✦ রাইটার'স নোট ✦
সম্পূর্ণ গল্প কাল্পনিক। এই পর্বটাও কাল্পনিক হিসেবেই নেবেন। কোনো কিছুই বাস্তবের সঙ্গে মিল নেই। লেখিকা কোনো অশুভ শক্তিকে বিশ্বাস করে না।
কয়েকঘণ্টা পর ধীরে ধীরে চেতনার পর্দা সরিয়ে চোখ মেলে তাকাল তায়ান। কিন্তু এই জেগে ওঠাটাও মনে হচ্ছে গভীর অন্ধকারের ভেতর থেকে আধো-ঘুমন্ত কোনো আত্মা ভেসে ওঠছে। মাথাটা একদম সীসার মতো ভারী হয়ে আছে, ভেতর থেকে চাপ দিচ্ছে অসহ্য যন্ত্রণা। মনে হচ্ছে, মাথার খুলি ফেটে যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হবে। কপালের দু’পাশে ধুকপুক শব্দ, প্রতিটা স্পন্দনে যন্ত্রণার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে সারা শরীরে। সে চোখ মেলে তাকালেও দৃষ্টি যেন ঠিকভাবে কাজ করছে না। সবকিছু ঝাপসা, কুয়াশার চাদরে ঢাকা। কোথায় আছে সে? কীভাবে এলো এখানে?
কয়েক মিনিট পর তার চোখে ঝাপসা হয়ে ভেসে ওঠে বাড়ি থেকে বের হওয়ার ঘটনা। কেউ তাকে অপহরণ করে কোথাও একটা নিয়ে গিয়েছিল, মেরেছিল ইচ্ছেমতো। সেটা নিশ্চয়ই আরশাদের কাজ হবে। তারপর কেউ একজন এসে তাকে বাঁচিয়ে নেয়। কিন্তু কে সে? কেন তাকে বাঁচাল? আর এখন সে কোথায়?
হঠাৎ করে তার সামনে দিয়ে কিছু একটা ছায়ার মতো উড়ে গেল।
ভীষণ কাছ দিয়ে দ্রুত গতীতে চলে গেল জিনিসটা। বাতাস কেটে যাওয়ার একটা শীতল অনুভূতি গাল ছুঁয়ে গেল তার। তায়ানের শরীর কেঁপে উঠল। বুকের ভেতর ধড়ফড় শুরু হলো নতুন করে। ওটা কী ছিল? পাখি? না কি বাদুড়? নাকি… অন্য কিছু? অন্ধকার যেন হঠাৎ আরও ঘন হয়ে এল। চারপাশে আরও ঝাপটাঝাপটির শব্দ ভেসে উঠলো। এমন অন্ধকার জায়গায় বাদুড় ছাড়া আর কিছু থাকবে না।
_“ কেউ আছো? আমাকে এখান থেকে বের করো…” তায়ান চিৎকার করে ডাকল। এতে ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ আরও বেড়ে গেলো। হামাগুড়ি দিয়ে সামনের দিকে এগোতে চাইলেই গা শিউড়ে ওঠে তার। শুকনো হাড়ের মতো কিছুর উপর স্পর্শ লাগে।
তায়ান হাত সরিয়ে আনে দ্রুত। পাশে, সামনে… ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরও হাড়ের অস্তিত্ব রয়েছে, যেন অন্ধকারের ভেতর মাটি না, হাড়ের উপরেই সে ভর দিয়ে আছে।
_“ হাড়! কিসের হাড় এগুলো!” তায়ান নিজে মনেই ফিসফিস করে।
উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালায় সে। কিন্তু পা’দুটো ভেঙে আসে।
_“ মা! বাঁচাও আমাকে, প্লিজ!” তায়ান এবার কেঁদেই ফেলল। গায়ে একফোঁটা শক্তি নেই। মনে হচ্ছে, একটু নড়লেই শরীরটা ভেঙে গুঁড়িয়ে যাবে। পেটের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছে। এমন ক্ষুধা, যেন অনেকদিন কিছু খায়নি। অথচ… সে তো কালই বের হয়েছিল! তাহলে এত দুর্বল লাগছে কেন? শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বুকের ভেতরটা ফাঁপা লাগছে। ক্ষুদায় পেটটা পিঠের সঙ্গে লেগে যাবে মনে হচ্ছে। আর অনু…অনু কি তাকে খুজছে? খুঁজবে আদৌও? ঘুম থেকে উঠে যখন তায়ানকে দেখবে না তখন কি মন খারাপ হবে না মেয়েটার? যদি তায়ানকে না খুঁজে? যদি ভুলে যায়? তায়ানের বুকটা হঠাৎ কেমন করে উঠল। এই অন্ধকারের ভয় থেকেও যেন বেশি কষ্ট দিল এই চিন্তাটা। সে কেন আরশাদের কথায় বাড়ি থেকে চলে এলো! অনুকে ছাড়া তো তার একমুহূর্তও ভালো লাগে না।
