রক্ত রেখার আড়ালে

পর্ব - ৫২

🟢

_​“ওঠ, আর কত ঘুমাবি? কীরে, ওঠ! অনু!”

​রাশভারী কণ্ঠস্বরটা কানে আসতেই চোখের পাতা কেঁপে উঠল অনুভার। এক তীব্র অবশতায় শরীরটা ভারী হয়ে আছে। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ রেখেই সে মাথাটা এদিক-ওদিক ঘোরাল, যেন নিজের চেতনাকে জোর করে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। তারপর ঝট করে চোখ মেলে পাশের দিকে তাকাল। তায়ানকে তার পাশের বেডে শুয়ে থাকতে দেখে স্বস্তির শ্বাস ফেলল মেয়েটা। এতক্ষণের জমে থাকা সব ভয় নিমেষেই উবে গেল যেন।

_​“যাক, ডক্টরের কথাই ঠিক হয়েছে। আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।” তায়ান পাশের বেডে শুয়ে থাকা অবস্থাতেই বেশ শান্ত গলায় বলল।

​কিন্তু অনুভার চোখের পাতা দুটো আবারও ভারী হয়ে আসছে। চারপাশের সবকিছু কেমন ঝাপসা, অস্পষ্ট লাগছে। সে অবশ হাতটা কোনোমতে বাড়িয়ে তায়ানের খোলা বুকের ব্যান্ডেজ করা অংশটুকু একটু ছুঁয়ে দেখতে চাইল, নিশ্চিত হতে চাইল মানুষটা ঠিক আছে কি না। তবে আঙুলের ডগা তায়ানের শরীরের কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই তার চোখের পাতা বুজে এলো, আবারও অতল অবচেতনায় তলিয়ে গেল মেয়েটা। ​তায়ান আর ডাকল না। কেবিনের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রিকো আর হাসপাতালের প্রধান ডাক্তার একদৃষ্টিতে সেদিকেই তাকিয়ে ছিলেন। গত চার দিন ধরে অনুভার সাথে ঠিক কতবার যে এমন হয়েছে, তার কোনো হিসেব নেই। একটুখানি জ্ঞান ফেরে, তায়ানকে দেখে স্বস্তি পায়, আর পরক্ষণেই আবার ঢলে পড়ে গভীর ঘুমে। রিকো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডাক্তারের দিকে ঘুরে তাকাল। অত্যন্ত ঠান্ডা ও গম্ভীর গলায় বলল,

_“আপনি ডেথ রিপোর্ট রেডি করুন, দুজনেই মা’রা গেছে।”

​চমকে উঠলেন ডাক্তার। চোখ দুটো কপালে তুলে বললেন,

_​“But why? Why both of them?”

_​“আমি বলেছি তাই।” ডাক্তারকে কথা শেষ করতে না দিয়েই রিকো শক্ত গলায় মাঝপথে থামিয়ে দিল। তার চিবুক শক্ত হয়ে উঠল, _“আপনি রিপোর্ট রেডি করুন, আমি মিডিয়ার লোকেদের খবর দিচ্ছি। এর জন্য যত টাকা লাগে, আমি আপনাকে দেব। আপাতত যা বলছি, সেটাই করুন।”

​ডাক্তারকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না রিকো। হনহন করে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো বাইরে। করিডোরে এসেই নিজের একজন বিশ্বস্ত গার্ডকে ডেকে কড়া গলায় নির্দেশ দিল, এখনই যেন আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে এই মৃ’ত্যুর খবরটা ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

