রায়েদ ঢাকা গ্রীন লাইন রাজারবাগ কাউন্টার এসে নিজের গাড়ি থামল।রাজশাহী থেকে রাঙ্গামাটি গাড়ি চালিয়ে যাওয়া যাবে না।রাজশাহী থেকে সরাসরি রাঙ্গামাটির কোনো পরিবহন ব্যবস্থা নেই, তাই প্রথমে ঢাকা যেতে হবে এবং তারপর সেখান থেকে রাঙ্গামাটির বাসে উঠতে হবে। তাই রায়েদ গাড়ি চালিয়ে ঢাকা আসলো। কিন্তু এখন পস্তাতে হচ্ছে তাকে।
মনে মনে বলল,,,
--"ট্রেন দিয়ে আসলেই পারতাম।৬ টায় পর রওনা দিলাম আর ঢাকা পৌঁছেতে পৌঁছাতেই প্রায় ৬ ঘন্টা লেগে গেল। ভাগ্যিস ট্র্যাফিক জ্যাম ছিল না। তাহলে ঢাকা পৌঁছাতে কত সময় লাগতো তা জানিনা কিন্তু আমার নিশ্চিত বারোটা বাজতো গাড়ি চালাতে চালাতে। ভেবেছিলাম গাড়ি চালিয়ে রাজশাহী থেকে ঢাকা আসলে আমার Little Rosebud এর সাথে সময় কাটাতে পারব। কিন্তু পিচ্চি মানুষ নিয়ে ঘুরলে যা হয় আরকি। একদম বাচ্চাদের মত গাড়িতে ঘুমিয়ে গেছে। না নিজে কিছু খেয়েছে আর না আমি কিছু খেয়েছি। ক্ষুধায় পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে আমার।"
রায়েদ নিজের হাতের ঘড়ি তে সময় দেখলো,১ টা ৩০ বাজে। সকালের খাওয়া তো হলোই না এখন আবার দুপুরের খাওয়ার সময় হয়ে গেল। অবশ্য তাদের বাস ছাড়তে এখনো অনেক দেরি।রায়েদ আগে থেকেই বাসের টিকিট বুক করে রেখেছিল। রাত ১০টায় বাস ছাড়বে।
রায়েদ ইফরাহার দিকে তাকালো।দেখলো তার Little Rosebud গভির ঘুমে আচ্ছন্ন।রায়েদ মুচকি হাসলো। তারপর আস্তে আস্তে ডাক দিল,,,,
--"এইযে মেম সাহেব এখন দয়া করে নিজের চোখ খুলে আমাকে উদ্ধার করুন।"
ইফরাহ একটু নড়ে চড়ে উঠলো কিন্তু এখনো ঘুমে আচ্ছন্ন সে।রায়েদ আর উপায় না পেয়ে গাড়িতে পানির বোতল ছিল সেই বোতল থেকে অল্প একটু পানি হাতে ঢেলে তারপর ইফরাহার মুখের ওপর হালকা হালকা করে ছিটিয়ে দিল।
ইফরাহ আতকে জেগে উঠলো।চোখ বন্ধ করে চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে বলতে লাগলো,,,,,
--"আব্বু আম্মু কই তোমরা বাড়ির ছাদ ভেঙ্গে গেছে বৃষ্টি পড়ছে আমার মুখে তাড়াতাড়ি আসো। নয়তো বাড়ি বর্নায় ভেসে যাবে তাড়াতাড়ি আসো। আমি ভিজে যাবো, তাড়াতাড়ি আসো তোমরা।"
ইফরাহ একনাগাড়ে কথা গুলো বলতে লাগলো।তার চোখ বন্ধ ছিল। কিন্তু কারোর হাসির শব্দ শুনে সে নিজের চোখ খুলল।দেখলো সে এখন বাড়িতে না বরং গাড়িতে। তার মানে সে এতক্ষণ ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করছিল এবং যা শুনে রায়েদ পাগলের মতো হেসে যাচ্ছে। বেচারার তো হাসি থামছেই না।
আর ইফরাহ সে তো লজ্জায় মরে যাচ্ছে।এই লোকটির সামনে তাকে বার বার লজ্জায় পড়তে হয়।
রায়েদ হাসতে হাসতে অনেক কষ্টে বলল,,,,
--"আমি যদি জানতাম তুমি এমন কথা বলবে তাহলে ভিডিও করে রাখতাম। ইশ্ কি সুযোগ টাই না মিস করেছি।"
