রক্ত রেখার আড়ালে

পর্ব - ৪২

🟢

✦ রাইটার'স নোট ✦


এই পর্বের প্রথম অংশে তায়ানকে নিয়ে একটু বেশিই বর্ননা করা হয়েছে, সাথে ইসলাম ধর্মীয় কিছু বিষয় ও বিশ্বাস তুলে ধরা হয়েছে। আমার ভিন্নধর্মী পাঠকদের অস্বস্তি লাগতে পারে। তারা এবং তায়ানের পাঠকরা নিজ দায়িত্বে পড়বেন। তবে সকল ধর্মের প্রতি সম্মান থাকলে পড়তে পারেন।

শহরের প্রতিটি ব্লাড ব্যাংক, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এবং অন্ধকার অলিগলি চষে ফেলার পর যখন রাত গভীরে এসে ঠেকল, তায়ানের সমস্ত ক্ষমতা তখন ধূসর ছাইয়ের মতো বাতাসে উড়ে গেছে । যে দম্ভ নিয়ে ও কাল রাতে হাসপাতাল থেকে বেরিয়েছিল, আজ সেই দম্ভ চূর্ণ-বিচূর্ণ। কোটি কোটি টাকার চেক বুকটা ওর পকেটেই রয়ে গেছে, কিন্তু এক ফোঁটা ‘বোম্বে ব্লাড গ্রুপ’ দেওয়ার মতো কোনো মানুষ এই পুরো ঢাকা শহরে ও খুঁজে পায়নি। গোটা দেশের সব কটা ব্লাড ব্যাংকেই লোক দিয়ে খোঁজ নিয়েছে সে। এতটুকু সময়ের ভেতর যতটুকু সম্ভব হয়েছে চেষ্টা করেছে। সে তো চাইলেই এক্ষুনি দেশের বাহিরে ছুটতো ছেলেকে নিয়ে। কিন্তু সময়! সময় যে এক স্রোত! তার জন্য মোটেও বসে নেই। নিজের এত টাকা, ক্ষমতা থাকতেও আজ কেমন পথের ভিকারি মনে হচ্ছে নিজেকে। নিজের বাচ্চাটার জন্য এতটুকুও সে করতে পারল না! নির্বোধ সে নির্বোধই থাকল। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে মাথা ঠেকিয়ে তায়ান পকেট থেকে তার ব্ল্যাংক চেক বইটা বের করল। যে রক্ত এনে দিতে পারবে, সে নিজের ইচ্ছামতো কোটি কোটি টাকা ওই চেকে বসিয়ে ব্যাংক থেকে তুলে নিতে পারবে। এমনই সাক্ষর করা এখানে। কিন্তু এতে লাভ হলো কি?

যে কাগজের টুকরোটা দিয়ে ও এতকাল দুনিয়ার যেকোনো কিছু চোখের পলকে কিনে নিতে পারত, আজ সেই কাগজের টুকরোগুলোকে ওর কাছে মূল্যহীন ডায়েরির পাতার মতো মনে হচ্ছে। ও শূন্য চোখে চেকে লেখা সংখ্যাগুলোর দিকে তাকাল। এই টাকার জোরে ও চাইলে পুরো একটা হাসপাতাল কিনে নিতে পারে, দেশের সেরা ডাক্তারদের পায়ের কাছে এনে দাঁড় করাতে পারে, কিন্তু এক ব্যাগ রক্ত? এই বিপুল সাম্রাজ্যের বিনিময়েও কি প্রকৃতির একটি নিয়ম ও বদলাতে পারবে? আজ এক ফোঁটা লাল র”ক্তের দাম ওর এই কোটি কোটি টাকার চেয়েও অনেক বেশি। এই প্রথম ও বুঝল, মানুষের জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে কাগজের নোটগুলো কতখানি অর্থহীন, কতখানি সস্তা! এই অন্ধ অহংকার আর কাগজের স্তূপ দিয়ে ও নিজের কলিজার টুকরোটাকে মৃ*ত্যুর মুখ থেকে টেনে আনতে পারছে না। এর চেয়ে বড় দেউলিয়া আর কী হতে পারে! নাহ! তায়ান আর নিজের ভেতরের এই চরম ব্যর্থতা সহ্য করতে পারছে না। একদমই মেনে নিতে পারছে না। অসহ্য লাগছে এই কাগজ গুলো। ওর শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভয়ংকর ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠে। এক ঝটকায় পকেটে থাকা কোটি টাকার সেই ব্ল্যাংক চেক বই আর দামী ওয়ালেটটা বের করে নেয়। যে টাকার ক্ষমতার জোরে ও নিজেকে অপরাজেয় ভাবত, আজ সেই সবকিছুকে ওর নিজের ছেলের জীবনের শত্রু মনে হলো। গাড়ির দরজাটা সজোরে ধা”ক্কা দিয়ে খুলে কনকনে ঠান্ডা রাতের অন্ধকারের মধ্যে ছিটকে বেরিয়ে এল ও।

_"ইউজলেস! এভরিথিং ইজ ইউজলেস!”

