এমন কেন খেলো আমায় নিয়ে..
পেয়ে হারাবার ব্যথা যাও কেন দিয়ে…
জীবন যেন খেলছে নিঠুর খেলা
ভালোবাসা যায় ঢেকে অবহেলায় হায়…
কেন, এভাবে কাঁদাও.. যেন ভালোবাসা
কোনো হাসি খেলা পুরোনো
ভালো লাগে না…’
গান শোনার ফাঁকে ফাঁকে বিছানায় শুয়ে থাকা আরাফের দিকে তাকাচ্ছিল। শুকিয়ে আছে বাচ্চাটার মুখ। একটা মুহূর্তের জন্য তায়ানের ইচ্ছে হলো ঘুমন্ত মুখটার উপর বালিশ চাপা দিয়ে সব শেষ করে দিতে। কারণ, তার মনে হচ্ছিল এই ছোট্ট বাচ্চাটাই তার সবকিছু নষ্ট করে দিয়েছে। হয়তো এটা না থাকলে অনুভা তায়ানকে দেখে নিজেকে আটকাতে পারত না। তার কাছেই ফিরে আসত।
ধীরে ধীরে আরাফের দিকে এগিয়ে গেল তায়ান। বিছানার পাশে এসে ঝুঁকে পড়ল। কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল বাচ্চাটার নিষ্পাপ মুখের দিকে। ঘুমে আচ্ছন্ন ছোট্ট মুখটার দিকে তাকিয়েও একটু নরম হলো না তায়ানের দৃষ্টি। চোখের গভীরে বিন্দুমাত্র কোমলতা, মায়া, দ্বিধা কিচ্ছু নেই। শুধু জমাট বাঁধা তীব্র আক্রোশ ছাড়া। বরং এই নিস্পাপ মুখটা তার ভেতরের অন্ধকারকে আরও উসকে দিচ্ছে।
অনুভাকে খুঁজে পাওয়ার পর থেকেই তায়ান ওদের ওপর নজর রাখা শুরু করেছিল। তখনই জানতে পারে, তারা প্যারিস ছেড়ে চলে যাচ্ছে। সেই সময়ই সে সুযোগ বুঝে এই বাচ্চাটাকে নিজের কাছে নিয়ে আসে।
সেদিন সন্ধ্যা থেকেই তায়ান অনুভাদের অ্যাপার্টমেন্টের আশেপাশে ঘুরছিল। তখম শান্তর সঙ্গে তার মুখোমুখি দেখা হয়ে যায়। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে তায়ানই প্রথম শান্তর গায়ে হাত তোলে।
শান্তর আগে থেকেই তায়ানের উপর ক্ষোভ জমে ছিল। সেও পাল্টা আঘাত করে তায়ানকে। দু'জনেই একে অপরকে আঘাত করেছে, দু'জনেই মা'র খেয়েছে।
_“ তুমি কী করছ?” রিকোর কন্ঠ পেয়ে তায়ান আরাফের গলার নিচ থেকে হাত সরিয়ে আনে। নিজের ভাবনায় ডুবে কখন সে
এই অব্দি হাত নিয়েছিল নিজেও টের পায়নি।
তায়ান কোনো উত্তর দিলো না। শুধু রিকোর হাতে থাকা জিনিসগুলোর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
_“ এগুলো কী?”
_“ ওর খাবার।” রিকো ভ্রু তুলে ঘুমিয়ে থাকা আরাফকে ইশারা করে বলল।
তায়ানের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
_“ আমি ওকে খাওয়াতে আনিনি।”
রিকো এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
_“ বাচ্চাটাকে সকাল থেকে না খাইয়ে রেখেছ, এভাবে তো ও মা’রা যাবে।”
_“ গেলে যাক! তোমার কী? তোমার বাচ্চা?” তায়ান ধমকে ওঠে।
রিকো হালকা হাসল।
_“ আমার বাচ্চা না হোক…আমি ওর আঙ্কেল,তোমাদের বাংলা ভাষায় যাকে ‘মামা’ বলে। ওর প্রতি আমার একটা দায়িত্ব আছে।”
তায়ান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রিকোর দিকে তাকায়।
_“ মানে?”
