[ গতরাতে...]
"কাটেনা সময় যখন আর কিছুতে...
বন্ধুর টেলিফোনে মন বসে না।
জানলার গ্রিলটাতে ঠেকাই মাথা,
মনে হয় বাবার মতো কেউ বলে না...
আয় খুকু আয়...আয় খুকু আয়..."
মেয়েলি কণ্ঠের এক অদ্ভুত, শীতল সুর চারপাশের থমথমে বাতাস কাঁপিয়ে আছড়ে পড়ল আরশাদের কানে। সেই চেনা অথচ এই মুহূর্তে ভীষণ অচেনা গানটার স্পর্শে আচমকা শিউরে উঠে ভাঙল তার ঘুম। সে এখনো গোডাউনেই বন্দী। কেটে গেছে দুটো দিন। তায়ানের নির্দেশ না আসা পর্যন্ত দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা পাথরের মতো গার্ডগুলোর একজনও তাকে কিংবা রিকার্ডোকে ছেড়ে দেবে না। অনুভাকে বন্দি করতে এসে এখন তারা নিজেরাই বন্দি।
আরশাদ চোখের পাতা পিটপিট করে ঝাপসা দৃষ্টিটা সোজা মেলে ধরল গোডাউনের সদর দরজার দিকে। সেখানে একটা অবয়ব। দরজার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক নারী। চারপাশের জমাট বাঁধা অন্ধকারের চাদর ভেদ করে অবয়বটা পুরোপুরি স্পষ্ট না হলেও, বাইরের হালকা আলো-ছায়ার খেলায় যা দেখল, তাতে আরশাদের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে এল। মেয়েটির পরনের শাড়ির আঁচল আর পিঠময় ছড়িয়ে থাকা খোলা চুলগুলো ডানা কাটা পরির মতো বাতাসে উড়ছে।
সেই মেয়েলি কণ্ঠটা আবারও গান গেয়ে উঠল। গোডাউনের নিস্তব্ধতা চিরে একই সুর দ্বিতীয়বার বাজতেই আরশাদ সাহেবের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। তীব্র আতঙ্কে কাঁপাকাঁপা গলায় তিনি অন্ধকার লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করলেন,
_"কে ওখানে?"
মেয়েটি কোনো জবাব দিল না। নিজের জায়গায় স্থির দাঁড়িয়ে থেকে সে স্রেফ গানের লাইনগুলো বারবার আওড়ে যেতে লাগল। ওই একই লাইনের পুনরাবৃত্তি অন্ধকার ঘরটায় এক গা-ছমছমে পরিবেশ তৈরি করল। ভয়ে আরশাদ সাহেবের শরীর রি-রি করে উঠল, গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। এবার আরও একটু জোরে, প্রায় ভয়ার্ত স্বরে তিনি আবারও চিৎকার করে উঠলেন,
_"কে ওখানে?"
আতঙ্কে তিনি পাশে তাকালেন। রিকার্ডো এখনো ম রা র মতো ঘুমাচ্ছে। এই নরককুণ্ডের মধ্যেও লোকটার কোনো হেলদোল নেই! আরশাদ সাহেব রিকার্ডোকে ধাক্কা দিয়ে জাগানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। দুজনেরই হাত-পা শক্ত দড়ি দিয়ে চেয়ারের সাথে বাঁধা। শরীরটা একটু ঝাকানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তিনি মরিয়া হয়ে পায়ের পাতা দিয়ে রিকার্ডোর পায়ে লাথি মারার চেষ্টা করলেন, কিন্তু রিকার্ডো নড়ল না, গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে রইল। ওদিকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার কণ্ঠ থেকে তখনো একটানা বেরোচ্ছে সেই একই গানের লাইন।
আরশাদের এমন ছটফটানি দেখে নারী অবয়বটা আরেকটু এগিয়ে এলো। এবার তার হাতে থাকা কুড়ালটা লক্ষ করল আরশাদ সাহেব।
কিছু বলার আগেই মেয়েটা বলল,
_“ এতো ভয় পাচ্ছো কেন, বাবা? আমি এসেছি…তোমার মেয়ে!”
