রক্ত রেখার আড়ালে

পর্ব - ৪৯

🟢
⚠ ১৮+ সতর্কতা ⚠

আরিজের রুমের নিস্তব্ধতা ভেঙে শুধু দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দটা কানে আসছিল। বিছানার কেন্দ্রবিন্দুতে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে অলি। পরনের ভারী লেহেঙ্গার জমকালো কারুকাজ আর গা ভর্তি স্বর্ণালঙ্কারের জাঁকজমক যেন এই ঘরের কৃত্রিম নীরবতাকে আরও বেশি ভারী করে তুলেছে। সময় যেন কাটতেই চাইছে না তার। আরিজের ফেরার প্রতীক্ষায় কাটিয়ে দিয়েছে সে দীর্ঘক্ষণ, অথচ তার আসার কোনো লক্ষণই নেই। অলি এখন বেশ বিরক্ত। শেষমেশ ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল তার। একরাশ ক্লান্তি আর ক্ষোভ নিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল অলি। ভারী গয়না আর জমকালো পোশাকের কৃত্রিম আবরণগুলো তাকে একদম দমবন্ধ করে দিচ্ছিল। ধীর পায়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল সে। একে একে শরীর থেকে ঝেড়ে ফেলল অলঙ্কারের কৃত্রিম ঔজ্জ্বল্য, বদলে নিল পরনের ভারী লেহেঙ্গাটি। সাধারণ পোশাকে নিজেকে মুড়ে যখন সে আয়নার সামনে দাঁড়াল, তখন অলির ক্লান্তি আর ঘুম ছাড়া আর কিছু দেখতে পেল না। চুপচাপ গিয়ে ফুলে মোড়ানো বিছানাটায় শুয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। এত ঝামেলা শেষ করেছে যে রুমে আসতে পেরেছে এটাই অনেক। আরিজ এখন আসুক বা না আসুক তার তাতে মাথা ব্যথা নেই। তাদের বিয়ে তো হয়ে গেছে। এতেই শান্তি। অলি ঘুমিয়ে গেল। ক্লান্ত থাকায় ঘুমের ভেতর অল্প সময়েই চলে গেল।

এত গভীর ঘুমে চলে গেল মেয়েটা যে, আরিজ কখন দরজা খুলে রুমে এলো, ওয়াশরুমে গিয়ে কাপড় পলটাল তার কোনোটাই টের পেল না। সবকিছু যখন শান্ত, তখন আরিজ এসে দাঁড়াল বিছানার পাশে। আরিজের চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। যেন দীর্ঘক্ষন কেঁদেছে সে। সে যাইহোক, বাকি সব ভুলে সে এখন হাটু ভেঙে অলির কাছে গিয়ে বসল। রাগ হলো তার। লোকজনের হুলস্থুল আর নিয়মের বেড়াজালে নিজের বিবাহিত বউকে এতক্ষণ ভালো করে দেখার সুযোগই মেলেনি। আর এখন সব গয়নাগাটি, জমকালো সাজ খুলে ছুড়ে ফেলে মেয়েটা কেমন নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে! ​একটা মৃদু অভিমানী ক্ষোভ মনে দানা বাঁধতে গিয়েও পারল না; অলির নিষ্পাপ ঘুমন্ত মুখের দিকে ঝুঁকে আরিজের ঠোঁটের কোণে অযথাই একটা চিলতে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। ছোটবেলায় এই মেয়েটাকে একটা উটকো ঝামেলা ছাড়া আর কিছুই মনে হতো না তার। উর্মিলা বেগম কোনো কারণে অলির দায়িত্ব আরিজের ওপর দিলে, কিংবা একটু কোলে নিতে বললে আরিজের বিরক্তির সীমা থাকত না। মাঝে মাঝে তো মনে হতো, এই আপদটাকে কোথাও দূরে গিয়ে ফেলে দিয়ে আসে! তার এই চরম বিরক্তির প্রধান কারণ ছিল অলির কথায় কথায় কেঁদে বুক ভাসানোর অভ্যাস। অনুভা মেয়েটা যেখানে শান্ত-শিষ্ট, লক্ষ্মী স্বভাবের ছিল, এই অলি ছিল ঠিক তার উল্টো। একদম পাজি আর একগুঁয়ে। ছোটবেলা থেকেই আরিজের পিছু ছাড়ত না সে। আরিজ কোথাও বের হতে নিলেই পেছনে চুইংগামের মতো লেপ্টে থাকত। সঙ্গে না নিলেই শুরু হতো তার আকাশ-পাতাল ফাটানো কান্না। সীমা অতিক্রম করে তো মেঝেতে শুয়ে গড়াগড়ি করে কাঁদত! হায়রে! আরিজের যে তখন কী পরিমাণ রাগ হতো! ইচ্ছে হতো তুলে একটা আছার মারতে। তবে বাড়ির লোকদের জন্য সেটা সম্ভব হতোই না, উল্টো কাঁধে চড়িয়ে মহারানীকে নিয়ে বের হতে হতো। কারণ বাড়ির বড়রা আরিজকে ধমকে-বুঝিয়ে অলির ছোট হাতটা তার হাতে ধরিয়ে দিত।

