রক্ত রেখার আড়ালে

পর্ব - ৩৫

🟢

শান্তর কথা নিঃশব্দে শুনছিল অনুভা। কোনো প্রতিবাদ, কোনো উত্তর,কিছুই যেন খুঁজে পেল না সে। শব্দগুলো এসে বুকের ভেতর কোথাও আটকে রইল, ঠোঁট পর্যন্ত পৌঁছাল না। তার চোখ দু’টো স্থির শান্ত আর আরাফের দিকেই। আরাফ কত আরাম করে শান্তর কাঁধে লুটিয়ে পড়েছে। সকাল সকাল ঘুম ভেঙে যাওয়ায় আবারও ঘুমিয়ে পড়েছে। আর শান্ত আরাফের পিঠে আলত করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। শান্তর মুখে রাতজাগা ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, তবু সেই ক্লান্তির ভেতরেও অদ্ভুত এক প্রশান্তি এসে বসেছে, যেন এই ছোট্ট মানুষটাকে বুকে পাওয়াই তার সব শান্তির উৎস।

অনুভা তাদের দিকে তাকিয়ে থাকলেও, দৃষ্টিটা যেন ভেদ করে চলে যাচ্ছিল আরও দূরে কোথাও, যেখানে এই মানুষটাই একটা নকল কাগজ এনে অনুভাকে ভেঙে দিয়েছিল। সেটা নিয়ে অনুভার আফসোস নেই। অনুভার অবাক লাগে এটা ভেবে, শান্তও তাকে মিথ্যা বলেছে। সবাই এতো মিথ্যার আশ্রয় কেন নেয়? সে যেটাকে ভয় পায়, সেটাই কেন এসে ধরা দেয়? হতে পারে শান্তর কাজে আজ সে এতটুকু শক্ত হতে পেরেছে, নাহলে তো সেও

শান্তর প্রতি তার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। তাকে তার বড় আব্বু, বড় আম্মু, অলির মা, অলি,আরিজ ভাইয়া সবাই ভালোবাসে। তারা তার আপনজন, তাদের সাথে অনুভার রক্তের সম্পর্ক, তাই তাকে ভালোবাসে। কিন্তু শান্ত…তার সঙ্গে তো কোনো রক্তের বন্ধন নেই। কোনো সামাজিক সম্পর্কও না। তবু এক আত্মিক টান তৈরি হয়েছে অজান্তেই। অদ্ভুত এক টান। অভ্যাসের মতো, নির্ভরতার মতো, একধরনের নীরব জড়িয়ে থাকা। যেখানে হৃদয়টা পুরোপুরি জড়ায়ও না, আবার ছিঁড়েও ফেলা যায় না। ঠিক সেই জায়গাটাতেই দাঁড়িয়ে আছে অনুভা। দূরত্ব রাখতে চেয়েও, পুরোপুরি দূরে সরে যেতে পারে না।

শান্তর প্রতি তার কোনো দাবি নেই, কোনো অধিকার নেই, আর না কোনো ভালোবাসা। গভীর এক নামহীন আত্মিক টানে জড়িয়ে ফেলেছে শান্ত তাকে। সে অভ্যস্ত হয়ে গেছে শান্তর উপস্থিতিতে, তার যত্নে, তার নির্ভরতায়। এই মানুষটা পাশে থাকলে সবকিছুই সহজ মনে হয়, আর না থাকলে কোথাও একটা শূন্যতা তৈরি হয়, কিন্তু সেই শূন্যতাকে সে ভালোবাসা বলে মানতে পারে না। হয়তো পারবেও না।

_“ দেখে মনে হচ্ছে রাতে ঘুমাওনি। রুমে যাও ঘুমাও।” শান্ত অনুভাকে চুপ থাকতে দেখে কথা ঘুরিয়ে বলল।

_“ ওকে দিন ঘুমিয়ে গেছে।” আরাফের দিকে ইশারা করে বলল অনুভা।

_“ না, ও আমার কাছেই ঘুমোবে। আমারও ঘুম পাচ্ছে। ঘুমাব আমি। আর ঘুমিয়ে পড়লে যদি ওকে নিয়ে পালিয়ে যাও?” শান্ত বলল।

_“ আমি এধরনের কাজ করি না। এসব প্রতারণামূলক কাজ আপনারাই…”

