শান্তর কথায় তায়ান আর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারল না। মাথাটা বুকের ওপর ঝুঁকে পড়ল। দুই হাতের তালুতে মুখটা ঢেকে সে চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর এক পরাজিত মানুষের মতো হাত দুটো সরিয়ে, শান্তর দিকে না তাকিয়েই ভাঙা এবং তীব্র যন্ত্রণাদায়ক কণ্ঠে বলতে লাগল,
_“তুমি ঠিক বলেছ ... তোমার মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিটা বাক্যই সত্য। আমি তার একটাও অস্বীকার করছি না। তুমি সত্যিই একজন মহান মানুষ, আর আমি এক ঘৃণ্য অপরাধী। তবে... আমাদের মধ্যে আরও কিছু পার্থক্য আছে, যা তুমি বা কেউ কোনোদিন রিয়ালাইজ করতে পারবে না।
তুমি তোমার বাবা-মায়ের স্নেহের ছায়ায়, আদরে আর নিশ্চিন্তে বড় হয়েছ। ইউ হ্যাড আ বিউটিফুল লাইফ! অথচ আমি? আমি আমার বাবাকে কোনোদিন চোখেই দেখিনি! চৌদ্দ বছর যাকে নির্দিধায় বাবা ডেকেছি হঠাৎ একদিন শুনতে হয়েছে সেই আমার আপন জন্মদাতাকে খু”ন করেছে! পনেরো বছর বয়স থেকে এক ভিনদেশে, এক নরকের অন্ধকারে একা একা বড় হয়েছি আমি। তোমাকে কখনো এই নরকযন্ত্রণা বুকে নিয়ে বাঁচতে হয়নি যে, নিজের জন্মদাত্রী মায়ের পরকীয়ার সম্পর্কটাকে জেতানোর জন্য... বাবা আর পুরো পরিবারকে নৃশংসভাবে খু”ন করা হয়েছে! আই গ্রু আপ ইন হেল, শান্ত! যেখানে প্রতিটা মুহূর্ত আমার কানে শুধু প্রতিশোধের চিৎকার ভেসে আসত। আমাকে দিনে দিনে একটা খু”নের মেশিন বানোনো হয়েছিল।
তায়ান আবারও বলতে লাগল,
_“বছরের পর বছর ধরে একটা মানুষ আমার মগজে শুধু বিষ ঢেলেছে, আমাকে অন্ধকারের উপাসক বানিয়েছে। একটা ফেক রিয়েলিটির ওপর দাঁড়িয়ে আমি শুধু প্রতিশোধের আ*গুনে পুড়েছি। আই ওয়াজ জাস্ট আ পাপেট! আমার হাত দিয়ে শুধু অশুভ আর ধ্বংস ছড়ানো হয়েছে। তুমি পবিত্রতা দিয়ে ভালোবাসতে শিখেছ, কারণ সমাজ তোমাকে সেটাই শিখিয়েছে। আমার শৈশব, আমার কৈশোর, আমার পুরো অস্তিত্বটাই কেউ একজন জঘন্যভাবে কলুষিত করে দিয়েছিল।
আলো দেখানো হয়নি আমাকে, তাই আলো ছড়াতেও পারিনি। আই ওনলি নো হাউ টু ডেসট্রয়! আমি শুধু ধ্বংসের আগুনে পুড়েছি, আর নিজের অজান্তেই সেই আগুনে আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকেও পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছি।”
তায়ান বেঞ্চিটায় হেলান দিয়ে ফের আকাশ পানে তাকাল। দীর্ঘশ্বাস টেনে বলল,
_“ নিজের ভুলের কারণে আমি নিজেই আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নরকযন্ত্রণা দিয়েছি—ডু ইউ হ্যাভ অ্যানি আইডিয়া হাউ পেইনফুল দ্যাট ইজ? একটা মানুষ নিজের হাতে নিজের ভালোবাসাকে খু”ন করেছে, এটা জানার পর বেঁচে থাকাটা কতটা যন্ত্রণাদায়ক, তা তুমি হয়তো একটু হলেও কল্পনা করতে পারো। তুমি জাস্ট একটা ফেক ডিভোর্স পেপার বানিয়ে ওকে দিয়েছিলে, যেন ও মুভ অন করতে পারে। আর সেটা জেনেই ও তোমার উপর আস্থা হারাতে বসেছিল। সেই এক রাতের যন্ত্রনাই তো তুমি নিতে পারোনি, তাহলে ভাবো আমি কীসের মধ্যে আছি!