বাদুড় গুলো বারবার তায়ানের আশপাশ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে তায়ানের শরীরে আঁচড় কেটে দিচ্ছে। তায়ান কাঁপতে কাঁপতে শরীরটা গুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। দু’হাত দিয়ে মাথা ঢাকার মতো করে বসে পড়ে সে, যেন নিজেকে যতটা সম্ভব ছোট করে ফেলতে পারলেই এই অন্ধকারের আঘাতগুলো থেকে বাঁচা যাবে।
হঠাৎ করেই দরজা খোলার মৃদু আওয়াজ ভেসে আসে। তায়ান হকচকিয়ে উঠে সামনে তাকায়। দরজার ফাঁক দিয়ে হালকা হলুদ আলো ঢুকল। সেই আলো অন্ধকার ভেদ করে ছড়িয়ে পড়তেই জায়গাটার একটা অংশ প্রথমবারের মতো স্পষ্ট হলো। ধুলোমাখা মেঝেতে অদ্ভুত কিছু চিহ্ন আঁকা। কালো রঙে আঁকা বৃত্ত, তার ভেতরে অচেনা প্রতীক। চারপাশে ছড়িয়ে আছে গলিত মোমবাতির অবশিষ্টাংশ, কিছু জায়গায় কালচে শুকনো দাগ, যা দেখে তায়ানের শরীর জমে ওটার উপক্রম। দরজার ওপাশে কয়েকটা ছায়া দাঁড়িয়ে আছে। মুখ স্পষ্ট নয়, শুধু গাঢ় কালো অবয়ব। তাদের মধ্যে একজন ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। তার পায়ের শব্দ প্রতিটা ধাপে ধাপে ঘরের ভেতর প্রতিধ্বনি তুলছে। তায়ান নিশ্বাস আটকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু লোকটা তায়ানের কাছে এলো না। ঘুরে চলে গেল আরেক পাশে। সেখানে থাকা একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে ঝুলন্ত জং ধরা ঘন্টা বাজালো।
এত ভয়ানক আওয়াজ সেটার! তায়ানের হৃদপিণ্ডটা এবার নিশ্চিত বের হয়ে যাবে। মোমের আলোতে আবছা আবছা দেখলো সামনে ভয়ানক এক শয়তানের প্রতিক। সেটার সামনে লোকটা মাথা নুইয়ে রাখলো এক মুহূর্ত।
_“ কে আপনি?”
তায়ান সাহস করে ডাকলো তাকে। মোমহাতে এবার তায়ানের দিকে এগিয়ে এসে তার কাছে বসলো। তায়ান অবাক চোখে দেখে তাকে। এত সূদর্শন যুবক সে খুব কমই দেখেছে। যেমন ফর্সা, তেমন মুখের ফেসকাট। বয়স ৩৮ বা ৩৯ হবে হয়তো। কোনো ভাবেই তাকে বাংলাদেশি মনে হচ্ছিল না তায়ানের। লোকটার সবকিছুই কেমন অদ্ভুত ভাবে নিখুঁত!
_“ কে আপনি?” তায়ান ফের প্রশ্ন করল।
_“ ঘুম ভেঙ্গেছে তোমার? সাতদিন হয়ে গেল! এত ঘুমাও কীভাবে? আমি তো চোখই বন্ধ করতে পারি না!” লোকটার কথায় তায়ান বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল,
_“ সাতদিন মানে? সাতদিন হয়ে গেছে মানে? কি বলছেন?” আকাশসম বিস্ময় তায়ানের কন্ঠে।
_“ মনে করে দেখো, সাতদিন আগে তোমাকে কিছু বাজে লোকদের থেকে বাঁচিয়ে এনেছি আমি।”
তায়ানের তো এটা আগেই মনে পড়েছে। তাই বলে সাতদিন? সাতদিন! সাতদিন ধরে তায়ান নিজ বাড়ি থেকে দূরে? সাতদিন ধরে সে অনুর থেকে দূরে? তাকে কি তার বাবা-মা খুঁজেনি?
_“ আমি বাড়ি ফিরব। আমাকে দিয়ে আসুন, প্লিজ।” তায়ান সেই সূদর্শন লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল।
_“ তোমার বাড়ি কোনটা?”
_“ যেখান থেকে আমি এসেছি।”
_“ তোমার বাড়ি সেটা নয়।”
_“ মানে, আপনি কে?”
লোকটা হাসলো।
_“ আমি তোমার না হওয়া বাবা।”
তায়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,
_“ বুঝলাম না।”
_“ বুঝতে হবে না।” সে একটা ছবির ফ্রেম তুলে ধরলো তায়ানের সামনে। যেখানে তিনজন যুবক কাধে কাধ মিলিয়ে হাসিমুখে দাড়িয়ে আছে। এদের তিনজনকেই তায়ান চেনে। একজন তার বাবা আরমান। যার রুমেও এই ছবি সে দেখেছিল।
_“ চেনো এদের?”
তায়ান উপর নিচ মাথা নেড়ে বলল,
_“ বাবা এবং তার বেস্টফ্রেন্ড।”
লোকটা দু’পাশে মাথা নাড়লো।
_“ উহু, তোমার বাবা এবং তার খুনি।”
_“ কিহ? বাবার খুনি হবে কীভাবে? আমার বাবা জীবিত!”
