রক্ত রেখার আড়ালে

পর্ব - ৩৭

🟢

_“ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বেঈমান মানুষটা কে জানো মা?”

প্রশ্নটা করেই থেমে যায় অনুভা। কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে নিজেই বলে ওঠে,

_“তুমি। তোমার জন্য আজ আমার সঙ্গে এত কিছু হয়েছে। তোমার জন্যেই আমি এত অসহায়। কি দরকার ছিল আমাকে রেখে ম’রে যাওয়ার? এটা কোনো জীবন হলো?” অপর প্রান্ত থেকে কোনো জবাব আসে না। আসার কথাও নয়। তবুও অনুভা যেন উত্তর আশা করেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর হঠাৎ করেই কবরটার মাঝখানের মাটি দু’হাতে খামচে ধরে।

_“ আমি এই বয়সেই আমার জীবন নিয়ে বিরক্ত হয়ে গেছি মা। তুমি এসে আমায় নিয়ে যাও।”

চারপাশে টাইলস দিয়ে বাঁধানো সেই কবরের এক পাশে বসে এসব বলছিল অনুভা। তার চোখে একফোঁটা জলও নেই। শুধু নিজের ভেতরে জমে থাকা আক্ষেপগুলো একের পর এক মায়ের কাছে উজাড় করে দিচ্ছিল।

_“ আমার এমন বিষাধ জীবনে কেন আমার ছেলেকে আনা হলো মা? আমি…আমি এখন ওকে নিয়ে কোথায় যাবো? কোথায় গেলে একটু শান্তিতে বাচঁতে পারব, বলো।”

অনুভার আজ এখানে বসে এগুলো বলতে হতো না। যদি না তার বড় আব্বু এভাবে চলে না যেত। এখানে যার ছায়ায় সে শেষবারের মতো একটু ভরসা পাবে, যার কাছে নিজের ভাঙা মনটা নির্ভয়ে মেলে ধরতে পারবে বলে এসেছিল, সেই মানুষটিই আজ সাত দিন হলো তাকে ফেলে চিরতরে চলে গেছে। না জানি কতটা অভিমান জমে ছিল তার বুকের ভেতর! কিন্তু অনুভা তো সেদিন নিজের ইচ্ছায় এই বাড়ি ছাড়েনি। তাকে যেতে হয়েছিল বাধ্য হয়ে। তার বড় আব্বুই বলেছিল চলে যেতে। আর সেই সিদ্ধান্তের কারণ ছিল তার বাবা। কিন্তু তার বড় আব্বু ভাবেনি অনুভা একেবারের জন্য চলে যাবে। আর ফিরবেও তার সমাপ্তির পর।

অন্ধকারে ডুবে থাকা সেই নির্জন কবরস্থানের এক কোণে বসে অনুভা গত সাত দিনের ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো স্মৃতিচারণ করল।

সেদিন আরমান সাহেবকে নিয়ে যাওয়ার পর সন্ধায় বাড়ির সবাই থমথমে ভাব নিয়ে বসেছিল। বাড়ির ছেলেরা তখনও ফেরেনি। অনুভার নানার সেই বিশার পুরোনো বাড়িটা সেদিন কেমন ভার হয়েছিল। অনুভা আমিরা বেগমের কাধে মাথা রেখে চুপচাপ বসেছিল। নাফিসা বেগম, উর্মিলা বেগম নিজেদের বাপের বাড়ির লোকজনদের সঙ্গে টুকিটাকি কথায় ব্যস্ত। শান্ত তখন আরাফকে নিয়ে বাহির থেকে বাড়ি ফেরে। দুপুরের সেই ভারী, আতঙ্কময় পরিবেশ আরাফের ছোট্ট মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিল। তাই শান্ত তাকে নিয়ে সন্ধ্যার আগে বাড়িতে ফেরেনি বাচ্চাটাকে কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার জন্য পার্কের দিকে চলে গিয়েছিল। ড্রইংরুমে পা রাখতেই সবার দৃষ্টি একসাথে তাদের দিকে ঘুরে গেল। আমিরা বেগম, নাফিসা বেগম, উর্মিলা বেগম তিনজনই কিছুটা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন। এই ছেলেটাকেই তো তারা আজ দুপুরে অনুভার সঙ্গে আসতে দেখেছে। আমিরা বেগমের চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় ভেসে উঠলেও, তার মলিন মুখে কোনো প্রকাশ ঘটল না। শোক যেন তার সব অভিব্যক্তিকে স্তব্ধ করে দিয়েছে একদম।

এদিকে, শান্তর কোলে আরাফকে দেখামাত্রই অলি আর নিজেকে সামলাতে না পেরে দৌড়ে এসে প্রায় ছিনিয়েই নিল তাকে কোলে।

শান্তর সঙ্গেও একটু হেঁসে দৃষ্টি বিনিময় করল। এক দেখাতেই চিনে ফেলেছে তার সেই তুলতুলে, ছোট্ট বাবুটাকে। কিন্তু আরাফ অচেনা মুখ, অচেনা স্পর্শে ভয়ে চমকে উঠে। মুহূর্তের মধ্যেই তার ছোট্ট মুখটা কুঁচকে গেল,এবং তখনই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।

উপস্থিত সবাই খানিকটা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সেদিকে। এর মধ্যেই শান্ত অনুভার উদ্দ্যেশে ধীর গলায় বলল,

_“ ওকে কিছু খাওয়ানোর ব্যবস্থা করো। বাহিরে হালকা কিছু খাইয়েছিলাম শুধু।”

নাফিসা বেগমের চোখ দুটো বড় হয়ে গেল। তার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। সে এগিয়ে গিয়ে অলিকে বলল,

_“ এই বাচ্চা আর এই ছেলে কে? তুই ওদের চিনিস?”

