রক্ত রেখার আড়ালে

পর্ব - ৫০

🟢

_​“খাবার খেয়ে যা। না খেয়ে যাস না।”

​পেছন থেকে মায়ের কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই তায়ানের পা দুটো থমকে গেল। পেছন ফিরে তাকাল সে ।

_“খাবো না আমি।”

​এতটুকু বলেই সে আবারও চলে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে পা বাড়াল।

_“এ দু’দিন বিয়ের প্রোগ্রামের কোনো খাবার আমি মুখে তুলিনি। আজও খাবো না তাহলে।”

​মায়ের এই অনাহারে থাকার আকস্মিক ঘোষণায় তায়ান থমকাতে বাধ্য হলো। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে শুধাল,

_“কেন?”

_​“কারণ যে আনন্দ-উল্লাসের মাঝে আমার ছেলে নেই, সেখানের কোনো অন্ন আমার গলায় নামবে না।” আমীরা বেগম সরাসরিই কারণ জানিয়ে দিলেন।

​মায়ের কথা শুনে তায়ানের ঠোঁটের কোণে একটা ম্লান, মলিন হাসি ফুটে উঠল।

_“এত ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য নই আমি, মা!”

_“কে বলেছে আমি তোকে ভালোবেসে এসব বলছি? তোর মতো ছেলে তো একটা অভিশাপ!”

​মায়ের মুখে এমন কথা শুনেও অভিব্যক্তিতে তেমন কোনো পরিবর্তন হলো না। এই কঠোর বাণীগুলো এখন আর তার গায়ে লাগে না। সে জানে, মা যা বলছেন, ঠিকই বলছে। ​তায়ানের এই নিথর নীরবতা আমীরা বেগমকে আরও ব্যথিত করে তুলল। তিনি শক্ত করে ছেলের বাহু টেনে ধরে রান্নাঘরের দিকে নিয়ে গেলেন। তায়ান কোনো বাধা দিল না। রান্নাঘরে গিয়ে আমীরা বেগম একটা কাঁচের প্লেটে ভাত আর তরকারি বেড়ে মাখতে শুরু করলেন। তারপর ছেলের দীর্ঘ অবয়বের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

_“অনেক লম্বা হয়েছিস, আগের মতো দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তোকে খাওয়াতে পারব না। বোস।”

​তায়ান বাধ্য ছেলের মতো চেয়ারটায় বসল। আমীরা বেগমও নিজের আঁচলটা সামলে পাশের অন্য একটা চেয়ার টেনে বসলেন। এরপর পরম যত্নে ভাতের প্রথম লোকমাটা তুলে ধরলেন ছেলের মুখের সামনে। ​তায়ান স্তব্ধ হয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। আচমকাই তার ঠোঁট দুটো কাঁপতে শুরু করল। ভেতর থেকে ঠেলে আসা কিছু একটা চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টায় সে নিজের নিচের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরল।

_“এত যত্ন নিয়ে কি আমাকে বিদায় জানাচ্ছো, মা?”

​ছেলের কথায় আমীরা বেগমের বুকটা ধক করে উঠল। ভেতরের মাতৃত্বটা হাহাকার করে উঠলেও তিনি তা বাইরে প্রকাশ পেতে দিলেন না। মুখের ভেতরের জড়তা কাটিয়ে শুধু বললেন,

_“হা কর।”

​তায়ান আর না করতে পারল না। মায়ের হাতের লোকমাটা সে মুখে নিল। চিবানোর আগেই তার ডান চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা তপ্ত জল গাল বেয়ে নেমে এলো। তার পরক্ষণেই বাম চোখটাও জলে ভরে উঠল। আমীরা বেগম নিজের বাম হাতটা বাড়িয়ে ছেলের চোখ থেকে নামা জলটুকু মুছে দিলেন। মুখে কৃত্রিম কঠিনতা এনে বললেন,

_“পুরুষ মানুষদের এভাবে কাঁদতে দেখলে লোকে দুর্বল ভাবে।”

​তায়ান মায়ের চোখের দিকে তাকাল। তার চোখের কার্নিশ বেয়ে তখনো জল নামছে।

_“আমি তো শক্ত নই, মা।”

আমীরা বেগম কিছুই বলতে পারলেন না। তায়ান এবার চেয়ার ছেড়ে মেঝেতে বসে মায়ের উরুতে মাথা রেখে, কিছুক্ষন নিশ্চুপ থেকে বলল,

_“ ওকে বলো না মা, আমাকে ক্ষমা করে দিতে। ফিরে আসতে বলো। আমি ওকে ছাড়া বাঁচব না।”

তায়ান যেন বাচ্চাদের মতো মায়ের কাছে আবদার করল। আমীরা বেগমের মনে হলো, বহু বছর পর তাঁর অবাধ্য ছেলেটা আবার ছোটটি হয়ে মায়ের কাছে কোনো এক দুর্লভ বস্তুর জন্য আবদার জুড়েছে। কিন্তু এই আবদার রাখার ক্ষমতা, ইচ্ছে কিংবা অধিকার কোনোটিই আমীরা বেগমের নেই। অনুভাকে গিয়ে তিনি কোন মুখে এই কথা বলবেন? আমীরা বেগম শুধু কাঁপতে থাকা হাতটা ছেলের অবিন্যস্ত চুলে ডুবিয়ে দিলেন। এবারও কোনো বাক্য তাঁর ঠোঁট গলে বেরুলো না।

_“ আমার সন্তান আমাকে বাবা বলে ডাকে না, আমার খুব কষ্ট হয় মা!" তায়ান এবার একটু ধরা গলায় বলল। ওর চোখের কার্নিশ বেয়ে আরও এক ফোটা জল নেমে এলো।

_“ আমার সাথেই কেন এমন হলো? স্রেফ একটা প্রতিশোধের গুটি বানিয়ে লোকটা আমাকেই কেন জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির মুখে ঠেলে দিল! আমি তো এই নরক চাইনি, মা। আমি তো এমন জীবন চাইনি।” তায়ান আনমনে বলতে থাকল।

আমীরা বেগম নিঃশব্দে কাঁদছে। সে জানে এর কেন্দ্রবিন্দু কোত্থেকে। ধারণাও ছিলনা তার একটা সিদ্ধান্তে তার পুরো জীবনটা এমন ওলোট পালোট হয়ে যাবে। আর এর প্রতিদান তার ছেলেকে দিতে হবে।