অনুভাকে বাক্য শেষ করতে দেয় না শান্ত।

_“ হয়েছে থাক। ফ্রিজে খাবার আছে। খেয়ে ঘুমাও।”

শান্ত নিজের রুমে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিল। তারপর নিঃশব্দে গিয়ে বেডে শুয়ে পড়ল। আরাফকে বালিশে শোয়াল না, বরং নিজের বুকের ওপর জড়িয়ে নিল। ছোট্ট শরীরটা বুকের সঙ্গে মিশে যেতেই অদ্ভুত এক ক্লান্তি নেমে এল তার ওপর। চোখ দু’টো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে এলো। অনুভা ধীর পায়ে নিজের রুমে ফিরে গেল। দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকে মেঝেতে বসে পড়ল। বিছানায় মাথা ঠেকিয়ে চোখটা বন্ধ করে রইল। আরাফকে তায়ান নিয়ে যাওয়ার পর থেকে ঠিকমতো খাওয়া হয়নি, ঘুমও না। পেটটা খিদেতে জ্বলছে, তবু খাওয়ার ইচ্ছে নেই একটুও। শরীর ক্লান্ত, মন আরও বেশি। এই জায়গা থেকে তাকে খুব শিঘ্রই চলে যেতে হবে। ওই মানুষটা এখানে থাকলে আবারও ঝামেলা করবে। আবারও এসে আরাফকে নিয়ে যেতে চাইবে, এটার কোনো নিশ্চয়তা নেই যে সে থেমে যাবে। কিন্তু একটা প্রশ্ন বারবার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে,

যে মানুষটা একদিন নিজে থেকেই চলে গিয়েছিল… সে আবার ফিরে এল কেন? আর কেন বলছে, এই দু’টা বছর সে তাকে খুঁজেছে? তার উদ্দেশ্য কী? সে আসলে কী চায়? আর কী নেওয়ার বাকি আছে অনুভার কাছ থেকে? সব ছেড়ে একটু শান্তিতে বাঁচতে এসেছে এখানে। কিন্তু সেখানেও এই অমানুষটা হাজির! সবকিছুর শেষ কোথায়। কোথায় গেলে তার থেকে মুক্তি পাবে।

—

দুপুর গড়িয়ে বিকেলের আলো নামার আগেই ঘুম ভাঙল অনুভার। ভারী চোখে কিছুক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর ধীরে উঠে শাওয়ার নিয়ে নিল। শরীরটা কিছুটা হালকা লাগলেও ভেতরের ক্লান্তিটা কোথাও যায়নি। হালকা কিছু খেয়ে নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল সে। মিডিয়াম সাইজের সবুজ টপ, সঙ্গে কালো প্যান্ট পড়া। চুলগুলোও যত্ন করে বেঁধে নিচ্ছিল। তখনই পাশের রুম থেকে ভেসে এলো আরাফের কান্না। অনুভা তড়িঘড়ি করে এগোতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই দরজা খুলে শান্ত নিজেই আরাফকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে এলো। অনুভা দু’হাত বাড়িয়ে ছেলেকে নিজের বুকে তুলে নিল,

_“এই তো মা…” ছেলের গালে আলতো করে চুমু খেল সে।

শান্ত কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল অনুভার দিকে, তারপর জিজ্ঞেস করল,

_“তুমি কোথায় যাচ্ছো?”

_“ক্লাবে যাবো একটু।” অনুভা স্বাভাবিক স্বরে বলল।

শান্ত ভ্রু কুঁচকাল।

_“কেন?”

_“বলে আসব… আমি আর সেখান থেকে বাইক রেস করছি না।”

শান্তর কপাল এবার আরও ভাঁজ পড়ল

_“মানে?”

অনুভা একবার ছেলের দিকে তাকাল, তারপর বলল।

_“বাংলাদেশে ফিরব। থাকব না আর এখানে।”

_“কেন?” শান্তর কণ্ঠে বিস্ময়।

অনুভা চোখ নামিয়ে নিল।

_“আমি কোনো ঝামেলা চাই না। কিন্তু যার নজরে পড়েছি… সে ঝামেলা না করে থাকবে না।”

শান্ত একটু এগিয়ে এসে বলল,

_“এখান থেকে চলে গেলে যে সে তোমার পিছু নেবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা আছে?”

