_“আসব?”
দরজার কাছ থেকে ভেসে আসা অচেনা কণ্ঠস্বর শুনে হাফিজা বেগম হাতের কাজ থামিয়ে ঘুরে তাকাল। মাটির ঘরের চৌকাঠ জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক। মাথায় ক্যাপ আর মুখে মাস্ক পরা থাকায় তার অবয়ব স্পষ্ট নয়। হাফিজা তাকে চিনতে পারল না তাকে। চোখের দৃষ্টিতে কিছুটা সংশয় নিয়ে প্রশ্ন করল,
_“আপনে ক্যাডা?”
আগন্তুক যুবক হাফিজার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
_“হাশিম… হাশিম চাচা কোথায়?”
_“বাজারে গেছে। ক্যান, কী দরকার?” হাফিজার কণ্ঠে এবার সামান্য কৌতূহল।
_“আসবে কখন?” আবারও পাল্টা প্রশ্ন করল যুবক। তার কণ্ঠে এক ধরণের তাড়া, যেন প্রতিটি মুহূর্তই তার জন্য খুব জরুরি।
হাফিজা ঘরের ভেতরের দিকে ইঙ্গিত করে বলল,
_“আইব একটু পরেই, আসনের সময় হইছে। বসেন।”
মহিলা তায়ানকে বসার জায়গা করে দিল। যুবক চুপচাপ সেখানে গিয়ে বসল। তার গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছিল। অগত্যা সে হাফিজার কাছে এক গ্লাস পানি চাইল। পানি খাওয়ার জন্য যখন সে মুখের মাস্কটা আলগা করল, হাফিজা বেশ মনোযোগ দিয়ে তার মুখের দিকে তাকাল। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেও যুবকের চেনা কোনো অবয়ব সে মনে করতে পারল না।
কিছুক্ষণ পরই হাশিম আলী বাজারের ব্যাগ হাতে বাড়ির উঠোন পেরিয়ে ঘরের ভেতর পা রাখল। কিন্তু চৌকাঠ পার হতেই তার চোখ গিয়ে পড়ল বসে থাকা যুবকের ওপর। নিমিষেই থমকে গেল হাশিম। মুখে মাস্ক পড়ে থাকা সত্ত্বেও এই চওড়া কাঁধ আর চোখের তীব্র দৃষ্টি চিনতে তার এক মুহূর্তও ভুল হলো না। হাতের ব্যাগটা একপাশে রেখে সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল। ভাঙা গলায় আবেগ মিশিয়ে বলল,
_“ তায়ান বাবা, তুমি? কবে আসছো?”
তায়ান হুট করে কোনো উত্তর দিল না। খানিকটা সময় নিয়ে সে ধীরপায়ে উঠে দাঁড়াল। হাশিমের চেয়ে বেশ লম্বা তায়ান। তায়ান একটু ঝুকলো, তারপর হাশিমের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। অত্যন্ত গম্ভীর আর শান্ত কণ্ঠে তায়ান বলল,
_“যেদিন আরমান আহসানি মারা গেল… সেদিন।”
কথাটা শোনামাত্র হাশিমের মুখের চওড়া হাসিটা এক ঝটকায় নিভে গেল। অপ্রস্তুত হয়ে সে আমতা আমতা করে কোনোমতে বলল, _“কষ্টদায়ক! কিন্তু… তোমার ইচ্ছে তো পূরণ হইছে। সে তোমার বাপেরে মারছিল…”
_“ চোপপপ!” হাশিমের বাক্য শেষ হতে না হতেই ছেলেটার ভেতর থেকে আচমকা হিংস্র বাঘের মতো হুঙ্কার বেরিয়ে এল। ঘরের মাটির দেয়ালগুলো যেন সেই গর্জনে কেঁপে উঠল। তায়ানের এই আকস্মিক ও রুদ্রমূর্তি দেখে হাশিম আর হাফিজা, দুজনেই আতঙ্কে শিউরে উঠে।
তায়ান এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করতে চাইল না। চোখের পলকে কালো কুচকুচে রি”ভল”বার বের করে আনল সে। হাশিম কিছু বুঝে ওঠার আগেই অস্ত্রের হিমশীতল নলটা শক্ত করে চেপে ধরল তার কপালে। চোখের মণি ভয়ে স্থির হয়ে গেল হাশিমের। তায়ান দাঁতে দাঁত চেপে, হিসহিসিয়ে ওঠা কণ্ঠে বলল,
_ “সেদিন কেন মিথ্যা বলেছিলি? হোয়াই? সেদিন তুই সত্য কথা বললে আজ আমার জীবনটা অন্য কোথাও মোড় নিতো!”
