ঠিক কত বছর পর এমন জায়গায় এসেছে,তায়ানের ঠিক মনে পড়ে না। তবে পনেরো/ষোলো বছর তো হবেই। এই দীর্ঘ সময়ে একবারও কোনো মসজিদের চৌকাঠে পা রাখা হয়নি তার। ছোটবেলায় মাঝে মাঝে আরমান আহসানি-র সঙ্গে জুমার নামাজে যেত, আর ঈদের সকালে ঈদের নামাজে। তাও নিজের ইচ্ছায় নয়,জোর করে নিয়ে যাওয়া হতো। অনেক সময় নামাজের মাঝপথে চুপিচুপি সরে পড়ত। আরও ছোট থাকতে মসজিদের অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়ত,কখনও মারামারিও করে দৌড়ে মসজিদ ছেড়ে পালিয়ে আসা ছিল নিত্য ঘটনা। এসব নিয়ে আরমান সাহেবের কাছে অভিযোগ পৌঁছালেও তিনি কখনও কঠোর কিছু বলেননি। কিন্তু আরশাদ সাহেব আর আসাদুর সাহেব এই সামান্য বিষয় নিয়েও বাড়িতে অশান্তি বাধাতেন। সেই অশান্তি, সেই চাপা রাগ থেকে তায়ান একই কাজ করত।
আজ ফজরের সময় হঠাৎই তার ঘুম ভেঙে যায়। বরাবরের মতো আজও সেই মেয়েকে নিয়েই অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছে। সেই মেয়ে। যার বিড়াল এখন উরুর উপর নিয়ে মসজিদের মেঝেতে বসে আছে। আর্জেন্টিনা-তে মসজিদ এমনিতেই খুব কম; মুসল্লির সংখ্যাও হাতে গোনা। চারপাশ একদম নিরব। নামাজ পড়েছে কিন্তু আদতে সেই নামাজ সঠিক হয়েছে কিনা সেটাও জানে না।
মসজিদ থেকে বের হয়েই দেখল কালো একটা গাড়িতে ড্রাইভার সিটে এলেনার বাবা বসে আছে। তায়ানকে বের হতে দেখে রিকার্ডো গাড়ির কাচ নামিয়ে দেয়,
_“ গুড মর্নিং, ইয়াং ম্যান!”
তায়ান কোনো জবাব দিল না। শুধু হালকা করে মাথা নেড়ে পাশের সিটে গিয়ে বসল। কোলে রাখা বিড়ালটার গায়ে আলতো করে হাত বোলাতে বোলাতে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। ভোরের আলো ধীরে ধীরে শহরের ওপর ছড়িয়ে পড়ছে।
গাড়ি চলতে শুরু করল। কিছুক্ষণ নীরবতার পর রিকার্ডো একবার তার দিকে তাকালেন।
_“হঠাৎ করে মসজিদ? অবাক হলাম!”
তায়ানও অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে তাকাল।
_“আমিও।”
_“কেন?”
_“আমার মসজিদে যাওয়া দেখে অবাক হওয়ার জন্য।”
রিকার্ডো মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন।
_“হ্যাঁ, কারণ এই পথ তোর জন্য না।”
তায়ান জানালার বাইরে তাকিয়েই বলল,
_“আমি একটু স্বস্তি খুঁজতে গিয়েছিলাম।”
_“আমার সঙ্গে গির্জায় যেতে বলেছিলাম।”
একটু থেমে তায়ান নিচু স্বরে বলল,
_“নো… সেসবের ওপর আমার আর বিশ্বাস নেই। যদি ‘আত্মা বিক্রি’ বলে সত্যিই কিছু থাকত, তাহলে আজ এই অস্বস্তিটা থাকত না। ভেতরে এমন শূন্যতা, এমন হতাশাও থাকত না।”
_“ কীসের শূন্যতা? কীসের হতাশা? কার জন্য এগুলা?” রিকার্ডো আচমকা গাড়ি থামিয়ে বলতে শুরু করে।
_“ তোর কী কী করার কথা ছিল,আর তুই কী করছিস একবারও ভেবে দেখেছিস? যে পরিবারকে ধ্বংসের কথা ছিল তারা এখন দিব্যি ভালো আছে। যাকে ভাঙার জন্য সেই মেয়েকে ব্যবহার করেছিস, তারা সবাই ভালো আছে!” আরও বলল,
_“ যদি ওই মেয়ের সঙ্গে এমন করে আজ কষ্টই পাচ্ছিস তাহলে কেন করতে গেলি? আমাদের পরিকল্পনা তো এমন ছিল না।”
তায়ান জানালার কাঁচে আলত ঘুষি বসিয়ে বলল,
_“ শাট আপ! আমি কারও জন্যই কষ্ট পাচ্ছি না।”
রিকার্ডো বলল,
_“ সবাইকে বোকা বানাতে পারলেও আমাকে পারবি না,ভিকি! আমি নিজ হাতে তোকে গড়েছি। কেন গড়েছি,কী তোর লক্ষ সব জেনেও এভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকার মানে কী?”
