শান্তকে যারা হসপিটাল নিয়ে গেছে,তারাই শান্তর ফোন দিয়ে অনুভাকে হসপিটালের ঠিকানা বলে দেয়। শান্ত শেষ কথা অনুভার সঙ্গেই বলছিল। মার্সেই এর এক প্রাইভেট হসপিটালের সামনে অনুভাদের ট্যাক্সি থামে,ক্যাসিস শহর থেকে প্রায় ত্রিশ মিনিটের পথ। অনুভার মনে হচ্ছিল প্রতিটা সেকেন্ড মুহূর্তের মতো দীর্ঘ।
আরাফকে বুকে চে'পে ধরে তড়িঘড়ি করে ট্যাক্সি থেকে নেমে আসে অনুভা। হসপিটালে ঢুকতেই দেখে শান্তর র*ক্তাক্ত শরীর স্ট্রেচারে করে ইমারজেন্সির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অনুভার পা জোরা এক মুহুর্তের জন্য থেমে যায়। আরাফ মায়ের কাধ থেকে মুখ তুলে তাকাতে চাইলে অনুভা আরও শক্ত করে আরাফকে চে'পে ধরে, যেন ছোট্ট বাচ্চাটাকে এরকম দৃশ্য না দেখতে হয়।
শান্তকে ইমারজেন্সিতে ঢোকানো হলো। অনুভা আর সামনে এগিয়ে যেতে পারল না। শান্তর শার্টটা লাল হয়ে আছে। ওগুলো র*ক্ত। তার র*ক্ত যে একটু আগে অনুভার সঙ্গে কথা বলছিল। অনুভার বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। মনে হলো, পুরো হাসপাতালটা হঠাৎ নিঃশব্দ হয়ে গেছে। চারপাশে মানুষজন ছুটোছুটি করছে, তবু অনুভার কানে কিছুই ঢুকছে না। আরাফ ধীরে ধীরে নড়েচড়ে উঠল। অনুভা বুঝল, বাচ্চাটা তার বুকের ধুকপুকানি টের পাচ্ছে। সে চোখ বন্ধ করে আরাফের মাথায় ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। ভেঙে পড়ার সময় এখনো আসেনি। শান্তর কিচ্ছু হবে না, হতেই পারে না।
_“Are you a family member of this patient?” নার্সের কন্ঠ পেয়ে অনুভার স্তম্ভিত ফেরে। সে দ্রুত উপর নিচ মাথা নাড়ায়।
_“ His name?”
_“ আরাফাত খান শান্ত।” অনুভা বলল।
_“ What is your relationship with him?”
অনুভা কিছুক্ষণ নার্সের দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর শান্তকে যেদিক দিয়ে একটু আগে নিয়ে গিয়েছে সেদিকে তাকাল।
_“ ফ্রেন্ড! হি ইজ মাই বেস্ট ফ্রেন্ড।”
নার্সটি অনুভার থেকে বয়স, রক্তের গ্রুপ পেপারে লিখে নিল, তারপর হেঁটে চলে গেল।
_“ মা! পা..পা কোতায়?” আরাফ ছোট্ট কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল। অনুভা আরাফের দিকে তাকাল। ছেলেটা কেমন গোলগোল চোখ নিয়ে মায়ের দিকে অসহায় ভঙ্গিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল কথাটা। ছোট বাচ্চাটাও বোধহয় বুঝতে পারছে, মায়ের এখন মন ভালো নেই। খারাপ কিছু হয়েছে। অনুভা আরাফের দিকে তাকিয়ে জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করল। বলল,
_“ আছে,সোনা। একটু পড়ে আমরা পাপার কাছে যাবো।”
ইমারজেন্সি থেকে ডক্টরকে বের হয়ে আসতে দেখে অনুভা আরাফকে ন্যানির কোলে দিয়ে সেদিকে এগিয়ে যায়।
_“ রোগির অবস্থা কেমন?”
ডক্টর দাঁড়াল না। তাড়াহুড়ো গলায় বলল,
_“ এখনই কিছু জানাতে পারছি না। Please call upon god.”
