ইফরাহ রায়েদের সামনাসামনি সোফায় বসে আছে। রায়েদ ইফরাহার মা এবং বাবার সাথে কথা বলছে।তখনি ইফরাহার মা বলে উঠলো,,,,,,
--"ইফরাহ তোকে একদিন এসে এক ছেলের কথা বলেছিলাম না।এই সেই ছেলে।"
ইফরাহ একবার রায়েদ দিকে তাকিয়ে দেখল রায়েদ তার দিকেই তাকিয়ে আছে।সে সাথে সাথে দৃষ্টি নামিয়ে ফেললো। তারপর মনে করতে লাগলো তার মা সেদিন বাড়িতে ফিরে কি বলেছে।
সেইদিনের ঘটনা _________________
ইফরাহ নিজের রুমে শুয়ে শুয়ে বই পড়ছিল। তখনি তার মা বাড়িতে এসে চিল্লাচিল্লি করে নিজের স্বামী কে এবং নিজের মেয়েকে ঢাকতে লাগলো।
--"কি গো কোই তোমরা। শুনে যাও কি হয়েছে।"
ইফরাহ এবং তার বাবা নিজ নিজ রুম থেকে বের হয়ে এলো।
ইফরাহ তার মাকে জিজ্ঞেস করল,,,,
--"কি হয়েছে?"
ইফরাহার বাবা বলল,,,,
--"কি হয়েছে এটা কি? এভাবে ষাঁড়ের মতো চেচাচ্ছ কেন?"
আয়েশা বেগম রেগে গেলেন এবং নিজের স্বামীর দিকে চোখ রাঙিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,,,,
--"এত বড় সাহস তুমি আমাকে ষাঁড় বললে?"
জহিরুল হক শুকনো ঢোক গিলে বললেন,,,
--"না মানে,,,যাই হোক মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। তুমি বলো তো কি জন্য ডাকছিলে।"
আয়েশা বেগম আপাতত রাগ কমিয়ে আসল কথায় আসলেন।তিনি নিজের মেয়ে এবং নিজের স্বামী কে সম্পূর্ণ ঘটনা খুলে বললেন। এবং আরো বলেন,,,,,,
--"জানো ছেলেটি সেই ছোট ছেলেটিকে নিজের ছোট বোনকে নিয়ে আসতে বলে আমাকে একদম বাড়ির মোর পর্যন্ত ড্রপ করে দিয়েছে। কারণ সেখানে আমি কোনো গাড়ি পেতাম না। এবং অনেক সুন্দর ব্যবহার কি যে বলব।আর দেখতেও মা শা আল্লাহ একদম হিরো। ব্যবহারে এবং আদব কায়দায় বোঝা যাচ্ছে ভদ্র ঘরের সন্তান।আমি জোর করলাম বাড়িতে আসতে কিন্তু আসলো না বলল সেই ছেলেটির এবং ছেলেটির বলে থাকার ব্যবস্থা করে তারপর অফিসে যেতে হবে।"
ইফরাহ এবং তার বাবা এতক্ষণ কথা গুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। তারপর দুজনেই একসাথে বলল,,,,,
--"আসলে এখন এমন মানুষ পাওয়া বিরল।"
তারপর জহিরুল হক জিজ্ঞেস করল,,,,,
"আচ্ছা ছেলেটি নাম কি?"
ইফরাহ উৎসাহ নিয়ে বসেছিল সেই মহান ব্যক্তিটির নাম শোনার জন্য। কিন্তু আমেনা বেগম নিজের জিব্বায় কামড় দিয়ে বললেন,,,,
--"এইরে সর্বনাশ। কথায় কথায় ছেলেটির নাম জানতে ভুলে গিয়েছিলাম। আর না ছেলেটির ঠিকানা। নয়তো ছেলেটিকে ইফরাহার জন্য খুব পছন্দ হয়েছে। অনেক সুন্দর মানাতো।আর ছেলেটাও তো কত ভালো।"
এই শুনে ইফরাহার মাথা গরম হয়ে গেল।সে রেগে গিয়ে বলল,,,,
--"উফ্ মা। তোমার আর অভ্যাস পরিবর্তন হলো না। একদম যাকে তাকে আমার সাথে বিয়ে দেওয়ার কথা চিন্তা করবে। এত তারা কেন আমাকে ঘাড় থেকে নামানোর জন্য। আমি পড়াশোনা শেষ করব চাকরি করব তারপর বিয়ে।"
এইসব বলে ইফরাহ থামে তারপর তার বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,,,,,,
--"দেখো না বাবা মা খালি বিয়ে বিয়ে করে। তুমি কিছু বলো তো। আমার আর এইসব ভালো লাগে না।"
এই বলে ইফরাহ নিজের রুমের দিকে চলে গেল।
জহিরুল হক নিজের স্ত্রী কে বললেন,,,,
--"তুমি একটু বুঝে শুনে কথা বলতে পারো না? জানোই তো মেয়েটি বিয়ের কথা শুনে রেগে যায়। সেই ছেলেকে তোমার পছন্দ হয়েছে ভালো কথা, আমাকে একা বললেই পারতা। মেয়ের সামনে বলার কি প্রয়োজন ছিল। দেখলে তো এখন মেয়ে রেগে গেছে। আর সেই ছেলেটি যদি আমাদের মেয়ের জন্য সঠিক হয় তাহলে আল্লাহ একদিন না একদিন সেই ছেলেকে তোমার সামনে আনবে। তারপর না হয় তাদের বিয়ের কথা ভেবো। এখন আর এসব ভেবে বেশি মাথা খারাপ করোনা।"
আয়েশা বেগম সায় জানালো স্বামীর কথায়।
