ফ্রান্সে সকাল তখন নয়টা বাজছে । জানালার ফাঁক দিয়ে হালকা রোদ ঢুকছে ঘরে। শান্ত আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শার্টের বোতাম লাগাচ্ছে, টাইটা ঠিক করছে। তখনই ছোট্ট পায়ের টুপটাপ শব্দ নিয়ে এক বছরের আরাফ টলমল করে হাঁটতে হাঁটতে এসে বাবার পায়ের সঙ্গে জড়িয়ে ধরল। শান্ত নিচের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে, এক হাতে ছেলেকে কোলে তুলে নেয়।
_“ কী ব্যাপার আমার পুঁচকে? এতো সকালেই উঠে পড়েছ কেন?”
আরাফ মুখ ফুলিয়ে, আধো আধো গলায় বলল
_“ পাপা…যাবো।”
শান্ত আলত হাতে আরাফের গাল টেনে বলল,
_“ কোথায় যাবে তুমি?”
_“ অপিছে..”
_“ কেনো,সেখানে পাপার সঙ্গে কাজ করবে?” শান্ত বলল।
আরাফ নিষ্পাপ ভঙ্গিতে দু'পাশে মাথা নাড়াল। বলল,
_“ উহুম..”
_“ তাহলে?”
আরাফ শান্তর গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
_“ দুত্তমি করব।” যদিও আরাফের বলা শব্দ গুলো তেমন স্পষ্ট নয় তবু শান্ত বুঝল। সে উচ্চস্বরে হেঁসে উঠলো।
_“ ওমা! দুত্তমি করবে? আমার এইটুকু বাচ্চার,এত প্ল্যান? কে শিখিয়েছে এগুলো?”
আরাফ বলল,
_“ মা!”
_“ মা শিখিয়েছে?” শান্ত এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল।
_“ উমম।” আরাফ উপর নিচ মাথা নাড়াল।
_“ কে শিখিয়েছে? আবার বলোতো!”
আরাফ চমকে দরজার দিকে তাকাল। দেখল তার মা বুকে দু'হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। আরাফের মুখটা মলিন হয়ে এলো। সে একবার শান্ত আর একবার অনুভার দিকে তাকাচ্ছে। অনুভা এগিয়ে আসতে আসতে বলল,
_“ এতো মিথ্যে বলা শিখছো কেন তুমি?”
আরাফ প্রথমে চুপ। তারপর শান্তর কাঁধে মুখ গুঁজে ছোট্ট গলায় বলল,
_“পাপা! মা বকা…” সে বলতে চাইল তার মা বকা দিচ্ছে।
শান্ত তার পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বলল,
_“মা বকা দিলে পাপা আছে তো… কিন্তু মিথ্যে বললে কিন্তু পাপাও বকা দেবে, বুঝেছো?” কথাটা শুনে আরাফ একদম থমকে গেল। গোল গোল চোখ তুলে বাবার মুখের দিকে তাকাল, যেন বুঝতে চাইছে, সত্যিই কি পাপাও বকা দেবে? কিন্তু পাপা তো বকে না। মা বকলে পাপা এসে বাঁচিয়ে দেয়। তার ছোট্ট ঠোঁটটা একটু ফুলে উঠল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নিচু করল। এক হাত দিয়ে শান্তর শার্টের বোতাম নিয়ে খেলতে লাগল। অপরাধী ভঙ্গিতে খুব আস্তে বলল,
_“ না আফু ভালো…পাপাও ভালো।’’ নিজের নামকেই সে আফু বলে।
_“আর মা? মা ভালো নয়?” শান্ত জানতে চাইল।
আরাফ একবার অনুভার দিকে তাকায়। অনুভাও আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। আরাফের মনে পড়ে কাল রাতেও মা তাকে ধমক দিয়ে ঘুম পারিয়েছিল। তৎক্ষনাৎ আরাফের ভ্রু খানিক কুঁচকে ওঠে।
সে ঘার সামনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
_“ মা…মা পঁচা।”
অনুভা অবাক হলো না। শান্ত ঠোঁট টিপে হেঁসে বলল,
_“ এভাবে বলে না,বাবা৷ মা কিন্তু কান্না করবে।”
অনুভা কন্ঠ শক্ত করে বলল,
_“ হয়েছে এখন তুমি নেমে আসো আঙ্কেল অফিসে যাবে।”
অনুভার কথায় আরাফ আর শান্ত দু'জনেই দু’জনের দিকে তাকাল। শান্ত অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
_“ আরাফ তোমার আঙ্কেল কে?”