শৈশবের সেই চুইংগামের মতো লেগে থাকার অবুঝ জেদটা যে বড় হয়ে এক অন্যরকম মধুর অত্যাচারে রূপ নেবে, তা আরিজ কখনোই ভাবেনি। ছোটবেলায় অলির জ্বালানোর ধরণটা ছিল নিছকই দুষ্টুমি আর একরোখামিতে ভরা, কিন্তু কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা দিতেই সেই জ্বালানোর ধরণটা বদলে গেল এক তীব্র মায়াবী মায়াজালে। ​কোনো রকম পূর্বাভাস ছাড়াই হুটহাট অলির এমন জাদুকরী উপস্থিতি ঘটত আরিজের সামনে যে, আরিজের পুরো অস্তিত্ব থমকে যেত। অলির সেই হরিণী চোখ আর বিষাক্ত সুন্দর রূপের সামনে দাঁড়িয়ে বুক ধড়ফড় করা সামলাতে আরিজের তখন কেবল নীরবে শুকনো ঢোক গেলা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকত না। বড় বেলার এই রূপের দহন যে ছোট বেলার পাজিপনার চেয়েও কত বেশি মারাত্মক, তা আজ বিছানার পাশে বসে আরিজ উপলব্ধি করছে।

অলির ঘুমন্ত মুখের খুব কাছে ঝুঁকে এলো আরিজ। তার তপ্ত নিঃশ্বাস অলির গালে আছড়ে পড়ছে। কপালে লেপ্টে থাকা অবাধ্য চুলগুলো আঙুলের ডগা দিয়ে সরিয়ে দিতে গিয়ে আরিজের হাতটা সামান্য কেঁপে উঠল। অত্যন্ত মৃদু, প্রায় ফিসফিসানি কণ্ঠে বলল,

_​" সারাক্ষন জ্বালাতন করে তো আমার জীবনটা অতিষ্ঠ করে তুলেছিস, আর এখন আমার অস্তিত্বে ঝড় তুলে কেমন নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছিস!”

নিজের ভেতরের তীব্র ব্যাকুলতা আর কোনো বাঁধ মানল না আরিজের। এতদিন বুকচাপা দিয়ে রাখা আকাঙ্ক্ষারা আজ সব ভেঙে আসছে যেন। এই মুহূর্তে, এই নিভৃত রাতে, অলির এই মায়াবী রূপের সামনে নিজেকে সামলানোটা তার কাছে অসম্ভব এক পরীক্ষা বলে মনে হচ্ছে। যে সংযম সে এতদিন ধরে কঠোরভাবে নিজের ভেতর টিকিয়ে রেখেছিল, আজ আর তা পারল না। সব দ্বিধা-দ্বন্দ্বের দেয়াল এক নিমেষে ধসে গেল। আরিজ অলির আরও কাছে, আরও নিবিড়ভাবে ঝুঁকে এলো। তার হৃদস্পন্দনের গতি তখন উথাল-পাথাল। অত্যন্ত সাবধানে, সে অলির দু’গাল নিজের দুই হাতের তালুর মাঝে আগলে নিল। অলির ত্বকের ওষ্ণতা আরিজের আঙুলের ডগা বেয়ে তার পুরো শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগিয়ে তুলল। ​সে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতে পারল না। প্রথমে গভীর আকুলতায় অলির কোমল দু’গালে এঁকে দিল দুটি ভালোবাসার পরশ। তারপর নিজের সমস্ত আবেগ, অধিকার আর এতদিন ধরে জমিয়ে রাখা তৃষ্ণা ঢেলে দিয়ে ঘুমন্ত অলির ওষ্ঠাধর নিজের ঠোঁটের ভাঁজে তুলে নিল। অপার্থিব নিস্তব্ধতায় দুই চেনা অধরের এই নতুন মিলন যেন তাদের রূপকথার মতো ভালোবাসাকে এক চিরন্তন পূর্ণতা দিল।

