হৃদয়ের অগোচরে

পর্ব - ৯

🟢

ইফরাহার বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামল রায়েদ। ১ ঘন্টার রাস্তা আড়াই ঘন্টা লেগেছে শুধু মাত্র জ্যামের কারণে। ইফরাহ নিজের সিট বেল্ট খুলেছিল ততক্ষণে রায়েদ নিজের সিট থেকে নেমে গিয়ে ইফরাহার সাইটে গেল। ইফরাহার জন্য দড়জা খুলে দিয়ে ছাতা ধরে রইলো।

ইফরাহ তা দেখল কিন্তু কিছু বলল না। কারণ সে‌ খুব ভালো করেই জানে রায়েদ তার প্রতি যত্নশীল তাকে কিছু বলেও লাভ নেই।তাই ইফরাহ কিছু না বলে চুপচাপ গাড়ি থেকে নেমে পরে।রায়েদ তার মাথার উপর ছাতা ধরে। বৃষ্টি এখনো পড়ছে।রায়েদ এবং ইফরাহার মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণে দূরত্ব।রায়েদ ইফরাহ কে তার বাড়ির ছাউনি পর্যন্ত এগিয়ে দিল।

ইফরাহ ছাউনির নিচে যেতে রায়েদ বলল,,,,

--"তাহলে এখন আমি আসি?"

কথার ধরনে স্পষ্ট যে রায়েদ জানান দিচ্ছে না বরং অনুমতি চাচ্ছে।

ইফরাহ বলল,,,

--"ভিতরে এসে বসুন। এতটুকু আগিয়ে দিয়েছেন আমাকে তার জন্য ধন্যবাদ। বাসায় আসলে আমি এবং মা বাবা খুশি হবে।"

রায়েদ প্রথমে যেতে চায় নি কিন্তু তারপর ভাবলো এই সুযোগে ইফরাহার মা বাবার সাথে পরিচয় হয়ে যাবে তাহলে ইফরাহ কে পেতে সুবিধা হবে তাই আর দ্বিমত পোষণ করল না।

ইফরাহ কলিং বেল বাজালো। ইফরাহ মা এসে দরজা খুলে ইফরাহ কে ভিতরে ঢুকার সুযোগ না দিয়েই দরজার সামনে রাগ দেখিয়ে বলা শুরু করলো,,,,,,,

--"মন কোই থাকে তোর?ছাতা নিতে কি খুব কষ্ট লাগে?জানিস না তোকে নিয়ে তোর বাবার কত চিন্তা। আমার মাথা খেয়ে ফেলেছে।তুই কি বাচ্চা যে তোর ব্যাগে এখন ছাতা ভরে দিতে হবে। বিয়ের পর তো দেখা যাবে,,, নিজের বাচ্চা হলে বাচ্চার পায়ের মোজো স্বামীকে দিবি আবার স্বামীর পায়ের মোজা বাচ্চাকে দিবি।"

ইফরাহ তার মায়ের এমন আবল তাবল কথা শুনে তবদা খেয়ে গেল এবং লজ্জায় পড়ে গেল কারণ তার পিছনে তার বস ছিল।

ইফরাহ তার মাকে চোখের ইশারায় থামতে বলছে।

আর অন্যদিকে রায়েদ মিটমিট করে হাসছে।সে তো এতক্ষনে কল্পনা পর্যন্ত করে ফেলেছে যে তার এবং ইফরাহার বিয়ের পর যখন সে মোজা চাইবে তখন ইফরাহ তার মোজার বদলি তাদের সন্তানের পা মোজা দিবে। সন্তান ছেলে হলে তাও চলবে। যদি মেয়ে হয় তাহলে মেয়েদের পা মোজা দিবে। গোলাপি কালার এ ধরনের হবে অবশ্যই। এইসব ভেবে রায়েদ আনমনে হেসে উঠলো।

আয়েশা বেগম মেয়ের দিকে রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে জিজ্ঞেস করল,,,,,

--"কি ইশারয় বলছিস?আমি এইসব ইশরা টিশারা বুঝি না এখন চুপচাপ ঘরে চলে আয়।"

ইফরাহ দুঃখে লজ্জায় বলল,,,,

--"উফ্ মা,করে দিলা তো মান ইজ্জতের পাংচার করে দিলে।"

এইবলে ইফরাহ ঘরের দরজার সম্পূর্ণ খুলে ভেতরে প্রবেশ করল।রায়েদ হাসি মুখে ইফরাহার মাকে সালাম দিতে নিবে কিন্তু ইফরাহার মা কে দেখে হ হয়ে গেল।

আয়েশা বেগম রায়েদ কে দেখে অবাক হলেও পরে খুশি হয়ে গেল। গেটের সামনে থেকে ইফরাহ কে সড়িয়ে তারাতাড়ি রায়েদের কাছে গেল। এবং হাসি মুখে বলতে লাগলো,,,,,,

--"আরে বাবা তুমি এখানে?কত মাস পরে দেখেছি তোমাকে।তো কেমন আছো বাবা?"