অনুর প্রতিটা ক্ষত, ওর প্রতিটা চোখের জল আর ওর এই নষ্ট হয়ে যাওয়া জীবনের জন্য দায়ী আর কেউ নয়... আমি! এই তায়ান! যে হাত দিয়ে ওকে আগলে রাখার কথা ছিল, সেই হাত দিয়েই আমি ওর পুরো আকাশটা কেড়ে নিয়েছি। সৃষ্টিকর্তা আমাকে এর শাস্তি হিসেবে মৃ*ত্যু দিলেও হয়তো আমি স্বস্তি পেতাম! অন্তত নিজের ভেতরের এই গিল্ট আর এই রিগ্রেট আমাকে প্রতিটা সেকেন্ড জ্যান্ত পুড়িয়ে মারতে পারবে না।
মোট কথা হলো, আমি আমার নিজের যত্নে গড়া ফুল নিজের পায়েই পিষে শেষ করে দিয়েছি। না কেউ আমাকে নিজের স্বার্থে আমাকে 'গুটি' হিসেবে ব্যবহার করত, আর না তো আমাকে এই বাড়ি-ঘর ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করত! আর না তো আজ আমার জীবনে এমন একটা কালো দিন আসত!
যে মেয়েটাকে আমি ছ’টা বছর এত আড়াল করে, এত যত্নে আগলে রেখেছিলাম... তাকে আমি বাকিটা জীবনও এভাবেই নিজের বুকের ভেতর রাখতে পারতাম। আই কুড হ্যাভ গিভেন হার দ্য বেস্ট লাইফ, বাট আই চোজ টু গিভ হার হেল!
একটু থামল তায়ান। তারপর দম নিয়ে আবারও বলল,
_“ এটা কাকতালীয় ছিল যে আমি দেশে এসেই ওই পুরো ফ্যামিলির ওপর ধ্বংসযজ্ঞটা চালিয়ে দিইনি। কারণ আমার মগজে এত বছর ধরে এটাই ঢোকানো হয়েছিল, এটা করাই স্বাভাবিক ছিল এন্ড সেই ক্ষমতাও আমার ছিল। আজ তুমি যেখানে দাঁড়িয়ে আমাকে জাজ করছ, জাস্ট একবার নিজের মনকে জিজ্ঞেস করো তো, আমার জায়গায় তুমি থাকলে, তুমি ঠিক কতটা সৎ থাকতে পারতে?”