হাশিক চোখ বন্ধ করে কাঁপা কাঁপা গলায় বলতে লাগল,
_“ আমি…আমি সত্য কথা বলেছিলাম বাবা! ওই লোকই তোমার বাপ আর পরিবাররে মাই’রা ফেলাইয়া তোমার মায়’রে বিয়া করছে। তোমার মায়ের লগে ওর পরকীয়ার সম্পর্ক…”
“ ঠাসস…”
তায়ানের আর ধৈর্য হলো না বাক্যটা শেষ পর্যন্ত শুনবার। যেখানে সে নিজে আজ সব সত্য জেনে গেছে, সেখানে এই লোকটার মুখ থেকে নতুন করে বানিয়ে বলা নোংরা গল্প শোনার কোনো মানেই হয় না। তায়ানের আঙুল ট্রিগার চেপে ধরতে এক সেকেন্ড সময় নিলো না।
বু”লেটের আ”ঘাতে হাশিম ছিটকে মাটিতে পড়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত য”ন্ত্রণায় ছটফট করে ছিটকে ওঠা র”ক্তের দাগ মেঝেতে লেপ্টে দিয়ে নি”থর হয়ে গেল সে। তার গোঙানি আর আকুতি দুটোই চিরতরে স্তব্ধ।
স্বামীর এই নৃ’শংস মৃ’ত্যু দেখে হাফিজা বেগম কলিজা ফাটা এক চি”ৎকার দিয়ে উঠতে চাইল। কিন্তু তার আগেই তায়ান হাতের তপ্ত রি”ভলবারটা সমেত ঝটকা দিয়ে পেছন ঘুরল। হাফিজার কণ্ঠনালীতেই আটকে গেল সেই আর্তনাদ। আগে থেকেই ভয়ে পাথর হয়ে থাকা মহিলাটি এবার যেন একেবারে জমে বরফ হয়ে গেল। তার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছিল, চোখের মণি দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম। কিন্তু ঠিক তখনই হাফিজাকে চরম মাত্রায় অবাক করে দিয়ে তায়ান আচমকা শান্ত হয়ে গেল। যেন এইমাত্র একটা জলজ্যান্ত মানুষকে সে খুন করেনি, এমনই এক স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সে আবার কাঠের চেয়ারটায় ধপ করে বসে পড়ল। তারপর মুখের মাস্কটা সরিয়ে ঠিক আগের মতোই শান্ত গলায় বলল,
_“ আরেক গ্লাস পানি দিন।”
হাফিজা অবশ, কাঁপা হাতে কোনোমতে গ্লাসে পানি ঢালল। মৃ”ত্যুর এই বিভীষিকার মাঝে দাঁড়িয়েও সে তায়ানের অবাধ্য হতে পারল না। কাঁপতে কাঁপতে গ্লাসটা এগিয়ে দিতেই তায়ান সেটা কেড়ে নেওয়ার মতো করে নিল ছেলেটা। এক নিঃশ্বাসে ঢকঢক করে পুরোটা পানি গিলে ফেলল। তার তৃষ্ণা যেন মেটার নয়।
পানি খেতে খেতেই তায়ানের স্মৃতির পাতাগুলো উল্টে গেল সেদিন রাতের ঘটনায়। অনুভাকে যেদিন সে নিজের করে পেয়েছিল, সেই রাতে। সেদিন বাসর রাতে নিজের সদ্য হওয়া বউকে একা রেখে সে ছুটে এসেছিল এই প্রত্যন্ত গ্রামের বাড়িটায়। সেদিন হাফিজা বাড়িতে ছিল না, হাশিম একাই ছিল।
এই হাশিম আলী বছরের পর বছর ধরে তায়ানের বাবা মোস্তাফিজুরের সংসারে কাজ করেছে। সেই অন্দরমহলে কখন কী ঘটেছে, তার সবকিছুই হাশিমের নখদর্পণে থাকার কথা ছিল। সে মনে মনে এক চিলতে আশা পুষে রেখেছিল, হয়তো রিকার্ডোর বলা সব কথা মিথ্যা! হয়তো এই লোকটার থেকে অন্য কিছু শুনতে সে পাবে। সেই শেষ আশাটার হাত ধরেই হাশিমের ঠিকানা জোগাড় করে এখানে ছুটে এসেছিল সে। কিন্তু সেদিন এই ঘরে বসে উল্টোটা ঘটেছিল। রিকার্ডো যা বলেছিল, হাশিম তার চেয়েও জঘন্য, নোংরা আর কুৎসিত ভাষায় আরমান এবং তায়ানের নিজের মায়ের চরিত্রকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিল। সেদিন হাশিমের সেই বি”ষাক্ত কথাগুলো শোনার পর তায়ানের ভেতরের জেদ আর প্রতিশোধের আগুন নিভে যাওয়ার বদলে আরও হাজার গুণ বেড়ে গিয়েছিল।
আজ স্বয়ং রিকার্ডোর মুখ থেকেই যে সমস্ত সত্যটা বেরিয়ে এসেছে। সেদিন হাশিম অবলীলায় এই মিথ্যা গুলো বলেছিল। তায়ানের সামনে কুয়াশার মতো জমে থাকা সব ধাঁধা এক নিমেষে কেটে গেছে। সিরাজ একা সেই ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারত না, তার প্রয়োজন ছিল ঘরের ভেতরের কোনো বিশ্বস্ত বিশ্বাসঘাতকের। আর হাশিমই ছিল সেই চাবিকাঠি। টাকার লোভে কিংবা অন্য কোনো অন্ধ স্বার্থে, হাশিম সেদিন রিকার্ডোর হাতের পুতুল হয়ে তায়ানের বাবা ও পুরো পরিবারকে মৃ”ত্যুর মুখে ঠেলে দিতে সহযোগিতা করেছিল। খু”নি রিকার্ডো যদি অপরাধী হয়, তবে তার পেছনের এই সহযোগীও সমান অপরাধে অপরাধী। অপরাধের দাঁড়িপাল্লায় সহযোগী আর হ”ত্যাকারী, দুজনই সমান দোষে দোষী। আর সেই কারণেই হাশিমের এই পরিণতি আজ অবধারিত ছিল। তায়ান হাফিজাকে সংক্ষিপ্ত করে সবটা বলে উঠে দাঁড়াল। পকেট থেকে কয়েক বান্ডিল টাকার নোট বের করে সে হাফিজার সামনে টেবিলটার ওপর রেখে দিল। তারপর আর একটি মুহূর্তও সেখানে নষ্ট না করে, ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে বাইরের বেড়িয়ে গেল।