রিকো খুব শান্ত গলায় ব্যাখ্যা করতে শুরু করল।
_“ মানে, ওর মা তোমার বোন। সে হিসেবে তুমি ওর মামা। আর আমি তোমার বন্ধু…আর ওই হিসেবে আমিও ওর মামা।”
এক মুহূর্তেই তায়ানের মুখের ভাব বদলে গেল। চোখে জ্বলে উঠল তীব্র আগুন। গর্জে উঠে বলল,
_“ কীসের বোন? কে বোন? ওর মা আমার ওয়াইফ। আমি নিজের ইচ্ছায়,সম্পূর্ণ সজ্ঞানে থেকে ওকে বিয়ে করেছি! সো, এসব ননসেন্স কথাবার্তা আমার সামনে বলবে না।”
_“ ওহ সরি, আসলে আমি ভুল বলেছি। তুমি শুধু বাচ্চাটার মামা নও..মামা এবং সাথে সৎ বাবাও হও।”
_“হোয়াট? মুখ সামলে কথা বলো, ইডিয়ট। নাহলে…”
তায়ান ধেয়ে গেল রিকোর দিকে। রিকো এক লাফে বিছানার অন্য পাশে চলে যায়। তাদের দু'জনের কথার আওয়াজে আরাফের ঘুম ভেঙে গেল। সারাদিন অনুভা আর শান্তর পরিচিত মুখ দেখতে না পেয়ে কাঁদতে কাঁদতেই ঘুমিয়েছিল ছেলেটা। উঠার পরও যখন তাদের পাশে না পেল আবারও কান্না জুড়ে দিলো। কান্নার সঙ্গে মা ডাকটা অস্পষ্ট ভাবে ভেসে উঠছে। তায়ান আর রিকোর দিকে গেল না। ঘুরে এসে আরাফের দিকে ঝুঁকে গিয়ে বলল,
_“ চুপ করো। তোমার কান্না আমার বিরক্ত লাগে।”
তায়ানের উচ্চস্বরে বলা বাক্যে চমকে ওঠে আরাফ। ঘন ঘন শ্বাস ফেলতে ফেলতে তায়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। পরপরই ঠোঁট কুঁচকে কেঁদে বলল,
_“ মা…”
এতে তায়ান আরও রেগে যায়। হাত বাড়িয়ে আরাফের দু গাল চে'পে ধরে হিসহিস করে বলল,
_“ ওকে মা ডাকবে না। মুখ সেলাই করে দেব একদম।”
আরাফ তায়ানে গালে হাত রাখল। কান্না থামিয়ে হালকা করে হাসল। এই অপ্রত্যাশিত স্পর্শে তাৎক্ষণিকভাবে তায়ানের দৃষ্টি থেকে কঠিন ভাবটা আপনা-আপনি মিলিয়ে গেল। ছেড়ে দিলো আরাফের চে'পে ধরা গাল। তারপর নিজের গালে রাখা আরাফের ছোট্ট, নরম হাতটা ধীরে ধীরে সরিয়ে দিয়ে চেয়ারে এসে বসল। আরাফ আবারও হাত-পা ছুঁড়ে কাঁদতে শুরু করে দেয়। তার কান্না এবার আরও তীব্র, আরও ব্যাকুল। ভেজা চোখ দুটো অস্থির হয়ে চারপাশে তাকিয়ে মা আর পাপাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে সে। রিকো হাত থেকে আরাফের জন্য আনা খাবার গুলো রেখে, আরাফকে দু'হাতে খুব সাবধানে কোলে তুলে নেয়। রিকো একটা চকলেট তুলে আরাফের হাতে দিয়ে নরম গলায় বলল,
_“ নাও, এটা খাও…কেঁদো না।”
