রক্ত রেখার আড়ালে

পর্ব - ৫১

🟢

রাত তখন তিনটে। ওটি-র দরজার ওপর লাল আলোটা জ্বলছে রক্তের মতো লাল হয়ে। শান্তকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে প্রায় এক ঘন্টা হতে চলল। তার শরীর থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়েছে, বুলেট দুটো নিখুঁতভাবে তার বাহু আর পায়ের পেশি ছিঁড়ে ভেতরে সেঁধিয়ে গিয়েছিল। ​অলি ওটি-র দরজার সামনের প্লাস্টিকের চেয়ারটায় মাথা নিচু করে বসে আছে। তার হাত দুটো কাঁপছে তার। অনুভা আর তায়ান পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অলি হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে, তবু আরিজ বিশ্বস্ত কয়েকজন গার্ড সঙ্গে দিয়ে শান্তকে হসপিটালে পাঠিয়ে দেয়। সঙ্গে আরাফ আর অলিও আসে। বাসায় এখনো কিছু জানানো হয়নি। অলির কিছুতেই চোখের সামনে থেকে সেই দৃশ্যটা মুছতে পারছে না। কী ভয়ানক এক জেদ আর অন্ধ উন্মাদনা নিয়ে তায়ান নিজের বুকে পর পর গুলি চালাল! আর শেষ মুহূর্তে শান্তকে অচল করে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করল না! চোখের পাতা ফেললেই বারবার সিনেমার মতো রিপিট হচ্ছে সবকিছু।

​করিডোরের একটু দূরে, একটা কোনায় রাখা সোফাটায় শুয়ে আছে ছোট্ট আরাফ। হসপিটালের চাদরটা তার গায়ের ওপর টেনে দেওয়া হয়েছে। এত বড় একটা ঝড় তার মা-বাবার জীবনটাকে তছনছ করে দিয়ে গেল, অথচ বাইরের এই পৈশাচিক ঝড়ঝাপটার কিছুই না বুঝে অবুঝের মতো ঘুমিয়ে আছে। মাঝে মাঝে সে ঘুমের ঘোরে শিউরে উঠছে, যেন অবচেতনেই সে তার বাবার সেই আকুল আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছে। অলি দূর থেকে আরাফের নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে থাকল।

_“ আল্লাহ, তুমি এই অবুঝ শিশুটার দিকে তাকিয়ে হলেও ওদের তিনজনকে ফিরিয়ে দাও! বাচ্চাটা যেন চোখ মেললেই ওর মাকে দেখতে পায়।” মনে মনে সাহায্য চাইলো মেয়েটা।

​এদিকে আরিজ অলিকে হসপিটাকে পাঠিয়ে দিয়ে, বাকি গার্ডদের সঙ্গে ব্রিজের নিচে আসে। প্রমত্তা নদীর পাড় ঘেঁষে আরিজ আর তার বাকি গার্ডদের টর্চের আলো অন্ধকারের বুক চিরে এদিক-ওদিক ছুটছে। কিন্তু যত সময় যাচ্ছে, আরিজের ভেতরের হতাশা আর শূন্যতা ততটাই ঘনীভূত হচ্ছে। বিশাল ব্রিজের নিচে এসে দাঁড়াতেই ওপরের ভূগোলটা সম্পূর্ণ ওলটপালট হয়ে গেছে। ঠিক কোন অংশটা থেকে তায়ান অনুভাকে নিয়ে লাফ দিয়েছিল, এই নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে নিচে দাঁড়িয়ে তা নিখুঁতভাবে পরিমাপ করা সম্ভব হচ্ছিল না। ব্রিজের বিশালাকার পিলারগুলো অন্ধকারের মাঝে এক একটা দানবের মতো দাঁড়িয়ে আছে। ​টর্চের তীব্র আলোর ঝলকানি ছুড়েও চারপাশের ঘন কালো কুয়াশা আর নদীর ঘোলাটে জল ছাড়া আর কিছুই নজরে আসছিল না। জলের কোথাও একটা বুদবুদ কিংবা ভেসে থাকা কাপড়ের টুকরো কিচ্ছু নেই, কোনো অস্তিত্বই যেন অবশিষ্ট নেই তায়ান আর অনুভার। ​আরিজ টর্চটা এদিক-ওদিক ঘোরাতে ঘোরাতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আরিজ ব্যর্থ হয়ে গার্ডদের উপর দায়িত্ব দিয়ে ফিরে যায় হসপিটালে। কারণ সেখানে অলি আর আরাফ একা। গার্ডরা নদীর পাড় ঘেঁষে পাগলের মতো খুঁজতে লাগল।

​ব্রিজের যে অংশটা থেকে তায়ান অনুভাকে নিয়ে ঝাপ দিয়েছিল, প্রমত্তা নদীর স্রোত আর ওপর থেকে পড়ার গতিবেগ দুটো মিলেমিশে ওদের শরীরকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল কিছুটা দূরে। সেখানে নদীর মূল স্রোতের ঠিক পাশেই জেগে ওঠেছে ছোট্ট, জনমানবহীন এক বালুর চর। চরের কিনারার দিকে পানির গভীরতা ছিল একদমই কম, বড়জোর কোমর সমান হবে। ​পানির সেই তীব্র ঝাপটায় তায়ানের অবশ হয়ে আসা শরীরটা যখন চরের নরম মাটির স্পর্শ পেল, সে যেন অলৌকিক কোনো শক্তি ফিরে পেল। নিজের ক্ষ”তবি”ক্ষত হয়ে যাওয়া বুকের ম”রণয”ন্ত্রণাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, সে অনুভাকে টেনে তুলল পানির ওপর, একদম শুকনো বালুর চরের বুকে।