_“এখানে আমরা শুধু দু’জন… আর উনার ভারা করা লোকের কোনো অভাব নেই। আপনি বা আমি, একা কেউই নিজেদের ঠিকমতো রক্ষা করতে পারব না। কিন্তু বাংলাদেশে অন্তত বড় আব্বু, বড় আম্মু আছেন… আমি চাই না সে আবারও এসে আরাফকে নিয়ে যাক।”

শান্ত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, কিছু একটা ভেবে নিচ্ছে বলল,

_“মার্সেইতে ফিরে চলো। আমার বাসায় থাকবে। আমি বাবাকে বুঝিয়ে বলব।”

অনুভা ফিচেল হেঁসে হালকা মাথা নাড়ল,

_“আপনি জানেন, এটা সম্ভব না। উল্টো… আমরা দু’জনই অপমান হব।”

_“কিন্তু বাংলাদেশেও তুমি ভালো থাকবে না, মাহভিন…”

_“ জানি না… কিন্তু আপাতত আমার সন্তানকে ওর নজরের বাইরে নিতে চাই। আর সবথেকে বড় কথা হলো, আমি বাংলাদেশের কোর্টে গিয়ে ডিভোর্স পেপার রেডি করব। এই সম্পর্কের ভেতর আমি আর থাকতে পারছি না। আমার দম আটকে আসে ভাবলে।”

ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শান্ত গভীর দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। ডিভোর্সের কথা শুনে আর বাঁধা দিতে ইচ্ছা হলো না ওর।

_“আচ্ছা… বেশ। কবে যাবে?”

_“যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।”

—

আরাফকে বুকের কাছে বেবি ক্যারিয়ারে জড়িয়ে,বাইকের সামনে বসিয়ে ছুটে চলেছে অনুভা। এক হাতে শক্ত করে হ্যান্ডেল সামলাচ্ছে, আর অন্য হাতে আরাফকে আগলে রেখেছে সে। যদিও ছোট্ট শরীরটা নিরাপদেই বাঁধা আছে, তবু সামান্য ঝুঁকিও নিতে রাজি নয় অনুভা। বাতাস চিরে এগিয়ে চলা সেই পথে দু’জনের মাথাতেই হেলমেট। সব দিক থেকেই যতটা সম্ভব নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা। আরাফকে সঙ্গে আনার ইচ্ছা ছিল না তার। কিন্তু শান্ত আজ নিজের অফিসে গেছে রিজাইন দিতে। আর ঘুম থেকে ওঠার পর আরাফের সমস্ত চাওয়া-পাওয়া যেন মাকে ঘিরেই। মা ছাড়া তখন পৃথিবীতে আর কিছুই যেন তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। এইতো এখন ফুরফুরে মন নিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। আর একটু পরপর মা'কে ডেকে উঠছে। মাঝে মধ্যে হাত বাড়িয়ে মায়ের মতো করে হ্যান্ডেল ধরার চেষ্টা করছে। অনুভা তা দেখে হেলমেটের আড়ালেই মুচকি মুচকি হাসছে। কিন্তু সেই হাসি মিলিয়ে গেল সামনে থেকে ধেয়ে আসা আরেকটি লাল রঙের বাইক দেখে। খুব দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসছে। অনুভা বুকের ভেতর ধক করে ওঠে। বিদ্যুৎ বেতে দু'হাতে ব্রেক কষে ধরল অনু। তীব্র ঝাঁকুনিতে বাইকটি হঠাৎ থেমে যেতেই ভারসাম্য হারিয়ে রাস্তার উপর ছিটকে পড়ে গেল তারা বাইকসহ। সৌভাগ্যবশত, বেবি ক্যারিয়ারের শক্ত বাঁধন আর মাথার হেলমেট আরাফকে বড় কোনো আঘাত থেকে বাঁচিয়ে দিল। তবুও অপ্রত্যাশিত ভয় পেয়ে সে কেঁদে উঠল জোরে। অনুভার কোমরে হালকা চোট লাগে। তীব্র ব্যথা সত্ত্বেও দাঁত চেপে উঠে দাঁড়াল সে। প্রথমেই ছেলেকে বেবি ক্যারিয়ার থেকে বের করে নিজের দিকে ঘুরিয়ে, হেলমেটটা আলত করে খুলে, বুকে জড়িয়ে নরম গলায় ভরসা দিতে থাকে যেন ভয়টা কমে যায়। তারপর সামনের দিকে তাকায়।

