রক্ত রেখার আড়ালে

পর্ব - ৪৪

🟢

স্কুল জীবনের তিন বন্ধু ছিল আরমান, সিরাজ, মোস্তাফিজুর। বন্ধু বললে ভুল হবে তিন ভাইয়ের মতো ছিল তারা। একসঙ্গে স্কুল শেষ করে একই কলেজ ইউনিভার্সিটিতে পড়ত। আরমান আর মোস্তাফিজুরের গায়ের রঙ ছিল স্বাভাবিক ফর্সা, কিন্তু সিরাজ ছিল বেশ কালো। বন্ধুদের সাথে থাকার সময় এই একটা কারণেই সে প্রায়ই ভীষণ হীনম্মন্যতায় ভুগত। ফর্সা বন্ধুদের পাশে নিজেকে তার সবসময় বড্ড ছোট আর কুৎসিত লাগত। আয়নার সামনে দাঁড়ালে এক ধরণের চাপা কান্না আর হাহাকার এসে দলা পাকাত তার গলায়; খোদার কাছে মনে মনে প্রশ্ন করত, কেন তাকে দেখতে আর সবার মতো সুন্দর করা হলো না? এই তীব্র হীনম্মন্যতা আর মানসিক কষ্ট সে কাউকে বলতেও পারত না, আবার সইতেও পারত না। অথচ আরমান কিংবা মোস্তাফিজুরের মনে এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র কোনো ভাবান্তর ছিল না। তারা সিরাজকে মন থেকেই নিজেদের ভাই মানত।

ইউনিভার্সিটির দিনগুলো স্বাভাবিক ভাবেই চলছিল। এর মধ্যেই একদিন তাদের ডিপার্টমেন্টে জুনিয়র হিসেবে ভর্তি হলো নওশিন আমীরা নামের একটা মেয়ে। মেয়েটার চোখে-মুখে কেমন যেন একটা শান্ত আর মায়াবী ভাব ছিল, যা প্রথম দেখাতেই সিরাজের মনকে নাড়া দিয়ে বসে। যে ছেলেটা গায়ের রঙের কারণে সারাজীবন নিজেকে সবার থেকে গুটিয়ে রাখত, লোকচক্ষুর আড়ালে থাকত, সে প্রথমবারের মতো কোনো মেয়ের মোহে পড়ল। আমীরাকে সে নিজের অজান্তেই গভীর ভাবে ভালোবেসে ফেলে। দূর থেকে মেয়েটাকে দেখা, তার হাসির শব্দ শোনা, এসবই সিরাজের একঘেয়ে জীবনের একমাত্র আনন্দের উৎস হয়ে উঠল।

বেশ কিছুদিন এভাবে কাটার পর, সিরাজের ভেতরের ভালোবাসাটা আর চেপে রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। অনেক রাত জেগে সে ভাবল, অনেক সাহস সঞ্চয় করল। অবশেষে একদিন ক্লাস শেষের পর, করিডোরের এক কোণে নওশিনকে একা পেয়ে সে নিজের মনের সবটুকু অনুভূতি ঢেলে দেয়। কাঁপা গলায় বলেই ফেলে তাকে ভালোবাসার কথা। কিন্তু নওশিন এক মুহূর্তও সময় নেয়নি। খুব স্বাভাবিক আর ঠান্ডা গলায় সে সিরাজকে সরাসরি না করে দেয়। নওশিনের সেই সাফ জবাব সিরাজ প্রথমে স্বাভাবিক ভাবেই নিয়েছিল তার সঙ্গে তো এমনটাই হওয়ার কথা ছিল। তবুও নিজের ভাঙা মনটা নিয়ে সে সেদিন কীভাবে বাড়ি ফিরেছিল, তা কেবল সেই জানত। সেদিনের পরও কয়েকবার নওশিনকে সে বেহায়ার মতো নিজের অনুভূতি জানিয়েছিল তবে তাতেও লাভ হয়নি। চিঠি পাঠিয়েছিল কয়েকবার।