অলি গভীর ঘুমে নিমগ্ন, তাই নিজের নিজের অবাধ্য অনুভূতিকে খুব বেশি দীর্ঘায়িত করল না আরিজ। অলির ওষ্ঠাধরে লেপ্টে থাকা নিজের তৃষ্ণার্ত ঠোঁট দুটোকে আলতো করে নিজেকে সরিয়ে নিল সে। অলির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, বিছানার একপাশে অলির একদম গা ঘেঁষে শুয়ে পড়ল। তারপর অলির নরম শরীরটাকে নিজের শক্ত দুই বাহুর ডোরে টেনে নেয় আরিজ। আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। ​আরিজের চওড়া, উন্মুক্ত বুকের উষ্ণতায় মুখ থুবড়ে পড়ল অলির নাক। আরিজের গায়ের পুরুষালি সুবাস আর শরীরের তপ্ত ওমে অলির স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস বারবার বাধা পেতে লাগল। ঘুমের সেই অতল ঘোরটা এক ধাক্কায় কেটে গেল অলির। চোখের ভারী পাতা দুটো মেলে ধরতেই চারপাশের আবছা অন্ধকারের মাঝে সে আবিষ্কার করল এক চেনা আশ্রয়। আরিজের হৃদপিণ্ডের ধকধক শব্দটা তখন অলির কানের খুব কাছে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। অলির বুঝতে আর বাকি রইল না সে এখন কার বুকের মাঝে বন্দী হয়ে আছে। আরিজের বুকের স্পন্দন তখন তার হৃদপিণ্ডের সাথে মিলেমিশে একাকার। স্বপ্নের মতো লাগলেও এটাই সত্যি। ঘুমের রেশ জড়ানো আচ্ছন্ন অবস্থাতেই অলি আলতো করে আরিজের চওড়া বুকে নিজের নরম হাতটা ছোঁয়াল, তারপর অত্যন্ত মৃদু কণ্ঠে ডাকল,

_“আরিজ ভাইয়া!”

​আরিজ নিজের বুকের ভেতর অলির অস্তিত্বটুকু অনুভব করছিল। চোখের পাতা না মেলেই, নিচু আর ভারী কণ্ঠে সাড়া দিল সে।

_“হ্যাঁ, বোইন, বল।”

​অলি খিলখিল করে হেসে উঠল। সে ধারণা করেছিল আরিজ এখন ঘুমিয়ে আছে। আরিজ কিছু বলল না। তার চোখ এখনও বন্ধ। হাসির পর ঘরজুড়ে আবার নীরবতা নেমে এলো। অলি আর কোনো কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ আরিজের বুকের ওপর নিজের মাথাটা এলিয়ে দিয়ে পড়ে রইল চোখ বন্ধ করে। ​আরিজ কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে অলির চুলের সুবাস আর এই মোহময় মুহূর্তটুকু নিজের ভেতর ধারণ করার চেষ্টা করল। কিন্তু অলির শরীরের এত কাছের ছোঁয়া আর তার তপ্ত নিঃশ্বাস আরিজের ভেতরের পুরুষালি সংযমকে নাড়িয়ে দিল ফের। হুট করেই চোখ দুটো খুলে ফেলল সে। অন্ধকারেও অলির ওই মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে তার চোখের চাউনি গভীর ও নেশাতুর হয়ে ওঠে। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্ট হাসি ফুটিয়ে সে ফিসফিসিয়ে বলল,

​_“জেগে গেলি কেন? জেগে এখন নিজের বিপদ ডেকে আনলি!”

অলি মুখ তুলে আরিজের দিকে প্রশ্নভরা চোখে তাকাল। তার চোখে তখনো ঘুমের আচ্ছন্নতা আর আরিজের কথার অন্তর্নিহিত অর্থ না বুঝতে পারার এক সরল অবুঝ ভাব। অন্ধকারে আরিজের চোখের চাউনিটার দিকে চেয়ে একটু অবাক হয়েই সে আলতো করে শুধাল,

​_“কীসের বিপদ?”

