রক্ত রেখার আড়ালে

পর্ব - ৫৩

🟢

সেদিনের পর আরাফ এখন শান্তর সঙ্গেই ফ্রান্সে দিন কাটাচ্ছে। অনুভার পরিবার চাইলে হয়তো জোর করে বাচ্চাটাকে নিজেদের কাছে আটকে রাখতে পারত না, কারণ শান্তকে ছাড়া আরাফ এক মুহূর্তও কোথাও স্থির হতে শেখেনি। যদি কোনোভাবে ছেলেটা শান্তর থেকে দূরে থাকতে পারত, তবে হয়তো শান্তও জোর করে নিজের অধিকার ফলাতে যেত না। কিন্তু আরাফের এই অবুঝ জেদ আর মানসিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে শেষমেশ ইয়াসির খানও নিজের কঠোরতা কিছুটা নরম করতে বাধ্য হয়েছেন। ​শান্ত এখন ফ্রান্সে নিজের বাড়িতেই বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকে। দেখতে দেখতে আড়াই মাসের মত কেটে গেছে, অথচ অনুভার কোনো মিলেনি। বাবার কড়া নজরদারির আড়ালে যতটুকু সম্ভব শান্ত এখনো গোপনে অনুভার সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ইয়াসির খানের সার্বক্ষণিক পাহারা তাকে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে যে, নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী বাড়ির বাইরে পা রাখার স্বাধীনতাটুকুও তার নেই।

সারাদিনের বেশির ভাগ সময়টাই তাকে আরাফকে সঙ্গী করে ছাদের এক কোণে কিংবা বাসার লনে কাটাতে হয়। শান্তর একপাশের হাত আর বাহুতে গুলি লাগায় শরীরের ভারসাম্য এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি, তাই হাঁটার জন্য এখনো একটা ক্র্যাচের ওপর ভরসা রাখতে হয় তাকে। আরাফ শান্তর ছায়ায় থাকলেও নিজের মাকে এক মুহূর্তের জন্যও ভুলে যায়নি। ফেলে আসা দিনগুলোতে হিসেবহীনবার সে তার মায়ের চেনা স্পর্শ খুঁজে বেরিয়েছে। যখনই অবুঝ মনে মায়ের স্মৃতি দোলা দেয়, তখনই সে শান্তর কাছে আধো-আধো গলায় আকুতি জানায়,

“পাপা, মা আছেনা? মা কোতায়? মা... নিয়ে দাও...”

​এই সরল জিজ্ঞাসা শান্তর বুকের ভেতরের বেদনাকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। এটা-ওটা মিথ্যে গল্প শুনিয়ে, খেলনা দেখিয়ে কোনোমতে বাচ্চাটাকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে। শাহানা বেগমের নরম স্বভাবের কারণে তাঁর সাথে আরাফের বেশ একটা সখ্য গড়ে উঠলেও, খাবারের ব্যাপারে ছেলেটা বড্ড একরোখা। শান্তর হাত ছাড়া সে এক লোকমা খাবারও মুখে তুলতে চায় না। এমনকি রাতে ঘুমানোর সময়ও তার শান্তকেই চাই। মাঝে মাঝে এসব আদিখ্যেতা দেখে ইয়াসির খান প্রকাশ্যেই বিরক্তি প্রকাশ করেন, কিন্তু তার কিছু করার নেই।

শান্ত নিজেকে আরাফের সামনে শক্ত করে ধরে রাখলেও, আড়ালে গিয়ে অনুভার জন্য ঠিক আরাফের মতোই ভেঙে পড়ে। ফ্রান্সের আসার পর অনুভার স্মৃতিগুলো আরও বেশি তাড়া করে তাকে। বাবার চোখের আড়াল হতে পারলেই সে আরাফকে কোলে নিয়ে ছুটে যেত সেই পরিচিত পাহাড়ের কিনারায়, যেখানে অনুভা মাঝেমধ্যে তাকে না জানিয়ে একা একা গিয়ে বসে থাকত। কখনো কখনো বিষাদের মাত্রা এতই বেড়ে যেত যে, আরাফকে শাহানা বেগমের কাছে রেখে সে একাই সেই পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকত, কাঁদত, শূন্য আকাশে মুখ তুলে চিৎকার করে নিজের হাহাকার জানাত। এভাবেই না খেয়ে, না ঘুমিয়ে কেবল আরাফের মুখের দিকে তাকিয়ে কোনো রকমে তার দিনগুলো কেটে যাচ্ছে তার। শান্তর জীবন থেকে আরাফ নামক এই অবলম্বনটুকু কেড়ে নিলে ছেলেটা যে একদম নিঃশেষ হয়ে যেত, তা এখন শাহানা বেগম আর ইয়াসির খানও মনে মনে অনুধাবন করতে পেরেছেন।

​আজকের দিনটা অবশ্য অন্য দিনগুলোর চেয়ে কিছুটা আলাদা। ইয়াসির খান ব্যবসার একটা জরুরি কাজে মার্সেই শহরের বাইরে গিয়েছেন। তাই বিকেলে শান্ত আরাফকে নিয়ে কাছের একটা পার্কের উদ্দেশ্যে বের হয়। শাহানা বেগম জোর করেই ড্রাইভারকে সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ​চলন্ত গাড়ির পেছনের সিটে আরাফকে কোলে নিয়ে বসে আছে শান্ত, আর সামনে মন দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে ড্রাইভার। কোলের ওপর বসা ছোট্ট আরাফ তখন বাইরের জগতের দিকে তাকিয়ে নিজের মনেই একরাশ দুষ্টুমিতে মেতে উঠেছে, যা দেখে শান্তর বিষণ্ণ মুখেও মলিন হাসি ফুটে উঠল।

পার্কের প্রধান গেইটের সামনে এসে গাড়িটা ব্রেক কষল। ড্রাইভার দ্রুত নেমে পেছনের দরজাটা খুলে দিতেই নামার প্রস্তুতি নেয় শান্ত। এক হাতে আরাফকে সে নিজের পাঁজরের একপাশে শক্ত করে চেপে ধরে, পকেট থেকে একটা কালো রোদ চশমা বের করে পড়ে নেয়। এরপর গাড়ির বডি ধরে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে এক হাতের বগলে ক্র্যাচটা চেপে, ধীরলয়ে সে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। ম্যাডামের কড়া নির্দেশ থাকায় ড্রাইভার পিছু ছাড়ল না, সে-ও শান্তর ঠিক পাশাপাশি তাল মিলিয়ে হাঁটতে লাগল। পার্কের ভেতরে ঢুকে কিছুটা খোলামেলা জায়গা পেতেই শান্ত আরাফকে কোল থেকে আলতো করে সবুজ ঘাসের ওপর নামিয়ে দিল। মাটিতে পা রাখতেই এতক্ষণের বন্দিদশা ভুলে আরাফ খিলখিল করে হেসে তার ছোট্ট পা দুটো ফেলে টলমল পায়ে সোজা দৌড় দিল পার্কের এক কোণে থাকা রঙিন চিলড্রেনস স্লাইড আর স্প্রিং রাইডারগুলোর দিকে। একটা লাল রঙের প্লাস্টিকের ঘোড়া আকৃতির স্প্রিং রাইডারে গিয়ে সে হাত রাখল, যেন ওটায় চড়ার জন্য তার তর সইছে না।

​শান্ত একটু এগিয়ে গিয়ে একটা কাঠের বেঞ্চিতে এসে ধীরেসুস্থে বসল। ক্র্যাচটা পাশে হেলান দিয়ে রেখে সে একদৃষ্টে আরাফের দিকে তাকিয়ে রইল। রোদ চশমার আড়ালে থাকা শান্তর চোখ দুটোতে এক অদ্ভুত মায়া। আরাফ স্প্রিং রাইডারে চড়ে দুলতে দুলতে একটু পরপরই খেলা থামিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছিল পাপা ঠিক জায়গায় আছে কি না। যখনই সে দূর থেকে দেখছিল শান্ত ওর দিকেই তাকিয়ে আছে, অমনি আধো-আধো গলায় ‘পাপা’ বলে চিৎকার করে হাত নাড়ছিল। শান্তও দূর থেকে হালকা হেসে হাত উঁচিয়ে ছেলেকে হাই জানাল।

​ড্রাইভারটি এসে একদম দূরত্ব না রেখে শান্তর গা-ঘেঁষে বসল। এত কাছাকাছি কারো বসে থাকাটা শান্তর ঠিক পছন্দ হলো না। সে চোখের কোণে তীব্র গাম্ভীর্য নিয়ে ড্রাইভারের দিকে তাকাল। তারপর একদম নিচু অথচ ভারী গলায় বলল,

_“তুমি আমার ড্রাইভার নাকি গার্লফ্রেন্ড যে, এভাবে সবসময় আমার সঙ্গে জোড়া বেঁধে থাকতে হবে?”

​ড্রাইভার একটু চওড়া হাসি দিয়ে কথা ঘোরানোর ছলে শান্তকেই উল্টো খোঁচা দিয়ে বলল,

_“স্যার, এই যুগে এসেও যে আপনার কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই, এটা আমার সামনে বলতে আপনার নিজের একটুও লজ্জা লাগছে না?”

​ড্রাইভারের এমন চটপটে আর ধূর্ত জবাবে শান্ত কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর আরাফের দিকে তাকিয়ে একটু হাত নাড়িয়ে ফের ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে বলল,

_“ যতটুকু তোমার ডিউটি, ততটুকুই করো। অন্তত এতটুকু দূরত্ব বজায় রেখে বসো, যাতে শান্তিতে নিঃশ্বাস নিতে পারি।”

ড্রাইভার এবার কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে একটু সরে বসল। শান্ত আবারও সেই স্প্রিং রাইডারে খেলতে থাকা আরাফের দিকে চোখ ফেরাল। ​কিছুক্ষণ পর পার্কের একপাশ থেকে একটা চেনা গানের সুর ভেসে এলো। কোনো এক মেয়ের কণ্ঠে বাংলা গানের কিছু লাইন। পরিচিত গানের সেই লাইন দুটো শান্তর কানে এসে আছড়ে পড়ছিল,

—​“ ঘুরে ঘুরে চলা একলা মন, খুঁজে পায় প্রতি-পল...

উড়ে উড়ে করা দিন যাপন, কবে দিশা পাবে বল..

যাবে কী একা একা রাত কেটে, এভাবে ওভাবে…!

হবে কী দেখা শোনা কোনোমতে, মাঝপথে, বল কবে?”

চারপাশের ফরাসি কোলাহলের মাঝে এই চেনা বাংলা সুরের কণ্ঠটা এতই নিখাদ যে, না চাইতেও শান্ত সেদিকে তাকাতে বাধ্য হলো। পার্কের ঠিক এক কোণে, খোলা আকাশের নিচে ছোট্ট একটা কফি শপের আদলে তৈরি ক্যাফে। সেখানে একটি চেয়ারে বসে একা একা গিটার বাজিয়ে গান গাইছে এক তরুণী। তার সম্পূর্ণ মনোযোগ হাতের গিটার আর সুরের ওঠানামার দিকে। মাথার ওপর একটা লেডিস ক্যাপ সামান্য বাঁকিয়ে পরা, যা তার মুখের অবয়বটাকে খানিকটা আড়াল করে রেখেছে। গায়ে জড়ানো একটা কালো রঙের ভারী লেদার জ্যাকেট।

শান্ত বেশিক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থাকল না। মেয়েটার পাশের খালি চেয়ারটায় আচমকা এক ক্যাপ পরিহিত পুরুষ এসে বসতেই সে নিজের চোখ জোড়া ফিরিয়ে নিল। ওই ছেলেটার চেহারা কেমন কিংবা তাদের মাঝে কী সম্পর্ক, তা দেখার বা জানার ন্যূনতম কোনো প্রয়োজনও মনে করল না সে।

দৃষ্টি ফিরিয়ে আবারও আরাফের দিকে তাকাতেই শান্তর বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। জায়গাটা সম্পূর্ণ ফাঁকা! এই তো কয়েক সেকেন্ড একটু আগেও ছেলেটা চোখের সামনে মনের আনন্দে দুলছিল, এখন হুট করেই উধাও হয়ে গেছে! শান্তর মাথার ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেল। ক্র্যাচটা বগলে চেপে তড়িঘড়ি করে বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াল। তখনই পার্কের অন্য প্রান্ত থেকে আরাফের চেনা কান্নার আওয়াজ এসে আছড়ে পড়ল তার কানে। শান্ত চমকে উঠে শব্দের উৎস লক্ষ্য করে পাশে তাকাতেই থমকে গেল। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই জ্যাকেট পরা মেয়েটিকে জাপটে ধরে ‘মা মা’ বলে চিৎকার করে কাঁদছে আরাফ। মেয়েটিও ইতিমধ্যে হাঁটু গেড়ে বসে পরম মমতায় অবুঝ আরাফকে নিজের কোলে তুলে নিয়েছে।

​

পায়ে প্রচণ্ড কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও শান্ত ক্র্যাচে ভর দিয়ে যত দ্রুত সম্ভব সেখানে ছুটে গেল। এক রকম ছিটকে গিয়ে সে মেয়েটির কোল থেকে আরাফকে টেনে নিতে চাচ্ছিল, কিন্তু সেই মুহূর্তেই শান্তর পুরো শরীর পাথরের মতো জমে গেল। তার চোখের পলক পড়া বন্ধ হয়ে যায়। এখন তার একদম সম্মুখে, সে জ্যাকেট পড়া, গান গাওয়া মেয়েটি আর কেউ নয়, মাহভিন! শান্ত অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইল। তার কণ্ঠনালী শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। অত্যন্ত অস্থির আর রুদ্ধশ্বাসে সে বিড়বিড় করে বলে উঠল,

_“মাহভিন! তুমি? তু-তুমি এখানে...?”