​ধপাস করে নরম বালুর ওপর শুয়ে পড়ল তায়ান। তার সারা শরীর নিজের রক্ত, অনুভার রক্ত আর নদীর ঘোলাটে জলে একাকার হয়ে গেছে। পাশে শুয়ে থাকা অনুভার দিকে তাকাল সে। অনুভা সম্পূর্ণ চেতনাহীন। তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে আছে, মাথাটা একদিকে হেলে পড়েছে। পেট থেকে গড়িয়ে পড়া রক্ত চরের সাদা বালুটাকে কালচে লাল রঙে রাঙিয়ে দিচ্ছে।

তায়ানের নিজের বুকের ভেতর থেকে তখন আগুনের হলকা ছুটছে। প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে ফুসফুসটা যেন ঝাঁঝরা হয়ে ভেঙে আসতে চাইছে। কিন্তু নিজের সেই অসহ্য যন্ত্রনা এক পাশে ঠেলে, ঝাপসা চোখ দুটো গিয়ে থমকে গেল অনুভার পেটের ক্ষ”তটার ওপর। ​সেখান থেকে অনবরত তাজা, লাল র’ক্ত চুইয়ে চুইয়ে বালিতে মিশে যাচ্ছে। একটু আগেই নিজের জেদের বশে এই নরম শরীরটাতে সে নিজেই বু’লেট ঢুকিয়েছিল। অথচ এখন, অনুভাকে এভাবে নিথর, র’ক্তাক্ত অবস্থায় দেখে তার বুকের ভেতরটা কেমন হাহাকার করে উঠল! অদ্ভুত, অবিশ্বাস্য উন্মাদনায় তায়ান অসাড় হওয়া শরীরটাকে টেনে তোলার চেষ্টা করে সে । প্রতিটা ইঞ্চিতে তার মনে হচ্ছিল কোটি কোটি সূচ একসাথে তার হৃদপিণ্ডে বিঁধছে। মুখ গর্ত থেকে র’ক্তের দলা বেরিয়ে এল, তাও সে থামল না। দাঁতে দাঁত চেপে, প্রচণ্ড কষ্ট করে সে অনুভার পাশে উঠে বসল। ​কাঁপা কাঁপা হাতে সে নিজের গায়ের র’ক্তে ভেজা শার্টের বোতামগুলো একটা একটা করে ছিঁড়ে ফেলল। শরীর থেকে শার্টটা খুলে নেওয়ার পর তার নিজের বুকের ক্ষতগুলো অন্ধকারের মাঝে আরও ভিশন ভয়ংকর দেখাল! কিন্তু সেদিকে তার বিন্দুমাত্রও খেয়াল নেই। তায়ান দুই হাত দিয়ে শার্টটাকে মাঝখান থেকে টেনে ছিঁড় ফেলে।

​তারপর অত্যন্ত সতর্কতায়, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান কোনো কাঁচের টুকরো আগলাচ্ছে, সে অনুভার র’ক্তাক্ত পেটের ক্ষতস্থানের ওপর নিজের শার্টের কাপড় দিয়ে ব্যান্ডেজের মতো করে রাখল। তার হাত তখন অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছিল তবু সে অনুভার পেটের চারপাশটা শক্ত করে বেঁধে দিল, যাতে র’ক্তক্ষরণটা অন্তত কিছুটা কমে যায়। জানেনা এতে কতটুকু লাভ হবে। ​ব্যান্ডেজটা বাঁধার সময় তায়ানের নিজের চোখ থেকে দু ফোঁটা তপ্ত জল টপ টপ করে গিয়ে পড়ল অনুভার নিথর গালে। তায়ান নিজেই জানে না সে আসলে কী করছে, বা কেন করছে! যে মেয়েটাকে সে নিজের হাতে মা’রতে চেয়েছিল, যার পেটে সে নিজেই বু’লেট চালিয়েছে, এখন এই অবস্থাতে দাঁড়িয়ে কেন সে তাকে বাঁচানোর জন্য এতটা মরিয়া হয়ে উঠেছে? এ কেমন বৈপরীত্য? কেমন এই ভালোবাসার টান, যা মৃত্যুর দোরগোড়াতেও তাকে এতটা নিঃস্ব আর ব্যাকুল করে তোলছে?