এই বলে রায়েদ আবার হাসতে লাগলো।তার হাসি তো কমছেই না।গাড়ি কে কিনা এই মেয়ে বাড়ি বানিয়ে দিল। আবার বলছে বাড়ির ছাদ ভেঙ্গে গেছে বৃষ্টি পড়ে নাকি বাড়িতে বন্যা হয়ে যাবে। মানে কথায় কোনো লজিক নেই। ঘুমে মানুষ আবোলতাবোল বলে, কিন্তু লজিক ছাড়া আবোল তাবোলও যে কেউ বলতে পারে তা রায়েদের জানা ছিল না।
ইফরাহ লজ্জা থেকে বাঁচার জন্য বলল,,,
--"হয়েছে এখন কি এরকম আক্করার মতো হাসবেন নাকি কিছু খাবেন? আমার যে ভিশন খিদে পেয়েছে।"
রায়েদের হাসি সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। তার Little Rosebud ক্ষুধার্ত এখন কি তার হাসলে চলবে।সে তড়িঘড়ি করে বলল,,,,
--" সামনে একটি হোটেল আছে। ওখানে ভিআইপি সাইট বুক করা আছে।সো সেখানে গিয়ে আমরা খাব।আর তুমি তো খাবার নিয়ে এসেছিলে না।এখন সেগুলোই খাব। অবশ্য তুমি তো পেত্নী হয়তো সেগুলো খাবার খাওয়ার পরও তোমার খিদে মিটবে না তখন হয়তো দেখা যাবে আমাকে আবার খাবার অর্ডার দিতে হবে।"
শেষের কথাগুলো রায়েদ অবশ্য আস্তে বলল কিন্তু ইফরাহার কান পর্যন্ত চলে গেল।সে রাগি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,,,,,
--" কিহ!!! কি বললেন আপনি? আবার বলেন তো। এবং হ্যাঁ জোরে বলবেন।"
রায়েদ শুকনো ঢোক গিলে।তার পর মনে পরে সে তো এখন ইফরাহার বস।তো এখানে ভয় পাবার কিছু নেই। বিয়ের পর না হয় ভয় পাবে।তাই আপাতত অফিসিয়াল ভঙ্গি বজায় রাখলে সে বেঁচে যাবে।
তাই সে অফিসিয়াল ভঙ্গিতে বলল,,,,
--"মিস ইফরাহ আমার ক্ষুধা পেয়েছে। আপাতত আপনার সাথে আমার ঝগড়া করার ইচ্ছা নেই।তাই আপনি গাড়ি থেকে নামুন।"
এই বলে রায়েদ নিজেই গাড়ি থেকে হড়হড় করে বের হয়ে গেল। গাড়ির বাইরে এসে সে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো। এখন সে তার জান ফেরত পেল।
আর অন্যদিকে ইফরাহ এখনো থ মেরে বসে আছে।তার ঠোঁটে হঠাৎ বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো। সে শয়তানি হাসি দিয়ে বলল,,,,
--"আপনাকে তো আমি বিয়ের পর মজা দেখাব।তখন বুঝবেন বস গিড়ি করার মজা। আসছে ইফরাহ কে কথা শুনাতে।"
ইফরাহ এইসব ভেবে মুচকি হাসলো।যেই না গাড়ির দরজা খুলে বের হতে যাবে তার আগেই রায়েদ এসে তার গাড়ির দরজা খুলে দিল সব সময়ের মতো। ইফরাহ কিছু না বলে চুপচাপ গাড়ি থেকে বের হল। সে তার চেহারার ভঙ্গিমা স্বাভাবিক রাখলো।
রায়েদ হাত দিয়ে ইশারা করল আগে আগে হাঁটতে। ইফরাহ তার আগে আগে হাঁটতে লাগলো আর রায়েদ তার পিছনে পিছনে।
দুজনে মিলে কাঙ্খিত হোটেলে গিয়ে উঠল। ইফরাহার জন্য রায়েদ হোটেলে ঢোকার গেইট খুলে দিল। ইফরাহ ভেতরে প্রবেশ করল।সেখানে অনেকেই চেয়ার টেবিলে খাবার খাচ্ছে। আবার অনেকেই ভিআইপি রুমে খাচ্ছে।রায়েদ ইফরাহ কে নিয়ে ভিআইপি রুমে যায়।