​শান্তর পরবর্তী বাক্যটি শেষ হওয়ার আগেই মেয়েটি ওর মুখের অস্থিরতা দেখে অত্যন্ত সহজ, স্বাভাবিক গলায় সে বলে উঠল,

_“সরি, আমি মাহভিন নই। আমার নাম মেহমিল।”

​

শান্ত এবার আরেক ধাক্কা খেয়ে পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেল।

​শান্ত ঘোরলাগা চোখে চেয়ে থেকে অস্ফুট স্বরে শুধাল,

_“মানে? তুমি কী বলছ এসব? মেহমিল মানে...?”

শান্তকে ওভাবে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মেহমিল মুচকি হাসল। সে গিটারের বেল্টটা কাঁধ থেকে নামিয়ে চেয়ারের পাশে হেলান দিয়ে রেখে বলল,

_​“মেহমিল মানে মেহমিল! আমার নাম অনামিকা মেহমিল শিকদার।”

শান্ত আরাফকে কোল থেকে নামিয়ে, তারপর এক হাতে মেহমিলের বাহু শক্ত করে চেপে ধরে তীক্ষ্ণ চোখে বলল,

_“ আর কত ফাঁকি দিবে আমার চোখে? অনেক হয়ছে! আমি পাগলের মতো তোমাকে খুজে বেরাচ্ছি, আর এদিকে তুমি পরিচয় গোপন রেখে চলাফেরা করছ!”

মেহমিলের হাসি নিভে গেল। কিছুই ঢুকছে না তার মাথায়। শান্ত আর কিছু বলার আগেই পাশে মেহমিলের সঙ্গে থাকা ছেলেটা মেহমিলের বাহু থেকে শান্তর হাত সরিয়ে দিয়ে বলল,

_“ চাচ্চু বলেছিল তুই পাগল হয়ে গেছিস। কিন্তু মেয়ে দেখলেই পাগলামি করবি, এমন তো ভাবিনি!”

শান্ত এতক্ষনে পাশের ছেলেটার উপর নজর দিলো। এতে সে যেন টুপ করে আকাশ থেকে পড়ল। এটা তার কাজিন ফারহান খান ইজান। সবার কাছে ডা. ইজান খান নামে পরিচিত। কিন্তু ও মাহভিনের সাথে কী করছে সে হিসেব শান্তর মিলছে না। এদিকে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা আরাফ আবারও মেহমিলের দু’পা জড়িয়ে ধরে কান্না জুড়ে দিয়েছে। সে বারবার হাত বাড়িয়ে মেহমিলের কোলে ওঠার আকুতি জানাচ্ছে। এতদিন পর নিজের মাকে চোখের সামনে পেয়ে অবুঝ শিশুটা বড্ড অস্থির হয়ে উঠেছে। মেহমিলও আর স্থির থাকতে পারল না। সে নিজের মাথার ক্যাপটা খুলে কফির টেবিলে রেখে আরাফকে কোলে তুলে নিয়ে ওর গালে একটা চুমু খেল। মেহমিল নিজেও জানে না এই অচেনা বাচ্চাটা কেন তাকে দেখে এমন করছে। মেহমিলের কোলে ওঠার সাথে সাথেই আরাফ ওর গলাটা দুই হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে তার ঘাড়ে মাথা দিয়ে এক গভীর শান্তিতে শুয়ে পড়ল।

​ছেলের এই কাণ্ড দেখে শান্ত এবার আরও বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। সে মেহমিলের দিকে তাকিয়ে চিবুক শক্ত করে বলল,

_“ নাটক বন্ধ করো মাহভিন! কোথায় ছিলে এতদিন? তায়ান কোথায়?”

_“ আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে, আমি মাহভিন নই! আর তায়ান? সেটা আবার কে? আপনি কি একটু বুঝিয়ে বলবেন আমাকে?”

মেহমিল এবারও বেশ শান্ত গলায় বলল।

_“ তুমি যদি মাহভিন না হবে, তাহলে তখন আরাফকে আদর করছিলে কেন?” আরাফকে ইশারা করে বলল শান্ত।

_“ এই বাচ্চাটার কথা বলছেন? আদর করব না কেন! এটা তো সেই বাচ্চা, যাকে তিন মাস আগে আমি বাংলাদেশের একটা হসপিটালে ব্লাড দিয়েছিলাম। এটা তাহলে আপনার বাচ্চা?”

শান্ত এবার শুধু জমে গেল না। পুরো বরফের স্তুপ হয়ে গেল যেন। মস্তিষ্কে বজ্রপাতের মতো আঘাত করছে কিছু একটা। সে নিজের মাথাটা চেপে ধরে। পাশে থাকা ড্রাইভার শান্তকে এমন অশান্ত হতে দেখে তার বাহু আগলে ধরে বলল,

_“ স্যার, আপনার কী খারাপ লাগছে? চলুন বাসায় ফিরে যাই।”

শান্ত ঝটকা মেরে সরিয়ে দিল ড্রাইভারের হাত। কিন্তু তীব্র মানসিক ধাক্কা আর শরীরের অতিরিক্ত দুর্বলতায় সে নিজের ভারসাম্য ধরে রাখতে পারছিল না, শরীরটা ভেঙে আসছিল। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ইজান দ্রুত এগিয়ে এসে শান্তকে আগলে ধরে পাশের একটা চেয়ারে বসিয়ে দিল। শান্ত বসার সাথেসাথেই হাতের ক্র্যাচটা মাটিতে ফেলে দিয়ে ইজানের শার্টের কলার খামচে ধরল। তার চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে, রুদ্ধশ্বাসে সে বলল,

_“সত্যিটা বল আমায়! তুই ওর সঙ্গে এখানে কী করছিস? আর ও কেন বলছে ও মাহভিন না? কী করেছিস তোরা ওর সঙ্গে? পাপা... পাপা তোদের এসব করতে বলেছে, তাই না?”

​ইজান শান্তর হাতটা আলতো করে নিজের কলার থেকে সরিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

_“পাগলামি বন্ধ কর আরাফাত! তুই যার নাম বলছিস ও সে নয়। আমি মেহমিলকে খুব ভালো করেই চিনি। ও আমার প্রফেসরের মেয়ে।”

_​“এটা অসম্ভব! তুই স্পষ্ট মিথ্যা বলছিস।” শান্তর গলায় তখনো তীব্র অবিশ্বাস।

​মেহমিল আর কোনো কথা বাড়াল না। সে আরাফকে এক হাতে কোলে রেখেই নিজের পার্স থেকে একটা পরিচয়পত্র বের করে শান্তর চোখের সামনে ধরল। শান্ত অবিশ্বাস্য চোখে সেটার দিকে তাকিয়ে রইল। কার্ডটা বাংলাদেশের নয়, এটা ফ্রান্সের এক নামী মেডিকেল কলেজের স্টুডেন্ট আইডি। আর পরিচয়পত্রে থাকা ছবিটা বেশ কয়েক বছর পুরোনো। অবিকল অনুভার মতো দেখতে হলেও তাদের স্টাইল আর গেটআপে আকাশ-পাতাল ভিন্নতা রয়েছে। এই ছবিটা যত বছর আগের, তখন অনুভার বাংলাদেশে থাকার কথা। আর অনুভার চুল কখনোই এত ছোট ছিল না, অথচ কার্ডের ছবিতে মেয়েটার চুল কাঁধ অব্দি ছাঁটা।

​

সবকিছু মিলিয়েও একটা সমীকরণ শান্তর মাথায় মিলল না। মেয়েটা নিজেই বলছিল, সে নাকি তিন মাস আগে বাংলাদেশে আরাফকে ব্লাড দিয়েছে, অথচ সে দেখতে হুবহু অনুভার কার্বন কপি! শান্ত আর নিতে পারছে না। তার চারপাশটা অন্ধকার হয়ে আসছে। এই দুর্বল মাথায় এত জটিল রহস্য মেলানো এই মুহূর্তে তার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ​শান্তর এমন মূর্ছা যাওয়ার মতো অবস্থা দেখে ড্রাইভার আর দেরি করল না। সে গাড়িটা পার্কের ভেতরে ঠিক ওদের কাছাকাছি এনে ব্যাক সিটের দরজা খুলে দিল এবং ইজানের সাহায্যে শান্তকে ভেতরে বসিয়ে দিল।

​শান্তকে গাড়িতে রেখে ড্রাইভার মেহমিলের দিকে এগিয়ে গেল। সে মেহমিলের কোল থেকে আরাফের বাহু ধরে নিজের দিকে টান দিতেই আরাফ হুট করে পেছন ঘুরে কোনো কথা না বলে নিজের ছোট্ট হাত দিয়ে ড্রাইভারের গালে ঠাস করে একটা চড় কষে দিল। বাচ্চাটার চোখ-মুখ তখন রাগে লাল। এতদিন পর নিজের মাকে খুঁজে পেয়েছে ও, আর এই লোক কিনা তাকে আবার মায়ের কাছ থেকে দূরে সরাতে চাইছে! চড় মেরেই ক্ষান্ত হলো না আরাফ, নিজের অবুঝ আর অস্পষ্ট ভাষায় সে ড্রাইভারকে বেশ কিছুক্ষণ ধমকে দিলো। ​

ড্রাইভার অবশ্য খামখেয়ালি বাচ্চার এই কাণ্ডে হাল ছাড়ল না। ছোট্ট হাতের চড়, থাপ্পড় আর নখের খামচি সহ্য করেই সে জোর করে আরাফকে মেহমিলের কোল থেকে নিজের কাছে টেনে আনতে চাইল। ড্রাইভারের এই অতিরিক্ত জোরাজোরিতে আরাফ এবার আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। সে কিছুতেই তার মায়ের কোল ছেড়ে আসবে না, কোনো শর্তেই না।

বাচ্চার ওপর এমন জবরদস্তি দেখে মেহমিলের মেজাজটা এবার সত্যিই বিগড়ে গেল। সে ড্রাইভারের হাতটা ঝটকা মেরে সরিয়ে দিয়ে রাগত স্বরে বলে উঠল,

_“স্টপ ইট! আপনি একটা বাচ্চার সাথে এমন করতে পারেন না। দেখছেন না হি ইজ নট উইলিং টু গো? ও যেতে চাইছে না!”

​ড্রাইভার কিছুটা অসহায় মুখে বলল,

_“রেখে তো আর যাওয়া যাবে না, ম্যাম। ছোট স্যারের শরীর ভালো না, এক্ষুনি বাসায় ফিরতে হবে। আর এই বাচ্চাকে এখানে রেখে গেলে আমার চাকরি নিয়ে টানাটানি পরবে।”

_​“কিন্তু ও তো কোনোমতেই আপনার কাছে যাবে না। দেখছেন না ও কীভাবে কাঁদছে?” মেহমিল আরাফকে আরও শক্ত করে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরল।

_​“কাঁদুক, গাড়িতে উঠিয়ে নিলেই আর কাঁদবে না।” ড্রাইভারের এমন নির্বিকার আর কাঠখোট্টা আচরণ মেহমিলের কাছে অসহ্য ঠেকল। সে বিরক্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

_“বাসা কতদূর আপনাদের?”

_​“খুব বেশি দূর না ম্যাম, এই তো সামনেই।”

​মেহমিল আরাফের কান্নার দিকে একবার তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

_“আচ্ছা, চলুন। আমিও আপনাদের সঙ্গে যাচ্ছি।”

​মেহমিলের মুখে এই কথা শুনে ড্রাইভার যেন মেঘ না চাইতেই জল পেল। সে এক গাল হেসে স্বস্তি নিয়ে বলল,

_“তাহলে তো খুব ভালো হয়, চলুন! আমি আবার আপনাকে কাজ শেষ হলে আপনার বাসায় ড্রপ করে দিয়ে আসব।”

​মেহমিল ড্রাইভারের কথা সম্পূর্ণ শেষ হতেই দিল না। সে আরাফকে কোলে নিয়েই গটগট করে এগিয়ে গিয়ে গাড়ির পেছনের সিটে শান্তর পাশে বসে পড়ল। শান্ত এক পলক মেহমিলের দিকে তাকাল, কিন্তু পরক্ষণেই একরাশ ক্লান্তি আর জটিল সমীকরণ মাথায় নিয়ে চোখ ফিরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল। ​মেহমিল সিটে হেলান দিয়ে বসতেই লক্ষ্য করল, সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে ইজানও এসে দিব্যি জাঁকিয়ে বসেছে। ইজানকে দেখামাত্রই মেহমিল আবার তেতে উঠল,

_“হোয়াট ইজ দিস? আপনি কি সব জায়গায় আমার পিছু নেবেন?”