সিরাজ যখন নিজের মনের এই ধা”ক্কাটা কোনোমতে সামলে ওঠার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই আরেকটা ব্যাপার ঘটল। জানতে পারল তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু মোস্তাফিজুরও নওশিনের প্রেমে পড়েছে। মোস্তাফিজুর যখন নওশিনকে নিজের মনের কথা জানাল, তখন কিন্তু সে আর ফিরিয়ে দিল না। যে ভালোবাসাকে নওশিন সিরাজের বেলায় অবহেলায় উড়িয়ে দিয়েছিল, মোস্তাফিজুরের বেলায় সে সানন্দে তাতে রাজি হয়ে গিয়েছিল। আরমান আর সিরাজের চোখের সামনেই তাদের প্রেম জমজমাট হলো এবং একসময় দুই পরিবারের সম্মতিতে ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে যায় মোস্তাফিজুর আর নওশিনের।

এই পুরো ব্যাপারটা সিরাজের জন্য একটা জীবন্ত নরক যাতনার মতো হয়ে দাঁড়ায়। যাকে সে এতো বেশি ভালোবাসল, সে প্রতিদিন তার চোখের সামনে ঘোরাফেরা করে তার বন্ধুর স্ত্রী হিসেবে। মোস্তাফিজুরের সাথে নওশিনের হাসি-খুশি মুখ ও কোনোভাবেই সহ্য করতে পারত না। বাইরে সবার সামনে সিরাজ মুখে একটা নকল হাসি ঝুলিয়ে রাখত, নিজেকে খুব স্বাভাবিক দেখানোর আপ্রাণ চেষ্টা করত, কিন্তু তার ভেতরের সেই তীব্র কষ্টটা ধীরে ধীরে একটা ভয়ংকর আক্রোশ আর বিষাক্ত রাগে বদলে যায়। যদিও পরে নওশিন সিরাজের ব্যাপারটা তেমন একটা গুরুত্ব দেয়নি। সে স্বাভাবিক ভাবেই স্বামীর বন্ধু হিসেবে সিরাজের সঙ্গে কথা বলত। মোস্তাফিজুরকেও এ ব্যাপারে কখনও জানায়নি নওশিন। তবু সিরাজ নিজের অজান্তেই মোস্তাফিজুর আর নওশিনের ওপর এক ধরণের চাপা প্রতিহিংসা তার বুকে জমাট বাঁধতে শুরু করে। শুধু মাত্র সে কালো বলে, অসুন্দর বলে তার খাঁটি ভালোবাসা নওশিন পায়ে ঠেলে তারই বন্ধুকে বিয়ে করল! গায়ের রঙের এতো দাম? সে কি নওশিনকে আগলে রাখত না? যত্ন করত না? তবে কেন নওশিন এমন নিষ্ঠুর কাজ করল? ভাবনা গুলো কখন যে ভয়ানক ভাবে সিরাজে মনে ঘাটি বাধল সে নিজেও বুঝতে পারেনি। তবুও সবার কাছে সিরাজ আগের মতোই সেই বিশ্বস্ত বন্ধু হয়েই থাকে।

এভাবে দেখতে দেখতে মোস্তাফিজুর আর নওশিনের বিয়ের তিন বছর কেটে যায়। তাদের কোলজুড়ে ছিল তখন দুই বছরের ফুটফুটে ছেলে সন্তান। এই দীর্ঘ সময় সিরাজ সবার সামনে চমৎকার অভিনয় করে গেছে। তার মুখে সবসময় হাসি থাকত, যেন সে অতীত ভুলে বন্ধুর সুখে খুশি। কেউই তার মনের ভেতরের সেই অন্ধকার দিকটা টের পায়নি। নওশিনকে পাওয়ার তীব্র জেদ আর নেশা তাকে ভেতরে ভেতরে একটা হিংস্র পশুতে রূপান্তর করে দিয়েছিল। মোস্তাফিজুরের এই সাজানো সংসার সে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি। ​ওদের তৃতীয় বিবাহবার্ষিকীর রাতের অনুষ্ঠানেই ওলোট-পালোট করে দেয় সব। পারিবারিক ভাবে ছোটখাটো একটা প্রোগ্রাম ছিল সেদিন। সেই আনন্দের মুহুর্তই নরখে পরিনত করে সিরাজ। মা’রা যায় নওশিন আর মোস্তাফিজুরের পরিবারের সকলেই। শুধু বেচে যায় নওশিন আমীরা এবং তার ছোট্ট ছেলে তায়ান। ​চারদিক র”ক্তে ভাসিয়ে দিয়ে সিরাজ যখন পালিয়ে গেল, মোস্তাফিজুর তখন ঘরের মেঝেতে শুয়ে জীবনের শেষ নিঃশ্বাসটুকু ফেলছে। নওশিন ছিল অবচেতন। বাচ্চা তায়ান মেঝেতে বসে কাঁদছিল। আরমান সাহেব কাজের ব্যস্ততায় সেদিনের প্রোগ্রামে উপস্থিত ছিল না। খবর পেয়ে আরমান যখন পাগলের মতো ছুটে আসে, মোস্তাফিজুরের চোখজোড়া বুজে আসছে তখন। শেষ শক্তিতে সে আরমানের হাতটা চেপে ধরে, নিজের স্ত্রী আর সন্তানের দায়িত্ব দিয়ে যায়।

