রক্ত রেখার আড়ালে

পর্ব - ৪৭

🟢

_“ মেহু মামুনি, ওঠো। আমাদের ফ্লাইট সাতটায়।” ডক্টর রামিন শিকদার মেয়েকে যখন ডাকছিল তখন ভোর পাঁচটা। তার মেয়ে একটু নড়েচড়ে উঠলো। ধীরে ধীরে চোখ খুলে সে তার বাবার দিকে তাকাল। চোখ কচলিয়ে আবারও বন্ধ করে জড়ালো গলায় বলল,

_“ কিছুদিন পর গেলে হয় না, বাবা? আমার একদম মন টানছে না!”

_“ না না, তোমার চেক-আপ করানো জরুরী। তাড়াতাড়ি ওঠো, নাহলে বাবা এখন বকাবকি শুরু করবে।” বাবার শক্ত কন্ঠ শুনে না চাইতেও উঠে গেল মেয়েটা। ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে কাপড় বদলে একদম রেডি হয়েই বের হলো। ব্যাগপত্র সব আগে থেকেই গোছানো ছিল। রুম থেকে বের হতে হতে তার সারে পাঁচটার বেশি বেজে গেল। তারা আবারও ফ্রান্সে ফিরে যাচ্ছে। স্থায়ী নিবাস সেখানেই। ঢাকার এই সংক্ষিপ্ত সফরটা ছিল মূলত একটা মেডিকেল সেমিনারে ডক্টর রামিনের জরুরি কিছু কাজের জন্য। ​আজকের জার্নির জন্য মেহু বেছে নিয়েছে একটা অফ-হোয়াইট রঙের ফুল স্লিভ শার্ট আর লুজ-ফিট ট্রাউজার্স। শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত হালকা করে গোটানো, যার কারণে তার কবজিতে থাকা মিনিমালিস্টিক রোজ-গোল্ড ব্র্যান্ডের ঘড়িটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পায়ে গলানো একদম সাধারণের মধ্যে এলিগেন্ট চামড়ার স্নিকার্স।

কোনো চড়া মেকআপ নেই, শুধু ঠোঁটে হালকা নিউড শেডের লিপবাম আর চোখে এক জোড়া সানগ্লাস, যা এই মুহূর্তে সে মাথার ওপর তুলে রেখেছে। হালকা ব্রাউন চুল গুলো একদম কাঁধ অব্দি কাটা। খাটো চুল গুলো সে কানের দু’পাশে গুজে রেখেছে।

তার কাঁধ পর্যন্ত পরিপাটি করে ছাঁটা চুলগুলো রেশমের মতোই কোমল। চুল গুলো সে ইচ্ছে করেই কালো থেকে ব্রাউনের পরিনত করেছে। এটা বলা যায় তার ব্যক্তিগত পছন্দ।

মেয়েকে বের হতে দেখে ডক্টর রামিন সোফা থেকে উঠে দাড়ালেন। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,

_“ ইজান তোমাকে কতবার কল করেছে, ধরছো না কেন?”

_“ওহ, তার মানে ও ইতিমধ্যেই তোমার কাছে কমপ্লেন করে দিয়েছে? তা করুক। কিন্তু আমি কেন ওর কল রিসিভ করতে যাব, বাবা? ও কি আমার লোকাল গার্ডিয়ান?” মেহু তার আবার দিকে বিরক্ত চাউনি দিয়ে বলল।

মেহুর ক্ষুরধার জবাবে রামিন শিকদার মৃদু হাসলেন। মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,

_“ছেলেটা তো তোমার ভালোমন্দের খোঁজখবর নেওয়ার জন্যই ফোন করে। যত্নশীল ছেলে, খারাপ তো নয়!”

​মেহু বাবার দিকে স্থির দৃষ্টিতে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে, কিছুটা উদাসীন কিন্তু স্পষ্ট গলায় বলল, _“আমার এই অতিরিক্ত কেয়ারিং স্বভাবটা একদম পছন্দ নয়, বাবা। ও তো স্রেফ বাইরের একজন মানুষ। আমার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে ওর এত মাথা ঘামানোর কোনো প্রয়োজন দেখছি না।”

_​“বাইরের লোক বলে এভাবে উড়িয়ে দিও না মেহু। ও আমার সবচেয়ে ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। মানুষ হিসেবে ও সত্যিই অসাধারণ।” ডক্টর রামিন শিকদার মেয়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন।