লোকটা প্রথম একজনকে দেখিয়ে বলল,
_“এটা মোস্তাফিজুর রহমান। তোমার বাবা।” মাঝের জন দেখিয়ে বলল,
_“ আরমান! তোমার বাবার খু’নি।” তারপর আরেকজনকে দেখিয়ে অদ্ভুত ভাবে বলল,
_“ সিরাজুল ইসলাম।” বলেই থেমে গেল।
তায়ান তাচ্ছিল্য হাসলো।
_“ আপনাকে নিশ্চয়ই আরশাদ এগুলো শিখিয়ে দিয়েছে? আমি এগুলো বিশ্বাস করি না। বাবার এই দুটো বন্ধু মা’রা গেছে। বাবা এখনও তাদের অনেক ভালোবাসে।”
_“ এটাই সত্যি, কারণ এই তিন নাম্বার বন্ধুটাই আমি।”
তায়ানের মুখের রঙ উড়ে গেল।
_“ কিহ!” তায়ানের বিশ্বাস হলো না। ফ্রেমে থাকা লোকটা তো কালো। কিন্তু সামনের জন ফর্সা।
_“ হ্যাঁ, এটাই আমি। বিশ্বাস হচ্ছে না?”
লোকটা বিভিন্ন ভাবে বিশ্বাস করালো সিরাজুল ইসলামই তিনি। এবং এটাও বিশ্বাস করালো তার জন্মদাতার খুনি তার বর্তমান বাবা আরমান সাহেব। তায়ান তবু শুনলো না। সে আরও প্রমাণ চাইলো। এতে লোকটা বলল,
_“ বাংলাদেশে চল, তোকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যাবো, যেখানে তোর বাবাকে খু’ন করা হয়েছে।”
_“ বাংলাদেশ মানে? আমরা তো বাংলাদেশেই আছি!”
_“ না, তুমি এখন আর্জেন্টিনায়, ডন রিকার্ডোর পরিত্যাক্ত গির্জায়।”
তায়ানের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল।
_“ আর্জেন্টিনা… আমি এখানে কি করে এলাম?”
_“ আমি এনেছি।”
_“ কিন্তু কেন?”
_“ আমার বন্ধুর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিবি তুই। তোকেই নিতে হবে, নিজের বাপের মৃত্যুর প্রতিশোধ। পারবি না?”
তায়ান চুপ করে তাকিয়ে রইলো। প্রথমে আরমান সাহেবের নিজের ভাই আরশাদও একই কথা বলেছে এখন আবার এই লোক। যে আরমান সাহেবের বেস্টফ্রেন্ড। বিশ্বাস না হলেও একেবারে অবিশ্বাস্যও না। কিন্তু আরমান সাহেব কিভাবে এমন একজন মানুষ হতে পারে?
_“ যদি আপনার কথা সত্য হয় তাহলে আমি অবশ্যই নিজের বাবার মৃত্যুই প্রতিশোধ নেব।” তারপর কিছু মনে করার মতো করে বলল,
_“ আর কি বললেন? ডন রিকার্ডোর পরিত্যাক্ত গির্জা মানে? কে সে?”
_“ আমি।”
তায়ান কপাল গোটালো। তারপর দু’হাতে মাথা চেপে ধরে বলল,
_“ উফফ! কি হচ্ছে এসব! আপনি তো সিরাজ, তাহলে এখন অন্য নাম কেন বলছেন?”
_“ বাংলাদেশে আমি সিরাজ ছিলাম। এখন আমি রিকার্ডো। ডন রিকার্ডো! কত বছর ধরে তোর অপেক্ষায় ছিলাম আমি জানিস?” লোকটা বলল। নিজের সিরাজ থেকে রিকার্ডো হওয়ার গল্প। আর্জেন্টিনার গ্যাংস্টার হয়ে ওঠার গল্প। নিজের ক্ষমতার কথাও বলল।
_“ অনেক বছর সময় লাগিয়ে নিজেকে গড়ে তুলেছি। এখন তোকে গড়ে তোলার সময়।”
_“ আমি এত ক্ষমতা কোথায় পাব?” প্রশ্ন করল তায়ান।
_“ আমি দেব। এই পরিত্যাক্ত গির্জা তোকে সেই ক্ষমতা দেবে।”
_“ অসম্ভব! আপনি এই জায়গাটাকে নোংরা করে ফেলেছেন। গির্জা মুসলিমের জন্য নিষিদ্ধ জায়গা, আর আপনি তো খ্রিস্টানদের জন্যেও অপবিত্র করে ফেলেছেন! প্রতিটা দেয়ালে শয়তানের প্রতিক!”
