রক্ত রেখার আড়ালে

পর্ব - ৩৯

🟢

তায়ান সেই যে দৌড়াচ্ছে রাস্তা যেন আরও লম্বা হচ্ছে। যে দূরত্ব গাড়িতে আধঘণ্টার, পায়ে হাঁটতে গিয়ে তা যেন অজস্র হয়ে উঠেছে। রাত কতদূর গড়িয়েছে, কোন পথ ঠিক, কোনটা ভুল। সে কিছুই জানে না। তবুও থামার উপায় নেই। নিজেকে এগিয়ে নিচ্ছে অন্ধকার ঠেলে।

অবশেষে আহসানী বাড়ির গেইটের সামনে পৌছালেও লাভ হলো না। ভেতর থেকে বন্ধ। সে সময় কোনো দাড়োয়ান ছিল না, তাই ভেতর থেকে আটকে রাখা হতো। তায়ান এক হাতে ছোট্ট প্রাণটাকে আগলে ধরে অন্য হাতে লোহার গেইট ধা’ক্কাল। লোহার শব্দ নিস্তব্ধ রাত চিরে বেরোলেও কারও কানে পৌঁছাল না। ভেতরের বাড়িটা তখন গভীর ঘুমে ডুবে। তায়ানের হাত ব্যথায় অবশ হয়ে আসছে, তবুও সে থামছে না । আর বারবার পেছন ফিরে তাকাচ্ছে, কেউ আসছে কিনা বোঝার চেষ্টা করছে। কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে তার, বুকের ভেতরটাও ধুকপুক করছে অস্বাভাবিক গতিতে। অন্যদিকে তার কোলে থাকা ছোট্ট অবুঝ প্রাণটা নিরবিচ্ছিন্নভাবে কেঁদেই চলেছে। এ গেট ভোর না হওয়া পর্যন্ত খুলবে না। ততক্ষন এখানেই অপেক্ষা করতে হবে। বসে পরে তায়ান সেখানেই। পায়ে আর শক্তি নেই। এত কম বয়সে আরেকটা অস্তিত্ব নিয়ে এতটুকু পথ এসে সে এখন ক্লান্ত।

ছোট্ট মেয়েটার ঘাড়ের নিচে নিজের এক বাহু রেখে অন্য হাত দিয়ে পুরো শরীর আকড়ে ধরে লোহার গেইটের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসল সে। তারপর মেয়েটার কান্নারত মুখের দিকে তাকাল। আজকের রাত ভীষন অন্ধকার। তবু রাতের নিজস্ব ম্লান আভায় আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে কান্নায় লাল হয়ে যাওয়া ছোট্ট মুখটা, ভেজা চোখ, কাঁপতে থাকা ঠোঁট। এই কান্না থামার নামই নিচ্ছে না। অন্য কোনো সময় হলে এই কান্না তার সহ্য হতো না, বিরক্ত হয়ে উঠত সে। কিন্তু এখন তার বিরক্ত লাগছে না। শুধু ভয় হচ্ছে যদি কান্নার আওয়াজ শুনে কেউ চলে আসে? সে চারপাশে তাকায়, আবার মেয়েটার দিকে ফিরে আসে। বারবার তাকে আরও নিরাপদ করে ধরার চেষ্টা করে। কিন্তু এত ছোট, এত নরম একটা শরীর ধরতেই ভয় লাগছে, যদি কষ্ট পায়? যদি ভুল করে একটু বেশি চেপে ধরে ফেলে?

সে ধীরে ধীরে শিশুটাকে বুকের কাছে টেনে নেয়। যেন নিজের বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখতে চাইছে তাকে। কান্নার শব্দটা তখনও থামেনি কিন্তু তায়ানের হাত দুটো আরও সতর্ক, আরও স্নায়বিক হয়ে উঠেছে। একটু পরেই তায়ানের খেয়াল হলো, দূরে কোথাও একটা ক্ষীণ আলো নড়ছে। প্রথমে বুঝতে পারেনি, কিন্তু দৃষ্টি ভালো ভাবে দিয়ে দেখল, ওটা টর্চলাইট। আলোটা স্থির না। তাড়াহুড়ো ভঙ্গিতে দুলছে, আর ধীরে ধীরে এদিকেই এগিয়ে আসছে। মুহূর্তেই তায়ানের শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। হৃদপিণ্ডটা যেন হঠাৎ করে জোরে ধুকপুক করতে শুরু করল। সে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল। চোখ দুটো অস্থির হয়ে চারপাশে ঘুরতে লাগল, কোথায় লুকানোর স্থান খোঁজার জন্য। আলোটা আরও কাছে আসছে। কিন্তু সেই আলোর পেছনে কে আছে তা বোঝার কোনো উপায় নেই।