_“ খেয়ে নে, খাবার নষ্ট হয়ে যাবে।”

তায়ান দু’পাশে মাথা নাড়ল। ও এখনও মায়ের কোলে মাথা এলিয়ে রেখেছে।

_“ বাবার ক’বর জিয়ারতে গেলে তাকে বলো আমাকে যেন কখনো ক্ষমা না করে। আমার তার কাছে যাওয়ার সাহস নেই।”

আমীরা বেগম এবারও চুপ। সে এখন ছেলেকে কিছু বলতে গেলেই ভেতরের দূর্বল সত্ত্বাটা৷ বের হয়ে আসবে। হাওমাও করে কেঁদে উঠবে। সে সেটা চায় না।

তায়ান আবারও বিড়বিড়াল,

_“ নিজের ভেতরের অপরাধবোধ মানুষকে মৃ’ত্যু পর্যন্ত তাড়া করে। আর অপরাধবোধের চরম পর্যায়ে চলে গেলে মানুষ মৃ’ত্যুকেই নিজের নিয়ামত মনে করে।” ও সোজা হয়ে বসে মেঝের দিকে তাকাল, “ আমার সাথেও এমনটা হচ্ছে। আমি আর কোনো ভাবেই এই অপরাধবোধ নিয়ে শ্বাস নিতে পারছি না। প্রতিটা নিঃশ্বাস বিষাক্ত দানা হয়ে আমার ভেতর প্রবেশ করছে। তুমি দোআ করো মা, আমার মৃত্যু হোক। খুব শিঘ্রই আমার মৃত্যু হোক।”

আমীরা বেগম তায়ানের মাথাটা আবারও নিজের কোলে রাখল। ওর সিল্কি চুলে হাত বুলিয়ে বলল,

_“ আমার এমন দোআ কখনও কবুল না হোক। বেঁচে থেকে যদি তোকে শাস্তি পেতে হয়, তবে সেই শাস্তির ভাগীদার আমিও।”

মায়ের হাতের শীতল স্পর্শ পেয়ে তায়ানের জ্বলতে থাকা চোখ দুটো আস্তে আস্তে বুজে এলো। তার তপ্ত মস্তিষ্কে অদ্ভুত প্রশান্তি ছড়িয়ে দিল। বহুদিন পর মায়ের শীতল আঁচলটুকুকে শেষ আশ্রয় বানিয়ে তার ক্লান্ত চোখে এক চিলতে শান্তির ঘুম নেমে এলো।

আমীরা বেগম সারা রাত একটুও নড়লেন না। সে অপলক দৃষ্টিতে ছেলের ঘুমে মগ্ন নিষ্পাপ মুখটার দিকে তাকিয়ে রইলেন আর পরম মমতায় তার মাথায় হাত বুলিয়ে গেলেন। এদিকে রান্নাঘরের দরজার আড়ালে, অন্ধকারের সাথে মিশে দাঁড়িয়ে ছিল আরিজ। এতক্ষণ ধরে সে মা আর ভাইয়ের প্রতিটি কথা, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস আর ভেতরের তীব্র হাহাকার খুব কাছ থেকে শুনেছে। না চাইতেও তার চোখের কোণ বেয়ে কয়েক ফোঁটা তপ্ত জল গাল বেয়ে নেমে এসেছে। নিজের অজান্তেই কখন যে সে ভাইয়ের এই যন্ত্রণায় শরিক হয়ে পড়েছে, তা সে নিজেও জানে না। মায়ের এই নীরব কান্না আর ভাইয়ের এই বুকফাটা আর্তনাদ তাকে দমবন্ধ করে দিচ্ছিল। সে আর দাঁড়াল না। ধীর পায়ে সে এখান থেকে চলে গেল। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করার আগ পর্যন্ত তিনি ওভাবেই পাথরের মতো বসে রইলেন, আর মায়ের অবিরত আঙুলের ছোঁয়া পেতে পেতে তায়ান নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে রইল।

তায়ান ঠিকি বলেছে, অপরাধবোধ মানুষকে মৃ’ত্যু পর্যন্ত তাড়া করে। মনোবিজ্ঞান এবং মানব ইতিহাস বলে, মানুষের মনের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক অনুভূতিগুলোর একটি হলো অপরাধবোধ। এটা মানুষকে শারীরিকভাবে না ছুয়েও মানসিকভাবে তিলে তিলে শেষ করে দিতে সক্ষম রাখে। মানুষ অন্য যেকোনো শত্রুর থেকে পালাতে পারলেও নিজের মন থেকে কখনোই পালাতে পারে না। অপরাধবোধ হলো নিজের ভেতরে চব্বিশ ঘণ্টা চলতে থাকা একরকম আদালত, যেখানে মানুষ নিজেই নিজের বিচারক এবং নিজেই আসামি। এই অবিরাম আত্মগ্লানি মানুষকে এক মুহূর্তের জন্যও শান্তিতে ঘুমাতে বা বাঁচতে দেয় না। ​তীব্র অপরাধবোধ মনের ওপর তো চাপ সৃষ্টি করেই, সাথে শরীরকে কঠিন ভাবে ভেঙে ফেলে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় সাইকোসোম্যাটিক ইলনেস। অতিরিক্ত মানসিক যন্ত্রণা থেকে মানুষের খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া, তীব্র ডিপ্রেশন, এবং বেঁচে থাকার ইচ্ছা পুরোপুরি লোপ পাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ, অপরাধবোধ মানুষকে একদম ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দেয়। আমীরা বেগম ছেলের দিকে এসবই ভাবতে থাকল। এভাবে চলতে থাকলে তার ছেলেটা খুব শীঘ্রই কোনো রোগের মুখোমুখি হবে।

ভোরে যখন অনুভার ঘুম ভাঙল, সে আরাফ ঘুম থেকে ওঠার আগেই রান্না ঘরে গিয়েছিল ছেলের জন্য ফিডার বানাতে। কিন্তু এই দৃশ্য দেখে কিছুক্ষন দাড়িয়ে থেকে চলে আসে রুমে। আজকে মাঝরাতে তাদের ফ্রান্সের ফ্লাইট। সে যত দ্রুত সম্ভব চলে যাবে এখান থেকে। বিকালে সে আবারও একবার কোর্টে গিয়ে উকিলের সাথে দেখা করে এলো। তারপর একবার আরশাদ সাহেব এবং তার মায়ের কবরের পাশে কিছুক্ষন বসে থেকে সন্ধায় ফিলে এলো। এসেই আরাফ এবং নিজের প্রয়োজনীয় জিনিস গুলো ব্যাগে তুলছিল।