​সব নির্দেশনা শেষ করে রিকো ধপ করে হাসপাতালের একটা খালি বেঞ্চের ওপর বসে পড়ল। দুই হাতের তালুতে মুখ ঢাকল সে। তারা এখন সিঙ্গাপুরের একটা অত্যন্ত গোপন হসপিটালে আছে। সেদিন রিকোকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে, তাকে না জানিয়েই তায়ান এই মারাত্মক কাণ্ডটা ঘটিয়েছিল। এমনকি রিকোর ড্রিংকসের সাথে কড়া ঘুমের ওষুধ খাইয়ে তাকে হোটেলে অবচেতন করে রেখেছিল তায়ান। তারপর নিজের পার্সোনাল গার্ডদের নিয়ে অনুভাদের গাড়ি আটকেছিল। কারণ তায়ান খুব ভালো করেই জানত, রিকো জেগে থাকলে তাকে কখনোই নিজের ইচ্ছেমতো এত বড় পাগলামি করতে দিত না। রিকো যখন ঘুম থেকে জেগে সব জানতে পেরে সেই ব্রিজে পৌঁছায়, ততক্ষণে সব শেষ। তখন অলরেডি অনুভা আর তায়ান ব্রিজ বেদ করে পানিতে পড়ে গেছে। রিকো এক মুহূর্ত সময় ব্যয় না করে নিজের সর্বোচ্চ ক্ষমতা ব্যবহার করে ইমার্জেন্সি হেলিকপ্টার আনায়। তারপর চড় থেকে ওদের উদ্ধার করে সরাসরি সিঙ্গাপুরের এই হসপিটালে নিয়ে আসে।

_​“নে, এটা খা। চারদিন ধরে কিছুই খাচ্ছিস না। এভাবে থাকলে তুই নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়বি।”

​এলেনা এসে রিকোর পাশে বসল এবং তার দিকে একটা স্যান্ডউইচ বাড়িয়ে দিল। খাবারটা ও একটু আগেই হসপিটালের ক্যান্টিন থেকে কিনে এনেছে। এলেনা আর রিকো, দুজনের মুখই শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে, চোখ দুটো ফোলা আর লাল। রিকোর কাছ থেকে খবরটা পাওয়ার পর থেকেই এলেনা সব ছেড়েছুড়ে এখানে চলে এসেছে। অনুভার ওপর এলেনার এখন আর রাগ বা ক্ষোভ নেই। নিজের বাবা যে পর্দার আড়ালে থেকে অনুভা আর তায়ানের জীবনে এত বড় কুকীর্তি ঘটিয়েছেন, তা জানার পর থেকে এলেনা নিজেই এখন নিজের বাবাকে ঘৃণা করে।

_​“আমি খাবো না, তুই খা।” রিকো স্যান্ডউইচটা সরিয়ে দিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল।

​রিকোকে খুব বেশি চিন্তিত আর বিধ্বস্ত লাগছে। এলেনা স্যান্ডউইচটা পাশে রেখে রিকোর কাঁধ ধরে নিজের দিকে ফেরাল। গভীর চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

_“সবাইকে লুকিয়ে এই সিঙ্গাপুরে এসে মিডিয়াতে এই মিথ্যে খবরটা কেন দিচ্ছিস রিকো? এসব কেন করছিস?”

​রিকো কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। করিডোরের সাদা দেয়ালটার দিকে তাকিয়ে একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,

_“জানি না। তবে আমার ভেতরের মন বলছে, এই মুহূর্তে এটাই করা সবচেয়ে বেশি উচিত।”

