হাসপাতালের নিস্তব্ধ করিডোর কাঁপিয়ে তায়ানের গাড়িটা যখন গেটের সামনে এসে থামল, চাকার ঘর্ষণে একটা তীক্ষ্ণ আর্তনাদ বেজে ওঠে। গাড়ি থামার মুহূর্তেই দরজা খুলে একরকম ছিটকে বেরিয়ে এলো। এতটুকু পথ সে কীভাবে এসেছে নিজেও জানে না। মনে হচ্ছে গাড়ি নয়, বিমান চালিয়ে এসেছে। কোলে রক্তে ভেজা ছোট্ট আরাফ। রাত তখন গভীর, কিন্তু হাসপাতালের সাদাটে নিস্তব্ধতার ভেতরেও যান্ত্রিক ব্যস্ততাটুকু মরে যায়নি। আরাফের ছোট্ট পা বেয়ে নামা রক্তের ধারা তায়ানের শার্টের হাতা ভিজিয়ে দিচ্ছে। ও নিজের সর্বশক্তি দিয়ে আরাফের গুলিবিদ্ধ জায়গাটা চেপে ধরে আছে, যেন আলগা হলেই ওর প্রাণপাখিটা ফুরুত করে উড়ে যাবে। দিশেহারা তায়ান গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল,
_"ডক্টর! আই নিড এ ডক্টর রাইট নাও! সামবডি হেল্প মি!"
ওর সেই ভরাট গলার আর্তচিৎকারে হাসপাতালের তন্দ্রাচ্ছন্ন পরিবেশটা মুহূর্তেই তছনছ হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দ্রুত ধাবমান স্ট্রেচারের চাকার শব্দ এগিয়ে আসতে থাকল। সাদা অ্যাপ্রন পরা কয়েকজন ডাক্তার আর নার্স দ্রুত ছুটে এলেন। একজন ডাক্তার তায়ানকে শান্ত করার চেষ্টা করতেই ও গর্জে উঠল,
_"ডোন্ট জাস্ট স্ট্যান্ড দেয়ার! ডু সামথিং! মাই সান ইজ ব্লিডিং। স্টার্ট দ্য ট্রিটমেন্ট ইমিডিয়েটলি!"
স্ট্রেচারে যখন আরাফকে শোয়ানো হলো, তায়ানের কম্পিত হাত দুটো যেন অবশ হয়ে আসছিল। ওর পুরো পৃথিবীটা এখন ওই এমার্জেন্সি রুমের নীল দরজার ওপারে ঝুলে আছে।
আরাফকে ভেতরে নিয়ে যাওয়ার পর তায়ানের জন্য প্রতিটা সেকেন্ড যেন এক একটা বছরের মতো ভারী হয়ে উঠল। ও করিডোরের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ধপাস করে বসে পড়ল। ওর দুহাতে এখনো আরাফের শরীরের তপ্ত রক্ত লেগে আছে। ও নিজের কাঁপতে থাকা হাতের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে উঠল,
_"নাথিং উইল হ্যাপেন টু ইউ, তাশভান। বাবা ইজ হেয়ার। কিচ্ছু হতে দেব না আমি।"
কিছুক্ষণ পর একজন নার্স ফাইল হাতে বেরিয়ে আসতেই তায়ান বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। ওর চোখেমুখে এক অদ্ভুত হাহাকার। ও অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল,
_"নার্স, আমার ছেলের অবস্থা কী? ইজ হি আউট অফ ডেঞ্জার? হোয়াই ইজ ইট টেকিং সো লং?"
নার্স ওকে শান্ত হওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে বললেন,
_"আমরা রক্ত থামানোর চেষ্টা করছি। ব্লাড লস হয়েছে অনেক।”
নার্স যখন জানালেন রক্তক্ষরণ অনেক হয়েছে, ঠিক তখনই করিডোরের শেষ মাথায় হন্তদন্ত হয়ে কয়েকজনকে আসতে দেখা গেল। অনুভা পাগলের মতো দৌড়ে আসছে, মেয়েটার চুল গুলো এলোমেলো। ওর পেছনেই শান্ত, আরিজ আর রিকো। অনুভার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে, চোখ দুটো কান্নায় রক্তবর্ণ।
অনুভা এসে তায়ানের দিকে তাকাল না পর্যন্ত। ও সরাসরি নার্সের হাত চেপে ধরল। কণ্ঠস্বর কাঁপছে ওর,
_"নার্স, আমার ছেলে কেমন আছে? আরাফ কোথায়? ও ভেতরে তো? আমি ওর কাছে যাব, আমাকে যেতে দিন!"