_“​ভেতরে আসো।”

​দরজার পাশে ছায়ার মতো আমীরা বেগমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ব্যাগ গোছানোর মাঝেই ডাকল অনুভা।

_“ আমি সাহায্য করি দে।” কাপড়ের ব্যাগ ধরে বলল সে।

_“ না, হয়েই গেছে। আরাফ কী করছে?” অনুভা বলল।

_“ খেলছে নীলার সঙ্গে।” আমীরা বেগম অনুভার কাপড় ব্যাগে তোলার দিকে তাকিয়ে থেকে আবারও বললেন,

_“ না গেলে হয় না?”

অনুভা নিজের হাতের কাজ থামাল না। অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বলল,

_“পরের বছর আবার আসব।”

_“ আচ্ছা, ওকে বিয়ে করে নিস।” কোনো ভূমিকা ছাড়াই বলে ফেলল আমীরা বেগম। অনুভা কাপড় গোছানো বন্ধ করে দিলো।

_“ কাকে?”

_“ ছেলেটা তোর জন্য অনেক করেছে, ওকে ফিরিয়ে দিস না। আর সারাজীবন এমন একা কাটানো যায় না। ও যেহেতু আরাফকেও এত ভালোবাসে, তাহলে নিজেদের ভবিষ্যতের দায়িত্বটা ওর হাতেই দিয়ে দে।”

_“ তুমি এই কথা বলছো?” একটু অবাক হয়েই বলল অনু।

আমীরা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনুভার হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বললেন,

_“আমি তোর শাশুড়ি কিংবা কারো মা হয়ে বলছি না রে মা, আজ আমি তোর বড় আম্মু হয়ে বলছি।”

​অনুভা আলতো করে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল। তারপর আবার ব্যাগের দিকে মনোযোগ দিয়ে বলল,

_“আমি এটা পারব না।”

_​“কিন্তু কেন পারবিনা? তোর বয়সই বা কতটুকু? সামনে এখনো পুরোটা জীবন পড়ে আছে।”

​ঘরজুড়ে কয়েক সেকেন্ডের এক নিরেট নীরবতা নেমে এলো। অনুভা হাতের কাপড়টা রেখে ঘুরে দাঁড়াল।

_“আমার ভাগ্যে আল্লাহ কী লিখে রেখেছেন, তা আমি জানি না। কিন্তু হৃদয়ের ওপর তো আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, বড় আম্মু। আমি জোর করে কাউকে ভালোবাসতে পারব না। শান্তর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা, সম্মান, মায়া সবকিছুই আছে, সারাজীবন থাকবেও। কিন্তু মনের ভেতর যে ভালোবাসার অনুভূতি, সেটা আমি চাইলেও আনতে পারিনি।”

আমীরা বেগম যেন হাল ছাড়লেন না

_“বিয়েটা করেই দেখ, একসময় এই ভালোবাসাও চলে আসবে। তুই ওর সঙ্গে অনেক সুখী হবি।”

​বলার সময় আমীরা বেগমের নিজেরই বুকটা কেঁপে উঠল। তিনি নিজেই জানেন না, কীভাবে একজন মা হয়ে নিজের ছেলের বউকে অন্য কারো হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলছেন! অনুভা এবার আমীরা বেগমের চোখের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত অভিমান তার।

_“বিয়ে করব? কিন্তু বড় আম্মু... একটা ইজ্জত আমি কতজনকে দেব?”

​কথাটা শুনে আমীরা বেগম স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তাঁর মুখের সমস্ত শব্দ যেন এক নিমেষে হারিয়ে গেল। তিনি শুধু অপলক দৃষ্টিতে এই মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। নিজের অজান্তেই তিনি অনুভার সাথে নিজের জীবনের তুলনা করতে লাগলেন। কত তফাত এই মেয়েটার সাথে তাঁর! তিনিও তো একসময় তায়ানের বাবাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু সে মারা যাওয়ার পর, পরিস্থিতির শিকার হয়ে এবং নিজের ছেলের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অন্য একজনকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু আজ এই তরুণী অনুভার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বড্ড ছোট, বড্ড অপরাধী মনে হতে লাগল তাঁর।

​

আমীরা বেগমকে এভাবে চুপ করে থাকতে দেখে অনুভার খারাপ লাগল। সে এগিয়ে গিয়ে আলতো করে তাঁর কাঁধে হাত রাখল। নরম গলায় বলল,

_“তুমি এত ভেবো না তো। যদি শান্ত সত্যিই আমার ভাগ্যে থেকে থাকে, তবে আল্লাহ নিজেই আমার মনে তার জন্য ভালোবাসার অনুভূতি সৃষ্টি করে দেবেন। তখন আমার এই চিন্তাভাবনাও বদলে যাবে।"

​আমীরা বেগম অনুভার মাথায় হাত রেখে একটা মলিন কিন্তু তৃপ্তির হাসি হাসলেন। মনে মনে বললেন,

_“খুব শীঘ্রই যেন সেটা হয়।”

রাতের খাওয়া-দাওয়া আর শেষ মুহূর্তের বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ওরা এখন ছুটে চলেছে এয়ারপোর্টের দিকে। রাত বারোটা বাজে। ওদের ফ্লাইট দেড়টায়। ​গাড়িটা এখন পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে যাচ্ছে। অনুভার কোলে মাথা দিয়ে গভীর ঘুমে মগ্ন ছোট আরাফ। ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছে। শান্ত অনুভার পাশের সিটে বসা। পেছনে বাইকে আরিজ আর অলি। ওদের এয়ারপোর্টে পৌছে দিতে আসছে। অনুভা জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল, তারপর একসময় নীরবতা ভেঙে শান্তর দিকে তাকাল।

_​“আপনার সব কাজ শেষ হয়েছে?” অনুভার নরম কণ্ঠ।

_​“হ্যাঁ,” শান্ত করে মাথা নাড়ল।

​অনুভা কিছুক্ষণ চুপ থেকে শান্তর মুখের দিকে তাকানোর চেষ্টা করল। সে আবার জিজ্ঞেস করল,

_“আপনি কি এখনও আমার ওপর রেগেই আছেন?”