_“ সময় হলে সব করব।” তায়ান নিচু গলায় বলল।
রিকার্ডো কিছুক্ষণ তায়ানের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার স্টিয়ারিংয়ে মন দিলেন। গাড়ির গতি ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল।
তায়ানও আর কিছু বলল না। জানালার বাইরে মন দিলো। এত বছর ধরে সে যা করেছে, যা ভেবেছে, যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে,সবই মূলত এলেনার বাবার কথায় ভর করে। অথচ আজ পর্যন্ত সে কোনো কিছুর স্পষ্ট প্রমাণ পায়নি। শুধু কথার উপর দাঁড়িয়ে ছিল তার সমস্ত পথচলা। কিন্তু এবার প্রমাণ ছাড়া আর এক পা-ও এগোবে না। যতক্ষণ না সত্যিটা নিজের চোখে দেখছে, ততক্ষণ আর কিছুই করবে না। নিজের সিদ্ধান্ত এবার সে নিজেই নেবে।
ম্যানশনের সামনে গাড়ি থামে। এতটুকু সময়ে তাদের মধ্যে আর কোনো কথা হয়নি। তায়ান গাড়ি থেকে নেমে সোজা ভেতরে চলে যায়। রিকার্ডোও নেমে আসে। লিভিং রুমে ঢুকতেই এলেনা সামনে পড়ে।
_“ কোথায় গিয়েছিলি?” তায়ানকে দেখে বলল এলেনা।
তায়ান থামল না। কাঁধের ওপর দিয়ে শীতল স্বরে বলল,
_“ তোর না জানলেও চলবে।”
পেছন থেকে রিকার্ডোর গলা ভেসে এলো।
_“ ও এতক্ষণ আমার সঙ্গে ছিল। তুমি এত সকালেই কোথায় যাচ্ছ সেটা বলো।”
এলেনা এবার বাবার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। তার গায়ে টেক্সটাইল রাইডিং জ্যাকেট
_“ ক্লাবে যাচ্ছি,সামনের মাসে আমাকে ফ্রান্সে যেতে হবে। এবারের ফাইনাল কম্পিটেশন প্যারিসে হবে।”
_“ একা যাচ্ছো?”
_“ রিকো যাবে।”
_“ তায়ানকে জানিয়েছ?”