নার্স ওকে থামানোর চেষ্টা করতেই অনুভা প্রায় চিৎকার করে উঠল,
_"আমি কোনো কথা শুনব না! আমার বাচ্চাটা একা ভয় পাচ্ছে, ও নিশ্চয়ই মা মা বলে কাঁদছে! আমাকে ভেতরে যেতে দিন, ও আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না!"
অনুভার আকুতি দেখে নার্স কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়লেন। তিনি অনুভার কাঁধে হাত দিয়ে শান্ত গলায় বললেন,
_ "ম্যাম, শান্ত হোন। ও এখন সেন্সলেস । ব্লাড লসের কারণে ও ট্রমার মধ্যে আছে, তাই জ্ঞান হারিয়েছে।"
নার্সের মুখ থেকে 'জ্ঞান হারিয়েছে' শব্দটা শোনা মাত্রই অনুভার পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। ও পাথরের মূর্তির ন্যায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। চোখের পলক পড়া বন্ধ হয়ে গেল। মেয়েটা নার্সের দিকে শূন্য দৃষ্টি ফেলে অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
_"জ্ঞান হারিয়েছে? আমার আরাফ জ্ঞান হারিয়েছে? ও কি আমাকে ডাকছে না? কথা বলছে না?"
শান্ত অনুভার কাঁধে হাত রাখল। নার্সের কথা শুনে সে নিজেও ভেতর থেকে প্রচণ্ড আতঙ্কিত। আরাফের বয়স খুব কম। এইটুকু নাজুক শরীর নিয়ে এত বড় আঘাত ও কীভাবে সইবে, সেই চিন্তায় শান্তর ভেতরটা কাঁপছে। কিন্তু এই মুহূর্তে অনুভাকে ভেঙে পড়তে দেওয়া যাবে না।
_"মাহভিন! তাকাও আমার দিকে! লিসেন টু মি।”
অনুভা শান্তর দিকে তাকাল না। ওর পলকহীন দৃষ্টি তখনো ওটি রুমের সেই বন্ধ দরজার দিকে। দুচোখ বেয়ে ঝর্ণার মতো তপ্ত নোনাজল গড়িয়ে পড়ছে ওর ফ্যাকাশে গালে। শান্ত নিজের কাঁপতে থাকা আঙুল দিয়ে অনুভার চোখের জল মুছে দিল। ও নিজের ভেতরের ভয়টা চাপা দিয়ে একটু দৃঢ় গলায় বলল, "
_"কিচ্ছু হয়নি আরাফের। ও জাস্ট একটু ক্লান্ত। ছোট মানুষ তো, এত ধকল সইতে পারেনি তাই ঘুমিয়ে পড়েছে। তুমি তো জানো ও কতটা স্ট্রং! ঠিক তোমার মতো। ও ঠিক ফিরে আসবে।”
শান্তর কথায় অনুভা এবার ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকাল। ওর চোখের মণি দুটো কাঁপছে। ও ভাঙা গলায় বিড়বিড় করে বলল,
_“ আমার আরাফ বাঁচবে তো, শান্ত?”
অনুভার এই একটা প্রশ্নে শান্তর বুকটা হাহাকারে ভরে উঠল। সে নিজেও যে প্রচণ্ড ভয়ে আছে, কিন্তু অনুভাকে তা বুঝতে দেওয়া যাবে না। অনুভা শান্তর চোখের দিকে চেয়ে আছে, যেন ওর চোখের মণি দুটোতে নিজের অস্তিত্বের শেষ আশাটুকু খুঁজছে।
শান্ত অত্যন্ত বিশ্বাসের সাথে বলল,
_"অফকোর্স ও বাঁচবে, অনুভা! ওকে বাঁচতেই হবে। তুমি এসব কেন ভাবছো?”
