রক্ত রেখার আড়ালে

পর্ব - ৫৪

🟢

সেই বালুর চরে রিকো পৌঁছাতে পৌঁছাতে অনুভা আবারও জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। রিকো চরে পা দিয়েই দেখতে পায়, রক্তাক্ত তায়ানের নিথর বুকের ওপর জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে অনুভা। সময় নষ্ট না করে রিকো ওদের দ্রুত হেলিকপ্টারে উঠিয়ে সোজা ঢাকায় এক প্রাইভেট হসপিটালে নিয়ে যায়। রিকো ততক্ষণেও নিজেকে শক্ত করে ধরে রেখেছিল, যতক্ষণ না ডক্টর আইসিইউ থেকে বের হয়ে মাথা নিচু করে এই ভয়ানক সত্যটা জানায়,

_“ হি ইজ নো মোর! তায়ান হারিস আরও দু’ঘন্টা আগেই মা’রা গিয়েছে।”

কথাটা শোনামাত্র রিকোর চোখের মণি দুটো কুঁকড়ে গেল, মুখের সমস্ত রক্ত চোয়ালে এসে জমা হয়ে থমথম করতে লাগল। ভেতরের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সে পকেট থেকে রিভলবারটা বের করে ডক্টরের কপালে তাক করে দাঁতে দাঁত চেপে হিংস্র গলায় গর্জে উঠল রিকো,

_“শাট আপ! জাস্ট শাট দ্য হেল আপ! ডু ইয়োর জব অ্যান্ড সেভ হিম! হি কান্ট ডাই!”

​ডক্টর আকস্মিক এই শীতল অস্ত্রের মুখে থতমত খেয়ে গেলেন। নিজের ঢোক গিলে কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন,

_“দেখুন… এটাই বাস্তব, মেনে নিন। তার বুকে চার-চারটে বুলেট ঢুকেছে! এতক্ষণে বেঁচে থাকাটা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, এটা স্রেফ অলৌকিক হতো যদি সে বেঁচে যেত…”

​রিকো আর ডক্টরকে কথা শেষ করার সুযোগ দিল না। তার মাথায় তখন একটাই জেদ, তায়ান মরতে পারে না। কোনো মতেই এটা হতে পারে না। গার্ডদের দিকে তাকিয়ে চিবুক উঁচিয়ে আদেশ করল তায়ান আর অনুভাকে আবারও হেলিকপ্টারে ওঠানোর জন্য। ঢাকার চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর তার আর কোনো ভরসা নেই। তিন ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস যাত্রার পর তারা সিঙ্গাপুরের এক বিশ্বমানের হাসপাতালে পৌঁছায়। কিন্তু যে আশা নিয়ে সে তায়ানকে নিয়ে সিঙ্গাপুরে ছুটে এসেছিল, সেখানেও ফলাফল শূন্য। সেখানকার ডক্টররাও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে একই সত্যটা রিকোর মুখের ওপর ছুড়ে দিয়ে ওর সবটুকু আশা ভেঙে দেয়।

​এদিকে তায়ানের খবর পেয়ে এলেনাও ঝড়ের বেগে সিঙ্গাপুরে ছুটে আসে। তায়ানের দেহের সামনে দাঁড়িয়ে এলেনার চোখ দুটো যেন জ্বলন্ত কয়লা হয়ে উঠল। ওর হিংস্র চাউনি দেখে মনে হচ্ছিল, পারলে সে হাসপাতালের ডক্টর আর নার্সদের তখনই জ্যান্ত কবর দিয়ে দেবে।

​অনুভাকে রাখা হয়েছিল অন্য কেবিনে। য’ন্ত্রণার মাঝেও সারাদিন পর ওর যখন জ্ঞান ফিরল, তখন সিঙ্গাপুরের আকাশে কেবলই সন্ধ্যা নামছে। চোখ মেলেই নিজের পেটের ব্যা”ন্ডেজটার দিকে তাকাতেই তায়ানের সেই র”ক্তাক্ত চেহারাটা ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল। বুকটা কাঁপুনি দিয়ে উঠল ওর। কোনো কিছু না ভেবেই হাতের চ্যানেল আর স্যালাইনের পাইপটা হ্যাঁচকা টানে ছিঁড়ে ফেলল। সুঁই ফোটার যন্ত্রণাটাকেও পাত্তাই দিল না। অবশ পা দুটো নিয়ে কেবিনের বাইরে যাওয়ার জন্য দৌড় দিতেই দরজার মুখে কয়েকজন নার্স এসে ওকে জাপটে ধরল।