ভয়ের তাড়নায় আর দেরি করল না তায়ান। হঠাৎই এক দৌড়ে বাড়ির পাশের ঘন ঝোপের ভেতরে ঢুকে পড়ল। ঝোপের ভেতরটা স্যাঁতস্যাঁতে, মাটিতে শুকনো পাতা, কাঁটা। কিন্তু সেসব দেখার সময় নেই তার। সে নিচু হয়ে বসে পড়ল, আর ছোট্ট অনুভাকে আরও শক্ত করে নিজের বুকের সঙ্গে চেপে ধরল। নিঃশ্বাস কাঁপছে তার, গলা শুকিয়ে কাঠ। শিশুটার কান্নাও থামছে না, বরং আরও তীব্র হয়ে উঠছে। তায়ান আতঙ্কে ফিসফিস করে উঠল,

_“কাঁদিস না… চুপ! চুপ না করলে কিন্তু… মা’রব এবার!”

এই ছোট্ট প্রাণ তার ভাষা বোঝে না। শিশুটি নিজের মতো করেই কেঁদে চলেছে। তায়ানের হাত কাঁপছে, তবুও সে আলতো করে শিশুটার মাথার এক পাশে হাত বুলিয়ে দেয়। এত নরম, এত ভঙ্গুর সে যেন ছুঁতেও ভয় পাচ্ছে। তারপর খুব আস্তে, কাঁপা কণ্ঠে, ছোট ছোট শব্দে বলতে থাকে,

_“ঘুমিয়ে পর। আমি আছি… কিছু হবে না। আমার কথা শোন!” বলতে বলতে তায়ান আলতো করে চুমু খেল ছোট্ট অনুভার কোমল গালে। গালের সঙ্গে নিজের গাল মিলিয়ে রাখল।

_“ কান্না থামা নাহলে কিন্তু আমার একটা ললিপপও তোকে দেব না।”

নয় বছরের এক শিশুর বুকের উষ্ণতা, তার কাঁপা কাঁপা হাতের আশ্রয় পেয়ে ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে একদিন বয়সের নবজাতক। কান্নার তীব্রতা কমে গিয়ে ছোট ছোট হেঁচকিতে থেমে যায়, আর অন্ধকারের ভেতর সেই ক্ষীণ নিঃশ্বাসটাও ধীরে ধীরে স্থির হতে থাকে। এখন শুধু সেই উষ্ণতার ভরসায় একটু একটু করে ঘুমের দিকে ঢলে পড়ছে সে।

তায়ান যার জন্য এতক্ষণ ধরে ভয়ে কুঁকড়ে ছিল সেই টর্চধারী মানুষটা আর কেউ নয়। এটা আরশাদই। আরশাদ হসপিটাল থেকে বের হয়ে দ্রুত বাড়ির দিকে আসে। সে জানে এত রাতে ছেলেটা এদিকেই আসবে। দুজনের ঝামেলা চিরতরে শেষ করে এসেছে, এখন এই দুজনের ঝামেলা শেষ করতে পারলেই সে নিশ্চিন্ত। সে উন্মাদের মত হন্য হয়ে চারপাশ খুঁজলো, কিন্তু কোথাও কারো অস্তিত্ব নেই। তবু এখানেই বসলো। ভোর না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কিছুতেই সে ছেলেটাকে সবার সামনে যেতে দিবে না।

এদিকে ঝোপের ভেতর তায়ানের বুকটা যেন ফেটে যাচ্ছে। হৃদপিণ্ড এত জোরে ধুকপুক করছে যে মনে হচ্ছে শব্দটা বাইরেও শোনা যাবে। তার প্রতিটা ধকধকানি কাঁপিয়ে তুলছিল ছোট্ট অনুভার শরীরটাও। তায়ান আরও শক্ত করে তাকে বুকের কাছে চেপে ধরে, নিঃশ্বাস আটকে রাখার মতো করে চুপ করে বসে থাকে। প্রতি মূহুর্তে মনে হচ্ছিল এই বুঝি মেয়েটা আবারও কাঁদা শুরু করবে। এভাবেই কেটে যায় কয়েক ঘন্টা।