কাজটা শেষ করে তায়ানের আর সোজা হয়ে বসে থাকার মতো এক ফোঁটা শক্তিও অবশিষ্ট রইল না। সে আবার বালির ওপর আছড়ে পড়ল। অনুভার একদম গা ঘেঁষে শুয়ে পড়ল সে। তার জখম বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। ঝাপসা হয়ে আসা চোখে সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল অনুভার ওই ফ্যাকাশে, নিস্পন্দ মুখের দিকে। এই মুখটার জন্যই সে আজ এই চরে র”ক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে, অথচ অনুভাকে অন্য কারও হতে না দেওয়ার এক পৈশাচিক তৃপ্তিও তার মনের এক কোণে খেলা করছে।

হঠাৎ করেই তায়ানের পুরো শরীরটা একটা তীব্র ঝাঁকুনি দিল উঠলো। ফুসফুস চিরে এক অসহ্য যাতনা দলা পাকিয়ে উঠে এল তার গলায়। মুখের ভেতর থেকে আরও এক দলা কালচে র”ক্ত ছিটকে বেরিয়ে এল চরের সাদা বালিতে। তায়ানের চোখের সামনে চারপাশটা ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসছে, সে বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে এসব তার সাথে! এই মুহূর্তেও তার অবশপ্রায় মস্তিষ্কে আচমকা একটা ভাবনা খেলে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে, নিজের শিরা-উপশিরা ছিঁড়ে যাওয়া কষ্টকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তায়ান আবারও কোনোমতে উঠে বসল। তার হাত কাঁপছে, শরীর কাঁপছে তবু সে নিজের র”ক্তাক্ত তর্জনী আঙুলটা দিয়ে চরের ভেজা বালির ওপর খুব কষ্টে, টেনে টেনে ১৭টি শব্দ নিয়ে ১টি বাক্য লিখল। প্রতিটা অক্ষর লিখতে তার মনে হচ্ছিল প্রাণটা শরীর থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে, তাও সে লেখাটা শেষ করল। লেখা শেষ হতেই আবারও অনুভার পাশে বালিতে ঢলে পড়ল। তার চোখের দৃষ্টি তখন স্থির হয়ে আসছে, শরীর বরফের মতো ঠান্ডা। কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে লেগে রইল সেই চিরচেনা ক্রূর, বিজয়ী হাসি। ​সে অনুভার কানের কাছে নিজের মুখটা কোনোমতে এগিয়ে নিয়ে অত্যন্ত ক্ষীণ, প্রায় বুজে আসা গলায় বিড়বিড় করে বলতে লাগল,

_“ ​এই যে তুই আমাকে ক্ষমা করলি না... এত ঘৃণা করলি... এর জন্যেও তুই অনেক পস্তাবি! আমার মৃত্যুতেও তোর মুক্তি মিলবে না ... আমাকে ক্ষমা না করার আফসোসে তুই আজীবন ছটফট করবি। মিলিয়ে নিস..”

তায়ানের শরীরটা আবারও ঝাঁকুনি খেল। সামান্য কুচকে উঠল কপালটা। তার স্থির হয়ে আসা দৃষ্টি তখনও অনুভার দিকেই নিবদ্ধ। মাথাটা একপাশে এলিয়ে সেই মানবীর দিকেই তাকিয়ে রইল। সে অপলক চেয়ে রইল সেই মানবীর দিকে, যে তাকে ধ্বংস করেও তার পুরো অস্তিত্ব জুড়ে রাজত্ব করছে। অথবা সে নিজেই এই মানবীকে ধ্বংস করেছে! কম্পিত হাতটা বাড়িয়ে নিজের শক্ত মুঠোয় মেয়েটার ঠান্ডা হাতটা চে’পে ধরল। চেতনা ডুবে যাচ্ছে কোনো এক অতল অন্ধকারে, কিন্তু সে তবু চোখ বুজল না। যেন এই মুহূর্তে চোখ বন্ধ করলে সে আর তার মায়াবিনীর মুখটা দেখতে পাবে না। পলকহীন সে তাকিয়েই রইল... পলক ফেলল না একটুও। একবারও না….একটিবারের জন্যও না...।

​কয়েক মুহূর্ত পর অনুভা চোখ পিটপিট করল। খুব ধীরে চোখ মেলতেই তার দৃষ্টিতে রাতের অন্ধকার আকাশ ধরা দিলো। প্রথমে যেন তার মস্তিষ্ক কাজ করছিল না, চারপাশটা ধোঁয়াশা লাগছিল। কিন্তু পরক্ষণেই সব স্মৃতি মনে পড়তেই সে একঝটকায় উঠে বসল। বসতেই পেটের ক্ষ’তটাতে তীব্র টান পড়ে, যন্ত্রণায় শরীর কুচকে উঠল তার। ক্ষ’তবিক্ষ’ত পেটে হাত দিতে যাবে, ঠিক তখনই সে টের পেল তার ডান হাতটা অন্য কারও শক্ত মুঠোয় বন্দি হয়ে আছে! চমকে উঠে পাশ ফিরতেই অনুভার চোখ স্থির হয়ে গেল তায়ানের ওপর।

—

​তায়ান এক বিস্তীর্ণ, রোদেলা উজ্জল সবুজ মাঠের ঘাসের ওপর বসে আছে। ফুটবল খেলার মাঠ। তবে এখানে কোনো বিরোধী দল নেই। নেই কোনো রেফারির বাশি বাজানোর শব্দ। আর না তো দর্শকের উচ্ছ্বাস। চারপাশটা একদম নিঝুম, শান্ত, শীতল। তায়ানের টানটান প্রশস্ত শরীরে জড়িয়ে আছে সেই চিরচেনা আকাশী-সাদা রঙের আর্জেন্টিনার জার্সিটা। যে জার্সি গায়ে জড়িয়ে একসময় সে পায়ের জাদুতে পুরো গ্যালারি মাতিয়ে রাখত। মাঠের ওপার থেকে বয়ে আসা শীতল বাতাস আলতো করে তার চুলগুলো ছুঁয়ে যাচ্ছিল। কী ভীষণ স্নিগ্ধ লাগছে তাকে! পায়ের কাছে ঘাসের ওপর স্থির হয়ে পড়ে আছে একটা ফুটবল। তায়ানের জীবনের সবচেয়ে চেনা, সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী।