লাল রঙের বাইকে থাকা এলেনা ধীর ভঙ্গিতে হেলমেট খুলে ফেলল। মুখ উন্মোচিত হতেই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিকৃত, পৈশাচিক হাসি, যেন এই অরাজকতাই তার আনন্দ। পরক্ষণেই সেই হাসি মিলিয়ে গিয়ে জায়গা নিল বিরক্তি। চোখে-মুখে স্পষ্ট আফসোসের ছাপ ফুটে উঠল। ঠোঁট বেঁকিয়ে ঠান্ডা স্বরে বলে উঠল,

_“Damn it! ভেবেছিলাম দু’টোকে একসঙ্গেই উপরে পাঠাব।”

_“ আমার বাচ্চার দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস করলে একদম জানে মে'রে ফেলব!” অনুভা চোয়াল শক্ত করে বলল।

_“ বাহ! প্রতিদ্বন্দী এমন না হলে জমে না। তো তোমার বাচ্চার দিকে তাকালে কী করবে তুমি?” এলেনার কণ্ঠে যেন এক অদ্ভুত উন্মাদ আনন্দ ঝরে পড়ছিল।

অন্যদিকে অনুভার চোখ তখন আ’গুন হয়ে উঠেছে। বুকের ভেতর জমে থাকা ভয়, রাগ আর মাতৃত্বের তীব্র স্রোত একসাথে ফেটে পড়ছে। খুব স্থির, দৃঢ় গলায় বলল,

_“ ওই যে বললাম… জানে মে'রে ফেলব!”

এ কথার পর আর দেরি করল না এলেনা। হঠাৎই বাইক থেকে নেমে পড়ে সে,ধীর পায়ে এগিয়ে এসে আরাফের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।

_“ ওকে ডান…”

তৎক্ষনাৎ অনুভা শক্ত করে চে'পে ধরে এলেনার হাত।

বিজ্ঞাপন

_“ আমি সব মেনে নেব, কিন্তু আমার বাচ্চার দিকে কেউ নজর দিলে চোখ উপড়ে ফেলব একদম! চলে যান এখান থেকে। আপনাকে দেখলেই আমার বিরক্ত লাগে।”

কথা শেষ হতেই একটা তীক্ষ্ণ চড় এসে আছড়ে পড়ল অনুভার গালে। এলেনার এক চ’ড়েই ঠোঁটের এক কোনে হালকা র’ক্ত বেড়িয়ে আসে অনুভা। আরাফ ভয়ে লাফিয়ে ওঠে। ছোট্ট শরীরটা কাঁপতে কাঁপতে মায়ের জামা খামচে ধরে মুখ লুকিয়ে ফেলল অনুভার বুকে। সেই মুহূর্তে অনুভার ভেতরের পৃথিবীটা যেন থমকে গেল। সে ধীরে ধীরে আরাফকে নিচে নামাল। কোমল অথচ দৃঢ় গলায় আশ্বাস দিলো ছেলেকে।

_“ কাঁদবে না। এখানে দাঁড়াও চুপ করে। আমি এখানেই আছি।”

এরপর অনুভার হাত অনিবার্য এক তাড়নায় উঠে গেল পাশের হেলমেটটির দিকে। মুহূর্তের ভেতরই যেন নিঃশব্দ হয়ে এলো সবকিছু, শুধু তার শ্বাসের ভারী শব্দ আর রক্তের মতো গাঢ় রাগের উপস্থিতি। এক মুহুর্ত দেরি না করে প্রথম আঘাতটা করে এলেনার মাথায়। এলেনা বিস্ময়ে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। কিন্তু সে কিছু বলা বা করার আগেই অনুভা দ্বিতীয় বারের মতো আঘাত করল। একে একে কয়েকবার। প্রতিটি আঘাতে তার ভেতরের জমে থাকা ভয়, অপমান আর মাতৃত্বের উন্মত্ত প্রতিরোধ আরও বেশি করে বিস্ফোরিত হচ্ছিল। এলেনা চেষ্টা করছিল নিজেকে সামলাতে, প্রতিরোধ করতে, কিন্তু অনুভার সেই মুহূর্তের তীব্রতা তাকে কোনো সুযোগই দিচ্ছিল না। যেন একরকম ঝড় এসে আছড়ে পড়েছে তার অস্তিত্বের উপর। অনুভা নিজে চ'ড় খেয়েছে তার চেয়েও বেশি রাগ উঠেছে তার ছেলেকে ভয় দেখানোর জন্য। সে রুক্ষ কন্ঠে চিৎকার করে উঠলো সে।