_​“ছাড়ুন আমাকে! আমাকে যেতে দিন বলছি! আমার হাজবেন্ড কোথায়? ও... ও মা’রা যায়নি, তাই না? আমি জানতাম ওর কিচ্ছু হতে পারে না, ও আমাকে একা ফেলে কোথাও যাবে না! বলুন ও কোথায়? ওর কেবিন কোনদিকে?” অনুভা নার্সদের লোহার খাঁচা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য পশুর মতো ছটফট করতে করতে বলল। ওর গলার রগগুলো ফুলে উঠছে।

_​“ম্যাম, প্লিজ! আপনি একটু শান্ত হন। আপনার অপারেশন হয়েছে, আপনি এখনো পুরোপুরি সুস্থ হননি। এভাবে নড়াচড়া করলে ব্লিডিং শুরু হবে!” নার্সরা ওকে সামলাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছিল।

_​“শান্ত হব মানে? কীসের শান্ত হব? আমি আমার হাজবেন্ডকে দেখব শুনতে পাননি? ওকে ডাকতে হবে!” অনুভার গলার আওয়াজ এবার আর্তনাদে রূপ নিল। কিন্তু নার্সরা চুপ করে রইল। মাথা নিচু করে নিজেদের ভেতরের করুণ চাউনি বিনিময় করল তারা। কারণ, সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা তাদের জানা ছিল না।

তাদের এই স্তব্ধতা অনুভাকে আরও বেশি উন্মাদের দিকে ঠেলে দেয়। ও দুহাতে নিজের চুল খামচে ধরে দেয়ালের দিকে তাকাতেই টেবিলে রাখা কাঁচের পানির জগ আর ওষুধের ট্রে-টা চোখে পড়ে। সেগুলো হাত দিয়ে সজোরে মেঝেতে আছাড় মেরে ভেঙে ফেলল। ঝনঝন শব্দে কাঁচের টুকরোগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল, দু-একটা টুকরো ওর পায়ে লেগে র’ক্তও বের হতে শুরু করল, কিন্তু অনুভার সেদিকে কোনো হুঁশ নেই। ও নার্সদের জামা চেপে ধরে কাঁপাকাঁপা গলায় চিত্কার করে ওঠে,

_“কী হলো! কথা বলছেন না কেন? নিয়ে যাচ্ছেন না কেন আমাকে ওর কাছে? আমাকে নিয়ে চলুন, নাহলে খোদার কসম, এই হাসপাতালের একটা জিনিসও আমি আস্ত রাখব না! সব ভেঙে ফেলব সব। ওকে নিয়ে আমি আমার ছেলের কাছে যাবো। আমার ছেলেটা আমার জন্য কাঁদছে। ওরা কেউ আমাকে ছাড়া থাকতে পারে না।”

_​“প্লিজ ম্যাম, নিজেকে সামলান! আপনার পেটের ক্ষতটা এখনো কাঁচা। এভাবে ছটফট করলে স্টিচ ছিঁড়ে যাবে, আপনার ইন্টারনাল ব্লিডিং শুরু হয়ে যাবে! প্লিজ বিছানায় চলুন!”

​নার্সের কথা যেন অনুভার কানেই ঢুকছে না। ও নিজের পেটের ব্যথার দিকে পাত্তাই দিচ্ছে না।

_​“স্টিচ ছিঁড়ে যাবে, র’ক্ত পড়বে! পড়ুক! আমার পুরো শরীর র’ক্তে ভেসে যাক, তাতে আপনাদের কী? আমাকে ওর কাছে নিয়ে চলুন, প্লিজ। নাহলে আমি শেষ করে দেব নিজেকে!”

_“ কিন্তু উনি তো এখন হসপিটালে নেই।” একজন নার্স বলল।

_“ ক-কোথায়? কোথায় গিয়েছে?”

_“ তাকে তার লোকেরা নিয়ে গেছে তার শেষ…” পাশে থাকা আরেকজন নার্স তাকে থামিয়ে দিলো।

অনুভা এবার গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলো।

_​“কী লুকাচ্ছেন আমার থেকে? কেন করছেন এরকম? কেন? বলুন ও কোথায়?”

​পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে এবং অনুভার এই আত্মঘাতী পাগলামি থামাতে এবার প্রথম নার্সটা অসহায় মুখ করে বলেই ফেলল,

_​“ম্যাম, প্লিজ শান্ত হোন! ওনাকে আর হসপিটালে রাখার মতো কিছু অবশিষ্ট ছিল না। ওনার লোকেরা ওনাকে নিয়ে গেছে। এই হসপিটাল সংলগ্ন মসজিদের পাশের কবরস্থানেই ওনার শেষকৃত্যের

ব্যবস্থা করা হয়েছে!”

শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলল অনুভা। বড় বড় চোখ করে নার্সের দিকে তাকিয়ে রইল। তার কথাগুলো কেমন যেন অবোধ্য ঠেকল ওর কাছে। সামান্য কয়েকটা শব্দ এত ভারী হতে পারে? বুকের ওপর এত বড় পাথর হয়ে চেপে বসতে পারে! চোখের পাতা দুটো নড়ছে না । মাথাটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেল। শেষকৃত্য! শব্দটা তো তায়ানের নামের সাথে কোনোদিনও মেলাতে পারবে না ও।

_“ কার…শেষকৃত্য?” অনুভা নিজেই শুনলো না ওর কথা।

_“ দেখুন সে আর নেই। এটা মেনে…”

অনুভা এগুলো শুনলো না। সে নার্সের বলা আগের বাক্যগুলো পুনঃরায় স্মৃতিচারণ করল।

‘হসপিটাল সংলগ্ন মসজিদের পাশের কবরস্থানে ওনার শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’ অনুভা দাঁড়াল না আর। চোখের পানি এক হাতে মুছতে মুছতেই কড়িডোর দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে বের হয়ে গেল হসপিটাল থেকে। সে তো জানে ওর তায়ান আর নেই। কাল রাতেই জানে। কিন্তু তাও, অবাধ্য মনটা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত একটা অলৌকিক আশার আলো ধরে রেখেছিল।

​নার্সরা চিৎকার করে ওর পিছু নিল, কিন্তু এই উন্মাদিনীকে ধরার সাধ্য তখন কারোর ছিল না। অনুভা হাসপাতালের আট নম্বর ফ্লোর থেকে লিফটের তোয়াক্কা না করে, অবশ পা দুটো নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে তড়তড় করে নিচে নেমে এল। ওর মাথায় তখন লিফটের বোতাম চাপার মতো সুস্থ কোনো চিন্তা কাজ করছিল না। হাসপাতালের চত্বরে পা রাখতেই সংলগ্ন মসজিদ থেকে ভেসে আসা মাগরিবের আযানের ধ্বনি ওর কানে এসে লাগল। এই পবিত্র, করুণ সুরটা যেন ওর ভেতরের জমানো বেদনাকে বাড়িয়ে দিল আরও হাজার গুণ। ও সেই আযানের আওয়াজ অনুসরণ করে ব্যাকুল হয়ে সেদিকেই এগিয়ে গেল। পরক্ষণেই এক দৃশ্য দেখে মাটির সাথে জমে পাথর হয়ে গেল ওর পা জোড়া।

​অদূরে কয়েকজন মানুষ নিঃশব্দে মাটি খুঁ’ড়ছে। পাশে রাখা একটা কাঠের কফিনের একপাশে কালো পোশাকে এলেনা আর রিকো পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অনুভা ঝড়ের গতিতে চারপাশের বাতাস কাঁপিয়ে সেখানে গিয়ে হাজির হয়। রিকো আর এলেনাকে সজোরে দুহাতে সরিয়ে দিয়ে ও কফিনের ঢাকনাটা খুলে ফেলল। কা’ফনের সাদা কাপড়টা সরিয়ে বের করে আনল তায়ানের ফ্যাকাসে, বরফ শীতল মুখটা। খুব তাড়াহুড়ো করে কাজগুলো করল ও, যেন একটু দেরি হলেই কেউ তায়ানকে চিরতরে লুকিয়ে ফেলবে।

বিজ্ঞাপন

_​“আমাকে সাথে নিয়ে চলুন! আমাকে সাথে নিয়ে ম’রবেন বলেছিলেন না? তাহলে আজ নিজের দেওয়া কথা এভাবে ভেঙে দিচ্ছেন কেন? আমায় সঙ্গে নিন! আমায় নিয়ে সেই নদীটায় ঝাঁপ দিয়ে বাকি পথটুকু আপনি একা কীভাবে চলে যাচ্ছেন? আবারও মাঝপথে আমার হাত ছেড়ে দিলেন?