_“ জানিয়ে লাভ কী? ও যাবে না।”
_“ ও যাবে। আমি পাঠাবো।” বলেই রিকার্ডো নিজের রুমে চলে গেল।
___
গালে, মুখে ছোট ছোট হাতের স্পর্শ পেতেই শান্তর ঘুম ভেঙে গেল। আরাফ শান্তর বেডের এক পাশে বসে,অবুঝ ভঙ্গিতে শান্তর গালে ও মাথায় থাকা ব্যান্ডিজে ছোট ছোট থাপ্পড় একে দিচ্ছে। যেন ঘুম থেকে উঠে পড়ে। শান্ত একটু বিরক্ত হয়েই চোখ মেলে,তবে পাশে আরাফকে দেখে অবাক হয়। ছয় দিন পর সে দেখল ছেলেটাকে। এতদিন তাকে ICUতেই রাখা হয়েছিল। কাল রাতে কেবিনে শিফট হয়েছে। চোখ খুলেই আরাফকে দেখতে পাবে ভাবেইনি শান্ত। তাই একটু চোখে অবাক ভাব,আর ঠোঁটে নরম হাসি ঝুলিয়ে বলল,
_“ আরাফ সোনা! কাছে আসো।”
শান্তকে চোখ মেলতে দেখেই আরাফের মুখ জ্বলজ্বল করে উঠলো। হেঁসে বলল,
_“ পাপা!” বলেই শান্তর বুকের উপর শুয়ে জড়িয়ে ধরল। শান্ত ধীরে ধীরে দু'হাতে আরাফকে আগলে নিলো।
_“ তুমি কী পাপাকে মিস করেছ?”
আরাফ মাথা নাড়াল। তারপর নিজের ছোট্ট হাত দিয়ে শান্তর গাল ছুঁয়ে বলল,
_“পাপা, ব্যাথা?”
শান্ত একটু হেঁসে বলল,
_“ না সোনা…এখন আর ব্যথা নেই। তুমি আছো না?”
আরাফ একবার গালে হাত বোলাচ্ছে,আবার এসে শান্তর বুকের উপর ঝুঁকে পড়ছে। শান্ত তার ছোট্ট পিঠে হাত রাখল। বুকের ভেতর অদ্ভুত শান্তি নামছে। তারপর তার দৃষ্টি কেবিনের চারপাশে ঘুরল।
কেবিনের ভেতর অনুভাকে না দেখতে পেয়ে বলল,
_“ তোমার মা কোথায়?”
আরাফ কয়েক মুহুর্ত চুপ থেকে বলল,
_“ মা..আছেনি।”
শান্ত হতবাক হয়ে বুকের উপর থাকা আরাফের দিকে তাকাল।
_“ তাহলে তুমি এলে কি-করে?”
আরাফ নির্ভীক স্বরে বলল,
_“একা এছেছি।”
শান্ত হালকা কঠোর গলায় বলল,
_“আরাফ! তোমাকে না বলেছি, মিথ্যে কথা বলতে হয় না?”
শান্তর কথা শুনে আরাফ ঠোঁট ফুলিয়ে ফেলল।
_“মিথ্যা না… আমি একা এছেছি।”
শান্ত ভ্রু তুলল।
_“কীভাবে এলে?”
আরাফ আঙুল তুলে দরজার দিকে দেখাল।
_“ একান দিয়ে।”
তার সেই নির্ভীক, সরল উত্তর শুনে এক মুহূর্ত চুপ করে রইল শান্ত। তারপর কপালে হাত ঠেকিয়ে হালকা চাপড়াল।
_“ইয়া আল্লাহ…!”
ঠোঁটের কোণে ক্লান্ত হাসি ফুটে উঠল। শান্ত গভীর নিঃশ্বাস ফেলল, তারপর আরাফকে কাছে টেনে নিয়ে নরম গলায় বলল,
_“দুষ্টু একটা।”
আরাফ কিছুই না বুঝে বাবার গালে চুমু দিল। অনুভা হাতে কিছু খাবারের ব্যাগ নিয়ে রুমে ঢুকল। শান্তকে জেগে থাকতে দেখে বলল,
_“ যা ভেবেছিলাম! বারবার বলে গিয়েছি চুপচাপ বসে থাকবে। পাপাকে ডিস্টার্ব করবে না।”
ব্যাগগুলো টেবিলে রেখে এগিয়ে এসে আরাফকে শান্তর বুক থেকে আলতো টেনে নামাল।
_“ তোমার কী ভালো হতে ইচ্ছা করে না?” একটু ধমকের স্বরেই বলল।
আরাফ অসহায় দৃষ্টিতে শান্তর দিকে তাকাল। যেন শান্ত আরাফকে বকার দায়ে মায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। শান্ত সেটাই করল। মুখে মিছে রাগ ফুটিয়ে বলল,
_“ তুমি আরাফকে বকবে না। ও আমাকে জাগায়নি, নিজে থেকেই ঘুম ভেঙে গেছে। আর এখন দুপুর হয়ে যাচ্ছে আর কত ঘুমাব?”