আরাফ এদিক ওদিক মাথা নেড়ে বলল,
_“ জানি না।”
_“ আরাফ, তুমি ঠিকই বলেছ তোমার মা আসলেই পঁচা।”
_“ ওকে যে এগুলো শেখাচ্ছেন, ও কী এতটুকুই থাকবে? বড় হবে না?” অনুভা বলল।
শান্ত ছোট করে শ্বাস ফেলে বলল,
_“ ওর শৈশবটা তুমি নষ্ট করে দিও না,মাহভিন।”
অনুভা কিছু বলার আগেই আরাফ বলল,
_“ আনকেল নয়…পাপা।’’
শান্ত আরাফকে বাহবা জানানোর মতো করে বলল,
_“ ইয়েস, প্রিন্স…আমিই তোমার পাপা।” তারপর আরাফের তুলতুলে গালে চুমু খেলো শান্ত। আরাফ নিজেও শান্তর গালে চুমু খায়।
অনুভা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দৃশ্যটা দেখে তার চোখের কঠিন ভাবটা নরম হয়ে এল। তার প্রথমে মনে হতো শান্ত শুধু অনুভাকে ভালোবেসে আরাফের দায়িত্ব নিয়েছে। কিন্তু সেই ধারণাও শান্ত থাকতে দেয়নি। সে শুধু দায়িত্ব নিচ্ছে না, ভালোবেসে নিয়েছে। দাবি ছাড়া, শর্ত ছাড়া। সে এই ছোট্ট শিশুর জীবনের একটা বড় অংশ হয়ে উঠেছে। শিশুরা খুব সহজে ভালোবেসে ফেলে, খুব সহজে ভরসা করে। সে শুধু যার কোলে নিরাপদ লাগে, তাকেই নিজের মানুষ বানায়। অনুভা জানে আরাফের জন্য অনুভার থেকেও শান্ত বেশি নিরাপদ। অনুভা ভাবনার মাঝেই দেখল আরাফ শান্তর গালে চুমু খেয়ে হেসে উঠেছে, সেই হাসিতে নিখাদ নিশ্চিন্ততা। সেখানে কোনো দ্বিধা নেই, কোনো ভয় নেই।
সে এবার নিজের ভাবনা থেকে সম্পূর্ণ বেড়িয়ে আসল। আরাফকে বলল,
_“ আচ্ছা এবার আমার কাছে আসো,পাপা অফিসে যাবে।”
মায়ের কথা শুনে আরাফ শান্তর গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ছোট ছোট আঙুল দিয়ে শান্তর শার্ট আঁকড়ে ধরল। শান্ত যখন তাকে নামিয়ে রাখতে চাইল, তখনই ঠোঁট কাঁপতে শুরু করল।
_“ আমি যাবো।”
তারপর নিজেই শান্তর কোল থেকে নেমে ছোটো ছোটো পায়ে হেঁটে গেল অনুভার রুমে। শান্ত আর অনুভা দু'জনেই আরাফের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। আরাফের পেছন পেছন লিভিং রুমে আসতেই দেখল আরাফ অনুভার রুম থেকে বেড়িয়ে আসছে। হাতে তার ডায়াপার। ডায়াপার শান্তর দিকে এগিয়ে ধরে বলল,
_“ এটা পলিয়ে দাও,পাপা।”
শান্ত আর অনুভা দু'জনেই কিংকর্তব্যবিমুঢ়। শান্ত হাঁটু গেরে আরাফের সামনে বসলো।
_“ এটা পড়ে তুমি কী করবে?”