​আরিজ অলির সেই প্রশ্নভরা মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও একটু চওড়া করল। তার চোখের নেশাতুর দৃষ্টি তখন অলির চোখের পাতা আর একটু আগেই চুম্বনে সিক্ত হওয়া ঠোঁটের ওপর স্থির। অলিকে নিজের বুকের সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরে, তার কানের কাছে মুখ নামিয়ে আরিজ অত্যন্ত নিচু, গভীর ও একটু চড়া গলায় ফিসফিসিয়ে বলল,

​_“এই যে এত কাছাকাছি আছিস, আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছিস... এত কিছুর পরেও যদি ভাবিস তোকে স্রেফ বুকে জড়িয়ে ধরে ভদ্রছেলের মতো রাত পার করে দেব, তবে ভুল ভাবছিস । এবার তোর এই চোখের ঘুম আমি পুরোপুরি কেড়ে নেব, দেখবি?”

আরিজের কথার তীব্রতা আর চোখের সেই আচ্ছন্ন চাহনি দেখে অলির বুকের ভেতরটা হুট করেই কেঁপে উঠল। ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তেই লজ্জায় লাল হয়ে উঠল তার। আরিজ আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে অলির ঠোঁটে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য উদ্যত হয়। কিন্তু অলি চট করে নিজের হাতের তর্জনী আরিজের ঠোঁটের ওপর ছুঁইয়ে তাকে মাঝপথেই থামিয়ে দেয়। ​

_“আপনি সেদিনও বলেছেন, আমি ছোট, আমার বিয়ের বয়সই হয়নি। তাহলে এসব কী?”

আরিজ এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। তারপর নিজের ঠোঁটের ওপর থেকে অলির নরম আঙুলটা কামড়ে ধরার ভঙ্গি করে সরিয়ে দেয়। অলির কোমরে নিজের হাতটা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে আরিজ নিচু গলায় বলল,

_​“সেদিন আন্দাজের উপর বলে ফেলেছিলাম। আজ একটু টেস্ট করে দেখি...তুই আসলেই ছোট নাকি বড় হয়ে গেছিস!”

স্বামীর একের পর এক লাগামহীন কথা শুনে অলির বুকের ভেতরটা রীতিমতো ঢাক পেটাচ্ছে। ​সে আরিজের শক্ত বুকটাতে দুহাতে একটা ধাক্কা দিয়ে চট করে বিছানায় উঠে বসল। নিজের ওড়নাটা টেনেটুনে গায়ের সাথে লেপ্টে নিয়ে বলল,

_“ছি ছি ছি আরিজ ভাইয়া! আপনি এতটা অসভ্য? অথচ বাইরে আপনাকে দেখলে মনে হয় যেন আপনি কোনো পাপ-পুণ্যের মধ্যেই নেই, একদম ধোয়া তুলসী পাতা! এত বড় ভণ্ড আপনি?”

​_“এতদিন বোন ছিলি, এখন বউ। যে ছেলে নিজের বউয়ের সামনেও ভদ্রতার মুখোশ পরে থাকে, তার পুরুষত্ব নিয়ে আমার সন্দেহ আছে ! তুই যখন আমার ঘরে এসেই গেছিস, তখন এই অসভ্যতার পুরো কোর্স তোকে প্র্যাক্টিক্যালি শেখানো আমার পবিত্র দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।”

অলি কিছু বলতে পারল না। আরিজের এই যুক্তিপূর্ণ অসভ্য মার্কা জবাব শুনে অলির চোখ দুটো চড়কগাছ হয়ে আছে।

_“ বোন থেকে বউ হয়ে আমার বাগানে এসে ঢুকেছিস, আর আমি অলি হয়ে মধু সংগ্রহ করতে চাইলেই দোষ? আজ থেকে তুই আমার বাগানের ফুলের কলি... আর আমি তোর লাগামহীন অলি!”