​আমি কার কাছে যাব? আমাদের ছেলেটার কী হবে? আপনি তো জানতেন, তায়ান ছাড়া অনুভার এই পৃথিবীতে আর কোনো অস্তিত্ব নেই, কোনো ঠিকানা নেই। তাহলে আজ আমাকে এই জীবন্ত লাশের মতো ফেলে রেখে নিজে কোন অভিমানে ঘুমিয়ে পড়লেন? চোখ খুলুন, প্লিজ একটা বার চোখ খুলুন! আপনি এভাবে একা অন্ধকার ক’বরে থাকতে পারেন না, আমি আপনাকে একা থাকতে দেব না!”

এলেনা শীতল চোখে চুপচাপ তাকিয়ে রইল অনুভার এই পাগলামির দিকে। রিকো নিজের দৃষ্টিটা অন্যদিকে । কেন যেন অনুভার এই কান্না, এই আর্তনাদ ওর ভেতর বিরক্তির জন্ম দিচ্ছে। ও পা বাড়িয়ে একটু দূরে সরে দাঁড়াল। এই মুহূর্তে এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে ও নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে হয়তো এমন কোনো কথা মুখ দিয়ে বলে ফেলবে যা এই মেয়েটাকে আরও বেশি কষ্ট দেবে।

​অনুভা চোখের জলভেজা ঝাপসা চোখে সামনে তাকাল। দেখল, একটু দূরে গার্ডরা খুব যত্নে একটা মাটির গর্ত খুঁড়ছে। কেমন নিখুঁত, সুন্দর আর শান্ত একটা অন্ধকার জায়গা বানাচ্ছে ওরা ওর জানটাকে সারা জীবনের জন্য লুকিয়ে রাখার জন্য! কিন্তু এখানে কেন একজনই থাকে? কেন এই ছোট্ট মাটির ঘরে দুজনে মিলে থাকা যায় না?

​অনুশোচনায় অনুভার বুকটা ভেঙে আসতে চাইল। কেন সে এমনটা হতে দিল? কেন তায়ানকে একটাবার করে ক্ষমা করতে পারল না? আজ তাদের দুজনের জেদ, অহংকার আর দূরত্বের জন্যই তো এই পরিণতি হলো! আর আজ সব দূরত্বের অবসান ঘটিয়ে মাঝখানে দেয়াল হয়ে চলে এলো এই সাড়ে তিন হাত ক’বর! তায়ানের বরফ শীতল গালে নিজের ভেজা কপালটা ঠেকিয়ে অনুভা শেষমেশ ডুকরে কেঁদে উঠল,

_​“তোমার আর আমার মাঝে এসে জিতে গেল এই নির্দয় কবর! ভালোবাসা, প্রতারণা-আত্মসম্মান, ঘৃণা, আমাদের সমস্ত জেদকে হারিয়ে দিয়ে শেষমেশ এই সাড়ে তিন হাত ক’বরটা জিতে গেল! সাথে মুক্তি পেয়ে গেলে তুমি। আর আমায় দিয়ে গেলে শূন্যতা।”

অনুভা তায়ানের কপাল আর দু’গালে চুমু খেল। ওর ঠোঁট দুটো কাঁপছে। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষাদময় হাসি ফুটে উঠেছে। খুব হাসি পাচ্ছে। নিজেকে বড্ড ভাগ্যহীন মনে হচ্ছে ওর। ভালোবাসা… তারপর প্রতারিত হওয়ার সেই যন্ত্রণা… সেই যন্ত্রণা থেকে জন্ম নেওয়া এক ঘৃণা… এবং সবশেষে সেই ঘৃণাকে ছাপিয়ে আবারও ভালোবাসার মানুষকে চিরতরে হারিয়ে ফেলার এই নারকীয় যন্ত্রণা! নিয়তি কত সুন্দর করে ওর জীবনটা নিয়ে খেলে গেল!