বাবার কথায় মেহু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার ট্রলি ব্যাগটার হ্যান্ডেলটা শক্ত করে ধরে বেশ ধারালো গলায় বলল,

_“ তোমার ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট হতে পারে বাবা, বাট দ্যাট ডাজন্ট মিন ও আমার লাইফেও ইন্টারফেয়ার করার লাইসেন্স পেয়ে গেছে। আর তাছাড়া, অতিরিক্ত যত্নআত্তি আমার ঠিক সহ্য হয় না। ইট ফিলস লাইক সাফোকেশন! চলো, লেট হচ্ছে আমাদের।”

ডক্টর রামিন শিকদার আর কথা বাড়ালেন না। তিনি ভালো করেই জানেন, এই মুহূর্তে যুক্তি দিয়ে মেয়েকে বোঝাতে যাওয়া বৃথা। সে নিজেও একটা মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ট্রলি ব্যাগটা টেনে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেলেন। তার মেয়েটা আসলে এমনই। যার সাথে একবার মনের মিল হবে, তার জন্য সে সব উজাড় করে দিতে পারে। আর যাকে একবার অপছন্দ হবে, তার নামটুকু সে সহ্য করতে পারে না৷ আর রামিন শিকদার জানে না, তার মেয়ের কখন কাকে পছন্দ/ অপছন্দ হয়ে যায়।

গাড়িতে উঠতে উঠতে মেহুর হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়ে গেল। সে তার বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,

_“বাবা, সেদিন যে বাচ্চাটাকে র*ক্ত দিলাম, যাওয়ার আগে তাকে কি আরেকবার দেখে গেলে হতো না? মানে, ও এখন পুরোপুরি সুস্থ হয়েছে কিনা...!”

​রামিন শিকদার মেয়ের কথায় কিছুটা দ্বিমত পোষণ করলেন। গাড়ির সিটে আরাম করে বসে শান্ত গলায় বললেন,

_“তার আর কোনো প্রয়োজন নেই, মামুনি। আমি হসপিটালে অলরেডি খবর নিয়েছি, বাচ্চাটা এখন সম্পূর্ণ সুস্থ আছে।”

মেহু কিছুটা নিশ্চিন্ত ভঙিতে সিটে গা এলিয়ে দিলো। বাচ্চাটাকে তার ভীষন ভালো লেগেছে। মায়াও লাগছিল তার খুব। ওমন নিষ্পাপ, নরম, গোলুমোলু বাচ্চাটা ওমন অবচেতন হয়েছিল, ইশশ! তার এখন মনে পড়ছে সে বাচ্চাটাকে একটা চুমুও দিয়ে আসেনি। কাছেই তো যেতে পারেনি তাড়াহুড়োয়। ভাবতে ভাবতে মেহু হেডফোনটা কানে চাপে। রামিন শিকদার গাড়ি স্টার্ট করার জন্য ড্রাইভারকে তাগাদা দেয়। গাড়ি চলতে শুরু করলে সে একদৃষ্টে নিজের বাসাটার দিকে তাকিয়ে থাকে। যতক্ষন পর্যন্ত দেখা গেল ততক্ষন তার চোখ বাড়ির নির্দিষ্ট একটি জায়গায়ই আটকে রইলো।