​ইজান আয়না দিয়ে মেহমিলের দিকে তাকিয়ে বেশ গর্বের সাথে বুক ফুলিয়ে বলল,

_“যেখানে যাচ্ছো, সেটা আমার আপন চাচার বাসা। সো, আমি তো যাবই!”

​মেহমিল আর কিছু বলার ভাষা খুঁজে পেল না। বিরক্তির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে নিজের কোলে শান্ত হয়ে আসা বাচ্চাটার দিকে মনোযোগ দিল। সে আজ পার্কের এই নিরিবিলি কোণটায় একাই একটু নিজের মতো সময় কাটাতে এসেছিল। কে জানে এই ইজাইন্না তাকে কোত্থেকে দেখে ফেলেছে! কোথাও গিয়ে যে একটু শান্তিতে নিঃশ্বাস নেবে, তার কোনো উপায় নেই। যেখানেই যাবে, কোত্থেকে যেন এসে হাজির হবেই!

শাহানা বেগমও শান্তর মতোই বিস্ময়ে পাথর হয়ে গিয়েছিলেন মেহমিলকে দেখে। ইজান শাহানা বেগমকে সবটা বুঝিয়ে বলে। সেই সাথে শাহানা বেগমের কাছ থেকেও সে জেনে নেয় শান্তর এই মানসিক অবস্থার আসল কারণ। তার মুখ থেকে অনুভার মা’রা যাওয়া এবং শান্তর ভেতরের হাহাকারের গল্পটা শুনে মেহমিল নিজেও বেশ চমকাল । প্রথমে তার স্বাভাবিকই লেগেছিল। হয়তো তার চেহারা কারো সাথে মিলে যাওয়ায় বাচ্চাটা আর লোকটার ভুল হয়েছে। তবে দুনিয়ায় একটা মেয়ের সাথে অন্য একটা মেয়ের ঠিক কতটুকু মিল থাকলে, অবুঝ একটা বাচ্চার পাশাপাশি শান্তর মতো একজন প্রাপ্তবয়স্ক যুবকও এমন মারাত্মক ভুল করে বসল!

​তবে এই সবকিছুর চেয়েও যে বড় একটা খটকা মেহমিলের মাথায় এসে ধাক্কা দিল, এই বাচ্চার মা যদি দেখতে হুবহু তারই মতো, আর এই বাচ্চাকেই সে তিন মাস আগে বাংলাদেশের হাসপাতালে নিজের রক্ত দিয়েছিল। যেই সেই রক্ত নয় অত্যন্ত দুর্লভ 'বোম্বে ব্লাড গ্রুপ'। তার বাবা যেখানে মেহমিলের এই বিশেষ রক্তের কারণে তাকে সবসময় সাবধানে রাখতেন এবং অন্য কাউকেই সহজে রক্ত দিতে দিতেন না, সেখানে এই বাচ্চার বেলায় মেহমিলকে প্রায় জোর করে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। মেহমিলের স্পষ্ট মনে আছে, সেদিন উনার আচরণে কী পরিমাণ অস্থিরতা আর ছটফটানি ছিল!

​তখনকার পরিস্থিতিতে এসব নিয়ে মেহমিলের মনে কোনো প্রশ্ন না জাগলেও, আজ এই পার্কের ঘটনার পর ভেতরের সন্দেহটা দানা বেঁধে উঠছে। এত কিছু কখনোই কাকতালীয় হতে পারে না। এই বাচ্চার মায়ের সঙ্গে নিশ্চয়ই মেহমিলের কোনো অতীত বা রক্তের যোগসূত্র তো আছে। আর এই সত্যটা মেহমিলের বাবা খুব ভালো করেই জানেন, যা এতদিন লুকিয়ে রাখা হয়েছে। ​লিভিং রুমের বসে মনে মনে ভাবছিল সে। তবে সে স্বভাবসুলভভাবেই একদম উত্তেজিত হলো না। কারণ সে জানে, এই সমস্ত রহস্যের জট একমাত্র তার বাবাই খুলতে পারবেন। মেহমিল অযথা দুশ্চিন্তা করে নিজের ওপর চাপ নেওয়ার মতো মেয়ে নয়। সে বেশ ঠান্ডা মাথায় সোফায় পিঠ ঠেকিয়ে বাবার কাছে মুখোমুখি জবাব চাওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগল।

বাসায় ফেরার পর লিভিং রুমে এক মুহূর্তের জন্যও দাঁড়ায় নি শান্ত। কারও সাথে কোনো কথা না বলে নিজের ক্র্যাচে ভর দিয়ে সোজা দোতলায় চলে গেছে। ​এদিকে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসা মেহমিলের কোল থেকে নামতেই চাইছে না আরাফ। এতদিন পর মায়ের মতো কাউকে কাছে পেয়ে অবুঝ শিশুটার আনন্দের যেন সীমা নেই। সে একে একে নিজের পছন্দের রঙিন গাড়ি, প্লাস্টিকের ব্লক আর স্প্রিংয়ের খেলনাগুলো এনে সে মেহমিলের কোলের ওপর জড়ো করতে লাগল। আধো-আধো অস্পষ্ট ভাষায় সে মেহমিলকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল, এতদিন সে কী কী খেলেছে, আজ সকালে কী কী মজার খাবার খেয়েছে। প্রতিটি কথার সাথে তার চোখ-মুখের অভিব্যক্তি আর হাত-পায়ের চপলতা দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, সে নিজের মনের সবটুকু জমানো গল্প আজ একবারে উজার করে দিতে চায়।

​মেহমিল একটুও বিরক্ত হলো না। সে মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে অত্যন্ত ধৈর্য নিয়ে আরাফের প্রতিটি ভাঙা ভাঙা কথা শুনছিল। বাচ্চাটা যখন একটা খেলনা উঁচিয়ে কিছু বলছিল, মেহমিলও তখন বাচ্চার মতোই হেসে উঠে তাতে সায় দিচ্ছিল। ​আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা শাহানা বেগম কিংবা ইজানের কাছে মেহমিলকে কেবলই অনুভার অবিকল প্রতিরূপ বা আারাফের মায়ের মতো দেখতে কেউ একজন মনে হলেও, আরাফের দুনিয়ায় কোনো ‘মতো’ শব্দের অস্তিত্ব নেই। তার অবুঝ মন কোনো লজিক বোঝে না, কোনো ডিএনএ টেস্টও চেনে না। আরাফের কাছে এটাই তার নিজের জন্মদাত্রী মা, যাকে সে এতদিন পর ফিরে পেয়েছে।

——————

শান্তর রুমে ডা.রামিন শিকদার, মেহমিল, ইয়াসির খান, শাহানা বেগম এবং ইজান বসে আছে। আরাফ ঘুমাচ্ছে তবে এখনও ওর ছোট্ট মুঠোতে মেহমিলের আঙুল। বাচ্চাটার মনে ভয় ঢুকে গেছে যদি মা আবারও চলে যায়! সারাদিনেও যখন আরাফের থেকে ছাড়া পাচ্ছিল না মেহমিল, তখন ইজানের থেকে খোঁজ নিয়ে রামিন শিকদাল এ বাড়িতে চলে আসে। এসে আরাফ আর শান্তকে দেখে চমকায়। তেমনি শান্তও রামিন শিকদারকে দেখে চমকায়।

এতকিছুর পর এটা একদম স্বাভাবিকই যে তার কাছে এসবের পেছনের কারণ জানতে চাইবে। শান্তর এখানে খুব একটা আগ্রও নেই। কারণ, সে মেয়েটার পরিচয়পত্র দেখে বুঝে গিয়েছে এই মেয়েটা মাহভিন নয়। আর এই মেয়েরটার কথা চাঞ্চলতা, আচরণ অনুভার মতোও না, তবে মেহমিল তো শুনেই ছাড়বে। তাই সবাইকে নিয়ে নিজের বাবাকে মাঝখানে রেখে সে সামনে মুখোমুখি হয়ে বসেছে।

_“ বলো বাবা, আরাফাত খানের ওয়াইফ—অনুভার সাথে আমার কীসের সম্পর্ক? তার সাথে আমার চেহারার মিল, এবং তার সন্তানের সাথে আমার ব্লাড গ্রুপের মিল। তার উপর তুমি তাদের চেন।”

মাঝখান থেকে শান্তর বাবা বলে উঠল,

_“ আমার ছেলে অবিবাহিত। ওর কোনো ওয়াইফ-সন্তান কিছুই নেই। ও শুধু মেয়েটাকে ভালোবাসত। তাই তার অবর্তমানে, তার সন্তানকে নিজের কাছে রাখছে। কারণ ও একটা পাগল।”

মেহমিলের চোয়াল এবার ঝুলে এলো। ও তো এতক্ষন এটাই ভাবছিল আর এটা ভাবাই তো স্বাভাবিক! ইয়াসির খানের এই রূঢ় কথার পিঠে শান্ত একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। সে শুধু একবার অত্যন্ত গম্ভীর আর তপ্ত চোখে নিজের বাবার দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো।

ইয়াসির খানের সত্যের রেশ কাটতে না কাটতেই রামিন শিকদার ঘরের থমথমে বাতাসকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়ে বিশাল এক বিস্ফোরণ ঘটালেন। অত্যন্ত ভারী আর অপরাধবোধে জড়ানো গলায় তিনি বললেন,

_​“অনুভা তোমার যমজ বোন, মেহমিল!”

​এই একটি বাক্য যেন পুরো ঘরের ওপর আস্ত একটা আকাশ ভেঙে ফেলল। বিশেষ করে মেহমিলের মাথায়! ও শ্বাস নিতে ভুলে গেল। স্তব্ধ হলো মস্তিষ্ক। ফ্যালফ্যাল করে নিজের বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। শান্তও চমকে উঠে রামিন শিকদারের দিকে তাকালেন।

তারা কিছু বলার আগেই মেহমিলের মাথায় পরবর্তী বাজটা এসে পড়ল, যখন ওর বাবাকে বলতে শুনল,

_“ আর আমিও তোমার আসল বাবা নই।”

না চাইতেও মেয়েটার চোখে বর্ষন নামল। সে অপলক তাকিয়ে আছে তার বাবার দিকে। তার বাবা নিজে বলছে সে তার আসল বাবা নয়। তার বাবা নিজে বলছে তার যমজ বোন আছে। যে চেহারা সে আয়নায় রোজ দেখে, তার একটা হুবহু প্রতিরূপ এই পৃথিবীতে টিকে ছিল, অথচ সে দীর্ঘ তেইশটা বছর ধরে কিচ্ছু জানত না!

_“তাহলে আমার বাবা কে? আমার আসল পরিবার কারা?” বেশ কিছুক্ষন ওর ধরা গলায় বলল মেহমিল।

_“ ওরাই, যেদিন তুমি তাদের হসপিটালে দেখেছিলে।”

_“ তাহলে আমার মা, আমার মা বেঁচে আছে?”

_“ এত মিথ্যের মাঝে আমি তোমাকে একটাই সত্য বলেছি। আর তা হলো, তোমার মা সত্যিই বেঁচে নেই।”

_“ তাহলে আমার বাবা।”

_“ সেও বেঁচে নেই।” উত্তরটা এবার শান্ত দিলো।

_“ তাকে মাহভিন মে’রে ফেলেছে।”

_“ কিন্তু কেন?”

উত্তর দিলো না শান্ত। সে রামিন শিকদারের দিকে তাকিয়ে বলল,

_“ তাহলে আপনিই জেসমিন আন্টির একতরফা প্রেমিক?”