হাফিজা বেগম কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে রইল। মেঝেতে পড়ে থাকা স্বামীর নি”থর দেহটার দিকে তাকিয়ে তার চোখ থেকে এক ফোঁটা জলও নামল না। উল্টো তায়ানের মুখে হাশিমের পুরনো পাপের খতিয়ান শুনে লোকটার প্রতি তার ভেতরের জমে থাকা ঘৃণাটা এক লহমায় বহুগুণ বেড়ে গেল। হাশিমের ওপর হাফিজার অসন্তোষ অবশ্য নতুন কিছু নয়, এই ক্ষোভের শিকড় অনেক গভীরে। অনেক কষ্ট করে, অভাবের সংসারে লড়াই করে দুটো মেয়েকে বিয়ে দিয়ে বিদায় করেছিল হাফিজা। আশা ছিল হয়তো লোকটা একটু শুধরাবে, সংসারে মন দেবে। কিন্তু মাঝবয়সে এসেও তার মদ্যপানের নেশা, পরনারীর নোংরা আসক্তি কমেনি। টেবিলে পড়ে থাকা টাকার বান্ডিলগুলোর দিকে তাকাতে তাকাতে হাফিজার মনে হলো, হাশিম তার পাপের উপার্জনে সংসার চালিয়েছে, আর আজ নিজের পাপের মাশুল দিয়েই এই টাকা রেখে গেছে।
——
হাশিমের বাড়ি থেকে বেরিয়ে তায়ান এক মুহূর্তের জন্যও কোথাও থামেনি। সোজা সেই পুরনো গোডাউনটায় চলে এসেছে। কিন্তু সেখানে পা রাখতেই এক বীভৎস দৃশ্য তায়ানের চোখ আটকে দিল।
মেঝেতে পড়ে আছে আরশাদের নিথর দেহ, তার দুটো হাত শরীর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। রক্তাক্ত এই মরদেহের দিকে তাকিয়ে তায়ানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে নির্মম তৃপ্তির রেখা ফুটে উঠল। কাজটা অনুভার। অনুভা না করলেও তায়ান করত। হয়তো এর চেয়েও ভয়ানক ভাবে করত। মেয়ের জন্য আবারও পার পেয়ে গেল লোকটা। কিন্তু আরশাদের এই নৃশংস পরিণতি দেখার পর তায়ানের চোখ জোড়া চঞ্চল হয়ে উঠল অন্য কারোর খোঁজে। সে পুরো গোডাউনের আনাচে-কানাচে তীক্ষ্ণ নজর বুলাল, তবে রিকার্ডোর কোনো চিহ্নও সেখানে দেখতে পেল না। রিকার্ডো নেই! তায়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে তীব্র আক্রোশে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রধান গার্ডের কলার চেপে ধরার মতো করে হুঙ্কার দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
_“রিকার্ডো কোথায়?”
গার্ডের কপালে ভয়ের চটচটে ঘাম। সে মাথা নিচু করে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,
_“ পালিয়েছে…”
_“পালিয়েছে মানে? হোয়াট দ্য হেল ডু ইউ মিন?” তায়ানের চোখের মণি দুটো রাগে লাল হয়ে উঠেছে। সে প্রতিটি শব্দ চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
_“ তোমরা এতজন সশস্ত্র লোক এখানে সিকিউরিটি দিচ্ছো, তারপরও একটা মানুষ এখান থেকে এস্কেপ করে কী করে? কী করছিলে তোমরা? হোয়াট ওয়ার ইউ ডুইং!” গর্জে ওঠে একদম!
গার্ড এবার ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলল,
_“ হয়তো… হয়তো ভেতরের কেউ তাকে হেল্প করেছে।”
গার্ডের কলার চে’পে ধরা তায়ানের শক্তপোক্ত কবজিটা মটমট করে উঠল। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তায়ান সজোরে পাশের কংক্রিটের দেয়ালে একটা শক্ত ঘু”ষি বসিয়ে দিল। পরক্ষনেই কল আসলো রিকোর।
দেয়ালে মারা ঘুষিটার চোট থেকে টপটপ করে র”ক্ত ঝরছে মেঝেতে। ঠিক সেই মুহূর্তেই তার পকেটে থাকা ফোনটা তীব্র শব্দে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা রিকো নামটা দেখেই সময় নষ্ট না করে কানের ব্লুটুথ ডিভাইসটা সচল করে কলটা রিসিভ করল। ওপাশ থেকে রিকোর চেনা, কিছুটা উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, _“কোথায় তুমি? তোমার ছেলের জ্ঞান ফিরেছে, তুমি কি আসবে না?”
