_“ তারপর কী ও একদম অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল?” অনুভার কথা শেষ হওয়ার পর শান্ত জিজ্ঞেস করল।
_“ না অজ্ঞান হওয়ার ভান ধরেছিল।” অনুভা বলল।
_“ তারপর?”
_“ আমি যখন ওকে অজ্ঞান ভেবে চলে আসছিলাম তখন ও এসে আমাকে ধা”ক্কা মে'রে মাটিতে ফেলে দেয়।”
শান্তর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
_“ তারপর?”
_“ আমার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে তারপর আমার হাতে থাকা লাঠি দিয়ে ওর ঘাড়ে আঘাত করি।”
_“ তারপর?” শান্ত যন্ত্রের মতো করে বলল।
_“ তারপর সত্যি সত্যিই অজ্ঞান হয়ে যায়।”
_“ গুড। কিন্তু তুমি আমাকে কালকে জানালে না কেন? ওকে আমি…” শান্তকে থামিয়ে দিয়ে অনুভা বলল,
_“ ওর সঙ্গে আপনি এই অসুস্থ শরীর নিয়ে ঝামেলা করতে যেতেন তারপর ও আমাদের কোনো ক্ষতি করত তাইনা?” অনুভা ছোট্ট করে শ্বাস ফেলে বলল,
_“ ও জেনে গেছে আমি কোথায় থাকি। কতক্ষণ অজ্ঞান থাকবে ও?”
শান্ত চুপচাপ অনুভার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর হেসে বলল,
_“ তুমি কবে এরকম ফাইট শিখলে?”
_“ জানি না। উল্টা পাল্টা কথা বলছিল তাই নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনি।”
তাদের প্যারিসে পৌঁছাতে দু'ঘন্টা সময় লাগে। এখানে এসে 4e arrondissement এর লে মারাইস এলাকার নতুন অ্যাপার্টমেন্টে ওঠে। অনুভাদের বেলকনি থেকে দূরের আইফেল টাওয়ারের চূড়া পর্যন্ত দেখা যায়,যেটা অনুভার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে। মার্সেই এর অ্যাপার্টমেন্টের টুকটাক জিনিসপত্র সাথে অনুভার বাইক ও আরাফের ভারি খেলনা গুলো মুভিং ট্রাকে করে নেওয়া হয়। যেগুলো এক দিনেই পৌঁছে যায় প্যারিসে। প্যারিসে এসে কিছুদিন রেস্ট নিয়ে নতুন জব নিয়ে নেয়। যদিও শান্তর এসবের প্রয়োজন নেই, তবু সারাক্ষণ বাসায় বসে থাকতে খারাপ দেখায়৷ এক সপ্তাহের ভেতর নতুন গাড়িও কিনে ফেলে নিজের জন্য। শান্ত যতদিন অসুস্থ ছিল,অনুভা ঠিক সেইভাবে তার যত্ন নিয়েছে,যেভাবে অনুভার প্রেগন্যান্সির সময় শান্ত তার দেখাশোনা করেছিল। তবু অনুভার অনেক সময় মনে হয়েছে, শান্তর মতো করে সে হয়তো কখনো পারবে না।
এখানকার এক ক্লাবের ম্যানেজার শান্ত আর অনুভাকে পর্বে থেকেই চিনত। সে নিজেও অনেকবার অনুভাকে এই ক্লাবের হয়ে রেস করতে বলেছিল। এতদিন অনুভা আসতে চায়নি। এখন এসে তার ক্লাবেই জয়েন হয়। এর পাশাপাশি এখানের একটা ইউনিভার্সিটিতেও এডমিশন নেয় অনুভা।
যখন অনুভা ব্যস্ত থাকে, তখন আরাফ শান্তের সঙ্গে অফিসে থাকে। অন্য সময়গুলোতে সে অনুভার সঙ্গে বাসায় থাকে। আজকে অনুভা, শান্ত দুজনেই বাসায়। ছুটির দিন থাকায় শান্ত পাশের সুপারশপ থেকে বাজার করে বাসায় ফিরছিল। সুপারশপ থেকে বের হতেই জেরিনকে দেখে থেমে যায়। শান্তর এক হাতে আরাফের জন্য কিছু জিনিসপত্র,অন্য হাতে বাসার জন্য খাবার।
_“তুমি এখানে?” শান্ত অবাক স্বরে বলল।
_“ অন্যের বউ আর ছেলেকে কতদিন নিজের বলে চালাবে?” জেরিন শান্তর হাতে থাকা বাচ্চাদের জিনিসপত্রর দিকে তাকিয়ে বলল।
শান্ত কপাল কুচঁকে কিছুটা দ্বিধান্বিত স্বরে বলল,
_“ মানে?”
