রক্ত রেখার আড়ালে

পর্ব - ১২

🟢

_“আমি কাউকে কিচ্ছু জিজ্ঞেস করতে পারব না।কিচ্ছু জানি না আমি,জানতেও চাইনা।সব ভুলে গেছি আমি,শুধু মনে আছে আপনার দেওয়া প্রতিশ্রতি গুলো।শুধু মনে আছে আপনি বলেছেন আমাকে ভালোবাসেন।” অনুভা অবুঝের মতো করে বলল।

_“নাটক গুলো করতে আমার বড্ড কষ্ট হয়েছিল।কী ফালতু নাটক করে এসেছি এতদিন সবার সঙ্গে!” তায়ান বিরক্ত স্বরে বলল।

অনুভা ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে বলল,

_“ ও তায়ান ভাই!কেনো এমন করছেন?কেনো এভাবে ভেঙে দিচ্ছেন আমাকে?আমি পারছি না…সত্যিই আর সহ্য করতে পারছি না।আমাকে এভাবে শেষ করে দেবেন না।আমি..আমি কীভাবে এই আগুন সামলাবো?”

অনুভা কাঁদতে কাঁদতে মেঝেতে বসে পড়ে।আর কত সহ্য করবে সে।সে তো তার জীবনে এমন মিরাকল চায়নি।এমন জঘন্য সকালের আশায় তো তায়ানকে বিয়ে করেনি।আজকের সকালটা তো তার জীবনে আলোর প্রথম রেখা হয়ে নামার কথা ছিল।তা কেন এতো নিষ্ঠুর হচ্ছে?এটা কেন একটা দুঃস্বপ্ন না!কেন ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছে না!

এলেনা বিরক্ত হয় অনুভার কান্নায়।অনুভা আবারও বলল,

_“আপনি মজা করছেন তাইনা?ফান করছেন আমার সঙ্গে?”

_“হ্যাঁ,কাল পর্যন্ত করেছি।” বিদ্রূপ হেসে বলল তায়ান।

এলেনা রুক্ষ কন্ঠে বলে উঠল,

_“তোদের নাটক কী শেষ হবে না?এটাকে তাড়াতাড়ি বের কর।ভিকি তুই আপাতত মুখে বলে তালাক দিয়ে দে।বাকিটা পড়ে কাগজের মাধ্যমে হয়ে যাবে।” অনুভার দিকে শয়তানি হাসি দিয়ে বলল শেষের কথা।

এলেনার বলা কথা শুনতেই অনুভা মেঝে তে বসে থেকেই হামাগুড়ি দিয়ে তায়ানের পায়ের কাছে যায়,

_“এতো নিষ্ঠুর হবেন না।তার কথা শুনে আমাকে শেষ করে দেবেন না।আমি অনুরোধ করছি… তালাক দেবেন না আমাকে…সব মেনে নেব… কিন্তু তালাক… তালাক দেবেন না…”চোখের জল আর হেঁচকির ভিড়ে কথাগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে বের হলো।

তায়ান পা ঝটকা মে'রে ঠেলে সরিয়ে দেয় অনুভাকে।তারপর এক হাঁটু গেরে অনুভার সামনে বসে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,

_“তোকে তালাক দেব না আমি অনুভা।তোকে তালাকও দেব না গ্রহনও করব না।তোর বড় আব্বুকে ভাঙ্গার জন্য এর চেয়ে নিখুঁত শাস্তি আর হয় না।”

তায়ানের কথায় অনুভার কান্না একটু থমকে গেল। দু'হাতে চোখের জল মুছে,কান্না ভেজা চোখ তুলে সে তায়ানকে প্রশ্ন করল,

_“বড় আব্বু তো আপনার বাবা।তবু তার সঙ্গে আপনার কীসের শত্রুতা?তার শাস্তির সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক?”