ফজরের আযানের ধ্বনি চারপাশ থেকে ভেসে আসে। তায়ান স্বস্তির শ্বাস ফেলে। আরশাদ বসে থাকতে থাকতে একসময় তার চোখ লেগে আসে। কখন কাজের বুয়া এসে গেট খুলে দিয়েছে সে জানেও না। তায়ান ঝোপের ভেতর থেকে খেয়াল করল আরশাদের চোখ বন্ধ। সে খুব সতর্ক ভঙিতে ঝোপ থেকে বের হয়। বাচ্চাটা এখনও ঘুমে। পা টিপে টিপে সে গেইট বরাবর দৌড় দেয়। পায়ের শব্দ শুনে আরশাদ জেগে ওঠে। এমন দৃশ্য দেখে সে তড়িঘড়ি করে উঠে বসে।

এদিকে তায়ান এক দৌড়েই চলে গেছে বাড়ির সদর দরজায়। আরশাদও দ্রুত গতিতে তার পেছন পেছন আসে।

সদর দরজা বন্ধ দেখে তায়ান প্রথমে ভয় পেলেও আলৌকিক ভাবে সেই মূহুর্তে দরজাটা খুলে যায়। বেড়িয়ে আসে পাঞ্জাবী, টুপি পড়া আরমান সাহেব। তায়ান নিজের বাবাকে দেখে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। দৌড়ে এসে প্রায় হোঁচট খেতে খেতে তার সামনে দাঁড়াল। ফজরের সময় মসজিদে যাওয়ার জন্য বের হচ্ছিল আরমান সাহেব। কিন্তু সামনে এমন দৃশ্য দেখে চমকে ওঠেন তিনি। কপালে ভাঁজ ফেলে বিস্মিত কন্ঠে বলেন,

_“ তায়ান! তুই এখানে.. ওকে নিয়ে..” অনুভার দিকে তাকিয়ে বলছিল। তখনই তায়ান হাঁপাতে হাঁপাতে বলতে নেয়,

_“ বাবা ওকে মে’রে…”

তায়ানকে কথা সম্পূর্ণ করতে দেয় না। তার আগেই আরশাদ এসে তায়ানের থেকে অনুভাকে কেড়ে নিয়ে ধমকে ওঠে,

_“ এত বড় কলিজা তোর! আমার মেয়েকে চুরি করে নিয়ে এসেছিস!” বলেই তায়ানের গালে সজোরে চ’ড় মা’রে সে। তায়ান মেঝেতে পড়ার আগেই আরমান সাহেব গিয়ে ছেলেকে ধরে ফেলে।

_“ কতবার বলেছি আমার ছেলের গায়ে হাত তুলবি না!” আরমান সাহেব ভাইয়ের দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে বলল।

_“ বারবার এই বে’জন্মাকে নিজের ছেলে বলে দাবী করো লজ্জা করে না তোমার?”

_“ এখন এগুলো নিয়ে কথা বলার সময় না আরশাদ!”

তায়ান বারবার বলতে চাইলো আরশাদের কর্মকান্ডের কথা কিন্তু তার আগেই আরমান সাহেবের ফোনে কল আসে। ইশতিয়াক আহমেদের কল আসায় সঙ্গে সঙ্গে কল রিসিভ করেন তিনি। করল রিসিভ করতেই অপর পাশ থেকে ইতিশাক আহমেদের কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে এবং সাথে জানায় তার মেয়ে জেসমিন আর নেই। এটা শুনে আরমান সাহেব তো অবাক হয়ই, তার চেয়েও বেশি অবাক হয় আরশাদ। সে একদম কাঁদতে কাঁদতে মেঝেতে বসে পড়ে। তায়ান হতভাক। তার চোয়াল ঝুলে গেছে আরশাদ সাহেবের নাটক দেখে। আরমান সাহেব দিশেহারা হয়ে দ্রুত গাড়ি নিয়ে বের হয়। আরশাদ নিজের মেয়েকে আমীরা বেগমের কাছে রেখে আসবে বলে বাড়ির ভেতর যায়। পেছন পেছন তায়ানও যায়।

ভেতরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আরশাদ তায়ানের গলা এক হাতে চে’পে ধরে।

_“ যদি আজকের এই ঘটনা কাউকে জানিয়েছিস তাহলে এই বাচ্চাকেও বাঁচতে দেব না আমি।”

তায়ান চমকে অনুভার দিকে তাকায়।

_“ এটা তো তোমারই মেয়ে!”