অলি নাফিসা বেগমের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে বলল,

_“ অনু আপার ছেলে এটা।”

নাফিসা বেগম বিস্ময়ে হা হয়ে গেল। শান্তর দিকে ভালো ভাবে নজর দিয়ে বলল,

_“ বাহ! বেশ তো, তুমি দেখি একেবারে তৈরি সংসার নিয়ে হাজির! দু’দিনে ছেলে জুটিয়ে আবার বাচ্চাও জন্ম দিয়ে ফেলেছ?”

অনুভা শুনেও শুনল না। সে উঠে এসে অলির থেকে আরাফকে নিয়ে অলিকে বলল,

_“ ওর জন্য একটু খাবার বানাবি? আমার ব্যাগে দেখ সব রাখা আছে।”

অলি খুশি মনে উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে চলে গেল। উর্মিলা বেগমেরও ধারণা একই। এমন দৃশ্য দেখলে যে কেউ ভাববে বাচ্চাটা শান্ত এবং অনুভারই। কিন্তু এই মূহুর্তে অনুভাকে এসব নিয়ে প্রশ্ন করাটা বোকামি। সে শান্তর হাত ধরে টেনে এনে বলল,

_“ এখানে এসে বসো বাবা…সেই সকালে এসেছ, এত কিছুর ভিড়ে তোমার দিকেই খেয়াল করা হয়নি।”

শান্ত কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। এমন শোকের দিনে তাকে নিয়ে এত আনুষ্ঠানিকতার কোনো প্রয়োজন নেই । তবুও ভদ্রতা বজায় রেখে বলল,

_“আমাকে নিয়ে ভাববেন না… মাহভিন কী কিছু খেয়েছে?”

তার কণ্ঠ মৃদু হলেও, নিস্তব্ধ ঘরে তা স্পষ্ট শোনা গেল। উর্মিলা বেগম ধীরে ধীরে দু’পাশে মাথা নাড়লেন। শান্ত শুধু একবার তাকাল অনুভার দিকে। এখানে এত মানুষের মাঝে কিছু বলার ইচ্ছা হলেও বলল না। ছোটবেলা থেকেই ভিড়, মানুষের ভেতর নিজেকে গুটিয়ে রাখে সে। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। সে অনুভার কাছে গিয়ে নিচু স্বরে বলল,

_“ তোমরা এখানে থাকো আমি আসছি।”

_“ কোথায় যাবেন?”

_“ একটা হোটেল রুম নিয়ে নেব।”

তাদের কথা মাঝখানে নাফিসা বেগম বাম হাত ঢুকিয়ে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তির্যক হাসি নিয়ে বলল,

_“কেন…? বউয়ের ধারে কাছে থাকতে ইচ্ছা করে না নাকি?”

শান্ত মহিলাটার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। তারপর অনুভাকে বলতে শুনল,

_“ উনি আমার সৎ মা।” অনুভা কথাটা অনেক ভর দিয়ে বলল। যা শুনে শান্তর কুঁচকানো ভ্রু সমান হয়ে গেল। এই মহিলার থেকে এর চেয়ে ভালো কথা আশা করাও যায় না।

_“ হোটেলে থাকতে হবে না। এখানেই থাকবেন আপনি।” অনুভা নাফিসা বেগমের কথা এড়িয়ে যেতে চাইছে। তার এই মানুষটার সঙ্গে কথা বলার কোনো রুচিই নেই।

_“ তা তোর স্বামি কি জানে…তোর প্রথম স্বামি যে তোকে এক রাত ভোগ করেই ছেড়ে দিয়েছে?”

অনুভার বিপরীতে শান্ত কিছু বলার আগেই নাফিসা বেগম সকলের সামনে এমন একটা কথা বলে উঠলো। শান্তর হাত দুটো অজান্তেই মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠল , ভেতরে ভেতরে রাগে ফেটে পড়লেও বুঝতে দিলো না। কিন্ত অনুভা একেবারে শান্ত। যে তেমন কিছুই বলেনি। শান্তকে নিয়ে কার কী ধারণা। কে কি বলল। শান্ত আদৌতে তার কী হয় না হয় এসবের কোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করল না।

সে নাফিসা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,

_“ কেন, তাতে কি হয়েছে? আপনিও তো আমার বাবার দ্বিতীয় বউ। আমার বাবাও তো অন্য একজন নারীর স্পর্শ পেয়েছে… তবুও আপনি তাকে বিয়ে করেছেন। তাহলে সমস্যা কোথায়? নাকি স্পর্শ শুধু মেয়েদের জন্যই কলঙ্ক… আর ছেলেরা করলে সেটা স্বাভাবিক? মেয়েদের ক্ষেত্রেই শুধু এসবের হিসাব কষা হয়?”

অনুভা এই জটিল জিনিসটা সবার সামনে এত সহজ ভাবে বলে দিলো যেন কথা গুলো একটা আয়না, যেখানে নাফিসা বেগম নিজের মুখ দেখতে বাধ্য। নাফিসা বেগম ভেবেছিলেন, আজ সবার সামনে অনুভাকে একটু ছোট করবেন, জব্দ করবেন। কিন্তু পরিস্থিতি উল্টো ঘুরে গেছে। এখন তিনিই বাকরুদ্ধ। সহ্য হলো না বেশিক্ষন অনুভার কথা। হঠাৎ করেই ডান হাতটা তুলে নিলেন, সোজা অনুভার গালের দিকে। কিন্ত এর আগেই শান্ত মাঝপথে শক্ত করে চেপে ধরে তার হাত। ধরাটা এতটাই দৃঢ় ছিল যে নাফিসা বেগম নিজেও থমকে গেলেন। চোখ তুলে তাকালেন শান্তর দিকে। চোখে রাগ, আগুন, অপমানের প্রতিচ্ছবি। শান্তর ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটুখানি বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।