_“ ছুছু করব।” আরাফের কথায় শান্ত আবারও হেঁসে ফেলল।
অনুভা চোখ পাকিয়ে বলল,
_“ আপনি হাসছেন? দেখেছেন ও কী পরিমান পাকা হয়েছে! বাহিরে নিয়ে গেলে যে,ডায়াপার পড়িয়ে নিয়ে যাই,এটাও মাথায় সেট করে ফেলেছে।”
শান্ত এক পলক অনুভার দিকে তাকিয়ে,আরাফকে কোলে তুলে বোঝানোর মতো করে বলল,
_“ আমি তো আজ বিকেলেই চলে আসব,বাবা। মায়ের রেস আছে না? আমরা সেখানে যাব। আসার সময় তোমার জন্য টয়েজ নিয়ে আসব।”
কিন্তু আরাফ আজ নাছোড়বান্দা,সে যাবেই। অনুভা আরাফের জেদ দেখে এগিয়ে এসে শান্তর কোল থেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইলেই, চোখমুখ খিচে বুকভাঙা কান্নায় ফেটে পড়ে। অনুভা হতবিহ্বল। মাঝে মাঝেই শান্তর সঙ্গে বাহিরে যাওয়ার জন্য বায়না ধরে, কিন্তু একটু বুঝিয়ে বললেই ঠিক হয়ে যায়। এরকম কখনোই করেনি।
_“ পাপা নিয়ে যাও…যাবো।” আরাফ কান্না ভাঙা ফিসফিস গলায় বলল।
শান্ত অসহায় দৃষ্টিতে অনুভার দিকে তাকাল। তার নিয়ে যেতে কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু মাহভিন নিতে দেবে না। শান্তর দৃষ্টি বুঝতে পেরে অনুভা দু'পাশে মাথা নাড়িয়ে বোঝাল কোল থেকে নামিয়ে দিতে।
ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও নিজের কোল থেকে নামাল আরাফকে। এতে আরাফের কান্নার আওয়াজ আরও বেড়ে গেল। ফর্সা মুখ মুহুর্তেই লাল হয়ে উঠেছে৷ ঠোঁট দু’টো ভেঙে মেঝেতে বসেই হাত পা ছুরে কান্না করতে লাগল। অনুভা এসে টেনে কোলে তুলে নিলো আরাফকে। কিন্তু ছোট্ট আরাফ বিরক্তি মিশ্রিত কান্না থামাতে রাজি নয়,ছোট হাত দিয়ে অনুভার গালে এলোপাতাড়ি থাপ্পড় দেয়,
এগুলো দেখে শান্ত আবারও আরাফকে নিজের কোলে তুলে নিল। তারপর বলল,
_“ ওকে তৈরি করে দাও,নিয়ে যাই।”
অনুভা কড়া কন্ঠে বলল,
_“ না,আপনি কী ঘুরতে যাচ্ছেন, নাকি কাজে যাচ্ছেন? ও যে কী পরিমাণ বিরক্ত করবে তা কী জানেন না? ওকে রেখে দ্রুত বের হন। আপনি থাকলেই কান্না করবে।”
আরাফ একদম আষ্টেপৃষ্টে শান্তর গলা জড়িয়ে ধরেছে। অনুভা ছাড়িয়ে আনতে চাইলে সেই বাঁধন আরও দৃঢ় করে। অনুভা তবু জোর করে শান্তর কোল থেকে টেনে আনল আরাফকে। তারপর শান্তকে বলল,
_“ আর দাঁড়িয়ে থাকবেন না এক্ষুনি যান।”
শান্ত একবার অসহায় দৃষ্টিতে আরাফের দিকে তাকাল। তারপর দীর্ঘ শ্বাস ফেলে পাশ থেকে ব্যাগ নিয়ে দরজার দিকে গেল। তা দেখে আরাফ অনুভার কোল থেকে মোচড় দিয়ে নেমে গেল। এলোমেলো পায়ে দ্রুত হাটার চেষ্টা করল। কিন্তু সে তো এখনো ঠিকঠাক ভাবে হাঁটতেই পারে না। পড়ে গেল মেঝেতে। তবে এক মুহুর্তও দেরি করল না। আবারও উঠে দাঁড়াল, হাঁটতে গিয়ে টলতে টলতে শান্তর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। যেন ভয় হচ্ছে, বাবা চোখের আড়াল হলেই হারিয়ে যাবে।