—————

আর্জেন্টিনার এক দুর্গম, জনমানবহীন পাহাড়ি অঞ্চলের শেষ সীমানা। চারপাশটা নিকষ কালো পাথরে ঘেরা, আর তার নিচেই আদিগন্ত বিস্তৃত এক অতল খাদ, যার গভীরতার আদৌ কোনো শেষ আছে কি না, তা ওপর থেকে বোঝা অসম্ভব। সেই খাদের কিনারায়, মরণ-ফাঁসের মতো ঝুলছে দুটি রক্তাক্ত পা। পায়ের পাতা বেয়ে টুপটাপ করে তাজা রক্ত ঝরছে নিচের ওই সীমাহীন অন্ধকারের বুকে। ওখানে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে ডন রিকার্ডোকে। তায়ান যখন সব সত্য জানতে পেরে আর্জেন্টিনা ছুটে আসে, তার নিখুঁত নজর এড়াতে পারেনি রিকার্ডো। সেই পরিত্যক্ত, অভিশপ্ত গির্জার ভূগর্ভস্থ গোপন আস্তানা থেকেই তায়ান তাকে খুঁজে বের করে। অবশ্য রিকার্ডোর নিজেরও আর বেঁচে থাকার তেমন কোনো ইচ্ছা ছিল না। তায়ানের মতো এক হিংস্র প্রতিপক্ষের হাত থেকে এত কিছুর পর নিজের জীবন ভিক্ষা আশা করাটা যে চরম বোকামি। আজ তায়ানের হাতে যে অসীম ক্ষমতা, তা কোনো উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া নয়, রিকার্ডোর নিজের স্বার্থে, নিজের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে সে নিজেই এই দানবীয় ক্ষমতা তায়ানের মধ্যে তৈরি করেছিল। সেই ক্ষমতার পুরোটা দিয়েই সে রিকার্ডোকে নিঃশেষ করবে। কিন্তু তায়ান যে তার সাথে এতটা ভয়ানক, এতটা পৈশাচিক খেলা খেলবে, তা রিকার্ডো তার দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি।

আঠারো দিন ধরে সে এই পাহাড়ের কিনারায়, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ঝুলছে। একসময়ের প্রতাপশালী, পরিপাটি রিকার্ডোর সেই রাজকীয় চেহারা আজ চেনার উপায় নেই। আঠারো দিনের অনাহার, ঝড়-বৃষ্টি আর রোদে তার শরীরের চামড়া পুড়ে তামাটে আর খসখসে হয়ে গেছে। গালের হাড়গুলো ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে, চোখের কোটর দুটো দেবে গেছে ভেতরের দিকে। একসময়ের সুঠাম শরীরটা শুকিয়ে চামড়া আর হাড়ের একটা কঙ্কালসার খাঁচায় পরিণত হয়েছে। ঝুলিয়ে রাখার কারণে তার হাত-পায়ের জয়েন্টগুলো প্রায় বিচ্ছিন্ন হওয়ার উপক্রম। পায়ের নখ উপড়ে ফেলা অংশ প’চে-গলে সেখান থেকে অনবরত রক্ত চুইয়ে পড়ছে। তার এই জীবন্ত লাশের মতো দশা দেখে এখন আর বোঝার উপায় নেই যে, এই লোকটাই গ্যাংস্টারদের গ্যাংস্টার ছিল।

তায়ান চাইলে পারতো। তায়ান চাইলে তাকে এখানে খুঁজে পাওয়ার প্রথম দিনই বুকে একটা বুলেট চালিয়ে দিয়ে গল্পটা শেষ করে দিতে। কিন্তু না! রিকার্ডোর মতো একজন পাপিষ্ঠের জন্য এক গু’লিতে মৃত্যু পাওয়াটা বোকামি, বড্ড বেশি সস্তা শাস্তি হয়ে যেত সেটা!