_“ চুপ! আমি যা বলেছি সেটা যেন মাথায় থাকে। নাহলে তোর জেসমিন মামুনির মতো এটাকেও ম’রতে দেখবি। আর তুই বললেই কী? তোর কথা কেউ বিশ্বাস করবে? তুই ওকে হসপিটাল থেকে নিয়ে এসেছিস। আমি যদি বলি জেসমিনকে মে’রে ওকে নিয়ে পালিয়েছিস, সবাই এটাই বিশ্বাস করবে। তাই ঝামেলায় পড়তে না চাইলে নিজের মুখ বন্ধ রাখ। নাহলে এই বাচ্চা তো ম’রবেই, সাথে তুইও ম’রবি।”

তায়ান দু’পাশে মাথা নেড়ে বলল,

_“ আমি বলব না। কিন্তু কথা দাও ওর কোনো ক্ষতি করবে না।”

আরশাদ রাজি হলো সেদিন। অনুভার কোনো করবে না। তায়ানও চুপ থাকল। তায়ানের মনে হলো আরশাদ ডক্টরকে নিজের মুঠোয় নিয়ে নিয়েছে। কারণ ডক্টর জেসমিনের মৃত্যুর ভুল ইনফরমেশন খুব গুছিয়ে বলছিল।

জেসমিনের মৃত্যুর পর অনুভাকে কিছুদিন তার নানা-নানু রাখত। আবার আরমান সাহেবও নিজের কাছে রাখত। আদরের কোনো কমতি ছিল না। আহসানি বাড়িতে থাকা অবস্থায় তায়ানই বেশি খেয়াল রাখত অনুভার উপর। আমীরা বেগম ফিডার বানালে সেটা তায়ানই বেশি খাওয়াত। স্কুল থেকে আসার সময় হাবিজাবি এনে দিত। বাচ্চা মেয়েদের খেলনা কিনে আনত। মন চাইলেই ধরে ধরে চুমু খেত। এর জন্য আরশাদ সাহেবের কম মা’র খায়নি সে। সে কখনই তায়ানকে অনুভার ধারে কাছে সহ্য করতে পারত না। যতক্ষন সে বাসায় থাকত তায়ান অনুভার কাছে যাওয়ার সাহস পায়নি।

আরশাদ সাহেব তখন অনুভার প্রতি এতবেশি যত্নশীল ছিল যে ইশতিয়াক আহমেদ মেয়ে হারিয়েও ভাবত তার একটা ছেলে আছে। অনুভা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। তাই একদিন ইশতিয়াক আহমেদ কথায় কথায় বলে ফেলে তার সব সম্পত্তি অনুভাকেই দিয়ে যাবে সে। যা শুনে আরশাদ সাহেবের মুখে কালবৈশাখীর মেঘ জমে যায়। যা পেতে সে এতকিছু করছে সেটা এই দু’দিনের বাচ্চাকে দিয়ে দেবে? তখন অনুভার বয়স মাত্র পাঁচ। ইশতিয়াক আহমেদের থেকে সেটা শোনার পর আরশাদ সাহেব অনুভাকে মে’রে ফেলারও অনেক সুযোগ খুঁজত। যেটা বেশিরভাগ সময় তায়ানের চোখেই পড়ত। বাসায় কেউ না থাকলেই আরশাদ নানা অজুহাত দেখিয়ে মেয়েটাকে নিজের কাছে রাখত। প্রতিবার তায়ান এসে আরশাদের কাজে বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে।

অনুভা রুমে একা থাকলে আরশাদকে যদি অনুভার রুমের দিকে যেতে দেখত, তায়ান আগেই সেই রুমে গিয়ে অনুভাকে নিয়ে আড়ালে লুকিয়ে থাকত। অনুভা ছটফট করলে ওর নাক-মুখ চেপে ধরে থাকত যেন শব্দ না করে। তাই আরশাদ সাহেবেরও সেই সুযোগ হতো না। তায়ান কখনও এগুলো কাউকে বলতেও পারত না। কারণ আরশাদ নিজেকে সবার সামনে এত দায়িত্বশীল বাবা হিসেবে প্রমাণ করেছে যে, এগুলো বললে উল্টো তায়ানই বিপদে পড়ত।

অনুভার ধারে কাছে থাকায় তায়ানকে প্রায়ই আরশাদের হাতের মা’র খেতে হতো। আর সেই রাগ গিয়ে অনুভার উপরই ঢালত তায়ান। কারণ ওর জন্যই তায়ানকে এত কিছু সহ্য করতে হচ্ছে। নাহলে আরশাদের মতো লোককে তায়ান কখনোই দু পয়সার দাম দিত না।