_“ পাপা…যেও না।” হেঁচকি তুলতে তুলতে বলল।
শান্ত দরজার কাছে গিয়েও পেছন ফিরে তাকাল। ছেলের কান্না তাকে অস্থির করে তুলছে। অনুভা নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। ধেয়ে এসে আরাফের গালে চ'ড় বসাবে,ঠিক সেই সময় শান্ত অনুভার হাত শক্ত করে চে'পে ধরে বলল,
_“ খবরদার, মাহভিন! তুমি এমন কিছু করার চেষ্টাও করবে না।”
অনুভা একটু অবাক হয়ে শান্তর দিকে তাকাল। শান্ত আরাফকে আবারও কোলে তুলে নিল। বুকের সঙ্গে শক্ত করে চে'পে ধরে পিঠের মধ্যে আলতো চাপড় দিতে লাগল।
_“ কাঁদবে না, সোনা। আমি তো বিকেলেই চলে আসব। আসার সময় তোমার জন্য ব্যাগভর্তি চকলেট নিয়ে আসব।” পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ন্যানিকে ইশারা করল। সে শান্তর ইঙ্গিত বুঝতে পেরে দ্রুত গিয়ে কয়েকটা খেলনার গাড়ি নিয়ে আসল। শান্ত আরাফকে কোল থেকে নামায়, তবে হাত ছাড়ল না পুরোপুরি। একটা রিমোট হাতে নিয়ে গাড়িটা চালাতে শুরু করল। গাড়িটা ভোঁ ভোঁ শব্দ করে সামনে এগিয়ে গেল, তারপর হঠাৎ ঘুরে গেল ডানে।
আরাফের কান্না হঠাৎ থেমে গেল। চোখের জল ভেজা পাপড়ির ফাঁক দিয়ে সে বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। তারপর টলতে টলতে গাড়িটার পেছনে ছুটতে লাগল। শান্ত ইচ্ছে করেই গাড়িটা রিমোটের সাহায্যে নিজের থেকে একটু আড়ালে নিতে চাইল। খিলখিল হাসি ফুটে উঠল আরাফের মুখে। একটু আগের কান্না যেন উধাও। হাত তালি দিয়ে সে গাড়ির পেছনে ছোটে, কখনো ধরতে গিয়ে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়, আবার উঠে দাঁড়ায়। আরাফ এভাবে গাড়ির পেছনে যেতে যেতে আড়াল হতেই শান্ত অনুভার হাতে রিমোট ধরিয়ে দিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। অনুভা দু'পাশে মৃদু ভাবে মাথা দুলিয়ে বিরবিরায়,
_“ আপনার ধৈর্যের প্রশংসা করতে হয়, শান্ত!”
__
তায়ান সেদিন বাংলাদেশে অনুভার সেই বিড়াল নিয়ে আবারও আর্জেন্টিনাতে চলে আসে৷ বিড়ালটা সব সময় তার সঙ্গে থাকে। প্রথম প্রথম পোষ মানতে চায়নি। তায়ানেরও এসবের প্রতি কোন আগ্রহ কখনোই ছিল না। তবু বিড়ালটাকে ধীরে ধীরে নিজের সঙ্গি বানিয়ে নেয়। যেখানে যায় সঙ্গে করে নিয়ে যায়। ঘুমানোর সময়ও পাশেই রাখে। এতে তার অস্থিরতা একটু হলেও কমে আসে। কিন্তু সেই মহিলার একটা কথা মাথা থেকে বের করতে পারে না। দু'জন ছেলেমেয়ে একই ফ্লাটে থাকত! বিড়াল এটা অনুভারই এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু অনুভার সঙ্গের ছেলেটা কে? কে হতে পারে? কার সঙ্গে অনুভার এত গভীর সম্পর্ক ছিল যে,তায়ান জানতে পারেনি? অনু কী এখন তার সঙ্গেই থাকছে? কোথায় থাকতে পারে? ডাইনিং টেবিলে খাবার সামনে নিয়ে ভাবছিল তায়ান। তার হাতের বাম পাশে টেবিলের উপর বিড়ালটা।