তায়ানের চোখ জ্বলে উঠে।নিজের পৈশাচিক রুপ সামনে এনে অনুভার চোয়াল চে'পে ধরে বলল,

_“স্টপ! ডোন্ট সে অ্যানাদার ফা*কিং ওয়ার্ড।হি ইজ নট মাই ফাদার। আই হ্যাভ নো ফাদার।আমার বাবাকে এইখানে..এই বাড়িতে খু*ন করেছে তোর বড় আব্বু। আমার পুরো পরিবার ধংস করে দিয়েছে ওই জা*নো*য়ারটা।সে এতটাই নিকৃষ্ট যে,আমার বাবাকে খু'ন করে আমার মা'কে বিয়ে করেছে।”

তায়ানের এই কয়েকটা বাক্যে যেন অনুভার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল।বাকরূদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল তায়ানের পানে।নিজের কানকে বিশ্বাস হলো না তার।তায়ান তাদের বাড়ির ছেলে না?তার বড় আব্বুর র*ক্ত না সে?তার বড় মায়ের আগেও বিয়ে হয়েছিল আর তায়ান সেই ঘরের সন্তান? সব থেকে অবিশ্বাস্য বাক্য যেটা তা হলো,বড় আব্বু খু'ন করেছে তায়ানের বাবা কে!আদৌও এটা সম্ভব?সম্ভব না অনুভা এটা বিশ্বাস করবে না।অনুভা যদি নিজের মায়ের পর কাউকে ভালোবাসে,সম্মান করে সেটা হলো বড় আব্বু।তার আদর্শেই সে বড় হয়েছে।সে সজ্ঞানে থেকে এমন কিছু কখনোই করতে পারে না।

অনুভা দু'দিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

_“আমার বড় আব্বু এমন কিছু করতেই পারে না। আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে,তায়ান ভাই।”

তায়ান অনুভার কাছ থেকে উঠে দাঁড়ায়।কৌতুক শোনার মতো করে হেসে বলল,

_“আই নো সুইটহার্ট!তুই এই কথাই বলবি।তোর মত আহাম্মক মেয়ে আমি দু'টো দেখিনি।নিজের বাবার এতো অত্যাচার সহ্য করেও ওই বাড়িতে পড়েছিলি।আহাম্মক বলেই তো…”

_“আহাম্মক বলেই তো আপনাকে বিশ্বাস করেছিলাম।” অনুভা চোখের জল মুছতে মুছতে তাচ্ছিল্য হেসে বলল।

তায়ান সেই কথার কোন প্রতিক্রিয়া না করে গম্ভীর স্বরে বলল,

_“তুই বিশ্বাস করিস আর না করিস।এটাই সত্য যে,তোর বড়ো আব্বু একটা জা*নো*য়ার।নরপিশাচের মতো আমার পরিবার ধংস করেছে।এবার আমার ধংস করার পালা।তিলে তিলে সব শেষ করব।”

অনুভা নিজের শাড়ির আচঁল ঠিক করে উঠে দাঁড়াল।

_“সে যদি এমন কিছু করেও থাকে,তার পাপের শাস্তি আমাকে কেন দিচ্ছেন?আমার অপরাধ কী?”

_“তোর অপরাধ তোর বড় আব্বু তোকে বেশি ভালোবাসে।হ্যাঁ,বাড়ির সবার মধ্যে তোর প্রতি তার ভালোবাসা বেশি।তাকে ভাঙ্গার জন্য তোর চেয়ে বড় হাতিয়ার আমি পাইনি।” তায়ান একটু থেমে অনুভার দিকে তাকিয়ে চোয়াল শক্ত করে বলল,

_“আই রিপিট..আমি তোকে তালাকও দেব না,গ্রহনও করব না।তুই বেঁচে থাকবি এক অনিশ্চিত নরকে।তোর প্রতিটা শ্বাসরুদ্ধ নিঃশ্বাস, রক্তঝরা চোখের জল,আরমান আহসানিকে ধংসের অন্তিম সীমানায় নিয়ে দাড় করাবে।”

_“অথচ ওই মানুষটা আপনাকে বেশি ভালোবেসে এসেছে!” অনুভা বলল।

_“নাটক সব,নাটক!তার মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছে…”

তায়ান তার কথা শেষ করার আগেই অনুভা তায়ানের বুকের শার্ট চে’পে ধরে কান্নামিশ্রিত স্বরে বলতে লাগল,