তাদের গাড়ি বামের এক রাস্তা দিয়ে বেড়িয়ে গেল। অন্যদিকে ডান পাশের এক রাস্তা থেকে একটা বাইক এসে রামিন শিকদারের বাসার সামনে দাড়ালো। অনুভা বাইকের গতি কমিয়ে ব্রেক কষল। এক ঝটকায় হেলমেটটা খুলে লক করে দিতেই তার অবিন্যস্ত চুলগুলো বাতাসে উড়ল। কোনো দ্বিধা না রেখে সে দ্রুত বাইক থেকে নেমে পা বাড়াল ভেতরের দিকে। কিন্তু সদর দরজার ঠিক ওপরে, সেই বিশাল অট্টালিকার নামফলকটার দিকে চোখ পড়তেই আচমকা তার পায়ের গতি স্তব্ধ হয়ে গেল। বিস্ময়ে মেয়েটা ওখানেই জড় বস্তুর মতো জমে গেল। সে নিজেকে সামলিয়ে আবারও চোখ বোলালো বাসার নেমপ্লেটটার দিকে। নাহ, সে ভুল দেখেনি নেমপ্লেটে রুপালি অক্ষরে জ্বলজ্বল করছে ‘JASMINE VILLA’ নামটি। অনুভার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেছে। কিন্তু এক অদ্ভুত অবশ করা অনুভূতিতে সে নিজেকে সামলে নিল; এত বড় একটা ধাক্কা খেয়েও মেয়েটা মোটেও উত্তেজিত হলো না। এক অদ্ভুত শান্ত ও পাথুরে জড়তা ভর করল তার ওপর। সে সদর দরজার সামনে গিয়ে ধা”ক্কা মারল। তবে খেয়াল করল বাসা তালাবদ্ধ হয়ে আছে। তার মানে তারা চলে গেছে! অনুভা বিরক্তি ও দুঃখে নিজের চুল নিজেই মুঠো করে ধরল। সে কাল রাতে আরাফের ডক্টরের থেকে, ডক্টর রামিনের নাম শোনা পর থেকেই সকাল হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। আরিজ আর শান্ত সকাল সকালই হসপিটালে পৌছে গিয়েছিল। তাই সবার উপর আরাফের দায়িত্ব দিয়ে ভোরের আলো ফুটতেই আরিজের বাইক নিয়ে চলে আসে এখানে। কিন্তু এসে এমন ফলাফল শূন্য পাবে ভাবতেও পারেনি! রামিন! এ নাম শোনার পর অনুভা অবাক হলেও নিশ্চিত ছিল না যে এটাই তার মায়ের এক তরফা সেই প্রেমিক। এখানে এসে বাসার নেমপ্লেট দেখে সে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়।

তার সঙ্গে অনুভার সর্বপ্রথম ফ্রান্সে দেখা হয়। তখনই সেই অমায়িক আচরণ, সেই সহানুভূতিশীল চোখ দুটো আজও অনুভার মনে স্পষ্ট।

এই মানুষটা সেদিন হসপিটালে তাকে কতটা মানসিক সাপোর্ট দিয়েছিল, তা অনুভা কোনোদিন ভুলবে না। আবার এখন নিজের ছেলের বেলায়! তার মানে সে কি অনুভাকে চেনে? চিনলে কেন নিজের পরিচয় গোপন রাখছে! আর এতো এতো মানুষের ভীরে তার মেয়ের সাথেই কেন তার ছেলের রক্তের গ্রুপ মিলে গেল!

এটা কাকতালীয় হিসেবে সেদিন মানতে পারলেও আজ মানতে পারছে না অনুভা।

আচ্ছা, লোকটা তো নিজের পরিচয় গোপনও রাখেনি, অনুভা নিজেই কখনো তার নাম জানতে চায়নি বা চেষ্টাও করেনি। কিন্তু নিজে থেকে তো বলতেই পারত! একের পর এক অমীমাংসিত প্রশ্ন তীরের মতো এসে বিঁধছে অনুভার মগজে। মনে হচ্ছে মাথাটা এখনই ফেটে যাবে। এই সমস্ত গোলকধাঁধার চাবিকাঠি কেবল একজন মানুষের হাতেই আছে। আর এই প্রশ্নের উত্তর রামিন শিকদার ছাড়া আর কেউ দিতে পারবে না।

——

মাঝখানে কেটে গেছে কয়েকটা দিন। হাসপাতালের চেনা সাদা দেয়াল আর ওষুধের কটু গন্ধের অধ্যায় চুকিয়ে আরাফকে অবশেষে রিলিজ দেওয়া হয়েছে। সবাই এখন অনেকটা নিশ্চিন্ত। তায়ান যেহেতু নিজের ভুল স্বীকার করেছে তাই আমীরা বেগম চেয়েছিল তাদের নিজ বাড়িতে চলে যেতে। তবে অনুভা জানিয়ে দিয়েছে সে ওখানে জীবিত থাকা অবস্থায় যাবে না। অনুভার এমন শক্ত কথা শুনে আমীরা বেগমের দ্বিতীয়বার কিছু বলার মতো সাহস হয়নি। অনুভা কাউকে এখানে জোর করেও রাখবে না। যার ইচ্ছা সে ওই বাড়িতে চলে যেতে পারে তবে অনুভা যাবে না কখনো। কারণ বাড়িটা এখন আর তার বড় আব্বুর নেই, এটা পুরোটাই তায়ান নিয়ে নিয়েছে। সেখানে থাকা অনুভার পক্ষে সম্ভব না।