আজ পর্যন্ত তায়ানের জীবনে যত ঝড় এসেছে, যত ধ্বংসলীলা চলেছে, তার সবকিছুর মূল সূত্রপাত তো এই একটা লোক! এই পি’শাচটার নিখুঁত ষ’ড়’যন্ত্রের কারণেই তায়ান নিজের আসল বাবা আর সাজানো পরিবারকে হারিয়েছে। এই লোকের বোনা মিথ্যের জালের কারণে সে নিজের জন্মদাত্রী মাকে আজীবন খারাপ চোখে দেখে এসেছে, মনে মনে ঘৃণা করেছে। তার কারণেই ছোটবেলা থেকে যাকে নিজের জন্মদাতা বাবা জেনে বড় হয়েছে, সেই নিরপরাধ মানুষটাকে সে অজান্তেই কষ্ট দিয়েছে। আর সবশেষে... নিজের একমাত্র ভালোবাসা মাহভিনকে! অনুভাকেও এই লোকটা তায়ানের জীবন থেকে কেড়ে নিতে চেয়েছিল। এতগুলো জীবনের ধ্বংসের পেছনে যে লোকটা দায়ী, সে একটা সামান্য বু’লেটের আঘাতে নিমেষেই সব য’ন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে? এক গু’লিতে মরে গেলে কী এমন শাস্তি হবে তার? না, তায়ান তাকে অত সহজে মরতে দেবে না। রিকার্ডোকে প্রতিটা সেকেন্ড মরতে হবে, প্রতিটা নিঃশ্বাসে অনুশোচনা আর যন্ত্রণার আগুনে পুড়তে হবে।

তায়ান এতে সফলও হয়েছে। রিকার্ডোর মতো একজন ক্ষমতাধর মানুষকে সে মৃত্যুর আগে ক্ষমতার চূড়া থেকে টেনে এনে পশুর চেয়েও অধম স্তরে নামিয়ে দিয়ে গেছে। সে এখন আর একটা মুহূর্তও বেঁচে থাকতে চায় না। এই অসহ্য, অমানুষিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সে এখন ব্যাকুল হয়ে শুধু নিজের মৃত্যু কামনা করছে। তায়ান তাকে এমন এক ফাঁদে ঝুলিয়ে দিয়ে গেছে, যেখানে চাইলেও সে নিজে আত্মহত্যা করতে পারছে না, আবার কেউ তাকে উদ্ধারও করতে পারছে না। ​সারাজীবন যে লোকটা শয়তানকে দেবতা মেনে এসেছে, অন্ধকারের উপাসনা করেছে, সে আজ সমস্ত দম্ভ ভুলে, সমস্ত পাপের বোঝা মাথায় নিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠছে। খাদের কিনারায় ঝুলতে থাকা রিকার্ডোর সেই কঙ্কালসার শরীরটা যখন বাতাসের তীব্র ধাক্কায় দুলে ওঠে, তখন সে শূন্য আকাশের দিকে চোখ মেলে, তার ফেটে যাওয়া শুষ্ক ঠোঁট জোড়া চিরে তীব্র আর্তনাদ করে ওঠে। যে পবিত্র নাম সে কোনোদিন জীবনে মুখে নেয়নি, আজ যন্ত্রণার শেষ সীমায় দাঁড়িয়ে সেই নামটাই তার গলা চিরে ঠিকরে বেরিয়ে আসে,

বিজ্ঞাপন

_​“আল্লাহ! ওহ আল্লাহ! আমাকে এই নরক থেকে মুক্তি দাও! আমাকে মেরে ফেলো... আর সহ্য হচ্ছে না!”

​একজন আজন্ম পাপীর মুখে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকার এই করুণ ও বুকফাটা চিৎকার জনমানবহীন পাহাড়ের দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। কিন্তু সেই পাহাড়ে রিকার্ডোর এই আর্তনাদ শোনার মতো কেউ নেই। তায়ান নিখুঁতভাবে জিতে গেছে।