_“আপনাদের এসব প্রতিশোধের খেলায় আমাকে কেন পোড়াচ্ছেন?আমাকেই কেন সহ্য করতে হবে?আমি তো আজ অবধি এতকিছু জানতামও না।তাহলে এসবের শিকার আমি কেন হবো?বড় আব্বু নরপিশাচ হলে আপনিও তার চেয়ে নিকৃষ্ট জা*নো*য়ার…”

অনুভার বাক্য শেষ হতে না হতেই,তায়ান আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে অনুভার গালে সজোরে চ'ড় বসিয়ে দেয়।তাল সামলাতে না পেরে অনুভা সোফার সঙ্গে গিয়ে ধা’ক্কা খায়।ঠোঁট ফেটে রক্ত বেড়িয়ে আসে তার।অনুভা ঠোঁটে হাত দিয়ে র*ক্ত স্পর্শ করে চোখের সামনে তুলে ধরে তাচ্ছিল্য হাসে।নিজের ভাগ্যের উপর ঘৃণা হয় তার। এতক্ষণ এলেনা আর রিকো নিরব দর্শক ছিল।রিকোই এলেনাকে কোনো কথা বলতে দেয়নি।তবে তায়ানের এমন কাজ পছন্দ হলো না রিকোর।সে তায়ানকে তিরস্কার জানিয়ে বলল,

_“গাঁয়ে হাত তুলো না তায়ান। এমনিতেও তুমি অন্যায় করছ।”

_“ন্যায় অন্যায় আমাকে শেখাতে এসো না। ওকে ওর জায়গায় দিয়ে আসো।চোখের সামনে থেকে চলে যেতে বলো।” তায়ান চি*ৎকার করে বলল।

রিকো কিছু বলল না।তায়ান গিয়ে অনুভার বাহু শক্ত হাতে ধরে টেনে তোলে।সদর দরজার দিকে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে আবারও ধা*ক্কা মে'রে ফেলে দিয়ে বলল,

_“বের হ এখান থেকে।গিয়ে বল আমার কথা,দেখা তার কৃতকর্মের ফল।”

রিকো হনহনিয়ে অনুভাকে টেনে তুলে বলল,

_“কেন চলে যাচ্ছ না?শুধু শুধু কেন অপমান হচ্ছ?চলে যাও অনুভা।চলো তোমাকে রেখে আসি।” রিকোর বাংলা কথা গুলো এখনো অস্পষ্ট শোনায়।

এলেনা রিকোর কথা শুনে চোখ উল্টায়।অনুভা রিকোর কথায় প্রতিক্রিয়া দেখায় না।ওভাবেই বসে থেকে কাঁদতে থাকে।রিকো অনুভাকে টেনে তোলে,

_“চলো আমার সঙ্গে।এখানে যত থাকবে অপমানিত হবে।”

অনুভা রিকোর হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে হেঁচকি তুলতে তুলতে বলল,

_“কোথায় যাব আমি?এটা আমার স্বামীর বাড়ি এখান থেকে আমি কোত্থাও যাব না।”

অনুভার কথা শুনতেই এলেনা সা*পের মতো ফুঁসে ওঠে।বিদ্যুৎ বেগে এসে অনুভার চুল মুঠো করে ধরে।অনুভা ব্যথায় চোখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলে।তায়ান যেন এসব দেখেও দেখে না।সে নির্লিপ্ত চোখে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে।অনুভার কান্না তার বিরক্ত লাগছে।

রিকো এলেনাকে ধা’ক্কা মে'রে সরিয়ে দেয়,

_“নিজের লিমিটের মধ্যে থাক,এলেনা!তুই যার জন্য এসব করছিস সে কিন্তু তোর দিকে ফিরেও তাকায় না।” এলেনাকে খোঁচা মে'রে কথাটি বলল রিকো।এলেনা কিছু বলতে চেয়েও বলল না।কারণ রিকো ঠিকই বলেছে।সে তায়ানকে এত বছর ধরে ভালোবেসে আসছে,আজ অবধি তায়ান তাকে বোঝারই চেষ্টা করেনি।