কিন্তু আরাফ চকলেটটা হাতে নিয়েই ঝটকা মেরে ফেলে দিল। সে এখন মা ছাড়া আর কারো কাছে, কোনো মতেই থাকবে না। আরাফের ছোট্ট মুখ আর কান জেদে লাল হয়ে উঠেছে। শ্বাস নিতে নিতে ছোট ছোট শব্দ বের হচ্ছে। হেঁচকি তোলা কান্না, থামছে না কিছুতেই। ছোট্ট হাতগুলো এদিক ওদিক ছুঁড়ে,শরীর শক্ত করে দিয়ে নেমে গেল রিকোর কোল থেকে। নিচে বসে পা ছুঁড়তে শুরু করল। রিকো বাচ্চাটাকে শান্ত করার জন্য কয়েকটা খেলনা এনে আরাফের সামনে দিলো। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হলো না। আরাফ সেগুলোর দিকে একবারও তাকাল না। উল্টো পা দিয়ে ঠেলে একে একে দূরে সরিয়ে দিল। তায়ান এগুলো দেখে বিরক্ত হয়েও কিছু বলল না। আজকে সারাদিন ধরে এভাবেই কেটেছে। রিকো আবারও নিচু হয়ে আরাফকে কোলে তোলার জন্য হাত বাড়ায়। কিন্তু তখনই তার ভ্রু কুঁচকে গেল। হালকা একটা অস্বস্তিকর গন্ধ নাকে আসে তার। সে একটু থেমে আরাফের দিকে তাকাল, তারপর বুঝতে পারল,বাচ্চাটা ডায়াপারেই প্রস্রাব করে ফেলেছে। সে নিঃশ্বাস ফেলে আস্তে করে বলল,
_“ওহ… এটাই বাকি ছিল।”
আরাফের বাহু দু'টো সাবধানে তুলে নিয়ে দ্রুত ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল সে। ভিতরে ঢুকে ডায়াপার খুলতেই রিকোর মুখের ভাব বদলে গেল। শুধু প্র’স্রাবই না… বাচ্চাটা পুরোপুরি নোংরা করে ফেলেছে। সে এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস নিল। সারাদিন ধরে একই ডায়াপার পরিয়ে রাখা হয়েছে এমন তো হবেই। রিকো নিচু গলায় বিড়বিড় করে বলল,
_“এভাবে কেউ একটা বাচ্চাকে রাখে!”
রিকো দ্রুত ডায়াপারটা ডাস্টবিনে ফেলে দিলো। সে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে ওয়াশবেসিনের দিকে এগোল,ওকে পরিষ্কার করিয়ে দেবে বলে। কিন্তু আরাফ এত সহজে মানার ছেলে নয়। জেদে তার ছোট্ট মুখটা আরও কুঁচকে গেল। শরীরটা শক্ত করে দিচ্ছে রিকোর হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য। রিকো কষ্ট করে তাকে সামলাতে সামলাতে নিচু গলায় বলল,
_“শান্ত হও। একটু চুপ থাকো, প্লিজ…”
কিন্তু আরাফ শুনছে না। সে আরও ছটফট করছে তো করছেই।
শেষমেশ রিকো তাকে কোলে একটু নিচের দিকে ধরে, পানি দিয়ে পরিষ্কার করার চেষ্টা করতেই ভেজা মেঝেতে হঠাৎ তার পা পিছলে গেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভারসাম্য হারিয়ে ধপাস করে মেঝেতে পড়ে গেল রিকো। আরাফ তার হাতেই ছিল, তাই শেষ মুহূর্তে তাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল, যেন বাচ্চাটার কোনো ক্ষতি না হয়। পড়ে গিয়ে রিকোর মুখ কুঁচকে গেল। ব্যথা চেপে, চাপা গলায় বলে উঠল,
_“ওহ শিট!”