তায়ান শান্তর দিকে আবারও তাকাল। ওর চোখে প্রশ্ন। ও নিজেকে কোনোদিন, কখনও এভাবে কারও সামনে মেলে ধরেনি। নিজের ভেতরের অন্ধকার, নিজের অতীত কিংবা কোনো দুর্বলতা সবকিছু সবসময় এক দুর্ভেদ্য দেয়ালের পেছনে লুকিয়ে রাখাই তার নিয়ম। এমনকি তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু রিকোর কাছেও সে কখনও এতটা স্পষ্ট বা উন্মুক্ত হয়নি। নিজের ভেতরের আবেগ, কান্না কিংবা অসহ্য কষ্টগুলো কীভাবে প্রকাশ করতে হয় সেটাও সে জানে না। অথচ আজ, অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তার ভেতরে জমিয়ে রাখা অনেক কিছুই নিজের প্রতিপক্ষ শান্তকে উগরে দিলো। তায়ানের ভেতরের সেই লৌহমানব আজ যেন এক চরম পরাজিত, নিঃস্ব সত্তা হয়ে শান্তর পাশে বসে একটা প্রশ্ন করে বসলো।
তায়ানের শেষ প্রশ্নটা শান্তর বুকের ভেতর গিয়ে সপাটে আঘাত করল। খানিকটা নড়েচড়ে বসল সে। তার ভেতরের বিবেকটা তায়ানের কথার অবাধ্য হতে পারল না। নাহ, তায়ানের যুক্তি একদম নিখুঁত, ওর কথায় বিন্দুমাত্র ভুল নেই। পরিস্থিতি মানুষকে তৈরি করে। যে ক’টা বছর ধরে ছেলেটাকে মিথ্যা বিশ্বাসের মধ্যে বড় করা হয়েছে, সেখানে যেকোনো সাধারণ মানুষের মস্তিষ্ক বিকৃত হয়ে যাওয়ার কথা। শান্ত নিজেও যদি তায়ানের জায়গায় থাকত, তবে সেও ওই একই অন্ধকারের চোরাবালিতে তলিয়ে যেত। সে-ও হয়তো প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য রিকার্ডোর হাতের একটা অন্ধ ধ্বংসের অস্ত্র ছাড়া আর কিছুই হতে পারত না।
তায়ান এখনও উত্তরের আশায় শান্তর দিকে তাকানো। শান্তও তাকিয়ে ছিল। এবার আরও দৃষ্টি গভীর করে বলল,
_“ হয়তো তোমার কথাই ঠিক। তোমার জায়গায় থাকলে আমিও হয়তো ধ্বংসের অস্ত্র হতাম। হয়তো এর চেয়েও খারাপ হতাম।
তোমার ওপর যে অন্যায় হয়েছে, তার জন্য আমি তোমাকে দোষ দিচ্ছি না। কিন্তু মাহভিনকে কেন টানলে এখানে? ও তো তোমার কোনো ক্ষতি করেনি! রিকার্ডো তোমার মস্তিস্ক বিষিয়ে দিয়েছে বলে তুমি নিজের সবচেয়ে বড় আশ্রয়টাকেই বিষাক্ত করে দিলে? তুমি পুরো পৃথিবীর ওপর প্রতিশোধ নিতে পারতে, কিন্তু যে মেয়েটা তোমাকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসল, তাকে কেন এতটা কষ্ট দিলে?”
তায়ান নিজের ডান হাতের তালুটা দেখল কিছুক্ষণ, তারপর একটা ক্লান্ত শ্বাস ফেলে বলল,
_“আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।”
শান্তও তায়ানের দৃষ্টি অনুসরণ করে তায়ানের তালুর দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল,
_“ কিসের ভয়?”
_“ ওর নিয়ে আসা পবিত্রতা যদি আমার ভেতরের আ*ক্রোশটা ঠান্ডা করে দেয়! সেই ভয়…”
_“তাহলে ওকে স্পর্শ করেছিলে কেন?” শান্ত সঙ্গে সঙ্গে বলল।
তায়ান কপাল কুঁচকে শান্তর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
_“ তাতে তোমার কি?”
শান্ত দমল না। সরাসরি তায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
_“ তাতে আমার কী, সেটা বড় কথা নয় তায়ান। বড় কথা হলো, তুমি নিজের ভেতরের আক্রোশটা বাঁচিয়ে রাখার জন্য একটা মেয়ের জীবনকে স্রেফ খেলনা বানিয়েছ। আর যাকে তুমি খেলনা বানিয়েছ, তাকে আমি একটা-দুটো দিন নয়, ছয় বছর ধরে চেয়ে আসছি। শেষমেশ যেদিন ও তোমার হয়েই গেল, তখন অন্তত এই একটা কথা ভেবে নিজেকে বুঝিয়েছিলাম মাহভিন যাকে চেয়েছে, শেষ পর্যন্ত তাকে তো পেয়েছে। ও অন্তত সুখে থাকবে।
আমি নিজের ভালোবাসা বিসর্জন দিয়েছিলাম ওর হাসির জন্য। ওকে পাওয়ার জন্য আমি নিজের সবটুকু দিতে রাজি ছিলাম, আর তুমি তাকে পেয়েও স্রেফ নিজের জেদের জন্য পায়ে ঠেলে দিলে!”