অনুভা শ্বাস নিতে ভুলে গেল। ডক্টর সে কথা গুলো ইংরেজিতে বলেছিল। একটু পর দেখল ডাক্তার আবার ইমার্জেন্সির দিকে দ্রুত পা বাড়াচ্ছে। তার মাথা থেকে খারাপ চিন্তা যাচ্ছেই না। সে হসপিটালের এক পাশের বেঞ্চিতে বসল। দু'হাতে মুখ ঢেকে বসে থাকল। ন্যানির কোলে আরাফ থাকতে চাইছে না। জোরজবরদস্তি করে নেমে অনুভার উরুর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। উঁকিঝুঁকি দিয়ে মায়ের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করছে।
_“ ও…মা!”
অনুভা মুখ থেকে হাত সরিয়ে আরাফকে কোলে নিয়ে তার গালে চুমু খায়। ন্যানিকে বলে,
_“ আপনি ওকে নিয়ে বাসায় চলে যান।”
_“ আর আপনি?” ন্যানি দ্বিধা নিয়ে বলল।
_“ আমি এখানেই থাকব। সকালে ওকে নিয়ে চলে আসবেন।”
_“ ও তো কান্নাকাটি করবে।”
_“ করুক। হসপিটালের পরিবেশ ওর জন্য না। একটু বুঝিয়ে কষ্ট করে এক রাত কাটান।” অনুভা খুব নিচু গলায় বলছে কথা গুলো।
ন্যানি আর কথা বাড়াল না। আরাফকে কোলে তুলে নিয়ে চলে যায়। বেচারা আরাফ যাবেই না। কাঁদতে কাঁদতে লাল হয়ে গেছে। তবু অনুভা সেদিকে ফিরে তাকাল না। তাকালেই কষ্ট হবে। জরুরী বিভাগ থেকে আরেকজন নার্স এলো।
_“ রোগীকে সিটি স্ক্যান করাতে হবে। মাথায় আঘাত লেগেছে। দ্রুত রিপোর্ট দরকার।”
শুনেই অনুভার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
_“ও… ওর অবস্থা খুব খারাপ?”
নার্স সরাসরি চোখে তাকাল না।
_“এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। স্ক্যান না হলে বোঝা যাবে না ভেতরে রক্তক্ষরণ হয়েছে কি না।”
স্ট্রেচারে শোয়ানো মানুষটাকে পাশের করিডর দিয়ে ঠেলে নিয়ে যাওয়া হলো। ধাতব চাকাগুলো ঠকঠক শব্দ করছিল। অনুভাও সঙ্গে যাচ্ছিল। সাদা আলোয় চেনা মুখটা মুহূর্তে মুহূর্তে মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে উঠেছে। CT রুমের সামনে থামানো হলো স্ট্রেচার।
কাঁচের দরজার ওপাশে বিশাল গোলাকার যন্ত্রটা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। অনুভাকে ভেতরে আসতে দেখে একজন টেকনোলজিস্ট বলল,
_“আপনি ভেতরে যেতে পারবেন না। বাইরে অপেক্ষা করতে হবে।”
অনুভা কিছু বলতে গিয়েও পারল না। কথা গুলো গলায় আটকে রইল। স্ট্রেচারটা ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ হয়ে গেল তার চোখের সামনে। বাইরে দাঁড়িয়ে অনুভার হাত দুটো অজান্তেই কাঁপছিল। সে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল। ভেতর থেকে যন্ত্রের একটানা শব্দ ভেসে আসছে।ঘুরছে, থামছে, আবার ঘুরছে। এই কয়েকটা মাস অনুভার কখনো নিজেকে একা মনে হয় নি। শান্ত তা মনেই হতে দেয়নি। যে সব সময় অনুভার খারাপ সময়ে কাঁধে ভরসার হাত রেখেছে, আজ সেই মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে অনুভার মনে হলো পৃথিবীটা হঠাৎ করে খুব বড় হয়ে গেছে, আর সে নিজে ভীষণ ছোট। বুকের ভেতর এক অসম্ভব শূন্যতা নিয়ে সে বুঝতে পারল, আজ সে ভয়ানক রকম একা,আর অসহায়। অনুভা চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল। নিজের মনকে শান্ত করার চেষ্টা করল। ছোট ছোট স্মৃতির ঝলক চোখে ভেসে উঠছিল। শেষ কথোপকথন, শেষ ছোট ছোঠ খুনসুটি,সবকিছু ঘুরে ফিরে আসছে।
অনুভা দেখল সিটি স্ক্যানের রুম থেকে স্ট্রেচার সমেত শান্তকে বের করা হচ্ছে। স্ট্রেচার ICU-এর দিকে ঠেলে নেওয়া হচ্ছে দেখে একটু অবাক হয় । ডাক্তার দ্রুত এগোচ্ছে, কিন্তু মুখে কোনো প্রমিত খুশির ছাপ নেই। অনুভার চোখে ভয় আর অনিশ্চয়তার আভা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কয়েক মুহুর্ত কেটে যায় সে ভয় নিয়েই।
_“ হোয়াটস ইয়োর নেইম?” ডক্টর এসে অনুভাকে বসে থাকতে দেখে ডাকল।
পাশ ফিরে তাকায় অনুভা।
_“ মাহভিন অনুভা।”
অনুভার ফ্যাকাসে মুখ দেখে ডক্টর মৃদু হাসে।
_“ বেঙ্গালি?”