আরাফ মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তারপর আবার কান্না শুরু করে দিল, আগের চেয়েও জোরে। তায়ান এবার বাধ্য হয়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে আসে। এসেই উচ্চস্বরে বলে ওঠে,
_“ কী হচ্ছে এখানে..” রিকোকে মেঝেতে আর রিকোর উপর আরাফকে দেখে তায়ানের বাকি কথা গলায় আটকে যায়।
এক সেকেন্ডের জন্য সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তায়ানকে এভাবে দাড়িয়ে থাকতে দেখে রিকো বিরক্ত হয়ে চেঁচিয়ে ওঠে।
_“ এভাবে দাঁড়িয়ে না থেকে, তোলো আমাদের।”
তায়ান কোনো উত্তর দিল না। নির্ভিগ্ন ভঙ্গিতে এগিয়ে গিয়ে এক হাতে আরাফকে তুলে নিল, তাকে নিজের ডান পাশের বাহুর ভাঁজে সামলে রাখল। তারপর বাম হাত বাড়িয়ে রিকোকে টেনে তুলে দাঁড় করাল। রিকো ঠিকমতো দাঁড়ানোর আগেই তায়ান ঠান্ডা গলায় বলল,
_“যেটা তোমার কাজ না, সেটা করতে যাও কেন?”
_“ তোমার জন্যই তো এসব করতে হচ্ছে।” রিকো ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে দরজায় গিয়ে দাড়িয়ে আবারও বলল,
_“ ওকে ক্লিন করে দাও। দেখো তোমার গায়েও নোংরা লেগে যাচ্ছে।”
আরাফ তায়ানের দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে। নিচের ঠোঁট কেঁপে কেঁপে উঠছে, মনে হচ্ছে যেকোনো মুহূর্তেই আবার কেঁদে উঠবে। তায়ান সেই মুখের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল,
_“ এভাবে তাকিয়ে থাকবে না।”
তারপর তায়ান নিজেই নিচু হয়ে আরাফকে পরিষ্কার করতে শুরু করল। আরাফ প্রথম প্রথম একটু ছটফট করল, কিন্তু তায়ানের স্থির এবং ধীর হাত দেখে হালকা শান্ত হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে তার ছোট্ট দু’হাত দিয়ে তায়ানের গলা জড়িয়ে ধরল। পরিষ্কার করার সময় তায়ান ছোট্ট কোমরের ওপর আলতো চাপর মেরে বলল,
_“ এটা দিয়ে যেন আর কোনো নোংরা বের না হয়।”
আরাফের ছোট্ট মাথা এসব কথার মানে বোঝে না। সে লোকটাকে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে তার কাঁধে মাথা এলিয়ে দেয়। তায়ান ওকে এভাবে নিয়েই ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আসে। কোল থেকে নামাতে চায় কয়েকবার, কিন্তু আরাফ এত তীব্রভাবে তায়ান শার্ট আঁকড়ে ধরে রেখেছে যে, তায়ানের নিজেরই কেন যেন নামাতে ইচ্ছা করল না।
রিকো ঠোঁট টিপে হাসল।
_“ তুমি ওকে কতদিন লুকিয়ে রাখবে?”
_“ আমি লুকিয়ে রাখছি না। ওরা জানে ওকে আমিই এনেছি।” তায়ান বলল।
_“ এনে কী লাভ হলো?” রিকো ফের প্রশ্ন করল।
_“ ও আমায় রেখে অন্য একজনকে বিয়ে করে বাচ্চা জন্ম দিয়েছে। আমি কি ওকে সুখে থাকতে দেব ভেবেছ?” তায়ান ঠাণ্ডা গলায় বলল।
_“ হাসালে তুমি! ও কী তোমার জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করত নাকি? যেখানে তুমি নিজেই ওকে ছেড়ে দিয়েছিলে।”
_“ আমি ওকে ছেড়ে দেইনি। তুমি সব জানো,সেদিনের পরই আমি ওকে নিতে এসেছিলাম।”
_“ তোমার কী মনে হয়,অনুভা এগুলো বিশ্বাস করবে?”
