলে তাও কত পরিপাটি! পড়নে থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট আর একটা শুভ্র টি-শার্ট। গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যামবর্ন। মায়াবি চেহারা থেকে চোখ ফেরাতে ইচ্ছা হলো না তার। এদিকে জেসমিনের কথায় ছেলেটা চোখ মুখ এমন বানাল যেন এই প্রশ্নে সে খুব বিরক্ত হয়েছে।

_“ তোমাকে এ বাড়িতে কে এনেছে? যে এটাই জানে না আমি কে!”

_“ আমি তো আসতে চাইনি৷ জোর করেই তো নিয়ে এলো।”

_“ তাহলে এখন চলে যাও।” ছেলেটা চট করে বলল।

_“ তুমি কী আমাকে সাহায্য করবে?”

_“ না।”

_“ কেন?”

_“ আমি তোমাকে সাহায্য করে কী পাব?”

_“ আমার কাছে তো তোমাকে দেওয়ার মত কিছু নেই।”

জেসমিনের কথায় ছেলেটা বলল,

_“ তাহলে আমিও তোমাকে সাহায্য করব না।”

_“ আজকে সাহায্য করো, পরে না হয় তোমাকে তোমার পছন্দের কিছু দিয়ে দিব।”

_“ আচ্ছা, তাহলে চলো।” ছেলেটা হাত বাড়িয়ে দেয়।

_“ তার আগে বলো তুমি কে?”

ছেলেটা অনেক ভাব নিয়ে বলল,

_“ আমি তায়ান, ফিউচার ফুটবলার।”

জেসমিন তেমন বুঝল না তায়ানের কথা। সে তায়ানের হাত ধরে রুম থেকে বের হতে নেয়। তখনই আরশাদ সাহেবের আগমন হয়। তায়ান, জেসমিন দুজনেই চমকে যায়। তায়ানকে দেখে আরশাদ সাহেব রাগী কন্ঠে বলে,

_“ তুই? তুই এখানে এসেছিস কোন সাহসে?”

_“ কেন এখানে আসতে আবার সাহস লাগে?” জেসমিন বোকার মত তাকিয়ে বলল।

আরশাদ সাহেব তার দিকে তাকিয়ে ধমকে ওঠে।

_“ তুমি থামো!”

তারপর তায়ানের ঘাড় চে’পে ধরে দরজার দিকে ঠেলে দিয়ে বলল,

_“ বের হ এখান থেকে! আর কখনও যেন আমার রুমে তোকে না দেখি।”

তায়ান হুমড়ি খেয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। জেসমিন দৌড়ে তায়ানের কাছে যেতে চাইলে আরশাদ ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়। তায়ানের চোখ টলমল করে ওঠে। তার বাবারই তো ভাই এটা, তাহলে সে সবসময় তার সঙ্গে এমন কেন করে? কই, তার ছোট ভাই আরিজের সঙ্গে তো এমন করে না! আরিজের বয়স তিন বছর, আর তায়ানের আটের শেষ দিকে৷ নয় বছর পড়বে আগষ্টের সাতে।

তায়ান মেঝে থেকে ধীরে ধীরে উঠে চলে যায় এখান থেকে। জেসমিনের সঙ্গে তায়ানের বেশ ভালো বন্ডিং হয়েছিল। তায়ান বেশিরভাগ সময় জেসমিনের সঙ্গেই থাকত। যার কারণে আরশাদ সাহেবের জেসমিনের সঙ্গে করা খারাপ ব্যবহার তায়ানের চোখেই বেশি পরত। এসব নিয়ে তায়ান সবাইকে বললে আরশাদ ধরে ধরে তাকে মারত।

তায়ানের কথাও কেউ বিশ্বাস করত না। কারণ আরশাদ সবার চোখে জেসমিনের ভালো স্বামী হয়ে নিজেকে প্রমাণ করত। ইশতিয়াক আহমেদের চোখেও সে তখন আদর্শ জামাই। বিয়ের আগে যে সন্দেহ, যে দ্বিধা ছিল সবই মুছে গিয়েছিল। এমনকি তিনি নির্দ্বিধায় ভাবতে শুরু করেছিলেন, তার সমস্ত সম্পত্তি নিশ্চিন্তে মেয়ে আর জামাইয়ের হাতে তুলে দিতে পারবেন। এই বিশ্বাস নিয়েই একদিন হঠাৎ তিনি আহসানি বাড়িতে গিয়েছিলেন মেয়েকে দেখতে।