লোকটা উঠে দাঁড়ালো।
_“ কি করবি তুই সেই পবিত্রতা দিয়ে? যেটা তোর সব কে’ড়ে নিয়েছে? তোর পবিত্রতা তোকে এতদিন অন্ধ করে রেখেছিল। যেটা আমি খুলে দিচ্ছি। আগের সব ভুলে যা। আচ্ছা, তোকে দিয়ে এসব করিয়ে আমার কি লাভ? আমি শুধু চাই তুই আমার বন্ধুর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে আমাকে সাহায্য করিস। তোর কত ক্ষমতা লাগবে? এই গির্জা তোকে সব দেবে। কি চাস তুই? এখানে সব পাবি। এর বিনিময়ে তুই নিজেকে দিবি।”
তায়ান কিছুক্ষন একদম চুপ করে রইলো। সত্যিই যদি আরমান তার বাবাকে খু’ন করে তার মাকে বিয়ে করে থাকে। তাহলে সে সব করতে রাজি। তার কাছে আরমান সাহেবকে অবিশ্বাস করা যেমন কঠিন, এই লোকটার কথা অবিশ্বাস করাও ততটাই কঠিন। তার তো এখানে কোনো স্বার্থ নেই।
_“ আমি বাংলাদেশে যেতে চাই। দেখতে চাই আমার নিজের বাড়ি।”
_“ বেশ, চল।”
সেদিনের পর বাংলাদেশে ফিরে তায়ানের ভেতরের শেষ সন্দেহটুকুও ভেঙে গেল। রিকার্ডো মিথ্যে বলেনি। তার বাবা… তার পরিবার… সেদিন সত্যিই খুন হয়েছিল। সেই বাড়িতে কাজ করা পুরোনো কাজের লোকও একই কথা জানায়। তায়ান সেদিন রাগে ফেটে পড়েছিল। চোখ দুটো রাগে হিংস্র হয়ে উঠেছিল। তক্ষুনি যেতে চেয়েছিল আহসানি বাড়িতে। মে’রে ফেলতে চেয়েছিল আরমান সাহেবকে। কিন্তু রিকার্ডো সেটা হতে দেয়নি।
_“ মে’রে ফেললে তো ম’রেই গেল। এটা প্রতিশোধ না… এটা তো শুধু রাগ ঝাড়া। আমি কি মা’রতে পারতাম না? প্রতিশোধ, প্রতিশোধের মত করে নিতে হয়। প্রতিশোধ নিতে হলে… এমনভাবে নিবি, যাতে ও বেঁচে থেকেও মরে। ধ্বংস করে দিবি এই পরিবারকে। এখন ফিরে চল। সময় হলে আবার আসব।”
তায়ানের বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। কিছুটা শান্ত হয়ে মেনে নিলো রিকার্ডোর কথা। তারপর বলল,
_“ আমি একজনকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চাই।”
_“ কাকে?”
তায়ানের চোখে অনুভার মুখটা ভেসে উঠলো তখন। মেয়েটার নিষ্পাপ, স্নিগ্ধ হাসি মুখ।
_“ আমার অনুফুলকে।”
রিকার্ডো গভীর চোখে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
_“ সেটা কে?”
_“ জানিনা, আমি ওকে সঙ্গে নিতে চাই। ও এই বাড়িতে সেফ না। ওর বাবা ওকে মে’রে ফেলবে।”
_“ তোর বাবার খু’নির রক্তের প্রতি টান দেখাচ্ছিস? এতে তোর বাবার আত্মা কষ্ট পাচ্ছে সেটা বুঝতে পারছিস না?”
_“ জেসমিন মামুনির মেয়েও। আর জেসমিন মামুনি এই বাড়ির রক্ত নয়। আমি ওর ক্ষতি চাই না।”
_“ আচ্ছা, ওর কিচ্ছু হবে না। কিন্তু সঙ্গে নেওয়া সম্ভব না।”
_“ কিন্তু আরশাদ ওকে মে’রে ফেলবে।” তায়ান বলল।
_“ বললাম তো কিছু হবে না। এটা আমার উপর ছে’ড়ে দে।”
রিকার্ডোর কথা মেনে নিয়ে চলে যায় তায়ান। রিকার্ডোর কথায় বিশ্বাস রেখে তায়ান শেষ পর্যন্ত তার পথেই হাঁটল। অন্ধকার, নিষ্ঠুরতায় ভরা পথই বেছে নেয় সে। ধীরে ধীরে সে নিজেকেও সঁপে দিল সেই অজানা শক্তির কাছে, ঠিক রিকার্ডোর মতোই। একসময় যে ছেলেটার ভেতরে কোমলতা ছিল, মানবিকতা ছিল সে-ই পরিণত হয় হৃদয়হীন এক মানুষে। সময় তাকে বদলে দিল ভয়ংকরভাবে। সে কি করেনি? পাপ, নিষ্ঠুরতা, অন্যায়, জুলুম সবকিছুর সাথেই নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিল সে নির্দ্বিধায়। যেন তার ভেতরের মানুষটা ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে গেছে। কিন্তু তবুও… সবকিছুর পরেও, একটা জায়গায় সে থেমে গেছে বারবার। নিজেকে অন্য কোনো নারীর কাছে নিতে পারেনি কখনো। যতবারই সে সেই চেষ্টা করেছে, ঠিক ততবারই তার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে ছোট্ট অনুভার মুখ। নিষ্পাপ, শান্ত, একরাশ অদ্ভুত টানে ভরা সেই চেহারা। সেই স্মৃতিটুকু