_“ আপনি বললেই হলো? ও চুপচাপ বসে থাকার ছেলে?”
শান্ত হালকা হেসে বলল,
_“ও যদি ঘুম ভাঙিয়েও থাকে তাহলে একদম ঠিক করেছে।”
অনুভা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। এই মানুষটা কয়েকদিন আগেও মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিল,আর এখন ছেলের পক্ষ নিয়ে তর্ক করছে। সে ব্যাগ গুলো থেকে খাবার বের করতে করতে বলল,
_“ আচ্ছা, এখন খাবার গুলো খেয়ে ঔষধ খেয়ে নিন।”
_“ এখন না। খেতে ইচ্ছা করছে না।”
_“ কেন? ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ে তো একদম ঠিক করেছে,এখন খাবার খান।”
শান্ত আরাফের দিকে অসহায় দৃষ্টি ফেলে বলল,
_“ আরাফ! তুমি একদম ঠিক করোনি।”
তারপর ধীরে ধীরে উঠে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিলো। খাওয়া শেষ হওয়ার পর অনুভা ঔষধ বের করে এগিয়ে দিলো।
_“ আজকে রিলিজ দিবে আপনাকে। কিন্তু বাসায় রেস্টে থাকতে হবে কিছুদিন।”
_“ ভাবলাম আজকে বাইক রাইড কম্পিটিশনে তোমার সঙ্গে যাবো।”
অনুভা বিস্মিত কন্ঠে বলল,
_“ আপনার মনে আছে?”
শান্ত মৃদু হেঁসে বলল,
_“ আমার সব মনে থাকে, মাহভিন!”
_“সামনের মাসে প্যারিসে ফাইনাল কম্পিটিশন। তুমি সেখানেও যাবে।”
_“ আমি এখান থেকে কোথাও যাচ্ছি না।” অনুভা দৃঢ় গলায় বলল।
_“ জেদ করলে হবে না তোমাকে যেতেই হবে।” শান্তও নিজের সিদ্ধান্তে অনড়।
বিকেলে শান্ত আর আরাফকে বাসায় রেখে অনুভা ক্লাবে চলে যায়। শান্ত সঙ্গে আসতে চেয়েছিল কিন্তু অনুভা কোনোভাবেই রাজি হয়নি।
হাইওয়ের ওপর দিয়ে বাইক ছুটছে দ্রুত গতিতে। অনুভার দৃষ্টি স্থির সামনের রাস্তায়। হেলমেট পরা থাকায় তার চোখ-মুখের কোনো অভিব্যক্তিই বোঝা যাচ্ছে না। শুধু দৃঢ়তা বোঝা যাচ্ছে চালানোর ভঙ্গিতে। ক্লাবের সামনে এসে বাইক থামাতেই সে ধীরে ধীরে হেলমেট খুলে ফেলল। মাথার পেছনে মাঝ বরাবর ঝুঁটি করে বাঁধা চুলগুলো একটু এলোমেলো হয়ে কাঁধ ছুঁয়ে নেমেছে। অনুভা বেশিরভাগ সময়ই রাউন্ড মিডি ড্রেস পরে,আজও তার ব্যতিক্রম নয়
ক্লাবের ভেতর ঢুকেই প্রথমে ছোট্ট ক্যাফে কর্নারে বসে ব্লাক কফি অর্ডার কয়ে। তারপর হাতের গ্রাভস গুলো পড়ে নেয়। এখানে অনুভার কয়েকজন নতুন মেয়ে বন্ধু হয়েছে,তাদের সঙ্গে টুকটাক কথা বলছে।