কিন্তু সেদিন যে দৃশ্যটা তিনি দেখলেন, তা তার পায়ের তলার মাটি সরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। বসার ঘরে সোফার উপর আরশাদ নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে শুয়ে আছে। মাথা রেখে দিয়েছে অন্য এক নারীর উরুর ওপর। হাতে টাকা। এক এক করে গুনছে।

মুখে তৃপ্তির হাসি। আর সেখানে রান্নাঘর থেকে শরবত বানিয়ে নিয়ে আসছে জেসমিন। নির্বিকার, অভ্যস্ত, চুপচাপ। দৃশ্যটা যেন ছুরি হয়ে বিঁধল ইশতিয়াক আহমেদের বুকে। তখন বাসায় কেউ ছিল না। সেদিনের পর ইশতিয়াক আহমেদ মেয়েকে নিজের সঙ্গে আহমেদ বাড়িতে নিয়ে আসে। সেই ফিরিয়ে আনার পরই প্রথমবারের মতো তিনি স্পষ্টভাবে দেখলেন জেসমিনের শরীরে ছড়িয়ে থাকা আঘাতের চিহ্নগুলো। হাতের ওপর, কাঁধে, পিঠের পাশে। পুরোনো আর নতুন ক্ষতের দাগ একসাথে মিশে আছে।

_“ তোকে এত মে’রেছে তুই আমাকে আগে জানাসনি কেন?” ইশতিয়াক আহমেদ বললেন।

_“ বললে সে তোমার ক্ষতি করত, বাবা।”

_“ ওর এত ক্ষমতা হয়নি আমার ক্ষতি করবে!”

ইশতিয়াক আহমেদ তখনই চেয়েছিলেন সবকিছু শেষ করে দিতে, নিজের হাতে মেয়ের জীবন থেকে আরশাদকে চিরতরে সরিয়ে দিতে। ডিভোর্সের সিদ্ধান্তটা ছিল তার জন্য একেবারে চূড়ান্ত।

কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে সেই সময়েই জেসমিনের শরীরে নতুন জীবনের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। সে খবরটা পুরো পরিস্থিতিকে এক মুহূর্তে বদলে দেয়। আরশাদও তখন আর দেরি করেনি। তার বড় ভাই আরমানকে সঙ্গে নিয়ে ইশতিয়াক আহমেদের সামনে এসে দাঁড়ায়। ক্ষমা চায়, অনুরোধ করে, আর জেসমিনকে নিজের কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি জানায়। ইশতিয়াক আহমেদ অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের পর শেষ পর্যন্ত নরম হন, তার নাতির কথা ভেবে, আর মেয়ের ভবিষ্যৎ ভেবে। পুরো নয়মাস আরশাদ সাহেব জেসমিনের প্রতি এত বেশি যত্নশীল হয় যে জেসমিনের বাবা আবারও মেয়ের জামাইয়ের উপর মুগ্ধ হয়ে যায়। সন্তানের মুখ দেখলে হয়তো ছেলেটা আরও বদলাবে, এটা ভেবেই সে আরও ভরসা করে আরশাদকে।

সবশেষে জেসমিনের কোল আলো করে এলো ছোট্ট শিশুকন্যা অনুভা। নামটা আরমান সাহেবই রেখেছিল। তাদের বাড়ির প্রথম কন্যা সন্তান ছিল সে। ইশতিয়াক আর নাজিয়া আহমেদ তো খুশিতে আত্মহারা। তাদের একমাত্র মেয়ের একমাত্র মেয়ে। সেদিন হসপিটালে আরশাদের উপর দায়িত্ব দিয়ে সবাই চলে আসে। সঙ্গে অবশ্য নাজিয়া আহমেদ আর আসাদুর সাহেবও ছিল। সঙ্গে সেদিন তায়ানও ছিল। আমিরা বেগম থাকতে পারেনি তার তিন বছরের ছেলে আরিজের জন্য। তায়ান নাজিয়া আহমেদের সঙ্গে পাশের কেভিনে ছিল। মাঝরাতে যখন সবাই ঘুমে তখন তায়ান পা টিপে টিপে জেসমিনের কেভিনের দরজা খোলে। কারণ সারাদিনেও আরশাদের ভয়ে সে তার মামুনি আর সদ্য হওয়া বোনকে দেখতে পারেনি।