যেন তাকে আটকে দিয়েছে প্রতিবার, টেনে রেখেছে অদৃশ্য কোনো বন্ধনে। তায়ান নিজেকে বদলে ফেলেছিল, নিজের অস্তিত্বকেই নতুন করে গড়ে তুলেছিল অন্ধকারের ছাঁচে। তবুও দুটো জিনিস সে কখনো ছাড়তে পারেনি। এক, তার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন। আর দুই, অনুভা। অদ্ভুতভাবে, সব প্রতিকূলতা আর অন্ধকার পেরিয়ে সে নিজের স্বপ্নটাকে ছুঁয়েও ফেলেছিল। সাধারণ এক বাঙালি ছেলে হয়েও, নিজের জেদ আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে সে জায়গা করে নিয়েছিল আর্জেন্টিনার মতো দেশের ফুটবলের মঞ্চে।
তায়ানের সেই স্বপ্নপূরণটাও নিছক নিজের চেষ্টার ফল ছিল না। তার মনে দৃঢ়ভাবে রিকার্ডো গেঁথে দিয়েছিল এক অদ্ভুত ধারণা। অশুভ শক্তির সাথে চুক্তি মানুষ অসম্ভবকেও সম্ভব করতে পারে। রিকার্ডোর কথাগুলো যেন বিষের মতো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছিল তার ভেতরে। “ক্ষমতা চাইলে মূল্য দিতেই হয়” এই বিশ্বাসটাই একসময় তার সত্য হয়ে দাঁড়ায়। যখন সে খুব সহজেই আর্জেন্টিনার বিখ্যাত একজন ফুটবলার হয়। তায়ান সেই মূল্য দিতে দ্বিধা করেনি। এই শক্তি, এই সাফল্য, এই আর্জেন্টিনার মাটিতে নিজের জায়গা করে নেওয়া। সবই সেই অদৃশ্য অন্ধকারের দান। নিজের আত্মার বিনিময়ে সে কিনে নিয়েছে নিজের স্বপ্ন। কিন্তু সে বুঝতে পারেনি মানুষ নিজের ভেতরের আলোটা হারিয়ে ফেললে, তখন সে যত বড়ই হোক, তার জয়গুলোও কোথাও না কোথাও ফাঁপা থেকে যায়। তায়ানেরও বেলায়ও তেমনই হয়েছিল।
সব পেয়েও এক অদ্ভুদ শূন্যতা তাকে ঘিরে রাখত সর্বক্ষন। অনুভার শূন্যতা। দিনের বেলা খেলার মাঠ, রাতের বেলা রিকার্ডোর গ্যাংয়ের মিশন, এই দুইয়ের ভিড়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখত তায়ান। কিন্তু দিনের শেষে, যখন ক্লান্ত শরীরটা একটু আরামের আশায় চোখ বন্ধ করত, ঠিক তখনই ভেসে উঠত নিষ্পাপ, একরাশ মায়া জড়িয়ে থাকা সেই মুখটা। মনে পড়ে যেত, কীভাবে জন্মের প্রথম দিন থেকেই সে মেয়েটাকে আগলে রেখেছিল নিজের মতো করে। আমীরা এবং আরমান সাহেবের বেড রুমে তায়ানের থাকার জন্য আলাদা একটা ছোট্ট বিছানা ছিল। অনুভা যখন নানুবাড়ি ছাড়া আহসানি বাড়িতে থাকত, তখন মেয়েটার ঘুম আরমান সাহেবের রুমে তায়ানের পাশেই হতো। আরিজ ছোট থাকায় আমীরা বেগম অনুভার খুব একটা খেয়াল রাখতে পারেনি। আর তায়ান এমন ভাবে মেয়েটাকে আগলে রাখত , আমীরা বেগমকে তেমন একটা প্রয়োজনই পড়ত না। রাতে ঘুমের সময় অনুভা কেঁদে উঠলে তায়ান দ্রুত উঠে বসত। ছোট্ট অনুভাকে আলতো করে কোলের কাছে টেনে নিয়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দিত। ক্ষুদার তাড়নায় কাঁদলে দৌড়ে গিয়ে নিজেই আরিজের ফিডার চুরি করে নিয়ে খাওয়ানো শুরু করত। কাঁধে তুলে ছাদের একপাশ থেকে অন্যপাশে হাটা। কিন্তু অনুভা যখন ধীরে ধীরে একটু বড় হয়, তায়ানের আলাদা রুম হয় তখন নিজেই সে মেয়েটার থেকে দূরত্ব বজায় রাখত। যদিও দিনের বেলায় সারাক্ষন সময় তার পেছনেই যেত। আর মেয়েটা তো তার হাত ধরেই প্রথম হাটা শিখেছিল। সাতাশ বছরে গিয়েও স্পষ্ট মনে পড়ে তায়ানের সে-সব।
“ আজকে পড়ে গেলেও আমি তোকে ধরব না। বড় হয়ে যাচ্ছিস এখনও হাটতে পারিস না! আয় বলছি! এসে আমাকে ধর।” ছাদের উপর একটা চেয়ারে বসে অনুভাকে নিজের থেকে একটু দূরে দাঁড় করিয়ে এগুলো বলছিল তায়ান।
অনুভা ঠোঁট ভেঙে দাড়িয়ে আছে। গায়ে একটা ছোট্ট জামা আর বিলাই প্যান্ট পড়া। হাত বাড়িয়ে তায়ানের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেও এগুতে পারছে না। তায়ানের মুখে ললিপপ সেটা হাতে নিয়ে অনুভার সামনে ধরে বলল,