রামিন শিকদার সম্মতি জানাল। তারপর সে ইয়াসির খানের দিকে তাকিয়ে বললেন,

_“ আপনি একটু আগে নিজের ছেলেকে পাগল বললেন না? এবার আমাকেও আপনার পাগলই মনে হবে। কারণ আমি আপনার ছেলের মাঝে দ্বিতীয় রামিন শিকদারকে খুঁজে পেয়েছি।”

তার কথা ইয়াসির খান বুঝলেন না। মেহমিল চোখে জল নিয়েই অত্যন্ত শীতল গলায় বলল,

_“ সবটা জানতে চাই আমি বাবা! এক্ষুনি জানতে চাই।”

রামিন শিকদার লুকালেন না আর কিছু। সব বললেন। অতীতে ঘটে যাওয়া সব।

​সে এক অন্য রামিন শিকদারের গল্প। জেসমিন নামের এক তরুণীকে সে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসত। গরীব রামিনের চোখে তখন জেসমিনকে নিয়ে এক আকাশ রঙিন স্বপ্ন। সবকিছুই বলতে লাগলেন একে একে। সে জেসমিনকে কতটা ভালোবাসত। তাকে নিয়ে কতটা স্বপ্ন দেখত। জেসমিনের মানসিক দূর্বলতা। জেসমিনের বাবা, অর্থাৎ অনুভা আর মেহমিলের নানার কাছে আরশাদ নিজেকে এতটাই বিশ্বস্ত আর ভালো মানুষ হিসেবে প্রমাণ করেছিল যে, জেসমিনের পুরো গর্ভকালীন সময়টার দায়িত্ব সে নিজের কাঁধে তুলে নেয়। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, নিয়মিত চেকআপ করানো, ওষুধ খাওয়ানো। সবকিছু সে নিজেই তদারকি করত।

​আর এই সুবাদেই আরশাদ আল্ট্রাসনোগ্রাফির রিপোর্টে এক মারাত্মক সত্য জানতে পারে। জেসমিনের গর্ভে একটা নয়, দুটো প্রাণ স্পন্দিত হচ্ছে। দুটোই কন্যাসন্তান। কিন্তু এই লোভী লোকটা সেই সত্য শুধু পুরো পরিবার নয়, স্বয়ং জেসমিনের থেকেও সুকৌশলে লুকিয়ে রাখে। মানসিক সমস্যায় জর্জরিত জেসমিনও উথাল-পাথাল দিনগুলোর মাঝে এই চক্রান্তের বিন্দুবিসর্গ টের পায়নি। ​জেসমিন সেই সত্য জানতে পেরেছিল জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিনে। যেদিন ডাক্তার তার গর্ভ থেকে একটা নয়, পরপর দুটো ফুটফুটে কন্যাসন্তান বের করেন। কিন্তু মা হওয়ার সেই অসীম আনন্দ উপভোগ করার আগেই জেসমিনের মুখের আলো নিভে যায়। অবশ শরীরে সে দেখতে পায়, তার প্রথম জন্ম নেওয়া সন্তানটিকে ডাক্তার এক নার্সের হাতে তুলে দিয়ে গোপনে বিক্রি করে দেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছে! এই দৃশ্য দেখে জেসমিন যন্ত্রণায় আর চিৎকারে ফেটে পড়লে ডাক্তার রেগে গিয়ে বাইরে থেকে ডেকে নিয়ে আসে আরশাদকে।

অন্যদিকে ​রামিন তখন মেডিকেলের ছাত্র হওয়ায় সেই হাসপাতালে তার প্রায়ই যাতায়াত ছিল। সেদিনও এক বিশেষ কাজে সে সেখানে গিয়েছিল এবং ওটি-র বাইরের সেই অরাজকতা ও জেসমিনের কান্নার আওয়াজ তার কান এড়ায়নি। ভেতরে কী ভয়ঙ্কর খেলা চলছে, তা বুঝতে রামিনের সময় লাগেনি। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, ভালোবাসার শেষ স্মৃতিকে বাঁচাতে সে জেসমিনকে উদ্ধার করতে না পারলেও, সেই বিক্রি হতে যাওয়া সন্তানটিকে বুকে চেপে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যায়। কয়েকটা দিন সে সম্পূর্ণ নিখোঁজ ছিল সেই সদ্যোজাত শিশুকে বাঁচানোর তাগিদে। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে ফিরে এসে জানতে পারে, জেসমিন আর এই পৃথিবীতে নেই। ​সেদিন রামিন শিকদার শিশুর মতো ডুকরে কেঁদেছিলেন।

এরপরের প্রতিটি দিন তিনি জেসমিনের কবরের পাশে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতেন, কোলের ওপর সেই ছোট্ট ফুটফুটে শিশুটিকে নিয়ে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, সেদিন জেসমিনের আরও একটা কন্যাসন্তান বেঁচে গিয়েছিল। সেই বাড়ির অন্ধকার দেয়ালে সে বড় হচ্ছে এবং তার নাম রাখা হয়েছে মাহভিন অনুভা।

তাই সে নিজের কাছে থাকা বাচ্চাটার নাম রাখে অনামিকা মেহমিল। মেহমিল তার কাছে ভালে থাকলেও অনুভাকে নিয়ে তার সব সময় ভয় হতো। কত রাত যে তিনি অনুভাকে চুরির মতন করে নিজের কাছে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু সেই বাড়ির ছেলে তায়ান অনুভাকে যেভাবে নিজের ছায়ার মতো আগলে রাখত, তা দূর থেকে দেখেই রামিনের মনে এক অদ্ভুত ভরসা জেগেছিল। না চাইতেও সেই ছোট্ট ছেলেটার ওপর তিনি বিশ্বাস রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন। অবশেষে অনুভার ভাগ্যকে তিনি একদিকে আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন, আর অন্যদিকে ভরসা রেখেছিলেন সেই বাড়ির তায়ান আর আরমান সাহেবের ওপর।

রামিন শিকদারের মাও এক সময় মারা যায়। মায়ের মৃত্যুর পর মেহমিলই হয়ে ওঠে রামিনের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন, তার গোটা পৃথিবী। জেসমিনকে হারিয়ে যে বিশাল শূন্যতা তার জীবনে তৈরি হয়েছিল, মেহমিলের নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি সেই শূন্যতা ভুলে যেতেন। মেহমিলকে নিয়েই তিনি নিজেকে পরিপূর্ণ ভাবতেন। নিজের পড়াশোনা, ক্যারিয়ার আর হাসপাতালের ব্যস্ততার মাঝেও তিনি মা-মরা মেয়েটাকে মায়ের অভাব বুঝতে দেননি। যতটুকু সম্ভব নিজের সমস্ত আদর আর যত্ন দিয়ে তিনি মেয়েটাকে আগলে রাখতেন। মহান আল্লাহ যেন জেসমিনের ভালোবাসার প্রতিদান হিসেবে এই মেয়েটিকে তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর নেয়ামত হিসেবে পাঠিয়েছিলেন।

সে খুব কম সময়েই মেডিকেলের স্টুডেন্ট হিসেবে সুনাম কামায়। যে রামিন টাকার অভাবে বিদেশে পড়াশোনা করার স্বপ্ন মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলেছিল। তারই হঠাৎ একদিন ফ্রান্সের এক বড় মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্কলারশিপ চলে আসে। তখন মেহমিলের বয়স সাত বছর। সাত বছরের মেয়ে নিয়ে সে চলে যায় ফ্রান্সে।

জেসমিনের প্রতি তার ভালোবাসা কতটা খাঁটি আর গভীর ছিল, তা প্রমাণ করে তার পরবর্তী জীবন। জীবনের এতগুলো বসন্ত পার হয়ে গেলেও, একাকীত্বের হাজারো সুযোগ থাকা সত্ত্বেও, তিনি জীবনে দ্বিতীয় কোনো নারীকে আনার কথা স্বপ্নেও ভাবেননি। আর তাকে এ বিষয়ে জোর করার বা বোঝানোর মতোও কেউ ছিল না এ পৃথিবীতে। তিনি চাইলে পারতেন নিজের একটা নতুন সংসার গড়তে, নিজের রক্তের সন্তান পৃথিবীতে আনতে। কিন্তু তিনি তা করেননি। নিজের পুরো যৌবন, পুরোটা জীবন তিনি উৎসর্গ করে দিয়েছেন জেসমিনের রেখে যাওয়া সেই পবিত্র অস্তিত্ব, মেহমিলের পেছনে। এক জীবনে একজন পুরুষ একটা মৃত মানুষকে কতটা তীব্রভাবে ভালোবাসতে পারে, রামিন শিকদার তার জীবন্ত উদাহরণ হয়ে এই ঘরের মাঝে দাঁড়িয়ে রইলেন।

———

সেদিনের পর থেকে মেহমিলে মধ্যে নিজের বাবার প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, মায়া সবকিছু দিগুন বেড়ে যায়। দিগুন, তিনগুন, চারগুন, পাঁচগুন, দশগুন, একশগুন, হাজারগুন, লক্ষগুন, কোটিগুন! কত বেড়েছে তার হিসেব মেহমিলও জানে না। কিন্তু একটা মানুষ যে এতটা ভালো হতে পারে তা সে নিজের বাবাকে না দেখলে বুঝত না। এমন একজন মানুষকে নিজের বাবা হিসেবে পেয়ে সে বরাবরই নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবতী মনে করত, তবে এখন সেই উপলব্ধিটা তার চেতনার আরও গভীরে গিয়ে ধাক্কা দেয়।

​নিজের পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত মেহমিলের মনে একবারের জন্যও আসেনি, আর সে কখনো যাবেও না। তার বাবা এত বছর ধরে এই সত্যটা সবার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিলেন কেবল একটা মাত্র ভয়ে, যদি মেহমিলের আসল পরিবার তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়! কিংবা মেহমিল নিজেই যদি সত্যটা জানার পর ছেড়ে চলে যায়! আর তাই, সেদিনের পর থেকে সে ভুলেও কখনো নিজের সেই অন্য পরিবারের কথা মুখে আনেনি, যেন তাদের কোনো অস্তিত্বই নেই তার জীবনে।

​আরাফের প্রতি মেহমিলের টান আগে থেকেই কাজ করত, তা এখন এক অন্য মাত্রায় রূপ নিয়েছে। এই নিষ্পাপ শিশুটি যে তার নিজের যমজ বোনের রেখে যাওয়া কলিজার টুকরো! যে বাচ্চাটা পৃথিবীর সমস্ত যুক্তি উপেক্ষা করে মেহমিলকেই নিজের জন্মদাত্রী মা বলে দাবি করে আসছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই, দিন বদলের সাথে সাথে আরাফ এখন মেহমিল এবং শান্ত দুজনের জীবনেরই কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

​আরাফ যখন শান্তর বাসায় থাকে, তখন মেহমিল নিয়ম করে ছুটে আসে তার ভাগ্নে তথা নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসার এই পুচকেটার সাথে সময় কাটাতে। আবার আরাফ যখন রামিন শিকদারের বাসাতে থাকে, তখন শান্তও গিয়ে হাজির হয় ছেলের সাথে কিছুটা সময় কাটাতে। তবে বেচারা আরাফ এই অদ্ভুত ভাগাভাগিতে মোটেও সন্তুষ্ট নয়। সে কেন তার পাপা আর মা’কে আগের মতো সারাক্ষণ একসাথে পাচ্ছে না! এই অবুঝ দুঃখ সে কাউকে বুঝিয়ে বলতে পারে না। মা যখন কাছে থাকে তখন পাপা থাকে না, আর পাপা যখন সামনে আসে তখন মা উধাও! এই লুকোচুরি খেলায় মন খারাপ করে সে প্রায়ই কাঁদে, কিন্তু তাতেও তো বাস্তবতার কোনো বদল হয় না।

​এই নিয়মিত আসা-যাওয়ার সুবাদে শান্ত আর মেহমিলের মাঝখানের সেই বরফটাও গলতে শুরু করেছিল। দুজনের মধ্যে টুকটাক সৌজন্যমূলক কথা হতে হতে একসময় জড়তা কেটে যায়। তাই মেহমিল একদিন সুযোগ বুজে শান্তর ভালোবাসার গভীরতা জানতে চাইল। তার বিশ্বাস ছিলনা শান্ত তাকে সেদিন অনুভার ব্যাপারে বলবে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে অনেক কিছুই বলে।

বিজ্ঞাপন

​অবশ্য এসবকিছুই মেহমিল শান্তর মায়ের মুখ থেকে আগেই শুনে নিয়েছিল। আর তখন থেকেই শান্তর ব্যক্তিত্বের প্রতি তার মনে এক গভীর মুগ্ধতা তৈরি হয়েছিল। কেবল মুগ্ধই হয়নি, সে হয়তো নিঃশব্দে এই মানুষটার প্রেমেও পড়ে গেছে। আর এমন একটা পরিস্থিতিতে এটা হওয়াই তো হয়তো সবচেয়ে স্বাভাবিক। নিজের বাবার পর সে এই প্রথম শান্তর মাঝে এমন একনিষ্ঠ, একতরফা এক প্রেমিককে দেখল, যে কি না ভালোবাসার মানুষের অবর্তমানেও তার স্মৃতিকে উপাসনা করে চলেছে।

​

তার তো এটা ভেবে আফসোস হয়, তার বোন অনুভা কীভাবে এই মানুষটার ভালোবাসার গভীরতা না বুঝে থাকতে পারল? এমন একজন মানুষকেও ফিরিয়ে দেওয়া যায়? দুনিয়ায় কেউ কি এতটা অবহেলা করতে পারে এমন পবিত্র অনুভূতিকে? সে তো রীতিমতো যমজ বোনের প্রতি এই লোকটার ভালোবাসার গভীরতা দেখে সে শান্তর ভালোবাসার অতল সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে। অথচ, যে ভালোবাসার কারণে সে শান্তর প্রতি দুর্বল হচ্ছে, সেই একই ভালোবাসা যে অন্য এক নারীর জন্য উৎসর্গীকৃত, তা মেহমিল খুব ভালো করেই জানে। আর তাই, বুকের ভেতর একরাশ তীব্র আকুলতা জমা হওয়া সত্ত্বেও, তা শান্তর সামনে প্রকাশ করার বিন্দুমাত্র সাহস বা অধিকার মেহমিলের নেই। সে এটা করবেও না কখনো।