জেরিন এক পা এগিয়ে এল। তার চোখে কঠিন এক দৃষ্টি।
_“ কেন করছো এগুলা? আমি…আমি সব জানি। না ওই মেয়ে তোমার বউ,না ওই বাচ্চা তোমার।”
শান্ত স্থির চোখে জেরিনের দিকে তাকিয়ে থাকল। সে বুঝতে পারছে না তার এখন কী বলা উচিৎ। কিছুক্ষণ চুপ থেকে জেরিনের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বলল,
_“ তুমি কীভাবে জানলে?”
জেরিন ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা হাসল।
_“আমি কীভাবে জেনেছি সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো,তুমি কেন এই মেয়ের জন্য নিজের ফিউচার নষ্ট করছ?”
_“ ওরা আমার না হলেও, তাদের পাশে থাকাটা আমার নিজের সিদ্ধান্ত। তাই এটাকে তুমি ফিউচার নষ্ট করা বললে ভুল করবে।” শান্ত বলল।
জেরিন ভ্রু সামান্য তুলল।
_“ তুমি ওকে বিয়ে কেন করছো না?”
_“ কারণ ও এটা চায় না। ও যেদিন চাইবে সেদিন আমি ওকে বিয়ে করব।” শান্ত নিঃশ্বাস ফেলে শান্ত গলায় বলল।
জেরিন সঙ্গে সঙ্গে বলল,
_“ ইক্সেক্টলি! ও তোমাকে চায় না। ও তোমাকে ব্যবহার করছে। তুমি কেন অন্যের সন্তানকে নিজের পরিচয় দেবে? কোথায় গিয়ে কী করেছে,না করেছে…”
শান্ত ধমকে উঠলো।
_“ জেরিন! যা জানো না সেটা নিয়ে তর্ক করবে না। সামনে থেকে সরো।” শান্ত চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়।
_“ আমি আঙ্কেল আর আন্টিকে সব বলে দেব।”
শান্ত আবারও থেমে যায়।
_“ বলে দাও,আমি কাউকে ভয় পাই না।”
জেরিন এবার শান্তকে জড়িয়ে ধরে। কাঁদতে কাঁদতে বলে,
_“ তুমি একটা বাহিরের মেয়ের জন্য আমার সঙ্গে এমন করতে পারো না। প্লিজ শান্ত! একটু বোঝার চেষ্টা করো।”
শান্তের ধৈর্য শেষ হয়ে এলো। সে দু’হাত থেকে জিনিসপত্র ফেলে দিয়ে জেরিনকে দূরে সরালো। চোখে তীব্র রাগের ছাপ নিয়ে বলল,
_“ শাট আপ! তোমার কোনো ধারণাই নেই আমি ওকে কতটুকু ভালোবাসি। এটাও ধারণা নেই ওর সঙ্গে কী ঘটেছিল। আর কতটা কষ্টের পর ওকে সেই অন্ধকার থেকে বের করে এনেছি।” একটু থেমে আবার বলল,
_“ দেখো জেরিন! নিজের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করার মতো বয়স আমার হয়েছে। আমার ভাগ্যে যা আছে সেটাই হবে। নিজের ভবিষ্যত সুন্দরের আশায় মাহভিনকে ছেড়ে দিতে পারব না।”
_“ এই বয়সেও এ ধরনের আবেগি কথা মানায় না তোমার, শান্ত! ওর সঙ্গে কী হয়েছে আমি জানি না। কিন্তু ও যে তোমাকে একদিন দুরে ঠেলে দিবে না, তার কী গ্যারান্টি?”