“ আয়, এটা দেব তাহলে।” ছোট্ট অনুভা এবার উচ্ছাসিত হয়ে সামনের দিকে পা বাড়াল। তবে এক পা, দু পা দিতেই হচোট খেয়ে পরে যায় মেঝেতে। চোখ মুখ কুঁচকে কেঁদে ওঠে তক্ষুনি। তায়ান বসে থাকে নির্বিকার৷
“ কেঁদে লাভ নেই। উঠে হেঁটে হেঁটে আমার কাছে আয়। তোকে আমি আর কোলে কোলে নিয়ে ঘুরতে পারব না। এবার হাঁটা শেখ।”
কেঁদেকেটে নাক দিয়ে সর্দি বের হয়ে গেল তবু ছেলেটা গিয়ে মেয়েটাকে ধরল না। হোঁচট খেতে খেতেই এলোমেলো পায়ে সে তায়ানের কাছাকাছি গেল। ওমনি তায়ান এক ঝটকায় অনুকে কোলে নিয়ে কষিয়ে তার গালে চুমু খেয়ে বলল,
_“ গুড গার্ল।”
আরও কত কি মনে পড়ত তায়ানের! একবার অনুভা বাগান থেকে ফুল ছেড়ায় কি ধমকটাই না দিয়েছিল তায়ান! বেঁচারি অনুভা ভয়ে কেঁদে দিতেই তায়ান আবার সেই ফুল অনুভার কানে গুঁজে দিয়ে বলেছিল,
“ কাঁদিস না, অনু। এই দেখ তোর কানে আমি ফুল লাগিয়ে দিয়েছি। এখন একদম তোকে ফুলের মত লাগছে। অনু আর ফুল একদম অনুফুল।”
এসব ভেবে অজান্তেই তায়ানের গম্ভীর, অনুভূতিহীন মুখে হাসি ফুটে উঠতো। সবচেয়ে বেশি মনে হতো সেই সময়টা যখন সে অনুভাকে জড়িয়ে নিয়ে ঘুমাত। এসব ভেবে মুখে হাসির আলো দেখা গেলে তার নিজের উপরই রাগ হতো। সে তো বোন হিসেবে স্নেহ করত তাহলে এত মনে পড়ার কী আছে? তায়ান যখন বাড়ি ছাড়ল তখন অলির বয়স তিন কি চার হবে। কই অলিকে নিয়ে তো এত ভাবে না! আর ওই মেয়েটাও নিশ্চয়ই তাকে ভুলে গেছে, তাহলে সে কেন এত ভাববে? শুধু কি ভাবে? সে তো তার এবং অনুভার ছোট বেলার ছবিও নিজের কাছে রেখে দিয়েছে এতগুলো বছর ধরে। যেটা সে বাড়ি ছাড়ার সময় সঙ্গে এনেছিল।
তায়ান মাঝে মধ্যেই রাতের অন্ধকারে বসে সেই ছবিটায় এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকত। যেখানে তায়ান ছোট্ট অনুভাকে কোলে নিয়ে তার গালে নিজের গাল লাগিয়ে রেখে হাসি মুখে তাকিয়ে আছে। এই ছবিটা আমীরা বেগম তুলেছিল।
এত কিছুর পরও তায়ান যখন ভাবত সে যা পেয়েছে, সবই সেই নিষিদ্ধ শক্তির থেকে তখন সেই বিশ্বাসই তাকে আরও অন্ধকারের গভীরে ঠেলে দিত।
—————————
অতীতের ভাবনা থেকে বেড়িয়ে আসে তায়ান। আরশাদ এতক্ষন সব বলছিল। একটার পর একটা লুকানো সত্য। মাঝেমধ্যে তায়ানও যোগ করছিল। কিছু শব্দে উচ্চারণ করছিল, আর কিছু নীরবে নিজের ভেতরেই পুনরাবৃত্তি করছিল
এতক্ষন সময় অনুভা একটা কথাও বলেনি। কিন্তু কিছু কিছু কথা শুনে না চাইতেও অনুভার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। তার মায়ের পরিণতি এমন হতে পারে এটা তার কল্পনার বাহিরে ছিল। তাও এর পেছনে তার বাবারই হাত। নিজের বাবা! নিজের জন্মদাতা! অনুভার ধারণা ছিল তার জন্মের কারণে তার বাবা নিজের স্ত্রীকে হারিয়েছে বলে হয়তো অনুভাকে দেখলে তার রাগ হতো। অনুভা সত্যিই বোকা! সে এতদিন এক ছাদের নিচে তার সঙ্গেই ছিল যে তাকে এতিম করেছে।
শান্ত অনুভার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। এতকিছু শোনার পর তার নিজেরই তো মাথা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। একজন বাবা কীভাবে এমন হতে পারে? সামান্য কিছু সম্পত্তির লোভে নিজের স্ত্রীকে সরিয়ে, সন্তানকেও মে’রে ফেলতে চেয়েছিল! তার তো ইচ্ছা করছে এক্ষুনি লোকটার মাথা ফাটিয়ে দিতে। কিন্তু কোলে থাকা আরাফ আর সামনে থাকা অনুভার জন্য সেটা সম্ভব না। সে দাঁতে দাঁত চেপে স্থির দাঁড়িয়ে রইলো। কিন্তু আরিজ থেমে থাকল না। সে জানত তার চাচা একজন লোভী, তাই বলে সে এতটা নিচে নামতে পারে ধারণাই ছিল না। তেড়ে গেল আরশাদের দিকে, কিন্তু অনুভা আরিজের হাত ধরে থামাল। আরিজ প্রশ্নভরা চোখে তাকায় বোনের দিকে। অনুভার দৃষ্টি তার বাবার দিকে আবদ্ধ। স্থির, গভীর দৃষ্টি। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় নিস্তব্ধ এক হ্রদ, যেখানে কোনো ঢেউ নেই, কোনো আলোড়ন নেই। কিন্তু তায়ান বুঝতে পারছিল, ওই স্থিরতার গভীরে লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর কালবৈশাখী ঝড়।