সেদিন রাতে শান্ত তার বাবার অফিস থেকে বাসায় ফিরে ডা. রামিন শিকদারকে দেখল। গম্ভীর মুখে শাহানা বেগমের সাথে কোনো এক জরুরি বিষয়ে কথা বলছেন। শান্তকে ভেতরে ঢুকতে দেখেই দুজনে হুট করে কথা বলা বন্ধ করে দিলেন। ঘরের ভেতরের এই আকস্মিক নীরবতা শান্তর নজর এড়াল না। সে ডা. রামিনের সাথে সামান্য সৌজন্যমূলক দু-একটা কথা বলে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। দোতলায় ওঠার চলতি পথেই ড্রয়িংরুম থেকে ভেসে আসা কিছু অস্ফুট বাক্য শান্তর কানে এসে পৌঁছাল। সেই কথাগুলো শোনা মাত্রই তার পায়ের গতি স্তব্ধ হয়ে গেল, সে কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে রইল। তবে সে পেছন ঘুরে তাকাল না। আবারও নিজের ঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। তবে এবার তার হাঁটার গতি আগের তুলনায় অনেক বেশি।

​বেশ কিছুক্ষণ পর শাহানা বেগম ধীর পায়ে ছেলের ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন। আরাফ আজ মেহমিলের কাছে থাকায় ঘরটা বেশ নিঝুম। তিনি খুব ভালো করেই জানেন, তার ছেলে রাতে সহজে ঘুমায় না। আর যদি কখনো চোখ লেগেও আসে, তা সামান্য কিছুক্ষণের জন্য। ঘরে ঢুকে দেখলেন, শান্ত ল্যাপটপের সামনে বসে একমনে কাজ করছে। ​শাহানা বেগম খাটের পাশে দাঁড়িয়ে কিছুটা দ্বিধা জড়ানো গলায় বললেন,

_“ আমি তোকে কিছু বলতে চাই।”

​শান্ত স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেয়,

_“এখান থেকে চলে যাও।”

_​“খুব জরুরি কিছু কথা, বাবা।” শাহানা বেগম আরেকটু এগিয়ে এলেন।

_​“চলে যেতে বলেছি!”

_​“শান্ত… শোন বাবা…”

​শাহানা বেগমের বাক্যটি শেষ হওয়ার আগেই ঘর কাঁপিয়ে এক বিকট শব্দ হলো। তিনি আতঙ্কে চোখ বন্ধ করে ফেললেন। পরক্ষণেই চোখ মেলে তাকিয়ে দেখলেন, একটু আগে সচল থাকা ল্যাপটপটা মেঝেতে আছাড় খেয়ে চুরমার হয়ে পড়ে আছে। ভাঙা যন্ত্রাংশগুলো থেকে চোখ ফিরিয়ে যখন তিনি ছেলের মুখের দিকে তাকালেন, তখন ভয়ে তার বুকটা কেঁপে উঠে। শান্তর চোখ দুটো রাগে টকটকে লাল হয়ে আছে। শাহানা বেগমের বুঝতে আর বাকি রইল না, সে যা বলতে এসেছে তা, তার ছেলে আগেই বুঝে ফেলেছে।

ছেলের এই অবাধ্যতা আর উগ্রতা দেখে শাহানা বেগম নিজেও এবার নিজের ধৈর্যের বাঁধ হারালেন। এই ছেলের খামখেয়ালিপনার পেছনে খাটতে খাটতে তিনিও ক্লান্ত। তিনি ক্ষোভ আর হতাশা মেশানো গলায় বলে উঠলেন,

_“এমন একজনের জন্য তুই নিজের জীবনটা এভাবে শেষ করছিস, যে কি না বেঁচে থাকতে তোর দিকে কোনোদিন ভালোভাবে তাকিয়েও দেখেনি তুই আসলে দেখতে কেমন!”

​ক্ষোভ নিয়ে কথাটি বলেই শাহানা বেগম ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন, দুম করে বন্ধ হয়ে গেল দরজাটা। ​মায়ের চলে যাওয়ার পর শান্ত সারাটা রাত চোখের পাতা এক করতে পারল না। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে তার ভেতরের হাহাকারটা আরও উগ্র হয়ে উঠল। সে কোনোমতেই, কোনো শর্তেই মাহভিনকে ছাড়া আর কাউকে নিজের জীবনে জড়াতে পারবে না। তার মন বলছে, তার মাহভিন এখনো এই পৃথিবীর কোথাও না কোথাও বেঁচে আছে। সে কি নিজের চোখে মাহভিনের লাশ দেখেছে? দেখেনি। তবে সে কেন অন্য কাউকে তার জায়গায় বসাবে? কেন সে অন্য কাউকে বিয়ে করবে!

​অসম্ভব, এটা কোনোদিন হতেই পারে না। তার এত বছরের ভালোবাসা এতটা মূল্যহীন নয়। মাহভিনের জায়গায় সে মনে মনে কাউকেই কল্পনা করতে পারে না, সেখানে বাস্তবে অন্য কোনো নারীকে বসানো তো দূর সাগরের গল্প। কাউকেই সে সেই আসনে বসাতে পারবে না! এমনকি দেখতে হুবহু মাহভিনের মতো তার এই যমজ বোন মেহমিলকেও না! দুনিয়ায় একই রকম চেহারার মানুষ তো আরও কতই হতে পারে। শুধুমাত্র দেখতে একই রকম বলে তো কেউ সেই নির্দিষ্ট মানুষটা হয়ে যায় না! অবয়ব এক হলেই কি হৃদয়ের ভেতরের সেই টান, সেই সুনির্দিষ্ট ভালোবাসা অন্য কারও প্রতি চলে আসে? কোনোদিন আসে না। মাহভিনের অভাব মেহমিলকে দিয়ে পূরণ করার এই অদ্ভুত চেষ্টা শান্তর কাছে এক অপমান বলে মনে হচ্ছে।

—

_“ তোমাকে কে বলেছে মাহভিনকে ভুলার জন্য আমার মেয়েকে তোমার হাতে তুলে দিতে চাইছি?”

কয়েকদিন পর রামিন শিকদার নিজেই শান্তর সঙ্গে এই ব্যাপারে কথা বলে।

শান্ত প্রথমটায় কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

_“কেউ বলেনি, তবে পরিস্থিতি দেখে আমার এটাই মনে হচ্ছে। দেখুন আঙ্কেল…”

_“ দেখো, তুমি আমার মেয়েকে বিয়ে করবে না, করো না। আমি জোর করতে আসিনি। তোমার চেয়ে হাজারটা যোগ্য আর ভালো ছেলে আমার মেয়ের জন্য তৈরি আছে। এমনকি তোমার নিজের কাজিন ইজানও মেহমিলকে পছন্দ করে। আমি তোমাদের দুজনকে এক ছাদের নিচে আনতে চেয়েছিলাম কেবল ওই ছোট্ট বাচ্চাটার কথা ভেবে। আরাফের খুশি, ওর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা, সবকিছু এখন তোমাদের দুজনের ওপর নির্ভর করছে। ও তোমাকে নিজের বাবা আর আমার মেয়েকে নিজের মা জেনেই বড় হচ্ছে। ওর পুরো ভালো থাকাটা তোমাদের দুজনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছে। একজন ডাক্তার এবং একজন মানুষ হিসেবে আমি চেয়েছিলাম এই নির্ভরশীলতা যেন সারাজীবন একটা সুন্দর আইনি পরিচয়ে টিকে থাকে।”

_“ সারাজীবনই থাকবে। আমি আমার জায়গা থেকে কখনোই ওকে বুঝতে দেব না, আমি ওর বাবা নই। আশা করি মেহমিলও ওকে নিজের সন্তানের মতোই দেখবে।” শান্ত বলল।

রামিন শিকদার এবার হালকা একটু হাসলেন,

_“এটা তখনই সম্ভব, যখন তোমরা দুজন একসাথে থাকবে। তুমি তো অনুভার স্মৃতি নিয়ে দেবদাস হয়ে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারবে, কিন্তু আমার মেয়েকে তো আর আমি এভাবে বসিয়ে রাখব না। আজ হোক বা কাল, ওর জন্য যোগ্য পাত্র দেখে আমি ওকে বিয়ে দেব। মেহমিল তখন তার নিজের সংসার, নিজের স্বামী আর সন্তানদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। আর খারাপ লাগলেও এটাই সবচেয়ে বড় সত্য, আরাফের সাথে তোমার রক্তের বা বংশীয় কোনো সম্পর্ক নেই। ভবিষ্যতে আইনিভাবে আরাফের পুরো দায়িত্ব মেহমিল কিংবা ওর আসল পরিবারই পাবে। তখন তুমি কোন অধিকারে ওকে নিজের কাছে রাখবে?”

​রামিন শিকদারের এই অকাট্য আইনি আর সামাজিক যুক্তিটা শান্তর মনের ভেতরের সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় গিয়ে আঘাত করল। আরাফকে হারিয়ে ফেলার এই আকস্মিক ভয়ে শান্তর যুক্তি-বুদ্ধি যেন লোপ পেল।

_​“যদি তেমন পরিস্থিতি আসে, তবে আমি আরাফকে নিয়ে এই শহর ছেড়ে চিরকালের জন্য পালিয়ে যাব! ঠিক যেমনটা আপনি একদিন করেছিলেন আপনার মেয়ের বেলায়।”

_​“এতে লাভটা কী হবে? তুমি নিজের জেদ পূরণ করতে গিয়ে ছেলেটাকে সারাজীবনের জন্য মায়ের আদর থেকে বঞ্চিত করে দেবে। আমার আর তোমার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। মেহমিল বুঝ হওয়ার আগে কখনোই নিজের মায়ের ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন করেনি। মা বলে আদেও কোনো অস্তিত্ব এই পৃথিবীতে আছে, সেটা সে শৈশবে কখনো উপলব্ধিই করতে পারেনি। কারণ ওর জন্মের পর থেকেই আমি ওর মা আর বাবা, দুটোর ভূমিকাই একসাথে পালন করেছি। কিন্তু আরাফ তো অলরেডি জানে মা কী জিনিস! সে মেহমিলের মধ্যে নিজের মাকে খুঁজে পেয়েছে। তাকে কেন তুমি শুধু শুধু সেই ভালোবাসা থেকে আলাদা করতে চাইছ?”

​লোকটার প্রশ্নের সামনে শান্ত কিছুক্ষণ কোনো জবাব খুঁজে পেল না। নিজের ভেতরের ছটফটানি দমানোর চেষ্টা করে ভাঙা গলায় বলল,

_​“আপনি আমাকে এই কথা বলছেন আঙ্কেল? আপনি নিজে একজন নারীকে ভালোবেসে, তার স্মৃতির ওপর ভর করে সারাটা জীবন একা কাটিয়ে দিলেন! আর আজ আমাকে এসে বলছেন আমি যেন আমার ভালোবাসা ভুলে অন্য কাউকে বিয়ে করি? আর যাই হোক, দুনিয়ার অন্য কেউ না বুঝলেও আপনি তো আমার ভেতরের এই অনুভূতিটা বোঝেন।”

​দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মেহমিলের বাবা।

_​“আমি তো আগেই বললাম, তোমার আর আমার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। তোমার মতো কোনো বড়লোকের ছেলে যদি আমি সেদিন হতাম, তবে জেসমিনের পরিবার কখনোই আমায় ওভাবে ফিরিয়ে দিত না। আর সবচেয়ে বড় কথা, জেসমিনের মনের ভেতর অন্য কারও জন্য কোনো ভালোবাসা ছিল না। আমি ওকে পাইনি, এর কারণ এমন ছিল না যে ও আমাকে মন থেকে চায়নি। কিন্তু তুমি যাকে পাওনি শান্ত, সে তোমাকে কোনোদিনও মন থেকে চায়নি। সে-ও তোমার মতোই সারাটা জীবন অন্য একজনকে ভালোবেসে এসেছে।”

শান্তর চোখের পাতা কাঁপল। তপ্ত গলায় বলল,

_​“সে এখন আর তাকে ভালোবাসে না! ঘৃণা করে।”

​রামিন শিকদার একটুও বিচলিত হলেন না। তিনি শান্তর চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়লেন,

_​“তুমি কি কোনোদিন পারবে অনুভাকে তার কোনো একটা ভুলের জন্য মন থেকে ঘৃণা করতে?”

​শান্ত এক মুহূর্তও না ভেবে তৎক্ষণাৎ জবাব দিল,

_​“কখনোই না।”

_​“তাহলে সে-ও হয়তো পারেনি। সব ঘৃণায় ঘৃণা থাকে না... কিছু ঘৃণা তো কেবল নিজের ভালোবাসাকে আড়াল করার এক ব্যর্থ অভিনয় মাত্র।” বলে সে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। দরজার দিকে এক পা বাড়িয়েও শেষবারের মতো শান্তর দিকে তাকালেন। উনার চোখজুড়ে তখন এক রাশ পিতৃসুলভ করুণা। তিনি শান্তকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

_“অপেক্ষা এমন কারও জন্য করো না, যে ফিরে এসেও কোনোদিন তোমাকে গ্রহণ করবে না।”

কথাটি বলে তিনি আর দাঁড়ালেন না, ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু দরজার হাতলে হাত দিতেই শান্তর অবরুদ্ধ কণ্ঠস্বর উনাকে থামিয়ে দিল। একটু আগে রামিন শিকদারের বলা সেই বাক্যটি শান্তর মস্তিষ্কের প্রতিটি কোণে তখনো হাতুড়ির মতো আঘাত করছিল ‘সে তোমাকে চায়নি... সে তোমাকে কোনোদিনও মন থেকে চায়নি।’

শান্ত খুব অসহায়, কম্পিত গলায় বলল,

_“সে আমাকে কেন চায়নি, আঙ্কেল? কেন চায়নি? আমার মধ্যে এমন কীসের অভাব ছিল, যেটা ওই পুরুষটার মধ্যে আছে? কী কমতি ছিল আমার ভালোবাসায়?”