রিকো অনুভার বাহু ধরে আবারও সদর দরজার দিকে নিয়ে যেতে যেতে বলল,

_“চলো এখান থেকে।সেলফ রেস্পেক্ট বলেও তো কিছু আছে।এভাবে অপমানিত হওয়ার কোনো মানে নেই।”

বিজ্ঞাপন

অনুভা আবারও রিকোর থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে দৌড়ে এসে তায়ানকে ঝাপটে ধরে।সঙ্গে সঙ্গে তায়ান চোখ বন্ধ করে ফেলে।অনুভা নিজের সর্ব শক্তি দিয়ে তায়ানের গলা জড়িয়ে নিয়ে উন্মাদের মত এক নাগাড়ে বলতে থাকে,

_“এমন করবেন না আমার সঙ্গে। আমি কোত্থাও যাবো না আপনাকে ছেড়ে। প্রয়োজনে আমাকে এখানেই মে'রে ফেলুন,তবু এভাবে বের করে দেবেন না।আমি এত বছর আপনাকে ভালোবেসে এসেছি!তার প্রতিদান এভাবে দেবেন না।আপনি যেভাবে বলবেন আমি সেভাবেই থাকব।যেভাবে চাইবেন,সেভাবেই চলব।আমার ভালোবাসা এভাবে ফিরিয়ে দিয়েন না। আমি ম”রে যাবো।”

তায়ানের দম আটকে আসছে।সহ্য হচ্ছে না অনুভার কান্না। কেন যেন বুকে অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে।অনুভাকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিতে চায়।অনুভা আরও শক্ত করে ধরে একই ভাবে বলতে থাকে,

_“যদি এমনই করবেন তাহলে আগে কেন বলেননি?নিজেকে ভেঙে ফেলার জন্য প্রস্তুত থাকতাম।কেনই বা কাল রাতে এতো ভালোবাসার কথা বললেন,কেন আমাকে স্পর্শ করেছিলেন?”

তায়ানের কাছে এসবের কোনো উত্তর নেই।সে নিজেও জানে না কেন অনুভাকে স্পর্শ করেছে।যদিও প্রতিশোধের জন্য বিয়ে করে ছেড়ে দেওয়াটাই যথেষ্ট ছিল।বাকি গুলো কেন করেছে জানে না,জানার ইচ্ছাও নেই।আর এতে তার কোনো অনুশোচনাও নেই। অনুভা আরও বলতে থাকল,

_“উত্তর দিন।কেন স্পর্শ করেছিলেন?সারাজীবন ভালোবাসার স্বপ্ন দেখিয়ে আজ কেন আগুনে ফেলে দিচ্ছেন।বলুন।উত্তর দিন!” কাঁদতে কাঁদতে নিস্তেজ হয়ে এলো অনুভার কন্ঠ।

_“এভাবে আগুনে ফেলে চলে যাবেন না।সত্যি বাঁচতে পারব না।”

_“ম’রে যা।” তায়ান অনুভাকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে আনল।অনুভার চোখে তাকিয়ে বলল,

_“ বাঁচতে না পারলে,ম'রে যা।”

অনুভা বিস্ময়ে স্থির হয়ে তায়ানের দিকে তাকিয়ে রইল।বুকে হাত রেখে হা করে শ্বাস টানল।তার বুকফাটা কান্না,উন্মাদনা,চোখের জল কোনো কিছুই তায়ান কে স্পর্শ করেনি।করবেও না।তায়ান সেদিন খেলার মাঠে বলেছিল,

‘তার স্বপ্ন কারও দুঃস্বপ্ন হওয়া।’সে তার স্বপ্ন পূরন করেছে।সে অনুভার দুঃস্বপ্ন হতে পেরেছে।এমন এক দুঃস্বপ্ন, যা অনুভা কোনো দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি।

সে ধীরে ধীরে এক পা,এক পা করে পিছিয়ে যায়।অনুভা হয়তো নিজেই চলে যেতো কিন্তু তায়ান তার আগেই অনুভার বাহু চে'পে ধরে টানতে টানতে সদর দরজার বাহিরে বের করে দিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলো।অনুভা ডুকরে কেঁদে ওঠে।সেখানে বসে পড়েই চি*ৎকার করে কাঁদল।রিকো দরজা খুলে দিতে চাইলে তায়ান বাঁধা দেয়।অনুভা চলে যেতে যেতে কালকের কথা ভাবল।কালকে ঠিক এই দরজা দিয়েই এক সমুদ্র রঙিন স্বপ্ন নিয়ে তায়ানের হাত ধরে প্রবেশ করেছিল।আর আজ!আজ সেই হাতেই ধা’ক্কা মে'রে বের করে দিলো।এটাই ছিল তার জীবনের মিরাকল!