আরশাদ সাহেব স্বস্তি পেল না। পাবে কীভাবে? মেয়েটি কাছে আসতেই তার হাতের ওই বড়সড় কুড়ালটা এবার একদম পরিষ্কারভাবে আরশাদ সাহেবের নজরে পড়ল। অন্ধকারের মাঝেও ভারী কাঠের হাতল আর ধারালো ইস্পাতের চওড়া ফলাটা হিংস্রভাবে চকচক করে উঠছে। নিজের মেয়েকে এই জল্লাদের বেশে দেখে আরশাদ সাহেবের গলা শুকিয়ে কাঠ। তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে কর্কশ গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
_“ তুই এখানে? এই অসময়ে কী করছিস?”
অনুভা এতটুকুও বিচলিত হলো না। কুড়ালটা হাতে নিয়েই সে অত্যন্ত স্বাভাবিক, শান্ত গলায় জবাব দিল,
_“ বাবার কাছে মেয়েরা যে কোনো সময়েই আসতে পারে, বাবা। তুমি এতো অবাক হচ্ছো কেন?”
মেয়ের মুখের এই অদ্ভুত স্বাভাবিকতা আরশাদ সাহেবের ভেতরের অস্বস্তি আর রাগ আরও বাড়িয়ে দিল। তিনি দাঁতে দাঁত চেপে, হিংস্রভাবে ধমকে উঠলেন,
_“ চলে যা এখান থেকে!”
অনুভার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল শীতল হাসি। সে মাথা নেড়ে বলল,
_“ আমি এখানে থাকতে আসিনি। হসপিটালের বেডে আমার ছেলেটা অপেক্ষা করছে, তার কাছে ফিরতে হবে শীঘ্রই।”
ছেলে শব্দটা শোনামাত্রই আরশাদ সাহেবের চোখ দুটো সরু হয়ে গেল। তিনি তীক্ষ্ণ, সন্দিহান দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে প্রায় ফিসফিসিয়ে প্রশ্ন করলেন,
_“বেঁচে আছে?”
অনুভা এবারও হাসল, তবে সেই হাসিতে কোনো মায়া ছিল না। সে কুড়ালের হাতলটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
_“আছে… আমার ছেলে বেঁচে আছে। তোমার এক গু*লিতে ম’রেনি।”
আরশাদ সাহেব একটুও অনুতপ্ত হলেন না, বরং হিংস্র চোখে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে উঠলেন। চিবুক শক্ত করে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠুর গলায় বললেন—
_" হা’রাম’জাদাটা এখনো ম’রেনি? শক্ত প্রাণ! কিন্তু মনে রাখিস, এখান থেকে একবার যদি আমি বের হতে পারি, তোর ওই জা’র’জটাকে আমি নিজের হাতে মাটির নিচে পুঁ’তব!"
বাবার মুখ থেকে নিজের মৃ’তপ্রায় সন্তানের নামে এমন চরম অপমানজনক কথা শুনেও অনুভা এতটুকু রাগ করল না। উল্টো শান্ত গলায় বুঝিয়ে বলল,
_ “জা’র’জ বলো না, বাবা। আমার ছেলে তো জা’র’জ নয়। হতে পারে ওর বাবা একজন অমানুষ... কিন্তু ও আমার বৈধ সন্তান।”
আরশাদ সাহেব নিজের কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব শক্ত রাখার চেষ্টা করে বললেন,
_ "বৈধ না অবৈধ, তা দিয়ে আমার কিছু যায় আসে না! তুই এই মাঝরাতে এখানে কী চাস, সেটা বল? হাত-পাগুলো খুলে দে আমার!"
অনুভা এবার তার বাবার খুব কাছে এসে দাঁড়াল। কু’ড়ালের হাতলটা আলতো করে মেঝেতে ঠেকিয়ে, বাবার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে এক চিলতে হাসল। তারপর বলল,
_ "খুলে দেওয়ার জন্যই তো এসেছি, বাবা। কিন্তু এতে দড়ি খোলার প্রয়োজন পড়বে না একদম। আচ্ছা যাইহোক, দেখো তো নীল শাড়িতে কেমন লাগছে আমাকে? আমার মায়ের মতো সুন্দর লাগছে? নাকি মা এর চেয়েও বেশি সুন্দর ছিল? আচ্ছা, তুমি কি পারতে না মায়ের সঙ্গে পুরোটা জীবন কাটিয়ে দিতে? মা না হয় একটু পাগলই ছিল...ভালোবাসা যেত না তাকে?”