​শান্ত এবার এক পলক অনুভার দিকে তাকিয়ে আবার সামনের রাস্তায় চোখ ফেরাল। নিস্পৃহ গলায় বলল,

_“রেগে থাকব কেন? না, রেগে নেই।”

_​“আচ্ছা, রেগে থাকলেও অবশ্য আমার কিছু করার নেই,” অনুভা হালকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালার পাশে মাথা ঠেকিয়ে বলল।

​শান্ত এবার বেশ অবাক হয়ে অনুভার দিকে তাকাল।

_“হ্যাঁ, আমি খুব ভালো করেই জানি যে তোমার কিছু করার নেই। তবে আমি সত্যিই তোমার ওপর রেগে নেই।”

বিজ্ঞাপন

_​“শুনে ভালো লাগল যে আপনি রেগে নেই। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। এর জন্য আমি আপনার জন্য সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।”

​শান্তর কাছে অনুভার কথাগুলো কেমন যেন অদ্ভুত ঠেকল। সে খানিকটা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

_“তুমি কি আমার সাথে মজা করছ?”

_​“আপনার কেন মনে হলো আমি মজা করছি? আপনি যে আমার ওপর রেগে নেই, এটা তো এই মুহূর্তে আমার জন্য একটা মস্ত বড় ভালো সংবাদ।”

​শান্ত এবার হালকা হাসল,

_“তুমি কিন্তু স্টিল মজা করেই যাচ্ছো।”

​অনুভা এবার জানালার দিক থেকে মাথাটা তুলে সোজা হয়ে বসল। একটু গম্ভীর হয়ে বলল,

_“আমাকে জেরিন কল করেছিল।”

শান্ত চমকাল।

_“কখন? কবে কল করেছিল?”

_​“সেদিন। আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছিল। আমি ওকে জানিয়েছি যে আমরা এখনও বাংলাদেশেই আছি।”

​তার মানে জেরিনের জন্যই তার বাবা জেনে গেছে সে এখন বাংলাদেশে আছে! এখন আর বুঝতে বাকি রইল না, সব জেরিনের কাজ। জেরিনই পেছনে কাঠিটা করেছে।

_“এবার ফ্রান্সে পৌছে নেই। ওর ব্যবস্থা আমি একটু বিশেষ ভাবে নেব।”

_“ কার?”

শান্ত কিছু বলার আগেই আচমকা তীব্র এক শব্দে ব্রেক কষল গাড়িটি। ঝাঁকুনি দিয়ে শান্ত আর অনুভা দুজনেই সামনের দিকে হেলে পড়ল। কোনোমতে নিজেদের সামলে নিয়ে উইন্ডশীল্ডের বাইরে তাকাল তারা। ​নিশুতি রাতে পদ্মা সেতুর ওপর তাদের পথ আটকে আড়াআড়িভাবে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়েকটি কালো রঙের গাড়ি। হেডলাইটের তীব্র আলো এসে পড়ছে ওদের চোখে। এক অজানা আশঙ্কায় অনুভার পেট মোচড় দিয়ে শরীরটা হিম হয়ে এলো। শান্ত গাড়ি থেকে নামার জন্য দরজার লক খুলতেই অনুভা ঝট করে তার হাতটা চেপে ধরে থামিয়ে দিল।

_​“আপনি নামবেন না! প্লিজ... আগে দেখি ওরা কারা।” অনুভার গলা কাঁপছিল।

​কিন্তু কথাটি শেষ হওয়ামাত্রই আচমকা অনুভার পাশের দরজাটা এক হ্যাঁচকায় খুলে গেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা শক্ত হাত অনুভার কবজি চেপে ধরে তাকে গাড়ির বাইরে টেনে বের করল। ছিটকে বাইরে চলে এলো অনুভা। লোকটা ক্ষিপ্র হাতে অনুভার ব্যাগটা ছিনিয়ে নিয়ে চেইনের ভেতর হাত ঢুকিয়ে টেনে বের করল একটা খাম। তার ভেতর থেকে একটা পেপার বের করে মুহূর্তের মধ্যে কুচিকুচি করে ছিঁড়ে বাতাসে উড়িয়ে দিল সে। ​সবকিছু এত দ্রুত, এত আকস্মিকভাবে ঘটল যে অনুভার মনে হলো সে একটা চোখের পলক ফেলারও সময় পায়নি।

​বাতাসে উড়তে থাকা কাগজের টুকরোগুলো মিলিয়ে যেতেই অনুভা দেখতে পেল সেই চেনা, হিংস্র অবয়বটা।

_​“ডিভোর্স পেপার রেডি করেছিস তুই? ডিভোর্স পেপার?!” তায়ানের গর্জনে যেন স্তব্ধ রাতের পুরো পদ্মা সেতুটা কেঁপে উঠল। ​সে গর্জনে অনুভাও ভেতর থেকে শিউরে উঠল।

তায়ানের চোখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। রাগে-ক্ষোভে চোখ দুটো অস্বাভাবিক লাল হয়ে আছে, যেন এক্ষুনি কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে। শান্ত গাড়ি থেকে নামার চেষ্টা করতেই তায়ানের সাথে আসা সশস্ত্র লোকগুলো শান্তর দিকে গান পয়েন্ট করে তাকে জিম্মি করে ফেলল। আরাফ এখনও সিটে নিশ্চিন্ত ভঙিতে ঘুমাচ্ছে। ভেতরে যেন কোনো শব্দ প্রবেশ না করে তাই দরজাটা বাহির থেকে লক করে দিলো তায়ান। ​পরের মুহূর্তেই তায়ান তার কোমর থেকে চকচকে রিভলবারটা বের করে কোনো দ্বিধা ছাড়াই সেটার নলটা চেপে ধরল অনুভার কপালে। ঠান্ডা ধাতব স্পর্শে অনুভার পুরো শরীর জমে গেল। তবু নিজের মুখটা কঠিন রাখল সে। ​তায়ান দাঁতে দাঁত চেপে, চোখ দুটোকে আরও হিংস্র করে বলল,

_​“ডিভোর্স পেপার বানিয়ে, দেশের বাইরে চলে গিয়ে, তারপর সেখানে বসে একটা সাইন করে পাঠিয়ে দিবি আর আমি সেটা মেনে নেব? হোয়াট আ ফা*কিং জোক! এত সাহস কোথায় পেলি তুই?!”