ইফরাহ নিজের রুমে এসে শব্দ করে দরজা লাগিয়ে দিল। তারপর বিছানায় উল্টো হয়ে শুয়ে পড়লো।তার ভালো লাগছে না। কেন জানি তার বিয়ের কথা শুনলে ভীষণ ভয় করে। অন্য কোন পুরুষ তার জীবনে আসবে এই কথা ভাবতেই সবার আগে তার চোখে রায়েদের চেহারা ভেসে ওঠে।
আজ ৮ বছর হতো চললো তার রায়েদের সাথে কোনো যোগাযোগ নেই।সে জানেও না রায়েদ কোথায়। এমন কোন দিন যায়নি এই আট বছরে যে সে রায়েদের কথা একবারও মনে করেনি।এই আট বছরে রায়েদের অনুপস্থিতি তাকে অনেক পুড়িয়েছে। কিন্তু এর পিছনের কারণ তার অজানা। অথবা সে নিজেকে জানতে দিতে চাচ্ছে না। কারণ সে এসবের ভেতর জড়াতে যায়গা। ইফরাহ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো। তার চোখের কোনে পানি জমে গেল। এরকম আরো অনেক হয়েছে যখন সে রায়েদের কথা ভাবতো তখন তার অনুপস্থিতির কারণে ইফরাহার চোখের পানি চলে আসতো। তখন রায়েদের সেই দাদিমা মার্কা ছবি বের করে দেখতো আর ইফরাহার মন ভালো হয়ে যেত।
বর্তমান ___________
রায়েদ সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। এতক্ষণ এখানে কি কথা বার্তা চলছিল তার সম্পর্কে ইফরাহ অজানা। কারণ সে অতীতের ভাবনায় ডুবে গিয়েছিল।
সে দেখলো রায়েদ তার মা বাবার সাথে কুশল বিনিময় করছে।সে বুঝতে পারল রায়েদ এখন চলে যাবে। মোটামুটি রাত হয়েছে। প্রায় ৯:০০ টা বাজে। বৃষ্টিও কমে গেছে।
আয়েশা বেগম তার মেয়েকে বলল,,,,
--"কিরে? এখনো এইখানে এভাবে বসে না থেকে রায়েদ বাবাকে একটু এগিয়ে দিয়ে আয়।"
ইফরাহ আর কিছু বলল না সে নিজের জায়গা থেকে উঠে দাঁড়ালো। এবং একবার রায়েদের দিকে তাকিয়ে তারপর সামনের দিকে হাঁটতে লাগলো। এবং রায়েদ তার পিছনে পিছনে যেতে লাগলো।
অন্যদিকে আয়েশা বেগম তার স্বামী কে উদ্দেশ্য করে বলল,,,,
--"মনে আছে তুমি বলেছিলে যে যদি এই ছেলেটি ইফরাহার জন্য সঠিক হয়ে থাকে তাহলে একদিন ঠিকই আমাদের সামনে আসবে। আর দেখেছো আজ ঠিক আমাদের সামনে এসেছে।"
জহিরুল হকের মুখে এক চিলতে হাসি।সে বলল,,,,
--"তা ঠিক। কিন্তু আমাদের মেয়ের কথা যেমন তেমন, আগে তো জানতে হবে যে রায়েদের পছন্দের কেউ আছে কিনা। কারণ ওরোও তো নিজের একটি জীবন আছে। পছন্দের কেউ থাকতে পারে। কিন্তু যদি কেউ না থাকে এবং সে রাজি থাকে, তাহলে এই বিষয় নিয়ে আরো ভাববো আমরা।"
আয়েশা বেগমের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
রায়েদ নিজের গাড়িতে উঠার আগে একবার ইফরাহার দিকে তাকালো।দেখল সে বাড়ির সামনের ছাউনিতে দাঁড়িয়ে আছে। রায়েদ মুচকি হেসে বিদায় জানালো।
ইফরাহ না চাইতেও মুচকি হাসি উপহার দিল। এবং যতক্ষণ না রায়েদ গাড়ির ভেতর ঢুকে গাড়ি চালিয়ে নিজের চোখের আড়াল না হয় ততক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে রইল।
_____________
ইফরাহ নিজের রুমে চলে আসলো।সে নিজেকে প্রশ্ন করতে লাগলো।,,,,,,
--"৮ বছর তো কম না। তাহলে এই আট বছরে আমি যেন আপনার কথা ভুলতে পারলাম না। আপনার কথা না হয় মানলাম যে আপনি কোনো এক সময় আমাকে ভালবাসতেন তাই আমাকে হয়তো ভুলতে পারেননি। কিন্তু আমি তো নিজেই আপনার প্রপোজাল রিজেক্ট করেছিলাম,তারপরও আমি কেন আপনাকে ভুলতে পারছি না। এই আট বছরে কেন বারবার আপনি মনে পড়তেন। কেন কোনো সমস্যায় পড়লে সব সময় আপনার কথা মনে পড়তো। আমি তো এইসব ভালবাসায় জড়াতে চাইতাম না। এবং সেই কারণে আপনাকে আমি প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। আমার যে নিজের পরিবারের প্রতি দায়িত্ব আছে। সেই দায়িত্ব হতে আমি পিছপা হতে পারব না।"
এইসব বলে ইফরাহ নিজের মুখ দুহাত দ্বারা ঢেকে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। সে নিজের মতামত নিজের অনুভূতি সম্পর্কে অজানা। অথবা জেনেও জানতে চাচ্ছে না। কিন্তু এটা নিয়ে ভাবাও বন্ধ করছেনা।