_“ সেদিনের অনুভা পেয়েছিস আমাকে? যা-তা ব্যবহার করবি, গায়ে হাত তুলবি, আর আমি কাঁদতে কাঁদতে সব মেনে নেব?”

ছোট্ট আরাফ এই দৃশ্য দেখে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেছে। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে তার ছোট্ট পা দুটো এলোমেলোভাবে মায়ের দিকে এগিয়ে যেতে চাইছে। তখনই কেউ এসে তাকে কোলে উঠিয়ে নেয়। কোলে উঠিয়ে নেওয়া মানবটার মুখের দিকে তাকিয়ে মুখ দেখতে না পেরে কান্নার তীব্রতা বেড়ে যায় বাচ্চাটার।

অনুভা আবারও হেলমেটটা শক্ত করে ধরে আঘাত করতে যাচ্ছিল, কিন্তু এলেনা হঠাৎই নিজের ডান হাত তুলে তার চুলের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করল। কিন্তু এলেনার হাত অনুভার চুল স্পর্শ করার আগেই, এক শক্তিশালী পুরুষালি হাত বিদ্যুৎগতিতে এসে তার কব্জি শক্ত করে চেপে ধরল। এক ঝটকায় সেই হাত তাকে দূরে সরিয়ে দিল। এলেনা হতভম্ব হয়ে তাকাল সামনে। কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে চাইল তবে এবারও কিছু বলতে পারল না। শক্ত হাতের চ'ড় পড়ল গালে। অনুভা বিস্মিত চোখে পাশ ফিরে তাকায়। মাস্ক, ক্যাপ পড়া মানুষটাকে এক দেখায়ই চিনে ফেলল অনুভা। বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠলো তার। লোকটা আরাফকে এক হাতে বুকে আগলে, অন্য হাতে এলেনার চুল খামচে ধরে হিংস্র বাঘের মতো গর্জন করে ওঠে,

_“ They are my property…এই হাত আর একবার যদি ওদের দিকে ওঠে… I swear, you won’t get a second chance.”

তায়ানের চিৎকারে আরাফের কান্নার তীব্রতা বাড়ল। সে মায়ের দিকে হাত এগিয়ে দিচ্ছে। ডাকছে মা'কে। অনুভা তড়িঘড়ি করে তার কাছ থেকে আরাফকে নিজের কাছে টেনে আনে। তায়ান অনুভার দিকে তাকায়। অনুভা আরাফকে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়ে নিজেও এবার চিৎকার করে ওঠে,

_“ রেহাই দিন একটু! অন্তত আমার ছেলেটাকে একটু শান্তিতে বাঁচতে দিন। কেন আমাকে এভাবে প্রতিদিন যুদ্ধের মধ্যে টেনে আনছেন? আমি শুধু একটু শান্তি চাই… শুধু আমার ছেলেটার জন্য একটা নিরাপদ জীবন চাই!”

_“ দেব না বাঁচতে। তোরা যতদিন বেঁচে থাকবি আমার শান্তি নেই। তুই আমার থেকে আমার ভিকিকে কেঁড়ে নিয়েছিস। এখন আবার তোর এই ছেলে! তোদের একজনকেও বাঁচতে দেব না।” এলেনাও গর্জে ওঠে বলল। এবার তায়ান আর অনুভা নয়, রিকো এসে থাপ্পড় মারল।

_“ আমি তোর মতো নির্লজ্জ মেয়ে দেখিনি কখনও, ট্রাস্ট মি!”