অনুভা নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে ধীর গলায় বলল,

_“ চলে যান এখান থেকে। ভয় পাবে আমার ছেলে। অন্তত ওর সামনে নিজের ভেতরের জা*নোয়ারটাকে বাহিরে বের করবেন না।”

_“শাট আপ! একদম চুপ! এই বাচ্চার জন্যই এতদিন চুপচাপ থেকেছি আমি। তোকে সময় দিয়েছি। নিজেকে যত নিচে নামানো যায়, তত নিচে নামিয়ে আমি তোর কাছে ক্ষমা চেয়েছি! আরে ইয়ার! সারাজীবন শিরক করার পরও সৃষ্টিকর্তা মানুষকে তওবা করার সুযোগ দেয়, আর তোর কাছে আমি একটা সুযোগ পাবো না? ডিভোর্স পেপার অব্দি চলে গেছিস!”

অনুভা তায়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে অবিচল গলায় জবাব দিল:

_“আজ হোক, কাল হোক... আমি আপনাকে ডিভোর্স দেবই। এই দমবন্ধ করা বন্ধনে থেকে আমার পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব না।”

​কথাটা শোনামাত্র তায়ানের কপালে রগগুলো ফুলে উঠল। রিভলবারের নলটা অনুভার কপালে আরও জোরে চেপে ধরে, হিসহিসিয়ে খ্যাপাটে গলায় বলল,

_“এই বন্ধন ভেঙে ফেললেও তুই বেঁচে থাকতে পারবি না অনুভা! আমি তোকে বাঁচতে দেব না!”

_“বেশ তো, মেরে ফেলুন!” চোখ বন্ধ রেখে বলল অনুভা।

তায়ান তার মাথার পেছনে ঠান্ডা নলের স্পর্শ পেল। তাকিয়ে দেখল শান্ত বন্দুক তাক করে আছে। অনুভা চোখ মেলে তাকাতেই আকাশ থেকে পড়ল যেন। শান্তর হাতে আগ্নেয়াস্ত্র থাকবে এটা সে মোটেও আশা করেনি। এটা ও পেল কোথায় পেল সেটাও জানে না সে। তায়ানের মুখে ভয়ের বিন্দুমাত্র রেখা ফুটল না। বরং তার ঠোঁটের কোণে এক পিশাচের মতো ক্রূর হাসি চওড়া হলো।

_“ নাইস! তুমি আমাকে, আমি ওকে। জাস্ট আ ওয়ান্ডারফুল সিন। ডু ইট।"

_“ ইউ আর আ সাইকোপ্যাথ তায়ান!” বলেই শান্ত নিজের রিভলবারের ভারী বাঁট দিয়ে তায়ানের রিভলবার ধরা হাতটার ওপর সজোরে আঘাত করল! ​তায়ানের হাত থেকে বন্দুকটা প্রায় ছিটকে যাওয়ার উপক্রম হলো এবং সে তিন-চার কদম পেছনে পিছিয়ে যায়। তায়ান নিজের ডান হাতটা চেপে ধরে হিংস্র বাঘের মতো তাকাল শান্তর দিকে। ​শান্ত পলকের মধ্যে অনুভার সামনে এসে নিজের শরীর দিয়ে তাকে আড়াল করল।

_“ ওকে মারতে হলে আগে আমাকে মারো তায়ান।"

_“ হিরোদের ডায়লগ এমনই হয়। এখন এটা না হলে একদম জমতো না। আই’ম ইমপ্রেসড! তোমাকে আমি এমনিতেও মারব, বাট আপাতত এখান থেকে সরে যাও।” তায়ান বলল।

_“ সরবো না।”

_“ হ্যাঁ, জানি। ভালো কথায় তুমি সরবে না। ইচ্ছে করে মরতে চাইলে তো আমার কিছু করার নেই।” বলেই তায়ান রিভলবারের ট্রিগারে চাপ দেওয়ার জন্য আঙুলটা শক্ত করল। অনুভা পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তায়ানের মনোযোগ অন্য দিকে ঘোরানোর প্রচেষ্টায় শান্তকে পাশের দিকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে গাড়ির দরজা খুলে বড় আরেকটা ব্যাগ থেকে ডিভোর্স পেপারের কপি আর কলম বের করে। এতে অনুভা সফলও হয়। তায়ানের মনোযোগ শান্তর থেকে সরে যায়। তবে অনুভা যদি জানত এটাই ওর জীবনের ভুল সময়ের, ভুল সিদ্ধান্ত তাহলে বোধহয় কখনোই এই কাজ করত না।

_“ এটা কি?” তায়ান বলল।

_“যেটা ছিঁড়ে টুকরো করেছেন, সেটারই আরেক কপি।” অনুভার মুখে তখন জয়ের হাসি। তার মন আগেই আচ করতে পেরেছিল এত বড় কাজ সে ঝামেলা ছাড়া সম্পন্ন করতে পারবে না। তাই একাধিক কপি সে রেখেছে নিজের কাছে।

​অনুভা আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করতে চাইল না। গাড়ির ডিকির ওপর তাড়াহুড়ো করে ডিভোর্স পেপারটা মেলে ধরল সে। কাঁপানো আঙুলে কলমের ক্যাপটা খুলে যেই না সই করতে যাবে, ঠিক তখনই এক ঝোড়ো হাওয়ার মতো তায়ান এসে ওর হাতটা খপ করে চেপে ধরল। তায়ানের হাতের মুঠো এত শক্ত যে অনুভার আঙুলগুলো অবশ হয়ে আসার জোগাড়। ​তায়ান প্রায় চিৎকার করে উঠল,

_“এই না! ভুলেও এই কাজ করবি না অনুভা! তুই... তুই এটা কিছুতেই করতে পারিস না!”