_“ আবেগ হলে কবেই কেটে যেত,ছয় বছর পর্যন্ত থাকত না।”
জেরিন শান্তর দু গালে হাত রাখল।
_“ আচ্ছা, তুমি ওর পাশে থেকো, ওকে ছাড়তে হবে না। ওর সব প্রয়োজনে তুমি ওর সঙ্গ দিও। কিন্তু তোমার জীবনে আমাকে একটু জায়গা দাও,প্লিজ।”
_“ না,জেরিন…আমি এমন কাউকে জায়গা দিতে পারব না, যার প্রতি আমার অনুভূতি কাজ করে না। এটা সম্ভব না।” শান্ত জেরিনের হাত সরিয়ে দিলো। শান্ত একটু আগে কেনা জিনিস গুলো আবার হাতে তুলে নিয়ে সামনের দিকে এগোয়। কয়েক কদম এগিয়ে আবার পেছন ঘুরে তাকায়। জেরিন শান্তর দিকে তাকিয়েই চোখের জল ফেলছে। শান্ত একটু হেঁসে বলল,
_“ আমার ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করো না,জেরিন! আমি আমার এই অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ ভালো আছি। তুমিও তোমার ভালোটা বেছে নাও।” বলেই নিজের গাড়িতে উঠে চলে গেল।
জেরিন বিদ্রুপ হাসল। যাকে ছাড়া নিজের ভালোটা ভাবতে পারে না, সেই বলছে নিজের ভালোটা বেছে নিতে। শান্ত বিয়ে করেছে জেনেও তো তাকে ভুলে যেতে পারেনি। তাহলে এখন সব সত্য জেনেও কীভাবে ভুলে যাবে? কখনোই ভাবেনি যে শান্তকে নিয়েও তাকে এতো বেদনা সহ্য করতে হবে। যে সম্পর্কটা তাদের পারিবারিক ভাবেই ঠিক ছিল,সেখানে অন্য একটা মেয়ে এসে সব নষ্ট করে দিচ্ছে।
শান্তর যেদিন এ”ক্সিডেন্ট হয় সেদিন জেরিন সেই হসপিটালে গিয়েছিল। কিন্তু সেদিন সেখানে সেই মেয়েকে যাকে শান্তর বউ ভেবে এসেছে, তাকে বলতে শোনে শান্ত তার বেস্ট ফ্রেন্ড। প্রথমে জেরিন একটু বিভ্রান্তিতে পড়ে গেলেও বাকিটা নার্সের থেকে শুনে নেয় মেয়েটা আসলেই শান্তর ফ্রেন্ড। সেদিন শান্তর সেই নির্মম পরিস্থিতিতেও জেরিনের হৃদয়ে নতুন আলোর ঝলকানি নেমে এসেছিল। সে আর হসপিটালে এক মুহুর্তও দেরি না করে ফিরে এসেছিল।
কিন্তু এখনো অনেক কিছু জানার বাকি। কী হয়েছিল সেই মেয়ের সঙ্গে। শান্ত যে বাচ্চাটাকে নিজের সন্তান হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে, তার আসল বাবা-ই বা কে,সব জানতে হবে। শান্তকে সে কখনোই এমন একটা মেয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে দেবে না।
———
শান্ত অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকতেই অনুভার কণ্ঠে চেচামেচির আওয়াজ ভেসে আসে। কৌতূহলী মন নিয়ে পা দ্রুত ড্রইং রুমের দিকে এগোয়। ড্রইং রুমে আসতেই দেখে আরাফকে সামনে রেখে তার দিকে ঝুকে ছেলেটাকে শাসাচ্ছে। আর বেচারা আরাফ ঠোঁট ভেঙে অনুভার দিকে তাকিয়ে আছে। ছোট্ট ঠোঁট দু'টো কাঁপছে।
_“ বলো আরও এমন কাজ করবে?” অনুভা খুব দৃঢ় গলায় বলল। আরাফ চুপ করে আছে।
_“ কী হলো বলো!” অনুভা আরাফকে আরেকটু ভয় দেখানোর জন্য গাল চে'পে ধরতে চাইল কিন্তু তার আগেই শান্ত এসে আরাফকে কোলে তুলে নেয়।
_“ কী হয়েছে? বকছো কেন?”