সেদিনের পর নওশিন ও তার দুই বছরের ছেলে তায়ানকে নিয়ে বাপের বাড়িতে চলে আসে। সেখানে চাচাদের সঙ্গেই সে থাকতে শুরু করে। ভালোবেসে বিয়ে করেছিল সে। সেই রাতের ভয়ানক স্মৃতি আর মোস্তাফিজুরকে হারানোর শোক নওশিনকে ভেতরে ভেতরে একবারে ভেঙে চুরমার করে দেয়। স্মৃতি বলতে তার কোলে থাকা এই ছোট্ট তায়ানই ছিল। তায়ানের মুখের দিকে তাকিয়েই সে কোনোমতে বেঁচে ছিল। ​আরমান তার বন্ধুর দেওয়া শেষ দায়িত্ব মনে রেখে প্রায়দিনই নওশিন আর তায়ানকে দেখতে যেত। আরমান যখনই আসত, তায়ানের জন্য এটা-সেটা নিয়ে আসত, তাকে কোলে নিয়ে খেলত। তায়ানও আরমানকে খুব পছন্দ করে ফেলেছিল। দেখলেই কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ত। দিনের পর দিন নওশিনের

এই কঠিন সময়ে দিনের পর দিন আরমান যেভাবে তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল, তায়ানকে নিজের ছেলের মতো আগলে রেখেছিল, তা আমীরার মনে আরমানের প্রতি এক ধরণের গভীর শ্রদ্ধা আর ভরসা তৈরি করে। অন্যদিকে, আমীরার এই অসহায়ত্ব আর তায়ানের প্রতি আরমানের নিজেরও একটা অন্যরকম মায়া ও ভালোবাসা জন্মে গিয়েছিল। ​আরমানের এই ঘন ঘন আসা-যাওয়া এবং তায়ানের প্রতি তার এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আমীরার চাচাদের নজর এড়ায়নি। তারা বুঝতে পারেন, আমীরা আর তায়ানের ভবিষ্যতের জন্য আরমানের চেয়ে ভালো কেউ হতে পারে না। শেষমেশ চাচারা উদ্যোগ নিয়ে আরমানের সঙ্গেই আমীরার বিয়েটা দিয়ে দেন।

​এদিকে, সেদিনের সেই ঘটনার পর থেকে সিরাজ ইচ্ছা করেই আমীরার সামনে যেত না। যদিও এ কান্ডের ব্যাপারে কেউ অবগত ছিল না। সবার ধারণা ছিল মোস্তাফিজুরের পরিবারের কোনো পূর্ব শত্রুর কাজ এটা।

আমীরার মোস্তাফিজুরের জন্য চোখের জল ফেলা, নিজের মৃ”ত স্বামীর শোকে কাঁদা সেটা সিরাজ কোনোভাবেই সহ্য করতে পারত না। আমীরাকে অন্য কারও জন্য কাঁদতে দেখলে সিরাজের মাথায় র”ক্ত চড়ে যেত, ইচ্ছে করত আমীরা আর তার ওই ছেলেটাকেও একেবারে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে। একারণেই সে নওশিনের কাছে যেত না। নিজের ভালোবাসার মানুষকে অন্য একজনের জন্য কাঁদতে দেখাটা তার অহংকারে লাগে।