এদিকে, আর্জেন্টিনা গিয়ে সেখান থেকে ফিরেও এসেছে তায়ান। কিন্তু রিকার্ডোকে সে খুঁজে পেয়েছে কিনা, নাকি নিজের হাতে মে*রে এসেছে এসবের কোনো কিছুই তায়ান মুখ ফুটে বলছে না রিকোকে। তারা দুজন এখন ঢাকার এক বিলাসবহুল প্রাইভেট হোটেলে। তায়ানের এখন ছটফটানিটা হলো অনুভা আর তার ছেলেকে নিয়ে।

অনুভার নানার বাড়িটায় যাওয়ার তীব্র ইচ্ছে থাকলেও, সেখানে পা রাখার মতো বিন্দুমাত্র সাহস সে নিজের ভেতর জোড়াতালি দিয়েও খুঁজে পাচ্ছে না। সে যা করেছে তার প্রতিদান হিসেবে অপরাধবোধ ছাড়া আর কিচ্ছু নেই। অনুশোচনা আর অপরাধবোধ! তায়ান খুব ভালো করেই জানে, আজ যে তারা নিজের বাড়িঘর ছেড়ে সেই বাড়ির আশ্রয়ে মাথা গুঁজেছে, তার একমাত্র কারণ সে নিজে! তায়ান নিজেই তো একসময় নিজ হাতে কেড়ে নিয়েছিল ওদের মাথার ওপরের একমাত্র ছাদটুকু। ​আজ কোন মুখে, কোন অধিকার নিয়ে সে আবার ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে? গিয়ে সেখানে থাকতে চাইলেই তো অনুভা তায়ানের মান সন্মান খেয়ে অপমান করে দেবে।

চাইলে সে ক্ষমতা দেখিয়ে সে বাড়িও দখল করতে পারে, তবে এতে ফলাফল ঘুরে আরও ভয়ঙ্কর হবে।

_“তায়ান! এলেনা জিজ্ঞেস করলে কি বলব? কি করেছ ওর বাবার সাথে?” রিকো এবার খুব বিরক্ত হয়ে বলল।

_“ যা করার তাই করেছি।” তায়ান অনুভার সেই বিড়ালটা হাটুর উপর বসিয়ে, তার গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে নির্লিপ্ত কন্ঠে বলল।

অনেকদিন পর আবার এই বিড়ালটাকে কাছে পেয়েছে।

_“ কিন্তু সেটা কি? কোথায়, কীভাবে খোঁজে পেয়েছিলে?”

_“ তুমি এতো কৈফিয়ত চাও কেন বলোতো? এতো দরদ লাগলে চলো, ওর কাছে তোমাকেও রেখে আসি!” তায়ান খানিকটা গর্জে উঠে বলল।

_“ না, আমি ওর কাছে কেন যাবো?”

তায়ান বলল,

_“ শ্বশুর বানাতে চাও, তাহলে শ্বশুরের কাছে যাবে না?”

_“ তুমি ওর সঙ্গে কী করেছ বলো প্লিজ।”

তায়ান চুপ করে রইলো। রিকো উত্তরের আশায় তাকিয়েই রইলো তার দিকে। উত্তর তো এলোই না উল্টো বিড়ালটাকে এক পাশে রেখে বলল,

_“ চলো যাই।” উঠে দাড়ালো সে।

_“ কোথায়?”

_“ ওই বাড়িতে।” অনুভার বাড়িকে ইঙ্গিত করেছে তায়ান। রিকো বুঝতে পারল।

_“ কেন? ওখানে গিয়ে কী করবে?” রিকো ভ্রু কুঁচকে বলল।

_“ ঝামেলা করব। সবাইকে গু’*লি করে আমার বউ বাচ্চাকে নিয়ে আসব।”

রিকো বিদ্রুপ করে বলল,

_“ এটাই তো পারো শুধু।”

_“ এমনই তো ভাবো আমাকে।” তায়ানও একই ভঙিতে বলল।

——

দুপুরের খাবারের আয়োজন চলছে অনুভার বাড়িতে। আমীরা বেগম আর উর্মিলা বেগম দুজনে মিলে খাবার এনে টেবিল সাজাচ্ছে।