তাই সবার ঘুমের সুযোগ নিয়ে তায়ান চুপচাপ ভেতরে ঢোকার সুযোগ নেয়। নতুন অতিথিটাকে একবার চোখে দেখার ইচ্ছা ছিল তার। একটা নিষ্পাপ জীবনের মুখ দেখার আকর্ষণ। কিন্তু দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই তার শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়। ভেতরের দৃশ্যটা দেখে মুহূর্তে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। জেসমিন বিছানায় অচল হয়ে আছে, আর আরশাদ তার ওপর ঝুঁকে, উন্মাদ, বিকৃত এক ভঙ্গিতে তার গলা চেপে ধরে আছে। জেসমিনের মুখে আতঙ্ক, চোখে বাঁচার আকুতি। দৃশ্যটা এত অবিশাস্য ছিল যে তায়ান কতক্ষন স্তব্ধ হয়ে তাকিয়েই থাকে। তায়ানকে তখনও আরশাদ দেখেনি। সে তখন মরণ খেলায় ব্যস্ত। জেসমিনের চোখ দরজায় পড়তেই সে চোখে তার পাশে ছোট্ট একটা দোলনায় শুয়ে থাকা নবজাতকের দিকে ইশারা করে। তায়ান যেন সহজেই বুঝল। সে দ্রুত এসে ছোট্ট অনুভাকে কোলে তুলে নেয়। সে নিজেও ছোট ছিল। বাচ্চাদের কীভাবে কোলে তুলতে হয় সে জানে না। তবু হয়ত সেদিন সৃষ্টিকর্তা তাকে সে বুদ্ধি দিয়েছিল। সে অনুভাকে কোলে নিয়ে কেভিন থেকে বের হয়। আরশাদ সাহেব সেদিকে একবার তাকায়। কিন্তু তবু জেসমিনকে ছাড়ে না। কারণ জেসমিন না ম’রলে আরশাদ যে তাকে মারার চেষ্টা করেছিল সবাই জেনে যাবে। তাই তার আগে তাকে মা’রতে হবে।

সেদিন অনুভার মায়ের আত্মাটা যেন যেতে চায়নি সেই দেহ ছেড়ে। বহু কসরত করে আরশাদ আত্মাটাকে বের করল। জেসমিনের নিথর চোখ দিয়ে পানি গড়াল। তার চোখ এখনও তার সদ্য জন্মানো ছোট্ট মেয়ের দোলনার দিকে। দোলনাটা এখন ফাঁকা।

এদিকে তায়ান তখন রাতের অন্ধকার চিরে ছুটছে। শরীরের চেয়ে ভারী হয়ে আছে তার বুকের ভয়। টাওয়ালে জড়িয়ে রাখা ছোট্ট অনুভা তার দু’হাতে, আর সে দৌড়াচ্ছে এমনভাবে যেন এক মুহূর্ত থেমে গেলেই সব শেষ হয়ে যাবে। হসপিটাল থেকে বাড়ির দূরত্ব আধা ঘণ্টার, কিন্তু সেই রাত যেন আর সাধারণ কোনো রাত ছিল না। আট-নয় বছরের এক ছোট্ট ছেলের কোলে একদিনের নবজাতক, এই পথটা যেন তার জন্য কয়েক ঘণ্টারও বেশি লম্বা হয়ে গেল। শিশুটার কান্না থামছে না। সেই তীক্ষ্ণ কান্না রাতের নিস্তব্ধতাকে ছিঁড়ে ফেলছে বারবার। তবুও তায়ান থামছে না। তার মাথার ভেতর একটাই চিন্তা ঘুরছে, আরশাদ যদি এসে পড়ে? প্রতিটি ছায়া, প্রতিটি শব্দ তাকে ভয় দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে এই বুঝি কেউ পেছন থেকে ধরে ফেলবে, আর ছোট্ট এই প্রাণটাকে আবার কেড়ে নেবে। তারপর জেসমিন মামুনির মতো এই ছোট্ট বাবুটাকেও মে’রে ফেলবে। আজ তো তায়ান গিয়ে সব বলে দেবে। আজ বিশ্বাস না করে যাবে কই? কিন্তু সে তো আর জেসমিন মামুনির সঙ্গে দূঃখ প্রকাশ করতে পারবে না।

বিজ্ঞাপন
রক্ত রেখার আড়ালে গল্পটি আয়েশা শেখ রিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে মোড়ানো থ্রিলার উপন্যাস