রুমটিতে এসে আছে খাবার খাওয়ার জন্য আরামদায়ক টেবিল , এবং বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বড় সোফা। পাশেই ওয়াশ রুম ।রায়েদ ইফরাহ কে সোফা তে বসতে বলল। ইফরাহ বসতেই সে ওয়াশ রুমে চলে গেল। যাওয়ার আগে নিজের চশমা সোফার পাশে থাকা একটি ছোট কেবিনেট এর উপর রেখে গেল। ইফরাহর নজর সেই চশমার উপর।সে মুচকি হেসে চশমা নিজের হাতে নিল। তারপর খুব যত্ন সহকারে নিজের পরনের ওড়না দিয়ে চশমার গ্লাস মুছে দিল। সুন্দর করে চশমার গ্লাস মোছার পর আবার আগের জায়গায় রেখে দিল
কিছুক্ষণ পর হাত মুখ ধুয়ে ফিরে এলো।চুল দিয়ে টপটপ পানি পরছে। মুখে পানি দেবায় কারণে চুল অনেকটা ভিজে গেছে পানি লাগার কারণে।পানির ফোঁটা বিন্দু বিন্দু করে গড়িয়ে পরছে।
ইফরাহ রায়েদ কে ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করে আনমনে বলল,,,
--"চশমা ছাড়াও খুব একটা মন্দ লাগে না। বরং আরো অদ্ভুত সুন্দর লাগে যা প্রকাশ করার মতোন না।মা শা আল্লাহ্।"
রায়েদের দৃষ্টি ইফরাহার দিকে যেতেই সে দেখল ইফরাহ তার দিকে তাকিয়ে কি যেন বিড়বিড় করছে। রায়েদ শ্বাস ছেড়ে মনে মনে বলল,,,,
--" নিশ্চিত আমাকে নিয়ে কিছু বাজে বলছো অথবা আমাকে বকছো। এছাড়া আর কাজ কি তোমার। আচ্ছা আমি কি এতটাই দেখতে খারাপ? আমাকে নিয়ে কি অন্যভাবে ভাবা যায় না? আমি কি এতটাই ভালোবাসার অযোগ্য?"
কিন্তু রায়েদের প্রশ্ন মনেই রয়ে গেল এবং যার উত্তর সে পেল না।না আজ পেল আর না গত ৮ বছরে।সে জানে না সে ভবিষ্যতেও এই প্রশ্ন করতে পারবে কিনা।সেই যায়গায় উত্তর পাওয়া বিলাসীতা।
নিজের চিন্তা ভাবনা দূর করে ইফরাহার উদ্দেশ্যে বলল,,,
--" ফ্রেশ হয়ে আসুন।ভালো লাগবে।"
ইফরাহ বিন বাক্যে নিজের ফোন সোফার উপর রেখে ওয়াশরুমে চলে গেল। রায়েদ সোফার আরাম করে বসল।সে বড্ড ক্লান্ত।একেই তো সকাল থেকে ড্রাইভ করে আসছে তার উপর আবার না খাওয়া।ভিশন খিদে পেয়েছে তার।সে বসে বসে ইফরাহার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।
ইফরাহ কিছুক্ষণ পর বের হয়ে এলো।তার হাতে হিজাবের কিছু পিন এবং ইনার ক্যাপ।সে শুধু হিজাব খুলে তারপর মাথা থেকে ইনার ক্যাপ খুলে ফেলেছে। কারণ ইনার ক্যাপ অনেকক্ষণ পরে থাকলে মাথা ব্যথা করে। তারপর আবার হিজাব দিয়ে সুন্দর ভাবে মাথা ঢেকে রেখেছে।যেন তার চুল দেখা যায় না।যাওয়ার আগ দিয়ে আবার হিজাব বেঁধে নিবে।
রায়েদ এক দৃষ্টিতে তার Little Rosebud এর দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে পাপড়ি তে পানি জমে আছে। গোলাপি ঠোঁটে পানির ফোঁটা।রায়েদ ইফরাহার ঠোঁটের দিকে তাকাতেই তার গলা শুকিয়ে গেল।রায়েদ সাথে সাথে নিজেকে সংযত করল। এভাবে ইফরাহ কে দেখা তার জন্য জায়েয না।নন মহরম সে ইফরাহার জন্য। শুধু শুধু ইফরাহার দিকে এভাবে তাকিয়ে নিজের পবিত্র ভালোবাসা কে সে অপবিত্র করতে চায় না। তাই আর দ্বিতীয়বার ইফরাহার দিকে চোখ তুলে তাকালো না। কারণ সে নিজে জানে এখন যদি সে ইফরাহার দিকে তাকায় তাহলে সবার আগে তার দৃষ্টি পড়বে ইফরাহার গোলাপি ঠোঁটে। বিয়ের পর তো অনেক সময় থাকবে মন ভরে দেখার। এখন না হয় নিজের সাথে নিজে লড়াই করে গেল