_“ আমি তোর মায়ের সঙ্গে সংসার করতে বিয়ে করিনি।” আরশাদ সাহেব বললেন।
অনুভা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
_“ সম্পত্তির জন্যে করেছিলে, তাইতো? তোমারই তো থাকত সব! তুমি না হয় সম্পত্তির লোভে আজীবন মা’কে ভালোবাসার নাটক করে যেতে। কেন খু’ন করে দিলে? কেন এতিম করে দিলে আমায়? অবুঝ মানুষটাকে মে’রে ফেলতে একবারও হাত কাঁপেনি তোমার?”
আরশাদ সাহেব রুক্ষ কন্ঠে বলে উঠলেন,
_“ তোর এসব নীতিবাক্য শোনার সময় নেই আমার! মাঝরাতে এখানে এসে ওই ম’রা মানুষের কাসুন্দি ঘাঁটছিস কেন? তোর মা একটা আপদ ছিল , একটা জ্যান্ত ন’রক! তোকে এই নীল শাড়িতে ঠিক তোর মায়ের মতোই একটা আস্ত ডাইনি লাগছে। দূর কর ওই কুড়াল, আর আমার চোখের সামনে থেকে যা!"
অনুভার রূপটা এবার পুরোপুরি বদলে গেল। কু’ড়ালের ফলাটা আলতো করে আরশাদ সাহেবের গালের পাশে ছোঁয়াতেই তার চিৎকার মুহূর্তে গলায় আটকে গেল। অনুভা মাথাটা সামান্য কাত করে, ঠোঁটের কোণে এক চিলতে প্রাণহীন হাসি ঝুলিয়ে বলল,
_“ আমি তো ডাইনি হয়েই এসেছি, বাবা! তোমার বাধ্য মেয়ে হয়ে আসলে তো আর এটা সঙ্গে করে আনতাম না।"
সে হাতের কু’ড়ালটা আরশাদ সাহেবের চোখের সামনে একটু উঁচিয়ে ধরল। ইস্পাতের ধারালো ফলাটা অন্ধকারের মধ্যেও চকচক করে উঠল। বুকের ঠিক মাঝখানটায় একটা অচেনা ভয়ের ধা’ক্কা খেলেন আরশাদ সাহেব। মেয়ের চোখের এই থমথমে চাউনি আর হাতের কু’ড়াল দেখে এবার তিনি সত্যিই ভেতরে ভেতরে দমে গেলেন। শুকনো ঢোক গিলে, গলা কাঁপিয়ে কোনোমতে বললেন,
_“মা... মানে?”
অনুভার চোখের সেই শান্ত ভাবটা এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। এতক্ষণের চেপে রাখা সব কষ্ট, ক্ষোভ আর আ’ক্রোশ এক হয়ে তার চোখে-মুখে উপচে পড়ল তার । সে দাঁতে দাঁত চেপে, প্রতিটি শব্দে আগুন ঝরিয়ে বলল,
_“ মানে খুব সহজ, বাবা! আমার নিষ্পাপ মাকে খুন করেছ তুমি! এখন আবার তুমি আমার ছেলের দিকে হাত বাড়িয়েছ? আমার ছেলে! আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন ওটা! জাস্ট তোমার জন্য ও আজ হাসপাতালের বেডে শুয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করছে। হারাতে বসেছিলাম ওকে আমি! তোমার কি মনে হয় না, তোমার হাত দুটো অনেক বেশি অন্যায় করে ফেলেছে, বাবা? বড্ড বেশি অপরাধ করে ফেলেছে!"
আরশাদ সাহেবের ভেতরটা এবার একেবারেই ভেঙে গেল। বুঝতে বাকি রইলো না মেয়েটার ইঙ্গিত কোথায়। অহংকার উবে গিয়ে এবার খাঁচায় বন্দী পশুর মতো ছটফটানি শুরু হলো। তিনি হাত-পা বাঁধার রশিটা খোলার জন্য মরিয়া হয়ে মোচড়ামুচড়ি করতে করতে আর্তনাদ করে উঠলেন,
_" তুই ভুল বুঝছিস আমাকে। আমি তোকে বড় করেছি, এই আরশাদের র’ক্ত তোর গায়ে! নিজের জন্মদাতার গায়ে তুই অ’স্ত্র তুলবি? কু’ড়ালটা সরা অনুভা, ওটা সরা! গার্ডস! কে আছিস তোরা? ভেতরে আয়! এই মেয়ে পা’গল হয়ে গেছে!” তারপর আবারও অনুভার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
_“ নিজের মা, সন্তানের জন্য এমন করছিস? ভুলে যাস না আমিও তোর বাপ!”