​তার ঠিক সামনেই, ভোরের নরম আলোয় দাঁড়িয়ে আছে শুভ্র রঙের এক অপূর্ব গাউন পরিহিতা অনুভা। সে পরম আহ্লাদে তাদের সন্তানের ছোট্ট দুটি হাত নিজের মুঠোয় ধরে আলতো করে শূন্যে ঝুলিয়ে চারপাশে গোল হয়ে ঘুরছে। অনুভার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সেই আজন্ম কাঙ্ক্ষিত খিলখিলে হাসির সুর পুরো মাঠে তৈরি করছিল স্বর্গীয় আবহ। অনুভার পরনের সেই ধবধবে সাদা গাউনের ঘেরটা বাতাসে ডানা মেলার মতো উড়ছে। মায়ের হাত ধরে ঘুরতে ঘুরতে পুচকে আরাফও মাথা ঘুরিয়ে তায়ানের দিকে তাকাচ্ছে। তার মুখেও খিলখিলে বাচ্চাসুলভ হাসি। তার ডাগর ডাগর নিষ্পাপ চোখ দুটোতে চেনা এক দুষ্টুমি ভরা চকমকে আলো। সে তার বাবা আর তার সামনের ফুটবলটাকে দেখে আরও জোরে হেসে উঠছে, যেন সে এখনই বাবার কাছে এসে বলটা নিয়ে খেলতে চায়।

মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে তায়ান সেই রূপকথার মতো দৃশ্যপটের দিকে। চারপাশের এই নিখাদ শান্তি, এই বাঁধনহারা আনন্দ যেন তায়ানের বুকের ভেতরের আজীবনের সমস্ত হাহাকার, সমস্ত জেদ আর তীব্র ঝড়, সবই চলে গেছে। মায়াবী এই ক্যানভাসে কোনোরকম রক্ত নেই, কোনো বিষাক্তটা, কোনো হারানোর ভয় নেই। এই মুক্ত বাতাসে অনুভা আর আরাফ এখন শুধুই তার... চিরকালের জন্য তার। এ যেন তায়ানের নিজের সাজানো গোছানো ছোট্ট এক টুকরো জান্নাত।

—————

বিছানার সাদা চাদরটার ওপর শান্তর হাতের আঙুলগুলো সামান্য কেঁপে উঠল। চোখের ভারী পাতা দুটো ভীষণ যন্ত্রণায় এক-আধবার নড়েচড়ে বসতেই কেবিনের ভেতরে নিস্তব্ধতা ভেঙে শান্তর মায়ের কান্নার সুর ভেসে এল। শান্তর মা-বাবা এতক্ষণ ওর বিছানার পাশেই পাথর হয়ে বসে ছিলেন, ছেলের চোখের পাতা নড়তে দেখেই তাঁরা এক বুক আশা আর ব্যাকুলতা নিয়ে আরও কিছুটা ঝুঁকে এলেন ওর দিকে।

​ধীরে ধীরে চোখের পাতা মেলল শান্ত। কিন্তু চারপাশের তীব্র সাদা আলো আর চেনা-অচেনা যন্ত্রপাতির মৃদু আওয়াজে ওর মস্তিষ্কটা একদম অসাড় হয়ে রইল কয়েক মুহূর্তের জন্য। কোনো কিছু চিন্তা করার বা চেনার শক্তি যেন এক নিমেষে হারিয়ে গেছে। সে ঠিক কোথায় আছে, কেন আছে, কিচ্ছু মাথায় ঢুকছে না। ধোঁয়াটে দৃষ্টিটা একটু পরিষ্কার হতেই শান্তর চোখ গেল বেডের এক পাশে বসে থাকা চেনা মুখের ওপর। নিজের মাকে এভাবে কেবিনের ভেতরে বসে থাকতে দেখে ওর ভেতরের অসাড়তা নিমেষেই কেটে গেল, জায়গা নিল তীব্র এক বিস্ময়। শান্তর অবশ মস্তিষ্ক চাবুক খাওয়ার মতো চমকে উঠল। ​সে কোনোমতে চোখের দৃষ্টিটা ঘুরিয়ে দেওয়ালের দিকে তাকাল। সাদা দেওয়ালের টিকটিক করতে থাকা ঘড়িটায় তখন সকাল আটটা বাজছে যেটা দেখে তার বিস্ময় যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। সাথে বেডের অপর পাশে নিজের বাবাকে দেখেও শরীরে কাটেন্ট খেল যেন! এটা একটু বেশিই অপ্রত্যাশিত ছিল।

তার মানে কি এখন সকাল? কিন্তু কীভাবে? ওর বাবা-মা তো ফ্রান্সে থাকার কথা! ফ্রান্স থেকে এত দ্রুত, মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাংলাদেশে চলে আসা তো কোনোভাবেই সম্ভব না!