আরাফ এতক্ষণে আবারও গভীর ঘুমে চলে গেছে। তায়ান ওকে শুয়ে দিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
_“ ও আমাকে বিশ্বাস করবে কী করবে না, সে অপেক্ষায় আমি থাকব না।”
_“ দেখো… এত ছোট্ট একটা বাচ্চাকে এভাবে তার মায়ের কাছ থেকে দূরে রেখে ঠিক করছ না।”
_“ রিকো তুমি রুম থেকে যাও। বিরক্ত করো না।” তায়ান স্পষ্ট দৃঢ়তা নিয়ে বলল।
_“ আচ্ছা। তবে ওকে সঙ্গে নিচ্ছি। তোমার উপর আমার ভরসা নেই। কে জানে কখন আবার গলা চে'পে ধরো।”
_“ না, ও এখানেই থাকবে।” তায়ান বলল।
_“ কিন্তু..”
_“ তুমি কী যাবে?”
রিকো চলে যায়। রিকো চলে যাওয়ার পর, একটা ললিপপ বের করে ঠোঁটে রেখে বেলকনির দিকে এগিয়ে গেল। বাইরে রাতের হাওয়া হালকা ঠাণ্ডা, প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের লাইটগুলো জ্বলজ্বল করছে। হোটেল ছেড়ে তারা এখন একটি লাক্সারি প্রাইভেট ম্যানশনে নিয়েছে। শহরের হট্টগোল থেকে একটু দূরে। আর্জেন্টিনা থেকে আসা অনেক গার্ড ইতিমধ্যে সেখানে অবস্থান করেছে। এছাড়াও, প্যারিসের বিভিন্ন গ্যাংস্টার ও মাফিয়াদের সঙ্গে তায়ানের সম্পর্ক অটুট। তারপরও, গত দুই বছর ধরে তায়ান কারো সঙ্গে নতুন কোনো ডিল করেনি। সব কিছু থেকেই নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে সে।
——
_“ফিরে চলো। থানায় রিপোর্ট করে এসেছি, দেখা যাক এখন কী হয়।”
সারাদিন ধরে আরাফকে খুঁজতে খুঁজতে অনুভা আর শান্ত দু’জনেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তবুও অনুভা বাড়ি ফিরতে রাজি নয়। রাস্তায় বসে আছে সে, নিস্তব্ধ রাতের মাঝে। ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে বারোটার দিকে এগোচ্ছে। সারাদিনের নিরন্তর খোঁজাখুঁজির পরও যখন আরাফের কোনো খোঁজ মেলেনি, তখন সন্ধ্যার দিকে তারা থানায় যায়। প্রথমে অবশ্য সেখানে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না অনুভার।
অনুভার ধারণা ছিল তায়ানই ওকে কল করে ভয় দেখাবে। তার ছেলেকে মে'রে ফেলার হুমকি দেবে। কিন্তু এসব কিছুই করেনি। কোনো কল, মেসেজ কিচ্ছু আসেনি। অনুভার বিশ্বাস ছিল তায়ান আরাফকে কিডনাপ করালে কল করত। কিন্তু তায়ান যদি এমন কিছু নাই করে কে করবে? এতদিন কেন করল না? তায়ানের সঙ্গে দেখা হওয়ার পরই কেন?