তায়ান গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল। ও নিজের সর্বশক্তি দিয়ে ছিঁড়ে কুচিকুচি করে মাঝরাস্তায় বাতাসে উড়িয়ে দিল চেক বইয়ের পাতাগুলো। দামী ওয়ালেটে থাকা হাজার হাজার টাকার নোটগুলো আবর্জনার ন্যায় দুই হাতে মুচড়ে ছুড়ে ফেলে দিল রাস্তার ধুলোবালির মধ্যে। ক্রেডিট কার্ডগুলো একে একে পিচঢালা রাস্তায় আছাড় মেরে ভাঙতে লাগল ও। কাগজের নোট আর প্লাস্টিকের কার্ডগুলো অবহেলায়, লাঞ্ছিত হয়ে ফুটপাতে ছিটকে পড়ল। যে টাকার পেছনে মানুষ সারাজীবন পাগলের মতো দৌড়ায়, আজ তায়ান সেই টাকাকেই নিজের পায়ের নিচে পিষে ফেলল চোখের পলকেই। এই কাগজের স্তূপের কোনো ক্ষমতা নেই ওর প্রানপাখিটাকে এক সেকেন্ড বেশি বাঁচিয়ে রাখার। এই সম্পদ আজ ওকে জীবনের সবচেয়ে বড় পরাজয় উপহার দিয়েছে। ওর ছোট্ট নিষ্পাপ ছেলেটার মুখের কাছে এগুলো আবর্জনা ছাড়া কিছুই না।

টাকা আর ক্ষমতার সমস্ত দম্ভকে এভাবে রাগে-ক্ষোভে রাস্তার আবর্জনার মতো ফেলে দিয়ে তায়ান হাঁটু গেড়ে ওখানেই বসে পড়ে তায়ান। ওর দুচোখ তখন নোনা জলে জমে গেছে। ঝাপসা হয়ে আসছে তবু চোখ বেয়ে পানি পড়ছে না। নিজের ভেতরের হাহাকার কমাতে চিৎকার করে উঠলো উচ্চস্বরে। শূন্য পকেটে, নিঃস্ব, এক বাবার মতো ধুলোবালির মাঝেই আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকাল তায়ান। চিৎকার করতে করতে এক সময় কেঁদেই ফেলল। ও কীভাবে নিজের ছোট্ট ছেলেটাকে ম’রে যেতে দেখবে? কেন সব কিছু তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে? মাসুম বাচ্চাটার শ্বাসহীন নিথর মুখটা সে কীভাবে সহ্য করবে! অমানুষ হলেও সে তার বাবা!

কয়েক মুহূর্ত চি’’ৎকার ক্লান্ত সে। ঠিক তখনই ওর ঝাপসা হয়ে আসা দৃষ্টি গিয়ে ঠেকল রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা সেই শান্ত, প্রাচীন মসজিদটির ওপর। উঠে দাড়ালো সে। ও এতদিন ঈশ্বরের অস্তিত্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এসেছে। নিজের ভেতরের অহংকার নিয়ে অন্ধকারকে উপাসনা করেছে। কিন্তু আজ নিঃস্ব বাবা হয়ে সেদিকেই এগিয়ে গেল, যেখান থেকে সে একসময় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। ধীর পায়ে সে রাস্তার ওপারে থাকা প্রাচীন মসজিদটার দিকে এগোতে লাগল। চারপাশের সবকিছু যখন নিথর, নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে, তখনো মসজিদের ভেতরের মৃদু আলোটা আঁধার চিরে এক চিলতে আলো জ্বলছে । তায়ানের রক্তভেজা শার্ট, ধুলোবালি মাখা শরীর আর এলোমেলো চুল, সব মিলিয়ে ওকে কোনো মস্ত বড় ফুটবলার মনে হচ্ছিল না, ও এখন কেবল এক কোণঠাসা, নিঃস্ব বাবা। ও কাঁপা কাঁপা পায়ে মসজিদের কাঠের ভারী দরজাটা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল। মসজিদের শীতল, স্নিগ্ধ পরিবেশ ওর উত্তপ্ত মগজে যেন এক পরম শান্তির প্রলেপ দিল তাকে। গিয়েই দেখল, মসজিদের ভেতরের আলোয় সাদা দাড়িওয়ালা একজন বৃদ্ধ ইমাম একা জায়নামাজে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি গভীর মগ্নতায় পরম করুণাময়ের সামনে হাত বেঁধে সিজদায় লুটিয়ে পড়ছেন। তায়ান হুট করে কোনো কথা বলতে পারল না। এতরাতে মসজিদে এমন দৃশ্য সে আশা করেনি। ও দরজার এক কোণে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ ইমামের নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপলক চোখে চেয়ে রইল। শ্বাস গুলো কেমন অস্থির ভাবে বের হচ্ছিল, যেন কতকাল ধরে ক্লান্ত ছেলেটা!