অনুভা কিছু বলার আগেই আরাফ শান্তর গলা ধরে উচ্চস্বরে কান্নায় ফেটে পড়ল । এতক্ষণের জমিয়ে রাখা কান্না সব বের করে দিলো। মুহুর্তেই সমগ্র মুখ লাল হয়ে গেল। এমন ভাবে কাঁদছে না জানি কতো মা'র মেরেছে তাকে অনুভা। অনুভা হতভম্ব হয়ে ছেলেকে দেখল। শান্ত আরাফের পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বলল,
_“ কাঁদে না, বাবা! কতো খেলনা এনেছি তোমার জন্য দেখো। কে মে'রেছে বলো। পাপা,এক্ষুনি তাকে শাস্তি দেবে।”
আরাফ সঙ্গে সঙ্গে অনুভার দিকে আঙুল তাক করে দেখাল। কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বলল,
_“ মা, বকা…”
অনুভা ছদ্ম রাগ নিয়ে অনুভার দিকে বড় বড় করে তাকাল।
_“ কেন বকেছ আমার ছেলেকে? একদম বাসা থেকে বের করে দেব।” আরও কিছু কথা শোনালো অনুভাকে। এতে আরাফের কান্না কিছুটা থামে। এখন শুধু হেঁচকি তুলছে। অনুভা বুকের উপর দু-হা
ত গুজে বলল,
_“ ওকে জিজ্ঞেস করুন ও কী করেছে।”
_“ কী করেছ তুমি?” শান্ত বলল।
আরাফ দু'পাশে মাথা নাড়াল। বোঝাতে চাইল সে কিছু করেনি। অনুভা নিজেই বলল,
_“ পাশের ইউনিট থেকে এক মহিলা এসেছিল, তার তিন মাস বয়সি নাতনিকে নিয়ে। আপনার আদরের ছেলে গিয়ে বাচ্চাটার গালে কামড় বসিয়ে দিয়েছে।”
অনুভার কথা শুনে শান্ত কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে তার দৃষ্টি ঘুরে এল কোলে থাকা আরাফের দিকে। ছোট্ট ছেলেটা তখন নিরীহ মুখ করে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে নির্দোষ মানুষ সে-ই। শান্ত ঠোঁট কামড়ে কোনোরকমে হাসিটা চেপে রাখল। তারপর কঠোর হওয়ার ভান করে বলল,
_“ মা, সত্যি বলছে?”
আরাফ আবারও দ্রুত মাথা নাড়ল। না, সে কিছু করেনি। শান্ত এবার ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করল।
_“এভাবে ছোট বাচ্চাকে কামড় দিতে নেই। আবার যদি এমন করো, তাহলে কিন্তু বাবাও রাগ করবে।” কথা বললেও তার চোখে-মুখে মৃদু হাসি লুকিয়ে ছিল। পাশ থেকে অনুভা বিরক্ত গলায় বলল,
_“ এভাবে বললে লাভ হবে না। আপনার আস্কারা পেয়েই এমন হচ্ছে।”
শান্ত কাশির ভান করে মুখ ঘুরিয়ে নিল, যেন হাসিটা আর বের না হয়ে যায়। তারপর আরাফের গালে আলতো চাপ দিয়ে বলল,
_“ এমন নিষ্পাপ ভঙ্গিতে থাকলে বুঝি কিছু বলতে ইচ্ছা করে? আর দুষ্টমি তো বাচ্চারাই করবে।”
_“ দুষ্টুমি করতে গিয়ে অন্যের ক্ষতি করবে কেন?” অনুভা বলল।
_“ ও অবুঝ, মাহভিন! বড় হলে তো আর এমন করবে না।”
আরাফের চোখ গেল শান্তর নিয়ে আসা খেলনা আর চকলেটের দিকে। সে তড়িঘড়ি করে নেমে সেগুলো নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাডপর শান্ত অনুভার দিকে তাকিয়ে বলল,
_“ কিছুদিন পড়েই তোমার ইন্টারন্যাশনাল বাইক রেস। সেদিকে তোমার কোনো আগ্রহই দেখতে পাচ্ছি না। কাল থেকে আবার প্র্যাক্টিসে যাবে।”
অনুভা একটু ভেবে বলল,
_“ কী দরকার? এ বছর থাক। আমি ধরতে গেলে একেবারে নতুন রাইডার। পরের বছর না হয় এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেব।”
_“ নতুন রাইডার বলেই তো বেশি করে প্র্যাক্টিস করা দরকার। এখনো আরও দশ দিনের মতো সময় আছে, পিছিয়ে যাওয়ার কোনো মানে নেই। কাল থেকে আবার প্র্যাক্টিস শুরু করবে,এই নিয়ে আর কোনো অজুহাত শুনব না।” গম্ভীর স্বরে বলে নিজের রুমে চলে গেল শান্ত।