_“ মাহভিন?” শান্ত আবারও ডাকল। অনুভার দৃষ্টি তখনও আকাশে স্থির। যেন অসীম অন্ধকারের ভেতর সে কোনো উত্তর খুঁজে চলেছে। কোনো সাড়া না পেয়ে শান্ত আর ডাকল না। সে বুঝতে পারল, এই মুহূর্তে অনুভার কোনো কথা বা অ্যাপার্টমেন্টে ফেরার ইচ্ছা নেই। সে
নিঃশব্দে গিয়ে রাস্তার ধারের ঠান্ডা পাথরের উঁচু কিনারায় বসল,যেখানে অনুভাও বসে আছে। প্যারিসের রাত ধীরে ধীরে গভীর হয়ে উঠছে। স্ট্রিটলাইটের নরম হলুদ আলো ছড়িয়ে আছে চারপাশে, কিন্তু সেই আলোয়ও যেন এক ধরনের নিঃসঙ্গতা লুকিয়ে আছে। দূরে কোথাও গাড়ি চলে যাওয়ার ক্ষীণ শব্দ, তারপর আবার সবকিছু নিস্তব্ধ। হালকা ঠান্ডা হাওয়ায় অনুভার চুল এলোমেলো হয়ে মুখের ওপর এসে পড়ছে, কিন্তু সে সেদিকে কোনো খেয়ালই করছে না সে। এই শহর,যাকে সবাই ভালোবাসার শহর বলে,সেই শহরের মাঝখানেই তারা দু’জন বসে আছে, অথচ চারপাশের সমস্ত আলো, সৌন্দর্য তাদের ছুঁতেও পারছে না। সারাদিন নিজের ছেলেকে অনুভা দেখেনি,ছুঁতে পারেনি। কোথায় আছে,কেমন আছে, কী করছে কিচ্ছু জানে না। এই প্রথম… এত দীর্ঘ সময় নিজের ছেলেকে না দেখে আছে সে। তার কী চিৎকার করে কাঁদা উচিত নয়? বুক ভেঙে কাঁদতে কাঁদতে চোখ দু’টো ফুলিয়ে ফেলা উচিত নয়? তবু সে কাঁদতে পারছে না। কেন? ভেতরে ভেতরে সবকিছু ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। বুকের ভেতর বইতে থাকা অদৃশ্য ঝড় কেন বাহিরে বের হয়ে আসছে না? চোখের পানি গুলো যেন জমে কোথাও আটকে গেছে, বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছে না।
অনুভা ধীরে ধীরে শ্বাস নিল। বুকটা ভারী হয়ে আছে, সব কিছুর সঙ্গে কান্নাটাও তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
_“ আমার বয়স কত বলুন তো?”
শান্ত অনুভার দিকে তাকায়। অনুভার দৃষ্টি এখনও আকাশের দিকেই সীমাবদ্ধ।
_“ বাইশ।” শান্ত বলল।
_“ বাইশ… এই বয়সে আমার মতো মেয়েরা কী করে জানেন? বাবা-মায়ের ছায়াতলে থাকে, নিশ্চিন্তে ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখে। আর আমি? আমার মা’কে আমি কখনও ছুঁতে পারিনি… বাবার ভালোবাসা পাইনি। যাকে স্বামী বলে মেনেছিলাম, সেও প্রতারণা করেছে। তারপর একটা ছেলে হলো… ভেবেছিলাম, অন্তত ওটা আমার থাকবে। সেটাও কেড়ে নিল। বলুন তো…এতো সব সুখ কেবল আমার জন্যই কেন?” শেষে অনুভা শান্তর দিকে তাকাল। চোখ দুটোতে চোখের পানি চিকচিক করছে। এখন শুধু গড়িয়ে পড়া বাকি। শান্ত চোখ ফিরিয়ে নিলো মাহভিনের সেই চোখ থেকে। তার দম বন্ধ হয়ে আসে। আরাফ তার রক্ত নয় তবু এই শিশুর প্রতি এতদিনে শান্তর যে মায়া জন্মেছে, সে নিজেই তো তাকে ছাড়া বাঁচবে বলে মনে হয় না,আর সেখানে তো মাহভিন আরাফের মা। ওর কেমন লাগছে তা শান্ত পুরোপুরি অনুভব না করতে পারলেও, কিছুটা বুঝতে পারছে।