​কিন্তু যখন সিরাজ খবর পেল যে, নওশিনের বিয়ে হয়ে গেছে এবং সেটা অন্য কেউ নয়! তারই আরেক বন্ধু! আরমান! সিরাজের ভেতরের সেই শান্ত হয়ে থাকা খ্যাপা বাঘটা আবার গর্জে উঠে তখন। যে নওশিনকে পাওয়ার জন্য সে এত বড় একটা র”ক্তার”ক্তি কাণ্ড ঘটিয়ে দিল, সেই নওশিন আমীরা এখন আরমানের ঘরে! সিরাজের ভেতরের সেই হিং*স্র পাগলটা এবার আরমানকে শেষ করার জন্য ছটফট করতে শুরু করে।

তবে এত বড় একটা ধা”ক্কা খাওয়ার পরও সিরাজ আরমান বা আমীরাকে মারল না। কেন যেন তার মনে হলো, এভাবে হুট করে মেরে ফেললে তার ভেতরের প্রতিশোধের আ”গুনটা শান্ত হবে না। সে এক অদ্ভুত খেলা খেলার সিদ্ধান্ত নেয়। কাউকে কিচ্ছু না জানিয়ে, সে দেশ ছেড়ে একদম গায়েব হয়ে যায়। গিয়ে আশ্রয় নেয় লাতিন দক্ষিন আমেরিকা মহাদেশের আর্জেন্টিনায়। সেখানে গিয়ে সে নিজের পুরনো পরিচয় ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে নতুন নাম রাখে 'রিকার্ডো'। শুধু নামই নয়, নিজের ধর্ম বদলে সে জড়িয়ে পড়ে শয়তানের উপাসনার মতো এক অন্ধকার ও ভয়ানক জগতের সাথে। যে কালো গায়ের রঙের কারণে ছোটবেলা থেকে সে অবহেলিত ছিল, টাকার বিনিময়ে সার্জারির করে সেই চেহারা বদলে নিজেকে করে তুলল ধবধবে ফর্সা। আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে সে এতটাই ওপরে উঠে যায় যে, একসময় নিজের নামের আগে পাকাপাকিভাবে বসিয়ে দেয় এক আতঙ্কের নাম 'গ্যাংস্টার ডন রিকার্ডো'।

​এই পুরো রূপান্তরটা তার জন্য মোটেও সহজ কোনো জার্নি ছিল না। একটা অচেনা দেশে, ভিন্ন ভাষা আর ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মাঝে নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে তাকে প্রতি মুহূর্তে মৃ”ত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে। পদে পদে মারামারি, র”ক্তপাত আর বিশ্বাসঘাতকতা পেরিয়ে নিজেকে এই জায়গায় দাঁড় করাতে তার জীবনের দীর্ঘ বারোটা বছর কেটে গিয়েছিল। এই বারো বছরে সে নিজেকে এক মুহূর্তের জন্যও শান্ত হতে দেয়নি, শুধু মনে মনে সেই পুরনো প্রতিশোধের দিন গুনছিল। সে তো এক নওশিনের জন্য কখনও বিয়েও করেনি। মনে-প্রাণে নওশিন ছাড়া আর কাউকে নিজের স্ত্রী হিসেবে কল্পনা করতে পারেনি। নওশিন ছাড়া আর কোনো নারীর নাম নিজের নামের পাশে বসাবে না। কিন্তু নিজের শারীরিক ক্ষুধা মেটানোর জন্য এই দীর্ঘ বারো বছরে সে অসংখ্য নারীকে ছুঁয়েছে, অসংখ্য মেয়ের জীবন নিয়ে খেলেছে।

​আর তখনই অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে জন্ম নেয় এক কন্যাসন্তান, যার নাম সে রাখে 'এলেনা'। এলেনা যখন পৃথিবীতে আসে, রিকার্ডোর ভেতরের অপরাধী মনটা কেমন যেন একটু থমকে দাঁড়ায়। নিজের শরীরের রক্তকে সে ফেলে দিতে পারেনি। কিন্তু এলেনার জন্মদাত্রী সেই মা-কে বাঁচিয়ে রাখাও নিরাপদ মনে করেনি। মে’রে ফেলেছে তাকে। তারপর নিজের মতো করেই সে মেয়েটাকে বড় করতে শুরু করে।