তায়ান নিরব। মুখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে আছে।
_“ ও তোমাকে ভালোবেসে কোনো ভুল করেনি। ও জাস্ট একটা ভুল মানুষকে ভালোবেসে ফেলেছিল। এখন তুমি আফসোস করো আর নিজেকে কাপুরুষ বলো তাতে ওর চোখের ঘৃণা এক ফোঁটাও কমবে না। ও তোমাকে এতটাই ঘৃণা করে যে তোমার অস্তিত্বও সে পৃথিবীতে আনতে চায়নি! আসার পরেও তাকে কাছে টানতে চায়নি। আজ যে নিজের সন্তান বলে জাহির করছো তা তোমার সামনে বসে থাকা মানুষটার জন্যই।” শেষ কথা বলে শান্তর মুখে এক রকম তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠলো।
_“ এর জন্য আমি তোমার কাছে ঋণী।” তায়ান বলল।
কিন্তু ওর এই বুকে, এই শিরায়-উপশিরায় যে বিষাক্ত ভালোবাসাটা মিশে আছে, তার নাম তায়ান! অনুভা আমাকে যত ঘৃণা-ই করুক না কেন, ওই এক রাতের স্মৃতি ও নিজের অস্তিত্ব থেকে কোনোদিন মুছে ফেলতে পারবে না। অনুভা আমাকে ঘৃণা করে না, শুধু বিশ্বাস করতে ভয় পায়। তাই তুমি চলে যাও আমাদের জীবন থেকে।”
মানুষ নিজের পছন্দের জিনিসের বেলায় স্বাভাবিক ভাবেই স্বার্থপর। তাই দুজনে একে অপরের অনুভূতি বুঝেও বুঝলো না। তায়ানের কথায় শান্ত জবাব দিলো।
_“ অসম্ভব! চলে তুমি যাও…কারণ তুমি নিজেই স্বীকার করছো মাহভিন তোমাকে বিশ্বাস করে না।”
_“ ওকে মাহভিন ডাকবে না। এই নাম আমি রেখেছি।” তায়ান রেগে বলল।
_“তুমি রেখেছ তো কী হয়েছে? বার্থ সার্টিফিকেটে সিল মেরে এনেছ নাকি যে আর কেউ ডাকতে পারবে না?”
_“ ওর আরেকটা নাম আছে ওটাই ডাকবে। এটা নয়।”
তায়ানের ধমক শুনে শান্ত দমে যাওয়া তো দূর, উল্টো ঠোঁটের কোণে একটা জেদি হাসি ফুটে উঠল। সে বলল,
_“একশোবার ডাকব। ওকে যখন প্রথম দেখি, ওর ব্যাপারে প্রথমবার জানতে পারি, তখন ওর এই নামটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি টেনেছিল। তুমি তো শুধু নামটাই রেখেছ তায়ান, এর অর্থটা কখনো বোঝার চেষ্টা করোনি। মাহভিন মানে জানো....”
তায়ান শান্তকে থামিয়ে দিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে নির্বিকার বলল,
_“ সূর্যের মতো উজ্জল আলো! আর এই আলোটাকেই আমি ভয় পেয়েছি।”
শান্ত তায়ানের কথার পিঠে কোনো পাল্টা যুক্তি দিল না। সে ধীরে ধীরে উপর-নিচ মাথা নেড়ে স্বগতোক্তির মতো আওড়ালো,
_“ আর আমি এই আলোটাকেই দূর থেকে দেখে ভালোবেসেছি। এত ভালোবেসেছি যে ওকে দেখার জন্য দু’বার ফাইনাল পরীক্ষায় ইচ্ছে করে ফেইল করেছি।”
তায়ানের এতক্ষণের চড়া ভাবটা কেটে গিয়ে চোখেমুখে ঘোর অবিশ্বাস ফুটে উঠল। ও ভ্রু কুঁচকে বলল,
_“হোয়াট? পরীক্ষায় ফেইল করেছ মানে?”