_“ না খেলে উঠে চলে যা,এভাবে বসে থাকার কী মানে?” এলেনা বিরক্ত ভঙ্গিতে বলল।
_“ তোর ভালো না লাগলে তুই চলে যা।” তায়ান এলেনার দিকে না তাকিয়েই বলল। তারপর নিজের প্লেট থেকে একটু মাংশ তুলে বিড়ালের মুখে দিল।
সেটা দেখেও এলেনার বিরক্ত লাগল।
_“ কোত্থেকে কুড়িয়ে এনেছিস এটা? ক দিন ধরে দেখছি খুব নাচছিস এটা নিয়ে।”
_“ তোর এতো প্রবলেম কোথায়?” রিকো বলল। সে বিড়ালটা চেনে। যেদিন নিয়ে এসেছিল সেদিনই দেখে চিনতে পেরেছে। কিন্তু কোনো প্রশ্ন করেনি। করলেও যথাযথ উত্তর দিতো না তায়ান।
_“ রাস্তার জিনিস বাসায় আনলে তো প্রবলেম হবেই।”
তায়ান টেবিলে শব্দ করে চাপড় মেরে বলল,
_“ রাস্তার জিনিস না এটা। জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব দ্বিতীয়বার এই কথা শুনলে।”
_“ কুল মাই ডিয়ার,কুল। আজকাল এতো রেগে যাও কেন?” ডন রিকার্ডো সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বলল।
_“ ভুল বলছো, আমি বরাবরই এমন।” তায়ান গম্ভীর স্বরে বলল।
_“ এখন একটু বেশিই।” ডন রিকার্ডো মুচকি হাসল। তারপর রিকোর পাশের চেয়ারে,তায়ানের সামনাসামনি বসল। এলেনার বাবা খুব ঠান্ডা মস্তিষ্কের মানুষ। সে রাগে কম। তায়ানের বেলায় তো একদমই তা দেখা যায় না। বেশির ভাগই তার মুখে মুচকি হাসি লেগেই থাকে।
_“ নো! তুমি ইদানীং আমার উপর বেশি নজর দিচ্ছ।” তায়ান বলল।
_“ মিশনে যেতে হবে,রিকো জানিয়েছে কিছু?” এলেনার বাবা বলল।
_“ জানিয়েছে।আমিও জানিয়েছি।”
_“ কী জানিয়েছ?”
_“ রিকোকে জানিয়েছি আর কাউকে জানাতে পারব না।”
রিকার্ডো হাসল। রিকোর দিকে প্রশ্ন সূচক তাকাতেই রিকো নড়েচড়ে উঠে বলল,
_“ সে নাকি মানসিক ভাবে প্রস্তুত না।”
__
বিকেলে অনুভা তাড়াহুড়ো করে তৈরি হচ্ছিল। আজকের রেস একটু পড়েই শুরু হবে। আরাফকে ন্যানি তৈরি করিয়ে দিচ্ছে। ড্রেসিং টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা জিনিসগুলো একে একে গুছিয়ে নিচ্ছে অনুভা। কালো ফিটিং রেসিং জ্যাকেটটা গায়ে চাপাতেই তার ভঙ্গিটা বদলে গেল। চুলগুলো উঁচু করে শক্ত করে বাঁধল। ঠোঁটে লাগাল ম্লান রঙের লিপস্টিক দিলো। টেবিলের ওপর রাখা গ্লাভস, ঘড়ি, বাইকের চাবি,সব এক এক করে গুছিয়ে ব্যাগে রাখছে। এটা তার প্রথম রেস নয়। মার্সেই সহ প্যারিসেও কয়েকবার রেসে অ্যাটেন্ড করেছিল সে। তবু তার বুকের ভেতর ধুকপুকানি হচ্ছে, কিন্তু মুখে কঠিন স্থিরতা। তাড়াহুড়োর মাঝেই শান্তর কল এলো। সে ব্যাগ গোছাতে গোছাতেই কল রিসিভ করে। পরক্ষণেই ওপাশ থেকে শান্তর কন্ঠস্বর ভেসে আসে,
_“ আপনার কিন্তু অলওয়েজ লেট হয়,মহারানী।”
_“ এইতো এখনই বের হবো। আপনি কোথায়?”