​বুকের ভেতরের খটকা আর অবিশ্বাস নিয়েই শান্ত ওর শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট দুটো কোনোমতে নাড়াল। ভাঙা, খসখসে গলায় প্রায় ফিসফিস করে বলল,

_“তোমরা এখানে? তোমরা এখানে কীভাবে এলে?”

​শান্তর মা যেন গত কয়েকটা ঘন্টা ধরে ঠিক এই একটা মুহূর্তের জন্যই চাতক পাখির মতো অধীর অপেক্ষায় ছিলেন। ছেলের মুখ থেকে কথা ফুটতেই তাঁর চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল আনন্দের জল। তিনি শান্তর কপালে হাত রেখে অত্যন্ত কাতর গলায় বললেন,

_“আমরা গতকাল তোর এই আশঙ্কাজনক অবস্থার কথা শুনেই প্রথম ফ্লাইটে ছুটে এসেছি, বাবা।”

​মায়ের মুখের কথাটা শুনে শান্ত এবার যেন আক্ষরিক অর্থেই আকাশ থেকে পড়ল। ওর পুরো মাথায় যেন কেউ এক বালতি বরফ-শীতল জল ঢেলে দিয়েছে। অবিশ্বাস্য চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে সে তোতলামির মতো করে বলল,

_“গতকাল মানে? আমার এই অবস্থা... এই অবস্থা তো কাল রাতেই হলো!”

​শান্তর মা এবার ছেলের গাল দুটো নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিলেন। তাঁর গলার আওয়াজটা কাঁপছিল,

_“আজকে চারদিন, বাবা! পুরো চারদিন পর তুই আজ চেতনা ফিরে পেয়েছিস...!”

চারটে দিন পুরো উবে গেছে তার জীবন থেকে! এটা শোনার পর শান্তর ভেতরের বিস্ময়টা চরম পর্যায়ে চলে গেল। চার চারটে দিন কেটে গেছে? তাহলে এতগুলো দিন ধরে মাহভিন আর আরাফ কোথায় আছে? ওরা কেমন আছে? তায়ান কি ওদের কোনো ক্ষতি করল? ​বুকের ভেতরের সেই তীব্র আতঙ্ক শান্তকে আর স্থির থাকতে দিল না। সে বিছানা ছেড়ে একঝটকায় উঠে দাঁড়াতে চাইল, কিন্তু পরক্ষণেই তার বাহু আর হাঁটুতে এক মারাত্মক টান পড়ল। চামড়া ছিঁড়ে যাওয়ার মতো তীব্র যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল সে। আসলে এই শরীর নিয়ে উঠতে যাওয়াটাই ছিল বোকামি, আর সে উঠতে পারলেও লাভ হতো না, কারণ সামনে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকা তার বাবা তাকে এই কেবিন থেকে এক পা-ও বাইরে বাড়াতে দিতেন না। ​শান্তকে ছটফট করতে দেখে তার বাবা এবার বাঘের মতো গর্জে উঠলেন।

_“একদম মে’রে তোমার আরেকটা পা-ও পঙ্গু করে দেব! এত কিছুর পরও তোমার লজ্জা হয় না? অসভ্য, বেয়াদপ ছেলে!”

​শান্তর বাবার সেই আকাশ ফাটানো ধমকে শান্ত ছাড়া কেবিনে থাকা নার্স ও শাহানা বেগম কেঁপে উঠলেন। শাহানা বেগমের আসলে এই মুহূর্তে কিছুই করার নেই, চুপচাপ স্বামীর রাগ সহ্য করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। আর আজ উনার স্বামীর এই রুদ্রমূর্তি ধারণ করাটা খুব একটা অস্বাভাবিকও নয়। এত বড় একটা ডাইনামিক বিজনেস সাম্রাজ্য তাঁর, অথচ পরিবারের মধ্য থেকে নিজের একটা আপন ভাতিজা ছাড়া আর কারও কোনো সাহায্য তিনি পান না। এত বড় জোয়ান ছেলে হয়েও সে নিজের ভবিষ্যৎ, ক্যারিয়ার, ব্যবসা, সব লাটে তুলে অন্য এক নারী আর তার সন্তানের পেছনে পাগলের মতো পড়ে আছে! এই ক্ষোভ কোনো বাবার পক্ষে হজম করা সম্ভব নয়।

বিজ্ঞাপন

_“ তোমার মতো দামরা ছেলে থাকতে আমার বিজনেসের দায়িত্ব অন্য একজনকে দিতে হয়! প্রেমিকপুরুষ গিরি ছোটাব তোমার!”

তার বাবা আরও বললেন। কিন্তু শান্তর কান এই মুহূর্তে বাবার কোনো কথাই নিচ্ছিল না। সে তার নিজের ভেতরের অস্থিরতা চেপে মুখ তুলে তাকাল। বাবার চিৎকারকে পুরোপুরি একপাশে ফেলে একদম গম্ভীর, সটান স্বরে বলল,

_“এগুলো শোনার অবস্থাতে নেই আমি এখন। আমাকে দেখতে এসেছ আমি অনেক খুশি হয়েছি। এখন তুমি চলে যেতে পারো। তাহলে আমি শুধু খুশিই নয় সাথে কৃতজ্ঞও থাকব।”

​বলেই সে তার মায়ের দিকে ঘুরে তাকাল। তার চোখের ভেতর এখন ছটফট করছে। মায়ের হাতটা চেপে ধরে ব্যাকুল গলায় বলল,

_“কোথায় ওরা মম! মাহভিন কী দেখতে আসেনি আমাকে? ও ঠিক আছে তো? মম, প্লিজ কিছু একটা বলো!”