অনুভা হাসলো। হাসতে হাসতেই নিচে ঝুঁকে তুলে নিল মাটিতে পড়ে থাকা সেই কাগজ-কলম। যেগুলো ধরে একটু আগে আরশাদ সাইন করার জন্য জোর করছিল। অনুভা একদম নির্দ্বিধায় কলমটা ধরল। একটার পর একটা কাগজ সামনে টেনে নিল আর নিঃশব্দে বসিয়ে দিল নিজের নামের সাইন। শান্ত আরিজ কপাল কুঁচকে তাকিয়ে থাকলেও তায়ানের দৃষ্টি স্বাভাবিক।
এদিকে আরশাদের চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। অবিশ্বাস্য লাগছে তার এই মুহূর্তটা। যে সম্পত্তির জন্য এত ছলচাতুরি, সব পেয়ে গেল সে? তার চোখে ঝিলিক খেল লোভের, ঠোঁটের কোণে অজান্তেই ফুটে উঠল এক চাপা হাসি। পরক্ষনেই ঝপ করে কাগজগুলো এসে পড়ল তার মুখের ওপর। অনুভা আরশাদের মুখের উপর দিয়ে বিদ্রুপ মেশানো কন্ঠে বলল,
_“ এই নাও। দিয়ে দিলাম সব। এগুলোর জন্যই তো এতকিছু? এই দেখো, আজ পেয়ে গেলে এই কাগজ গুলোর মালিকানা। নানাভাইয়ের বিশাল সম্পত্তির অধিকারী আজ তুমি।”
আরশাদ সাহেবের মুখে তখনও তৃপ্তির হাসি। অনুভার মুখের শীতল হাসি আরও প্রসারিত হলো।
_“ সব পেলে তুমি। কিন্তু কি লাভ হলো? আজ থেকে তো তোমার জায়গা হবে কারাগারে। আমি পারলে এটাও আটকে দিতাম, জানো। শান্তিতে রাখতাম তোমাকে এই পৃথিবীতে। কিন্তু সমস্যা হলো একটা জায়গায়…আমার মা…আমার মা কবরে অশান্তিতে আছে। তার আত্মার শান্তির দরকার এখন। আর সেই শান্তির জন্য… তোমার শাস্তি জরুরি। তোমার ধ্বংসেই মিলবে আমার মায়ের আত্মার শান্তি। আর তুমি কারাগারে অনুশোচনার আ’গুনে জ্বলে পুড়ে মরবে!”
অন্ধকার নেমে এলো আরশাদের মুখে। সে কাগজ গুলো হাতে নিয়ে কিছু বলতে চাইলো, তবে মুখ থেকে শব্দ বের হওয়ার আগেই, ঝড়ের মতো এগিয়ে গিয়ে এক ঝটকায় সজোরে লাথি মারল আরশাদের মুখে। আবারও মা’রতে শুরু করল। অনুভা পিছিয়ে আসে।
_“ তায়ান! ওকে আর মারিশ না।” রিকার্ডো চেঁচিয়ে উঠলো।
আরশাদের কলার চে’পে ধরে তায়ান তাকায় তার দিকে, ওর চোখ দুটো রক্তবর্ণ ক্রোধে জ্বলছে।
_“ কেন? কেন মারব না? ওর প্রতি কিসের এত দরদ আপনার? কেন ওর সঙ্গে মিলে কাজ করছেন?”
এক ঝটকায় আরশাদকে ছেড়ে উঠে দাঁড়াল তায়ান। তার বুক উঠানামা করছে দ্রুত, মুঠি শক্ত হয়ে আছে।
_“ এতদিন যাকে শাস্তি দেওয়ার কথা বলতেন… আজ তার জন্যই আপনি আমাকে থামাচ্ছেন? সে তো আপনার বন্ধুর খু’নির ভাই, তাহলে কেন থামতে বলছেন আমাকে? হোয়াই? সত্যিটা বলুন। কেন ওর সঙ্গে মিলে কাজ করছেন? আর কি আছে যা আমি জানি না? উত্তর দিন!” গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলো তায়ান। তায়ানের এমন বজ্রকন্ঠে আরাফ লাফিয়ে ওঠে। সে এক ঝটকায় নেমে গেল শান্তর কোল থেকে। ছোট ছোট পায়ে হেঁটে গেল মায়ের দিকে। আরশাদ মেঝেতে শুয়ে কাতরাচ্ছিল। হঠাৎ তার দৃষ্টি গেল বাচ্চাটার দিকে। কিছু না ভেবেই এক সেকেন্ডের ভেতর পাশে পড়ে থাকা রিভলবার তুলে নিলো সে। এদিকে অনুভা খেয়ালই করেনি তার আরাফ নেমে গিয়ে তার দিকে আসছে। আরাফ শান্তর কোল থেকে নামার পর আরশাদ এত দ্রুত রিভলবার হাতে নেয় যে, তার হাতে রিভলবার দেখে প্রথমেই শান্তর নজর যায় অনুভার দিকে।
তায়ানও এক পর্যায়ে আরশাদের দিকে তাকিয়ে এমন দৃশ্য দেখে পেছনে তাকায়। নিজের ছেলেকে মেঝেতে হাঁটতে দেখেই বুকের ভেতর মুঁচড়ে ওঠে। শান্ত গেল অনুভাকে সরিয়ে দিতে। আর তায়ান এক ঝড়ের গতীতে নিজের ছেলের দিকে এগিয়ে এসে বাহু ধরে টান দেয়। নাম ধরে চিৎকার করে ওঠে,
_“ তাশভান!!”