​এই মুখটাকে ও এতদিন কত অবজ্ঞা করে এসেছে, কত অবহেলা করেছে। এই মুখটার ভেতরে লুকিয়ে থাকা অস্থিরতা, ওকে ফিরে পাওয়ার ব্যাকুল ছটফটানি অনুভা চোখের সামনে দেখেও কোনোদিন দেখেনি, বুঝেও বুঝতে চায়নি। অথচ আজ যখন সব জেদ ভুলে ও তায়ানকে দেখতে চাইছে, নিজের চোখের পানির জন্য মুখটা স্পষ্ট দেখতেও পারছে না। বারবার নোনা জল এসে ওর চোখ দুটোকে ঘোলা করে দিচ্ছে। আর মাত্র কয়েকটা মিনিট… তারপর ও চাইলেও এই চেনা মুখটা পৃথিবীর কোথাও আর কোনোদিন দেখতে পাবে না। অনুভা তায়ানের নিথর দেহটাকে দুহাতে জাপটে ধরে আবারও ডুকরে কেঁদে উঠল।

​রিকো এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ও সামনে এগিয়ে এসে অনুভাকে শক্ত করে ধরে তায়ানের কফিন থেকে সরিয়ে দিল।

_“সরো অনুভা, ওকে এবার সমাধি দিতে হবে। অনেক হয়েছে, এবার সরো এখান থেকে।”

_​“আমি সরব না! ও কোথাও যাবে না… ও আমার কাছেই থাকবে!” অনুভা আবারও পাগলের মতো তায়ানের ওপর আছড়ে পড়ে ওকে জাপটে ধরল।

​রিকো এবার একটু জোর করেই ওকে টেনে সরিয়ে দিল। রিকোর চোখের কোণে তখন লাল আভা। ও দাঁতে দাঁত চে’পে বলল,

_“কেন এমন নাটক করছ? তুমি তো মনে মনে এমনটাই চেয়েছিলে, তাই না? কতবার নিজের এই মুখে ওকে ম’রে যেতে বলেছিলে, মনে পড়ে? নাও, হি ইজ রিয়্যালি ডেড! তোমার সেই চাওয়া আজ পূরণ হয়েছে। তাহলে এখন কেন কাঁদছ? তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় পথের কাঁটা তো চিরতরে চলে গেল। যাও, এবার নিজের লাইফ এনজয় করো!”

​রিকোর এই ধারালো কথাগুলো তীরের মতো অনুভার বুকে বিঁধল। ওর কান্না যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। নিজের অপরাধবোধের আগুনে পুড়তে পুড়তে আরও ভেঙে পড়ল।

​রিকো তবু থামল না,

_“তুমি দয়া করে আর কেঁদো না অনুভা। আমার সত্যিই বড্ড বিরক্ত লাগছে! আজ যে ভালোবাসার টানে তুমি এখানে এসে এমন পাগলামি করছ, এই ভালোবাসাটা এতদিন কোথায় ছিল? তুমি কি এতটাই অবুঝ? সবটা সত্যি জানার পরও কি তোমার একটা বারও মনে হয়নি যে ও তোমার সাথে যা করেছে, ওর জায়গায় তুমি থাকলেও ঠিক এই কাজটাই করতে?”

​বলতে বলতে রিকোর কণ্ঠ এবার ধরে এল, চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। ও গলা নামিয়ে ধরা গলায় বলল,

_“তুমি কি পারতে না নিজের ভালোবাসার জোর দিয়ে ওর ভুলগুলো ভুলে নতুন করে সব শুরু করতে? ও তোমার জন্য কী করেনি বলো? নিজের একটা ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে ও কি করেনি? ভালোবাসার শক্তি নাকি সবথেকে প্রবল হয় অনুভা… এটা দিয়ে একটা জানোয়ারকেও মানুষে পরিণত করা যায়। আর সেখানে তায়ান তো নিজেই মানুষ হয়ে, নিজের সবটুকু অহংকার বিসর্জন দিয়ে তোমার কাছে ফিরে এসেছিল! তুমি কি পারতে না আর একটুখানি উদার হয়ে ওর বুকে ফিরে যেতে? ও তো বরাবরই শুধু তোমারই ছিল। তোমার জায়গা ও তোমার থেকে শত দূরে থেকেও এই জীবনে কাউকে দিতে পারেনি। আর তুমি…”

​রিকো জানে না সে কেন এখানে দাঁড়িয়ে এগুলো বলছে। সে এটাও জানে না যে এই মুহূর্তে, তায়ানের লা’শের সামনে দাঁড়িয়ে অনুভাকে এভাবে কাঠগড়ায় তোলা ওর ঠিক হচ্ছে কিনা। কিন্তু সে নিজেও আজ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন।