ইমাম সাহেব যখন সালাম ফিরিয়ে মোনাজাত শেষ করলেন, তখন ঘরের কোণে এক অচেনা যুবককে এমন উদভ্রান্ত অবস্থায় দেখে চমকে গেলেন। শার্টের বোতার উপরের দুটো খোলা। চুল গুলো কপালে লেপ্টে আছে। চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল, ঠোঁট দুটো কাঁপছে। বৃদ্ধ ইমাম তায়ানকে দেখে অবাক হয়েও কোনো প্রশ্ন না করল না। ওর ভেতরের ঝড়টা বুঝতে পেরে অত্যন্ত শান্ত গলায় বললেন,

_“ ভেতরে আসো।”

তায়ান কিছুক্ষণ দরজার চৌকাঠে স্থির দাঁড়িয়ে থেকে ধীর কদমে ভেতরে গেল। তারপর যেন আর শরীরের ভর ধরে রাখতে না পেরে ধপাস করে মেঝেতে বসে পড়ল। ও শূন্য দৃষ্টিতে ইমামের দিকে তাকিয়ে নিস্তেজ গলায় বলল,

_“আপনি কী করছিলেন এত রাতে?”

_“ নামাজ পড়ছিলাম।” ইমামের কথায় তায়ান আবারও সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করল,

_“ আজান দিতে আরও দেরি…” তায়ানের বাক্য অসূম্পুর্ন রেখেই ইমাম বলল,

_“ তাহাজ্জুদ পড়ছিলাম, বাবা।”

_“ ওহহ।” তায়ান মেঝের দিকে চুপচাপ বসে রইলো। বারবার ভেতরটা মুচড়ে ওঠছে। বসে থাকতে থাকতেই চোখের কোণ বেয়ে টুপ করে এক ফোঁটা তপ্ত জল মেঝেতে এসে পড়ল। ইমাম এবার একটু ইতস্তত করে প্রশ্ন করেই ফেললেন,

_“ তুমি কী কোনো যন্ত্রনার ভেতরে আছো, বাবা?”

তায়ান কোনো উত্তর দিল না। ইমাম কিছুক্ষণ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেও যখন কোনো উত্তর পেলেন না, তখন তায়ানকে একা ছেড়ে দেওয়ার জন্য তিনি উঠে দাঁড়ালেন। ঠিক তখনই তায়ান আর নিজের ভেতরের বাঁধ ভাঙা কান্না চেপে রাখতে পারল না। ও দুই হাতে মুখ ঢেকে শব্দ করে কেঁদে উঠল। এলোমেলো বাক্যে হাহাকার করে বলল,

_“আমার… আমার বাচ্চা অসুস্থ। র*ক্ত লাগবে। কোত্থাও পেলাম না। আমি এত খুঁজলাম! যত টাকা লাগত দিতাম, আমার সব দিয়ে দিতাম! কিন্তু কারও কাছে পেলাম না। আমি আমার বাচ্চাকে হারাতে চাই না, হুজুর!”

তায়ানের এই বুকফাটা আর্তনাদ মসজিদের শান্ত দেয়ালগুলোতে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। বৃদ্ধ ইমাম আর চলে গেলেন না, তিনি আবার নরম মাটিতে তায়ানের মুখোমুখি বসলেন। পরম মমতায় তায়ানের কাঁপতে থাকা পিঠে হাত রেখে বললেন,

_“শান্ত হও বাবা। যিনি তোমাকে এই শেষ রাতে তাঁর ঘরে টেনে এনেছেন, তিনি সব শুনছেন। এই যে এখন তাহাজ্জুদের সময়, এটা হলো আরশের মালিকের সাথে সরাসরি কথা বলার সময়। দুনিয়ার সব মানুষ যখন ঘুমে মগ্ন, তখন আল্লাহ প্রথম আসমানে নেমে এসে ডাকেন। তোমার কোটি টাকার ক্ষমতা যেখানে ফুরিয়ে গেছে, সেখান থেকে আমার আল্লাহর কুদরত শুরু হয়। এমন কিছু নেই, যেটা তোমার জন্য মঙ্গলজনক, সেটা তুমি এই তাহাজ্জুদে চেয়ে পাবে না।