শান্ত উঠে দাড়িয়ে আবারও এগিয়ে আসতে চাইল, তবে গার্ডগুলো ক্ষিপ্র গতিতে ফের তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলল, ওর নড়ার উপায় রইল না।অলি, আরিজও গার্ডের হাতে বন্দি। অনুভা একবার সেদিকে তাকিয়ে হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা না করেই তায়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বলল,

_“আমি সব পারি। আপনি ঠিক কী ভেবেছেন? একটা কাগজ ছিঁড়ে ফেললেই সবকিছু আপনার নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে? কয়টা কাগজ ছিঁড়বেন আপনি? আমার কাছে এমন আরও অনেক কপি আছে। আপনার জেদ যত বড়, আমার প্রস্তুতিও ততটাই জোরালো।”

​অনুভার এই অবাধ্যতা তায়ানের সহ্যসীমা পার করে দিল। এক ঝটকায় সে অনুভার হাত থেকে কলমটা কেড়ে নিয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। কলমটা গড়িয়ে গিয়ে পড়ল পিচঢালা রাস্তায়।

​পরের মুহূর্তেই তায়ান রিভলবারটা তাক করল। তবে এবার সেটা অনুভার দিকে নয়, উল্টো করে নিজের বুকের বাঁ-পাশে, ঠিক হৃদপিণ্ড বরাবর চেপে ধরল। বন্দুকের নলটা নিজের বুকে ঠেসে ধরে, রক্তবর্ণ চোখে অনুভার দিকে তাকিয়ে সে হিসহিসিয়ে বলল,

_“ডিভোর্স পেপারে সাইন করবি? কর! ডিভোর্স পেপারে সাইন করার আগে আমার ডেথ সার্টিফিকেটে সাইন কর। এইখানে, এই বুকে গুলিচালা। এই বুকে একটা বুলেট বিঁধিয়ে তারপর তুই যা খুশি কর!”

তায়ানের এই আকস্মিক ও উন্মত্ত আচরণে অনুভা পুরোপুরি স্তম্ভিত হয়ে গেল। তার কিছু বলার বা বোঝার আগেই, তায়ান দ্রুত গতিতে অনুভার দুটো হাত টেনে এনে শক্ত করে চেপে ধরল রিভলবারের হাতলের ওপর। ​অনুভার নরম হাত দুটোকে নিজের লোহার মতো শক্ত মুঠোয় বন্দী করল। তায়ানের হাতের ছোঁয়ায় অনুভার আঙুলগুলো থরথর করে কাঁপছিল, কিন্তু তায়ানের সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তার চোখের মণি দুটো তখন এক ভয়ঙ্কর জেদ আর ভালোবাসার মরণকামড়ে জ্বলজ্বল করছে। ​সে অনুভার মুখের খুব কাছে নিজের মুখটা এনে, তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

_“কী হলো, কাঁপছিস কেন? তোর পথের কাঁটা উপড়ে ফেলার এত বড় সুযোগ তো আর পাবি না। নে, ট্রিগারে চাপ দে!”

তায়ান তখন উন্মাদপ্রায়। সে বন্দুকের ট্রিগারে চাপ দেওয়ার জন্য জোর প্রয়োগ করল। ঠান্ডা ধাতব স্পর্শ আর তায়ানের উত্তপ্ত নিঃশ্বাসের মাঝে অনুভা নিজেকে যেন একদম অসহায় অনুভব করল। অনুভার আঙুলের চাপে ট্রিগার যখন বেঁকে আসার উপক্রম, ঠিক তখনই অনুভা আর্তনাদ করে ওঠে।

_​“না! প্লিজ বন্ধ করুন আপনার এই খেলা। আমাকে আপনার খুনি বানাবেন না। নাহ!”

নিজের হাত ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হলো অনুভা। অনুভার পিঠ তখন গাড়ির সাথে মিশে। তায়ান এবার আরও কিছুটা ঝুঁকে এল অনুভার দিকে। এতটাই কাছে যে, দুজনের মাঝে বাতাসের দূরত্বটুকুও যেন মুছে গেছে। সে অনুভার কাঁধ ঘেঁষে ওর ঘাড়ের কাছে মুখটা নামিয়ে আনল। তারপর চোখ দুটো বুজে অত্যন্ত ধীরলয়ে, গভীরভাবে একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিল, যেন অনুভার শরীরের চেনা সুবাসটুকু নিজের ফুসফুসে আজীবনের জন্য বন্দি করে নিতে চাইছে। সে ফিসফিসে বলল,

_“ পারতেই হবে তোকে! এই নরক থেকে মুক্তি চাস না তুই? তাহলে মার আমাকে! অন্যের হাত ধরে পালিয়ে যাবি, আর আমি বেঁচে বেঁচে তোদের সুখে থাকার দৃশ্য দেখব! এটা অসম্ভব। হয় আজ এই বুকে গুলি চালিয়ে তুই স্বাধীন হবি, না হলে তোকে এই তায়ানের খাঁচাতেই আজীবন বন্দি থাকতে হবে। বল, কোনটা চাস?”

_“ কোনোটাই না!” অনুভাও ফিসফিসে বলল। আতঙ্কে অনুভা নিঃশ্বাসের গতি বেড়ে গেছে।

এবার তায়ান আচমকাই নিজের মুখটা অনুভার মুখের ওপর চেপে ধরল। নিজের নাকটা অনুভার নরম গালে আর মুখে পাগলের মতো ঘষতে লাগল সে।

_“ ওকে, জাস্ট ডু ইট!”

আবাররও ট্রিগারটা পেছনের দিকে টেনে নেওয়ার জন্য বাধ্য করল তাকে। ​ভয়ে, আতঙ্কে অনুভা আবারও ডুকরে কেঁদে উঠল,

_“নাহ, প্লিজ... স্টপ...!”

​ক্লিক!

​ট্রিগারের প্রথম ধাপের সেই চেনা, ধাতব শব্দটা মেকানিক্যালের মতো বেজে উঠল। কিন্তু বুলেট বের হলো না। ​তায়ান থামল না। অনুভার মুখে নিজের নাক-মুখ ঘষে ওর চোখের জল আর গায়ের সুবাস উন্মাদের মতো মাখতে মাখতেই সে যেন এই অদ্ভুত খেলায় মেতে রইল। অনুভার কান্নার শব্দকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সে আবারও চাপ দিল অনুভার আঙুলে।

​ক্লিক!