​

সে নিজের চোখে দেখেছে তায়ানের শেষ দিনগুলোর ছটফটানি, ওর না ঘুমানো রাতগুলো। তাই রিকোর এখন তায়ানের জন্য আফসোস হয়েও হচ্ছে না। অনুশোচনা আর অবহেলা নিয়ে না খেয়ে, না ঘুমিয়ে জ্যান্ত লাশ হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে, তায়ানের জন্য এভাবে শান্তিতে মরে যাওয়াটাই হয়তো অনেক ভালো হয়েছে। রিকো শূন্য দৃষ্টিতে গার্ডদের খুঁড়তে থাকা ওই অন্ধকার গর্তটার দিকে তাকাল। আজ অন্তত শান্তিতে ঘুমাবে ছেলেটা।

_“আত্মসম্মান নিয়ে আর যাই হোক, ভালোবাসা হয় না। অতিরিক্ত জেদ মানুষকে নিঃশেষ করে দেয়।” তায়ানের কবর থেকে চোখ সরিয়ে অনুভার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল রিকো। অনুভা তখনও তায়ানের নিথর দেহটাকে পাগলের মতো জাপটে ধরে আছে। এলেনা আর রিকোকে একটা শব্দও বলতে দিল না, ও ইশারায় রিকোকে থামিয়ে দিল।

​রিকো এবার অনুভাকে শক্ত হাতে সরিয়ে, বাকিদের সাহায্য নিয়ে তায়ানের কফিনটা তুলে ওর শেষ ঠিকানার দিকে এগিয়ে গেল। ​পেছন থেকে বাতাসে ভেসে আসছে অনুভার হাজারটা বুকফাটা আহাজারি, কান্নার আর্তনাদ। এলেনা আর হাসপাতালের নার্সরা ওকে শক্ত করে আটকে রেখেছে যেন ও ক’বরের দিকে ছুটে যেতে না পারে। রিকোর ভেতরটা আবারও তাচ্ছিল্যে ভরে উঠল। লাভ নেই তো! কী লাভ এখন এমন করে? যে মানুষটা বেঁচে থাকতে এক ফোঁটা ভালোবাসা পেল না, তার মৃত্যুর পর এই রাজকীয় শোক স্রেফ একটা প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়।

​অনুভা নিজের ভেতর ভালোবাসা আর আত্মসম্মান দুটোকে একসাথে জায়গা দিতে গিয়ে আজ দুটোই হারিয়েছে। যেখানে ভালোবাসা থাকে, সেখানে তো আত্মসম্মানের স্থান নেই। আর যেখানে আত্মসম্মান বড় হয়ে ওঠে, সেখানে ভালোবাসা পুরোপুরি ফিকে হয়ে যায়। কিন্তু অনুভা দুটোই আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েছিল। ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো! অহংকার আর আত্মসম্মান ধরে রাখতে গিয়ে সে ভালোবাসাকে হারাল, আর আজ ভালোবাসার মানুষকে হারিয়ে ওর সেই অহংকারী আত্মসম্মানও ধূলিসাৎ হয়ে গেল।

আল্লাহ তাআলা মানুষকে কত গুণ দিয়েছেন, তার মধ্যে ক্ষমা হলো সবচেয়ে মহৎ, সবচেয়ে সুন্দর এক স্বর্গীয় গুণ। যে ক্ষমার হাত বাড়িয়ে দিলে পৃথিবীর বড় বড় ক্ষত এক নিমেষে মিলিয়ে যায়। অনুভা সেটা করতে পারেনি। অথচ তাকেই নাকি পৃথিবীর সবচাইতে বেশি ভালোবাসে! তবে কেন এই মহৎগুন সেই মানুষটার উপর প্রয়োগ করতে পারল না! কেন নিজের জেদ, সেলফ রেসপেক্টকে জেতাতে গেল! আর কেনই বা তায়ান প্রতিশোধ পরায়ন হলো! এই দুটো শব্দের কাছে সব কিছু হেরে গেল!

অনুভা দেখল, প্রতিদিন টেলিভিশনের পর্দায় সবুজ মাঠে যে গম্ভীর মানুষটাকে ও ফুটবল খেলতে দেখত, সেই তায়ান ভাইকে ওরা কফিন থেকে বের করে ধীরলয়ে ওই ঘুটঘুটে অন্ধকারের ভেতর নামিয়ে রাখছে। এতক্ষণের সব ছটফটানি, উন্মাদনা এক নিমেষেই থমকে গেল ওর। একদম চুপচাপ, পলকহীন চোখে দৃশ্যটা দেখতে লাগল।