————

মাঝখানে কেটে গেছে আরও পাঁচটা দিন। এই দীর্ঘ সময়ে শান্ত একবারের জন্যও হাসপাতাল থেকে বের হতে পারেনি তার বাবা ইয়াসির খানের জন্য। কড়া নজরদারিতে রেখেছে তাকে। এই দিনগুলোতে সে না পেরেছে অনুভার কোনো হদিস করতে, আর না পেরেছে আরাফের কাছে পৌঁছাতে। আরাফের কথা আরিজকে যতবারই সে জিজ্ঞেস করেছে, ততবারই আরিজ অভয় দিয়ে বলেছে, ও ভালো আছে। ​তবু শান্তর মন মানছে না, এক মুহূর্তের জন্যও সে শান্তি পাচ্ছে না। বুকের ভেতরটা সারাক্ষণ ছটফট করছে। খাবার ছোঁয়া তো দূরের কথা, নার্স জোর না করলে প্রয়োজনীয় ওষুধটুকুও সে মুখে তুলছে না। তার অবাধ্য মনটা বারবার শুধু ওই আরাফের জন্য অস্থির হয়ে উঠছে। আজ রাতে বিশেষ একটা জরুরি কাজে ইয়াসির খান হাসপাতালের বাইরে যান। দীর্ঘদিনের ক্লান্তিতে শাহানা বেগমও তখন পাশের সোফাটায় গভীর ঘুমে ঢুলছেন। মায়ের সেই অসতর্ক মুহূর্তটিকে কাজে লাগিয়ে শান্ত বিছানা থেকে নেমে পড়ল। নিজের জোড়া ক্র্যাচ বগলে চেপে, নিজের সমস্ত শারীরিক কষ্টকে উপেক্ষা করে সে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসে।

​ক্ষত পা নিয়ে হেঁটে হেঁটে সে এসে পৌঁছাল অনুভাদের চেনা বাড়ির সামনে। প্রধান ফটক গলে ভেতরের দরজায় পা রাখতেই, ওপর তলা থেকে একটা শিশুর কান্নার আওয়াজ তার কানে ভেসে এলো। সেই চেনা অথচ অসহায় কান্নাটা শোনামাত্র শান্তর বুকের ভেতরটায় যেন ধারালো কোনো অস্ত্র আমূল বসে গেল! গুনে গুনে দীর্ঘ নয়টা দিন হয়ে গেছে অনুভা নেই। এই দিনগুলোতে মা-বাবা ছাড়া তার পুচকে ছেলেটা যে কতখানি কষ্ট পেয়েছে, তা শান্তর চেয়ে ভালো আর কে বুঝবে? ​শান্ত ক্র্যাচে ভর দিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে ভেতরের দিকে এগিয়ে গেল। লিভিং রুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে ওপরের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ডাকল,

_“আরাফ! পাপা, আমার... আরাফ দেখো, আমি এসেছি!”

​শান্তর সেই চেনা গলার আওয়াজ ওপরের ঘরে পৌঁছানো মাত্র আরাফের কান্না নিমেষেই স্তব্ধ হয়ে গেল। এতক্ষণ উর্মিলা বেগম আর অলি মিলে ঘরের ভেতর তাকে ঘুম পাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। কিন্তু পাপার কণ্ঠস্বর শোনামাত্রই ছেলেটা তার ভেজা চোখমুখ এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে ব্যাকুল হয়ে কাউকে খুঁজতে শুরু করল। অনবরত কান্নার কারণে তার পুরো মুখটা তখনো লাল হয়ে আছে। ​শান্ত নিচ থেকে আবার ডেকে উঠল,

_“আমার লিটল প্রিন্স! তুমি কোথায়? পাপা এসেছে তো!”

​ওপরের ঘর থেকে আরাফও তার ভাঙা আধো-আধো গলায় সাড়া দিল,

_“পাপা...!”

​শান্ত ওপরের দিকে চেয়ে দেখল, অলি আরাফকে কোলে নিয়ে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসছে। অলির কোল জুড়ে থাকা আরাফের ছটফটানি দেখে মনে হচ্ছিল, সে যেন এখনই ডানা মেলে উড়ে এক লাফে পাপার বুকে এসে পড়বে! এক সেকেন্ডের বিলম্বও তার সহ্য হচ্ছে না। এদিকে নিজের কলিজার টুকরোকে চোখের সামনে অক্ষত দেখে শান্তর চোখের বাঁধ ভেঙে গেল। সে নিজেও অবোধ শিশুটার মতো ডুকরে কেঁদে উঠল। অলি সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছানোর আগেই শান্ত হাতের ক্র্যাচ দুটো মেঝেতে ফেলে দিল। নিজের সবটুকু শক্তি এক করে সে ওখানেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল, যেন তার রাজপুত্র এসে সরাসরি তার চেনা আশ্রয়টুকু খুঁজে পায়।