রায়েদ প্রথমে অবাক হয়ে গেলেও এখন নিজেকে সামলে নিল সে হাসি মুখে সালাম দিয়ে তারপর বলল,,,,,

--"আলহামদুলিল্লাহ আন্টি আমি ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন? আপনি তো দেখছি এখনো সেই আগের মতই ফিট!"

আয়েশা বেগম হাসলো তারপর বললো,,,,,

--"আরে বাবা বাহিরে দাঁড়িয়ে আছো কেন ভেতরে আসো। তুমি তো দেখছি ভিজে গেছে।"

এই বলে রায়েদ কে ভিতরে আসার সুযোগ দিল। তারপর ইফরাহ দিকে রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,,,,

বিজ্ঞাপন

--"শুধুমাত্র তোর বয়স বাড়লো। কিন্তু বুদ্ধি ছোট বাচ্চাদের থেকেও কম। বেচারা কে কতক্ষণ ধরে বাহিরে দাঁড়া করিয়ে রেখেছিস।আদব কায়দা কি সব ভুলে গেছিস?"

ইফরাহ কে তার মা এত গুলো কথা শুনিয়ে তাকে প্রতিবাদ করার সুযোগ না দিয়ে রায়েদ কে নিয়ে ড্রয়িং রুমে চলে গেল।রায়েদ তো মনে মনে হাসছে ইফরাহার এমন কনফিউজড চেহারা দেখে।

অন্যদিকে ইফরাহ নিজে নিজে বলল,,,,,

--"যাহ্ বাবা!আমি আবার কি করলাম?নিজেই তো আমি কলিং বেল বাজাতে না বাজতেই দরজা খুলে আমাকে প্রথমে কতগুলো কথা শোনালে। এখন আবার আমাকে দোষারোপ করছে।আর মা উনাকে কি করে চিনে? উফ্ কিছুই মাথায় ঢুকছে না।আরো উনার সামনে আমার ইজ্জতের পাংচার হয়ে গেল। ধ্যাত ভালো লাগে না।"

ইফরাহ ভেতরে গেল দেখল তার মার সঙ্গে এখন তার বাবাও যোগ হয়েছে।কত সুন্দর রায়েদের সাথে কথা বলছে।আর রায়েদ ও তাই।কত সুন্দর হেসে হেসে কথা বলছে। ইফরাহার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে সব।সে আর বেশি কিছু না ভেবে নিজের রুমে চলে গেল চেঞ্জ করার জন্য।

অন্যদিকে রায়েদ মুচকি হেসে মনে মনে বলল,,,,

--"বাহ্ মেঘ না চাইতেই জল।এখন তো মনে হচ্ছে আরো সহজ হবে ইফরাহ কে নিজের করে পেতে।"

অন্যদিকে ইফরাহ ড্রেস চেঞ্জ করে মাথায় সুন্দরভাবে ঘোমটা দিয়ে যখন নিজের রুম থেকে বের হতে যাবে তখন থেমে গেল এবং মনে মনে বলল,,,,

--"আচ্ছা উনাকে মা কি করে চিনে?আর উনিও আমার মা কে কি করে চিনে? এইটা কি করে সম্ভব? উনারা যেভাবে কথা বলছে দেখে মনে হচ্ছে একে অপরকে খুব ভালোভাবে চিনে। তার মানে কি উনিই সেই ছেলে যার কথা একদিন মা বাড়িতে এসে বলে বলে আমার এবং বাবার কান পঁচিয়ে দিয়েছিল?"

ইফরাহ চলে গেল অতীতের স্মৃতিতে যখন তার মা এসে এক ছেলের গুনগান করেছিল।

অতীত______________

আজ থেকে প্রাই ৫ মাস আগে। তার আরো কিছু মাস আগেই রায়েদ দেশে ফিরে কোম্পানির হাল ধরেছে। মূলত এই কোম্পানি তার বাবার ছেলে। এই কোম্পানি ছাড়াও আরো অন্যান্য কোম্পানি আছে। কিন্তু রায়েদ ভালো করেই জানে ইফরাহার কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এর প্রতি আকর্ষণ তাই এই অফিসে ইফরাহার আসার চান্স বেশি। মূলত সেই কারণে সেই অফিসের CEO.