তায়ান সেদিন বাগানে ফুটবল নিয়ে প্র্যাকটিস করছিল। তার বয়স তখন চৌদ্দর শেষ দিকে। অল্প বয়সেই তায়ান হাতে পায়ে অনেকটা লম্বা হয়ে গিয়েছিল৷ দেখলে সতের আঠার বছরের মতোই মনে হতো তাকে। অনুভাকে বাগানের একপাশের চেয়ারে বসিয়ে রেখেছে। মেয়েটা বারবার চলে যেতে চাইলেও তায়ান যেতে দেয়নি। তখন আহসানি বাড়িতে আরিজ, অলি থাকলেও তায়ান শুধু ঘুরে ফিরে অনুভাকেই বেশি আদর করত। অজানা এক টান তাকে শুধু এই মেয়েটার কাছে নিয়ে যেত। আরশাদ সাহেবের উপর রাগ করে অনুভাকে কষ্ট দিলেও সবশেষে অনুভাকে না দেখলে তায়ানের অস্থির লাগত।

ফুটবল খেলার ফাঁকে ফাঁকে সে বসে ছটফট করতে থাকা অনুভাকে দেখছিল। মেয়েটার গায়ে গোলাপী রঙ্গের সিম্পল গাউন পড়া। চুলগুলো ক্লিপ দিয়ে দু’পাশে সেট করা। সেগুলোও তায়ানই কিনে এনে দিয়েছিল। তায়ান বল ফেলে দিয়ে অনুভার সামনে এসে হাটুগেড়ে বসে গম্ভীর গলায় বলে,

_“ এভাবে ছটফট করছিস কেন?”

_“ আমি বাসায় যাবো, ভাইয়া।” অনুভা চোখ মুখ কুঁচকে বলল।

তায়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,

_“ কেন? এখানে কী সমস্যা?”

অনুভা চোখ বড় বড় করে ফিসফিসিয়ে বলল,

_“ আব্বু এসে দেখলে মা’রবে তো।”

_“ এত ভয় পাশ কেন? আমি আছি না?”

_“ আপনার সাথে দেখলেই তো বেশি মা’রে।”

কথাটা শুনে তায়ান থেমে গেল। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইল তার দিকে। সেই ছোট্ট, ভীত মুখটার দিকে। তারপর বলল,

বিজ্ঞাপন

_“ আচ্ছা শোন, তুই তো একদিন বড় হবি। আমিও বড় হবো। তারপর আমি তোকে বিয়ে করব। তুই আমার বউ হবি। তখন আর তোর বাপ আমার থেকে তোকে আলাদা করতে পারবে না।”

অনুভা ঠোঁট উল্টে বলল কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল,

_“ বউ মানে কী, তায়ান ভাইয়া?”

তায়ান একটু চুপ থেকে মাথা চুলকে, হালকা হেসে বলল—

_“বউ মানে… উম… যে আমার সাথে সবসময় থাকবে… আর আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না। আর… আমি ওকে কাউকে কাঁদাতে দেব না।”

_“ আপনি নিজেই তো আমাকে কাঁদান।”

অনুভার কথায় তায়ান অপ্রস্তুত হলেও বুঝতে দিলো না। সে গম্ভীর ভাব ধরে রেখে বলল,

_“ রাগ হলে কাঁদাই, তারপর তো আবার আদরও করি। তুই কী চাস না আমার সঙ্গে থাকতে?”

অনুভা সঙ্গে সঙ্গে চুল গুলো নাচিয়ে দু’পাশে মাথা নেড়ে বলল,

_“ না।”

তায়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে যায় তৎক্ষনাৎ।

_“ কি বললি?”

অনুভা এবার উপর নিচ মাথা নাড়ল। বলল,

_“ চাই…”

এই সব কিছুই আড়ালে দাড়িয়ে আরশাদ শুনল। তার কিছুদিন পরই সে তায়ানকে সব বলে দিলো। সে যে এ বাড়ির ছেলে নয়, তার পরিবারকে খু’ন করা হয়েছে। এমনকি সে যাকে বর্তমানে বাবা হিসেবে জানে সে নিজেই তার জন্মদাতার খু’নি। তার মায়ের সঙ্গে আরমান সাহেবের পরকীয়ার সম্পর্ক থাকায় আরমান সাহেব তার বাবাকে বিয়ে করে আমিরা বেগম আর তাকে এই বাড়িতে এনেছে।

আরও অনেক কিছুই সেদিন তায়ানকে জানিয়েছিল। যা তায়ান কল্পনাও করতে পারেনি।

_“ আজ বুঝেছিস আমি তোকে কেন এত ঘৃণা করি? কারণ তুই আমার ভাইয়ের ছেলেই না।”

_“ আমি বিশ্বাস করি না। নিজের বাবা না হলে সে আমাকে এত ভালোবাসে কেন?”