তায়ান দূরে দাঁড়িয়ে এই করুণ দৃশ্যটা সহ্য করতে পারছিল না। ওর দুচোখে না চাইতেও আগুনের হল্কা খেলে যাচ্ছিল, দৃষ্টিটা হয়ে উঠল প্রচণ্ড প্রখর। হাতের মুঠি শক্ত করার কারণে আঙুলের গাঁটগুলো সাদাটে হয়ে গেছে, চোয়াল জোড়া পাথরের মতো শক্ত। নিজের স্ত্রীকে অন্য কেউ সান্ত্বনা দিচ্ছে, এই দৃশ্যটা সহ্য করা ওর জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ওর ভেতরের জন্মগত অধিকারবোধ বারবার ফুঁসে উঠছিল।
তায়ান কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু রিকো এসে তার সামনে দাঁড়ায়।
_“ নিজের ছেলেকে নিয়ে ভাবো। আশেপাশে কি হচ্ছে, না হচ্ছে ভুলে যাও।”
তায়ান রিকোর কথায় কান দিল না। ওর স্থির দৃষ্টি তখনো শান্তর ওপর নিবদ্ধ, যে অনুভার ঠিক পাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। তায়ান কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব নিচু রেখে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলল,
_“ ছেলেটাকে যেতে বলো এখান থেকে।”
_“ কেন? কেন চলে যাবে? হিসেবে তোমার চেয়ে ওর অধীকার বেশি এখানে।” রিকো তায়ানের চোখে চোখ রেখে সরাসরি বলে দিলো।
রিকোর এই একটা বাক্য তায়ানের বুকের পাঁজরে সজোরে আঘাত করে। রিকো থামল না,
_“তুমি ছিলে না, তায়ান। বাচ্চাটার জন্মের সময় তুমি ছিলে না। এই লোকটাই আরাফের পাপা হয়ে ছায়ার মতো পাশে ছিল। অনুভাকে আগলে রেখেছে। আজ যখন বাচ্চাটা ওটি-র ভেতরে জীবন-মৃত্যুর সাথে লড়ছে, তখন তুমি নিজের ইগো নিয়ে পড়ে আছ? লুক অ্যাট হার, অনুভা এখন তোমার সান্ত্বনা চায় না। ও যাকে বিশ্বাস করে, তার কাছেই দাঁড়িয়ে আছে।
মানুষ যখন একবার কারও কাছে ভরসা পায়, দ্বিতীয়বার তার কাছেই যায়।”
তায়ান রিকোর কথা শুনলো, বুঝলো। সে ভুল বলেনি। তায়ান একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রিকোর চোখের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু ও ভারী গলায় বলল,
_“ইগো নয়, রিকো। ওটা আমার ছেলে, মাই ওন ব্লাড। আর অনু... শি ইজ স্টিল মাই ওয়াইফ। আমি ওকে ভালোবাসি। যখন আমার মধ্যে কোনো ভালোবাসার অনুভূতি জন্মায়নি তখন থেকে আমি ওকে চেয়ে এসেছি। আই ওয়ান্টেড হার টু বি মাইন সিন্স চাইল্ডহুড।”
তায়ান শান্তর দিকে এক পলক তাকিয়ে আবারও রিকোকে উদ্দেশ্য করে বলল,
_“নিজের কলিজার টুকরোকে অন্য কারো পরিচয়ে বড় হতে দেখা আর নিজের স্ত্রীকে অন্য কারো ওপর ভরসা করতে দেখাটা ইগো নয়, ওটা নরক যন্ত্রণা। আই নো আই মেক মিসটেকস, কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমি আমার অধিকার ছেড়ে দিয়েছি।”
_“ এত ভালোবেসেও কেন সেদিন মেয়েটার সাথে এমন করেছিলে? তোমার প্রতিশোধের আর কোনো রাস্তা ছিলো না?”