​আবারও সেই একই যান্ত্রিক শব্দ। মৃত্যুর এত কাছাকাছি দাঁড়িয়ে প্রতিটা ‘ক্লিক’ শব্দ যেন অনুভার কানের পর্দায় কামানের গোলার মতো আঘাত করছিল। যতবার এই ভয়ানক শব্দটা হচ্ছে, আর অনুভার মনে হচ্ছে এই বুঝি তার নিজের হাত দিয়েই তায়ানের বুকটা ঝাঁঝরা হয়ে গেল। অনুভা চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে তীব্র যন্ত্রণায় মাথাটা এপাশ-ওপাশ করতে লাগল, কিন্তু তায়ানের আঙুলের নির্মম চাপ আর ট্রিগারের সেই প্রথম ধাপের খটখট শব্দ যেন কিছুতেই থামছিল না।

তায়ানের উন্মাদনা তখন চূড়ান্তে পৌঁছেছে। অনুভার গালে, মুখে নিজের নাক ঘষতে ঘষতে সে যখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণহীন, ঠিক তখনই অনুভা ভয়, ঘৃণা আর বাঁচার আকুলতা থেকে নিজের অজান্তেই তার সমস্ত শক্তি এক জায়গায় জড়ো করে তায়ানের হাত থেকে নিজের হাতটা হ্যাঁচকা টানে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। ​আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ধস্তাধস্তির তীব্র ঝাঁকুনিতে, তায়ানের নিজের আঙুলের অসাবধানী চাপ আর অনুভার আঙুলের মোচড়, দুটো মিলেমিশে এক হয়ে হলো। ট্রিগারের শেষ ধাপটা পেরিয়েই গেল এবার!

​ডুম!

​স্তব্ধতা চিরে এক কানফাটা শব্দে পুরো ব্রিজটা কেঁপে ওঠে। ​বাতাসে বারুদের কটু গন্ধ বেরুলো। ​পরের সেকেন্ডেই সবকিছু অবিশ্বাস্য রকমের শান্ত হয়ে গেল। আর কোনো ‘ক্লিক’ শব্দ নেই। তায়ানের হিংস্র ঘষাঘষিটাও আচমকা থেমে গেল। তার পুরো শরীরটা একটা তীব্র ঝটকায় সোজা হয়ে গেছে, তারপরই সে অস্বাভাবিক রকম স্থির হয়ে গেল।

​অনুভা তার ভেজা চোখ দু’টো খুলে তাকাল। তায়ানের ঠোঁটের কোণের সেই ক্রূর হাসিটা তখনো লেগে আছে, কিন্তু চোখের ভেতরের উন্মাদনাটা দপ করে নিভে গেছে যেন। সেখানে এখন কেবল এক সীমাহীন শূন্যতা। তায়ানের বুকের ঠিক বা পাশ থেকে তরল, উষ্ণ রক্ত ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে অনুভার হাত, জামা আর সাদা ডিভোর্স পেপারগুলোকে ভিজিয়ে দিতে লাগল। ​তায়ান অনুভার দিকে তাকিয়ে একটা তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলে বলল, _‘‘শেষমেশ তুই পারলি!’’

অনুভা নিজের কাঁপতে থাকা রক্তাক্ত দু’হাতের দিকে চোখ বড় করে অবিশ্বাস্য চোখে দেখতে থাকল। তারপর তায়ানের বুকে। কী হলো এটা! মস্তিষ্ক যেন কোনো সংকেত পাঠাতে পারছে না, অবিশ্বাসের এমন এক চরম শিখরে সে পৌঁছে গিয়ে যেখানে কান্নার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছে সে। এদিকে অন্ধকারের মাঝে শান্ত বুঝলোও না বুলেটটা ঠিক কার গায়ে লেগেছে। তার মাথায় অবচেতনেই অনুভার নাম এলো। সে এবার ঝাড়া মেরে গার্ডদের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে দৌড়ে অনুভা আর তায়ানের দিকে আসতে চাচ্ছিল।

​শান্তকে ছুটে আসতে দেখে অনুভা এক পলক সেদিকে তাকাল। কিন্তু সেই সুযোগ তায়ান দিল না। নিজের বুক থেকে রক্ত ঝরলেও, তায়ানের শেষ শক্তিটুকু যেন দানবীয় রূপ নিল। সে আচমকা তার শক্ত হাত দিয়ে অনুভার থুতনি আর চোয়াল চেপে ধরে হ্যাঁচকা টানে মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। অনুভার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে, তায়ান তার অন্য হাত দিয়ে অন্ধের মতো রিভলবারটা তাক করল ছুটে আসা শান্তর দিকে। ​কোনো ধরনের হুঁশিয়ারি বা সুযোগ না দিয়েই তায়ান পর পর দুবার ট্রিগার চাপল।

​

​শান্তর বাহু আর পা ভেদ করে চলে গেল দুটো বুলেট। অথচ পুরোটা সময় তায়ানের চোখের পলকও পড়ল না, তার রক্তচক্ষু জোড়া তখনো অনুভার চোখের অতল গভীরে বিঁধে আছে। শান্ত আর একটা কদমও ফেলতে পারল না। এক তীব্র আর্তনাদ করে সে মাটিতে কুঁকড়ে পড়ে গেল।

​শান্তর ওভাবে লুটিয়ে পড়ার দৃশ্যটা দেখা মাত্রই অনুভার ভেতরের শেষ আলোটুকুও যেন নিভে গেল। তার পুরো শরীরটা একদম অসার, অবশ হয়ে এল। তায়ানকে প্রতিহত করার মতো এক ফোঁটা শক্তিও অবশিষ্টাংশও আর তার দেহে বাকি রইল না। তায়ান এবার অনুভার সেই অসাড়, প্রাণহীন হাতটা আবার টেনে আনল রিভলবারের ওপর। অনুভার আঙুলটা নিজের মুঠোয় নিয়ে, ট্রিগারে চেপে ধরে, নিজের বুকের ঠিক মাঝখানে নলটা ঠেকিয়ে গুনে গুনে ঠিক তিনটা বুলেট নিজের হৃৎপিণ্ডে ঢুকিয়ে দিল।

​

​অনুভার মনে হলো সে যেন কোনো এক দুঃস্বপ্ন দেখছে। এগুলো সত্য হতেই পারে না। এগুলো স্বপ্ন! এইতো চারপাশ সব অন্ধকার। স্বপ্ন এটা! নিজের হাত দিয়ে তায়ানকে আত্মাহুতি দিতে দেখল সে, অথচ তার চেতনার জগত তখন সম্পূর্ণ অসাড়। তায়ানের ভারী শরীরটা কখন যে তাকে ঠেলতে ঠেলতে ব্রিজের একদম শেষ কিনারায় নিয়ে এসেছে, চারপাশের অতল শূন্যতা আর ব্রিজের নিচের নদীর গর্জন, তার কোনো কিছুই অনুভার অবশ মস্তিষ্কে আর পৌঁছাল না।