_“ কারণ সে তোর মা’কে ভালোবাসে। তার চোখে ভালো থাকার জন্য তোর উপর দরদ দেখায়।”

_“ কিন্তু তোমার কথা আমি কেন বিশ্বাস করব?”

_“ আমার কথা বিশ্বাস করতে হবে না। তোর বাড়িতে যে লোকটা কাজ করত সে সব জানে। তবে তার কাছে পৌছাতে হলে তোকে আরেক জনের কাছে যেতে হবে।”

_“ আমার কিছুই জানার দরকার নেই। আমি এগুলো বিশ্বাস করি না। আমি এ বাড়ি ছেড়ে কোত্থাও যাবো না।” তায়ান বলল।

_“ কেন যাবি না?” আরশাদ বিরক্ত হয়ে বলল।

_“ কারণ আমি চলে গেলে তুমি অনুভার ক্ষতি করবে।”

তায়ানের কথায় হাঁসল আরশাদ।

_“ ক্ষতি কী আমি তুই থাকা অবস্থায় করতে পারব না? বরং তুই যদি না যাস তাহলে আরও বেশি ক্ষতি করব। এমনও হতে পারে ওকে আমি সুযোগ পেলেই মে’রে ফেলব।”

_“ নিজের মেয়ের উপর কী একটুও দয়া নেই তোমার?”

_“ না, নেই। ওকে দিয়ে আমার কী হবে? ও আমার কোনো কাজেই আসবে না। কিন্তু তুই যদি এই বাড়ি ছাড়িস তাহলে আমি ওকে জীবিত রাখব।”

তায়ান রাজি হতে চায়নি। কিন্তু আরশাদ অনুভা আর তার বাবার খু’ন হওয়ার গল্প শুনিয়ে তায়ানকে এক প্রকার আতঙ্কে ফেলে দেয়। তায়ানের বয়স কম। সে চাইলেও তখন আরশাদকে কিচ্ছু করতে পারত না। তায়ানের পরিবারের কথা বলে যতটুকু কাজ না হয় ততটুকু হয় অনুভাকে মে’রে ফেলার কথা বলে। রাজি হয় তায়ান।

_“ চলে যাবো আমি। কিন্তু কথা দিতে হবে, অনুভার কোনো ক্ষতি তুমি করবে না। আর যদি করো তাহলে ভুলে যেও না আমিও একদিন বড় হবো।”

তায়ান আরশাদকে নিরব হুমকি দেওয়ার চেষ্টা করল। আরশাদ সব মেনে নিলো। কথা দিলো সে অনুভার কিছু করবে না। তবে এটা যে তায়ানকে ভয় পেয়ে সেটাও নয়। ইশতিয়াক আহমেদ ইতিমধ্যে নিজের সবকিছু তার নাতনিকে অর্থাৎ অনুভাকে দিয়ে দিয়েছে। আর এ সব কিছুর দায়িত্ব দিয়েছে আরমান সাহেবের কাছে। এজন্য অনুভাকে বাঁচিয়ে রাখবে সে। সম্পত্তি লিখে দেওয়ার আগে মে’রে ফেললে সে কথা ভিন্ন। কিন্তু এখন সব অনুভার হয়ে গেছে। আর তায়ান বড় হয়ে অনুভাকে বিয়ে করতে চাইলে এক কথায়ই আরমান সাহেব রাজি হয়ে যাবে। আর সেই সম্পত্তি নিয়ে রাজ করবে বাহিরের একটা ছেলে! এসব ভাবনাই আরশাদকে পাগল করে দিচ্ছিল।

_“ আজ রাতেই বাড়ি ছাড়বি তুই।”

_“ কিছুদিন পর আমার জন্মদিন। জন্মদিনের পরে যাই?” তায়ান বলল।

আরশাদ কটাক্ষ করে বলল,

_“ এ বাড়িরে খেতে পেরেছিস এতদিন এটাই কী অনেক নয়? আবার জন্মদিন! আর তোর কী লজ্জা নেই? নিজের বাপের খু’নির বাড়ির জন্য এত মায়া দেখাচ্ছিস!”