অলি এবার কিছু একটা বলতে চাচ্ছিল। তার আগেই আরিজ বাঘের মতো ক্ষিপ্রতায় অলির দুই হাত নিজের এক হাতে মুঠো করে ধরল। অলির কোনো রকম বাধা দেওয়ার সুযোগ না দিয়েই আরিজ তাকে আলতো কিন্তু এক ঝটকায় আবার বিছানায় শুইয়ে দিল। ​বিছানার নরম চাদরে অলির পিঠ ঠেকতেই ভয়ে সে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলে। আরিজ তার ওপর পুরোপুরি ঝুঁকে এল। তাদের দুজনের মাঝখানের দূরত্ব তখন শূন্যের কোঠায়। আরিজ অলির নিচের ঠোঁটে আলতো করে কামড় বসাল। অলির হাত দুটো আরিজের মুঠোয় বন্দি থাকায় সে শুধু নিজের শরীরটা একটু মুচড়ে ছটফট করে উঠল। কিন্তু তার থেকে আট বছর বয়সি বড় আরিজের পুরুষালি শরীরের ভারের সামনে অলির সেই চেষ্টা পুরোপুরিই অর্থহীন।

​আরিজের মুক্ত হাতটি এবার অলির কোমরের কাপড়ের অংশ সরিয়ে অলির উন্মুক্ত পেটের চামড়ায় স্পর্শ করল। বরফ শীতল হাতের সেই ছোঁয়ায় অলির পুরো শরীর একসাথে শিউরে উঠে। আরিজের ঠোঁট জোড়া অলির ঠোঁট থেকে ক্রমশ নিচে নেমে তার গলার খাঁজে আর কলারবোনে নিজের অধিকারের দাগ বসাতে শুরু করল এবার। আরিজের ভারী আর তপ্ত নিঃশ্বাস অলির গলার চামড়ায় আগুনের মতো বিঁধছে।

অলি কাঁপা গলায় শুধু বলতে পারল,

_“আ-আরিজ ভাইয়া... ছাড়ুন...”

​কিন্তু আজ আরিজ সত্যিই লাগামহীন। সে অলির কানের পাশে মুখ নামিয়ে এনে অত্যন্ত নিচু, ভারী গলার স্বরে ফিসফিসিয়ে বলল,

_“চুপ... একদম চুপ। ভাইয়া ডাকটা আজ থেকে একদম নিষিদ্ধ।”

———

অনুভা যে তখন জেদ দেখিয়ে অনুষ্ঠান থেকে রুমে চলে এসেছে আর বের হয়নি। এর মাঝে শুধু শান্ত একবার এসে আরাফকে ওর কাছে রেখে গেছে। সন্ধায় শান্ত সেগুলো বলে নিচে চলে যাওয়ার পর অনুভা বেশ দেরি করেই রেডি হয়ে নিচে যায়। নিচে গিয়ে প্রথমেই শান্তকে খোঁজে সে।

_“ সামান্য একটা কথায় এত রিয়েক্ট করতে হবে? আমি জাস্ট জানতে চেয়েছিলাম।” অবশেষে হলেরুমের এক কোণায় শান্তকে আবিষ্কার করতেই অনুভা পাশে দাড়িয়ে বিড়বিড়িয়ে বলল। এটাও বলত না, যদি না শান্ত অনুভাকে দেখেও এড়িয়ে না চলত। নিজে তো এড়িয়ে চলছেই সাথে ওর ছেলেকেও তার কাছে আসতে দিচ্ছে না!

_“ ওট শুধু প্রশ্ন না। ওই একটা মাত্র প্রশ্ন দিয়ে তুমি এটাই বুঝিয়েছো, এতকিছুর পরও তুমি এখনও আমাকে বিশ্বাস করো না।”

বিজ্ঞাপন

শান্তও অনুভার মতো ধীর গলায় বলল। অনুভা নিজের কপাল চাপড়াল। শান্তর মতো একজন শান্ত স্বভাবের মানুষ যে এভাবে তিলকে তাল বানাবে, তা সে ভাবতেই পারেনি। সে নিজের ভেতরের বিরক্তি আর অসহায়ত্ব লুকিয়ে একটু চড়া সুরেই বলল,

_​“দারুণ! আপনার মতো মানুষও যদি এত কিছুর পর বলেন যে আপনাকে আমি বিশ্বাস করি না, তাহলে আমার আর কী-ই বা করার আছে! নিজের মনের সব ভুল ব্যাখ্যা আপনি নিজেই দাঁড় করিয়ে নিচ্ছেন।”