_“পাগলামি মনে হচ্ছে নাহ? হ্যাঁ, তখন হয়তো একটু পাগলই ছিলাম। আমি জানতাম, আমি পাশ করে বেরিয়ে গেলে ওকে রোজ দেখার এই সুযোগটা আর থাকবে না। তাই ইচ্ছে করে খাতায় সাদা পৃষ্ঠা জমা দিয়ে চলে আসতাম।”
তায়ান লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল,
_“ আমিও ওকে ফিডার খাইয়ে বড় করেছি।”
_“ আমি ওর বাচ্চাকে ফিডার খাইয়ে বড় করেছি!” শান্তও বলল।
_“ ওটা আমারও বাচ্চা।”
_“ কিন্তু আমাকে পাপা ডাকে।”
ওরা দুজন কি বলছে না বলছে নিজেরাও জানে না। শুধু আনমনে বলেই যাচ্ছে। তবে এবার তায়ান ঘুরে শান্তর শার্টের কলারটা এক হাতে চেপে ধরে বলল,
_“ তুমি কি থামবে? তুমি এখান থেকে চলে যাও, একা থাকতে দাও আমায়।”
শান্তর কলার চেপে ধরা সত্ত্বেও ওর চোখে কোনো ভয়ের বালাই দেখা গেল না। সে তায়ানের হাতের ওপর নিজের হাতটা আলতো করে রাখল, তারপর একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল,
_“ সত্য মেনে নিতে সবারই একটু কষ্ট হয়, তোমারও হচ্ছে। তবে এটাই সত্য। আরও নাও প্রতিশোধ।”
তায়ানের ধৈর্য বরাবরই কম। শান্তর মুখের কথায় ও নিয়ন্ত্র হারালো। নিমেষে ভেঙে চুরমার করে দিল। আচমকা নিজের কপাল দিয়ে শান্তর কপালে আঘাত করে বসল। পাথরের মতো দুটো কপাল একত্রিত হয়ে 'ঠাস' করে একটা শব্দ হলো। দুজনের কপালই ফুলে উঠে। শান্তর ধৈর্যও এবার বাঁধ ভাঙল। তায়ানের কলারটা দুহাতে চেপে ধরল। তায়ানও থেমে রইলো না। দুজনের মধ্যেই আগাম যুদ্ধের প্রস্ততি। রিকো গাড়ি নিয়ে হসপিটালের দিকেই আসছে। দূর থেকেই দেখছে হসপিটালে সামনের বেঞ্চিতে বসে থাকা দু’জনের কান্ড। গাড়ি ব্রেক করে দৌড়ে এসে দুজনকে ছাড়িয়ে দিয়ে বলল,
_“ অসুস্থ বাচ্চাকে হসপিটালের বেডে শুইয়ে, তোমরা এখানে বাচ্চাদের মতো ঝগড়া করছো? তোমাদের কি লজ্জা নেই।”
দুজনেই রিকোর দিকে তাকাল। আবার দুজন দুজনের দিকে তাকাল। শান্ত রাগি চোখে তায়ানকে এক মুহূর্ত দেখে হনহনিয়ে হসপিটালে চলে গেল। রিকো তায়ানকে কিছু বলার আগেই তায়ান রুক্ষ গলায় বলল,
_“ তোমাকে কি বলেছিলাম? এনেছো? কোথায় সেগুলো?” বলতে বলতে নজর গেল তার গাড়ির দিকে। দেখল দু’জন গার্ড খেলনা আর খাবারের বক্স বহন করে হসপিটালের ভেতরের দিকে যাচ্ছে। তায়ান শান্ত হয়ে রিকোর দিকে তাকিয়ে বলল,
_“ ওদের বলো ফ্লাইট বুক করতে। আমি আর্জেন্টিনায় যাবো।”
_“ কেন?”
_“ রিকার্ডো পালিয়েছে।”
_“ ও যে আর্জেন্টিনায়ই আছে সেটা কীভাবে জানো?”