তাহাজ্জুদ হলো পরম করুণাময়ের এক বিশেষ নেয়ামত, বাবা। যখন দুনিয়ার সব দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও, তখনো আরশের এই দরজাটা খোলা থাকে। এই শেষ রাতে বান্দা আর আল্লাহর মাঝখানে কোনো দেয়াল থাকে না। তুমি ভাঙা মন নিয়ে ওনার কাছে হাত পেতে দেখো, কারণ আল্লাহ ভাঙা মনের ডাক কখনো ফিরিয়ে দেন না।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তাহাজ্জুদের দুআ হলো এমন এক তীরের মতো, যা কখনও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। দুনিয়ার মানুষ তোমার চোখের জল দেখলে দুর্বলতা ভাববে, কিন্তু আমার আল্লাহ এই শেষ রাতের চোখের জলকে এত ভালোবাসেন যে, ওনার কুদরতে বান্দার ভাগ্যটাই বদলে দেন। তুমি পৃথিবীর কাছে হেরে গিয়ে ওনার কাছে এসেছ, দেখবে ওনার এক ফোঁটা রহমত তোমার জীবনের অন্ধকার নিমেষেই আলো করে দেবে। যাও বাবা, ওযু করে নাও। আজকে তোমার কোটি টাকার দম্ভিকতা নয়, একজন নিরুপায় বাবার আকুতি নিয়ে ওনার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ো।”

ইমাম সাহেবের এই প্রতিটা শব্দ তায়ানের বুকের ভেতরে তপ্ত মরুর বুকে প্রথম বৃষ্টির ফোঁটার মতো আছড়ে পড়ল। ওর মনের ভেতরের সেই ভয়ংকর পাথরটা যেন এক মুহূর্তে গলে জল হয়ে গেল। কিন্তু তখনই ওর মগজের কোনো এক অন্ধকার কোণ থেকে এক তীব্র অপরাধবোধ ফুঁসে উঠল। ওর মনে পড়ে গেল নিজের অতীতের কথা, সেই অন্ধকারের উপাসনার দিনগুলোর কথা। ওর শিরদাঁড়া বেয়ে এক হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। ও তো একসময় আল্লাহর অস্তিত্বকে অস্বীকার করে শিরকের মতো জঘন্যতম পাপে লিপ্ত ছিল!

ও ইমাম সাহেবের দিকে তাকিয়ে কাঁপতে কাঁপতে মাথা নাড়ল। চরম এক হাহাকার নিয়ে নিরাশ গলায় বলল,

_“আমার প্রার্থনা কবুল হবে না, হুজুর। আমি খুব বড় অপরাধী। আমি... আমি শিরককারী। আমি একসময় শ*য়তানের উপাসনা করেছি। আল্লাহ আমার মতো মানুষকে কখনো ক্ষমা করবেন না। আমার এই অপবিত্র হাত ওনার দিকে তোলার কোনো অধিকার নেই!”

তায়ান মেঝের দিকে তাকিয়ে দুই হাতে মাথা চেপে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার মনে হচ্ছিল, ওর এই মহাপাপের কারণেই আজ ওর নিষ্পাপ ছেলেটাকে ওটি-র ঠান্ডা রুমে মৃ"ত্যুর মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আল্লাহ হয়তো ওর ওপর চরম ক্ষুব্ধ তার উপর। বৃদ্ধ ইমাম সাহেব তায়ানের এই আকুলতা আর অনুশোচনা দেখে একটুও দূরে সরে গেলেন না। ওনার চোখে কোনো ঘৃণার আভাস ফুটল না, বরং ওনার মুখটা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কণ্ঠস্বরে এক অদ্ভুত অভয় আর ভরসা ফুটিয়ে তুলে বললেন,

_“ভুল ভাবছ বাবা, একদম ভুল ভাবছ। শোনো, আল্লাহ তায়ালা দয়াময়, তিনি রহমান। মানুষ যখন বেঁচে থাকে, আর নিজের ভুল বুঝতে পেরে খাঁটি মনে তওবা করে ওনার দিকে ফিরে আসে, তখন আল্লাহ ওনার আগের সব গুনাহ মাফ করে দেন। তুমি যে নিজের পাপকে স্বীকার করছ, এই অনুশোচনাই প্রমাণ করে আল্লাহ তোমাকে হেদায়েত দিয়েছেন। তিনি তোমাকে ধ্বংস করতে চান না, তাই তো এত রাতে তোমাকে রাস্তা থেকে টেনে এনে নিজের ঘরে আশ্রয় দিয়েছেন।”

ইমাম সাহেব একটু থামলেন, তারপর তায়ানের চোখে চোখ রেখে বললেন,

__“হতাশ হয়ো না বাবা। আল্লাহ বলেছেন, ‘হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন।’ আজকে তুমি অতীতের সেই তায়ান নও, আজকে তুমি এক অনুতপ্ত বাবা। যাও, ওযু করে এসে ওনার দয়ায় নিজেকে সঁপে দাও। দেখবে ওনার রহমতের সমুদ্রের সামনে তোমার পাহাড় সমান পাপ এক নিমেষে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে। সেটা যদি তোমার শিরকও হয় সেটাও মাফ হয়ে যাবে।