_“ যার দেহে অন্য পুরুষের স্পর্শ আছে দেখেও, আমি তাকে অসম্মান করতে পারিনি, তার গায়ে আঘাত করা এত সহজ?” শান্তর সেই শীতল কন্ঠের সঙ্গে তীক্ষ্ণ হাসিই নাফিসা বেগমকে বুঝিয়ে দিলো, শান্ত সব জেনেই অনুভার সঙ্গে আছে।

নাফিসা বেগমের মুখটা লাল হয়ে গেল অপমানে। নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,

_“ নিশ্চিত সম্পত্তির লোভ দেখিয়ে পটিয়েছে তোমায়।”

_“ সবাইকে নিজের মত ভাববেন না।” শান্ত বলল।

উর্মিলা বেগম নাফিসা বেগমকে থামালেন।

_“ থামুন আপনি! মেয়েটা এতগুলো দিন পর এসেছে। কোথায় খুশি হবেন তা না, পুরোনো কথা নিয়ে পড়ে আছেন।”

সেই মূহুর্তে অনুভার বাবা, আরিজসহ বাকি সবাই বাড়ি ফেরে। উর্মিলা বেগম নিজের বাপের বাড়ির লোকদের ইশারা করতেই তারা চলে যায়।

আরশাদ সাহেব ভেতরে ঢুকেই চারপাশে একবার তাকালেন। তার দৃষ্টি এসে থামল অনুভার কোলে থাকা ছোট্ট আরাফের ওপর। কপাল কুঁচকে এগিয়ে এলেন তিনি।

_"কে এটা?"

অনুভা একটুও বিচলিত হলো না। শান্ত, নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল,

_" দেখে বুঝতে পারছেন না?"

_" না পারছি না।"

_" ও আমার ছেলে।"

আরশাদ সাহেব এক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেলেন। তারপর ধীরে ধীরে তার দৃষ্টি ঘুরে গেল শান্তর দিকে। একটা হিসেবি, সন্দেহমিশ্রিত দৃষ্টি ফেলে বলল,

_"তুই...তুই সব সম্পত্তি ওর নামে দিয়ে দিয়েছিস?"

অনুভা বাবার কথায় অবাক হলো না একদমই । আজকে এমন একটা শোকের দিনেও যে আরশাদ সাহেবের সম্পত্তি নিয়ে চিন্তা থাকতে পারে সেটা খুব সহজেই মেনে নিলো অনু। কিন্তু উপস্থিত নাফিসা বেগম বাদে বাকিরা আশ্চর্য বনে গেছে।

শান্তর হাসি পাচ্ছিল এসব শুনে। ভাবতে কষ্ট হচ্ছে এটা মাহভিনের নিজের বাবা। এত বছর পর মেয়ে আর নাতিকে দেখল অথচ তার চিন্তা সম্পত্তি নিয়ে!

_" কি হলো চুপ করে আছিস কেন? কোথায় ছিলি এতদিন ,বল!"

আরশাদ সাহেব এবার উঁচু গলায় বলে উঠলেন।

অনুভা এসব কথা এড়িয়ে গিয়ে বলল,

_" ভদ্র ভাবে কথা বলুন। আমার ছেলে ভয় পাচ্ছে। আর ভদ্র ভাবে কথা না বলতে পারলে আমার সঙ্গে কথা বলবেন না।"

_"অনু! বেয়াদবের মত কথা বলবি না! দলিল গুলো কথায়?"

_" কিসের দলিল?"

_"তোর নানার রেখে যাওয়া সব।"

_" সেগুলো নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। সেগুলো আমার ছেলের ভবিষ্যৎ।"

_" কিসের ছেলে? চিনি না জানি না হুট করে একটা ছেলে এনে দাড় করাবি আর সব মেনে নেব?"

_" আপনার মেনে নেওয়া , না নেওয়াতে আমার কিছু যায় আসে না।"

_"অসভ্য মেয়ে! দে সেগুলো আমার কাছে।"

পরিস্থিতি ক্রমেই তপ্ত হয়ে উঠছিল। ঠিক তখনই শান্ত এগিয়ে এসে তাদের মাঝখানে দাঁড়াল।

_“আপনি কি বুঝতে পারছেন না, বাচ্চাটা আপনাকে ভয় পাচ্ছে?”

আরশাদ সাহেব চোখ রাঙিয়ে তাকালেন।

_“তুমি আমাদের মাঝখানে কথা বলবে না। সম্পত্তির আশায় আমার মেয়েকে বিয়ে করেছ, না?”

আরিজ আর নিজের মুখ বন্ধ রাখতে পারল না।

_" নিজেকে আর নিচে নামাবেন না, চাচ্চু! অনুভা কাওকে বিয়ে করেনি।”

এবার সবাই আরিজের দিকে তাকাল তার পরবর্তী বাক্য শোনার আশায়।

আমীরা বেগম এবার উঠে দাড়াল। মৃদু আওয়াজে বলল,

_" বাচ্চাটা কার?" আমীরা বেগম অদৃশ্য ভাবে দুপাশে মাথা নাড়াল। তার ভাবনা যেন সত্যি না হয়। কারণ অনেকক্ষণ ধরেই তার চোখ আটকে ছিল বাচ্চাটার পায়ের গোড়ালিতে। সেই ছোট্ট জন্মদাগে।

একই দাগ…তায়ানের পিঠে আছে। আরিজের হাঁটুতেও। দু’ভাই-ই পেয়েছে সেই দাগ তার থেকেই। কারণ আমিরা বেগমের নিজের শরীরেও আছে ঠিক এমনই এক চিহ্ন।

আরিজ ঠোঁট ভিজিয়ে নিল। গলার স্বরটা যেন কোথাও আটকে আছে। চোখ একবার অনুভার দিকে, তারপর আমিরা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,