​শান্তর মায়ের এবার আর বুঝতে বাকি রইল না যে অনুভা আর তায়ানের সাথে ঘটে যাওয়া বিভীষিকাময় কোনো কিছুই তার ছেলে জানে না। সে সম্পূর্ণ অন্ধকারের মধ্যে আছে। শাহানা বেগম আমতা আমতা করে মুখ ফুটে কিছু একটা বলতে চাইলেন, কিন্তু শান্ত উনাকে থামিয়ে দিয়ে পাগলের মতো বারবার একই প্রশ্ন করতে লাগল,

_“মম ওরা কোথায়? ওরা ভালো আছে তো?”

​ছেলের এমন অনড় পিড়াপিড়ি আর অবাধ্যতা দেখে শান্তর বাবা এবার চরম বিরক্ত হলেন। তাঁর মুখের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। তিনি আর কোনো কথা না বাড়িয়ে, ঝটকা মেরে কেবিনের দেওয়ালের রিমোটটা তুলে নিয়ে টিভি চ্যানেলটা অন করে দিলেন। শান্তর মা আটকাতে চেয়েও পারলেন না। টেলিভিশনের পর্দায় সাথে সাথেই একটা বিদেশি নিউজ চ্যানেল ভেসে উঠল। সেই চ্যানেলের ব্রেকিং নিউজে স্ক্রিনের একপাশে একটা হেলমেট পরা মেয়ের ছবি এবং অন্যপাশে জার্সি পরা একটা ছেলের ছবি বারবার ফ্ল্যাশ করছে। আর তার ঠিক নিচেই স্ক্রল করে যাচ্ছে এক হাড় হিম করা খবর!!

টিভির ঠিক মাঝখানে ইংরেজিতে বড় বড় অক্ষরে হেডলাইন উঠছে:

​"Famous footballer THV (Tayan Haris Vicky) and French National Lady Biker (Mahvin Anuva) met with a horrific accident four days ago and died on the spot. This tragic news has been confirmed by Tayan's close friend, Federico, who also stated that their bodies remain missing."

​

যেটার বাংলা-

[​"বিখ্যাত ফুটবলার টিএইচভি (তায়ান হারিস ভিকি) এবং ফ্রান্সের ন্যাশনাল লেডি বাইকার (মাহভিন অনুভা) চার দিন আগে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়ে সেদিনই ঘটনাস্থলে মা’রা গেছেন। তায়ানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফেডেরিকো এই মর্মান্তিক খবরটি নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি আরও জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার পর থেকে আজ পর্যন্ত তাদের লা’শ বা কোনো দেহাবশেষ খুঁজে পাওয়া যায়নি।"]

ব্যস! এতটুকুই যথেষ্ট ছিল শান্তর পুরো শরীর বরফ-শীতল করার জন্য। বুকের ভেতরটা যেন এক নিমিষে শূন্য কোনো মহাকাশে পরিণত হলো, যেখানে কোনো বাতাস নেই, কোনো স্পন্দন নেই। তার চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে রইল টিভির স্ক্রিনের ওপর। চোখ দুটো অশ্রুতে ভরে উঠল, কিন্তু সেই জল গড়িয়ে পড়ার আগেই শান্তর ভেতরের স্তব্ধতা অদ্ভুদ উন্মাদনায় রূপ নেয়।

_​“না... না! এটা হতে পারে না! এটা মিথ্যা!”

​শান্ত আচমকা এক প”শুর মতো চিৎকার করে উঠে। তার সেই গগনবিদারী আর্তনাদে হাসপাতালের কেবিনের দেওয়ালগুলো পর্যন্ত যেন কেঁপে উঠল। সে নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে, এক ঝটকায় ছিঁড়ে ফেলল গায়ের সমস্ত স্যালাইনের পাইপ আর মনিটরের তার। চামড়া কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ল বিছানায়, কিন্তু সেই যন্ত্রণার চেয়ে তার বুকের ভেতরের যন্ত্রণাটা তখন লক্ষ গুণ তীব্র! সে এসবের ধার একদমই ধারল না।

_​“শান্ত! শান্ত হ বাবা! কী করছিস তুই?” শাহানা বেগম চিৎকার করে ছেলেকে জাপটে ধরতে গেলেন, কিন্তু শান্ত তখন এক দিশেহারা উন্মাদ। সে তার মাকে ঝটকা মেরে সরিয়ে দিয়ে বিছানা থেকে নিচে নামতে চাইল। ​কিন্তু ভাঙা পা আর অবশ বাহু তাকে সঙ্গ দিল না একটুও। ভারী একটা পাথরের মতো মেঝেতে আছড়ে পড়ল সে। মাটিতে পড়ে গিয়েও তার পাগলামি থামল না। সে দুই হাতে মেঝে খামচে ধরে দরজার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগল, যেন এখনই সে এখান থেকে হেঁটে মাহভিনকে খুজতে চলে যাবে।

_​“মাহভিন! মাহভিন তোমার কিছু হতেই পারে না। আমাকে ছেড়ে যেতে পারো না! সব নাটক, তায়ানের সব চাল এগুলো!”