আরশাদের মাধ্যমে সে তায়ানকে নিজের কাছে নিয়ে নেয়। নিজের কাছে আটকে রেখে সে তার মাথায় এই বিষাক্ত বাক্য এমনভাবে ঢুকিয়ে দিল, যা একটা পনেরো বয়সি কিশোরের পুরো পৃথিবীটাকে ওলটপালট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। ​সে তায়ানকে বিশ্বাস করায় বর্তমানে সে যাকে বাবা বলে জানে এবং যার আদর-ভালোবাসায় বড় হচ্ছে, সেই আরমানই আসলে তার আপন বাবা মোস্তাফিজুরের আসল খু*নি। শুধু তাই নয়, নিজের মায়ের চরিত্র নিয়েও রিকার্ডো তার মনে তীব্র বিষ ঢেলে দেয়। তার মা আমীরা মোস্তাফিজুর বেঁচে থাকতেই আরমানের সাথে পরকীয়ায় লিপ্ত হয়ে দুজনে মিলে পরিকল্পনা করে মোস্তাফিজুরকে খু”ন করে এবং সমাজকে দেখানোর জন্য বিয়ের নাটক সাজায়। এসব শুনে স্বাভাবিক ভাবেই তায়ানের মনে ​নিজের জন্মদাত্রী মা আর বর্তমান বাবার প্রতি তীব্র ও ঘৃণ্য ক্ষোভের জন্ম নেয়।

রিকার্ডো তায়ানের ভেতরের মনস্তত্ত্বটাকে এমনভাবে দুমড়ে-মুচড়ে দেয় যে, তায়ান নিজের জন্মদাত্রী মা-কে নিজের শত্রু ভাবতে শুরু করে। তায়ানকে নিজের কাছে আগলে রেখে এই একটা মিথ্যাকেই পরম সত্য হিসেবে তার মগজে গেঁথে দিতে থাকে দীর্ঘ চৌদ্দটি বছর।

নিজের তৈরি সেই অন্ধকার জগতে রিকার্ডো ছেলেটাকে তার নিজের মতো অশুভ শক্তির উপাসনা করাতেও বাকি রাখেনি। বানিয়ে তোলে তাকে হিংস্র হাতিয়ার। ধীরে ধীরে তায়ানের ভেতরের সমস্ত মায়া-দয়া আর বিবেককে পুড়িয়ে ছাই করে দেয় সে। রিকার্ডোর এই নিখুত ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ছেলেটা সব সময়ই এক মানসিক ট্রমার মধ্যে দিন কাটাত। তাকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করা হয়েছে তার আপন বাবার র*ক্তাক্ত লা*শের ওপর দাঁড়িয়ে তার মা আর আরমান এক নোংরা খেলায় মেতেছিল। যে আরমানকে সে পিতৃ ভরসায় জড়িয়ে ধরত, তাকেই তার বাবার খুনি হিসেবে চিনিয়েছে রিকার্ডো। আর যে মায়ের আঁচল ছিল তার সবচেয়ে নিরাপদ ছাদ, সেই মাকে বানিয়েছে পরকীয়া আসক্ত চরিত্রহীন নারী!

—

রিকার্ডো গভীর একটা শ্বাস টানল।

​অনুভা বলল,

_“থামলেন কেন? বলুন।”

​রিকার্ডো তার ফর্সা মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তুলল। তারপর অনুভার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,

_“আমার আর কিছু বলার নেই।”

_“ কি পেলেন এসব করে?”

রিকার্ডো অনুভার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চে’পে আবারও বলল,

_“ কি পেয়েছি? শান্তি পেয়েছি! শান্তি! মোস্তাফিজুর যে ছেলের দায়িত্ব আমাকে না দিয়ে আরমানকে দিয়েছিল, নওশিন যে ছেলের কথা ভেবে আরমানকে বিয়ে করেছিল, আরমান যে ছেলের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য নওশিনকে আমার থেকে কেড়ে নিয়েছিল, আমি ওদের সেই প্রিয় ছেলেকে বছরের পর বছর নিজের কাছে রেখে মগজ ধোলাই করেছি। সেই আদরের সন্তানকেই পিশাচ বানিয়ে ফেরত পাঠিয়েছি। এতগুলো বছর যখন নিজের সন্তানকে পেল তখন সে তাদের জীবনের অভিশাপ হয়ে দাড়াল। আর যতগুলো বছর সেই ছেলে দূরে ছিল তারা শান্তিতে ঘুমিয়ে তোমার মনে হয়? ওদের এই অশান্তিই আমাকে শান্তি দিয়েছে।”