অন্যপাশে, ড্রয়িংরুমের নরম সোফাটায় বসে অলি, নীলা আর অনুভব মিলে মেতে উঠেছে এক খুনসুটি ভরা খেলায়। তাদের মাঝখানে একটু আলতো করে বসিয়ে রাখা হয়েছে ছোট্ট আরাফকে। ডাক্তার কড়াভাবে বারণ করে দিয়েছেন, ওর পা এখন একদমই নড়াচড়া করানো যাবে না। কিন্তু অবুঝ শিশু তো আর অত নিয়ম বোঝে না। শান্ত আর অনুভাকে ছাড়া তো সে এক মুহূর্তও থাকতে পারে না। তাই খালা-মামাদের সাথে খেলায় মেতে থাকার চেষ্টা করলেও, বারবার মায়ের খোঁজে তার কচি মুখটা অভিমানে কালো হয়ে উঠছে, আর একটু পর পরই সে বিরক্ত হয়ে কেঁদে উঠছে। অলি আবার তৎক্ষনাৎ এটা ওটা দিয়ে বুঝিয়ে কান্না থামাচ্ছে। শান্ত অবশ্য এখন বাড়িতে নেই, আরিজের সাথে কোনো একটা দরকারে বাইরে গেছে। অনুভা মাত্র নিজের রুম থেকে বের হয়ে নিচে আসছে। বের হতে না হতেই সে থমকে দাড়াল। বাইরের সদর দরজা ঠেলে ঝড়ের গতিতে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়লেন নাফিসা বেগম। তার চোখমুখ উস্কোখুস্কো, চেহারায় চরম হাহাকার। ভেতরে ঢুকেই তিনি আর কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে সোজা অনুভার পায়ের কাছে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন। কান্নায় ভেঙে পড়লেন তিনি,

_​“অনুভা! তোর বাবার কোনো খোঁজখবর পাচ্ছি না রে... আমার মন বলছে, ওরা তোর বাবাকে মে*রে ফেলেছে!”

​চারপাশের সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। কিন্তু যার উদ্দেশ্যে এই আর্তনাদ, সেই অনুভার অভিব্যক্তিতে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। তার চোখের পলক পর্যন্ত কাঁপল না। এক অদ্ভুত, পাথুরে শীতলতা নিয়ে সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে শুধাল,

_“কারা?”

​নাফিসা বেগম চোখের জল মুছতে মুছতে ভাঙা গলায় বললেন, _“ব্যবসার কথা বলে কয়েকজনের থেকে অনেকগুলো টাকা নিয়েছিল ও। কিন্তু তারপর ব্যবসাও করেনি, আর সেই টাকাও ফেরত দেয়নি। আমার মনে হয়... ওরাই তোর বাবাকে কিছু একটা করে ফেলেছে!”

বিজ্ঞাপন

​নাফিসা বেগমের মুখের কথা শেষ হতে না হতেই অনুভার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল তৃপ্তির, বিষাক্ত হাসি। সে অবহেলার ভঙ্গিতে বলল,

_“বেশ তো! একজন প্রতারকের সাথে তো এমনই হওয়া উচিত। যদি মে*রেই ফেলে থাকে, তবে বেশ করেছে। দুনিয়াটা থেকে একটা পাপী কমে গেল!”

​অনুভার মুখে এমন নিষ্ঠুর কথা শুনে নাফিসা বেগমের কান্না যেন এক নিমেষে থমকে গেল। তিনি অপমানে আর ক্ষোভে এবার মেঝে ছেড়ে ঝটকা দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। অনুভার চোখের দিকে তাকিয়ে তীব্র গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন,

_​“অনুভা! উনি তোর জন্মদাতা বাবা! কেমন মেয়ে তুই? নিজের বাবার জন্য তোর বুকে একটুও দয়া নেই?”

নাফিসা বেগমের কথায় অনুভার ঠোঁটের কোণের সেই বিষাক্ত হাসিটা যেন আরও চওড়া হলো, কিন্তু তার চোখ দুটো হয়ে উঠল জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। তার চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে সে শান্ত থেকেও ধারালো গলায় বলল,

_​“জন্মদাতা বাবা? তার আর আমার মাঝখানে এই শব্দ যায় আদৌও? আপনার কি মনে হয় না এটা বলে, বাবা শব্দটার অবমাননা করছেন? আর কেমন মেয়ে আমি, তা জানতে চাইছেন? আমি ঠিক তেমনই মেয়ে, যেমনটা আপনারা দুজনে মিলে আমাকে বানিয়েছেন। ভুলে যেতে পারেন আপনি সব কিছু, তবে আমি ভুলিনি। যে যেমন বীজ বোনে, সে তেমনই ফসল কাটে। প্রতারণা যার পেশা, তার পরিণতি এর চেয়ে ভালো কিছু হতে পারে না।”

অনুভা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকাল নাফিসা বেগমের দিকে। তারপর বলল,