অতীতের সব অন্ধকারকে পিছে ফেলে তুমি আবার আলোর পথে ফিরে এসো, বাবা। নিজের মুখে সাক্ষ্য দিয়ে নতুন করে তোমার বিশ্বাসের ভিত গড়ো। আমার সাথে বলো,

বিজ্ঞাপন

ইমাম সাহেব ডান হাত তায়ানের কাঁধে রাখলেন। তায়ান রুদ্ধশ্বাসে, কাঁপতে থাকা ঠোঁটে ওনার মুখের দিকে চেয়ে রইল। ইমাম সাহেব স্পষ্ট ও ধীর উচ্চারণে কালেয়া শাহাদাত পাঠ করতে লাগলেন, আর তায়ান ওনার প্রতিটি শব্দ নিজের হৃদয়ের সবটুকু আকুতি দিয়ে উচ্চারণ করতে লাগল..

_“আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ আল্লাহর বান্দা ও রাসুল)।”

কালেমা শাহাদাত পাঠ শেষ হতেই তায়ানের মনে হলো ওর বুকের ওপর থেকে যেন শত মণের একটা পাথর এক নিমেষে নেমে গেল। ওর ভেতরের সমস্ত গ্লানি, অপবিত্রতা আর অন্ধকার যেন এক অলৌকিক আলোয় ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল। ও এক নতুন জীবনের আস্বাদ পেল।

তায়ান এক নতুন আশার আলো বুকে নিয়ে ওযুখানার দিকে পা বাড়াল। তার যে এছাড়া আর কোনো পথ নেই। তায়ান ওযু শেষ করে যখন পুনরায় মসজিদের মূল কক্ষে এসে দাঁড়াল, তখন ওর পুরো শরীর কাঁপছে। ওযুখানার শীতল জল ওর মুখের ধুলোবালি ধুয়ে দিলেও, ভেতরের তপ্ত মরুভূমি তখনও শান্ত হয়নি। ও ইমাম সাহেবের বিছিয়ে দেওয়া জায়নামাজে গিয়ে দাঁড়াল। সাথে ইমাম সাহেব একটা টুপিও দিলো। তার থেকে তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ম শুনে নিলো। এছাড়াও কীভাবে নামাজ পড়তে হয়, সেই শৈশবের ভুলে যাওয়া নিয়মগুলো মনের ভেতর থেকে টেনেটুনে বের করার চেষ্টা করল। ও হাত তুলে নিয়ত শেষে ‘আল্লাহু আকবার’ বলল। অস্ফুট স্বরে শব্দ দুটো উচ্চারণ করে ও যখন হাত বাঁধল, ওর চোখের বাঁধ আর মানল না। দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল ঝর্ণার মতো তপ্ত নোনাজল। হেঁচকি তুলতে তুলতেই বিরবিরিয়ে সুরাহ পাঠ করে।

রুকু শেষ করে প্রথম সিজদায় মাথা নোয়াতেই তায়ানের চোয়াল ভেঙে কান্নার স্রোত নেমে এল। বুক ফেটে যেন ভেতরের সব কিছু বেড়িয়ে আসছিল তার। ছেলেটা সিজদারত অবস্থায়ই মেঝের কার্পেট খামচে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল,

_ "আমি পাপী, আল্লাহ! আমি শিরককারী! পাপে অন্ধ হয়ে শ’’য়তানের উপাসনা করেছি। তুমি আমাকে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় শাস্তি দাও, আমাকে এখনই ধ্বংস করে দাও, কিন্তু আমার নিষ্পাপ ছেলেটাকে কেড়ে নিও না। ও তো কোনো ভুল করেনি! তোমার কোনো বিধান সে অমান্য করেনি! তবে কেন ওর এই শাস্তি?

আমি পাপ করেছি। আই অ্যাম আ সিনার। আই ওয়াজ ব্লাইন্ডেড বাই রিভেঞ্জ। আমার সমস্ত পাপের শাস্তি হিসেবে তুমি আমার মৃ’ত্যু দাও। তবু আমার বাচ্চাটাকে তুমি সুস্থ করে দাও।”

তায়ানের বুকফাটা কান্নার শব্দে মসজিদের দেয়ালে যেন কাঁপছিল। ও প্রতিটা সেজদায় নিজের অতীতের প্রতিটা ভুলের হিসাব দিচ্ছিল। অনুভাকে দেওয়া কষ্ট, নিজের অন্ধ প্রতিশোধের নেশা, আরও কত কি! অতীতের ভুলের জন্য ক্ষমা চাইল, অজানা সত্য জানতে চাইলো। সবশেষে আরাফের সুস্থতার জন্য কাঁদল। ইমাম সাহেব নিশ্চুপ হয়ে দেখে সেগুলো।