অনুভা ধোঁয়া ওঠা কফিতে চুমুক বসাবে সেই সময় এই ক্লাবের সেফটি অফিসার এসে ইংলিশে বলল,
_“ এই সময় কফি না খেলেই ভালো হয়। যদি পেটের ভেতর কোনো সমস্যা হয়,তাহলে রাইড করার সময় ঝামেলায় পড়তে পারো।” অফিসারের কথায় অনুভার সঙ্গে থাকা কয়েকজন মেয়ে হেঁসে উঠল। অনুভাও বিরক্ত হলো। এই সেফটি অফিসার সব সময় অনুভার প্রতি বেশি কনসার্ন থাকে। যা অনুভার একদম পছন্দ নয়।
অনুভা কফির মগ টেবিলে রেখে বলল,
_“ কিছু হবে না। আপনি বেশি চিন্তা করছেন।”
বলার সঙ্গে সঙ্গেই লোকটা কফিতে থাকা হাজারটা খারাপ গুন তুলে ধরল। অনুভা মুখে কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে শুনল। আজ নতুন না। এই লোক সব সময় এমন করে। কেন এই নিরন্তর সতর্কতা দেখায়, সেটা অনুভার বুঝতে বাকি নেই। সব সময় বাকিদের থেকে অনুভার দিকে একটু বেশিই খেয়াল রাখে। প্রথম প্রথম স্বাভাবিক ভাবে নিলেও এখন আর সম্ভব নয়। এই লোক নিজের সীমা অতিক্রম করে ফেলছে। লোকটার বলতে থাকা কথা থামিয়ে অনুভা বলল,
_“ ঠিকাছে, স্যার! আমি খাবো না কফি। আমি বুঝতে পেরেছি আপনি চান না অসময়ে এটা খেয়ে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি।” যদিও অনুভার যেকোনো সময়ে কফি খাওয়ার অভ্যাস আছে,তবু বলল। তারপর টেবিলের উপর দু'হাতের পিঠে থুতনি রেখে বলল,
_“ ধন্যবাদ আমার এতো খেয়াল রাখার জন্য। সত্যিই আমি কৃতজ্ঞ!”
সেফটি অফিসার লজ্জা পাওয়ার ভঙ্গিতে হাসল। অনুভা আবারও বলল,
_“ আপনি আমার এতো খেয়াল রাখেন,আপনাকে সত্যিই আমার বন্ধু ভাবা উচিৎ। এমন বন্ধু যাকে সব বলা যায়।” শেষের কথা অনুভা একটু নিচু আওয়াজে বলল। সেটা শুনে লোকটা নড়েচড়ে বসল। নিজের চুল গুলোয় হাত দিয়ে ঠিকঠাক করল।
_“ সে হিসেবে আমিও আপনাকে সব বলতে চাই। আই মিন,আই হ্যাভ সিক্রেট টু টেল ইউ।”
লোকটা অধৈর্য গলায় বলল,
_“ প্লিজ বলো। আমি তো এই অপেক্ষাতেই ছিলাম।”
_“ আই’ম আ মাম্মি!” অনুভার কথায় লোকটা থমকে গেল। স্থির চোখে তাকিয়ে থেকে বলল,
_“ I don't understand.”
_“ আই’ম আ মাম্মি। আই হ্যাভ আ বেবি বয়।” অনুভার ঠোঁটে গৌরবের হাসি। এদিকে সেফটি অফিসারের মুখে অন্ধকার নেমে এলো। স্তব্ধ খেয়ে বলল,
_“ আর ইউ কিডিং উইদ মি?”