অনুভার একদমই ইচ্ছা করছে না এই ইভেন্টে যোগ দিতে। কিন্তু কিছু করার নেই। শান্তকে মানাতে পারলেও ক্লাবের ম্যানেজার ছাড়বে না। সে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে আরাফের দিকে তাকাল। দুপুর হয়েছে শাওয়ার করানো দরকার। তাই আরাফকে কোলে তুলে ওয়াশরুমের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বলল,
_“ চলো গোসল করবে।”
আরাফ আবারও কান্না জুরে দিলো। ছোট্ট হাত ছুঁড়ে অনুভাকে এলোপাতাড়ি থা*প্পড় দিতে লাগল। ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ হতেই কান্নার আওয়াজ ধীরে ধীরে মৃদু হয়ে এলো।
———
প্যারিসের এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন শেষ করে তায়ান, রিকো আর এলেনা বাইরে বের হল। এলেনা আর রিকো একসঙ্গে হাঁটছে, পাশাপাশি। দুজনের হাতেই লাগেজ। তায়ান একটু পেছনে। সে সঙ্গে প্রয়োজনীয় কিছু আনেনি। আর্জেন্টিনাতে যে কাপড়ে ছিল, সেই কাপড়েই চলে এসেছে। এসেছে বললে ভুল হবে এলেনার বাবা জোর করে পাঠিয়েছে। শুধু আর্জেন্টিনা এয়ারপোর্ট থেকে ক্যাপ আর কালো চশমা কিনে পড়ে আছে। আর মুখের সেই ললিপপটা, সেটা সব সময়ের মতই আছে। আর হাতে একটি ছোট্ট ক্যারি ব্যাগ, সেখান থেকে মাঝে মাঝে কাচের মতো চকচকে বিড়ালের চোখ বেরিয়ে আসছে।
এলেনা পেছনে ঘুরে একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
_“ শরীরের এনার্জি কী আর্জেন্টিনায় ফেলে এসেছিস?”
_“ তোর মতো আমার এতো তাড়া নেই।’’ তায়ান বলল।
এলেনা জেদ দেখিয়ে আরও কিছু বলতে চাইল কিন্তু তার আগেই রিকো তার হাত চে'পে ধরে বলল,
_“ স্টপ! বেশি কিছু বললে ও এখনই আবার আর্জেন্টিনা ব্যাক করবে। যেভাবে আছে থাকতে দে।”
এলেনা কিছু বলল না। বাহিরে বের হয়ে আসতেই দেখল হোটেল থেকে গাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। রিকো গিয়ে ব্যাকসিটে বসতে চাইলে এলেনা উচ্চকণ্ঠে বলে ওঠে,
_“ তুই ড্রাইভারের সঙ্গে বোস।”
রিকো একটু অবাক হয়ে এলেনার দিকে তাকায়। তারপর এলেনার কথা মতো ড্রাইভারের পাশে এসে বসে। আর এলেনা গাড়ির ব্যাকসিটে গিয়ে বসল। তায়ান যখন এসে দেখল তার সিট এলেনার পাশে তখন সামনে এসে রিকোর পাশের দরজা খুলে বলল,
_“ নেমে আসো।”
_“ কেন?” রিকো ভ্রু তুলে বলল।
_“ সেটার আন্সার দিতে পারব না। নেমে আসো নাহলে আমি অন্য গাড়ি দেখছি।” তায়ান নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল।
রিকো সময় নষ্ট না করে নেমে আসল। গিয়ে বসল এলেনার পাশে।
এদিকে এলেনা অপমানবোধে চোয়াল শক্ত করে ধরে রাখল, কান লাল হয়ে গেল। রিকো একবার পাশ ফিরে এলেনার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হাসল।
ওরা তিনজন 4e arrondissement এর লে মারাইস এলাকার ‘ল’অরিয়েন্টেল হোটেলে ওঠে। ‘ল’অরিয়েন্টেল হোটেলের বড় জানালা দিয়ে, পুরো লে মারাইস এলাকা চোখে ভাসে। দূরে মিনি-ল্যান্ডস্কেপের মতো আইফেল টাওয়ার তার সোনালি ঝলক দেখা যায়। রাতে তায়ান সেদিকে তাকিয়েই কফি খাচ্ছে।