সময় যেন এক অলৌকিক স্রোতে বয়ে চলল। তায়ান একটা সিজদা থেকে মাথা তুলছে, আবার অন্য সিজদায় লুটিয়ে পড়ছে। ওর চোখের জলে জায়নামাজের একটা বড় অংশ ভিজে কাদা হয়ে গেছে, কিন্তু ওর ক্লান্তি নেই। সারাটা রাত, প্রতিটা সেকেন্ড কেবল এক ব্যাগ রক্তের জন্য আর নিজের পাপের ক্ষমার জন্য আরশের মালিকের কাছে মাথা নুইয়ে পড়ে রইলো।

———

হাসপাতালের নিস্তব্ধ করিডোর তখনও ভোরের আলো-আঁধারিতে ডুবে আছে। করিডোরের এক কোণে আরিজের কাঁধে মাথা রেখে ক্লান্তিতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছে অলি। আমিরা বেগমরা বাসায় ফিরে গেছে। সঙ্গে গেছে অনুভাও। র’’ক্তের মেলার পর কেন যেন এক মুহূর্তও দেরি করেনি। শান্ত আর আরিজের উপর সব দায়িত্ব দিয়ে সে চলে গেছে।

পুরো করিডোর জুড়ে কেবল এক থমথমে একাকীত্ব। আইসিইউ-এর জানালার ওপাশে দাঁড়িয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শান্ত। ওর ক্লান্ত, লাল হয়ে যাওয়া চোখে তখন এক অদ্ভুত বিস্ময় আর স্বস্তি। এক পাশের বেডে শুয়ে আছে অবচেতন ছোট্ট আরাফ। অপর পাশের বেডে শুয়ে আছে সেই বোম্বে গ্রুপের র’ক্তদানকারী। সে এক পরম রহস্যে ঘেরা মেয়েটা। পুরোপুরি কালো বোরকায় আবৃত। ওর মুখটা এক নিবিড় নিকাবে ঢাকা, যার কারণে ওর চিবুক বা ঠোঁটের কোনো অংশই দৃশ্যমান নয়। কেবল নিকাবের সরু অংশ দিয়ে ওর চোখ দুটো হালকা দেখা যাচ্ছে। মেয়েটার দৃষ্টি আরাফের দিকে। শান্তর দৃষ্টিও আরাফের দিকে। মাঝেমধ্যে মেয়েটার দিকে তাকাচ্ছিল। অপেক্ষার সময় কাটছে না একদম শান্তর। কখন যে ছেলেটার কাছে যাবে একটু! স্পর্শ করবে। চুমু খাবে।

মেয়েটাকে নিয়েও না চাইতেও বারবার ভাবছিল সে। এই গভীর রাতে কেন এক অপরিচিতা মেয়ে নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে এক ব্যাগ বিরল র’ক্ত দিতে ছুটে এলো! তার কোনো উত্তর শান্তর জানা নেই। শুধু মাত্র একবারের পরিচয়ে ডক্টরটা নির্দিধায় মাহভিনকে এত বড় বিপদ থেকে বাঁচিয়ে দিলো! শান্ত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে নাকি অবাক হবে বুঝতে পারে না। শান্ত আবারও মেয়েটার দিকে তাকায়। নিকাবের আড়ালে মেয়েটা কি মৃদু হাসল, নাকি কোনো দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তা দূর থেকে শান্তর পক্ষে বোঝা অসম্ভব ছিল।

র*ক্ত দেওয়া শেষ হতে হতে ফজরের আজান পড়ে যায়। অনুভা তখনও ফেরেনি। ডক্টর আর সেই মেয়েটা অনুভার অপেক্ষায় থেকে চলে যায়। শান্ত যতটুকু সম্ভব ডক্টরকে কৃতজ্ঞতা জানায়। সাথে মেয়েটাকেও। তারা চলে যাবার পর সে ডক্টরের অনুমতি না নিয়েই আরাফের কাছে যায়। আর অপেক্ষা করা সম্ভব নয়। রুমে ঢুকে প্রথমেই আরাফের কাছাকাছি যাওয়ার সাহস হলো না। সেদিনের ঘটনা মনে পড়ল। সে যদি আরেকটু শক্ত করে ছেলেটাকে নিজের সঙ্গে চে’পে রাখত। এতটা আঘাত পেত না। কেন যে তখন ওমন বেখেয়ালী হয়েছিল! ও কাছে গেল। অত্যন্ত সাবধানে গেল। যেন ওর পায়ের শব্দেও কোনো বিঘ্ন না ঘটে, সেভাবে ধীর পায়ে আরাফের বেডের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ওইটুকুনি বাচ্চার ফ্যাকাশে মুখে এতক্ষণ পর এক চিলতে র’ক্তের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ছোট্ট বুকটা ধীর গতীতে ওঠানামা করছে। শান্ত বেডের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে। আরাফের কপালে তখনো বিন্দু বিন্দু ঠান্ডা ঘাম লেগে আছে। সে কাঁপতে থাকা হাতটা বাড়িয়ে আরাফের নরম কপালে রাখল। ওর আঙুলগুলো দিয়ে আলতো করে আরাফের এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিতে দিতে ও অত্যন্ত নিচু স্বরে, এক পরম নির্ভরতার গলায় বলল,