অনুভা উপর নিচ মাথা নাড়ায়। ডক্টরের মুখের ভঙ্গি এমন হলো যে তার ধারণা সঠিক হয়েছে।
_“ চিন্তা করো না,মা।”
অনুভা এবার অবাক দৃষ্টিতে ডক্টরের দিকে তাকায়। ডক্টরের মুখে বাংলা শুনে অবাক হয়। অনুভার চোখে মুখে বিস্ময় ভাব দেখে ডক্টর বুঝেই ফেলল মেয়েটা কী ভাবছে।
_“ ইয়েস, আইম বাঙালি। এম.বি.বি.এস শেষ করে আর দেশে ফেরা হয়নি।”
অনুভার চিন্তিত মুখে মৃদু হাসির রেখা ফুটল। নিজের দেশের কাউকে পেয়ে মনে হলো আপন কাউকে পেয়েছে।
_“ উনি তোমার…” ডক্টর উল্টাপাল্টা কিছু সম্মোধনের আগেই অনুভা বলল,
_“ আমার খুব কাছের ফ্রেন্ড উনি।”
_“ তার ফ্যামিলির লোক কোথায়?”
_“ তারা জানেন না এখনো।”
ডক্টর বোধহয় একটু অবাক হলেন কিন্তু প্রকাশ করলেন না।
_“ রিপোর্ট এখন হাতে নেই,” ডাক্তার বলল। CT স্ক্যান সম্পন্ন হয়েছে। সংক্ষেপে বলতে পারি,মাথায় রক্তক্ষরণ আছে। সরাসরি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন নেই, তবে ICU-এ পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।”
_“ বেঁচে যাবে তো?” অনুভা বুঝতে পারল না সে কী বলছে এসব। বেঁচে যাবে মানে? বাঁচতে তো হবেই।
_“আল্লাহ চাইলে অবশ্যই। জ্ঞান ফেরেনি যেহেতু বলতে পারছি না।”
অনুভা ডক্টরের কথায় তেমন কোনো আশ্বাস পেল না।
_“ আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। আশা রাখছি সকালের মধ্যে জ্ঞান ফিরবে।” অনুভা এবারও কোনো ভরসা পেল না। তনু স্বাভাবিক হয়ে হাসার চেষ্টা করল। ডক্টর আরও কিছু বিস্তারিত বলে চলে গেল। অনুভা হসপিটালের ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে মুখে পানি দেয়। শান্তর পরিবারকে জানানো দরকার কিন্তু তাদের কারও সঙ্গে অনুভার কন্টাক্ট নেই। মাঝে মধ্যে শান্ত তার মায়ের সঙ্গে কথা বলার সময় অনুভাও বলত। কিন্তু সে তার স্বামীর ভয়ে কখনো আরাফকে দেখতেও আসতে পারেনি। শান্তও চায়নি আসুক।
ICU-এর করিডরটা এই সময় অদ্ভুতভাবে নীরব। অপেক্ষা করতে করতে মাঝরাত পেরিয়ে গেছে। শান্তর জ্ঞান এখনো ফেরেনি। ডাক্তাররা যতটুকু চিকিৎসা করা সম্ভব, সবটাই করেছে। এখন শুধু সময় আর শরীরের লড়াই। অনুভা ICU এর বাহিরে ঝাপসা কাঁচের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। এবার নিয়ে কতবার যে এসে দাড়িয়েছে এখানে..