_“ আমি জানি ও কোথায় থাকতে পারে।”
———
রাত হয়ে গেছে। কেবিনের একপাশের সিঙ্গল বেডে অলি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। অন্যপাশের বড় বেডটাতে শুয়ে আছে আরাফ আর অনুভা। আরাফ দু-হাত দু-দিকে ছড়িয়ে দিয়ে একদম নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। ওর চারপাশটা হরেক রকমের খেলনায় ভর্তি। এত এত খেলনা আর প্রিয় সব খাবার পেয়েও, অসুস্থতার কারণে সেগুলোর দিকে হাত বাড়িয়ে খেলতে না পারার দুঃখে মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে গুনগুনিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে ছেলেটা।
কিন্তু অনুভার চোখে ঘুম নেই। সে একদৃষ্টিতে সামনের সাদা দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর মাথা তখন ডক্টরটাকে নিয়ে ভাবছে। আরাফ ঘুমের ঘোরে একটু নড়েচড়ে উঠে অনুভার আরেকটু কাছ ঘেঁষে এল, ছোট্ট মুখটা গুটিসুটি মেরে লুকিয়ে রাখল মায়ের বুকের ওমে। ঠিক সেই মুহূর্তেই কেবিনের দরজার লকটা হালকা শব্দ করে খুলে গেল। আচমকা এই শব্দে অনুভার পুরো শরীর শক্ত হয়ে উঠল। সে তড়িঘড়ি করে আরাফকে আলতো করে নিজের বুকের সাথে আরও চেপে ধরল, আর ঝটপট বন্ধ করে ফেলল চোখ দুটো। পর মুহূর্তেই অতি পরিচিত কোলনের সুবাস ভেসে আসতেই অনুভা বুঝে গেল তার ধারণাই ঠিক। এত রাতে এই লোকটা ছাড়া আর কেউ আসবে না কেবিনে। এই মুহূর্তে লোকটার মুখোমুখি হওয়া কিংবা কোনো রকম তর্ক বা বিতণ্ডায় জড়ানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে অনুভার নেই। তাই সে নিঃশ্বাস স্বাভাবিক রেখে একদম গভীর ঘুমের ভান করে পড়ে রইল।
তায়ান দরজাটা আলত করে বন্ধ করে দিয়ে একদম নিঃশব্দে, ধীর পায়ে বেডের দিকে এগিয়ে এলো। কেবিনের মৃদু আলোয় সে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকল বিছানায় শুয়ে থাকা ওই দুটি মানুষের দিকে। যারা একাধারে তার পুরো পৃথিবী, অথচ তাদেরকে সে নিজের হাতেই তীব্র কষ্টের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
আরাফ মুখটা ঘুরিয়ে অনুভার বুকের একদম কাছাকাছি গুটিসুটি মেরে শুয়ে ছিল, তাই তায়ান আলতো করে বেডের ওপর ভর দিয়ে একটু বেশিই ঝুঁকে এল। অনুভার গায়ের চেনা সুবাসটা ওর নাকে এলো। শ্বাসটা তায়ান আরও লম্বা করে নেয়। তারপর অতি সাবধানে, যেন বিন্দুমাত্র নড়াচড়াতেও ঘুম ভেঙে না যায় ছেলের, সেভাবে তাশভানের ছোট্ট নরম গালে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। বাবার ঠোঁটের সেই আদুরে স্পর্শ পেয়ে ঘুমের ঘোরেই আরাফ ছোট্ট একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। ছেলের গালে চুমু খেয়ে তায়ান যখন মুখটা সামান্য তুলল, তখন ওর তপ্ত নিশ্বাস সরাসরি এসে আছড়ে পড়ছে অনুভার গলার কাছে। অনুভা চোখ বন্ধ করে থাকলেও স্পষ্ট টের পাচ্ছিল, তায়ানের দৃষ্টি এখন আর আরাফের ওপর নেই, তা আটকে গেছে অনুভার বন্ধ চোখের পাতায়।