এই পৃথিবীতে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে চলতে কেউই সাধু থাকতে পারে না। জেনে না জেনে অনেক গুনাহ করে ফেলে। কিন্তু নিজের গুনাহ বুঝতে পারার পর সেখান থেকে নিজেকে সংযত করা আসল।
"নফসে আম্মারা"এটি হলো সেই নফস যা মন্দ কাজের নির্দেশ দেয় এবং মানুষকে কুপ্রবৃত্তির দিকে ধাবিত করে। যার ফলে মানুষ মন্দ কাজে আগ্রহী হয়। ঠিক যেমন একটু আগে তার দৃষ্টি বার বার ইফরাহার গোলাপি ঠোঁটের দিকে যাচ্ছিল।
"নফসে লাওয়ামাহ" এটি আত্ম-ভৎর্সনাকারী আত্মা, যা ভালো কাজ করার পর আনন্দিত হয় এবং মন্দ কাজ করলে অনুতপ্ত হয়। ঠিক যেমন রায়েদ ইফরাহার ঠোঁটের দিকে তাকানোর পর অনুতপ্ত হলো।যত যাই হোক দিন শেষে সেও একজন পুরুষ।তার মনে তখন অন্য রকমের অনুভুতি নাড়া দিয়েছিল। ।যা থেকে সে নিজেকে সরিয়ে এনেছে।
জিহাদে আকবর" বা সবচেয়ে বড় জিহাদ হলো মানুষের ভেতরের নফস বা কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম। এবং রায়েদ অনেকটা তাই করেছে।
সে নিরবতা ভেঙ্গে বললো,,,
--"খেতে বসো।"
এই বলে ইফরাহর বসার জন্য চেয়ার টেনে দিল। ইফরাহ বসতেই সে নিজের সিটে এসে বসল।
ইফরাহার খুব ভালো লাগে রায়েদের এমন ছোট ছোট কেয়ারে। পুরুষ নিজের ভালবাসার মানুষের জন্য গাড়ি দরজা খুলবে, কোনো হোটেলে বা রেস্টুরেন্টে গেলে আগে দরজা খুলে দিয়ে তাকে ঢুকতে দেবে, চেয়ার টেনে দিয়ে তাকে বসতে দিবে। এগুলো আসলে bare minimum' এর অর্থ সর্বনিম্ন পরিমাণ।যা একজন পুরুষ করা উচিত।আর এইসব কাজ তারাই করে যারা স-পুরুষ।
এক ওয়েটার এসে বাড়ি থেকে আনা খাবার সুন্দরভাবে প্লেটের সাজিয়ে দিয়ে গেল।রায়েদ আসার সময় সেই ওয়েটার কে খাবারের বক্স দিয়ে বলে এসেছিল যাতে এই খাবারগুলো সুন্দরভাবে প্লেটিং করে দেয়। এবং সাথে ঠান্ডা পানি ও মোজো।
ইফরাহ খুব আরাম সহকারে খাবার খাচ্ছে।রায়েদ কয়েকবার তার দিকে তাকিলো। তারপর মুচকি হেসে মনে মনে বলল,,,,
--"তুমি যাতে আরামে খেতে পারো তাই তো এই ভিআইপি রুম বুক করলাম। বাইরে খেলে তুমি কখনো হিজাব খুলে এত ফ্রেশ ভাবে খেতে পারতে না। এবং তোমার সুবিধা অসুবিধা বোঝা আমার জন্য যে ফরজ Little Rosebud . "
আর ইফরাহ খেতে খেতে মনে মনে বলল,,,,
--" আসলেই আমি অনেক ভাগ্যবতী যে আপনার মতোন একজন আক্করা আমার জীবনে আছে। যে আমার সকল সুবিধা অসুবিধা প্রয়োজনের দিকে খেয়াল রাখে। এমন মানুষ যে খুঁজে পাওয়া খুবই বিরল। ইন শা আল্লাহ কথা দিলাম খুব শীঘ্রই আপনার কাছে ধরা দিব। সম্পূর্ন ভাবে আপনার হয়ে যাব। আপনাকে নিজের মনে জমিয়ে রাখা ভালোবাসা প্রকাশ করব। আপনার ভালোবাসা যে একতরফা না।"
ইফরাহ থামল এবং খাবার খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে দিকে ভালোবাসাময় দৃষ্টিতে তাকালো