একদিন রায়েদ গাড়ি চালিয়ে বাড়ি আসছিল‌। হঠাৎ তার ফোনে কল আসাতে সে তার গাড়ি রোডের এক পাশে থামায়। এবং গাড়ি থেকে বের হয়ে বাড়ির সামনের দিকে ঢেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে ফোনে কথা বলতে থাকে।

ঠিক তখনই তার কানে কোনো মহিলার চিৎকারের আওয়াজ শোনা যায়।

--"চোর চোর! আমার ব্যাগ নিয়ে যাচ্ছে।"

এই বলে এক প্রাপ্ত বয়স্ক মহিলা এক যুবকের পিছনে দৌড়াচ্ছে।রায়েদ বিষয় টা খেয়াল করে। তৎক্ষণাৎ সে ফোন কেটে দিয়ে পকেটে ভরে দেয় এবং সেই চোরের দিকে দৌড় দেয়। এবং কিছুক্ষণের ভেতর চোর কে ধরে ফেলে। কারণ যে চুরি করেছে তার বয়স ১৩/১৪ হবে।

ছেলেটির হাত ধরেছে রায়েদ। ছেলেটি তো ভয়ে কাঁপছে। রাস্তা নিরিবিলি ছিল,তার উপরে দুপুর লোক নাই বললেই চলে। ছেলেটি ভাবছি এখনই বুঝি রায়েদ তাকে মারবে। কিন্তু ছেলেটি চিন্তা ভাবনাকে ভুল প্রমাণ করে রায়েদ শান্ত কন্ঠে বলল,,,

--"ব্যাগ টি তার আসল মালকিনের কাছে ফেরত দাও।"

ততক্ষণে আয়েশা বেগমও সেখানে চলে এসেছে।তিনি হাঁপাচ্ছেন। ছেলেটি সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগটা দিয়ে দিল।আয়েশা বেগম ব্যাগ নিয়ে দেখল সব ঠিকঠাকই আছে।

ছেলেটি রায়েদর সামনে হাত জোড় করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,,,,

--"ভাই আমারে মাফ কোইরা দেন।পেটের দায়ে চুরি হরছি।মা মোইরা গেছে,বাপ ফালাইয়া থুইয়া গেছে গা।ছোডু একটা বোইন আছে।বোনের আবার পড়া লেহা করার খুব শখ। ভিক্ষা কইরা যা পাইতাম তা দিয়ে আমাগোর খাওয়া হইতো না। পড়ালেখা কেমনে পড়াইতাম? তাই এই চুরির পথে নামছি।কালহা বোইনের ভর্তি। ট্যাহা পয়সা কিছু নাই। রাতের তে খাই না।বোইন থামলে আশায় বইয়া রোইছে। এইবারের মতো মাফ করিয়া দেন। আর জিবনে চুরি করুম না।আমার মরা মায়ের কসম।"

আয়েশা বেগমের চোখ পানি চলে এলো। আসলেই দুনিয়া ঘুরে দেখলে বোঝা যায় মানুষের দুঃখের শেষ নেই। এবং অন্যদের দুঃখ দেখলে নিজেদের দুঃখকে দুঃখ মনে হয় না। তাইতো মানুষ সব সময় বলে,,,--"নিজের থেকে যারা উপরে তাদেরকে নয় বরং নিজের থেকে যারা নিচে আছে তাদেরকে দেখতে হয়। তাহলে আর কোন কষ্ট দুঃখ থাকে না।"

রায়েদ ছেলেটার সামনে হাটু গেড়ে রাস্তায় বসলো। তারপর ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,,,,,

--"আমি বুঝতে পারছি যে তুমি পরিস্থিতি চাপে পড়ে এই অসৎ কাজে এসেছ। কিন্তু আজকে যদি আমার জায়গায় অন্য কেউ তোমাকে ধরতো এতক্ষণে তোমার কথা না শুনে তোমাকে মারতো তখন তোমার ছোট বোনের কি হতো? দুনিয়া বড় কঠিন এবং খারাপ। তুমি এবং তোমার ছোট বোন এই দুনিয়ার জন্য একেবারেই নিষ্পাপ। এই খারাপ দুনিয়া তোমাদের মত নিষ্পাপ মানুষের যোগ্য না।তাই হোক আজ থেকে তোমার এবং তোমার বোনের দায়িত্ব আমার। শুধু তোমার বোনকে নয় বরং তোমাকেও পড়ালেখা করাবো। আমার একটি আশ্রয় কেন্দ্র আছে যেখানে তোমাদের মত শিশুদেরকে পড়াশোনা করানো হয়। এবং স্বনির্ভরশীল তৈরি করা হয়। যাতে এই দুনিয়া এবং এই দুনিয়ার মানুষের উপর তোমাদেরকে নির্ভরশীল হতে না হয়।"

আয়েশা বেগম অবাক দৃষ্টিতে রায়েদের দিকে তাকিয়ে ছিল।তিনি মনে মনে বলল,,,,

--"এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে এমন মানুষ পাওয়া বিরল। আসলেই কোন মানুষকে সাহায্য করতে হলে মন বড় রাখতে হয়। আর এই ছেলেটির মন অনেক বড়ো। কত সুন্দর এই বাচ্চাটার কথা বিশ্বাস করল। একবারের জন্য মাথায় এই চিন্ত না যে এই বাচ্চাটি বাঁচার জন্য মিথ্যা বলতে পারে। ইশ্ এমন ছেলেই তো চাই আমি আমার ইফরাহার জন্যে।"

বিজ্ঞাপন
হৃদয়ের অগোচরে গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও থ্রিলারভিত্তিক গল্প