​কথাটা বলেই অনুভা আর তর্ক না বাড়িয়ে শান্তর কোল থেকে আরাফকে নিজের কাছে নিতে চাইল। কিন্তু শান্ত এক চুলও নড়ল না, বরং একটু পাশ কেটে সরে দাঁড়াল তার। তারপর সে স্পষ্ট ও অনড় গলায় বলল,

_​“ওকে একদম ছোঁবে না। ও আমার আশ্রয়ে সম্পূর্ণ নিরাপদ আছে। তোমার এখানে এত বাড়তি অধিকার দেখানোর কোনো প্রয়োজন দেখছি না।”

​শান্ত এভাবে প্রকাশ্যেই তাকে তাচ্ছিল্য করবে, এটা অনুভার কল্পনারও বাইরে ছিল। সে কেবল অবাক ও স্তব্ধ চোখে শান্তর দিকে তাকিয়ে রইল। মানুষটার এই অদ্ভুত একরোখা আর জেদি রূপ সে খুব কমই দেখেছে। আরাফের সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই। সে শান্তর কাঁধে চিবুক ঠেকিয়ে বড় বড় কৌতূহলী চোখে চারপাশের রঙিন আলো আর কোলাহল দেখছে। আগত অতিথিদের হইচই আর আনন্দঘন পরিবেশটা তাকে এতটাই বুঁদ করে রেখেছে যে, মা আর শান্তর মাঝখানের এই অদৃশ্য যুদ্ধটা তার স্পর্শই করতে পারছে না। মাকে খেয়াল করলে হয়তো সে নিজে থেকেই অনুভার কাছে চলে আসত।

হঠাৎ করেই অনুভা নিজের ডান হাতে এক শক্ত, পুরুষালি হাতের হ্যাঁচকা টান অনুভব করল। ভিড়ের মাঝে আচমকা এই টানে সে বেশ হকচকিয়ে গেল। শরীরের ভারসাম্য সামলে নিয়ে ধড়ফড় করে সামনে তাকাতেই সামনে থাকা মাস্কের আড়ালে তায়ানের অনুভূতিশূন্য, ধারালো চোখ আবিষ্কার করল। ​এত মানুষের মাঝে তায়ান এভাবে আসবে অনুভার কল্পনাতেও ছিল না। কারণ, গত দুই দিনের কোনো অনুষ্ঠানেই তার দেখা মেলেনি। অনুভা কিছু বলার আগেই তায়ান তার হাতটা শক্ত করে ধরে টেনে হিঁচড়ে হলরুমের এক কোণায়, মানুষের ভিড়ের কিছুটা আড়ালে নিয়ে গেল,

_“ওর সাথে কীসের এত কথা তোর?”

_“ তাতে আপনার কি? হাত ছাড়ুন আমার!”

​তায়ান হাত ছাড়ল না, বরং আঙুলের চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

_“তুই আমার ওয়াইফ, অনুভা! আমার সমস্যা কী মানে?”

_“ওকে চলে যেতে বল এখান থেকে। আমার চোখের সামনে আমি এই ছেলেকে আর এক মুহূর্তও সহ্য করব না।”

_“গেলে আপনি যাবেন! এটা আমার বাড়ি, এই বাড়িতে কে থাকবে আর কে থাকবে না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আপনার নেই।”

​অনুভার কথায় তায়ান কিছু বলল না। তাকিয়ে রইলো শুধু। হলরুমের মৃদু সোনালী আলো এসে পড়েছে অনুভার মুখে। মেয়েটা আজ একটু সেজেছে। খুব বেশি না, একদম হালকা, সামান্য একটু। তবু এই কাজল কালো চোখ আর চেনা অবয়বটা তায়ানের বুকের ভেতর কেমন যেন ওলটপালট করে দিল! ওর মনে পড়ল ছোট বেলায় তায়ান ওকে কতবার কপালের এক পাশে কালো টিপ লাগিয়ে দিতো! কারণ আমীরা বেগম বলত এটা দিলে নাকি কারও বদ-নজর লাগে না।

নিজের এত বড় অন্যায়ের পর অনুভাকে অন্য কারও পাশে দেখার ঈর্ষা আর অনুভাকে হারানোর ভয়টা যেন একাকার হয়ে গেল। ​তায়ান চোখের পলক ফেলল না। তার ভেতরের রুক্ষতা আর জেদটা কমে গেল হুট করেই। সে নিজের কণ্ঠের সমস্ত কর্কশতা ধুয়ে-মুছে ফেলে একদম নিচু গলায় বলল,