_“এই বাচ্চা… তায়ান ভাইয়ের…”শেষ শব্দটা উচ্চারণ করতে গিয়ে তার গলা কেঁপে উঠল। যেন নিজের কাছেই স্বীকার করা কঠিন এই সত্য।

আমিরা বেগম প্রথমে কিছুই বললেন না। শব্দগুলো যেন তার কানে পৌঁছাতে বেশ সময় নিচ্ছে। ধীরে ধীরে তার চোখ স্থির হয়ে গেল আরাফের দিকে। ছোট্ট, ভীত, নিরপরাধ একটা শিশু। তারপর দৃষ্টি সরে এল অনুভার দিকে। মেয়ের মত বড় করা অনুভা, যে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে এখন, মাথা উঁচু, কিন্তু চোখের ভেতর জমে থাকা কত শত না বলা কথা। আমিরা বেগমের বুকের ভেতরটা যেন হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। তার দু’চোখ বেয়ে নিঃশব্দে জল গড়িয়ে পড়ল।

তিনি খেয়ালই করলেন না। কখন সেই জল তার গাল বেয়ে নিচে নেমে এসেছে। তার নিজের ছেলে… তায়ান…এই নির্দোষ, চুপচাপ মেয়েটাকে, যে কখনো কারও সামনে মাথা উঁচু করে কথা বলত না। তাকে এমন শাস্তি দিয়েছে? এত ছোট্ট একটা মেয়েকে এত বড় দায়িত্বের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। আমিরা বেগমের বুকের ভেতরটা মোচড় দিলো। তার দৃষ্টি আবার চলে গেল আরাফের দিকে। ছোট্ট পা… সেই একই জন্মদাগ। তিনি ধীরে ধীরে এক পা এগিয়ে এলেন। কিন্তু আবার থেমে গেলেন মাঝপথে। কী বলবেন? কীভাবে বলবেন? ক্ষমা চাইবেন? নাকি নিজের ছেলের জন্য লজ্জা পাবেন? তার চোখ আবার ভিজে উঠল। এবার আর থামাতে পারলেন না। মাথা নিচু হয়ে এল তার। আর ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়তে লাগল একজন মা…যার নিজের সন্তানই অন্য একজন নির্দোষ জীবনের ওপর এমন দাগ কেটে দিয়েছে। যেটা কোনোদিন মুছে ফেলার নয়।

_“ মা’রে, কেন ফিরে এলি? এগুলো শুনিয়ে আমাকে মে’রে ফেলার জন্য?” চোখ বেয়ে অঝোরে জল নামছে তার, বুকের ভেতরটা কাঁপছে অপরাধবোধে।

_“ তুমি কেন লজ্জিত হচ্ছো বড় আম্মু? অন্যের ভুলের জন্য নিজেকে ছোট কেন করছো?”

_“ কারণ ওই জা*নোয়ারটার মা আমি।”

_“ তুমি তো আমারও মা। মা নও আমার? তুমিই তো বলতে তোমার মেয়ে নেই, আমি তোমার মেয়ে। আমি এসব নিয়ে আর কষ্ট পাই না বড় আম্মু। যে যার কর্মফল পাবে… আমি সব ভুলে গেছি।” অনুভা বলল।

নাফিসা বেগম হঠাৎ করেই এগিয়ে এসে বিষাক্ত স্বরে বললেন,

_“একজনের বাচ্চা নিয়ে ঘুরছিস, আর আরেকজনকে পেছনে ঘোরাচ্ছিস! দুশ্চরিত্রা কোথাকার!”

কথাটা যেন ছুরি হয়ে বিঁধল শান্তর ভেতর। সে সরাসরি প্রতিবাদ করে বলল,

_“মুখ সামলে কথা বলবেন। ও কাউকে ঘোরাচ্ছে না। আমি সব জেনে-বুঝেই ওর পাশে আছি।”

আরশাদ সাহেব ঠান্ডা বিদ্রূপে হেসে উঠলেন

_“থাকবেই তো… সব ওই ওর সম্পত্তির আশায়।”

অলি এতক্ষন সব শুনছিল। সে আরাফের ফিডার বানিয়ে নিয়ে আসতে আসতে বলল,

_“শান্ত ভাইয়া আমাদের মতো ভিখারি না, চাচ্চু। খোঁজ নিয়ে দেখুন। উনার বাবা ফ্রান্সের একজন টপ ব্যবসায়ী।”

নাফিসা ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন,

_“তাহলে তো বলতে হয়, তোর বোন বড়লোক দেখে ঝুলে গেছে!”

এই কথাটা যেন শেষ সীমা ছুঁয়ে গেল। শান্ত এবার হাতটা উপরে তুলল। কিন্তু অনুভা সঙ্গে সঙ্গে এসে শান্তর হাত ধরে তাকে সামলানোর চেষ্টা করল। শান্ত অনুভার দিকে তাকিয়ে চোখে দপদপে রাগ নিয়ে বলল,

_“ এই রকম সুরক্ষার জন্য এসেছ তুমি?”

_“ আমরা আবারও চলে যাবো। আপনি উত্তেজিত হবেন না প্লিজ।”

শান্তকে থামানো গেলেও আমীরা বেগম থামলেন না। সে ঝড়ের বেগে গিয়ে নাফিসা বেগমের দু’গালে জোরে দু’টো চড় বসিয়ে দিলেন।

_“ অনেক্ষন ধরে সহ্য করছি! তোরা ভুলে গেছিস আজ এই বাড়ির একজন মানুষকে আমরা চিরদিনের জন্য হারিয়েছি। আর তোরা এখানে দাঁড়িয়ে নোংরা কথা বলে যাচ্ছিস! যাকে একটু আগেই মাটির নিচে রেখে আসা হয়েছে… তারই ভাই এখন সম্পত্তির লোভে নিজের মেয়েকে যা-তা বলে যাচ্ছে! মানুষ মরে গেল তোদের লোভ মরল না!”