বাবার মুখে 'বাপ' শব্দটা শুনে অনুভার ভীষণ হাসি পেয়ে গেল। এই চরম ভ’য়ানক পরিস্থিতিতেও সে নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। অন্ধকার ঘরটা কাঁপিয়ে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল সে। সেই হাসির শব্দে একদমই আনন্দ ছিল না, ছিল এক জঘন্য উপহাস। হাসতে হাসতেই আচমকা একদম চুপ হয়ে গেল অনুভা। পুরো ঘরটায় আবার সেই থমথমে নীরবতা নেমে এল। সে আলতো করে চোখ দুটো বন্ধ করল। কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল একদম নিথর হয়ে। তারপর ঝট করে চোখ খুলে আরশাদ সাহেবের দিকে তাকিয়ে আবারও বিষাদ মাখানো এক চিলতে হাসল। এবার তার গলাটা বুজে এল এক অদ্ভুত অভিমানে, সে বলল,
_ “ইস! তোমার মুখে বাপের দাবি শুনে আমি সত্যি খুব ভাবলাম, বাবা। চোখ দুটো বন্ধ করে অনেক চেষ্টা করলাম, যদি জাস্ট একটা মুহূর্তও চোখে ভেসে উঠত যে তুমি আমাকে একটু বাবার আদর দিয়েছ! কখনো কপালে হাত রেখে ভালোবেসেছ, কিংবা মেলা থেকে একটা পুতুল কিনে দিয়েছ, ভালোবেসে একটাবার আম্মু বলে ডেকেছ! বিশ্বাস করো বাবা, আমার পুরো স্মৃতি ঘেঁটে এমন কোনো সুন্দর মুহূর্ত আমি খুঁজে পেলাম না। আমার পুরো শৈশব জুড়ে কেবল তোমার ওই হিংস্র চিৎকার, অপমান আর অত্যাচারই জমা হয়ে আছে। যে মানুষটা কোনোদিন আমার বাবা হতে পারল না, আজ মরার ভয়ে সে আমার 'বাপ' সাজতে এসেছে? একদম দেরি করে ফেললে, বাবা!”
আরশা সাহেব বললেন,
_“ মা আমার! আমাকে আরেকটা সুযোগ দে…ভুল হয়ে গেছে আমার।”
_“ আমি আমার মায়ের আত্মাকে মুক্তি দিতে এসেছি, বাবা! কত বছর হয়ে গেল বলো তো, মা ক’বরে ছটফট করছে? দুনিয়াতে সে কোনোদিন শান্তি পায়নি, তুমি পেতে দাওনি। আজ অন্তত তার একটা গতি হওয়া দরকার, তার আত্মাকে শান্ত করা দরকার।”
আরশাদ চৌধুরীর এই কান্নাকাটি আর অনুনয় অনুভার কান পর্যন্ত পৌঁছালই না। বিন্দুমাত্র দয়ার উদ্রেক হলো না মেয়েটার বুকের ভেতর। সে আরশাদের দিকে তাকিয়ে থাকলেও, তার মনের ভেতরের অন্ধকার পর্দাটা আচমকা এক চরম সত্যের মুখোমুখি এনে দাঁড় করাল তাকে। সে চোখ দুটো আবার বুজল। অন্ধকারের পর্দায় সে কল্পনা করল একটা রক্তাক্ত, আর্তনাদ করতে থাকা মুখ, যা সে কোনোদিন ছুঁয়ে দেখতে পারেনি শুধু এই লোকটার জন্য। মায়ের সেই শূন্যতা বুকের ভেতর আছাড় মারতেই, তার চোখের সামনে ভেসে উঠল হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে থাকা তার ছোট্ট নিষ্পাপ বাচ্চাটার মুখ। নল গোঁজা শরীরটা নিয়ে নিথর হয়ে পড়ে আছে তার কলিজার টুকরো।