এলেনা চোখ লাল হয়ে ওঠেছে। প্রথমে জানত এই মেয়েটা সেই ছেলেকে বিয়ে করে এই বাচ্চা জন্ম দিয়েছে। যেটা তায়ানকে এই মেয়ের থেকে অনায়াসে দূরে সরিয়ে দিতো। কিন্তু পরে জানতে পারে এটা তায়ানেরই বাচ্চা। তায়ান আর যাই হোক এটা জানার পর কোনো ভাবেই নিজেকে থামিয়ে রাখবে না। তাই এলেনা আজ তাদের মে’রে সিদ্ধান্ত নিয়েই বের হয়েছিল। সে সা’পের মতো করে ফুঁসে উঠে রিকোর দিকে তাকাল,

_“ নির্লজ্জ তো তোর বন্ধু। দিনের পর দিন একটা মেয়ে অন্য ছেলের সঙ্গে এক ছাদের নিচে কাটানোর পরও তাকে বউ বলে দাবি করছে!”

অনুভা মেনে নিলো না একদম। আরাফকে আবারও নামিয়ে দিলো। বুলেটের মতো এলেনার দিকে এগিয়ে গিয়ে, গায়ের সব শক্তি ঢেলে তাকে ধা’ক্কা মেরে রাস্তায় ফেলে দিলো।

_“ মুখ সামলে কথা বলবে! নিজের মতো সবাইকে ভেবো না। নাহলে আমার চেয়ে খারাপ আর কেউ হবে না।”

এলেনা মাটিতে পড়ে থেকেও রাগে ফুঁসে উঠে আবার আক্রমণের জন্য এগোতে গেল। কিন্তু রিকো তাকে আটকে দিল। তায়ান অনুভার হাত ধরে থামিয়ে দেয়।

_“ স্টপ অনু… ও যাই বলুক আমি জানি তুই এমন মেয়েই না। এন্ড আই নো, ইউ স্টিল লাভ মি।”

অনুভা তায়ানের কথা শুনেও না শোনার ভান করে। তাকায়ও না তার দিকে। নিজের বাইকের কাছে গিয়ে সোজা করে তুলল সেটা।

তারপর আাবরও নিজের ছেলেকে কোলে তুলে। আতঙ্কে ছেলেটা একদম জমে গেছে। অনুভা আরাফের পিঠে আলত করে চাপড় দিতে দিতে বলল,

_“ কিচ্ছু হয়নি, বাবা। মা আছে তো। তোমার কিচ্ছু হবে না। আমরা এক্ষুনি এখান থেকে চলে যাবো।” ছেলেকে যতরকম আশ্বাস দেওয়ার দিতে লাগল সে।

তায়ান একবার ক্ষিপ্ত চোখে এলেনার দিকে তাকিয়ে, অনুভার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

_“ তুই আমাকে যেকোনো শাস্তি দিতে পারিস। তবু এভাবে দূরে সরে যাস না। আমাকে শুধু একবার সবকিছু এক্সপ্লেইন করতে দে।”

মাস্ক খুলল তায়ান।

অনুভা তাকাল না এবারও। আরাফ কান্নাটা একটু থামিয়ে,লোকটার দিকে কৌতূহলি চোখে তাকিয়ে আছে। তায়ান একবার ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল,

_“ শুধু শাস্তি হিসেবে আমার বাচ্চাকে আমার থেকে কেঁড়ে নিস না।”

তায়ান যতটুকু সম্ভব নরম গলায় বোঝাচ্ছিল। রাগ দেখিয়ে ছোট্ট ছেলেটাকে আর আতঙ্কে ফেলতে চায় না।

_“ সামনে থেকে সরুন।” অনুভা ছোট করে বলল।

_“ আই লাভ ইউ, অনু! তাকা একবার আমার দিকে।” খুব অস্থিরতা নিয়ে নিচু গলায় বলল তায়ান। বাক্যটা দু'বছর আগে শুনলে হয়তো অনুভার মনটা আজ উচ্ছ্বাসে ভরে উঠতো। বুকের ভেতর দিয়ে দল বেধে উড়ে যেত হাজারটা প্রজাপতি। কিন্তু আজ…একই শব্দ অস্বস্তি ছাড়া কিচ্ছু জাগাল না। যেন মহাবিশ্বের সবথেকে জঘন্য বাক্যটা তাকে কেউ বলছে। অনুভা এবারও তাকাল না মানুষটার দিকে।

তায়ান আরও কাছে এগিয়ে এলো।

_“ আচ্ছা, তাকাতে হবে না। শুধু আমার সঙ্গে চল।”