তায়ানের মুখ শক্ত হয়ে গেল। আরশাদের কথা যদি সত্যি হয় তাহলে এটা আসলেই তো তার বাবার খু’নির বাড়ি! সে কেন এখানে নিজের জন্মদিন অব্দি থাকবে? যে তার জন্মদাতাকে মে’রে তার বাড়িতে কেন থাকবে? সে আগে সত্য জানবে তারপর ফিরবে। তায়ান সেদিন মাঝরাতেই বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।

যাওয়ার আগে একবার অনুভার রুমে যায়। সেদিন অনুভার রুমে যেতে কেমন যেন তার পা কাঁপছিল। পনেরো বছর তখনও হয়নি তার, ভালোবাসার অনুভূতি কেমন সেটা সে জানে না। তবু অনুভার প্রতি একরকম টান, একরকম মায়া, যার ব্যাখ্যা সে নিজেও জানে না। কাঁধে ছোট্ট একটা ব্যাগ ঝুলানো। নিঃশব্দে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেল। বেডের এক পাশে বসে। বুকের ভেতরটা অদ্ভুদ এক চিনচিনে ব্যাথা হচ্ছিল। ঘরের ভেতর ম্লান ড্রিম লাইট জ্বলছে।

হালকা হলুদাভ আলোয় সবকিছু যেন স্বপ্নের মতো লাগছে। একধ্যানে তাকিয়ে রইল অনুভার দিকে। মেয়েটার বয়স তখন ছয়, কি সাত। ঘুমের ভেতর নির্ভাবনায় হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে।

চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গালে লেগে আছে। খুব সাবধানে তায়ান হাত বাড়িয়ে অনুভার হাত-পাগুলো একটু গুছিয়ে দিল, চাদরটা টেনে ঠিক করে দিল গায়ের ওপর। যেন কোনো কাঁচের পুতুল একটু অসাবধান হলেই ভেঙে যাবে। তার আঙুল ছুঁয়ে গেল অনুভার কপাল, একটু থামল তারপর খুব আস্তে করে সেখান থেকে চুল সরিয়ে দিল। কিছু একটা বলতে চাইল হয়তো, কিন্তু গলায় কোনো শব্দ এল না। সে কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়েই রইল। মেয়েটার জন্মের প্রথম দিন থেকে সব ভাবতে লাগল। জেসমিন মামুনি সেদিন চোখের ইশারায়ই তায়ানের উপর তার মেয়ের দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিল। তায়ানের আরও সব মনে পড়ল। কীভাবে সেদিন এক দিনের নবজাতককে নিয়ে ছুটছিল সে। সেই ছোট্ট মেয়েটাই আজ এইভাবে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে তার সামনে। তায়ানের চোখে ভেসে উঠতে লাগল আরও কত মুহূর্ত, ফিডার হাতে নিয়ে খাওয়ানো, স্কুল থেকে ফিরে ছোট ছোট জিনিস এনে দেওয়া, অকারণে বকাঝকা করা, আবার নিজেই গিয়ে জড়িয়ে ধরে আদর করা…মেয়েটা কখন যে তার অভ্যাস হয়ে গেছে, সে নিজেও জানে না। যার উপর রাগ না করলে যেন দিন সম্পূর্ণ হয় না, আবার আদর না করলে মন ভরে না। এক অদ্ভুত টান, যার কোনো নাম সে জানে না, কিন্তু যার টানেই সে বারবার ফিরে আসে এই ছোট্ট মানুষটার কাছে। আজ সেই মানুষটাকেই ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে…ভাবতেই বুকের ভেতরটা কেমন ব্যথায় টনটন করে উঠল।

এসব ভেবে ভেবে কখন যে তায়ানের চোখে পানি চলে এলো! সে তো কাঁদেই না। আরশাদ সাহেব তাকে কত মা’রত, বকত। কষ্ট পেলেও সহজে কাঁদত না সে। আজ এমন কেন লাগছে তার? কান্না পাচ্ছে। ইচ্ছা করছে মেয়েটাকে সঙ্গে নিয়েই কোথাও চলে যেতে। কিন্তু তা তো সম্ভব নয়। তার সঙ্গে নিয়ে কোথায় রাখবে? তার তো নিজেরই যাওয়ার জায়গা নেই। তখন তো মেয়েটার অযত্ন হবে। সঙ্গে নেওয়া কখনোই সম্ভব না। এখানে থাকাও সম্ভব না। ভাবনার ঘোরে তায়ান কখন যে অজান্তেই অনুভার দিকে ঝুঁকে পড়েছে, সে নিজেও টের পায়নি। তার চোখের কোণ ভিজে উঠেছিল অনেক আগেই। কিন্তু সেই জল যে গড়িয়ে পড়ছে, এটাও যেন বুঝতে পারছিল না সে। টুপটাপ করে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গিয়ে পড়ল অনুভার বুকের ওপর, চাদরের ওপর ছোট ছোট ভেজা দাগ হয়ে ছড়িয়ে গেছে। মুখটা আরও কাছে এনে নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে। তার চোখে তখন শুধু একরাশ অসহায়তা, আর এমন এক কষ্ট, যার ভাষা সে নিজেও ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ।