বোঝার বয়স হওয়ার পর থেকেই এই মানুষটাকে ও নিজের অজান্তেই ভালোবেসে ফেলেছিল। মনের গভীরে যত্নে আগলে রেখেছিল ওর প্রতিচ্ছবি। অথচ আজ সেই মানুষটাই নিজের সমস্ত অস্তিত্ব, সমস্ত ভালোবাসা গুটিয়ে নিয়ে চিরতরে মাটির বুকে বিলিয়ে দিচ্ছে নিজেকে। অনুভার ভেতরটা এত বেশি অসাড় হয়ে গেল যে, ও এখন আর একটা চিৎকার করার শক্তিও খুঁজে পেল না। এক ফোঁটা কান্নাও আর চোখ দিয়ে নামল না। ও শুধু দেখেই গেল পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ানক দৃশ্যটা। অনুভার চোখের পাতাও আর কাঁপছিল না। কোদালের প্রতিটা ঘায়ে যখন তায়ানের ওপর মাটির আস্তরণ জমছিল, অনুভার ঠোঁট দুটো তখন নিঃশব্দে নড়ে উঠল। ম্লান হাসি ফুটিয়ে ও একদম ফিসফিসে গলায়, শুধু মাত্র তায়ান শুনতে পাবে এমন স্বরে বলল,

_​“আমাদের পরপারে দেখা হবে দেখো তায়ান, সৃষ্টিকর্তা আমাদের আবার এক করবেন। আমি সেখানে আবারও কিশোরী অনুভা হয়ে তোমার প্রেমে পড়ব। তবে একটা কথা… তুমি কিন্তু সেখানে আর আমার সাথে প্রতারণা কোরো না। আমার বিশ্বাস আর ভেঙো না কোনোদিন। এই পৃথিবীতে যা অসম্পূর্ণ রয়ে গেল, সেখানে আমাদের সেই ভালোবাসা পূর্ণতা পাবে। তুমি শুধু আমার অপেক্ষায় থেকো তায়ান… আমি খুব শীঘ্রই তোমার কাছে চলে আসব। এই নিয়তি, এই পৃথিবী আমাদের তাচ্ছিল্য করেছে, কিন্তু পরপারে তো আর কোনো দেয়াল থাকবে না।”

তায়ানের ওপর এখন শেষধাপের মাটি চাপাদেওয়া চলছে। রিকো নিজের কাঁপতে থাকা হাতে কোদাল ভরে সেই মাটিগুলো দিচ্ছে। চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল অনুভা। ​ঠিক এক মিনিট পর, ও যখন ধীরলয়ে আবার চোখ মেলল, চারপাশের অন্ধকার কবরস্থান, মাটির স্তূপ এক নিমেষে ভ্যানিশ হয়ে গেল। ও দেখল, দূর থেকে মানুষটা একদম হাস্যোজ্জ্বল মুখে ওর দিকেই হেঁটে আসছে। হ্যাঁ, তায়ান হেঁটে আসছে! ওর পরনে কোনো সাদা কাফন নেই, মুখে কোনো যন্ত্রণার ছাপ নেই। ঠিক আগের মতোই প্রাণবন্ত। অনুভার ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। এক বুক শান্তি নিয়ে অনুভা আবারও চোখ বুজে ফেলল।

————

তখন থেকে শুরু করে গত কয়েকটা মাস অনুভার দিনগুলো এভাবেই কাটছে। ওর অদ্ভুত এক দুনিয়ায় তায়ান এখনো জীবিত, একদম আগের মতোই। তায়ান আর ছোট্ট আরাফকে নিয়ে ও নিজের কল্পনার এক নিখাদ সংসার পেতে বসেছে। সেই মায়ার সংসারে ও ভীষণ সুখে আছে। প্রথম প্রথম রিকো আর এলেনা ব্যাপারটাকে শোকের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া ভেবেছিল। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছিল, অনুভার এই বিভ্রমের দেয়ালটা যেন আরও শক্ত হচ্ছিল। ​পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে ওর উন্নত চিকিৎসার জন্য রিকো আর এলেনা শেষমেশ অনুভাকে নিয়ে আমেরিকায় চলে আসে। তায়ানের শেষ ঠিকানা সিঙ্গাপুরেই রয়ে গেছে। রিকোর অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মৃ’ত দেহটা বেশি সময় রাখা সম্ভব ছিল না বলে সিঙ্গাপুরেরই এক মসজিদের লাগোয়া কবরস্থানে ওকে শায়িত করা হয়।