ছেলের জ্ঞান ফেরার খবরটা কান দিয়ে মগজে পৌঁছানো মাত্রই
তার শক্ত হয়ে থাকা সুঠাম শরীরটা আচমকাই শিথিল হয়ে এলো।
ভেতরের জ্ব”লন্ত আ”গুন সব কিছু যেন এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। চোখের সেই হিং”স্র লাভা গলিয়ে সেখানে জায়গা করে নিল এক অদ্ভুত পিতৃস্নেহের ব্যাকুলতা। তায়ান তার ভারী, গম্ভীর কণ্ঠস্বরটাকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক আর শান্ত করার চেষ্টা করল। রিকোকে উদ্দেশ্য করে সে বলল,
_“আসছি আমি। আই অ্যাম কামিং। তুমি এক কাজ করো, রিকো… বেবিদের যত রকমের টয়েজ আর খাবার আছে, সব কিনে এনে ওর কেবিনটা ভরে ফেলো। ও যেন একটুও মন খারাপ করে না থাকে। আই ওয়ান্ট হিম হ্যাপি।” কথাটা শেষ করেই তায়ান দ্রুতপায়ে গোডাউনের বাইরে নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
তায়ানের ওমন হুকুম শুনে ফোনের ওপাশে থাকা রিকো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে অসহায়ত্বের হাসি। এই ছেলেটা যেন কোনোদিন বদলাবে না! তায়ান তাকে বন্ধু হিসেবে কতটা গণ্য করে তা জানা নেই, তবে কাজের খাতিরে আর নিজের দরকারে রিকোকে তার সবসময় বন্ধুর চেয়ে বেশি ‘পার্সোনাল বডিগার্ড’ বা ব্যক্তিগত দেখভালকারী মনে হয়। যখন যা মনে চায়, অবলীলায় হুকুম জারি করে বসে। অথচ তায়ানের এই রু”ক্ষ, হুকুমপ্রিয় স্বভাবটার পেছনে যে কী গভীর একটা ভালোবাসা আর নির্ভরতা লুকিয়ে আছে, তা রিকোর চেয়ে ভালো আর কে-ই বা জানে! ফোনটা পকেটে রেখে রিকো আর দেরি করল না, তায়ানের কথামতো খেলনা আর খাবারের খোঁজে হাসপাতালের করিডোর ধরে পা বাড়াল।
—
অনুভা নিজের র”ক্তাক্ত শাড়িটা পরিবর্তন করে, ভালোমতো ফ্রেশ হয়ে তবেই সে ছেলের কাছে এসেছে । কেবিনে এসে অনুভা প্রথমেই শান্তকে বিদায় করল। ওর নিজেরও বিশ্রামের দরকার। তাই অনুভা কিছুটা জোর করেই শান্তকে আরিজের সঙ্গে বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছে। এখন এই নিঝুম সাদা ধবধবে কেবিনটায় কেবল তিনজন মানুষ। বিছানায় শুয়ে থাকা আরাফ, আর তার শিয়রে বসে থাকা অলি আর অনুভা। অনুভা বিছানার পাশে আলতো করে বসে পরম মমতায় আরাফের মুখে দুধের ফিডারটা ধরে আছে। ছোট্ট আরাফ আধো-বোজা চোখে শান্ত হয়ে ফিডার টানছে, আর অনুভা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার কলিজার টুকরোর দিকে। আরাফ ফিডার টানার ফাঁকে ফাঁকে একটু পরপর বড় বড় চোখ করে পাশে বসে থাকা অলির দিকে তাকাচ্ছে। অলির সাথে তার সম্পর্কটা এখনও ঠিকঠাক জমে ওঠেনি। মেয়েটা যেটুকু সময় ওকে কাছে পাওয়ার চেষ্টা করত, মাঝেসাঝে টেনেটুনে নিজের কোলে নিত, তা অনেকটা জোর করেই নিতে হতো। আরাফ নিজে থেকে অলির কাছে খুব একটা ধরা দিতে চায় না, চেনা মানুষদের বাইরে একটু গুটিয়েই থাকে বাচ্চাটা। অলিকে বোধহয় ওর অকারণেই পছন্দ হয় না।
আরাফের অমন পিটপিট করে তাকিয়ে থাকা দেখে অলি একটু হাসল। অনুভার দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,
_“দেখো আপু, ও কেমন বড় বড় চোখ করে আমার দিকে তাকাচ্ছে। মনে হচ্ছে কত রেগে আছে আমার উপর।”
কথাটা বলেই অলি আরাফের দিকে একটু ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে ওর ছোট্ট নরম গালটা আলতো করে ছুঁয়ে দিল। পরম আদরে বলল,
_“ আমার সোনা তুলতুলে বাবাটা! তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে বাড়ি চলো, তারপর আমরা ঘুরতে যাবো।”
অনুভা তো আজকাল হাসেই না৷ তবু এখন অলির কথা শুনে অনুভার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। সে ফিডারটা আরাফের মুখে ঠিকঠাক ধরে রেখেই অলির দিকে তাকাল।
_“ রেগে নেই, ও মনে মনে ভাবছে, এই খালামণিটা তো আমাকে পেলেই শুধু কোলে নেওয়ার জন্য অস্থির হয়ে থাকে, এখন কেন শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে!”