অনুভা তাকাল। চোখের দৃষ্টি খুব শক্ত করে তাকাল।

_“ ঘৃণা করি আপনাকে আমি। আপনার দিকে তাকাতেও আমার ঘৃণা হয়! নাহ…ঘৃণা শব্দের অপমান হবে এটা বললে। আপনি ঘৃণারও অযোগ্য। আচ্ছা… আপনার উদ্দেশ্য কী বলুন তো? কেন মুক্তি দিচ্ছেন না? বাঁচতে দিন এবার একটু। আর যদি আমার ভালো আপনার সহ্য না হয় একেবারে মে'রে ফেলুন, নয়তো নিজে ম'রে যান। আপনি প্লিজ ম'রে যান। আমি সত্যিই আফসোস করে আমার ছেলেকে বলব তোর জা:নোয়ার বাবাটা ম'রে গেছে।”

তায়ান কিচ্ছু বলল না। নির্বিকার তাকিয়ে রইলো অনুভার দিকে। এসব শোনার যোগ্যতা সে রাখে। যে মেয়েটা তার জন্য পাগল ছিল সে আজ চাইছে তায়ান ম'রে যাক। আজ সেই মেয়েটাই তার মৃত্যু চায়। তায়ানের মুখে কোনো অভিযোগ নেই। কোনো প্রতিরোধও নেই। শুধু এক অদ্ভুত শান্ত, ভাঙা সহনশীলতা। একটু সময় নিয়ে সে ধীরে ধীরে বলল

_“ আচ্ছা ম'রে যাবো। তার আগে আমার ছেলের থেকে একবার হলেও বাবা ডাক শুনতে চাই আর…” তায়ান থামল একটু। তারপর ঢোক গিলে বলল,

_“ আর তোর চোখ থেকে সেই আগের মতো কোমল চাহনি দেখে যেতে চাই।”

_“ হাস্যকর! যার প্রতি কোনো কোমলতা নেই, তার দিকে সেই দৃষ্টি এই জন্মেও আসবে না।” অনুভা অন্যদিকে তাকিয়ে বলল।

_“ তাহলে আমিও ম'রব না।”

_“ দেখুন আমার ছেলেটা ভয়ে কাঁপছে। ওর জন্যে হলেও আমাদের রেহাই দিন। আমি আমার সন্তানকে এমন অসুস্থ পরিবেশে বড় করতে চাই না। ওর উপর দিয়ে কোনো বিপদ আসলে আমি সেটা সহ্য করতে পারব না।” অনুভা এবার অসহায় হয়েই বলল।

তায়ান খুব অবাক হলো। এইতো একটু আগে বলল তাকে ঘৃণা করে, কিন্তু তার ছেলেকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্যই তায়ানকে অনুরোধ করছে। তায়ান হালকা হাসল। তারপর বলল,

_“ আমায় ঘৃণা করিস, অথচ যে শিশুটাকে এতো ভালোবাসিস সে আমারই রক্তে গড়া।”

অনুভাও মুখেও এক নিষ্প্রভ হাসি ফুটে উঠল,

_“ আমার দূর্ভাগ্যটা এখানেই…এতো ঘৃণার মাঝেও, যাকে আমি বুকে আগলে রাখি, সে একজন অমানুষের রক্ত বহন করছে। তবু তাকে আমি মামুষ হিসেবে গড়ে তুলব, যেন কারও জীবন নরকে পরিণত না করে।”

_“ অমানুষ কেউ হয় না। অমানুষ হিসেবে গড়ে তোলা হয়। আমার অমানুষ হওয়ার পেছনে যদি কোনো মানুষ দায়ী থাকে, তাহলে প্রথম মানুষটা তুই নিজেই ।” তায়ান বলল।

এই কথায় অনুভার চোখ সামান্য কেঁপে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য সে থমকে গেল। কিন্তু তার বিপরীতে সে বলল,

_“ সে শাস্তি হিসেবেই কী আপনার অংশকে নিজের গর্ভে ধারণ করতে হয়েছিল?”

_“ শাস্তি! তোর কাছে শাস্তি হলেও, আমার কাছে..” তায়ান বাকি কথা বলার প্রয়োজন মনে করল না।

বিজ্ঞাপন
রক্ত রেখার আড়ালে গল্পটি আয়েশা শেখ রিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে মোড়ানো থ্রিলার উপন্যাস