​রিকো চাইলে পারতো অনুভাকে ওর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে, কিন্তু ও তা করেনি। অনুভা ফিরে গেলে শান্ত ছেলেটা আবারও নিজের সবকিছু বিসর্জন দিয়ে ওর পেছনে ছায়ার মতো পড়ে থাকবে। এতে অনুভাও কখনো এই ঘোর থেকে বের হতে পারবে না, আর শান্তও কোনোদিন নিজের জীবনটা গুছিয়ে নিতে পারবে না। এমনও তো হতে পারে, আজ থেকে পাঁচ বা দশ বছর পর অনুভার ইচ্ছা না থাকার পরও ওর পরিবার জোর করে ওকে শান্ত বা অন্য কারও হাতে তুলে দেবে! রিকো বেঁচে থাকতে অন্তত এই অন্যায়টা হতে দেবে না। যে বন্ধু নিজের ভালোবাসা, নিজের বউকে নিজের করে আগলে রাখার জন্য শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এত বড় যুদ্ধ করে গেল, তার আমানতকে রিকো অন্য কারও ঘরে যেতে দিতে পারে না। রিকো এমনিতে ভীষণ উদার, কিন্তু বন্ধুর বেলায় ও নিজেও চরম স্বার্থপর। তায়ান আজ নেই, অনুভা না হয় থেকেও না থাকুক। শান্ত নিজেকে গুছিয়ে নিক। আর আরাফ? ও আপাতত ওখানেই ভালো আছে। ভবিষ্যতে অনুভা যদি কোনোদিন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে, তখন না হয় আরাফকে ওর বুকে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে। আর তাছাড়া, অনুভার নিজস্ব ভুবনে তো তায়ান আর আরাফ দুজনেই ওর হাত ধরে আছে। ও তো নিজের মতো করে সুখেই আছে!

​আমেরিকায় আসার পর অনুভাকে দেখে ডাক্তার এর নাম দিয়েছেন ডিলুশনাল ডিজঅর্ডার উইথ সাইকোটিক গ্রিফ। ডাক্তারদের ভাষায়, প্রিয় মানুষের আকস্মিক চলে যাওয়ার ধাক্কাটা অনুভার মস্তিষ্ক নিতে পারেনি। নিজেকে অপরাধবোধ আর একাকীত্ব থেকে বাঁচাতে ওর মন সজ্ঞানে বাস্তবতাকে অস্বীকার করে এই কাল্পনিক সুখের আশ্রয় নিয়েছে, মনোবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে এক প্রকার প্রতিরক্ষা কবচ বা ডিফেন্স মেকানিজমও বলে। যে তায়ানকে ঘৃণা করে বলেও সেই তায়ানের মধ্যেই আটকে রয়েছে। ঘৃণা করেও সে তায়ানের মৃত্যুর পর তাকে ভ্রম করছে।

রিকো এতে খুব বেশি অবাকও হয়নি। কারণ তায়ান তো এটাই চাইছিল! অনুভা যদি আজ স্বাভাবিক থাকত, তবেই বরং রিকো অবাক হতো। সেদিন নদীর চরে রিকো যখন পৌছাল তখন ওদরে গার্ডরা হেলিকপ্টারে তোলার সময় বালুর উপর বড় বড় ইংরেজি অক্ষরে লিখে রাখা সেই বাক্যটা দেখে ওর শরীরটা জমে গিয়েছিল। সে সেটা সেদিন ছবি তুলে রেখেছিল। ফোন বের করে রিকো ছবিটা বের করল, যেখানে তায়ানের লিখে যাওয়া অক্ষর গুলো এখনও জ্যান্ত আছে। সেদিন হয়তো নিজের মরণ যন্ত্রনা নিয়ে এতটুকুই লিখতে পেরেছিল মানুষটা! সেই ১৭ টি শব্দের একটা বাক্য!

‘My heart is stopping, but my love will never die, you can’t run from my soul.’

✦ রাইটার'স নোট ✦


কিছু মৃ’ত্যুতেও পূর্ণতা। এটা মেনে নিন…
ক্ষমা মহৎ গুন তাই অনুভার মতো এত কঠোর হওয়াও ভালো না। যদি আপনি কাউকে ভালোবেসে থাকেন, তার ভুলের একটা সুযোগ দিন। একবার দিন, দু'বার দিন...তারপর আর দেওয়ার দরকার নেই। তবে একবার দিতেই পারেন।
বিজ্ঞাপন
রক্ত রেখার আড়ালে গল্পটি আয়েশা শেখ রিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে মোড়ানো থ্রিলার উপন্যাস