কথাটা শেষ করে অনুভা আবার আরাফের দিকে তাকাল। তার কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে বলল,
_“আমার লক্ষ্মী বাবাটা রাগ করেনি তাই না?”
অলি আরাফের ওই চাউনি দেখে ফিক করে হেসে বলল,
_“ইশশশ... আমার মেয়ে বাবু হলে ওর সঙ্গে বিয়ে দিবো।”
বোনের শুনে অনুভাও না হেসে পারল না।
_“এজন্যই বোধহয় তোকে দেখতে পারে না।”
তাদের খুনসুটির মাঝেই হসপিটালের সেই শান্ত শান্ত পরিবেশটা ওলটপালট করে দিয়ে ঘরের ভেতর ঠিক টর্নেডোর মতোই প্রবেশ করল তায়ান। তার চোখে-মুখে এক অদ্ভুত অস্থিরতা আর তাড়া।
কিন্তু কেবিনে ঢুকেই তায়ান থমকে দাঁড়াল। থমকে গেল তার ভেতরের সেই ঝোড়ো গতিও। সে দেখল, অনুভা বিছানার একপাশ হয়ে শুয়ে তার নিজের ছোট্ট অংশের মুখে ফিডার ধরে বসে আছে। দৃশ্যটা তায়ানের বুকের ভেতর কোথাও যেন একটা তীব্র মোচড় দিল। সে অপলক দৃষ্টিতে দৃশ্যটার দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে রইল।
এদিকে তায়ানকে ঘরে ঢুকতে দেখেই অনুভার মুখের সেই এক চিলতে মিষ্টি হাসি নিমেষেই মিলিয়ে গেল। তার পুরো শরীর শক্ত হয়ে উঠল। তায়ান যখন ধীর পায়ে আরাফের বিছানার দিকে এগিয়ে আসতে চাইল, তখন অনুভা আর সেখানে বসে থাকল না। তায়ানের উপস্থিতি সহ্য করতে না পেরে আরাফের কাছ থেকে সরে দাঁড়াল।
তায়ান ধীর পায়ে আরাফের একদম কাছে এসে দাঁড়াল। তারপর বিছানার পাশে এক হাঁটু গেড়ে নিচু হয়ে, পরম আকুলতায় ঝুকে এলো তার সন্তানের দিকে। যেন এই একটা মুহূর্তের জন্যই সে এতক্ষণ চাতক পাখির মতো ছটফট করছিল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে আরাফের ছোট্ট গলার কাছে মুখ ডুবিয়ে দিয়ে বুক ভরে বাচ্চাটার গায়ের সেই চেনা, মিষ্টি ঘ্রাণ টেনে নিল। এই একটা ঘ্রাণে যেন তায়ানের বুকের ভেতরের সবটুকু ঝড়, সবটুকু অপরাধবোধ আর অস্থিরতা এক নিমেষে শান্ত হয়ে গেল। পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি ভুলে সে শুধু তার এই ছোট্ট অংশটাকে নিজের অস্তিত্ব দিয়ে অনুভব করতে চাইল। অনুভা একটু দূরে দাঁড়িয়ে পাথরের মতো শক্ত চোখে তায়ানের এই ব্যাকুলতা দেখছিল। পুরো কেবিনটায় তখন শুধু তায়ানের ভারী হয়ে আসা শ্বাসের শব্দ।
তায়ান ওর ছেলেটার কপাল, দু’গালে স্নেহভরা চুমু খায়। আরাফ কেবল ড্যাবড্যাবিয়ে বড় বড় চোখ করে তায়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। তার সেই অবুঝ চাউনি ঘুরে ঘুরে আবার গিয়ে পড়ছে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ের ওপর। এই চেনা-অচেনার দোলাচলের মাঝেই ছোট্ট বাচ্চাটার অবুঝ মনে বোধহয় হঠাৎ শান্তর মুখটা ভেসে উঠল। যে মুখটা তাকে সবসময় আগলে রাখে। মায়ের পরে অত্যন্ত পরিচিত মুখ তার কাচে। সে তার আধো আধো, ভাঙা কণ্ঠে মায়ের দিকে তাকিয়ে হাত দুটো একটু বাড়িয়ে দিয়ে বলে উঠল,
_“মা... পাপা...”