একটু থেমে ঠোঁট প্রসারিত করে হেসে বলল,

_“ আর ও যে কাজটা আমি না চাইতেও করেছে, সেটা হলো তোমার সাথে করা অন্যায়। আরমান চেয়েছিল তার আদরের ভাইঝির সাথে নিজের প্রিয় ছেলের বিয়ে দিয়ে একটা সুখী পরিবার গড়তে। তায়ান সেই সুযোগটাই নিল। ও খুব ভালো করেই জানত, তোমাকে ধোঁকা দিলে, তোমার জীবনটা ধ্বংস করে দিলে আরমান ভেতরে ভেতরে কতটা রক্তক্ষরণ নিয়ে তিল তিল করে ম”রবে। আরমানকে সবচেয়ে বড় শাস্তি দিতেই ও তোমাকে নিজের ছায়ায় টেনে নিয়ে এভাবে মাঝপথে ফেলে চলে গিয়েছে।”

রিকার্ডোর গলায় হঠাৎ তাচ্ছিল্য ফুটে উঠে। সে একটা কুৎসিত হাসি দিয়ে বলল,

_"কিন্তু অসভ্যটা এখন আবার পাল্টি খেয়েছে! এত কিছু করার পর, এখন নাকি ওর আবার পুরনো টান জেগে উঠছে! হা*রামজাদাটা সব কিছু আমার হাতের বাহিরে নিয়ে গেছে!”

বিজ্ঞাপন

——

[ পরদিন সকাল, হসপিটালে]

অনুভা নিজের ফোনের রেকর্ডার বন্ধ করে দিলো। আরাফের জ্ঞান এখনও ফেরেনি। হসপিটালের করিডোরে কমবেশি সকলেই উপস্থিত। কাল রাতের রিকার্ডোর বলা কথা গুলো অনুভা রের্কড করে নিয়ে এসেছিল। সেগুলোই এতক্ষন সবাইকে শোনাল। সবাই স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ। সবার মধ্যে আমীরা বেগম যেন পাথর হয়ে গেছে। তার কল্পনাও ছিল না সিরাজ সামান্য একটা ব্যাপারে এত বড় সাইকোপ্যাথ হয়ে যেতে পারে! একটা পুরনো জেদ আর মোস্তাফিজুরের দেওয়া ওই একটা সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে একটা মানুষ এতটা বিকৃতমনা, এতটা হিংস্র হয়ে উঠতে পারে, তা ভাবতেই তার গা শিউরে উঠছে।

তায়ান তখন আর বেঁচে নেই, সে যেন একটা খোদাই করা পাথরের মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পায়ের তলার মাটি ধসে গেছে তার অনেক আগেই, ঠিক যখন থেকে রেকর্ডারে রিকার্ডোর আসল সত্যটা বাজতে শুরু করেছিল। সে যে সত্যটা জানার জন্য এতদিন অপেক্ষা করছিল, আজ একদম রিকার্ডোর নিজের মুখ থেকেই সে তা শুনেছে। যাকে সে নিজের উদ্ধারকর্তা ভাবত, সেই রিকার্ডো তাকে স্রেফ একটা ঘুঁটি বানিয়ে নিজের নোংরা প্রতিশোধের খেলায় ব্যবহার করেছে! কারও দিকে তাকানোর সাহস নেই। ও কেমন করে যেন ধীরে ধীরে হেটে চলে যাচ্ছে হসপিটাল ছেড়ে। নিজের শরীরের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ পাচ্ছিল না তখন। এক হাতে নিজের বুকটা চে’পে ধরেছে, দম যেন ফুরিয়ে যাচ্ছে ওর। ​এই সত্যিটা জানার জন্য সে এতদিন চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত হয়ে ছিল, আজ সেই সত্যটা জানার পর তার নিজের অস্তিত্বটাই বড্ড ভারী লাগছে। এত বড় সত্যের ওজন সহ্য করার ক্ষমতা যেন তার এই মুহূর্তে নেই। তার পুরো জীবনটাই তাহলে একটা সাজানো মিথ্যার ওপর ভর করে চলে গেল! একটা মস্ত বড় ভুলের চক্রে আটকে সে নিজের জীবনের চৌদ্দটা বছর পার করে দিল! রিকার্ডো নামের ওই সাইকোপ্যাথটা তাকে একটা অন্ধ হাতিয়ার বানিয়ে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেছে! আর সে-ও এক চরম বোকার মতো সেই মিথ্যাকে ধর্ম মেনে নিজেরই আপনজনদের র”ক্তে হাত রাঙিয়েছে!