_“ নিজেকে একা ভাবার আগে এটা মনে রেখো শান্ত এখনও ম'রে যায়নি। আরাফের কিচ্ছু হবে না। আমার মন বলছে, ও ভালো আছে। খুব শীঘ্রই আমরা ওকে ফিরিয়ে আনব।” শান্ত কথা শেষ করার আগেই অনুভা দু'পাশে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল,
_“ কিন্তু আমার মন বলছে না, আমার মন বলছে না আমার ছেলে ভালো আছে। ও কাঁদছে, আমি ওর কান্নার শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আমি আজকে একবারের জন্যেও আমার ছেলেকে জড়িয়ে ধরতে পারিনি। ও আমাকে একবারও মা বলে ডাকেনি। ও আমাকে দেখতে না পেয়ে কেমন করছে,ওকে কিছু খেতে দিয়েছে কিনা…এসব ভাবনা আমাকে পাগল করে দিচ্ছে।” অনুভা নিজেকে আর আটকে রাখতে পারল না শান্তর বুকের শার্টের অংশ চে'পে ধরে কান্নামিশ্রিত কণ্ঠে বলতে লাগল,
_“ আমার ছেলেকে এনে দিন। আমি শুধু একবার ওকে দেখতে চাই। এনে দিন ওকে। আমি পাগল হয়ে যাবো ওকে ছাড়া।”
শান্ত অনুভার দু-হাতের কবজি ধরে ওর চোখের দিকে চোখ রেখে বলে,
_“ তুমি ভেঙে পড়তে শেখোনি, মাহভিন। এমন পাগলামো কেন করছো? সকাল হতে দাও আমরা আবার ওকে খুঁজব।”
_“ আমি মানুষ হিসেবে শক্ত হলেও, মা হিসেবে নই।”
অনুভার কথায় শান্ত আর কিছু বলার মত পেলো না। অনুভার প্রতি তার মন এতটাই দুর্বল যে মেয়েটির কান্না দেখে নিজের চোখও অচেতনভাবে ভিজে যাচ্ছে। কিন্তু তার তো কান্না করা যাবে না। তাহলে এই মেয়েকে সামলাবে কে?
শান্ত খেয়াল করল, অনুভা তার কাঁধের ছোট্ট অংশে কপাল ঠেকিয়ে হেঁচকি তুলে কাঁদছে। সে ধীরে চোখ বন্ধ করল, নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করল। সে অনুভাকে কাঁদতে বারণ করল না। অনুভার সারাদিন চুপ থাকাতেই আরও শান্তর ভয় হচ্ছিল। সে কিছুক্ষণ নিঃশ্বাস থামিয়ে হাত তুলে অনুভার মাথায় রাখল। খুব কোমলভাবে, আলতো করে ধরে। যেখানে কোনো লালসা নেই, শুধু আছে সান্ত্বনা আর যত্ন। শান্তর আফসোস হয়। অনুভার কথা না শুনে যদি দু'বছর আগেই তাকে জোর করে বিয়ে করে নিতো। আজ আর এমন দিন হয়তো আসত না। আসতো না কী? শান্ত নিজেকেই প্রশ্ন করে। অনুভা তো সেই সময় মনে প্রানে অন্য একজনকে ভালোবাসত। আজও বাসে কী? হয়ত বাসে,হয়ত না। শান্ত নিজের ঠোঁট দু'টো চে'পে ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে লম্বা শ্বাস নেয়। তার এক হাত এখনও অনুভার চুলের ভাঁজে। তার কাঁধের শার্টের অংশটা ভিজে উঠছে। কেন যেন তার মনটাও সার্থপরের মতো ভাবতে থাকে,তার ভালোবাসার মানুষ অন্যের সন্তানের জন্য কাঁদছে। মাহভিন না থাকলে হয়ত শান্ত গাইত,
‘প্রেম যে বোবা,প্রেম যে কালা,
তাই প্রেমে এতই জ্বালা…
এই জ্বালায় পরান..কান্দেরে..’