সঙ্গে সঙ্গে অনুভাও তাদের দু’জনকে উদ্দেশ্য করে বলল,

_“ বেড়িয়ে যান আপনারা এই বাড়ি থেকে।”

_“ অনুভা, আমি তোর বাবা!”

_“ আমি বেড়িয়ে যেতে বলেছি।”

বিজ্ঞাপন

নাফিসা বেগম কিছু বলতে নিলেন। থাপ্পড় খেয়েও যেন মুখে কথা আটকাচ্ছে না। কিন্তু তার আগেই অনুভা চিৎকার করে বলল,

_“ বেড়িয়ে যেতে বলেছি! আপনারা এই মূহুর্তে বেড়িয়ে যাবেন।”

আরশাদ সাহেন যেন প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছে না নিজের মেয়ের এমন আচরণ। চোখ দুটো কুঁচকে গেছে, কপালে গভীর ভাঁজ। চোয়াল টানটান। কিছুক্ষণ স্তব্ধ দাঁড়িয়ে থাকলেন। সে কিছুতেই নিজের মেয়ের মুখ থেকে এই কথাটা হজম করতে পারছেন না। ক্ষোভ থাকলেও, পরিস্থিতিটা তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। সে নাফিসা বেগমকে নিয়ে চলে গেলেন। তারা অবশ্য এখানে থাকেও না। ভাইয়ের মৃ*ত্যূর খবর পেয়েই এসেছিল।

তাদের পেছন পেছন অনূভবও চলে যাচ্ছিল। অনুভা খুব নরম গলায় বলল,

_“ বোনের সঙ্গে থাকবি না?”

অনুভব পেছন ঘুরে তাকাল। বোনের চোখের দিকে তাকিয়ে দেখল অনুভার চোখ চিকচিক করছে। সে দৌড়ে এসে বোনকে জড়িয়ে ধরল।

_“ আমি তোমার সঙ্গেই থাকব আপু। আমাকে বের করে দিও না। আমার ওদের সঙ্গে থাকতে ভালো লাগে না।”

_“ আমাকে তোর এত খারাপ মনে হয়?”

_“ একদমই না। ওকে একটু নেই?” অনুভব আরাফের দিকে তাকিয়ে বলল।

অনুভা একটু হেঁসে আরাফকে অনুভবের দিকে এগিয়ে দিলো। কিন্তু বাচ্চাটা এবারও কান্নাকাটি শুরু করে দিলো। এমনিতেই এতক্ষনের চেঁচামেচিতে ভয়ে জমে আছে সে। অনুভবের কোলে কান্না করায় আমীরা বেগম এসে নিজের কাছে নিলো। তার দাড়িয়ে থাকার মত শক্তি নেই, তাই গিয়ে সোফায় বসলো। আরাফ বারবার মায়ের দিকে তাকাচ্ছিল। ছেলেটা যেন কান্না না করে তাই সেও আমীরা বেগমের কাছে গিয়ে বসল।

আমীরা বেগম ছোট্ট শরীরটাকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো। আজ তার স্বামী বেঁচে থাকলে কী করত সে? খুশি হতো ? নাকি আফসোস করত?

সে ছোট্ট মুখটায় হাত বুলিয়ে বলল,

_“ আমি তোমার কী হই? তোমার আমার কি পরিচয়? আমি তো আমার ছেলেকে নিজের বলে মানি না আর। তুমি আমাকে কখনো দাদু ডাকবে না। আমি তোমার নানু। বড় হয়ে তাই ডাকবে।” কান্নায় সেই শব্দ গুলো ফিসফিসে শোনাল।

——

দু’তিন দিন যেতেই তায়ান এসে হুট করেই সকালে উচ্চস্বরে একটা নাম বারবার অনবরত, অস্থিরভাবে ডাকতে থাকে।

_“ অনুভা! অনু!”

আমীরা বেগম বসার ঘরেই ছিলেন। নিজের ছেলেকে দেখেও তার মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া ফুটল না। না আনন্দ, না বিস্ময়। যেন সম্পর্কের বাঁধনগুলো বহু আগেই কোথাও ছিঁড়ে গেছে।

_“ কী চাই এখানে?”

তায়ান এক মুহূর্ত না ভেবে উত্তর দিল।

_“আমার বউ আর বাচ্চাকে চাই।”

আমিরা বেগম ঠোঁট শক্ত করে বললেন।

_“লজ্জা নেই তোর?”

তায়ান একটুও না কেঁপে, ঠান্ডা গলায় বলল,

_“তোমার মতোই আমি।”

আরাফ অলির কাছেই ছিল। সে চেঁচামেচি শুনে আরাফকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামছিল। ঠিক তখনই তায়ানের চোখ পড়ল আরাফের ওপর। এক মুহূর্ত দেরি না করে সে এগিয়ে গেল। ঝড়ের মতো, হনহনিয়ে এসে শিশুটাকে কোলে তুলে নিল। আরাফ এতটাই হঠাৎ ঘটনার শিকার হলো যে স্তব্ধ হয়ে গেল এক মুহূর্ত। তারপরই ভয়ে কেঁদে উঠল জোরে। তায়ান শিশুটাকে বুকে টেনে নিয়ে এক মুহূর্ত থামল। তারপর ধীরে, অদ্ভুত কোমলতায় তার গালে চুমু খেল।

_“কাঁদছো কেন তুমি? আমাকে ভয় পেও না… আমি… আমি তোমার বাবা।” তায়ান মাস্কটা খুলে ফেলল।

আরাফ তাকাল মানুষটার দিকে। হেঁচকি তুলছে তবু তার দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে। তায়ান নিজের মুখের কঠোরতা একটু ভেঙে দিল। হালকা, অস্থির এক হাসি ফুটে উঠল ঠোঁটের কোণে।