তায়ান চলে যাচ্ছে দেখে আমীরা বেগম দৌড়ে গেল ছেলের নিকট। গিয়ে চে’পে ধরল তায়ানের বুকের অংশের শার্ট।

_“ কোথায় যাচ্ছিস এখন?” আমীরা বেগম বললেন।

তায়ান চোখ তুলে তাকাল না। ওর চোখ ক্রমশ ঘোলা হয়ে আসছে। তাকাবে কি করে মায়ের দিকে? ও যে এতদিন মা-কে দুশ্চরিত্রা বলে এসেছে! তাকাতে পারবে না কোনো মতেই। আমীরা বেগম আবারও বললেন,

_“ তাকা আমার দিকে!”

তায়ান তবু তাকায় না। ওর ঠোঁট কাঁপছে এখন। বুকের ভেতরটা বারবার মোচর দিয়ে উঠছে। ও মায়ের মুখের দিকে না তাকিয়েই, নিজের ভেতরের এই অবর্ণনীয় হাহাকার আর বুকের কাঁপন থামাতে হঠাৎ করেই দুহাতে মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। নিষ্পাপ শৈশবের মতো করেই মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল ছেলেটা! সবাই তাকিয়ে আছে সেদিকে। অনুভা তাকিয়ে আছে মেঝের দিকে।

তায়ান শুধু কাঁদলোই, মুখে কোনো বাক্য উচ্চারণ করার শক্তি তার নেই। আমীরা বেগম এক হাতে ছেলের পিঠে রাখল। ছেলের উপর আর কোনো অভিযোগ সে রাখল না। তার ছেলে এখন নিজেই ভেতরে ভেতরে জ্বলে যাচ্ছে। শুধু নিস্তেজ গলায় বলল,

_“ এবার না হয় নিজের আসল খু’নিকে শাস্তি দে! দেখি কতটা ক্ষমতা তোর! যে প্রতিশোধের আগুন তুই আরমান আহসানির উপর জ্বালিয়েছিস সেটা এবার তার উপর প্রয়োগ কর, যে তোকে হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলেছে।”

তায়ান কোনো কথা বলল না। চলে গেল হসপিটাল ছেড়ে। অনুভা একপলক তাকাল সেদিকে। চোখ সরিয়ে নেয় সঙ্গে সঙ্গেই। গতরাতে আরাফের র*ক্তের গ্রুপে পাওয়ার পরই সে আমীরা বেগমের সঙ্গে বাড়ি ফিরে যায়। সেখান থেকে যায় সেই গোডাউনে, যেখানে তায়ানের গার্ডরা তার বাবাকে আটকে রেখেছিল, যেখানে তার ছেলেকে গু’লি করেছিল।

অনুভা চোখ বন্ধ করে বুক ভরে শ্বাস নেয়। মাথাটা পাগল পাগল লাগছে তার। শাড়ীতে এখনও র*ক্ত লেগে আছে। শান্ত দাড়িয়ে আছে এক পাশে। অনুভা সেদিকে তাকাল। সারারাত জেগে চোখ-মুখ বসে গেছে ছেলেটার! কার জন্য এসব করছে সে? তার আর তার বাচ্চার জন্য। শান্তর দিকে তাকালে অনুভার কান্না পায়। তাকে ভালোবাসতে না পারার আফসোসে কান্না পায়। অনুভা যাকে ভালোবাসল সে নিজের প্রতিশোধের গুটি হিসেবে অনুভাকে ব্যবহার করল! অথচ সেই মানুষটাও নাকি অনুভাকে ভালোবাসে! ভালোবাসা ঠিক কত ধরনের হয়? সিরাজও তো তার বড় আম্মুকে ভালোবেসেই এগুলো করেছে! এত জঘন্য খেলা খেলেছে! এটা আদোতে ভালোবাসা? সবার ভালোবাসার ধরণ শান্তর মতো কেন হয় না? জানে না অনুভা। ভাবতেও চায় না।