যে লোকটা তাকে মায়ের কোল থেকে বঞ্চিত করেছিল, আজ সে-ই তার নিজের কোল খালি করতে চেয়েছে! আরশাদের এই হাত দুটোই ধ্বংস করেছে অনুভার অতীত, আর আজ ধ্বংস করতে চাইছে তার ভবিষ্যৎ! অনুভার চোখ দুটো যখন আবার ঝট করে খুলে গেল, তখন সেখানে আর কোনো সন্তানের অভিমান ছিল না, ছিল কেবল এক হিংস্র, প্রতিশোধপরায়ণ মায়ের রূপ, অথবা জেসমিনের সন্তানের রূপ।
নাহ! সময় নষ্ট করবে না একদম সে। তার ছেলেটার জ্ঞান ফিরলে তাকে না পেলে কাঁদবে তো! এমনিতেই অনেক যন্ত্রনা সহ্য করেছে ছোট্ট প্রানটা। অনুভা সে কু’ড়ালটা মাথার ওপর উঁচিয়ে ধরল। আরশাদ সাহেব কিছু বুঝে ওঠার আগেই, পুরো ঘর কাঁপিয়ে তীব্র গতিতে নেমে এল কু’ড়ালের ধারালো ফলা। বাতাস চিরে একটা বীভৎস শব্দ হলো, আর তার পর মুহূর্তেই আরশাদ সাহেবের গগনবিদারী আর্তনাদ অন্ধকারের বুক চিরে দিল। এক পশলা গরম তাজা র’ক্ত ছিটকে এসে লাগল অনুভার মুখের একপাশে আর তার পরনের নীল শাড়িতে। মায়ের না-দেখা অসহায় র’ক্তাক্ত মুখের আর সন্তানের য’ন্ত্রণার প্রথম বদলাটা অনুভা নিয়ে নিল আরশাদের দুটো হাত শরীর থেকে চিরতরে আলাদা করে। আরশাদ সাহেব কাতরাতে কাতরাতে জীবনের শেষ নিশ্বাসটা ছেড়ে দিলো।
কুড়ালটা মেঝেতে ঠাস করে পড়ে গেল অনুভার হাত থেকে। সে নড়ল না। এক চুলও সরল না। আরশাদ সাহেবের নিথর, র’ক্তাক্ত দেহের দিকে তাকিয়ে সে জাস্ট দাঁড়িয়ে রইল পাথরের মতো। তার নিজের মুখের একপাশে আর নীল শাড়িতে তখনও আরশাদের শরীরের গরম র’ক্ত লেগে আছে। তার জন্মদাতার র’ক্ত! কিন্তু অনুভার চোখে কোনো অনুশোচনা নেই, কোনো ভয় নেই।
আচমকা এক অদ্ভুত কাঁপন শুরু হলো তার হাত দুটোতে। নিজের হাতের তালু দুটোর দিকে তাকাল। যে হাত দিয়ে মাতৃস্নেহে নিজের নিষ্পাপ অংশকে বুকে জড়িয়ে ধরে, আজ সেই হাত দুটো র’ক্তে ভেসে গেছে। এক পা পিছিয়ে গেল অনুভা। তারপর হুট করেই তার ঠোঁটের কোণে একটা টুকরো হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসিটা আস্তে আস্তে চওড়া হতে হতে একসময় রূপ নিল এক অদ্ভুত, পাগলাটে হাসিতে। অন্ধকার ঘরটা কাঁপিয়ে শব্দ করে হাসতে লাগল মেয়েটা।
চরম মানসিক অবসাদ আর প্রতিশোধের নিষ্ঠুর তৃপ্তি লেগেছিল সে হাসিতে। যেন এত বছরের জমে থাকা একটা দমবন্ধ করা পাথর এক ঝটকায় বুক থেকে নেমে গেছে। সে তার মা’কে তার থেকে কেড়ে নিয়েছে, তার ছেলেকে আ’ঘাত করেছে, তার ভালোবাসার মানুষটাকে তার চোখে ঘৃণার পাত্র বানিয়েছে। যদিও এতে পুরোপুরি দোষ তার নেই, কিন্তু শুরুটা তো এই আরশাদই করেছিল!