_“প্রতিশোধের নেশা মানুষকে অন্ধ করে দেয়, রিকো। আমি রাগে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। তখন আমার মনে হয়েছিল ওকে কষ্ট দেওয়াটাই হবে আমার জয়ের শেষ রাস্তা। বাট আই ওয়াজ রং। আমি আসলে ওকে কষ্ট দিতে গিয়ে নিজেকেই তিলে তিলে শেষ করেছি।”
তায়ান একটু থামল। ওর দৃষ্টি তখন অনুভার দিকে, কাঁদছে মেয়েটা। ওরই বাচ্চার জন্য কাঁদছে অথচ ও নিজে গিয়ে একটাবার আগলে নিতে পারছে না। ধরা গলায় তায়ান আবারও বলল,
_“ভেবেছিলাম প্রতিশোধ আমাকে শান্তি দেবে। কিন্তু আমি আসলে নিজের পৃথিবীটা নিজের হাতেই জ্বালিয়ে দিয়েছি। এভরি সিঙ্গেল ডে আই রিগ্রেট, রিকো। অতীত বদলানোর ক্ষমতা তো আমার নেই। কিন্তু আমার ফিউচার ওদের ছাড়া কল্পনাও করতে পারি না।”
তায়ান নিজের দুহাতে লেগে থাকা আরাফের শুকিয়ে আসা রক্তগুলোর দিকে তাকাল। এগুলো যেন ওকে চিৎকার করে ধিক্কার দিচ্ছিল তখন। এই হাতে কিছুদিন আগে ও নিজেও বাচ্চাটাকে কষ্ট দিয়েছিল।
তায়ান আর রিকোর কথার রেশ কাটতে না কাটতেই অপারেশন থিয়েটারের ভারী দরজাটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে খুলে গেল। ডাক্তার মাস্ক খুলতে খুলতে বেরিয়ে এলেন, ওনার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম আর চোখেমুখে একরাশ ক্লান্তি ও দুশ্চিন্তা। ডাক্তারকে দেখামাত্রই তায়ান, অনুভা আর শান্ত, তিনজনেই একরকম ছুটে গেল ওনার কাছে। অনুভা থরথর করে কাঁপছে, ওর কণ্ঠস্বর বুজে এসেছে। ও কোনোমতে অস্ফুট স্বরে বলল,
_"ডাক্তার... আমার বাচ্চা? আমার আরাফ?” এর বেশি বাক্য উচ্চারণ করতে পারল না অনু।
ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। করিডোরের বাতাসকে একদম বিষাক্ত করে তুলল তার নিরবতা। তায়ান অস্থির হয়ে রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করল,
_"ডক্টর, সে সামথিং! ও কি বিপদমুক্ত?
অনুভা তখন উত্তরের অপেক্ষায় পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। শান্ত পাশ থেকে ডাক্তারের খুব কাছে এগিয়ে এল। ওর চোখেমুখেও স্পষ্ট আশঙ্কার ছাপ, কিন্তু তায়ানের মতো ও মেজাজ হারাল না। শান্ত অত্যন্ত নিচু কিন্তু আর্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
_"ডক্টর, দয়া করে আমাদের সত্যিটা বলুন। ওর কন্ডিশন এখন কেমন? ব্লিডিং কি বন্ধ হয়েছে? আমরা কি একবার ওকে দেখতে পারি?"
ডাক্তার সবার উৎকণ্ঠা দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওনার ক্লান্ত চোখগুলো একবার অনুভার দিকে আর একবার তায়ানের রক্তভেজা শার্টের দিকে ঘুরে এল। এরপর মাথা নিচু করে অত্যন্ত ভারী গলায় বললেন,
_“আই অ্যাম সরি টু সে দিস.. এটা বলতে আমার খারাপ লাগছে..” ব্যস, পরবর্তী শব্দ শোনার আগেই অনুভার পা দুটো ভেঙে এলো। প্রায় মেঝেতে পড়ে যাবে যাবে…সেই মুহূর্তে শান্ত হাত বাড়াল তাকে সামলানোর জন্য, তবে তার আগেই তায়ান অনুভার দু’বাহু ধরে আগলে নিলো। শান্ত আর ধরলো না। আপনা-আপনিই ফিরে এলো তার হাত। তায়ান ডক্টরের দিকে তাকিয়ে বলল,
_“ কি হলো? বলুন!”