_“ বাবা বলে ডাকবে একবার?” কথাটা বলার সময় তার কণ্ঠ ভাঙা ভাঙা, অচেনা এক কাঁপুনিতে ভরে যায়। যেন নিজের কাছেই সে নিশ্চিত না এই অধিকারটা তার আছে কি না। তার ভেতরটা তখন অদ্ভুতভাবে কাঁপছে। এই বাচ্চাটার সামনে এলেই বুকের ভেতর কোথাও অচেনা একটা শূন্যতা আর টানাপোড়েন একসাথে ধাক্কা দেয়।

আরাফ ডাকল না। এখনও চোখে আতঙ্ক তার। তায়ান পকেট থেকে একটা ললিপপ বের করল। সেই ললিপপ নয় যেটা তায়ান খায়। এগুলো সে তার ছেলের জন্যই কিনেছিল। সে ললিপপটা আলতো করে আরাফের সামনে ধরল। কণ্ঠটা এবার আরও নরম, প্রায় ফিসফিসে।

_“এই নাও…এবার বাবা ডাকো…”

আরাফ প্রথমে ভয় পেতে পেতে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে ললিপপটার দিকে হাত বাড়াল। মুখে হালকা একরাশ নিষ্পাপ হাসি ফুটে উঠল। ভয়ের মাঝেও শিশুসুলভ এক কৌতূহল তার। তায়ান স্থির হয়ে গেল। সেই ছোট্ট, ভেজা,নিচের দু’টো দুধ দাঁত বের করা হাসি তার বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে অচেনা করে দিল। তার চোখ স্থির হয়ে রইল আরাফের মুখে। এর চেয়ে সুন্দর কিছু সে কখনো দেখেনি। আর হয়তো ভাবেওনি জীবন তাকে এমন একটা মুহূর্ত দেবে, যেখানে ভালোবাসা আর অপরাধবোধ একসাথে দাঁড়িয়ে থাকবে, একদম মুখোমুখি।

_“ বাবা হওয়ার যোগ্যতা রাখিস তুই?” আমীরা বেগম বলল।

_“ অবশ্যই রাখি। আমি আমার ছেলেকে, আমার মত, বাবাহীন বড় হতে দেব না।”

_“ আমিও আমার ছেলেকে আপনার ছায়ায় বড় হতে দেব না।” অনুভার কন্ঠস্বর পেয়ে তায়ান পেছন ঘুরে তাকাল। শান্ত আর অনুভা এক সঙ্গে দাড়ানো। তাদের হাতে নানা জিনিসপত্র। আরাফের জন্য কিছু জিনিস প্রয়োজন ছিল সেগুলোই কেনার জন্য গিয়েছিল তারা। ফিরে এসে বাহিরে গাড়ি আর গাড়ির ভেতর রিকোকে দেখেই হাত-পা অবশ হয়ে আসে অনুভার। হুড়মূড় করে ভেতরে এসেই দেখে তার ছেলে অমানুষটার কোলে।

তায়ান দু’জনের দিকেই তাকাল। একটু আগের কোমলতা চোখ থেকে হারিয়ে গেছে। কিন্তু সে তার ছেলের সামনে কোনো রকম ঝামেলা করতে চায় না।

_“ শুধু ও না। তোকেও আমার সঙ্গেই থাকতে হবে। আর এখন তোরা আমার সঙ্গেই যাবি। তোরা এখানে সেফ না, প্লিজ কথা শোন।”

অনুভা আজকাল অল্পতেই রেগে যায়। সে উচ্চস্বরে বলে ওঠে,

_“ একই কথা শুনতে শুনতে আমি বিরক্ত হয়ে গেছি। আপনার আজাব থেকে মুক্ত হতে আমি এখানে এসেছি। কেন বারবার আমার পিছু নিচ্ছেন? রেহাই দিন। মুক্তি চাই আপনার থেকে।”

তায়ান ওর ছেলেটাকে আরও দৃঢ় ভাবে আগলে নিলো। অনুভার কাছে গিয়ে তার বাহুতে ধরে শান্তর পাশ থেকে সরিয়ে আনল।

_“ তোর আর আমার মাঝখানে দেয়াল তোলার সাধ্য কোনো মানচিত্রের নেই, অনু! তুই ওপারে চলে গেলেও আমি ঠিক সেখানেই পৌছে যাবো। আর এক দেশ থেকে অন্য দেশে আসা তো স্রেফ সময়ের ব্যাপার।”

অনুভা সঙ্গে সঙ্গে ঝটকা মেরে তায়ানের হাত নিজের বাহু থেকে সরিয়ে দেয়।

_“ তাহলে আপনিও শুনে রাখুন, সৃষ্টিকর্তা ছাড়া এমন কোনো শক্তি নেই যে আমাকে আমার সিদ্ধান্ত থেকে সরাতে পারবে। আমার ঘৃণা আমার ভালোবাসার চেয়েও বেশি প্রবল। একবার মুখ ফিরিয়ে নিলে আমি আর সেদিকে ফিরে তাকাই না।”

অনুভার চোখ গুলো লাল হয়ে উঠেছিল তখন। সে আরও বলল,

_“ আপনার পথ আর আমার পথ এক না, আর এটা আলাদা করেছেন আপনি নিজেই। আপনি যতই জোর করুন না কেন, আমি আর সেই জায়গায় ফিরব না, যেখান থেকে আপনি নিজে আমাকে ছুড়ে ফেলেছিলেন।”

তায়ান কিছুই বলতে পারে না। তার কানে বাজতে থাকে অনুভার বলা সেদিনের সেই বাক্য, যেদিন অনুভা আহসানি বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গিয়েছিল,