হাসতে হাসতেই আচমকা তার দম আটকে এল অনুভার। হাসিটা মাঝপথেই গুমরে কেঁদে ওঠার শব্দে রূপ নিল। সে মেঝের ওপর হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল। বাবার নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে আবারও শীতল, কম্পিত, একদম নিচু কন্ঠে সেই গানের সুর মেলাল,
“ কাটেনা সময় যখন আর কিছুতে, বন্ধুর টেলিফোনে মন বসে না।
জানলার গ্রিলটাতে ঠেকাই মাথা।
মনে হয় বাবার মতো কেউ বলে না…আয় খুকু আয়, আয় খুকু আয়!”
অনুভা দুই হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠল। তার চোখের জল আর মুখের ওপর লেগে থাকা আরশাদের রক্ত একাকার হয়ে গাল বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়তে লাগল। ওপরের দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
_"মা... দেখেছ মা? যে হাত দিয়ে লোকটা তোমার সুন্দর মুখটা শেষ করে দিয়েছিল, আজ আমি সেই হাত দুটো কেটে ফেলেছি। তুমি কি শান্ত হয়েছ এবার? তোমার আত্মা কি শান্তি পেয়েছে, মা?"
ছেলেকে আ’ঘাত করায় হয়তো এতো বড় নির্মম শাস্তি সে দিতো না নিজের জন্মদাতাকে। কিন্তু মায়ের খুনিকে সে কীভাবে বাঁচিয়ে রাখবে? এই পিশাচটা তো অনেকদিন বেঁচে গেল! অনেকগুলো বছর পৃথিবীর আলো-বাতাস অন্যায়ভাবে ভোগ করে নিল! সত্যটা জানার পরও যদি শাস্তি না পায় তার মা কি স্বস্তি পেত? মায়ের সন্তান হিসেবে এটা যে তার খুব বড় একটা দায়িত্ব ছিল। যে মা তাকে জন্ম দিয়েই দুনিয়া থেকে হারিয়ে গেছে, সেই মায়ের ওপর হওয়া জঘন্য অন্যায়ের বিচার করার আর কেউ ছিল না।
রিকার্ডোর ঘুম ভেঙেছে অনেক আগেই। সে চুপচাপ, নির্বিকার চোখে সব দেখছিল, যেন চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এই র’ক্তার’ক্তি কাণ্ড তার কাছে কিছুই না, একদমই স্বাভাবিক। অনুভা তার দিকে তাকাল। সোজা রিকার্ডোর সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
_"আমার বড় আব্বু তো সেই লোকটার বাবাকে খু’ন করেননি, তাহলে কেন তায়ানের ভেতর সেই পৈশাচিক আত্মা ঢুকিয়ে দিয়েছেন আপনি? কেন তার ভেতর এই মিথ্যে প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে তাকে জ্যান্ত ঝলসে দিয়েছেন? কী উদ্দেশ্য আপনার? আজ আপনাকে সেই জবাব দিতেই হবে!"
রিকার্ডোর চেহারায় কোনো পরিবর্তন এলো না। সে একবার আড়চোখে তাকাল আরশাদের নিথর শরীরে, সেখান থেকে চোখ ফিরিয়ে সে সোজা তাকাল অনুভার চোখের দিকে। গলার স্বরটা একদম নিচু, শীতল আর মখমলের মতো মসৃণ করে বলল,
_“ভালোবাসা... ভালোবাসার জন্য মানুষ কত কী-ই না করে! তায়ানকে অন্ধ বানিয়ে আমি যা করেছি, তা কেবল আমার সেই ভালোবাসার টানেই করেছি। এতে খারাপের কী দেখলে বলো তো?”
অনুভা কপাল কুঁচকে বলল,
_“ মানে?”