অনুভা ফোন বের করে আরাফ আর নিজের ছবি দেখাল। লোকটার মুখটা আরও ফ্যাকাসে হয়ে গেল। একটু আগের সেই আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি মিলিয়ে গিয়ে সেখানে ভেসে উঠল অস্বস্তি আর অপ্রস্তুত লজ্জা। আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েগুলো সেফটি অফিসারের এমন মুখভঙ্গি দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারল না,হো হো করে হেসে উঠল সবাই।
অনুভা ঠোঁটের কোণে হালকা একরকম হাসি টেনে ফোনটা ব্যাগে রেখে দিল। আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে রইল না। সময় হয়ে গেছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই রেসিং ইভেন্ট শুরু হবে।
কম্পিটিশনের জন্য ক্লাব থেকে আলাদা স্পোর্টস বাইক দেওয়া হয়। চকচকে কালো-লাল রঙের বাইকটা আগুনের মতো ঝলমল করছে। হেলমেটটা শক্ত করে বাঁধল। চুলগুলো হেলমেটের ভেতরে গুছিয়ে নিয়ে বাইকের উপর বসল। ইঞ্জিন স্টার্ট হতেই গর্জে উঠল চারপাশ। এখন শুধু ছুটে যাওয়ার অপেক্ষায়।
স্টার্টিং লাইনে সারি করে দাঁড়িয়ে আছে আরও কয়েকজন রাইডার। সবার চোখ সামনে, শরীর সামান্য ঝুঁকে, আঙুল ব্রেক আর ক্লাচে প্রস্তুত। সিগ্যাল নামতেই গর্জন তুলে ছুটে গেল সব গুলো বাইক।
অনুভা প্রথমেই শরীরটা সামনে ঝুঁকিয়ে দিল, বাতাস চিরে এগিয়ে যাচ্ছে সে। স্পিডোমিটারের কাঁটা দ্রুত ওপরে উঠছে। প্রথম বাঁকটা আসতেই ব্রেক আর ক্লাচের নিখুঁত সমন্বয়ে শরীর কাত করে বাইকটা ঘুরিয়ে নিল। চাকার সাথে রাস্তায় ঘর্ষণের শব্দ উঠলেও,নিয়ন্ত্রণ একটুও হারাল না। পেছন থেকে দুটো বাইক ওভারটেক করার চেষ্টা করল। অনুভা চোখের কোণ দিয়ে দেখে, ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটল। সামান্য ইঞ্জিন চাপ বাড়িয়ে সোজা স্ট্রেচে গতি তুলল আরও। বাতাসের চাপ গায়ে লাগছে, তার দৃষ্টি স্থির,ফিনিশ লাইনের দিকে। প্রত্যেকেই সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছে। কয়েকটা বাইক অনুভাকে ওভারটেক করে সামনে এগিয়ে যায়। অনুভা ইঞ্জিনের গতি আরও বাড়ায়। সব মিলিয়ে অনুভা ফিনিশ লাইনের দিকে ছুটল।
চূড়ান্ত স্পিডে পৌঁছে বাইকটা সামনে গেল, আর চোখে ঝলক মুদ্রিত হলো একরকম জয়ের আনন্দ। এভাবে আজকের রেসটাও সেই জিতল।
ক্লাব থেকে বের হতে সন্ধা হলো। অনুভা অ্যাপার্টমেন্টে যাওয়ার আগে বাইক থামিয়ে গ্যাস ভরানোর জন্য পাম্পের সামনে দাঁড়াল। মোটামুটি ভির থাকায় হেলমেট খুলে ফেলে। দীর্ঘ সময় রাইড করার কারণে তৃষ্ণা পেয়ে যায়, তাই একটা পানির বোতল কিনে আনে। এমনিতেও ক্লাবে তখন কফি খেতে নিয়েও সেই লোকের জন্য আর খাওয়া হয়নি।
অনুভা বোতলের ক্যাপ খুলে পানি মুখে দিবে,ঠিক সেই সময় কেই এসে শক্ত করে ওর হাতের কব্জি চে'পে ধরে। অনুভার কপাল কুঁচকে যায়,শরীর অবলীলায় সঙ্কুচিত হল। তাড়াহুড়ো নয়, খুব ধীরেই পাশ ফিরে তাকায়। কিন্তু আগন্তুকের মুখ দেখতেই অনুভার মুখের রঙ বদলে লাল হয়ে ওঠে। হাত থেকে আপনা-আপনি পানির বোতল পড়ে যায়। পানি ছিটকে ওঠে। এতগুলো দিন পর সামনে থাকা লোকটার মুখের সেই চিরচেনা শয়তানি হাসি দেখে অনুভার সর্বাঙ্গে বিদ্যুৎ ঝলক মারল। তবে ভরকে ওঠার পরও সেটা প্রকাশ করল না।