তাকে ধংস করার জন্য কত রঙ্গকৌশলই না করল মানুষটা!সে সত্যিই আহম্মক।মস্ত বড় আহম্মক!যে মানুষটা তাকে ভেঙে চুরমার করার জন্য একের পর এক রঙিন অভিনয় সাজিয়েছিল, তাকেই সে ভালোবেসে এসেছে বছরের পর বছর।বিশ্বাস করেছিল নিঃশর্তভাবে।আর আজ কত নিখুঁতভাবে সে তাকে ধ্বংসের পথে ফেলে দিল!এই মুহুর্তে অনুভার মন বিদ্রুপ হেসে বার-বার একটা গান-ই গেয়ে উঠছে,

“ না জানি কোন অপরাধে দিলা এমন জীবন!

আমারে পোড়াইতে গো তোমার এত আয়োজন!”

রাস্তায় পড়ে থাকা ইটের সঙ্গে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল অনুভা।তা দেখে,দুটো মেয়ে এসে তাকে তুলে দাঁড় করাল। ভাবতে ভাবতে আনমনে হেটে কখন সেই অভিশপ্ত বাড়ি থেকে রাস্তায় চলে এসেছে বুঝতেও পারেনি সে।রাস্তায় চারপাশ চোখ ঘুড়িয়ে দেখল।না চাইতেও চোখ বার-বার ঘোলা হয়ে আসছে।সে আবারও বড় করে শ্বাস টানল।মেয়ে দু'টো প্রশ্ন করল,

_“কী হয়ে আপু আপনার?সাহায্য লাগবে কোনো?আপনি কী অসুস্থ?”

অনুভা মেয়ে দু'টোর দিকে নিস্তেজ চোখে তাকাল।তারপর বলল,

_“আমাকে কিছু টাকা দেবেন?বাড়ি ফেরার মতো টাকা নেই।”

মেয়ে দু'টো কৌতূহলি চোখে অনুভাকে দেখল।সৌন্দর্যের কোনো কমতি নেই তার মধ্যে।গাঁয়ে দামী সুতির নীল শাড়ি, হাতে ও গলায় স্বর্নের অলংকার দেখেই বোঝা যাচ্ছে কোনো বড়লোক পরিবারের মেয়ে।সে এভাবে টাকা চাওয়ায় অবাকই হলো মেয়ে দুটো।মেয়ে দুটো স্টুডেন্ট।তাদের কাছেও তেমন টাকা নেই।একটা মেয়ে একশো টাকা বের করে দিয়ে বলল,

_“হবে এতে?নাকি আরও লাগবে।”

_“হয়ে যাবে,ধন্যবাদ।” অনুভা টাকা হাতে নিয়ে হাটা ধরল।তার শাড়ির আঁচল রাস্তায় ঠেকেছে।রাস্তায় থাকা অনেক মানুষই কৌতুহলী চোখে দেখল তাকে।

____

অনুভা চলে যেতেই এলেনা গিয়ে তায়ানকে জড়িয়ে ধরে।তায়ান সঙ্গে সঙ্গে এলেনার থেকে ছিটকে দুরে সরে যায়।তারপর সাবধান করে বলল,

_“হুটহাট এভাবে কাছে আসবি না।আমার এগুলো পছন্দ না।”

_“তাহলে ওই মেয়েটার সঙ্গে কেন রাত কাটিয়েছিস?”

_“তোকে এতো কৈফিয়ত দেব কেন আমি?আর তুই কেন এসেছিস এখানে?”