রামিন শিকদার দরজার হাতল ছেড়ে ধীর পায়ে পেছনে ফিরলেন। তিনি দেখলেন, শান্তর চোখ দিয়ে অবাধ্য অশ্রুধারা নামছে। সে আবার শান্তর কাছে এগিয়ে এলেন। ওর কাঁধে নিজের হাতটা রাখে। উনার নিজের চোখ দুটোও তখন জেসমিনের স্মৃতিতে কিছুটা আর্দ্র হয়ে উঠেছে। শান্তর মাথায় হাত বুলিয়ে তিনি অত্যন্ত গভীর গলায় বললেন,

_“ভালোবাসাও এক ধরণের রিজিক, সৃষ্টিকর্তা যদি তা নির্ধারণ করে না রাখেন, তবে হাজার অনুভূতি, হাজার চাওয়ার মাঝেও শেষ পর্যন্ত তা অপূর্ণই থেকে যায়।”

একটু থেমে আবারও বললেন,

_​“আমরা মানুষরা নিজেদের জীবন নিয়ে কতশত হিসাব কষি, কত নিখুঁত পরিকল্পনা করি। কিন্তু একটা কথা তো মানো, আমাদের নিজেদের পরিকল্পনার বাইরেও সৃষ্টিকর্তার আলাদা একটা পরিকল্পনা থাকে। আর শেষ পর্যন্ত উনার পরিকল্পনাই জয়ী হয়। তুমি যা চেয়েছ তা হয়তো পাওনি, কিন্তু উনার পরিকল্পনা অনুযায়ী তুমি যা পাবে, সেটাই হয়তো তোমার জন্য সবচেয়ে উত্তম। কারণ আল্লাহ তাআলা বান্দার জন্য সব সময় উত্তম কিছুই বেছে রাখেন। বান্দা যদি ফুল চেয়ে থাকে, সৃষ্টিকর্তা তাকে আস্ত একটা বাগান করে দেন। ​তবে সৃষ্টিকর্তা বাগান করে দিলেও সেই বাগানের যত্ন আর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কিন্তু বান্দাকেই নিতে হবে। ফুল শুকিয়ে যাবে নাকি সুবাস ছড়াবে, তা সম্পূর্ণ মানুষের ওপরই নির্ভর করে।”

চলে গেলেন সে। ছেলেটার মতো এক সময় সেও তো এভাবে কেঁদেছে। মনে মনে অপূর্ণতা নিয়ে কত প্রশ্ন করে গেছে নিজেকে। সেই প্রশ্নের উত্তর তখন না পেলেও, সময়ের সাথে সাথে পেয়ে গেছে।

——

শান্ত আর রামিন শিকদারের মধ্যকার দীর্ঘ সেই আলোচনার পরও শান্ত কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছিল না। রামিন শিকদারও আর কখনো এ ব্যাপারে কিছু বলেনি। শান্তর সাথে দেখা হলে তিনি এমন স্বাভাবিক আচরণ করতেন যেন তাদের মধ্যে এ নিয়ে কোনো কথাই হয়নি। শান্ত আগের মতোই তার বাসায় যাওয়া আসা করত। মেহমিলও একই ভাবে আরাফের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য শান্তর বাসায় আসত। সবকিছু স্বাভাবিক ভাবে চললেও শান্ত একদমই স্বাভাবিক ছিল না। লোকটার কথাগুলো বারবার সে শুনতে পেত। আরাফ যেদিন শান্তর কাছে থাকত, তখন মনের ভেতরের অস্থিরতা আরও বহুগুণ বেড়ে যেত।

আজ অবুঝ বলে আরাফ তাকে পাপা ডাকছে। কিন্তু ও যখন বড় হবে, যখন জীবনের বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জেনে যাবে যে এই শান্ত আসলে তার রক্তের কেউ নয়, কোনো বৈধ অভিভাবক নয়, বরং তার মায়ের একতরফা এক পাগল প্রেমিক মাত্র, তখন তাঁদের এই সম্পর্কের কী ভিত্তি থাকবে? আরাফের তো নিজস্ব এক বিশাল পরিবার আছে। কোন অধিকার, কোন জোর নিয়ে শান্ত তখন সমাজের সামনে দাঁড়াবে? ​বাস্তবতা তো এটাই যে, এখন কেবল শান্তর মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে আরিজ আরাফকে তার হাতে তুলে দিয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতে যখন পরিস্থিতি বদলাবে, তখন কি ওর আপন চাচা হিসেবে আরিজ তাকে নিজের পরিবারে ফিরিয়ে নিতে চাইবে না? আরাফের তো মামা, চাচা, খালা সবাই আছে। তারা সবাই রক্তের সম্পর্কের সুতোয় বাঁধা।

​শুধু অবাস্তব এক জেদ নিয়ে বসে আছে শান্ত। কিন্তু এই জেদ আর অতীতের স্মৃতির ওপর ভর করে একটা বাচ্চার ভবিষ্যৎ সে কতটুকু সুরক্ষিত করতে পারবে? সে যদি সত্যিই আরাফকে নিজের সন্তান হিসেবে আজীবন আগলে রাখতে চায়, তবে তাকে আইনি আর সামাজিক একটা জোরদার ভিত্তি তৈরি করতে হবে। আর তার একমাত্র উপায় মেহমিল। ​মেহমিলকে বিয়ে করা মানে শুধু একটা সামাজিক বন্ধনে জড়ানো নয়, বরং আরাফকে চিরকালের জন্য নিজের করে পাওয়ার একটা বৈধ অধিকার অর্জন করা।

ভাবতে ভাবতে শান্ত কোন পর্যায়ে চলে এসেছে বুঝতেই পারেনি! সে কী ভাবছে! মধ্যে মনের ভেতর ভেঙে যাওয়া সেই দ্বিধার দেয়ালগুলো আবার দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে খাড়া হয়ে গেল। মাহভিন ছাড়া তার জীবনে অন্য কোনো নারী স্ত্রীর মর্যাদায় আসবে, এটা ভাবলেই তার কান্না পায়।

পরক্ষণেই তার মনে পড়ল আজকের সকালে ব্রেকফাস্টের টেবিলে হওয়া তার মায়ের সঙ্গেকার কথা। শাহানা বেগম তখন রুটি আর অমলেট শান্তর প্লেটে তুলে দিচ্ছিলেন। উনার মুখটা ভীষণ গম্ভীর ছিল তখন। শান্তর উদাসীনতা দেখে তার বিরক্তিসীমা অতিক্রম হয়ে গেছে। চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার আগেই তিনি আবারও সেই মেহমিলের প্রসঙ্গটা তুলেছিলেন। ​

_“ তুই কি চাস না এই বাচ্চাটা একটা সুস্থ, স্বাভাবিক পরিবার পাক? মেহমিল মেয়েটা কতটা লক্ষ্মী, তুই কি তা চোখে দেখিস না? ও তো তোর কাছে কিছু চাচ্ছে না। শুধু আরাফের মুখের দিকে তাকিয়ে তুই এই জেদটা এবার ছাড়।”

​শান্ত তখন প্লেটের দিকে তাকিয়ে নিস্পৃহ গলায় বলেছিল,

_“আমি তো আরাফকে নিজের কাছেই রাখছি মম। ওর যত্নের তো কোনো কমতি হচ্ছে না।”

_“যত্নের কমতি হচ্ছে না মানে? তুই কি সারাজীবন ওকে এভাবে একটা দয়ার সম্পর্কের ওপর বড় করবি? মেহমিলের বাবা নিজে এসে তোকে সুন্দর একটা প্রস্তাব দিয়েছেন, আর তুই নিজের এক কাল্পনিক জগতের পেছনে ছুটে সেই সুযোগটা পায়ে ঠেলছিস? তুই মেহমিলকে বিয়ে না করলে ডা. রামিন বেশিদিন আরাফকে তোর কাছে রাখতে দেবেন না, এটা তুই লিখে রাখ!”

_“আমি আমার ভালোবাসার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারব না, মম! তুমি যা-ই বলো না কেন, মাহভিনের জায়গায় অন্য কাউকে বসানো আমার পক্ষে অসম্ভব।”

_​“সে তোর বউ ছিল না, শান্ত! আর না তো সে তোকে কোনোদিন ভালোবেসেছিল! দুটো বছর তোরা এক ছাদের নিচে একসাথে ছিলি, তবুও সেই মেয়েটার মনে তোর প্রতি সামান্য একটু মায়া ছাড়া আর কিচ্ছু তৈরি হয়নি। নিজের মনকে আর কত মিথ্যা সান্ত্বনা দিবি তুই? আচ্ছা, তোর সেই মহান ভালোবাসার বাকি সব কথা বাদই দিলাম। এই দুনিয়ায় মানুষ নিজের জন্ম দেওয়া সন্তানের কথা ভেবেও তো কত দ্বিতীয় বিয়ে করে, করে না? তুই না হয় আরাফের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সেটাই কর! যদিও কপাল ভালো যে এটা তোর জীবনের প্রথম বিয়ে হতে যাচ্ছে, কোনো দ্বিতীয় বিয়ে নয়!”

বিছানার এক কোণ থেকে আধো-আধো স্বরে একটা অস্ফুট আওয়াজ ভেসে এলো। ​ঘুমের ঘোরেই আরাফ কাকে যেন ডাকছে। এই আধো কণ্ঠের ডাকটা শোনা মাত্রই শান্তর সমস্ত ভাবনার দেয়াল ভেঙে গেল। সে ধীর পায়ে বিছানার পাশে এসে বসল। জিরো ওয়াটের নীলচে স্লান আলোয় সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আরাফের নিষ্পাপ, কোমল মুখটার দিকে। ​বাচ্চাটা যত বড় হচ্ছে, তার অবয়বে মেহমিল আর অনুভার ছাপ যেন তত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একদম মা আর খালার মতো চেহারা নিয়ে দুনিয়ায় এসেছে এই ছেলে। মেহমিল যখন আরাফকে কোলে নিয়ে বাইরে বের হয়, সবাই একে মেহমিলের ছেলেই মনে করে। এই অনামিকা মেয়েটার জন্যই আজ তার সাজানো গোছানো একাকীত্বে এত বড় ঝড় উঠেছে! এই মেয়েটার হুট করে তাদের জীবনে এভাবে উদয় হওয়ার কোনো দরকার ছিল না। আরাফকে নিজের সন্তান পরিচয়ে বড় করতে গিয়ে তাকে আজ এই কঠিন বাস্তবতার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতো না।

——

এ সিদ্ধান্তে শান্তর বাবাও রাজি। অনামিকা তার বন্ধুর মেয়ে জেরিনের চেয়েও যোগ্য। সেও একসময় বাবার মতোই একজন ভালো ডক্টর হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। রাজি না হওয়ার প্রশ্নই আসে না। ডাইনিং টেবিলে বসে ইয়াসির খান খাচ্ছিলেন আর এসব নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছিলেন। তখনই হুট করে শান্তকে বলতে শুনল,

_“আমি বিয়ে করতে রাজি। তুমি আঙ্কেলকে জানিয়ে দিতে পারো।”

ইয়াসির খান আর শাহানা বেগম দুজনেই থমকে পাশে দাড়িয়ে থাকা শান্তর দিকে তাকাল। কাঙ্ক্ষিত এই সম্মতিটুকু শোনার পর যে কোনো মায়ের মুখে আনন্দের জোয়ার বয়ে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হলো ঠিক তার উল্টোটা। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে উনার ভেতরের সেই ক্ষণিক স্বস্তি এক নিমেষে মিলিয়ে গেল।

​শান্তর চোখে কোনো প্রাপ্তির আনন্দ ছিল না, সেখানে কেবল জমে ছিল পরাজয়ের গ্লানি।

_“তবে অনামিকাকে আগে থেকেই বলে দিও, সে যেন আমার থেকে কোনোদিন স্বামী হিসেবে ভালোবাসা না খোঁজে। এই বিয়েটা শুধু আরাফের জন্য। ওর আইনি অধিকার নিজের কাছে রাখা ছাড়া, এর বাইরে আমার আর কোনো উদ্দেশ্য নেই।” সে তার পরবর্তী বক্তব্য জানিয়ে যেভাবে এসেছিল সেভাবেই উপরে চলে গেল।