অলি সিঁড়ির শেষ কয়েকটা ধাপ নামার আগেই আরাফ অলির কোলে এক মুহূর্তের জন্যও স্থির থাকল না। শরীরটা ছটফট করে, মোচড় দিয়ে কোল থেকে নিচে নামার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল। অলি ওকে শক্ত করে ধরে রাখার চেষ্টা করেও পারল না, অবুঝ ছেলেটা এক রকম জোরাজুরি করেই ওর কোল ঘেঁষে মেঝেতে নেমে গেল। ​পায়ের নিচে মাটি পেতেই আরাফ কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে এলোমেলো, কাঁপাকাঁপা কদম ফেলে দৌড়ে সিঁড়ি থেকে নামতে শুরু করল। ঠিকমতো ব্যালেন্স সামলাতে না পেরে সিঁড়ির শেষ ধাপে এসে আচমকা একবার হুমড়ি খেয়ে পড়েও গেল ছেলেটা। হাঁটুতে কিংবা হাতে হয়তো চোট লাগল, কিন্তু সে এতটুকু কাঁদল না, থামল না, যেন ওই যন্ত্রণার চেয়েও পাপার কাছে পৌঁছানোর তাগিদটা তার কাছে অনেক বড়। মেঝে থেকে ঝটপট উঠে দাঁড়িয়ে সে আবারও এক দৌড়ে এসে ছিটকে পড়ল শান্তর বুকের ওপর। ​শান্ত দুই চোখ বুজে নিজের সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে ঝাপটে ধরল তার এই আত্মিক মানিককে। বুক চিরে একটা দীর্ঘ, তপ্ত শ্বাস বেরিয়ে এলো তার। এতগুলো দিন ধরে বুকের ভেতর যে একাকীত্বের হাহাকার আর শূন্যতার পাথর জমে ছিল, আরাফের এই ছোট্ট শরীরের উষ্ণতায় তা যেন এক নিমেষে গলে জল হয়ে গেল। মনের ভেতরের ক্ষতটা যেন একটু হলেও উপশম পেল। পুচকে আরাফ তার ছোট ছোট হাত দুটো দিয়ে শান্তর শার্টের কলারটা এমন ভাবে চেপে ধরল, যেন হাত আলগা করলেই তার এই পাপাকে সে আবারও চিরকালের জন্য হারিয়ে ফেলবে।

গত নয়টা দিন এই অবোধ শিশুটার ভেতর যে কী ঝড় গেছে, তা কেবল ওই জানে। তার তো দমবন্ধ হয়ে আসে! মা আর পাপাকে চোখের সামনে না দেখলেই তার ছোট্ট পৃথিবীর আলো নিভে যায়, চারপাশটা অন্ধকার লাগে। শান্ত আরাফকে নিজের বুক থেকে আলগা করে আলতো হাতে ওর চোখের কোনায় জমে থাকা নোনা জলটুকু মুছে দিল। নিজের কলিজার টুকরোটার দিকে তাকিয়ে শান্তর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। অনাহারে, অনিদ্রায় আর অনবরত কান্নায় ছেলেটার সেই চিরচেনা ফর্সা, ফুটফুটে মুখটা একদম শুকিয়ে কালচে হয়ে গেছে। চোখের নিচে কালশিটে দাগ, ঠোঁট দুটো তখনো এক অবাধ্য অভিমানে কাঁপছে। শান্ত নিজের চোখের জল চেপে রেখে আরাফের কপালে, গালে, বন্ধ চোখের পাতায় বারবার ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। ভাঙা গলায় বিড়বিড় করে বলতে লাগল,