_“তুই বিয়ে করেছিস সেটা শুনেও আমি বসে থাকব?” এলেনা অবাক হয়ে বলল।

_“তোকে কে জানিয়েছে?” রিকো বলল।

_“তোদের উপর নজর রাখার জন্য লোক পাঠিয়েছিলাম। সে-ই জানিয়েছে।” এলেনা বাঁকা হেঁসে বলল।

রিকো বিরক্ত চোখে এলেনার থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়।তায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,

_“এসব করবে আমাকে একবার জানালেও পারতে।ভেবেছিলাম মেয়েটাকে অন্তত এসবে জড়াবে না।”

_“তুমি এতো দরদ দেখাচ্ছ কেন?” তায়ান গম্ভীর চোখে তাকিয়ে বলল।

_“স্বাভাবিক।অতীতের কোনো কিছুতে ওর হাত নেই!”

_“সেটা আমিও জানি।কিন্তু ও তাদেরই রক্ত।এটা ভুলে যেও না।”

_“এখন কী করবে?” রিকো বলল।

_“চলো দেখাই কী করি।”

__

_“কোথায় আরমান আহসানি?বের হয়ে আসুন।দেখুন আপনার কারণে আজ আমার কত বড় সর্বনাশ হয়ে গেল!কোথায় আপনি?” অনুভা আহসানি বাড়ির হলরুমে এসে দাঁড়িয়ে উন্মত্ত হয়ে ডাকতে লাগল।

আমীরা বেগম আর উর্মিলা বেগম রান্না ঘরে ছিলেন।তারা অনুভার চি*ৎকার শুনে বের হয়ে আসে।এসে অনুভাকে এমন বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে স্তব্ধ হয়ে যায় দুজনেই।অনুভা আবারও আরমান সাহেবের নাম ধরে ডাকে।আমীরা বেগম অনুভার দু বাহু ধরে বললেন,

_“কী হয়েছে তোর?এই অবস্থা কেন?তায়ান কোথায়?”

_“তোমার স্বামীকে ডাকো বড় আম্মু।আরমান আহসানি কে ডাকো।”

_“অনুভা!এটা কেমন আচরণ?বড় আব্বুর নাম ধরে ডাকছিস কেন?” আমীরা বেগম একটু রেগে গিয়ে বললেন।

উর্মিলা বেগম এগিয়ে এসে বললেন,

_“কী হয়েছে মা তোর?এমন ভাবে কেন এসেছিস?”

আরমান আহসানি এতক্ষণে নিচে আসলেন।অনুভাকে দেখতেই তার পা জোড়া থমকে যায়।বুকের ভেতর ধক করে ওঠে।অনুভা আরমান আহসানি কে দেখেই তার কাছে এগিয়ে যায়,

_“দেখুন বড় আব্বু,সে তার প্রতিশোধ নিয়েছে।আমাকে ধংস করে আপনার উপর প্রতিশোধ নিয়েছে।”

ধীরে ধীরে বাড়ির সকলে উপস্থিত হয়।আরশাদ আহসানি অনুভাকে এখানে দেখে অবাক হয়ে বললেন,

_“তুমি এখানে কী করছ?ওই ছেলে কোথায়?”

অনুভা কারও কথায় কোনো উত্তর দেয় না।সে আরমান আহসানির দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে আছে।আরমান সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন,

_“কী বলেছে ও তোমাকে?”

_“খু*নি আপনি! খু*ন করেছেন ওর বাবাকে! খু*ন করে ওর মা’কে বিয়ে করেছেন! আর আপনার সেই র’ক্তরঞ্জিত কীর্তির শাস্তি দিতে, সে আমাকে বিয়ে করেছে!”

নিজের ছেলেকে নিয়ে এমন কিছু শুনতেই আমীরা বেগম অজান্তেই দু’পা পিছিয়ে যায়।আরমান সাহেব চোখ বন্ধ করে ফেলেন।হলরুমেল বাতাস ভারি হয়ে যায়।উপস্থিত সবাই বিস্ফোরিত চোখে আরমান সাহেবকে দেখে।

বিজ্ঞাপন
রক্ত রেখার আড়ালে গল্পটি আয়েশা শেখ রিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে মোড়ানো থ্রিলার উপন্যাস