‘ আমি আপনার জীবনের একমাত্র অধ্যায়, যেটা আপনি ইচ্ছে করেই অসম্পূর্ণ রেখে গেলেন। আর সেই অপূর্ণতার দায়ে একদিন আমার চেয়েও বেশি ছটফট করবেন।’

শান্ত একদম নিরব দর্শক আজ। তার যা বলার তা অনুভাই বলে দিয়েছে।

——

হঠাৎ করেই শরীরটা কেমন যেন ছমছম করে উঠলো অনুভার। চোখের পানি মুছে চারপাশে তাকাল। রাত ভালোই গভীর হয়েছে। এখন বাড়ি ফেরা উচিত। কবরস্থানটা খুব বেশি দূরে না তার নানার বাড়ি থেকে। তাই কাউকে কিছু না বলেই এসেছিল। শেষবার মায়ের থেকে বিদায় নিতে। এই কয়েকদিন তায়ানসহ তার বাবা দুজনেই এসে ঝামেলা করেছে। সেদিনের পর তার বাবা আরও অনেকবার এসেছে, এমনকি তার ছেলেটাকে মে’রে ফেলার হুমকিও দিয়েছে। তাই আবারও চলে যাবে। কিন্তু কোথায় যাবে? কোথায় গেলে তায়ানের থেকে নিস্তার পাবে?

_“ কোথায় যাবো আমি? কোথায় লুকাব আমার ছেলেটাকে নিয়ে? আমার পক্ষে আর সম্ভব না। যাই হয়ে যাক, ওই মানুষটার সঙ্গে বাঁচা সম্ভব না, মা।” অনুভা কবরের মাটিতে হাত ছোয়াল।

_“ আমার জন্য দোয়া করো, মা। আমি এবার আসি।”

অনুভা ধীরে ধীরে চারপাশে তাকাল। চোখের সামনে যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু সারি সারি কবর। বাতাসটাও যেন থম মেরে আছে। হঠাৎ করেই তার মনে হলো, কেউ যেন তাকিয়ে আছে তার দিকে। একটা কোথাও থেকে, খুব কাছ থেকে। তার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। পা দুটো যেন ভারী হয়ে মাটির সঙ্গে লেগে আছে, এগোতেই চাইছে না। শ্বাসটা আটকে আসছে ধীরে ধীরে। সে মোটেও ভুতের ভয় পাচ্ছে না, কিন্তু তার মনে হচ্ছে এখানে সে ছাড়াও কেউ আছে।

অনুভা ঠোঁট নেড়েনিঃশব্দে আল্লাহকে ডাকল। একটা গভীর শ্বাস নেয় সে। নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করে আবারও এগিয়ে যায়

মাটি যেন টেনে ধরছে তাকে বারবার। তবু থামে না, কারণ থেমে থাকা আরও ভয়ংকর।

হঠাৎ একদম হুট করেই পেছন থেকে কারও শক্ত হাত তার মুখ চেপে ধরল। এক টুকরো কাপড় ঝটকা মেরে জড়িয়ে গেল তার নাক-মুখে। অনুভা বুঝে ওঠার আগেই আটকে গেল নিঃশ্বাস। তীব্র এক গন্ধ ঢুকে পড়ল শ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করল তার। অনুভা ছটফট করে উঠল। দু’হাত দিয়ে সরানোর চেষ্টা করল সেই হাতটা, কিন্তু গ্রিপটা এতটাই শক্ত যে একচুলও নড়াতে পারল না। তার চোখ বড় বড় হয়ে উঠল আতঙ্কে। চারপাশের কবরগুলো যেন ঘুরতে শুরু করল। সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। সে কিছু বলতে চাইল, চিৎকার করতে চাইল। কিন্তু শব্দ বের হওয়ার আগেই রুমালটা আরও শক্ত করে চেপে ধরা হলো।

শরীরের শক্তি যেন মুহূর্তে ঝরে যেতে লাগল। পা দুটো ভেঙে পড়ল ধীরে ধীরে…শেষবারের মতো তার চোখ এদিক-ওদিক ছুটল কেউ নেই…তারপর সব অন্ধকার।

প্রায় কয়েক ঘন্টা পর অনুভা চোখ মেলতে সক্ষম হয়। চোখ মেলে তাকাতেই সামনে থাকা একজনকে দেখে আতকে ওঠে। একদম অচেনা একজন লোক। ফর্সা মধ্যবয়সি। দেখে মনে হচ্ছিল সে নিজের প্রতি ভীষন যত্নশীল। লোকটা চোখ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে আছে। সে চারপাশে তাকাল। কোনো পুরোনো গোডাউনের ভেতরে সে। আলো খুব মৃদু।

_“ কে আপনি?” অনুভা নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে বলল।

অনুভার কন্ঠস্বর পেয়ে লোকটা চোখ না খুলেই হাসে। তারপর ধীরে ধীরে চোখ মেলে।

_“ কী জিজ্ঞেস করলে?”

_“ কে… আপনি?” অনুভা ভেঙে ভেঙে উচ্চারণ করল।

_“ আমি তোমার না হওয়া শ্বশুর।” লোকটা বলল।

অনুভার ভ্রু কুঁচকে গেল।

_“ কী সব বলছেন? আর আমাকে এখানে কেন এনেছেন?”

_“ ঠিকি বলছি। তোমাকে আনব না? তুমি আমার সব প্লান, সব চাল নষ্ট করে দিচ্ছো!”