_“পেশেন্টের কন্ডিশন খুব একটা ভালো না। গুলিটা বের করা সম্ভব হলেও ওর ইন্টারনাল ব্লিডিং আমরা পুরোপুরি কন্ট্রোল করতে পারছি না। তাছাড়া ওর বয়স খুব কম হওয়ায় ব্লাড প্রেসার মারাত্মকভাবে ফল করছে। পেশেন্টের শরীর খুব একটা রেসপন্স দিচ্ছে না। হার্টবিট খুব দূর্বল হয়ে পড়েছে।"
একে একে এতগুলো সমস্যার কথা শুনে অনুভা চিৎকার দিয়ে, তায়ানের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে, মেঝেতে বসে পড়ল। ডাক্তারের এই কথাগুলো করিডোরে যেন একটা বোমা বিস্ফোরণের মতো শোনাল। তায়ানের পৃথিবীটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ডাক্তার থামলেন না, তিনি আরও যোগ করলেন,
_"আগামী ২৪ ঘণ্টা ওর জন্য অত্যন্ত ক্রিটিক্যাল। ব্লাড দরকার, প্রচুর ব্লাড লাগবে। কিন্তু ওর ব্লাড গ্রুপটা বেশ রেয়ার, আমাদের স্টকে এই মুহূর্তে নেই। আমরা ট্রাই করছি, বাট আপনাদের যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।"
তায়ান রক্তশূন্য মুখে ডক্টরের দিকে তাকিয়ে নিস্তেজ গলায় বলল,
_“ ব্লাড গ্রুপ কী ওর?”
উত্তরটা ডক্টরের দিকে তাকিয়ে শান্ত দিলো।
_“ বোম্বে… ব্লাড গ্রুগ বোম্বে। যেটা লাখে তিন-চার জনের থাকে।” শান্তর কণ্ঠস্বর তায়ানের মতোই নিস্তেজ শোনাল। শান্ত আর অনুভা আগে থেকেই জানত আরাফের রক্তের গ্রুপ যে কতটা বিরল। এজন্যই ডক্টরের মুখে রক্ত লাগবে শব্দটা শোনা মাত্রই অনুভা ওভাবে ভেঙে পড়েছে। ও জানে এই রক্ত খুঁজে পাওয়া কতটা অসম্ভব। জানত না শুধু তায়ান। তার জানার কথাও না, কারণ এই দীর্ঘ সময়ে সে তো নিজের রক্তেরই খবর রাখেনি।
শান্তর কথায় ডক্টর দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়লেন। তিনি চরম অসহায় কণ্ঠে বললেন,
_“উনি ঠিক বলেছেন। আমাদের হসপিটালে তো এই ব্লাড গ্রুপ নেই-ই, পুরো শহরে এই মুহূর্তে কারো আছে কি না সন্দেহ। আমরা ব্লাড ব্যাংকগুলোতে যোগাযোগ করেছি, কিন্তু রেসপন্স জিরো। তবে হ্যাঁ, এই ব্লাড গ্রুপ অনেক সময় উত্তরাধিকার সূত্রেও পেয়ে থাকে। হতে পারে আপনাদের পরিবারেরই কারও আছে।”
আরিজ ডক্টরকে জানাল এমন গ্রুপের র’ক্ত তাদের পরিবার তো দূরে থাক, পরিচিত কারোরই নেই। তায়ানের আর আরিজের দুজনেরই বি পজিটিভ। অনুভার ও পজিটিভ।
শান্ত ডক্টরের কথা শুনে এক মুহূর্ত দেরি করল না। বেড়িয়ে গেল এই বিরল র”ক্তের খোঁজে। তায়ানের কানের কাছে শান্তর শব্দগুলো বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল 'লাখে তিন-চার জন'। শরীরের সমস্ত শক্তি যেন এক মুহূর্তে কেউ শুষে নিয়েছে তায়ানের। ও নিজের দামী ঘড়িটার দিকে একবার তাকাল, যেটার দাম কয়েক লাখেরও বেশি। তারপর ওটি-র সেই বন্ধ দরজার দিকে। পৃথিবীর সব সম্পদ এখন ওর হাতের মুঠোয় থাকলেও, তাশভানকে দেওয়ার মতো এক ফোঁটা রক্ত ওর কাছে নেই।
তায়ান অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে উঠল,
_“ লাখে মাত্র তিন-চার জন? তার মানে আমার ছেলের জন্য কোনো আশা নেই? না, না…”
ঠিক সেই মুহূর্তে করিডোরের ঠান্ডা বাতাস চিরে অনুভার সেই বুকফাটা হাহাকার তায়ানের কানে ভেসে এল। অনুভা ওটি-র দরজার কাঁচের ওপর কপাল ঠেকিয়ে এক অদ্ভুত শান্ত কিন্তু ভয়ংকর স্বরে বিড়বিড় করছে
_“এবার তুমিও আমাকে ফেলে চলে যাবে, বাবা? আচ্ছা যাও, ভয় নেই সোনা। মা-ও আসছে তোমার পিছু পিছু... এক সঙ্গেই যাব, চলো।”
মেয়েটার এই নিথর আত্মসমর্পণ আর মৃত্যুর আহ্বানে তায়ানের শিরদাঁড়া দিয়ে এক হিমশীতল স্রোত বয়ে যায়। আরাফের নিভে যাওয়া প্রাণের সাথে সাথে যে অনুভাও নিজেকে শেষ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে তা বুঝতে বাকি নেই তায়ানের। তার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠল, চোয়াল শক্ত হয়ে এক হিংস্র রূপ নিল।
তায়ান এক ঝটকায় ঘুরে রিকোর শার্টের কলার চেপে ধরল। ওর কণ্ঠে বাঘের গর্জন,
_"যেভাবে পারো আমার রক্ত চাই, রিকো! এই শহরের প্রতিটা ব্লাড ব্যাংক, প্রতিটা ডোনাট সেন্টার তছনছ করে ফেলো। দরকার হলে সেনাবাহিনী ডাকো!”