তায়ানের হৃৎপিণ্ড ভেদ করে বুলেটগুলো চলে গেছে, কিন্তু তার চোখের সেই তৃষ্ণার্ত, মরণপণ চাউনিটা এখনো ম্লান হয়নি। ব্রিজের কিনারায় অনুভাকে প্রায় লেপ্টে ধরে রেখে, নিজের শেষ নিঃশ্বাসটুকু জড়ো করল সে। তার ঠোঁটের কোণ বেয়ে তখন রক্তের কালচে রেখা নেমে আসছে। ​অনুভার অসার, ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে তায়ান তার রক্তাক্ত হাতটা দিয়ে অনুভার গালটা আলতো করে ছুঁল। তার সেই হিংস্র চোখে এক অদ্ভুত, করুণ আকুতি ফুটে উঠল। এই শেষ মুহূর্তে এসেও সে অনুভার মুখ থেকে কেবল একটা শব্দ, একটা স্বীকারোক্তি শুনতে চায়। ​সে অনুভার চোখের দিকে তাকিয়ে একদম ফিসফিসে, প্রায় বুজে আসা গলায় বলল,

_​"Just once, Anu... do you love me? Still you love me, don't you?” প্রশ্নটা করেই সে চাতকের মতো অনুভার ঠোঁট দুটোর দিকে তাকিয়ে রইল, যেন এই একটা উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে তার আত্মার মুক্তি।

তায়ানের সেই আকুতি, তার চোখের জল কিংবা রক্তের দাগ, কোনো কিছুই অনুভার ভেতরের পাথর হয়ে যাওয়া মনটাকে গলাতে পারল না। তায়ানের পুরো সমস্ত অন্যায় এই এক মুহূর্তে অনুভার চোখের সামনে ভেসে উঠল। ​সে তার অবশ হয়ে আসা ঠোঁট দুটোকে কোনোমতে আলগা করল। অবশ হাত তায়ানের রক্ত মাখা বুকে স্পর্শ করে কেবল একটা শব্দই উচ্চারণ করল,

_​“নেভার।”

​শব্দটা তায়ানের বুকে বুলেটের চেয়েও তীব্রভাবে আঘাত করে ফেলে। অন্তত এই সময় সে পজেটিভ কিছু শোনার আকাঙ্ক্ষা করেছিল। তার চোখের সেই করুণ আকুতিটা পলকেই এক হিংস্র, পৈশাচিক হাসিতে রূপ নিল। শেষ আশাটুকুও যখন ভেঙে গিয়ে তার ভেতরের দানবটা যেন জেগে উঠল শেষবারের মতো। সে রক্তের স্বাদ পাওয়া বাঘের মতো এক অদ্ভুত শব্দ করে হেসে উঠল।

​সে অনুভার মুখের আরও কাছে এসে হিসহিসিয়ে বলল,

_ “আই নিউ ইট! তুই কোনোদিনও সোজা পথে আমার হবি না। কিন্তু তোকে আমি অন্য কারও হতেও দেব না। এ জন্মে যখন আমার হলি না, তখন ও জন্মে তোকে আমার সাথেই নরকে যেতে হবে!”

​কথাটা শেষ করেই তায়ান আচমকা টেনে অনুভাকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তায়ানের রক্তে ভিজে উঠলো অনুভার শরীরটাও। নিজের রক্তে ভেজা ঠোঁট দুটো দিয়ে অনুভার বরফের মতো ঠান্ডা কপালে গভীর, অধিকারবোধে মত্ত চুমু খেল সে। তারপর জড়িয়ে ধরে রাখা অবস্থাতেই, রিভলবারের নলটা অনুভার পেটে একদম ঠেসে ধরে ট্রিগার চেপে দিল তায়ান।

​তীব্র ব্যথায় অনুভার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল, সোজা হয়ে গেল তার মেরুদন্ড। তার দৃষ্টি তখন তায়ানের কাঁধ গলিয়ে গাড়িটার দিকে। যেখানে তার ছোট্ট পৃথিবীটা ঘুমাচ্ছে। অথচ সে জানেও না তার বাবা আজ ধ্বংসের খেলায় মেতেছে। অনুভা চিৎকারও করতে পারল না। নিঃশব্দে বর্ষন হলো দু’চোখে। তায়ানও ঘাড় ঘুড়িয়ে সেই গাড়িটার দিকেই তাকাল। পাথুরে চোখটায় এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল তার। অনুভাকে শক্ত বাঁধনে ধরে রেখেই সে গাড়ির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,

_“ ​আই’ম সরি বাবা...! সরি ফর নট বিইং আ গুড ফাদার টু ইউ। সরি ফর নট বিইং আ গুড হাজবেন্ড টু ইয়োর মাদার। আই’ম সরি ফর এভরিথিং বাবা... পাপ্পা ইজ ভেরি ব্যাড। নেভার বি লাইক ইয়োর ফাদার, ওকে? ইউ উইল বি আ গুড বয়... অ্যান্ড আ গ্রেট ফুটবলার ওয়ান ডে। গুডবাই, মাই বয়….”

বলেই তায়ান চোখের জলটুকু মুছে শেষবারের মতো অনুভার দিকে তাকাল। তার চোখের সেই শেষ মায়াটা নিমেষেই আবার এক অন্ধ, আত্মঘাতী জেদে রূপ নিল। তায়ান এবার অনুভার স্তব্ধ শরীরটাকে নিয়ে ব্রিজের রেলিং টপকে পেছনের দিকে হেলে পড়ল। রাতের নিকষ কালো আঁধার চিরে দুটো শরীর একসাথে তলিয়ে গেল ব্রিজের নিচের অতল, গর্জে ওঠা নদীর বুকে। রক্তলাল হয়ে গেল পদ্মার পানি।

বিজ্ঞাপন
রক্ত রেখার আড়ালে গল্পটি আয়েশা শেখ রিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে মোড়ানো থ্রিলার উপন্যাস