_“তাই আমার সামনে দাঁড়িয়ে এই মেকি কান্নাকাটি বন্ধ করুন। যে মানুষটা বেঁচে থেকেও আমার জন্য কোনোদিন বেঁচে ছিল না, সে মরে গেল নাকি বেঁচে রইল, তাতে আমার বিন্দুমাত্র কিছু আসে যায় না। চলে যান এখান থেকে।”

নাফিসা বেগম এবার জ্বলে উঠলো। অনুভার চোখের দিকে আঙুল উঁচিয়ে, চড়া গলায় বললেন তিনি,

​_“মুখ সামলে কথা বল অনুভা! উনি বেঁচে থাকতে তোকে কী দিয়েছেন না দিয়েছেন, সেটা বড় কথা নয়; বড় কথা হলো উনি তোকে এই পৃথিবীতে এনেছেন। ​তোর নানার এই সম্পত্তি আর টাকার গরমে তুই আজ অন্ধ হয়ে গেছিস, তাই না? মনে রাখিস, উনি যতই অন্যায় করে থাকুন না কেন, ওনার গায়ের র*ক্তই তোর শরীরে বইছে।

_“ সম্পত্তি পেয়ে অন্ধ হয়েছি, সম্পত্তির পাওয়ার লোভে তো হইনি।”

অনুভা বলল।

_“ আজ ওনার এই বিপদের দিনে তুই এভাবে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারিস না, অনুভা!”

_“ কেন নয়? আপনিই তো বললেন তার র*ক্ত আমার শরীরে! এমন র*ক্ত থেকে এর বেশি কী আশা করতে পারেন?”

_“ বেয়াদপ মেয়ে! বাবার বদদোয়া যদি একবার লাগে, তোর এই অহংকার ধুলাবালি হয়ে উবে যাবে!”

_“ আলহামদুলিল্লাহ! কিছু একটা অন্তত বাবার থেকে পাবো।” অনুভা খুব নিশ্চিন্ত ভঙিতে, শান্ত গলায় মুচকি হেসে হেসে বলছিলো কথা গুলো।

অনুভার শেষ কথাটা শেষ হতেই আমীরা বেগম বাঘিনীর মতো এগিয়ে এসে কোনো কথা না বাড়িয়ে নাফিসা বেগমের কাপড় খপ করে চেপে ধরে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে চললেন সদর দরজার দিকে।

​নাফিসা বেগম অপ্রস্তুত হয়ে চিৎকার করতে চাইলেন,

_“এ কী! ছাড়ুন আমাকে! অসভ্য মহিলা, হাত ছাড়ুন….!”

​কিন্তু আমীরা বেগমের শক্ত হাতের টানের সামনে ওনার কোনো জোর খাটল না। একপ্রকার ধা*ক্কা দিয়েই নাফিসা বেগমকে সদর দরজার বাইরে বের করে দিলেন তিনি। তারপর শব্দ করে ভারী কাঠের কপাট দুটো বন্ধ করে ভেতর থেকে ছিটকিনিটা তুলে দিলেন।

তারা সবাই জানে আরশাদের সঙ্গে কী হয়েছে। এটা নিয়ে বাসার কারো কোনো কিচ্ছু যায় আসে না। তার পরিণতি এমনই হওয়ার ছিল। তার লা*শটাও হয়তো তায়ানের লোকেরা গায়েব করে দিয়েছে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ির তপ্ত পরিবেশটা আবার স্বাভাবিক হয়ে এলো। অনুভা ধীরপায়ে সোফার দিকে এগিয়ে গিয়ে খুব সাবধানে সে তার ছোট্ট আরাফের ডায়াপারটা পালটে দিল। একটু পরেই

​শান্ত আর আরিজ ঘরে প্রবেশ করল। আমীরা বেগম আর উর্মিলা বেগম আর দেরি করলেন না; সবাইকে একসাথে নিয়ে ডাইনিং টেবিলে দুপুরের খাবার বেড়ে দিলেন। খাবার টেবিলে তেমন কোনো কথা হলো না। তবে খাওয়া শেষ হতেই অনুভা সবাইকে ড্রয়িংরুমে একটু বসার অনুরোধ জানাল। ​মূলত অনুভার ইশারাতেই সবাই এখন ড্রয়িংরুমের সোফাগুলোতে গোল হয়ে বসে আছে। সবাই অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে অনুভার মুখের দিকে। ​অনুভা সোফায় পিঠ ঠেকিয়ে বসল। এক অদ্ভুত, শান্ত দৃষ্টিতে সে প্রথমে তাকাল অলির দিকে, তারপর তার নজর ঘুরে গেল আরিজের মুখের ওপর। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসি ফুটিয়ে সে বলল,