_“পাপা আর কোথাও যাবে না, সোনা। পাপা তোমার কাছেই থাকবে। আর কেঁদো না, বাবা।”

​আরাফ হয়তো শান্তর সব কথার অর্থ বুঝল না, কিন্তু এই চেনা গলার আশ্বস্ততাটুকু তার অবুজ মনে গিয়ে পৌঁছাল। সে আবারও নিজের ছোট্ট দুটো হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরল শান্তর গলা। এতক্ষণের সেই বুকফাটা কান্নাটা এবার থামিয়ে দিলেও, তার ছোট্ট বুকটা থেকে থেকে হেঁচকি তুলে কেঁপে কেঁপে উঠছে। শান্তর ঘাড়ের কাছে মুখ গুঁজে সে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়টুকু খুঁজে পেল নিষ্পাপ প্রানটা।

​অলি পাশে দাঁড়িয়ে স্তব্ধ হয়ে, নিস্পন্দ চোখে দেখছিল এই দৃশ্য। বাড়িটায় আরাফের রক্তের সম্পর্কের মানুষের কোনো অভাব নেই। তার নিজের খালামণি, নানি, দাদী, চাচা, সবাই এখানে উপস্থিত। রক্তের বাঁধনে বাঁধা এতগুলো মানুষ দিন-রাত এক করে তাকে আগলে রাখার চেষ্টা করেছে, বুকে টেনে নিয়েছে। কিন্তু এই দীর্ঘ নয়টা দিনে আরাফ তাদের কারো কোলেই একবিন্দু শান্তি পায়নি, কারো আদরই তার কান্না থামাতে পারেনি। অথচ এই শান্তর সাথে আরাফের কোনো রক্তের বন্ধন নেই, নেই কোনো বংশীয় সুতো। পৃথিবীর কোনো আইনি বা সামাজিক সম্পর্কে তারা একে অপরের আপন নয়। তবু সম্পর্কের এই চেনা সমীকরণগুলোকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাচ্চাটা আজ শান্তকে পেয়ে নিজের হারিয়ে যাওয়া জীবনটা ফিরে পেল। রক্তের সম্পর্ককে ছাপিয়ে যে আত্মার একটা অলিখিত, অটুট বাঁধন থাকে, তা এই নিষ্পাপ শিশুর আকুতি আর শান্তর বুকফাটা হাহাকার যেন তারই এক জীবন্ত প্রমাণ হয়ে রইল।

বেশ কিছুক্ষণ পর বাড়ির সদর দরজায় ভারী বুটের আওয়াজ পাওয়া গেল। হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢুকলেন ইয়াসির খান আর শাহানা বেগম। শান্তকে কেবিনে না পেয়ে তারা যে কতটা হন্যে হয়ে খুঁজেছেন, তা তাদের দুজনের চোখে-মুখের আতঙ্কেই স্পষ্ট। কিন্তু শান্তকে এখানে ওভাবে হাঁটু গেড়ে আরাফকে জড়িয়ে ধরে থাকতে দেখে ইয়াসির খানের সেই আতঙ্ক নিমেষেই ক্ষোভে রূপ নিল। শান্তর এই অবাধ্যতা আর খামখেয়ালিপনা তার ভেতরের সমস্ত ধৈর্যকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করল। সকলের সামনেই পুরো ঘর কাঁপিয়ে গর্জে উঠলেন ইয়াসির,