_“ ঘুরিয়ে না বলে স্পষ্ট করে বলুন।”

লোকটা পাশ ফিরে তাকাল। কাউকে ডাকল।

_“ নিয়ে আসো ওগুলো। তোমার কাজ আগে শেষ করি।”

অনুভা লোকটা দৃষ্টি অনুসরণ করে সেদিকে তাকায়। একজন মাঙ্কি টুপি পড়া লোক কয়েকটা কাগজ নিয়ে এগিয়ে আসে। চেয়ারে বসে থাকা লোকটার কাছে দেয়। লোকটা সময় নষ্ট না করে একটা কলম আর কাগজ গুলো এগিয়ে দেয়।

_“ সব গুলোতে সাইন করবে।”

অনুভার হৃদপিন্ড অস্বাভাবিক ভাবে লাফাচ্ছে। তবু যেন বুঝতে দিচ্ছে না। সে কাগজ গুলো হাতে নিলো। ভালোভাবে লক্ষ করে দেখল এগুলো তার সেই দলিলের কাগজ যা নেওয়ার জন্য তার বাবা এতদিন ধরে ঝামেলা করছে। কিন্তু তার বাবার তো ক্ষমতা নেই যে এগুলোর জন্য অনুভাবে অপহরণ করবে।

_“ কি হলো! সাইন করো।” লোকটা বলল।

_“ করব না। কী করবেন?”

_“ এটা দেখেছ?” লোকটা একটা কুড়াল তুলে ধরে বলল।

অনুভা হেঁসে বলল,

_“ আমি ভয় পাই না। নিজের পরিচয় দিন। কে আপনি?”

_“ তোমার কাছে আমার একটাই পরিচয়। আমি তোমার না হওয়া শ্বশুর।”

_“ আমি সাইন করব না। আপনার সঙ্গে আমার কোনো শত্রুতা আছে বলে মনে হয় না। যেতে দিন।”

_“ যেতে দিবো? তোমাকে? আগে সাইন করো তারপর ভেবে দেখব।”

_“ সরি, পারব না।”

অনুভার এড দৃঢ়তা দেখে চেয়ারে বসে থাকা লোকটা স্থির থাকলেও মাঙ্কিটুপি পড়া লোকটা থাকল না। সে এগিয়ে এসে অনুভার চুল মুঠো করে ধরে বলল,

_“ তাড়াতাড়ি সাইন কর, নাহলে এক কো’পে তোর গলা নামিয়ে দেব।”

অনুভার মাথাটা তখনও ভারী। চোখের সামনে সবকিছু কেমন ঝাপসা, তবুও লোকটার কণ্ঠস্বরটা তার কানে অদ্ভুতভাবে বাজতে লাগল। পরিচিত… খুবই পরিচিত। কিন্তু ঠিক কোথা থেকে সেটা ভাবার সুযোগই পেল না সে। গোডাউনের বিশাল লোহার দরজায় প্রচণ্ড শব্দ হলো। হকচকিয়ে ওঠে অনুভা। এমনভাবে কেউ ধাক্কা দিচ্ছে, যেন মুহূর্তের মধ্যেই সেটা ভেঙে পড়বে। ভেতরের সবাই থমকে গেল। দরজাটা সত্যিই ভেঙে গেল। লোহার পাত ছিটকে পড়ে ধুলোর ঝড় উঠল চারদিকে। সেই ধুলোর ভেতর দিয়েই দ্রুতগতিতে ভেতরে ঢুকল তায়ান। তার পাশে রিকো, আর পেছনে কালো পোশাকধারী কয়েকজন সশস্ত্র মানুষ। তায়ানের চোখ জ্বলছে। হাতে রিভলবার, সোজা তাক করা সামনে চেয়ারে বসে থাকা লোকটার দিকে।

_“কী ভেবেছ তুমি? আমার স্ত্রীকে এত সহজে আমার থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে?”

ডন রিকার্ডো চেয়ার থেকে উঠে দাড়াল।

_“ তায়ান! তুই এখানে?”

_“ শাট-আপ, ডন রিকার্ডো! কোন সাহসে ওকে এখানে এনেছ?”

রিকার্ডোর চোখে বিরক্তি ফুটে উঠল।

_“এখান থেকে চলে যা। ভুলে যাস না আমি কে।”

তায়ান এক পা এগিয়ে এল।

_“তুমি কে?”

ডন রিকার্ডো ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল।

_“আমি গ্যাংস্টারদের গ্যাংস্টার।”

তায়ান এবার চারপাশে তাকাল, তারপর ধীরে বলল,

_“তোমার টিম কোথায়?”

রিকার্ডোও তাকাল চারপাশে। তার চোখের সামনে যা দেখল, তা বিশ্বাস করার মতো না। তার নিজের লোকজন, সবাই তার দিকেই বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে আছে। তায়ান উচ্চস্বরে হেসে উঠল।

_“তোমার এত ক্ষমতা… এতদিন যা ছিল তা আমার জন্যই। সেটা হয়তো ভুলে গেছো।”

রিকার্ডোর চোখে এবার রাগ আর অবিশ্বাস মিশে গেল।

_“তায়ান! তুই কার সঙ্গে এভাবে কথা বলছিস? মনে করে দেখ আমি তোকে কীভাবে বড় করেছি!”

তায়ানের চোখে কোনো আবেগ নেই। গম্ভীর গলায় বলে,

_“পারব না। আমার কাছে আমার স্ত্রী আর সন্তান ছাড়া আর কিছুই গুরুত্বপূর্ণ না।”

_“নিজের বাবার খু*নির পরিবারের জন্য আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলছিস?”

_“হ্যাঁ, বলছি।”

এই বলে তায়ান হঠাৎ করে এগিয়ে গেল। মাঙ্কি ক্যাপ পরা লোকটার দিকে হাত বাড়িয়ে এক ঝটকায় টুপিটা খুলে ফেলল। যা দেখে অনুভার চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল। শ্বাস নিতেই ভুলে গেল মেয়েটা। ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে শব্দ বের হলো অস্পষ্ট স্বরে।

_“বা… বাবা…!”

বিজ্ঞাপন
রক্ত রেখার আড়ালে গল্পটি আয়েশা শেখ রিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে মোড়ানো থ্রিলার উপন্যাস