তায়ান রিকোকে ধা”ক্কা দিয়ে সরিয়ে নিজেই পাগলের মতো হাসপাতালের গেটের দিকে ছুটল। ওর মনে হচ্ছে প্রতিটা সেকেন্ডে ওর ছেলের প্রাণপাখিটা একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছে। ও ফোন বের করে ওর একজন গার্ডকে কল দিয়ে চিৎকার করে বলল,
_"শোনো! সিটির সব বড় বড় হসপিটালের লিস্ট বের করো। লাস্ট টেন ইয়ার্স-এ যারা এই ব্লাড ডোনেট করেছে তাদের নাম-ঠিকানা আমার এখনই চাই। আই উইল পে এনি অ্যামাউন্ট, শুধু আমাকে একটা নাম দাও!”
হাসপাতালের সেই বিষাক্ত করিডোর এখন এক জীবন্ত নরক। তায়ান ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেছে, তার পেছনে রিকো। এখানে শুধু এখন অনুভা আর আরিজ। আরিজ বাড়ির লোকদের খবর জানিয়ে দিয়েছে। একটু পর ওরাও চলে আসে। কিন্তু অনুভাকে সামলানো যেন কারোর সাধ্যের মধ্যে নেই। সারারাত মেয়েটা এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে বসেনি। ও পাগলের মতো ওটি-র দরজায় ধাক্কা দিয়েছে, নার্সদের পায়ে ধরেছে, চিৎকার করে বলেছে,
_"আমার বাচ্চাটা অন্ধকারে ভয় পায়, আমাকে ওর কাছে যেতে দিন!" কিন্তু এমার্জেন্সি কন্ডিশন এতই ক্রিটিক্যাল যে ডাক্তাররা কাউকেই ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দেননি। আমিরা বেগম বারবার অনুভাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে শান্ত করতে চেয়েছেন, কিন্তু মেয়েটার কানে সেসব পৌছাচ্ছে না।
আমিরা বেগম, অলি, উর্মিলা বেগম সবাই মিলেও অনুভাকে ঠিক করতে পারেনি।
——
রাত পেরিয়ে ভোর হলো, সকাল গড়িয়ে দুপুর। হাসপাতালের সাদাটে দেয়ালে আলোর রেখাগুলো সময়ের সাথে সাথে বদলে যাচ্ছে, কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত খবরটা আর আসছে না কোনো মতেই। তায়ান বা শান্ত, কেউই আর হাসপাতালে ফিরে আসেনি। বিকেল গড়িয়ে যখন গোধূলির ধূসর ছায়া নামল, করিডোরটা যেন আরও অন্ধকার হয়ে উঠল। র’ক্তের কোনো খোঁজ মেলেনি। তায়ান তার ক্ষমতা আর টাকা নিয়ে শহরের অন্ধকার গলি চষে বেড়িয়েছে, শান্তও তার পরিচিত সব স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের দুয়ারে হানা দিয়েছে, কিন্তু 'বোম্বে ব্লাড গ্রুপ' যেন এই পৃথিবীর বুক থেকেই হারিয়ে গেছে।
হাসপাতালের সেই গুমোট নিস্তব্ধতা এখন এক ভয়ংকর সমাপ্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। অনুভা এখন আর চিৎকার করছে না। ও করিডোরের মেঝেতে দেয়াল ঘেঁষে বসে আছে, ওর চোখের জল শুকিয়ে গালের ওপর সাদা দাগ কে’টে গেছে। শূন্য দৃষ্টিতে ও ওটি-র সেই লাল বাতিটার দিকে তাকিয়ে আছে, যেটা এখনো নিভছে না।