প্রতিবারই একই আশা নিয়ে, হয়তো এবার চোখ খুলেছে, হয়তো এবার তাকিয়ে আছে। কাঁচ গলিয়ে ভেতরে তাকিয়ে অনুভা শান্তকে দেখতে থাকে অনুভা। সাদা আলোয় শান্তর মুখটা অস্বাভাবিক রকম ফ্যাকাসে। মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা, নাকে অক্সিজেনের নল, হাতে ক্যানোলা ঢোকানো। বুকের পাশে মনিটরের আলো নিভে-জ্বলে উঠছে,প্রতিটা ব্লিপ জানিয়ে দিচ্ছে, সে এখনো লড়ছে। চোখ দুটো বন্ধ, ঠোঁট শুকনো, শরীরটা নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে বিছানায়। অনুভা ঠোঁট দু'টো কেঁপে উঠলো। এই মানুষটা ক’ঘণ্টা আগেও কথা বলছিল, হাসছিল। আর এখন সে নিঃশব্দে যন্ত্রের ওপর ভর করে বেঁচে আছে।
অনুভা কাঁচে হাত রাখল। ভেতরের মানুষটা তার ছোঁয়া টের পাবে না জেনেও হাতটা সরাতে পারল না। গলায় জমে থাকা কান্নাটা চেপে রেখে মনে মনে বলল,
_“ আমাকে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখিয়ে আপনি এভাবে হারিয়ে যেতে পারেন না। এটা অন্যায়…খুব অন্যায়!” অনুভার ঠোঁট দুটো ভেঙে আসছে।
_“ আপনি ফিরে আসুন শান্ত…প্লিজ ফিরে আসুন। আপনাকে ছাড়া আমি খুব অসহায়।” অনুভা নিজের ফুপিয়ে উঠার শব্দ নিজেই শুনতে পেল। সে যথেষ্ট পরিমাণ চেষ্টা করছে কান্না চে'পে রাখার। তবু অনিচ্ছায় চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
_“ আরাফ আপনাকে অনেক মিস করছে…প্লিজ চোখ খুলুন..” আবারও মনে মনে বলল।
রাত প্রায় শেষের দিকে। ICU-এর আলোগুলো নিস্তেজ হয়ে এসেছে। করিডরে শব্দ কম, শুধু মনিটরের একটানা টুকটুক শব্দ। প্রতিবারের মতো এবারও এসে দাঁড়িয়েছিল শান্তকে দেখার জন্য। কিন্তু জ্ঞান না ফেরায় নিরাশ হয়ে চলে আসার জন্য উদ্যত হতেই দেখে শান্তর আঙুলের ডগাটা খুব সামান্য নড়ছে। প্রথমে মনে হলো ভুল দেখছে। চোখ কচলাল অনুভা। আবার তাকাল। সত্যিই নড়ছে!
অনুভার এতক্ষণ যে শ্বাসটা আটকে ছিল, এখন মনে হলো বুক ভরে বাতাস ঢুকছে। সে আগেই ভেতরে গেল না। দ্রুত ডক্টরকে ডেকে নিয়ে আসে। ভেতরে হালকা নড়াচড়া, মনিটরের শব্দ,ডক্টর নার্সের চাপা কণ্ঠে কথা,সব মিলিয়ে ICU এর নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল। অনুভা নিজেও ICU এর ভেতর ঢুকেছে এখন । তবে একটু দুরে দাড়ানো সে। শান্তর চোখের পাতা কেঁপে উঠল। একবার… দু’বার… তারপর খুব ধীরে ধীরে চোখ খুলল। আলোয় চোখে যেন ব্যথা লাগছে। ভ্রু কুঁচকে গেল। ঠোঁট দুটো নড়লেও,কোনো শব্দ বের হলো না। শান্ত আবার চোখ বন্ধ করে আবারও তাকায়। খুব ধীরে মাথাটা নড়াল। চোখ দুটো আধ খোলা। দৃষ্টিতে কেমন বিভ্রান্তি,কোথায় আছে, কী হয়েছে,সবকিছু যেন মিলছে না।
ডক্টর তৎক্ষণাৎ রেসপন্স চেক করে। রোগী ঠিকঠাক জেগেছে কি না, কথা বুঝছে কি না, অবস্থা আবার খারাপের দিকে যাচ্ছে কি না সব কিছু চেক করল। সবশেষে অনুভার কাছে এসে সংক্ষেপে বলল,