তায়ান আবারও কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। নিজের ভেতরের অস্থিরতাটা চেপে রাখার চেষ্টা করছিল সে, কিন্তু পারল না। হঠাৎ করেই তার ভারী হয়ে এলো শ্বাসটা। চোয়াল শক্ত করে রাখতে চেয়েছিল, তবুও আবার ভিজে উঠল চোখ দুটো। একটা চাপা কান্না প্রথমে গলায় আটকে থাকলেও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ল। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল একের পর এক অশ্রু। নিঃশব্দে, থেমে থেমে কাঁধ কেঁপে উঠছে তার। তায়ান হাত দিয়ে মুখ ঢাকার চেষ্টা করল, কিন্তু কান্না তাতে আরও ভেঙে বেরিয়ে এলো। তার বুকের ভেতর জমে থাকা ভয়, দায়, আর অদ্ভুত সেই মায়া, সব একসাথে বেরিয়ে আসছে যেন। মায়া যে এত জঘন্য অনুভূতি জানলে সে এই মেয়ের দিকে ফিরেও তাকাতো না। কই সে তো তার মা’কেও ছেড়ে যাচ্ছে। তার ছোট ভাইকে ছেড়ে যাচ্ছে তাদের জন্য কেন এমন লাগছে না? হলদে আলোয় তায়ানের মুখটা পুরো পরিষ্কার না হলেও দেখা যাচ্ছিল। ফিকে হলদে আভায় তার মুখটা কেমন যেন অদ্ভুত লাগছিল, চোখ লাল হয়ে ফুলে উঠেছে, গাল ভেজা, ঠোঁট শক্ত করে চেপে ধরার চেষ্টা করা।

শেষমেশ তায়ান ধীরে ধীরে অনুভার এক হাত আলতো করে নিজের দু’হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল। হাতটা আস্তে করে ঠোঁটের কাছে এনে রাখল সে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎই ফুপিয়ে উঠল , একদম ভেঙে পড়া গলায়, থেমে থেমে নিঃশ্বাস নিতে নিতে। বাচ্চাদের মতো করে কাঁদল যেন তার থেকে কত পছন্দের খেলনা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।

_“ তুই তো ছোটো। ভুলে যাবি আমাকে। কিন্তু আমি কীভবে তোর সঙ্গে কাটানো সবকিছু ভুলে যাবো? এত মায়াবী কেন তুই?” শেষ শব্দটা বলতেই তার কণ্ঠ আরও নরম হয়ে গেল। সে অনুভার হাতটা একটু শক্ত করে ধরে রইল, যেন হাতটা ছেড়ে দিলেই সব স্মৃতি ছিটকে চলে যাবে। গলা ভেঙে আসছে তার তবুও বলল,

_“ আমাকে ভুলে যাস না। আমি ফিরে আসব আবার। তুই তখন আমার সাথেই থাকবি…তোকে আমার বউ বানাব। তারপর আর কেউ আমার থেকে তোকে আলাদা করতে পারবে না।” তায়ান কথা গুলো এত নিচু গলায় বলছিল সে নিজেও যেন শুনতে পাচ্ছিল না।

_“আমি গেলে কি তুই একটুও খুঁজবি আমাকে? একটু হলেও মনে পড়বে তোর? আমি যে তোকে অভ্যাস করে ফেলেছি…এখন গেলে কীভাবে থাকব আমি?” এক হাতে অনুভার হাত ধরে অন্য হাতে নিজের চোখের পানি মুচছিল সে। ছোট ছোট হেচঁকি উঠছিল।

_“ ফিরে আসব একদিন। অপেক্ষায় থাকবি আমার। এসে যদি দেখি অন্য কারও বউ হয়েছিস। মে’রে ফেলব একদম।”

আরও অনেক কিছুই বলল তায়ান। তারপর ধীরে ধীরে ঝুঁকে এসে অনুভার কপালে আলত করে ঠোট ছুইয়ে দিয়ে বের হয়ে যায়। যাওয়ার আগে একবার দরজায় দাড়িয়ে পেছন ফিরে তাকায়।

সে যখন বাড়ির বাহিরে চলে যায় তখনই কেউ এসে তায়ানের মুখে কাপড় পেচিয়ে শরীর বেঁধে গাড়িতে নিয়ে বসায়। যেন অনেক্ষন ধরেই তার অপেক্ষায় ছিল।

বিজ্ঞাপন
রক্ত রেখার আড়ালে গল্পটি আয়েশা শেখ রিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে মোড়ানো থ্রিলার উপন্যাস