আরাফের মুখের ওই একটি শব্দ যেন তায়ানের বুকে তীরের মতো এসে বিঁধল। মুখটা কেমন মলিন আর ফ্যাকাসে হয়ে গেল! বুকের ভেতরটা যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠল তার। সে খুব ভালো করেই জানে, তার নিজের জন্ম দেওয়া এই ছেলেটা 'পাপা' বলে কাকে বোঝাচ্ছে। এই ডাকটা তার জন্য নয়, বরং শান্তর জন্য। নিজের সন্তানের মুখে অন্য কারোর জন্য এই আকুলতা তায়ানের সহ্য হলো না।
তায়ান আরাফের কাছ থেকে ধীরে ধীরে উঠে এসে, সমস্ত দ্বিধা আর দূরত্ব পেরিয়ে সোজা এগিয়ে গেল অনুভার দিকে। একদম কাছাকাছি গিয়ে সে স্থির হয়ে দাঁড়াল এবং অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অনুভার চোখের দিকে। যেন সেই চোখে সে নিজের হারানো অধিকার কিংবা কোনো ক্ষমার আভাস খুঁজছে। তায়ানের এমন অতর্কিত আর গভীর চাউনিতে অনুভার ভেতরটা কেমন অস্বস্তিতে মোচড় দিয়ে উঠল। শুধু অস্বস্তিই নয়, পরক্ষণেই তীব্র বিরক্তি আর ক্ষোভ গ্রাস করল তাকে। অনুভা এমন দমবন্ধকর অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে তায়ানকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে পাশ কাটিয়ে সরে আসতে চাইল। কিন্তু অনুভা এক পা বাড়াতেই তায়ান আচমকা অনুভার হাতটা শক্ত করে টেনে ধরে ফেলে। পরক্ষনেই অনুভা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তায়ান তাকে নিজের বুকের মাঝে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
তায়ানের চোখ দুটো মুহূর্তেই জল ছলছল করে ওঠে। সেই টলমল করা জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ার উপক্রম হয়। ওদিকে তায়ানের এই অতর্কিত আলিঙ্গনে অনুভার পুরো শরীর ঘৃণায় রি রি করে ওঠে। সে ছটফট করে নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকে। তায়ানের এই স্পর্শ, এই বুকের ধড়ফড়ানি, সবকিছু তার কাছে এখন অসহ্য, ভীষণ দমবন্ধকর লাগছে। কিন্তু তায়ান অনুভাকে ছাড়ল না। তার ভেতরের সমস্ত অহংকার, জেদ আর পুরুষালি দম্ভ যেন আজ ধুলোয় মিশে গেছে। সে অনুভাকে ধরে রেখেই ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমে গেল। মেঝেতে দু'হাঁটু গেড়ে বসে সে অনুভার হাঁটু দুটো শক্ত করে ঝাপটে ধরল। একজন নিঃস্ব ভিখারির মতো অনুভার পা জড়িয়ে ধরে ভাঙা গলায় আকুল হয়ে বলতে লাগল,
_“ক্ষমা চাইব না আর। আমি জানি আমি ক্ষমার অযোগ্য। শেষবারের মতো শুধু তোকে চাই অনু। একদিন হলেও তুই আমাকে ভালোবেসেছিলি, সেই ভালোবাসার বিনিময়ে হলেও আমাকে আর একটা বার সুযোগ দে। আমি কোনোদিন তোকে স্পর্শ করব না, কোনোদিন স্বামীর অধিকারও দাবি করব না। গোলাম হয়ে থাকব তোর, তবু শেষবারের মতো একটা সুযোগ দে। চৌদ্দ বছর তোর থেকে দূরে ছিলাম, আর সম্ভব না। আই সোয়্যার, আই কান্ট সার্ভাইভ দিস পেইন!” তায়ানের কণ্ঠস্বর কান্নায় বুজে আসে। চৌদ্দ বছরের জমানো দীর্ঘশ্বাস আর বুকফাটা যন্ত্রণা যেন এক হয়ে ঝরে পড়তে লাগল অনুভার পায়ের কাছে।
তায়ানের আকুলতা অনুভাকে একটুও দোলা দিল না, বরং অতীতের স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠতেই তার পুরো শরীর কেঁপে উঠল। সে আলতো করে নিজের পা দুটো তায়ানের বাঁধন থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দু'কদম পিছিয়ে গেল। তার চোখ দুটো ততক্ষণে নোনা জলে ভরে উঠেছে, তবে সেই জলে কোনো দুর্বলতা নেই, আছে তীব্র দহন।
অনুভা ওপর থেকে নিচের দিকে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা তায়ানের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চরম তাচ্ছিল্যের হাসি। তারপর পাথরের মতো শক্ত কণ্ঠে সে বলতে লাগল,
_“সেদিন সকালে... ঠিক এভাবেই জড়িয়ে ধরেছিলাম আপনাকে।
এই আপনি যেভাবে আজ আমার পায়ে পড়েছেন, ঠিক সেভাবেই আমিও পায়ে পড়েছিলাম আপনার। যতবার আপনি আমাকে ঝাটকা মেরে সরিয়ে দিচ্ছিলেন, ততবার আমি আরও শক্ত করে আপনাকে ঝাপটে ধরে একটা কথাই বলছিলাম ‘ছেড়ে যাবেন না আমাকে।' একটা ভিক্ষুকের মতো আপনার কাছে আমাদের ভালোবাসার ভিক্ষা চাইছিলাম আমি।” বলতে বলতে অনুভার গলাটা বুজে এল। চোখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়লেও তার কণ্ঠস্বর চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল তায়ানের ওপর।
_“আপনি সেদিন আমার দিকে একটিবারের জন্যও ফিরে তাকাননি, তায়ান ভাই! ওদের সামনে আমাকে ঘাড় ধা*ক্কা দিয়ে আপনার বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন। একটা বারও কি সেদিন আপনার ওই পাষাণ মনে এই প্রশ্ন জাগেনি, যাকে আপনি জ্যান্ত আ*গুনে ঠেলে দিলেন, সে রাস্তায় মরে গেল নাকি বেঁচে রইল? আমার... আমার কাছে সেদিন একটা রিকশা ভাড়া করে বাড়ি ফেরার মতোও কোনো পয়সা ছিল না ! আমি তো... আমি তো এত জঘন্য পরিস্থিতির যোগ্য ছিলাম না, তায়ান ভাই!”