খবরটা শাহানা বেগম রামিন শিকদারকে জানিয়ে খুব দ্রুতই বিয়ের তারিখ ঠিক করে ফেলে। কারণ তার ছেলের মন আবার কখন ঘুরে যায় কে জানে। শান্ত নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানানোর ঠিক চারদিনের মাথায় বিয়ের সব আয়োজন সম্পন্ন হয়ে গেল।

​এই চারটে দিনে শান্ত একবারের জন্যও মেহমিলের সাথে কথা বলার প্রয়োজন মনে করেনি। মেয়েটা আদেও এই বিয়েতে মন থেকে রাজি কি না, বা তার কোনো নিজস্ব মতামত আছে কি না তা জানার বিন্দুমাত্র আগ্রহ শান্তর ছিল না। সে নিজে রাজি হয়েছে মানেই গল্প শেষ, সেখানে আর কে রাজি থাকল কি থাকল না, তা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় তার নেই।

বিয়ের অনুষ্ঠান ফ্রান্সেরই এক নির্জন মসজিদে সম্পন্ন হয়। কোনো জাঁকজমক নেই, কোনো কোলাহল নেই, এক্কেবারে সাদামাটাভাবে আক্দ শেষ করে তারা এখন গাড়িতে করে বাড়ির উদ্দেশ্যে ফিরছে। শান্ত শূন্য, উদাসীন দৃষ্টিতে গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরের অচেনা রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার পরনে একটা নেভি ব্লু রঙের ব্লেজার। মাঝখানের সিটটায় বসে আছে আরাফ। ওর পরনেও শান্তর ব্লেজারের অবিকল একটা ছোট সাইজ। আর তার ঠিক অন্য পাশে বসে আছে শুভ্র রঙের স্নিগ্ধ এক বিয়ের গাউন পরিহিতা মেহমিল। আরাফ আজ বেশ খুশি। চোখে থাকা কালো চশমাটা একবার খুলে ফেলছে আবার চোখে পড়ছে। সিটে দু’পা ছড়িয়ে দিয়ে বসে সেটা নিয়েই খেলতে ব্যস্ত সে। মেহমিল আরাফের দিক থেকে চোখ সরিয়ে বাহিরে তাকিয়ে থাকা শান্তর দিকে তাকাল।

বিয়ে নিয়ে তাদের দুজনের মধ্যে কোনো আলাপ তো দূরের কথা, গোটা বিয়ের অনুষ্ঠান জুড়েও শান্ত তার সাথে একটা শব্দও বিনিময় করেনি। এমনকি কবুল বলার পর মেহমিলের দিকে এক পলক তাকানোর সৌজন্যতাও সে দেখায়নি। তবে মেহমিল এই উদাসীনতাকে খুব স্বাভাবিকভাবেই নিচ্ছে। এ নিয়ে তার মনে কোনো আক্ষেপ বা রাগ নেই। মেহমিলের তো ধারণাতেও ছিল না যে তার বাবা আড়ালে শান্তদের পরিবারের সাথে তাদের বিয়ে নিয়ে এতদিন ধরে কথা চালাচালি করছিলেন। বাবার মুখ থেকে প্রথম যখন সে শান্তর সাথে বিয়ের এই প্রস্তাবটা শুনেছিল, সে শুধু অবাকই হয়নি, আকাশ থেকে পড়েছিল। আর তার চেয়েও বড় ধাক্কাটা সে খেয়েছিল তখন, যখন বাবা তাকে জানিয়েছিলেন যে শান্ত নিজেও এই বিয়েতে মত দিয়েছে! বুঝতে পারছিল না শান্ত অনুভার সাথে তার চেহারার এই অবিকল মিলের মোহে পড়ে রাজি হলো, নাকি শুধুই আরাফের ভবিষ্যতের কথা ভেবে? যদি শান্ত শুধু চেহারার মিল দেখে মেহমিলকে মেনে নিয়ে থাকত, তবে তা খুবই বাজে হতো। এই বাজে হতো ধারনাটা ভেঙে যায় আজ। এখন আরও বেশি ভেঙে গেছে। শান্ত কখনোই তার চেহারার মিলের জন্য বিয়ে করেনি তা মানুষটার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। তার ভেতরে কি চলছে সেটা হয়তো সহজেই কেউ বুঝবে না। কিন্তু মুখটা দেখে মেহমিলের মায়াই হচ্ছে।

গাড়ির মৃদু দুলুনিতে শান্তর কপালের ওপর কয়েকটা চুল এসে পড়েছে। মেহমিল মনে মনে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্তর উদ্দেশ্যে অলিখিত কিছু কথা সাজাতে লাগল,

_​“আমি আপনার কাছে অনুভার জায়গা কোনোদিনও দাবি করব না। আপনার হৃদয়ে ও যেভাবে আছে, সেভাবেই থাকুক। আপনি ওকে সারাজীবন, আপনার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এভাবেই ভালোবেসে যান, আমার তাতে কোনো আপত্তি নেই। কারণ আপনার ওই একনিষ্ঠ ভালোবাসার রূপ দেখেই তো আমি নিজের অজান্তে আপনার প্রেমে পড়েছি।”

​মেহমিলের ঠোঁটের কোণে এক আত্মবিশ্বাসী হাসি ফুটে ওঠে। সে শান্তর দিক থেকে চোখ না সরিয়েই আবারও মনে মনে বলল,

_​“তবে হ্যাঁ, আজ হোক বা বহু বছর পর, আমার ভালোবাসার টান যদি কখনো আপনার মনের ওই শক্ত বরফটাকে গলাতে পারে, আর সেই টানে আপনি যদি কোনোদিন নিজে থেকে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দেন... সেদিন কিন্তু আমি আপনাকে ফিরিয়ে দেব না।

কারণ আমার বুকেও এক আকাশ ভালোবাসা জমা আছে আপনার জন্য। আমি আপনাকে এত বেশি, এত উজার করে ভালোবাসব যে, একদিন আপনিও আমাকে ভালোবাসতে বাধ্য হবেন। আমিও আপনাকে ভালোবেসে আপনার ওই ভালোবাসার জোরকে হারিয়ে দিতে চাই।”

————

_“আপনি আবারও এই রুমে এসেছেন! আমি আপনাকে এই রুমে আসতে বারণ করেছি না?” তায়ানকে নিজের রুমে দেখতে পেয়েই রেগে গেল অনুভা। সে তখন বিছানায় নিজের দু’পায়ের ওপর আরাফকে রেখে আলতো করে দুলিয়ে ঘুম পাড়াচ্ছিল।

_“তোর বারণ আমি কবে শুনেছি? আমার যখন ইচ্ছে হবে আমি আমার ছেলেকে দেখতে আসব।” তায়ান ধীর পায়ে সামনে এগোতে এগোতে বলল। অনুভা ওর দিকে রাগ জড়ানো চোখে তাকিয়ে রইল, কিন্তু মুখে আর কিছু বলল না। আরাফ এখনো পুরোপুরি ঘুমায়নি। তবে ওর চোখের পাতা দুটো ছোট হয়ে এসেছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে যাবে। তায়ান বিছানার পাশে এসে ঝুঁকে গেল ছেলের দিকে। ওর কপালে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে অনুভাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

_“তোর জন্য ও এখনো আমাকে বাবা বলে ডাকে না।”

_“আমি তো ডাকতে নিষেধ করিনি।” অনুভা মুখ নামিয়ে বলল।

_“ডাকতেও তো বলিস না।”

_“বলবও না। সরুন এবার, ও ঘুমাবে।”

তায়ান সরল না। ওখানেই বসে রইল স্থির হয়ে। একদৃষ্টিতে ছেলের ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে যাওয়া দেখতে থাকল। অনুভা তায়ানের সেই শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ খুব নিচু গলায় বলল,

_“এভাবে আমরা আর কতদিন থাকব?”

তায়ান চট করে অনুভার চোখের দিকে তাকাল। বলল,

_“ আজীবন। আজীবনই থাকবি। থাকতে হবে। থাকতেই হবে।”

_“আমার দমবন্ধ লাগে।”

_“আসলেই লাগে?” তায়ানের গলায় এক অদ্ভুত শীতলতা।

অনুভা আর কিছু বলতে পারল না। তায়ানও চুপ করে রইল। ঘরের ভেতর এক গুমোট নীরবতা নেমে এলো। বেশ কিছুক্ষণ পর অনুভা আবারও নিজের ভেতরের সমস্ত ক্ষোভ জড়ো করে বলল,

_“আমি আপনাকে সত্যিই অনেক ঘৃণা করি।”

তায়ান একটু হাসল। বলল,

_“কর। আমি না হয় তোর ঘৃণার মাঝেই বেঁচে থাকি।”

বলেই তায়ান ঘর থেকে চলে গেল।

সন্ধ্যায় ঘুম ভাঙল আরাফের। অনুভা ওকে খাইয়ে দিয়ে তারপর মেতে উঠল খুনসুনিতে। বিছানায় ছড়িয়ে আছে হরেক রকম রঙিন খেলনা। মা আর ছেলে মিলে খেলছে, হাসছে। তায়ানও কোত্থেকে যেন এসে যোগ দিল ওদের সেই খেলায়। অনুভা মাঝেমধ্যে তায়ানের দিকে তাকাচ্ছে, পরক্ষণেই আবার ছেলের দিকে মনোযোগী হচ্ছে। ছেলের মিষ্টি হাসির সাথে মিলিয়ে সেও খিলখিলিয়ে হাসছে। পুরো ঘরটা যেন এক আনন্দের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে।

অথচ, সেই রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অনুভার দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে কাঁদছে রিকো। কান্না আটকে রাখার এক আপ্রাণ চেষ্টায় সে শক্ত করে নিজের দাঁত চেপে ধরেছে। তবু তার দু’চোখ বেয়ে অবাধ্য জল গড়িয়েই যাচ্ছে। অনুভার কাছে এই রুমে এখন তিনজন মানুষ উপস্থিত। তিনজন? নাহ, এখানে তো তিনজন নেই। এখানে একজন। নাহ নাহ নাহ, একজনও না। এখানে দু’জন। তবে রুমের ভেতর একজন, আর দরজায় দাঁড়ানো একজন। রুমের ভেতরের জন অনুভা, যে এক কাল্পনিক সুখে হাসছে। আর দরজায় দাঁড়ানো জন রিকো, যে বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে শব্দহীন কাঁদছে। ওর পাশে এসে দাঁড়াল এলেনা।

ওরা এখন ​আমেরিকায় বিশ্বমানের, অত্যাধুনিক মানসিক হাসপাতালে আছে। 'মেডিকেল সেন্টার ফর সাইকিয়াট্রি'-র চার দেয়ালের মাঝে গত কয়েক মাস ধরে এভাবেই দিন কাটছে ওদের। অনুভার এই জটিল মানসিক সমস্যার উন্নত চিকিৎসার আশায় রিকো আর এলেনা নিজেদের দেশ, চেনা পরিবেশ ছেড়ে এখানে পড়ে রয়েছে। দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা অনুভাকে চোখে চোখে রাখা, ওর এই অদ্ভুত বিভ্রমগুলোর সাক্ষী হওয়া, এ যেন রিকোর জন্যও এক নীরব শাস্তি।

​করিডোর দিয়ে ভারী জুতোর শব্দ তৈরি করে কেবিনের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন হাসপাতালের চিফ সাইকিয়াট্রিস্ট ড. ড্যানিয়েল। উনার পেছনে তিনজন নার্স, যাদের একজনের হাতে ট্রের ওপর প্রস্তুত রাখা একটি সিরিঞ্জ। রিকো আর এলেনা স্তব্ধ হয়ে একপাশে সরে দাঁড়াল। ​ডক্টর আর নার্সরা ঘরে প্রবেশ করতেই অনুভার সেই কাল্পনিক সুখের স্বর্গটা এক নিমেষে কাঁচের মতো ভেঙে গেল। উধাও হয়ে গেল তায়ান আর খেলতে থাকা আরাফ। খেলনায় ছড়িয়ে থাকা বিছানাও কেনব ফাঁকা হয়ে গেল!