_“অন্যের বাচ্চার জন্য আর কত নিচে নামবে তুমি শান্ত? নিজের দিকে তাকিয়ে দেখেছ একবার? তুমি গুরুতর অসুস্থ! ভাঙা পা আর এই শরীর নিয়ে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে এসেছ! যে শ’য়তানটা তোমাকে শেষ করে দিতে চেয়েছিল, নিজের ভালো-মন্দ সব ভুলে ওই শ’য়তানের রক্তের জন্য নিজের জীবন বাজি ধরছ?” ইয়াসির খানের চোখ তখন রাগে জ্বলছে। ​বাবার এই তীব্র চিৎকারে শান্তর বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা আরাফ চমকে উঠল। সে ভয় পেয়ে শান্তর শার্টটা আরও শক্ত করে খামচে ধরল। আবার ফুঁপিয়ে কাঁদার উপক্রম তার। শান্ত দুই হাত দিয়ে আরাফের কান দুটো চেপে ধরে। যাতে তার বাবার এই কর্কশ গলার আওয়াজ বাচ্চাটার কানে না পৌঁছায়। সে নিজেও এখন ইয়াসির খানের কথার কোনো উত্তর দিতে চাচ্ছে না।

বাবার এত বড় তিরস্কার, এতখানি ক্ষোভের মুখেও সে পুরোপুরি নির্বাক হয়ে রইল। সে কেবল আরাফকে আরও শক্ত করে আগলে ধরে রাখল নিজের দুই হাতের খাঁচায়। শান্তর এই নীরবতা, এই মৌন প্রতিরোধ আরও বেশি ক্ষিপ্ত করে তুলল ইয়াসির খানকে। সে এবার প্রায় শাসানোর ভঙ্গিতে চড়া গলায় বললেন,

_“চলো এক্ষুনি! এই মুহূর্তেই হসপিটালে ফিরবে তুমি। আর শোনো, আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি, আমরা কালই ফ্রান্সে ফিরে যাব। না যেতে চাইলে একদম কান ধরে নিয়ে যাব তোমায়!”

শান্ত এবার মেঝে ছেড়ে ক্র্যাচ ছাড়াই উঠে দাড়াল। নিজে অসহ্য যন্ত্রনাকে উপেক্ষা করে এক হাতে আরাফকে কোলে তুলে বলল,

_“ ​ও আমার সন্তান, বাবা! হ্যাঁ, আমারই সন্তান। ওর শরীরে কার রক্ত বইছে, সেই হিসাব মেলাতে যাওয়ার মতো ছোট মন আমার নেই। আমি শুধু জানি, ও নিজের মায়ের গর্ভ থেকে বের হয়ে পৃথিবীর বুকে প্রথম আমার এই দু'হাতেই এসেছিল। জন্ম দিলেই বাবা হওয়া যায় না, বাবা! আমি ওকে দিনের পর দিন নিজের বুক দিয়ে আগলে রেখেছি, রাতের পর রাত জেগে কপালে হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়েছি। আমার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার আর একাকীত্বের দিনগুলোতে আমি ওর ওই নিষ্পাপ হাসি আর দুষ্টমি দেখেই বেঁচে থাকার আলো খুঁজে পেয়েছি।

ও কোনো অপরাধ করেনি, বাবা! একটা নিষ্পাপ শিশু কীভাবে কারও শত্রু হতে পারে? র’ক্ত তো একটা উছিলা মাত্র, আত্মার যে বাঁধন ও আমার সাথে তৈরি করেছে, তা পৃথিবীর কোনো আইন বা যুক্তি দিয়ে তুমি ছিঁড়তে পারবে না। আমার নিজের বলতে যদি এই দুনিয়ায় কোনো অস্তিত্ব থাকে, তবে তা এই আরাফই। ​আমাকে যদি তোমাদের সঙ্গে নিতেই হয়, তবে এই বাচ্চাও আমার সঙ্গে যাবে। যেখানে ওর জায়গা হবে না, সেখানে আমিও থাকব না। এই আরাফকে বাদ দিয়ে আমার কোনো জীবন নেই।”

বিজ্ঞাপন
রক্ত রেখার আড়ালে গল্পটি আয়েশা শেখ রিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে মোড়ানো থ্রিলার উপন্যাস