অনুভা আর বলতে পারল না। তীব্র অপমানে আর অভিমানে তার বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করতে লাগল। সে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল, যেন তায়ানের এই ভেঙে পড়া রূপটা সে দেখতেও ঘৃণা বোধ করছে সে।
_“ আমি নিজের মধ্যে ছিলাম না অনু! বিশ্বাস কর, আমি সেদিন নিজের মধ্যে ছিলাম না! প্রতিশোধের আগুন, অন্ধ জেদ আর ভুল বোঝাবুঝি আমার মস্তিষ্কটাকে পুরো অবশ করে দিয়েছিল। আমি কী করছিলাম, কেন করছিলাম, কোনো বোধ বুদ্ধি সেদিন আমার ছিল না। আমি জানি আমার কোনো ক্ষমা নেই। কিন্তু তুই ছাড়া যে আমার আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই ! ফিরিয়ে দিস না আমায়…বাঁচবো না তোকে ছাড়া।” তায়ান অনুভার ফুঁপিয়ে ওঠে। তার পুরো শরীরটা তখন অপরাধবোধ আর হারানোর ভয়ে কাঁপছে।
_“ ফিরিয়ে দেওয়া তো আপনিই শিখিয়েছেন, তায়ান ভাই। নইলে আপনাকে পাওয়ার সাধ তো আমার সেই কিশোরী বয়স থেকেই। প্রতিশোধে অন্ধ হয়ে ধ্বংস করার জন্য আমাকেই আপনার চোখে পড়েছিল?
যে মেয়েটা আপনাকে নিজের আকাশ ভাবত, তাকে এক রাতে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ বানিয়ে পরের দিন সকালে কীভাবে ওভাবে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দিলেন? আপনার সেই তথাকথিত প্রতিশোধের আ”গুনে আমার কী দোষ ছিল বলুন? আমার অপরাধ কি শুধু এইটুকুই ছিল যে, আমি আপনাকে আমার জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছিলাম? কী চমৎকার আপনার প্রতিশোধের ধরণ, তাই না? স্বামী হয়ে একটা রাত শুধু আমাকে ভোগ করলেন, আর পরদিন সকালেই আবর্জনার মতো ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। অথচ... অথচ তার কিছুদিন পরেই যখন আমি জানতে পারলাম যে আপনার সেই এক রাতের লালসার অংশ, আপনারই র”ক্ত আমার গর্ভে বেড়ে উঠছে, তখন আমার কেমন লেগেছিল, একটা বার ভেবেছেন?”
যে সন্তানকে আপনি আজ নিজের অংশ বলে বুকে জড়াতে চাইছেন, সে অন্য একজনকে বাবা হিসেবে জানে। যে মানুষটা আমার এই জঘন্যতম পরিস্থিতিতে নিজের নাম আর পরিচয় দিয়ে আমাদের বাঁচিয়ে নিয়েছে, আরাফ তাকেই নিজের বাবা মানে! আপনার এই এক রাতের পাপের কোনো অধিকার নেই আমার ছেলের ওপর। আপনার এই কান্না, এই অনুশোচনা, সবকিছু এখন আমার কাছে নাটক আর সস্তা অভিনয় ছাড়া আর কিচ্ছু মনে হচ্ছে না। যে মানুষ নিজের অহংকার আর জেদের জন্য একটা মেয়ের পুরো জীবনটা এক রাতে ছারখার করে দিতে পারে, তার মুখে এই মরণ ভিক্ষা আর ভালোবাসার বুলি বড্ড বেমানান লাগে! যদি বলেন…আমাকে ছাড়া বাঁচবেন না, তাহলে আমিও সেদিনের মতো বলব, ম’রে যান। বাঁচতে না পারলে, ম’রে যান।”
তায়ান বলল,
_“ সৃষ্টিকর্তাও তো একসময় পাপীকে ক্ষমা করে দেন ! তিনিও তো অনুতপ্ত বান্দাকে ফিরিয়ে দেন না। এতটা কঠোর হোস না অনু! আমাকে হাজারটা শাস্তি দে। যে ভুল আমি করেছি, তার খেসারত আমি আজীবন দেব। তুই আমাকে স্বামী বলে না মানিস, আমার ছোঁয়াও তোকে কোনোদিন সহ্য করতে হবে না। শুধু আমার সন্তানটাকে একটু দূর থেকে দেখার অধিকার দে। আই বেগ ইউ অনু... আমাকে আর এই নরকযন্ত্রণার দিকে ঠেলে দিস না!”