——————
[ বর্তমান, সকাল]
“কাটেনা সময় যখন আর কিছুতে, বন্ধুর টেলিফোনে মন বসে না।
জানলার গ্রিলটাতে ঠেকাই মাথা, মনে হয় বাবার মতো কেউ বলে না…
আয় খুকু আয়, আয় খুকু আয়”
বিছানায় আধশোয়া হয়ে বাঁ হাতে গিটারের ফ্রেটবোর্ডটা চেপে ধরে ডান হাতের আঙুলে নরম একটা সুর তুলল মেয়েটা। তার ওই ডান হাতের শিরায় স্যালাইনের সুঁইটা ফোটানো, সেখান থেকে একটা স্বচ্ছ প্লাস্টিকের নল বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা তরল নেমে আসছে শরীরে।
শরীরটা বড্ড ক্লান্ত, একটু আগেই আরাফ নামের বাচ্চাটাকে নিজের শরীরের র’ক্ত দিয়ে বাসায় এসেছে সে। এখন নিজেই স্যালাইন লাগিয়ে বসে আছে। তার বাবা নাস্তা সাজিয়ে তার সামনে এনে রেখে বলল,
_“ গিটার রাখো তো মা, আগে খেয়ে নাও।”
মেয়েটা গিটার বাজানো থামাল না, আঙুলের মৃদু স্ট্রামিং সচল রেখেই বাবার দিকে তাকিয়ে একটু অভিমানী গলায় বলল,
_“ভারী অদ্ভুত তো তুমি বাবা! তোমাকে নিয়ে গান গাইছি, আর তুমিই কি না এভাবে বলছো?”
_“শরীরটা বড্ড দুর্বল তোমার, মা। এখন এই ধকল নেওয়ার দরকার নেই।"
বাবার এই অযাচিত উদ্বেগে মেয়েটার ঠোঁটের কোণে একটা ম্লান, আদুরে ক্ষোভ মেশানো হাসি ফুটে উঠল। গিটারে শেষ একটা কর্ড বাজিয়ে সে বলল,
_"আমার এই দুর্বলতার জন্য দায়ী কে বলো তো? তুমিই তো! আগেপরে কতবার কত মানুষকে র’ক্ত দিতে চেয়েছি, তখন তো দুনিয়ার নিয়মকানুন দেখিয়ে আমায় কিছুতেই অনুমতি দিতে না। অথচ কাল রাতে বাচ্চাটার কথা শুনে আমায় একদম ঘুম থেকে তুলে টেনে নিয়ে গেলে! আর এখন আবার বাসায় আসতে না আসতেই এক হাত দিয়েছ স্যালাইন ধরিয়ে, অন্য হাতে খাবারের প্লেট! তোমার এই দ্বিমুখী শাসনের মানে কী, শুনি?”
মেয়ের মুখের এই যৌক্তিক অভিযোগ শুনে বাবার ঠোঁটের কোণে প্রশ্রয়ের হাসি ফুটে উঠল। তিনি মেয়ের মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে খুব মৃদু স্বরে বললেন,
_“ বাচ্চাটার মা আমার পরিচিত। সে তোমার বয়সিই, তাই মনে হলো সাহায্য করা দরকার।”
মেয়েটা কিছু একটা ভেবে বলল,
_“ওকে, দ্যাটস ফাইন! ওটা নিয়ে আমার কোনো অবজেকশন নেই। কিন্তু বাবা, হসপিটালে যাওয়ার সময় আমাকে ওমন বোরকা পরিয়ে কেন নিয়ে গিয়েছিলে? তুমি তো খুব ভালো করেই জানো আমি এগুলো একদমই পরি না! বড্ড আনকমফোর্টেবল লাগছিল আমার।”
ডক্টর লোকটা সঙ্গে সঙ্গে কোনো উত্তর দিলেন না। কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ মেয়ের সেই ফ্যাকাসে, চঞ্চল মুখটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর খুব শান্ত গলায় বললেন,
_“হসপিটালে অনেক ধরনের মানুষ থাকে মা, পরিবেশটাও ভালো না। আর তার ওপর তুমিও অসুস্থ। তাই ওমন করেছি। এখন আর কোনো কথা নয়, চুপচাপ খেয়ে নাও তো!"
কথাটা শেষ করেই তিনি প্লেট থেকে খাবারের প্রথম লোকমাটা তুলে ধরলেন মেয়ের ঠোঁটের সামনে। আর কোনো তর্কে গেল না মেয়েটা। বাধ্য মেয়ের মতো মুখ বাড়িয়ে খাবারটা মুখে নিল, কিন্তু তার চোখ দুটো স্থির হয়ে রইল বাবার মুখের ওপর। ভাগ্যবতি মনে হয় নিজেকে এমন বাবা পেয়ে। মা না থাকার পরও কখনও তাকে মায়ের অভাব বুঝতেই দেয়নি মানুষটা! তার তো ইচ্ছা করে সারাদিন মানুষটাকে নিয়ে গান গাইতে।