শান্ত ড্রাইভ করছিল,সে একবার ব্যাক সিটের দিকে তাকাল। সেখানে আরাফের জন্য কয়েক প্যাক চকলেট, কয়েক রকমের টয়েজ,নতুন কিছু আরাফের সাইজের ড্রেসও কিনেছে। সেগুলো দেখে মৃদু হেসে,আবার সামনের দিকে তাকিয়ে রাস্তায় মনোযোগ দিয়ে বলল,
_“ আমি মাত্র সুপারশপ থেকে বের হলাম। এখন ক্লাবের দিকে যাচ্ছি। তোমরা চলে আসো।”
_“ আচ্ছা।”
_“ আরাফ কী এরপর আরও কান্না করেছে?” শান্ত বলল।
_“ হ্যাঁ,একটু মর্জি করেছিল।”
শান্ত কপাল কুঁচকে বলল,
_“ তারপর তুমি কী করেছ? বকেছ? মেরেছ?”
_“ এত উত্তেজিত হচ্ছেন কেন? আমি কিছুই বলিনি,কার্টুন দেওয়ার পর আর মর্জি করেনি।” অনুভা অ্যাপার্টমেন্টের দরজা লক করতে করতে বলল। ন্যানি আরাফকে নিয়ে গ্রাউন্ডফ্লোরে চলে গেছে।
শান্ত স্বস্তির শ্বাস ফেলল। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি,আরাফের জন্য কেনা জিনিসগুলো মনে পড়তেই বুকটা নরম হয়ে গেল। হঠাৎ সামনের মোড়ে একটা ট্রাক বেপরোয়া ভাবে লেন পরিবর্তন করল। শান্ত ভ্রু কুঁচকে ব্রেক চাপল। চাকা রাস্তার ওপর ঘর্ষণে তীব্র শব্দ তুলল। এমন শব্দ শুনে ওপাশ থেকে অনুভা ভ্রু কুঞ্চিত করে বলল,
_“ কী হয়েছে?” সে মাত্রই লিফটে উঠেছে। শান্ত কোনো জবাব দিতে পারল না।
তার গাড়িটা সামান্য নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডানদিকে স্লাইড করল। শান্ত দ্রুত স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে সামলানোর চেষ্টা করল। তার হাত থেকে ফোন পড়ে যায় নিচে। তারপর পেছন থেকে একটা দ্রুতগতির সিটি বাস এসে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে শান্তর গাড়িতে ধা’ক্কা মে'রে দেয়। সামনেও আরেকটা প্রাইভেট কারের সঙ্গে হালকা ধা’ক্কা লাগে। ধাক্কার শব্দে পুরো গাড়িটা কেঁপে উঠল। এয়ারব্যাগ হঠাৎ খুলে গেল। স্টিয়ারিংয়ের ওপর ঝুঁকে পড়ল শান্ত। কয়েক সেকেন্ড সবকিছু নিস্তব্ধ। শুধু ইঞ্জিনের কাঁপা শব্দ… আর ভাঙা কাঁচের টুকরো মাটিতে ঝরে পড়ার মৃদু আওয়াজ। শান্তর কল এখনো কাটেনি। অনুভা এসবের আওয়াজ শুনতে পেয়ে তখন থেকে চিৎকার করে শান্তকে ডাকছে। শান্তর কপালে হালকা কেটে গেছে, রক্ত গড়িয়ে চোখের পাশে নেমে আসছে। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। শ্বাস নিতে বুকে চাপ লাগছে। তার চোখ আধখোলা। চারপাশ কুয়াশার মতো ঝাপসা। মনে পড়ল,আরাফ…ব্যাক সিটে রাখা চকলেট… খেলনা…। কাঁপা হাতে সে মোবাইলের দিকে এগোতে চাইল, কিন্তু হাতটা মাঝপথেই নিস্তেজ হয়ে ঝুলে পড়ল। দূরে লোকজনের চিৎকার শোনা যাচ্ছে। লোকজন ছুটে এল চারদিক থেকে। কেউ গাড়ির দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে, কেউ কাঁচের ভাঙা অংশ সরাচ্ছে। সামনের অংশটা দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। হর্নটা আটকে গিয়ে একটানা, অসহ্য কর্কশ শব্দ তুলছে। একজন যুবক চিৎকার করে বলল,
_“ইঞ্জিন বন্ধ করার ব্যাবস্থা করো! তাড়াতাড়ি! নাহলে গাড়ি ব্লা স্ট হয়ে যাবে।”
কেউ একজন কষ্ট করে দরজা খুলল। ধোঁয়ার গন্ধ,পুড়ে যাওয়া রাবারের গন্ধ… বাতাস একদম ভারী হয়ে উঠেছে। শান্তর মাথা পাশের দিকে কাত হয়ে আছে। কপাল বেয়ে রক্ত গড়িয়ে গালে নেমে এসেছে। গায়ে চড়ানো সাদা শার্টটা রক্তিম হয়ে উঠেছে। তার চোখ সামান্য কাঁপল। মনে হলো যেন দূর থেকে আরাফের কান্না ভেসে আসছে। আজ আসার সময় যেভাবে কাঁদছিল, ঠিক সেই আওয়াজ। তার ঠোঁট খুব মৃদু ভাবে নড়ল। ফিসফিস করে,একদম অস্পষ্ট স্বরে শব্দ বেরুলো,
_“ আ-আরাফ..”
মাহভিনের হাসি মাখা আর, রাগ মিশ্রিত চাহনিটা চোখে ভেসে উঠছিল। আরাফ কেঁদে কেঁদে বলছিল, ‘ পাপা,যেও না।’ সে খুব দ্রুতই জ্ঞান হারাবে। তার ঠোঁট আবারও নড়ল। জ্ঞান হারানোর আগে শুধু হৃদয় ভাঙা কন্ঠে সে ফিসফিস করল,
_“ ভয় পাচ্ছি…আমি মাহভিন। আমি… ভুলতে পারব না…তোমার হাসি… চোখ…।আমি ভালোবাসি তোমাকে, আরাফকে….” মনে মনে আরও কিছু বলতে চাইল, কিন্তু শব্দ বের হলো না।
–
এতক্ষণের গাড়ির ধা’ক্কা মানুষের ভিরের সব কিছুর আওয়াজ অনুভা পাচ্ছিল। সে এখন গ্রাউন্ডফ্লোরে। যখন কেউ বলছিল ‘এখনো বেঁচে আছে’ তখনই অনুভার বুকের ভেতর কিছু একটা খামচে ধরে। হাত পা ভেঙে আসে তার। সব রকমের খারাপ চিন্তা মাথায় চে'পে বসল। অনুভার এমন দিশাহীন অবস্থা দেখে ন্যানি অনুভার কাছে এসে বলল,
_“ কী হয়েছে? এমন লাগছে কেন তোমাকে?” তার কোলে আরাফ।
_“ শান্ত! ও কলে ছিল..তখনই বিকট শব্দ হয়। এক্সিডেন্ট হয়েছে ওর।” শেষের বাক্য উচ্চস্বরে বলল। আশেপাশের কয়েকজন এগিয়ে এলো।
_“ যেতে হবে। ন্যানি,তুমি ট্যাক্সি ডাকো…বাইক চালানোর শক্তি নেই আমার।” ন্যানি দারোয়ানকে বলল ট্যাক্সি ডেকে আনতে। আরাফ মায়ের আতঙ্কিত মুখ দেখেই ঠোঁট উল্টে কেঁদে উঠল। ট্যাক্সি আসার সঙ্গে সঙ্গে অনুভা আরাফকে কোলে নিয়ে ট্যাক্সিতে গিয়ে বসে। পাশে ন্যানিও বসে। অনুভার হাত,বুকের ভেতর আতঙ্কে কাপছিল। তবু আরাফের কান্না থামানোর জন্য নিজেকে সামলে বলল,
_“ কেঁদো না, কিচ্ছু হয়নি তো। এইতো, আমরা পাপার কাছে যাবো এক্ষুনি।