_“আমি খুব শিঘ্রই ফ্রান্সে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সব গোছানোই আছে। তবে যাওয়ার আগে আমার মনে হয়, অলির বিয়েটা এখন হয়ে গেলেই সবচেয়ে ভালো হতো।”

​সেই মুহূর্তে আরিজ গ্লাসের জলটা কেবল মুখে পুরেছিল। কিন্তু অনুভার এই অপ্রত্যাশিত বোমা ফাটানো বাক্যটি কানে আসতেই সে জল গিলতে ভুলে গেল। শ্বাসনালীতে জল আটকে গিয়ে সে একপ্রকার বিষম খেয়ে কাশতে শুরু করল। ​কিন্তু ড্রয়িংরুমের কেউ তার এই কাশির দিকে বিন্দুমাত্র মনোযোগ দিল না। সবার চোখ তখনো অনুভার ওপর স্থির। আর অলি যেন সোফার সাথে জমে পাথর হয়ে গেছে। আরিজের বিষম খাওয়া আর চারপাশের এই স্তব্ধতার মাঝেই অনুভা আলতো করে হাসল। সে বাকি সবাইকে উপেক্ষা করে, সরাসরি আরিজের চোখের দিকে তাকিয়ে কৌতুকের সুরে বলল, “

_“ তোমার পানিটাও গলায় আটকাচ্ছে ভাইয়া?”

আরিজ কোনোমতে কাশির বেগ সামলে নিয়ে হাতের কাঁচের গ্লাসটা টেবিলের ওপর রাখল। তার ফর্সা মুখটা বিষম খাওয়ার কারণে লাল হয়ে উঠেছে। সে সোজা হয়ে বসে, গলার স্বরটা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে অনুভার দিকে তাকাল। ​অলির দিকে সরাসরি তাকানোর সাহস এই মুহূর্তে তার নেই, তাই অনুভার চোখের দিকে তাকিয়েই একটু আমতা আমতা করে বলল,

_​“ অলির বিয়ের কথা হঠাৎ এভাবে তোলার মানে কী? মেয়েটা মাত্র কলেজে পড়ছে , এখনো কত কিছু বাকি। আর তুই হুট করেই ফ্রান্স চলে যাওয়ার কথাই বা বলছিস কেন? তুই আর কোথাও যাবি।”

​কথাটা শেষ করেই আরিজ আড়চোখে একবার অলির দিকে তাকানোর চেষ্টা করল, মেয়েটাও অসহায় দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়েছিল।

_“ আমাকে ফ্রান্সে যেতেই হবে, ভাইয়া! ওখানে আমার অনেক কাজ। আর তুমি এতো উত্তেজিত হচ্ছো কেন? আমি শুধু আমার মতামত জানিয়েছি, বিয়ে তো দিয়ে দিইনি।”

_“ না, এখন ওর কোনো বিয়ে টিয়ে হবে না। আগে বড় হোক।” আরিজ বিরক্ত হলো। শান্ত ওর হাবভাব দেখে ঠোঁট টিপে হাসছে।

_“ আমিও চাইছিলাম অলির বিয়েটা দিয়ে দিতে, আমার এক কাজিনের ছেলের অনেক আগে থেকেই অলিকে চেয়ে রেখেছে।” অনুভার কথায় উর্মিলা বেগম বললেন।

এটাই বাকি ছিল! আরিজের মাথায় বাজ পড়েছে বললেও ভুল হবে এখন। সে একদম ঝটকা মেরে দাড়িয়ে পড়ল।

_“ কি হচ্ছে এগুলো? বয়স কত ওর? তোমরা কি এই যুগে এসে বাল্যবিয়ে দিতে চাচ্ছো? আর কে অলিকে বিয়ে করতে চেয়েছে শুনি? নাম বলো তার...”