_“তুই... তুই ঠিক কী করলে ক্ষমা করবি আমায়, অনুভা? কী করলে তুই আবার আগের মতো আমার কাছে ফিরে আসবি?” তায়ান জানে এই প্রশ্ন করা অনর্থক। সে এই প্রশ্ন আরও করেছে। এর উত্তরও সে জানে। তবুও যেন নতুন কিছু শোনার আসায় অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলো।

ছটফটানি কিছুটা থামিয়ে দেয় অনুভা। সে স্থির হয়ে তায়ানের দিকে তাকাল। তায়ানের চোখের ওই অনুশোচনা আর আকুতি তাকে ছুঁতে পারল না, বরং তার মনে একরাশ বিতৃষ্ণা এনে দিল।

_​“ মৃত মানুষ যেমন কখনো জীবিতদের দুনিয়ায় ফিরে আসে না, আপনার জন্য অনুভাও ঠিক তেমনি মরে গেছে। দয়া করে আর নিজেকে ছোট করবেন না, এখান থেকে চলে যান।”

তায়ান বলল,

_“ আমি কোথায় যাব? কে আছে আমার?"

_“সব তো ছিল।” অনুভা স্লান হেসে বলল।

—

অনুভা যে কখন শান্তর পাশ থেকে গায়েব হয়ে গিয়েছে, শান্ত টেরও পায়নি। হঠাৎ পাশে তাকিয়ে অনুভাকে না পেয়ে সে একটু চমকে উঠল। এদিক-ওদিক চোখ বোলাল, ভাবল হয়তো অলি বা আরিজের কাছে গেছে। কিন্তু সেখানেও তাকে দেখা গেল না। শান্ত একটু নিজের জায়গা থেকে সরে এসে ভিড়ের মাঝে অনুভাকে খুঁজতে লাগল। পরক্ষণেই হলের এক অন্ধকার কোণায় চোখ পড়তেই শান্তর জোড়া ভ্রু কুঁচকে গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে তায়ান, তার খুব কাছে দাঁড়িয়ে থাকা অনুভাকে কিছু একটা বলছে। ​এতক্ষণ ধরে শান্তর মেজাজটা এমন খিটখিটে থাকার আসল কারণ ছিল এই তায়ানই। আরও আগেই তায়ানের সাথে তার সাক্ষাৎ হয়েছে। আর দ্বিতীয়ত তার বাবার সাথে কলে ঝামেলা হওয়া। তার বাবা জেনে গেছে সে যে এখন ফ্রান্সে নেই। আর এটা নিয়ে তার বাবা নিশ্চয়ই তার মায়ের সঙ্গে ঝামেলা করছে!

যদিও দূর থেকে শান্ত দেখতে পাচ্ছিল যে অনুভা অত্যন্ত শক্ত চোয়ালে, তায়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে জবাব দিচ্ছে, তবুও ওদের দুজনকে এভাবে একসাথে কথা বলতে দেখে শান্তর পুরো পরাণ জ্বলে উঠল। ভেতরের রাগটা যেন দ্বিগুণ হয়ে মাথায় চড়ে বসল। ​সেখানে দাঁড়িয়ে নিজের ভেতরের এই জ্বলন আর বাড়াতে চাইল না শান্ত। সে এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে হনহন করে হেঁটে চলে গেল অলি আর আরিজের দিকে। কোনো কথা না বলে কোলে থাকা আরাফকে অলির কোলে গুঁজে দিল। তারপর আরিজের এক মোটা বন্ধুর হাত থেকে হুট করে গিটারটা কেড়ে নিল। ​আরিজের সেই বন্ধুটি এতক্ষণ ধরে পরম সুখে চোখ বন্ধ করে, নিজের মনেই চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে গান গাইছিল। হঠাৎ হাতের গিটার উধাও হয়ে যাওয়ায় সে থতমত খেয়ে চোখ মেলল। তবে শান্তর এই কাণ্ড দেখে আশেপাশের সবাই যেন মনে মনে এক মস্ত বড় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল! কারণ আরিজের বন্ধুর ওই কর্কশ গলার গানটা এতক্ষণ ধরে উপস্থিত সবার কান ঝালাপালা করে দিচ্ছিল, যা তারা ভদ্রতার খাতিরে সহ্য করছিল।