_“ আইম সরি, পাপা! আর রাগ করে থেকো না। খুব দ্রুত চোখ মেলে তাকাও। পাপা ডাক মিস করছি না? এভাবে আর লুকোচুরি খেল না তুমি।”

শান্ত আরাফের সেই ছোট্ট, ব্যান্ডেজ করা পায়ের দিকে তাকাল, যেখান থেকে এতক্ষণ ধরে রক্ত ঝরছিল। ওর নিজের চোখ দুটো নোনা জলে ভরে উঠল। ও অত্যন্ত সাবধানে আরাফের ছোট্ট, তুলতুলে হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। বাচ্চার হাতটা তখনো বেশ ঠাণ্ডা। শান্ত নিজের হাতের ওমে সেই ছোট্ট হাতটাকে উষ্ণতা দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। অজান্তেই চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা জল টুপ করে এসে পড়ল আরাফের হাতের পিঠে। শান্তর বিরক্ত লাগে। বাচ্চাটা তো ওর নয়। এত মায়া থাকতে হবে কেন? তার কোনো অস্তিত্বই নেই এই শিশুটির শরীরে। তবুও এখন ওর হৃদয়ের প্রতিটা স্পন্দন আরাফের জন্যই ডুকরে কাঁদছে। কি হতো যদি র*ক্ত না মিলত? কীভাবে মেনে নিত! আধো আধো কন্ঠে সেই আদুরে ডাক শুনতে না পারলে যে ওর একদিনও কাটে না। জন্ম না দিলেও, এই শিশুটাকে নিজের অস্তিত্বের চেয়েও বেশি ভালোবেসে আগলে রেখেছে সে। ও দেখেছে আরাফের প্রথম উপুড় হতে শেখা, প্রথম আধো-আধো বোলে 'পাপা' বলে ডেকে ওঠা। এই ছোট্ট হাতটাই শান্তর আঙুল শক্ত করে ধরে হাঁটতে শিখেছিল। আজ এই আইসিইউ-এর সাদা চাদরের ওপর আরাফকে এত অসহায়ভাবে শুয়ে থাকতে দেখে শান্তর বুকটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল। ও আরাফের ফ্যাকাশে কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করল,

_“থ্যাঙ্ক গড! থ্যাঙ্ক ইউ ফর সেভিং মাই বয়। পাপা তোমাকে আর কোনোদিন এভাবে একা ছাড়বে না,বাবা। তুমি ভালো হয়ে ওঠো, আমরা আবার এই দেশ ছেড়ে চলে যাব।”

শান্ত আসলেই ছাড়বে না। অন্তত আরাফকে সে নিজের থেকে কেড়ে নিতে দিবে না। সে যেই হোক।

———

রাত গড়িয়ে যখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল, আর মসজিদের মিনার থেকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি বাতাসে ভেসে এল, তায়ান তখনও জায়নামাজে বসে চোখ মুছে চলেছে। পুরোটা মুহূর্ত সে এভাবেই কাটিয়ে দিয়েছে। সিজদা ছেড়ে উঠতেই ইচ্ছা হয়নি তার। এমন শান্তি যে আর কোত্থাও নেই। অনুভাকে হারিয়ে ফেলেও কয়েকবার সে মসজিদের দুয়ারে গিয়েছিল, তবে তখন এতটা মনোযোগি হতে পারেনি। আজ সারারাতের এই বুকফাটা কান্না ওর ভেতরের সমস্ত অন্ধকার অনেকটা ধুয়ে মুছে সাফ করে দিয়েছে। ও যখন ইমাম সাহেবের পেছনে দাঁড়িয়ে ফজর নামাজ শেষ করল, তখন ওর মনের ভেতরের সেই ভয়ংকর ঝড়টা এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে রূপ নিয়েছে। ওর চোখ দুটো লাল হলেও, সেখানের এখন আর কোনো হতাশা কিছুটা হলেও কমে গেছে। এখন আছে এক অলৌকিক দৃঢ় বিশ্বাস। সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস।

সে বিশ্বাস নিয়েই তায়ান এগিয়ে যাচ্ছে হসপিটালের দিকে। গাড়ি যেন এগুচ্ছে না তার। ও যখন ইমাম সাহেবের থেকে বিদায় নিচ্ছিল তখন লোকটা অনেকটা দ্বিধা নিয়ে বলেই ফেলেছিল

_“ আমি মনে হয় তোমাকে চিনি।”