_“ জ্ঞান ফিরেছে,এটা ভালো। কিন্তু এখনও ঝুঁকি আছে, প্রথম ২৪ ঘণ্টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ততক্ষণ ICU-তেই রেখে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বমি হলে সঙ্গে সঙ্গে জানাবে।”
_“ আমি কী ওর পাশে গিয়ে বসতে পারব ?” অনুভা বলল।
ডক্টর একবার শান্তর দিকে তাকাল। অনুভাকে মুখের উপর না করতে পারল না। সে শুধু মাথা নাড়িয়ে চলে যায়। একটু পর নার্সও বেড়িয়ে যায়। অনুভা ধীর পায়ে শান্তর বেডের পাশে গিয়ে বসে। বুকের ভেতর এতক্ষণ যে কান্না জমে ছিল, এবার আর চেপে রাখতে পারল না। শব্দহীন কান্না গড়িয়ে পড়ছে গালে। ঠোঁট কামড়ে ধরে বসে আছে। অনুভার নীরব কান্না শান্তর কানে পৌঁছায়। কিন্তু শান্ত তার দিকে ঘুরে তাকাতে তাকাতেই চোখের পানি মুছে ফেলে। শান্ত তাকে এখানে দেখতে পাবে,এটা আশা করেনি। ICU-র বিছানায় শুয়ে থেকে হঠাৎ পরিচিত মুখটা দেখে তার চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল। খুব কষ্টে ঠোঁট দুটো একটু বাঁকিয়ে সে হাসার চেষ্টা করল। হাসিটা ঠিক হাসি হলো না,ক্লান্ত, ভাঙা, তবু তাতে খানিকটা ফিরে পাওয়ার আনন্দ ছিল।
_“ ভয় পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম তোমাকে আর দেখতে পাবো না।”
গলা দিয়ে শব্দ বেরোতে চাইছিল না। তবু খুব নিচু আওয়াজে বলল।
_“ অনেকবার নিষেধ করেছিলাম ড্রাইভ করার সময় ফোনে কথা বলতে।” অনুভা কন্ঠে চাপা রাগ ঢেলে বলল।
_“ স্যরি…তোমার কথা শোনা উচিৎ ছিল।” শান্ত নিজের ভুল স্বীকার করল।
_“ আপনার একটা ভুলের জন্য কী হতে পারত ভেবে দেখেছেন?” বাক্য শেষে অনুভার কন্ঠ কেঁপে উঠলো। চোখের কোণে আবারও জল জমল। বুক ভারি হয়ে আসছে তার। নিজের আর ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব হলো না। প্রথমে শুধু চোখ ভিজল, তারপর পাতার কোণে জমে থাকা জল ধীরে গড়িয়ে পড়ল গালে। সে ঠোঁট কামড়ে ধরে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে ফেলল,যেন শান্ত দেখে না ফেলে। কান্নার শব্দ বেরোতে দিতে চাইছে না। কিন্তু দমটা ভেঙে এল। বুকের ভেতর জমে থাকা ভয়, দুশ্চিন্তা আর দীর্ঘ অপেক্ষার ক্লান্তি একসাথে চেপে ধরল তাকে।
শান্ত খুব ধীরে হাত বাড়াল। শরীরটা তখনো দুর্বল, তবু অনুভার মুখের দিকে হাত তুলতে চাইল। আঙুলগুলো কাঁপছিল একটু। গালের ওপর গড়িয়ে পড়া পানির ফোঁটাটুকু আলতো করে মুছে দিল সে। যত্নে ভরা ছোঁয়া ছিল তার। অনুভা চমকে তার দিকে তাকাল।
_“ কাঁদছ কেন? তুমি না স্ট্রং গার্ল!”