আরিজের চোখমুখ মুহূর্তেই লাল হয়ে গেছে। সে শান্ত স্বভাবের মানুষ। এতটা রাগ করার কারণ অনুভা, অলি আর শান্ত ছাড়া কেউ বুঝলো না। অলি কিছুটা বিরক্ত হলো। তার বয়স এতটাও কম না যে বাল্যবিয়ে বলতে হবে।

অলির বাবা আসাদ সাহেবও আরিজের সাথে একমত। সে এখনোই অলিকে বিয়ে দিবেন না।

_“ আরিজ ঠিকই বলেছে। আর ক’টা বছর যাক। অলি তো ছোটোই।”

_“ আরিজ ভাইয়া ঠিক বলেছে। একটু পর আর এটা বলবে না। সুর বদলে যাবে চাচ্চু।” অনুভা বলল।

_“ কেন?” আমীরা বেগম বেশ কৌতুহল নিয়ে প্রশ্ন করলেন।

_“ ​কারণ, বিয়েটা অন্য কারও সাথে নয়, এই আরিজ ভাইয়ার সঙ্গেই হবে। ওরা দুজনেই অনেক দিন ধরে দুজন দুজনকে পছন্দ করে।” কাউকে পরোয়া না করে, কোনো ভূমিকা ছাড়াই একটানে বোমাটা ফাটিয়ে দিল অনুভা।

অলির মুখ থেকে র*ক্ত সরে গিয়ে মুখের রঙ বদলে গেল। চোখ বড় বড় করে সে তার বাবা আর মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। না জানি কি হয়! আরিজ তো রেগেমেগে চলেই যাচ্ছিল এখান থেকে। সিড়ির কাছে গিয়েই থেমে গেল সে। তবে ঘুরে পেছন ফিরল না। দাড়িয়ে রইলো ওভাবেই।

_“ কিহ! আসলেই?” আমীরা বেগম বিস্মিত কন্ঠে বললেন।

_“ হ্যাঁ, বড় আম্মু! এটা অনেক পুরোনো কেস। ওরা অনেক আগে থেকেই একে অপরকে ভালোবাসে।”

আসাদ সাহেব এবার গম্ভীর চোখে মেয়ের দিকে তাকালেন। অলি তখন লজ্জায় আর ভয়ে মাথা একেবারে নিচু করে মেঝের কার্পেটের দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি কিছুটা শক্ত গলায় শুধালেন,

_ “অলি, অনুভা যা বলছে তা কি সত্যি?”

​অলি কোনো কথা বলল না, পাথরের মতো নিথর হয়ে রইল। এবার অলির মা উর্মিলা বেগমও চড়া গলায় ডাকলেন,

_ “এই মেয়ে, কথা বলছ না কেন? অনুভা যা বলছে সব সত্যি?”

​এবারও অলি মাথা তুলল না। মেয়ের এই নীরবতা দেখে আসাদ সাহেব এবার একটু ধমকে উঠলেন,

_ “অলি!”

​বাবার আকস্মিক ধমকে অলি আঁতকে উঠল। সে ভয়ে ধীর ধীরে মাথা তুলল। প্রথমে সে সিঁড়ির কাছে পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আরিজের অবয়বটার দিকে তাকাল, তারপর অত্যন্ত মৃদুভাবে মাথা নাড়িয়ে সায় দিল। মেয়ের এই মৌন সম্মতি দেখা মাত্রই উর্মিলা বেগমের মাথা গরম হয়ে গেল। তিনি রাগে গজগজ করতে করতে তেড়ে গেলেন অলির দিকে। মেয়ের এত বড় সাহস! তিনি নিশ্চয়ই এবার অলির চুলগুলো মুঠো করে ধরে শাসন করবেন। কিন্তু তিনি অলির গায়ে হাত তোলার আগেই, সিঁড়ির কাছ থেকে বাতাসের গতিতে ছুটে এসে আরিজ শক্ত প্রাচীরের মতো অলির সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়াল। উর্মিলা বেগমের দিকে তাকিয়ে আরিজ বেশ চড়া এবং দৃঢ় গলায় বলল,

_“অলি এখন বড় হয়েছে চাচী! মন চাইলেই, তুমি ওর গায়ে হাত তুলতে পারো না।”

​আরিজের মুখে এই কথা শুনে উর্মিলা বেগমের বিস্ময়ে চোয়াল ঝুলে গেল। এতক্ষন তো নিজেই বয়স কম বলে বলে চেচাচ্ছিল! শান্ত ফিক করে হেসে দিলো। বলল,

_“ আরে আরিজ! পাত্র তুমি হওয়ায় মাত্র দুই মিনিটে মেয়ে নাবালিকা থেকে সাবালিকা হয়ে গেল?”

বিজ্ঞাপন
রক্ত রেখার আড়ালে গল্পটি আয়েশা শেখ রিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে মোড়ানো থ্রিলার উপন্যাস