​শান্ত কারো দিকে তাকাল না। গিটারে টান দিল। কর্ডগুলো বেজে উঠতেই চারপাশের শোরগোল নিমেষেই স্তব্ধ হয়ে গেছে। অনুভাও এতক্ষনে উপতস্থিত হয়ে গিয়েছে। তায়ানও এসেছে তার পিছু। সে গিয়ে দাড়িয়েছে রিকোর পাশে। তক্ষুনি কানে ভেসে আসল শান্তর গাওয়া গানের অদ্ভুর লাইন। শান্ত গাইছে,

—“ স্বজন, বন্ধু ছাইড়া…এসেছি, এসেছি।

স্বপ্ন তোমায় লইয়া…দেখেছি, দেখেছি।”

অনুভা চোখ বড় করে বিস্মিত চোখে তাকাল শান্তর দিকে। শান্তর অভিমানী দৃষ্টি তার দিকেই। কথাগুলোর ভেতরের গভীরতা বোঝাতে শান্ত এই লাইন দুটো পর পর দু’বার গাইল। তারপর গিটারে একটা ভারী কর্ড বাজিয়ে সুর পরিবর্তন করে নতুন লাইনে গেল,

—“ তুমি কাছে, তবু যে দূরে, কত যে দূরে…

ওরে বঁধূয়া….পরাণ যায় জ্বলিয়া রে…

পরাণ যায় জ্বলিয়া রে!”

তায়ান পারছে না ধেঁয়ে এসে শান্তকে আক্রমণ করতে। রিকো তার এক বাহু চেপে ধরে মুখ চেপে হাসছে। তায়ান নিজের ফোন বের করে একটা গান সার্চ করে কানের কাছে নিয়ে তা শুনতে লাগল। শান্ত গান থামিয়ে দিতেই সবাই বেশ খুশিতে হাত তালি দিতে থাকে। এতে শান্ত আরও বিরক্ত হয়। সে নিজের ভেতরের কষ্টকে গানের মাধ্যমে উজার করেছে এদিকে সবাই সেটাতে বিনোদন পাচ্ছে! সে নিজের ঠোঁট দুটো কামড়ে ধরে গিটারটা আরিজের বন্ধুর দিকে বাড়িয়ে দিতে উদ্যত হলো, তবে গিটারটা এসে এক ঝটকায় নিয়ে নিলো তায়ান। শান্তর দিকে শীতল চোখে তাকিয়ে গিটারের কর্ডে আঙুল চালাল,

—“ Jaane meri janeman! Bachpan ka pyaar mera bhool nahi jana re”

ব্যস অলি এবার ফিক করে হেসে দিলো। এই গানটা তার এমনিতেই ফানি লাগে আর এটাও নাকি শুনছে তায়ান ভাইয়ের মুখে! এটা অপ্রত্যাশিত বললেও ভুল হবে, এটা চরম অপ্রত্যাশিত!

—“Jessa mera pyaar hain, Jaan tuje kiya hain,

Bachpan ka pyaar mera bhool nahi jana ree…”

​অনুভা এবার যেমন অবাক হলো, ঠিক তেমনি চরম বিরক্তিতে তার কপাল কুঁচকে গেল। একজন গান গেয়ে বোঝাচ্ছে যে সে নিজের সব কিছু ছেড়ে তার কাছে এসেছে, আর অন্যজন গিটার কেড়ে নিয়ে বোঝাচ্ছে তার শৈশবের ভালোবাসা যেন ভুলে না যায়! আশ্চর্য! দুই পুরুষের এই অদ্ভুত রেষারেষি আর সহ্য করতে পারল না অনুভা। সে সেখানে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না, রাগে হনহন করে তখনই নিজের রুমের দিকে চলে গেল। ​অনুভাকে চলে যেতে দেখে তায়ানেরও আর গান গাওয়ার কোনো আগ্রহ রইল না। সে মাঝপথেই গান থামিয়ে দিয়ে গিটারটা আরিজের বন্ধুর দিকে ছুঁড়ে ফেলল। তারপর পকেটে হাত গুঁজে, সটান সদর দরজার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। তখনই আমীরা বেগম এসে ছেলেকে থামিয়ে দেয়।

বিজ্ঞাপন
রক্ত রেখার আড়ালে গল্পটি আয়েশা শেখ রিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে মোড়ানো থ্রিলার উপন্যাস