অনুভার ইচ্ছা করছিল এক ঝটকায় চোখ দুটো খুলে তায়ানের কলারটা চেপে ধরে ওর গালে তীব্র একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিতে। তবে সে তা করল না। সে খুব ভালো করেই জানে, এখন চোখ খুললেই একটা অনাকাঙ্ক্ষিত অশান্তি শুরু হবে, যা এই হসপিটালের কেবিনে ঘুমিয়ে থাকা অসুস্থ ছেলেটার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাবে। তাই ভেতরের সমস্ত ঘৃণা, ক্ষোভকে জোর করে চেপে রেখে, সে পাথরের মতো স্থির হয়ে চোখ বন্ধ করেই পড়ে রইল। ওদিকে তায়ানও অনুভার মুখের ওপর ঝুঁকে থেকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, যেন সে অনুভার এই কৃত্রিম ঘুমের পেছনের অস্থিরতাটুকু মাপার চেষ্টা করছে। অনুভা যে
ঘুমায়নি তা তায়ানের তীক্ষ্ণ নজর এড়ানো গেল না। তার চোখের পাতার সামান্য কাঁপন আর বুকের দ্রুত ওঠানামা দেখেই তায়ান ধরে ফেলল মেয়েটা ঘুমিয়ে থাকার ব্যর্থ অভিনয় করছে। তায়ানের ঠোঁটের কোণে একটা ম্লান, বিষাদময় হাসি ফুটে উঠল। শান্তর কথাই ঠিক। অনুভা হয়তো আসলেই তায়ানকে অনেক বেশি ঘৃণা করে!
তায়ান একটা বেড থেকে ললিপপের প্যাকেট ছিঁড়ে ঘুমন্ত তাশভানের মুখে দিয়ে কেবিন ছেড়ে বেড়িয়ে আসলো। আসতে আসতে তার মনে পড়ল প্রথম দিনের কথা। সেদিন তার ছেলেটা তায়ানের থেকে ললিপপ নেওয়ার জন্য কেমন আকুল হয়ে পড়েছিল! অথচ সে বুঝতেও পারেনি এটা তার ছেলে!
ওদিকে আরাফ ঘুমন্ত অবস্থায়ও ললিপপটা মুখের কাছে পেতেই ও অবচেতন মনেই সেটা চুষতে শুরু করে দিয়েছে। যেন এতক্ষণের না-খেলতে পারার সব দুঃখ এই ঘুমের ঘোরেই দূর হয়ে গেছে। ললিপপটা পেয়ে ও ঘুমিয়ে থেকেও ভীষণ খুশি। অনুভা চোখ মেলে ছেলের এই কাণ্ড দেখে বেশ বিরক্ত হলো। তায়ানের দেওয়া কোনো জিনিসই সে এই ঘরে দেখতে চায় না, কিন্তু ছেলের এই নিষ্পাপ খুশিটুকু কাড়ার উপায়ও তার নেই।
অনুভার মনের ভেতরটা তখন ছটফট করছিল। সে আস্তে করে আরাফের পাশ থেকে উঠে দাঁড়াল। তারপর ধীর পায়ে কেবিনের বাইরে বেরিয়ে এল। সোজা গিয়ে ঢুকল আরাফের চিকিৎসা করা সেই ডক্টরের রুমে। তার সামনে গিয়ে চেয়ারটা টেনে বসে অনুভা বলল,
_“আমি আসলে সেই ডক্টরের চেম্বারে যেতে চাই, যিনি আমার ছেলের রক্তের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। আসলে পরিস্থিতির কারণে ওনাকে ধন্যবাদ জানানো হয়নি।”
ডক্টর নিজের ফাইল থেকে চোখ তুলে অনুভার দিকে তাকালেন, তারপর ভদ্রভাবে হেসে বললেন,
_“আপনি কি ডক্টর রামিন শিকদারের কথা বলছেন? উনি আজ হসপিটালে আসেননি।”
অনুভা সৌজন্যমূলকভাবে একটু হেসে উঠে চলেই আসতে নিয়েছিল। তখনই হঠাৎ অনুভার বুকের ভেতরটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। একটা তীব্র খটকা নিয়ে সে আস্তে করে আবারও চেয়ারে বসে বলল,
_“আপনি এইমাত্র কার নাম বললেন?”