অনুভা হালকা হেঁসে বলল,
_“আমরা কেউ শক্ত না… শুধু শক্ত হওয়ার অভিনয় করি।”
শান্ত তাকিয়ে রইল। চোখ দুটো ঘোলা হয়ে উঠেছে, পাতার কোণে পানি জমে আছে। ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে ধরেছে, যেন কান্নাটা গলার কাছে এসেও ফিরে যায়। এক মুহূর্তের জন্য চোখ নামিয়ে আবার তাকাল অনুভার দিকে। তার মাহভিন তার জন্য কাঁদছে! তার মনে হলো অ্যাক্সিডেন্ট না হলে সে এই দৃশ্য দেখতেই পেত না। স্বার্থক মনে হচ্ছিল। সে যদি এখন কাঁদত তাহলে সেটা হতো তার আনন্দের কান্না।
_“ তুমি আমার জন্য কাঁদছ,মাহভিন? যদি জানতাম আমার এই অবস্থা দেখে কাঁদবে তাহলে অনেক আগেই…”
শান্তর কথা থামিয়ে দেয় অনুভা।
_“ চুপ করুন। এগুলা কেমন কথা?” তার ভেজা চোখ কঠিন হয়ে উঠল।
তবু এক চিলতে হাসি দেখা গেল শান্তর ঠোঁটে।
_“ তুমি আমার জন্য কাঁদছ! আমার খুব আনন্দ হচ্ছে।”
_“ কেন আমার পক্ষ থেকে আপনার জন্য কান্না বারণ?”
শান্ত ধীরে শ্বাস নিয়ে দু’পাশে মাথা নাড়ল।
_“বারণ না। তুমি আমার জন্য কাঁদবে,এই ধারণা ছিল না কখনও।”
তারপর খুব আস্তে যোগ করল,
_“তবে একটা কথা সত্যি…আজ যদি চলে যেতাম, অন্তত এটুকু জেনে যেতাম,আমার জন্য আরাফ ছাড়াও অন্য কেউ কাঁদে।”
শান্তর কথা শেষ হতেই অনুভার ভেতরে কেমন যেন তাকিয়ে বলল,
_“মায়া জিনিসটা খুব খারাপ, জানেন?” তার গলা কেঁপে উঠল।
_“মানুষকে দুর্বল করে দেয়। নিজের অজান্তেই কাউকে নিয়ে ভয় পেতে শেখায়।” অনুভা চোখের পানি মুছল,
_“ আপনার জন্য আমার যে অনুভূতিটা… সেটা হয়তো ভালোবাসা না। কিন্তু মায়া… খুব গভীর মায়া। আর সেই মায়াই আমাকে আজ কাঁদাচ্ছে।”
অনুভা শান্তর চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নেয়।
_“ আপনি বলছিলেন না, আমি কেন কাঁদছি? কারণ আপনাকে ছাড়া আমার দিনগুলো কল্পনা করতে পারি না। আপনি থাকেন বলেই আমি নির্ভয়ে থাকি। আপনি আছেন বলেই আমি ভেঙে পড়লেও আবার উঠে দাঁড়াই।” ICU মনিটরের দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে অনুভা।
_“ এই যে আপনার কষ্ট দেখে আমার হৃদয়টা অস্থির হয়ে ওঠে, এটা হয়তো ভালোবাসা না। কিন্তু এটা এমন এক মায়া, যেটা আমাকে আপনার সঙ্গে অদৃশ্যভাবে বেঁধে রেখেছে…। আমি আজ বুঝতে পেরেছি,আপনার কিছু হলে আমার ভেতরের একটা অংশ থেমে যাবে।”
এতক্ষন ধরে অনুভার দিকে অপলক তাকিয়ে থেকে তার কথা শুনছিল শান্ত। তার চোখে বিস্ময় নেই, ছিল এক অদ্ভুত নরম আলো। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সে অবশেষে নিজের জায়গাটা খুঁজে পেয়েছে। তার ঠোঁটের কোণে খুব আস্তে একটা হাসি ফুটে উঠল।
শরীর জুড়ে টান টান যন্ত্রণা। তবু মনে হচ্ছিল, আজ সে অদ্ভুত এক প্রশান্তি পেয়েছে।
মায়া…শব্দটা তার ভেতরে বারবার প্রতিধ্বনি তুলল। সে কখনও জোর করে ভালোবাসা চায়নি। শুধু চেয়েছিল মাহভিনের জীবনে নিজের একটা জায়গা থাকুক,নামহীন হলেও থাকুক। আজ বুঝল, সে জায়গাটা আছে। অদৃশ্য, কিন্তু গভীর। শান্তর চোখ বেয়ে অবশেষে একফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। এই কান্না ব্যথার ছিল না। এটা ছিল প্রাপ্তির।