ভাবনার মাঝেই শান্ত এসে অনুভার পাশে দাড়ায়,

_“ ফ্রেশ হয়ে আসো। র’ক্ত লেগে আছে।”

_“ আমি কী কোনো ভুল করেছি?” অনুভা শান্তর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল। শান্ত বুঝতে পারল কেন এই প্রশ্ন করছে মেয়েটা। সে অনুভার র’ক্ত লেগে থাকা নরম হাত আলত করে দু’আঙ্গুলে স্পর্শ করল।

তারপর বলল,

_“ তোমার এই হাত এসবের জন্য নয়, তবে আজ যেটা করেছ তাতে কোনো ভুল নেই। সে এসবের যোগ্য ছিল। তুমি কোনো ভুল করোনি।”

অনুভা স্লান হাসল। যেন শান্তর কথায় সে হালকা হলো। তারপর আবার বড় করে শ্বাস নিয়ে বলল,

_“ আপনি বাড়ি ফিরে যান। আপনাকে ক্লান্ত লাগছে।”

_“ ক্লান্ত তো তুমিও। তুমি যাও আমরা আছি এখানে। তোমার ফ্রেশ হওয়া দরকার।”

অনুভা কিছু বলার আগেই ডক্টর এসে জানাল আরাফের জ্ঞান ফিরেছে। শান্ত, অনুভা, অলি, আরিজ দৌড়ে গেল কেভিনে। আরাফ তার দূর্বল ছোট্ট হাতে চোখ কচলাচ্ছে হাই তুলছে। যেন কত সময় পর সাহেবের ঘুম ভাঙল। অনুভা কাছে গেল না ছেলের। কেভিনের এক পাশে দাড়িয়ে রইলো। তার হাতে তার বাবা অপবিত্র নোংরা রক্ত লেগে আছে। এই হাতে সে নিজের নিষ্পাপ বাচ্চাকে স্পর্শ করবে না। আরিজ অলি শান্ত বাচ্চাটাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে। সবার মধ্যে থেকে আরাফ আধো চোখে শান্তর দিকেই তাকাল। তার ছোট্ট মাথাটা ভার হয়ে আছে। শান্তর দিকে তাকিয়ে অস্পষ্ট গলায় ভেঙে ভেঙে ডাকল,

_“ পা-পা!”

শান্তর বুকের ভেতরটায় যেন ঠান্ডা জল বয়ে গেল৷ আরাফের এই ডাকে কি আছে কে জানে! শান্ত এই ডাকেই থমকে যায়। এই ডাকেই তার শান্তি। সে ঝুকে আরাফের দু’গালে অসংখ চুমু দিলো।

_“ পাপা! পাপা এসেছি দেখো। পাপার সাথে আর লুকোচুরি খেলবে না কেমন? পাপা তোমাকে ছাড়া বাঁচবে না একদম।”

আরাফ হাত বাড়িয়ে শান্ত গলা জড়িয়ে ধরে। উঠে শান্তর কোলে উঠতে চাইলেই পায়ে টান পড়ে। কুঁচকে ওঠে আরাফের মুখটা।

_“ পাপা, ব্যতা।”

আরিজ আরাফের হাতে কিছু চকলেট ধরিয়ে দিয়ে বলল,

_“ কিচ্ছু হয়নি চাচ্চু, এই দেখো কত চকলেট এনেছি তোমার জন্য।”

অনুভা কেভিনের একপাশ থেকে আরিজের দিকে তাকিয়ে একটু শক্ত গলায় বলল,

_“ চাচ্চু বলবে না ওকে। মামা হও তুমি ওর। শুধু মামা।”

আরাফ আর শান্ত সেসবে কান দিলো না। সে তার ছোট্ট হাত দুটো দিয়ে শান্তর গলা জড়িয়ে ধরে আছে। মাত্র দু’দিন আরাফ আই-সি-ইউতে ছিল তবু শান্তর মনে হচ্ছে কতকাল সে এই কোমল হাতের স্পর্শ পায়নি! নসিবে সৃষ্টিকর্তা কি লিখে রেখে তা অজানা শান্তর, তবে নিজের ভবিষ্যত এই বাচ্চাকে ছাড়া কল্পনাও করতে পারে না।

বিজ্ঞাপন
রক্ত রেখার আড়ালে গল্পটি আয়েশা শেখ রিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে মোড়ানো থ্রিলার উপন্যাস