অনুভা আচমকা এই মানুষদের দেখে চিৎকার করে উঠল, নিজের কল্পনার সংসার আর কাল্পনিক আরাফকে বাঁচানোর জন্য বিছানার এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসল। ​কিন্তু নিয়মের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ তো আর এখানে নেই। ডক্টরের ইশারায় তিনজন নার্স দ্রুত এগিয়ে গিয়ে অনুভাকে শক্ত করে চেপে ধরে। হাত-পা ছুড়ে বাঁচার চেষ্টায়, অস্ফুট স্বরে কাকে যেন ডাকল। কিন্তু নার্সদের শক্ত বাঁধন আলগা হলো না। মুহূর্তের মধ্যেই ডক্টর অত্যন্ত নিখুঁত হাতে অনুভার শরীরে একটি কড়া সিডেটিভ ইনজেকশন পুশ করে দিলেন।

​তারপর ধীরে ধীরে মিইয়ে যেতে লাগল অনুভা। ওর ছটফট করতে থাকা হাত-পাগুলো শিথিল হয়ে এলো, চোখের পাতা দুটো এক অদ্ভুত ক্লান্তিতে ভারী হয়ে নামল। তার গোছানো সংসার ছেড়ে সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। তবে তাতে কি! এই সংসার সে আবার সকালে ঘুম ভাঙতেই সাজিয়ে নেবে।

রিকো চলে গেল এখান থেকে। তায়ানের শূন্যতা শুধু অনুভা নয়, রিকোকেও শেষ করে দিয়েছে।

——

সেদিন পদ্মার সেই বালুর চরে অনুভার চেতনা ফেরার পর যখন দেখল ওর হাত তায়ানের হাতের বাঁধনে। তারপর অনুভা তায়ানের দিকে তাকিয়ে দেখল সে তাকিয়ে আছে। নিজের হাত তায়ানের হাতের বাঁধন থেকে ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে আনল। তবে হাত ছাড়ানোর জন্য যে তীব্র শক্তির সে প্রয়োগ করেছিল, তার কোনো প্রয়োজনই ছিল না। ও চাইলে খুব ধীরেই হাতটা আলগা করে নিতে পারত। হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার পর তায়ান আর আগের মতো জোর খাটাল না, অধিকার দেখিয়ে ফিরে অনুভার হাতটা চেপেও ধরল না। তায়ানের এই আচমকা নীরবতায় অনুভা কেমন এক অদ্ভুত দ্বিধা আর কৌতূহল নিয়ে আবার সেই হাতের দিকে তাকায়। কেমন যেন অসাড়, নিথর মনে হলো তায়ানের আঙুলগুলো। অজান্তেই অনুভার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল অজানা আশঙ্কায়।

​

তায়ানের মুখের দিকে সরাসরি তাকানোর সাহস যেন কিছুতেই সঞ্চয় করতে পারছিল না ও। অত্যন্ত ধীরে, খুব সাবধানে তাকাল তায়ানের মুখের দিকে। তায়ান এখনো অপলক তাকিয়ে আছে ঠিক সেই শূন্য জায়গাটার দিকে, যেখানে একটু আগে অনুভা চেতনা হারিয়ে শুয়েছিল। ওর চোখের কার্নিশ বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় খুব ধীরে জল গড়িয়ে পড়ছে এখনো। কিন্তু সেই জলের ধারা কি নদীর জল, নাকি কপালে জমে থাকা ঘাম, নাকি শেষ মুহূর্তের কোনো অশ্রু বর্ষণ, তা অনুভার এই দিশেহারা মগজ বুঝতে পারল না।

​এক বুক সংশয় নিয়ে অনুভা কিছুটা ঝুঁকে এলো তায়ানের দিকে। নিজের কাঁপতে থাকা হাত দুটো বাড়িয়ে তায়ানের এলিয়ে থাকা মুখটা আলতো করে নিজের দিকে ফেরাল। সঙ্গে সঙ্গে অনুভার পুরো শরীরে যেন বৈদ্যুতিক তরঙ্গ বয়ে গেল। মনে হচ্ছিল তায়ান যেন সমস্ত প্রাণ নিয়ে সরাসরি ওর চোখের গভীরে তাকিয়ে আছে! শ্বাস-প্রশ্বাস আচমকা খুব দ্রুত হতে শুরু করল ​অনুভার। বুকের খাঁচাটা ওঠানামা করছে। তায়ানের এই অন্তহীন, পলকহীন তাকিয়ে থাকার আসল মানেটা যখনই অনুভার মস্তিষ্কে এসে আঘাত করতেই, এক ঝটকায় নিজের দু-হাত তায়ানের মুখ থেকে ফিরিয়ে আনল। যেন কোনো জ্বলন্ত আগুনে হাত দিয়ে ফেলেছে ও। পরক্ষণেই ​বালুর চরের স্তব্ধতা ভেঙে অনুভা চিৎকার করে বলে উঠল,

_“অসম্ভব!”

​ওর ঠোঁট, হাত থেকে শুরু করে পুরো শরীর তখন থরথর করে কাঁপছে। এক অজানা, চেনা আতঙ্কে চোখ দুটো বড় হয়ে উঠেছে অনুভার। শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া গলা থেকে খুব কষ্ট করে, বাক্য উচ্চারণ করল,

_​“পলক ফেলছেন না কেন আপনি? এই! পলক ফেলুন! আমার... আমার দিক থেকে চোখ সরান ! আমার ভয় করছে আপনার এই চাউনিতে। দৃষ্টি... দৃষ্টি সরান আমার থেকে!” শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসছে অনুভার।

তায়ান দৃষ্টি সরালই না। সে আগের মতোই অপলক, নির্বাক আর নিথর হয়ে চেয়ে রইল। অনুভার দু’চোখ তপ্ত জলে ভরে উঠলো। ও একটা শুকনো ঢোক গিলে কাঁপতে কাঁপতে তায়ানের বুকের সেই ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া র’’ক্তাভ অংশে হাত রাখল। কোনো স্পন্দন নেই এই বুকে, একদম স্তব্ধ। কিন্তু অনুভা এই সত্যটা মানতে নারাজ। তার অবুঝ মন বলল, হয়তো নদীতে পড়ে যাওয়ায় তায়ান অনেক পানি খেয়েছে, তাই জ্ঞান হারিয়েছে। ও পাগলের মতো দু’হাতে তায়ানের বুকে চাপ দিতে লাগল। তবে এক ফোঁটা পানিও তায়ানের মুখ থেকে বের হলো না।

​এরপর অনুভার মনে হলো, হয়তো নদীর ঠাণ্ডা পানিতে এতক্ষণ ডুবে থাকায় তায়ানের শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, মানুষটা দম নিতে পারছে না। বোধবুদ্ধি তখন পুরোপুরি লোপ পেয়েছে অনুভার। ও আরও ঝুঁকে এসে তায়ানের ঠোঁট দুটো সামান্য আলগা করে, নিজের মুখ এগিয়ে দিয়ে সিপিআর দেওয়ার মতো করে তায়ানের মুখে শ্বাস ফুঁকে দিতে লাগল। তবু কোনো লাভ হলো না। তায়ানের শরীর থেকে কোনো সাড়া মিলল না।

_“ শ্বাস নিন! পলক ফেলুন! আমি কিন্তু আবারও গুলি করব আপনাকে!” অনুভা তায়ানের মুখটা নিজের দু’হাতের মাঝখানে নিয়ে বলছিল,

_“ না না না! আল্লাহ, আমি এটা চাইনি! আবারও ঠকাচ্ছেন আমাকে? আবারও! বলেছিলেন না আর কখনো ছাড়বেন না আমাকে? একটু আগেও বলছিলেন, তাহলে এখন কেন কথা বলছেন না? একবার শ্বাস নিন, কথা বলুন, একবার!” কন্ঠ ভেঙে এলো অনুভার।

_“ তায়ান ভাই যাবেন না! যেও না তুমি, একবার শ্বাস নাও। আমি আর তোমাকে ফিরিয়ে দেব না।” অনুভা তায়ানে মাথাটা নিজের বুকে জড়িয়ে কান্নামিশ্রিত গলায় বলল।

স্বামীর সেই নিথর, নিস্পন্দ দেহের সামনে এসে অনুভার এতদিনের সব রাগ আর আত্মসম্মান এক নিমেষে তাসের ঘরের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। যে মেয়েটি নিজের আত্মসম্মান আর জেদের কাছে কখনো এক চুল মাথা নত করেনি, আজ সে-ই নিজের সমস্ত কিছু ভুলে পদ্মার সেই ভেজা বালুর ওপর হাঁটু গেড়ে বসে তায়ানের নিথর বুকের ওপর মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকল। ওর চোখের অবাধ্য জল তায়ানের শার্টের রক্তমাখা অংশটাকে আরও ভিজিয়ে দিচ্ছে। ​অনুভা তায়ানের বরফশীতল হাত তুলে নিজের দুই গালের মাঝে চেপে ধরল। যে হাতটাকে ও এতদিন অবহেলা করেছে, ঝটকা মেরে সরিয়ে দিয়েছে, আজ সেই হাতটাকেই ও নিজের মুখের সাথে লেপ্টে ধরে আকুল হয়ে বলল অনুভা,

_​“আমি হেরে গেছি তায়ান ভাই... আপনি তো আমাকে হারাতেই চেয়েছিলেন, তাই না? এই দেখুন, আমি আজ সত্যি হেরে গেলাম। এবার তো অন্তত কথা বলুন! আপনার জেদ তো পূরণ হলো, তবে কেন এখনও এভাবে শাস্তি দিচ্ছেন আমাকে?”

অনুভা আবারও তায়ানের নিথর শরীরটা নিজের বুকে টেনে নিলো,

_“ আমার সন্তানকে এতিম করো না তুমি। এভাবে আমাদের দু’জনকে একা করে দিও না। আমি কথা দিচ্ছি, আর ফিরিয়ে দেব না। তুমি…তোমার সন্তানের থেকে বাবা ডাক শুনবে না? শুনতে চেয়েছিলে না? আমি ডাকতে শেখাব ওকে। ও তোমাকে বাবা ডাকবে। তুমি না থাকলে ও কাকে বাবা ডাকবে?”

কান্নায় বুজে আসছে মেয়েটার কন্ঠ। ওর বলা বাক্যগুলো এতটাই অস্পষ্ট ও কী বলছে না বলছে নিজেও শুনতে পারছে না। স্বামীর নিথর দেহ বুকে নিয়ে ওর কেবল সবকিছু সেই প্রথম থেকে চোখের সামনে থেকে ভেসে উঠছিল। ছোট বেলার আবছা স্মৃতি থেকে শুরু করে চৌদ্দ বছর পর আবারও নতুন করে তায়ানের দেখা পাওয়া। তারপর ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণা করা সব ভেসে উঠছিল। তখনই তায়ানের শরীর আবারও বালুর উপর ফেলে দিয়ে তায়ানের শার্ট চেপে ধরে ক্ষোভ মেশানো কন্ঠে বলে ওঠে,

_“ সারাজীবন ঠকিয়েই গেলি! আমাকে ভালোবাসিস তাইনা? এই তোর ভালোবাসা? এ কেমন ভালোবাসা? পোড়ানো ছাড়া আর কিছুই দিতে পারলি না!” শেষে আবারও কেঁদে উঠলো মেয়েটা।

_“ এবার শুধু আমাকে না, আমার সন্তানকেও একা করে দিলে তুমি। প্লিজ, যেও না…আমাদের এখনো সংসার করা বাকি তো।” চোখের পানি মুছতে মুছতে বলছিল অনুভা।

_“তোমাকে…তোমাকে ভালোবেসে এ জীবনে শূন্যতা ছাড়া কিছুই পেলাম না আমি। তোমাকে ভালোবাসার শাস্তি এত কঠোর হবে জানলে, খোদার কসম কোনোদিন তোমার ছায়াও মাড়াতাম না! কেন আমার ভাগ্যে শুধু তোমাকে হারানোই লেখা ছিল? কেন? আমি তোমাকে সারাজীবনই ঘৃণা করে যাবো। আবারও পরাজয় করে দিলে আমায়!” অনুভা আর কাঁদতেও পারছে না। দীর্ঘক্ষণ কাঁদার কারণে ওর পেটের ক্ষতটা বেড়ে গেছে। মানুষটা যদি শুধু তায়ান হতো। যদি অনুভার প্রতারণা করা স্বামীই হতো, তবে হয়তো অনুভা এক ফোটা চোখের জলও এই মানুষটার জন্য খরচ করত না। কিন্তু সে তো শুধু তার স্বামী নয়। তার প্রথম প্রেম। কিশরী বয়সের প্রথম প্রেম। স্বামী তায়ানকে সে ঘৃণা করলেও, প্রথম প্রেমকে সে কীভাবে মরে যেতে দিতে পারে! অনুভা আবারও চেতনা হারাবে। সে তায়ানের পাশে শুয়ে দু’হাতে ওকে জড়িয়ে ধরল। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মৃত স্বামীর র’ক্তাক্ত নিশ্চল বুকে মাথা রেখে অতলে ডুবে যায়।

তায়ানের আত্মাটা হয়তো এখন এখানে দাড়িয়ে বিদ্রুপ করছে। ভালোবাসা? এ কেমন ভালোবাসা , যেটা একটা মানুষের দেহ থেকে শ্বাস ফুরিয়ে যাওয়ার পর নদী ভাঙা জোয়ারের মতো বেড়ে যায়? বেঁচে থাকতে যে মানুষটা একটুখানি ভালোবাসার জন্য, নিজের একটা ভুলের ক্ষমার আশায় চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েছিল, আজ তার নিথর দেহকে সেই ভালোবাসার সমুদ্র দেখিয়ে কী লাভ?

​মানুষ আসলেই এক আজব প্রাণী! সময় থাকতে নিজের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটাকেও মূল্যহীন মনে করে ছুড়ে ফেলে দেয়। অথচ চিরতরে হারিয়ে গেলে আজীবন অনুশোচনায় ছটফট করতে থাকে। তায়ান আর অনুভা, দুজনেই এর আস্ত এক একটা প্রমাণ!

বিজ্ঞাপন
রক্ত রেখার আড়ালে গল্পটি আয়েশা শেখ রিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে মোড়ানো থ্রিলার উপন্যাস