তায়ান স্মিত হেসে জবাব দেয়,

_“ আমাকে? নাহ! আমি বিষেশ কেউ নই যে চিনবেন। আজ আসি। আবার আসব।” তায়ান গাড়িতে গিয়ে নিজের মাস্ক ক্যাপ লাগাতে ভোলে না।

ইমাম সাহেব অনেক্ষন তাকিয়ে রইলেন। তবুও মনে করতে পারল না ঠিক কোথায় দেখেছে তাকে।

—

তায়ান এতক্ষন নিজেকে শক্ত করে হসপিটালের দিকে আসলেও যখন হাসপাতালের করিডোরে এসে পা রাখল, ওর ভেতরের সেই সাহসটাবিন্দুমাত্র অবশিষ্ট ছিল না। ও এক পা এক পা করে অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে আইসিইউ-এর দিকে এগোতে থাকে। প্রতিটা পদক্ষেপ ওর কাছে যেন অগ্নিপরীক্ষা। সারারাত আল্লাহর দরবারে কেঁদে নিজের পাপের তওবা করলেও, হসপিটালের এই চেনা সাদা দেয়ালগুলো দেখামাত্রই ওর বুকটা আবার দুরুদুরু করে কেঁপে উঠল। নিজের কাঁপতে থাকা হাত দুটো মুঠো করে ভেতরের তীব্র অস্থিরতা সামলানোর চেষ্টা করল। রিকোর অসংখ্য কল তার ফোনে।

ঠিক তখনই করিডোরের ওপাশ থেকে ডক্টরকে এদিকেই এগিয়ে আসতে দেখে। ডাক্তারকে দেখামাত্রই তায়ানের পুরো শরীর জমে বরফ হয়ে যায়। ভেতরটা এক তীব্র আতঙ্কে মোচড় দিয়ে উঠে। না জানি কী খবর অপেক্ষা করছে তার জন্য! নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে মনে মনে বিড়বিড় করতে কিছু।

ডাক্টর তায়ানের একদম সামনে এসে দাঁড়ালেন। ওনার মুখে এখন কোনো দুশ্চিন্তার ছাপ নেই, বরং এক পরম তৃপ্তির হাসি। তিনি তায়ানের কাঁধে হাত রেখে বললেন,

_"ইউ ক্যান রিল্যাক্স নাও। মিরাকল হ্যাপেনস । ব্লাড গ্রুপ মিলে গেছে এক মেয়ের সাথে। অপারেশন পুরোপুরি সাকসেসফুল । আরাফ এখন একদম বিপদমুক্ত।"

ডাক্তারের এই ভালো খবরটা শোনা মাত্রই তায়ানের চোখ চিরে আনন্দের অশ্রু দিয়ে ভরে ওঠে। সৃষ্টি কর্তাকে শুক্রিয়া জানায়। কীভাবে কি হলো না হলো এসবের কিছুই সে জানতে চায় না। তার একান্ত বিশ্বাস, সৃষ্টিকর্তা তাকে ফিরিয়ে দেয়নি। সে ডক্টরকে পাশ কাটিয়ে আরাফের কেবিনের দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়…ঠিক তখনই পুরো করিডোরকে স্তব্ধ করে দিয়ে এক অদ্ভুত দৃশ্য তৈরি হলো। করিডোরের শেষ প্রান্ত থেকে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ছুটে আসছে অনুভা।

কাল রাতেও যে মেয়েটা প্রায় নিথর, মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছিল, সে এখন পাগলের মতো দৌড়ে আরাফের কেবিনের দিকে যাচ্ছে। তায়ানকে পেছনে ফেলেই চলে গেল। ওর পরনে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। গাঢ় একখানা নীল শাড়ি, কিন্তু সেই নীল শাড়ির আঁচলে আর পাড়ের নিচের অংশে লেপ্টে আছে তাজা লাল র*ক্তের ছিটাময় দাগ। অনুভা কারোর দিকে তাকাল না।

বাহিরে থাকা তায়ান, আরিজ,অলি রিকো সবাই বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইলো। এরপর তায়ান নিজেও কেবিনে ঢুকে যায়।

✦ রাইটার'স নোট ✦


তায়ান চরিত্রটি শিরকের সঙ্গে জড়িত ছিল। এটি কোনোভাবেই সমর্থন করার উদ্দেশ্যে লেখা হয়নি। তাই তার ভুল উপলব্ধি ও ক্ষমা চাওয়ার দিকটাই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আমি একজন সাধারণ মানুষ। তাই লেখার মাঝে অনিচ্ছাকৃত কোনো ধর্মীয় ভুল বা অসঙ্গতি থেকে গেলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কাউকে কষ্ট দেওয়া বা ভুল কিছু প্রচার করা আমার উদ্দেশ্য নয়।
বিজ্ঞাপন
রক্ত রেখার আড়ালে গল্পটি আয়েশা শেখ রিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে মোড়ানো থ্রিলার উপন্যাস