শান্তর বাবা ইশারায় নার্স আর হাসপাতালের সিকিউরিটিকে ডাকলেন। শান্ত তখন মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থাতেই বাবার দিকে তাকিয়ে তীব্র আ*ক্রোশে চেঁচিয়ে উঠল। সে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না যে, যে মেয়েটাকে সে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসে এসেছে, যার এক চিলতে হাসির জন্য সে নিজের পরিবার-সংসার সব ত্যাগ করেছিল, সেই মেয়ে আর এই পৃথিবীতে নেই! চার দিন আগেই তার অস্তিত্ব শেষ হয়ে গিয়েছে, অথচ শান্ত এখানে এতদিন ধরে মড়ার মতো ঘুমিয়ে ছিল! এটা অসম্ভব! মাহভিনের কিচ্ছু হয়নি।

_​“আমাকে যেতে দাও! বাবা, আল্লাহর দোহাই লাগে আমাকে আটকিও না! আমি মাহভিনকে খুঁজতে যাব! ওদের লা’শ কোথাও পাওয়া যায়নি মানে ও বেঁচে আছে! ও কোথাও মরে পড়ে থাকতে পারে না! ও আমার কাছে আসবে... মম, তুমি তো বিশ্বাস করো? মম, বলো না ও বেঁচে আছে!”

​শান্ত মেঝেতে বসে দুই হাতের মুঠো শক্ত করে ডুকরে কাঁদতে লাগল। তার পুরো শরীরটা তখনো রাগে আর অবিশ্বাসে কাঁপছে। শান্তর এই আর্তনাদ, পাগলামির শব্দ শুনে করিডোর থেকে আরিজ হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে কেবিনের ভেতরে এলো। ঘরের ভেতরের এই ধ্বংসাত্মক অবস্থা আর শান্তকে মেঝেতে ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে সে এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। সে দ্রুত শান্তর পাশে এসে হাঁটু গেড়ে বসল, তারপর শান্তকে শান্ত করার চেষ্টা করতে করতে সেদিন শান্তর গায়ে গু’লি লাগার পর থেকে আজ পর্যন্ত ঠিক কী কী ঘটেছিল, সবকিছু এক নিঃশ্বাসে খুলে বলতে লাগল। ​আরিজের মুখ থেকে একেকটা সত্য বের হচ্ছিল আর শান্তর চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উঠছিল। আরিজ জানাল, গত চারটে দিন ধরে তারা আকাশ-পাতাল এক করে তায়ান আর অনুভাকে খুঁজেছে, কিন্তু কোথাও কোনো চিহ্ন মেলেনি। আর আজ, চারদিন টানা খোঁজাখুঁজির পর হুট করেই রিকো নিজের সিদ্ধান্তেই বিশ্বের সমস্ত মিডিয়াকে ডেকে এই নিখোঁজ হওয়ার আর মৃ’ত্যুর খবরটা জানিয়ে দিয়েছে।

———

একই নিউজ তখন চলছিল অনুভাদের বাড়ির লিভিং রুমের টেলিভিশনটাতেও। গত চারটে দিন ধরে এই বাড়ির প্রতিটি মানুষের অবস্থা এমনিতেই ভীষণ খড়কুটোর মতো নড়বড়ে হয়ে আছে। আর আজকের এই ব্রেকিং নিউজটা যেন এসে তাদের শেষ আশাটুকুও চিরকালের জন্য ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল। বাড়ির সবাই একদম পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে বসে টিভির পর্দার দিকে চেয়ে আছে। কারো চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে, কেউ বা একদম নিস্প্রাণ। ​উর্মিলা বেগম এক বাটি সুজি হাতে নিয়ে আরাফকে কোলে নিয়ে বসে আছেন। তাঁর কোলে ছটফট করছে ছোট্ট আরাফ। ছেলেটাকে জোর করে হলেও দু-এক চামচ মুখে তুলে দেওয়ার এক ব্যর্থ চেষ্টা করছেন তিনি। বাচ্চাটা গত চারটে দিন ধরে তার মা আর পাপার জন্য একাধারে কেঁদে চলেছে। তার ভাঙা ভাঙা বুলি জুড়ে মা আর পাপা ছাড়া আর কোনো নাম নেই। কোনো খেলনা, কোনো আদর, কোনো কিছু বুঝিয়েই তাকে এতটুকু শান্ত করা যাচ্ছে না। সে কোনো কিছু মুখেও তুলতে চাইছে না। তবু উর্মিলা বেগম জানেন তার এই চেষ্টা ব্যর্থ হবে, তাও এক বুক কষ্ট নিয়ে তিনি নাতিটাকে খাওয়াতে বসেছেন। অন্যদিকে আমীরা বেগমের অবস্থা প্রায় পাগলপ্রায়ের মতো। তার যেন হুশ থেকেও নেই। তিনি এককোণে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে সারাক্ষণ ঠোঁট নেড়ে বিড়বিড় করে কী যেন বলে যাচ্ছেন।