দেখতে দেখতে রাত বারোটা বেজে গিয়েছে। কাল আরাফের ডক্টর চব্বিশ ঘন্টার সময় দিয়েছিল। বারো ঘন্টা শেষ হয়ে আর দু ঘন্টা বাকি। শান্ত তখন ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছে। অনুভা এখনও আগের মতোই মেঝেতে বসা। ঠিক সেই সময় অপারেশন থিয়েটারের করিডোর দিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে আসছিলেন একজন ডাক্তার। তাঁর পরনে ওটি ড্রেস, সম্ভবত অন্য কোনো সিরিয়াস পেশেন্টের অপারেশনের জন্য তিনি নিজেকে প্রস্তুত করে নিচ্ছেন। কিন্তু অনুভাকে দেখেই লোকটা থমকে যায়। কয়েক সেকেন্ড দাড়িয়ে থেকে প্রানহীন হয়ে বসে থাকা অনুভার কাছে এসে বলে,
_“ তুমি এখানে? কী হয়েছে?”
অনুভা খুব ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকাল। তবে পরক্ষনেই চমকাল একটু। এটা সেই ডক্টর যে ফ্রান্সে শান্তর এ’ক্সিডেন্টের সময় অনুভার সাথে পরিচয় হয়েছিল। সেদিনও এমনই এক বিপদের দিনে লোকটা অনুভার পাশে একটু হলেও ছিল। আজ এই মুহূর্তে ডক্টরকে দেখে ডুকরে কেঁদে ওঠে মেয়েটা।
ডাক্তার ওর অবস্থা দেখে বিচলিত হয়ে পড়লেন। তিনি অনুভার কাঁধে হাত রেখে বললেন,
_"শান্ত হও মা। আমাকে বলতে পারো, কি হয়েছে।”
অনুভা ওটি-র বন্ধ দরজার দিকে আঙুল তুলে অস্ফুট স্বরে বলল,
_"আমার আরাফ ভেতরে ডক্টর। আমার এক বছরের বাচ্চাটা... ওর ব্লাড গ্রুপ বোম্বে। কোথাও রক্ত পাচ্ছি না। ও বোধহয় আমাকে ছেড়ে চলে যাবে ডক্টর!"
ডক্টরটা একটু বিস্ময়ে নিয়ে আবারও জানতে চাইলেন,
_“ কি গ্রুপ?”
_“ বোম্বে।” অনুভা বলল।
লোকটা কয়েক মুহূর্ত একদম নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। 'বোম্বে' শব্দটা শোনার পর তাঁর চেহারায় বিস্ময় আর এক অদ্ভুত দ্বিধা খেলা করে গেল। তিনি যেন নিজের মনের সাথে লড়ছেন, কিছু একটা বলতে চাইছেন, কিন্তু পরক্ষণেই দমে যাচ্ছেন। সে আবার জানতে চাইলেন,
_"তুমি নিশ্চিত এটা বোম্বে ব্লাড গ্রুপই?"
অনুভা কেবল মাথা নাড়াল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছে। ডাক্তার এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্যদিকে মুখ ফেরালেন। তাঁর কপালে চিন্তার ভাঁজ। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে, যেন নিজের ভেতরের দ্বিধা কাটিয়ে উঠে অত্যন্ত নিচু স্বরে বললেন,
_"সৃষ্টিকর্তা মানুষকে কখনো নিরাশ করেন না। তোমার বুক খালি হবে না, মা। আমার নিজের মেয়ের ব্লাড গ্রুপও 'বোম্বে'।"
অনুভা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। ডক্টরের দিকে অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে বলল,
_“ আপনি…আপনি সত্যি বলছেন?”