এক ঝটকায় আরাফকে তুলে বুকে জড়িয়ে নেয় তায়ান। কিন্তু কোলে তুলতে তুলতেই বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো গোডাউন। তায়ানের হাত হঠাৎই ভিজে গেল উষ্ণ, অচেনা এক তরলে।
সে নিচে তাকাল। তার এক হাত আরাফের ডান পায়ে। বুকের ভেতর ছ্যাৎ করে ওঠে তায়ানের। যেন কেউ তার হৃদয়টা মুঠোয় চেপে ধরেছে। আরাফের মুখ থেকে তীব্র একটা চিৎকার বেরিয়ে এলো, তারপর কান্নায় ভেঙে পড়ল সে…গোটা গোডাউন কেঁপে উঠল তার কান্নায়…ছোট্ট শরীরটা তায়ানের বুকে ছটফট করতে লাগল ব্যথায়। বারবার ঝাঁকুনি দিয়ে উঠছে ছোট্ট প্রাণটা। তায়ান যদি আরাফের বাহু ধরে উপরের দিকে টান না দিত তাহলে হয়তো গু’লি ঠিক আরাফের বুকের মাঝ বরাবর লেগে যেত। কিন্তু তায়ান এসে ধরায় সেটা পায়ের উপর লেগেছে।
শান্ত অনুভাকে অন্য পাশে সরিয়ে নিয়েছে। বিকট শব্দটা শোনা মাত্রই অনুভা দুই হাত দিয়ে কান চেপে ধরল প্রথমে। কিন্তু পরের মুহূর্তেই তায়ানের বুকে র’ক্তাক্ত হয়ে থাকা ছোট্ট সন্তানকে দেখেই শরীরের ভেতরটা শূন্য হয়ে যায়। মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থেকেও মনে হলো পায়ের নিচ থেকে জমিন সরে যাচ্ছে। হাত-পা যেন অবশ হয়ে যায় তার ধীরে ধীরে। সে ছুটে যেতে চাইল। কিন্তু পা দুটো আর সাড়া দিল না। মনে হলো, এক পা এগোলেই সে নিজেই ভেঙে পড়ে যাবে মাটিতে। শান্ত প্রথমে তড়িঘড়ি করে তার দু’বাহু ধরে অনুভাকে সামলানোর চেষ্টা করল। কিন্তু ঠিক তখনই তার চোখ গেল আরশাদের দিকে। যে আবারও বন্দুক তাক করছে। এক মুহূর্ত দেরি না করে শান্ত সেদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এক ঝটকায় লাথি মেরে বন্দুকটা ফেলে দেয় মেঝেতে। ধাতব শব্দে গোডাউনটা আবার কেঁপে উঠল। গার্ডরা আর অপেক্ষা করল না। চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলল আরশাদকে, দ্রুত তাকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা শুরু করল। আর সেই বিশৃঙ্খলার মাঝেও অনুভা শুধু তাকিয়ে রইল তার আরাফের দিকে। তার একটা মাত্র কলিজার টুকরো। কখন সে মেঝেতে বসে পড়েছে নিজেও জানে না। ছোট্ট শরীরটা তায়ানের বুকে ছটফট করতে করতে একসময় নিথর হয়ে যায়।
মাটি খামছে ধরে অনুভা চিৎকার করলেও কোনো আওয়াজই বের হলো না। একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা তাকে গ্রাস করল, যেন সে হঠাৎ করেই বোবা হয়ে গেছে।
সে দেখল তায়ান শিশুটাকে আকড়ে ধরে গোডাউন থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। ছোট্ট, ফর্সা, তুলতুলে পা দুটো ঝুলে আছে নিস্তেজভাবে। আর সেখান থেকে টুপটাপ করে গড়িয়ে পড়ছে লাল তরল। অনুভার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। আশপাশের সব শব্দ মিলিয়ে গিয়ে পুরো পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে যায় অনুভার কাছে।
তায়ান দ্রুত পায়ে গাড়ির দিকে এগোচ্ছে, বুকে শক্ত করে জড়িয়ে আছে আরাফের নিস্তেজ শরীর। ছেলেটা তার আর এখন ছটফট করছে না। মস্তিষ্কটা যেন ফাঁকা হয়ে গেছে তায়ানের। কীভাবে গাড়িতে উঠে পড়ল, কখন ড্রাইভিং সিটে বসলো, নিজেও টের পায়নি। আরাফকে এক হাতে চে’পে ধরে গাড়ি স্টার্ট করে। কে কোথায় আছে না আছে কোনো কিছুই তায়ানের মাথায় নেই। সে ভাবতেও চায় না। স্টিয়ারিং এক হাতে ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,
_“ কিচ্ছু হবে না তোমার। বাবা আছি তো। আমাকে বাবা না ডেকে তুমি যেতে পারো না! কখনোই না। তোমার বাবা যে এই ডাক শোনার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে, তুমি জানো না?…আমাকে এভাবে শাস্তি দিতে পারো না। আমি কখনোই এই শাস্তি মেনে নিতে পারব না, বাবা!” তায়ানে গলা শুকিয়ে আসছে এসব বলতে বলতে। সারাটা রাস্তা সে উন্মাদের মতো, ভাঙা গলায় একটানা কথা বলে যাচ্ছিল নিজের অবচেতন ছেলেকে নিয়ে।