কান্নার মাঝেই আরাফের চোখ আচমকা গিয়ে পড়ল উজ্জ্বল ওই টিভির স্ক্রিনটার ওপর। পর্দায় তখন ভেসে উঠেছে তায়ানের ছবি। আরাফ দেখল সেই চেনা লোকটাকে, যে মাঝে মাঝে তার সামনে এসে তাকে জোর করে কোলে তুলে নিত, পকেট থেকে ললিপপ বের করে দিত। বুকে চেপে ধরে আকুতি ভরা কন্ঠে বারবার বলত, 'আমাকে একটা বার বাবা বলো'। তায়ানের চেনা মুখটা দেখতেই আরাফের কান্নাকাটি যেন এক নিমেষে থমকে গেল। সে ভারী কৌতূহল নিয়ে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইল টিভির দিকে।

​তার সেই ছোট্ট কৌতূহলী মস্তিষ্কটা মুহূর্তের মধ্যেই যেন এক অনাবিল উচ্ছ্বাসে ভরে উঠল। লোকটা তাকে কতকত খেলনা এনে দিতো! পেছনের সব দুঃখ ভুলে, মুখের নিচের দুটো ছোট্ট দাঁত বের করে একগাল হেসে দিয়ে টিভির দিকে নরম দু’হাত হাত বাড়িয়ে বলল,

_“বা-বাব্বা, বাবা! বাবা...!”

তার মুখের এই একটা শব্দ, এই প্রথম উচ্চারণ করা 'বাবা' ডাকটা লিভিং রুমে উপস্থিত সবার বুকের ভেতরটায় মোচড় দিয়ে উঠল! অলি নিজের ভেতরের জমে থাকা বাঁধভাঙা কান্না আর কোনোভাবেই চেপে রাখতে পারল না; দুই হাতে মুখ ঢেকে সে ওখানেই ডুকরে কেঁদে দেয়। এই নিষ্পাপ ছেলেটা যদি আজ জানত যে টিভির পর্দায় তার বাবার এই ছবি দেখানোর পেছনের আসল রহস্যটা কী! সে যদি বুঝত যে 'মৃত' শব্দের মানে কী, সে চিরকালের জন্য এতিম হয়ে গিয়েছে!

​ঘরের বাকিরা কান্নায় ভেঙে পড়লেও, আরাফের মুখে এই প্রথম 'বাবা' ডাক শুনে আমীরা বেগমের ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত, মায়াবী হাসি ফুটে উঠল। উনার চোখের শূন্যতা কেটে গিয়ে সেখানে খেলা করে গেল এক পরম তৃপ্তি। তিনি শূন্য ছাদের দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে, যেন তায়ানকে সে দেখতে পাচ্ছেন,এমন এক সুরে বললেন,

_“দেখেছিস তায়ান! তোর ছেলেও আজ তোকে বাবা ডাকল রে। তোর তো সব কষ্ট শেষ রে বাবা... তুই যে জিনিসের জন্য এতদিন চাতকের মতো চেয়েছিলি, আজ তো তুই সেই সব পেয়ে গেলি। তুই জিতে গেলি বাবা।”

​আরাফের মুখের সেই নিষ্পাপ হাসিটা খুব বেশি সময় স্থায়ী হলো না। তায়ানের ছবির পরই যখন পরবর্তী স্ক্রিনে ঝিলিক দিয়ে তার মায়ের সেই চিরচেনা, মায়াবী মুখটা ভেসে উঠল, তখন আরাফের ঠোঁট দুটো আবার অভিমানে আর কান্নায় ভেঙে এলো। মা কেন তাকে ছেড়ে ওই কাঁচের বাক্সের ভেতর বসে আছে? মা’টা এতো পঁচা হয়েছে! এতদিন ধরে সে কেঁদে চলেছে তবু আসছে না! কতদিন মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে ঘুমায় না সে! বাক্সের ভেতর বসে কীভাবে হাসছে! তাকে কাঁদিয়ে কীভাবে হাঁসছে তার মা! একদম বাজে তার মা! তাকে নিয়ে গেলেও তো পারত বাক্সের ভেতর। সে টিভির স্ক্রিনের দিকে ব্যাকুল হয়ে দুই হাত বাড়িয়ে দিয়ে এক আকুল, অস্পষ্ট গলায় কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল,

_“মা, কোলে... মা...ও মা…!”

কোনো লাভ হলো না। তার মা সেই নিস্প্রাণ কাঁচের স্ক্রিন থেকে বের হয়ে এলো না। নাম ধরে ডেকে নিলো না তাকে বুকে টেনে। নিজের জন্মদাত্রীকে এভাবে চোখের সামনে পেয়েও বুকে জড়িয়ে না পেয়ে, ছেলেটা এক অভিমানে ধপ করে চোখ দুটো বুজে মাথাটা নিচু করে ফেলল। মায়ের ওপর তীব্র রাগ আর কষ্ট নিয়ে সে আবার উন্মাদের মতো কেঁদে কেঁদে তার পুরো ফর্সা মুখটা একদম টকটকে লাল করে ফেলল। পুরো ঘরে তখন কেবল একটা নিষ্পাপ শিশুর বুকফাটা কান্নার শব্দ আর টিভির যান্ত্রিক আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।

বিজ্ঞাপন
রক্ত রেখার আড়ালে গল্পটি আয়েশা শেখ রিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে মোড়ানো থ্রিলার উপন্যাস