অনুভা ঝটকা মেরে তায়ানের কলার চেপে ধরল দু’হাতে।
_“ সৃষ্টিকর্তার দোহাই দেবেন না ! একদম দেবেন না! খোদা তাকেই ক্ষমা করেন, যে নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়। আর আপনি? আপনি তো ভুল করেননি, আপনি সচেতনভাবে অপরাধ করেছিলেন! একটা মেয়ের সরলতাকে পুঁজি করে তাকে এক রাতের জন্য নিজের লালসা আর প্রতিশোধের গুটি বানিয়েছিলেন। সৃষ্টিকর্তা কি আপনাকে এই অধিকার দিয়েছিলেন?”
অনুভার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে,
_“খোদা ক্ষমা করবেন কিনা আমি জানি না। করলেও এই অনুভা আপনাকে কোনোদিন ক্ষমা করবে না । খোদা অন্তর্যামী, তিনি খুব ভালো করেই জানেন সেই বিভীষিকাময় দিনগুলো আমাকে ঠিক কতটা পুড়িয়ে ছাই করেছে। এই যন্ত্রণার প্রতিটা ক্ষত আমি নিজের ভেতরে বয়ে বেড়িয়েছি…আপনার এই কান্নার জল যদি আজ গঙ্গা হয়েও বয়ে যায়, তাও আমার সেই একটা সকালের অপমানের দাগ ধুয়ে মুছে সাফ করতে পারবে না!
সৃষ্টিকর্তা অনেক দয়ালু, কিন্তু আমি সৃষ্টিকর্তা নই। আমি রক্তে মাংশে গড়া সাধারণ মানু্ষ! আমার কষ্ট ভোগ করার ক্ষমতা কম, ধৈর্য্য ধারণের ক্ষমতা কম, তেমনি ক্ষমা করার মতো উদারতাও আমার নেই! তায়ানের দেওয়া আগুনে পুড়ে খাক হয়ে যাওয়া এই অনুভা বড্ড নিষ্ঠুর হয়ে গেছে।”
অনুভা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। হনহন করে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো। আসার পথে দরজায় স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শান্তর সঙ্গে একবার চোখাচোখি হলো ওর। অনুভার চোখে তখনো জল, কিন্তু চোয়াল শক্ত। তাদের মাঝে কোনো বাক্যবিনিময় হলো না। শান্তও অনুভাকে ডাকল না, শুধু এক বুক নীরবতা নিয়ে তাকে চলে যেতে দেখল মেয়েটাকে।
ওদিকে তায়ানও মেঝে থেকে ধীরপায়ে উঠে দাঁড়াল। তার ভেতরের সবটুকু শক্তি যেন আজ নিঃশেষ হয়ে গেছে। কারো দিকে না তাকিয়ে, একদম এলোমেলো পায়ে সে হসপিটালের করিডোর পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। একটা খালি বেঞ্চিতে ও নির্জীবের মতো বসে পড়ল। তার পিছু পিছু শান্তও এলো। কোনো কথা না বাড়িয়ে সে-ও তায়ানের পাশে এসে বসল। তায়ান পাশ ফিরে শান্তকে একপলক দেখল। তারপর শূন্য দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিস্পৃহ কণ্ঠে বলল,
_“কেন চলে যাচ্ছ না আমাদের জীবন থেকে?”
শান্ত এক চিলতে মুচকি হাসল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
_“আমি তো চলেই গিয়েছিলাম তায়ান। ছেড়েই দিয়েছিলাম তোমার প্রেয়সীকে। তুমি কেন তাকে ধরে রাখতে পারলে না?”
_“আবার ছেড়ে দাও।” তায়ানের কণ্ঠস্বর এবার পাথরের মতো শক্ত শোনাল।
_“একবার ছেড়ে দিয়েই তো তোমার সন্তানের পাপা হয়ে গেলাম আবার যে হবো না তার কি কোনো মানে হয়?” শান্তর কন্ঠে স্পষ্ট উপহাস।
তায়ানের চোখ দুটো হিংস্র হয়ে উঠল, চোয়াল শক্ত করে সে শান্তর দিকে তাকিয়ে বলল,
_“আমি প্রয়োজনে আমার স্ত্রীকে মেরে ফেলব, তবু ও শুধু আমারই থাকবে।”
শান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তায়ানের এই জেদ আর হিংস্রতা তাকে আর অবাক করে না। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে দুঃখী মানুষের মতো বলল,
_“ধ্বংস করাই তো শিখেছ শুধু।”
তায়ান আর কিছু বলল না। এক গভীর নীরবতা নেমে এলো দুজনের মাঝে। সেই নীরবতা ভেঙে আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্ত আবারও বলল,
_“তোমার আর আমার পার্থক্যটা কোথায় জানো? তুমি বহু বছর ভালোবেসেও যে চোখের জল ঝরাতে পেরেছ, আমি সেই চোখের সামান্য মলিনতাও সহ্য করতে পারি না। ভালোবাসার দাবি নিয়ে এক রাতের পরই তুমি যাকে কলুষিত করে রাস্তায় ফেলে দিয়েছ, আমি একই ছাদের নিচে থেকেও কোনোদিন তার দিকে নোংরা দৃষ্টিতে তাকানোর সাহস পাইনি। তুমি নিজের সন্তানকে আমার সন্তান ভেবে একটা নিষ্পাপ শিশুর ওপর অত্যাচার করেছ… আর আমি, সব সত্য জেনেও তোমার সন্তানকে নিজের সন্তানের পরিচয় দিয়ে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছি।”