হৃদয়ের অগোচরে

পর্ব - ১২

🟢

একটার পর একটা জিনিস ভেঙ্গে ফেলছে ঈতিশা।তার সব জিদ ঘরের জিনিসপত্র ভাংচুর করে মেটাচ্ছে।সে কখনোই ভাবতে পারেনি রায়েদ তাকে প্রত্যাখ্যান করবে।তার রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে। ইচ্ছে করছে সব কিছু তছমছ করে দিতে।

এইতো কিছুক্ষণ আগেই তা মা এসে তাকে বলল যে রায়েদ এবং তার পরিবার এই বিয়েতে রাজি না।

এই কথা শুনেই না শুনতেই সে চিৎকার করে উঠল,,,,,

--"না আমি মানব না।রায়েদ শুধু আমার।আমি যেভাবে হোক রায়েদ কে নিজের করে ছাড়ব। ছোটবেলার ভালোবাসা এত সহজে ছাড়ব না আমি। যতদূর যেতে হবে আযি যাব কিন্তু রায়েদ কে নিজের করেই ছাড়ব।"

এই বলে ঈশিতা একটি কাঁচের গ্লাস ডেসিন টেবিলের আয়নায় ছুড়ে মারে। সাথে সাথে আয়নার কাঁচ ভেঙ্গে গুড়িয়ে পরে। সেই ভাঙ্গা আয়নায় ঈশিতা নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেল।তার মুখে এক সয়তানি হাসি ফুটে উঠলো।সে ভাঙ্গা আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে পাগলের মতো হাসতে লাগলো।

_____________

সকাল থেকে ঝুমঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টি কমার কোনো নাম গন্ধ নেই। ইফরাহ অনেক কষ্টে অফিস পৌঁছালো।সে তো ভেবেছিল আজ দেড়ি হয়ে যাবে কিন্তু না সময়ের আগেই এসেছে।

ইফরাহ নিজের মতো কাজ করছে। তারপর তার ফোনে সেট করে রাখা এলাম বেজে উঠল। মানে রায়েদ কে কফি দেওয়ার সময় এসে গেছে। ইফরাহ চলে গেল কফি বানাতে।

সে নিজের মতো করে কফি বানাচ্ছে আর ভাবছে কত তাড়াতাড়ি দিন চলে যায়। কিন্তু সে ৮ বছর আগের স্মৃতি এখনো ভুলতেই পারেনা।তার এখনো মনে তার যখন স্কুল শেষ হতো তখন রায়েদ কে‌ সবসময় তার স্কুলের বাইরে অপেক্ষা করতে দেখতো। এমনকি তার এসএসসি পরীক্ষার সময় তো রায়েদ তার সিট খুঁজে বের করে দিয়েছিল।তার কলেজে ভর্তি হওয়ার সময়ও সমস্ত ফর্মালিটি পূরণ করতে তাকে সাহায্য করেছিল। আসলে তখন তার মা,বাবা দুজনই তাদের প্রশিক্ষণের জন্য এলাকার বাইরে ছিল।তার সাথে তার নানু এসে থেকে ছিল। কিন্তু তার নানু বয়স্ক লোক তিনি তো আর এত কিছু বুঝে না তাই ইফরাহ নিরুপায় হয়ে একা একা গিয়েছিল কিন্তু রায়েদ তাকে অনেক সাহায্য করেছিল।যা সে এখনো ভুলেনি।

রায়েদের কথা ভাবতেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।সে মনে মনে বলল,,,,,

--"একটি মানুষ এতটা পারফেক্ট হতে পারে তা মি. আক্করা কে না দেখলে জানতেই পারতাম না। আসলে উনি ওয়ানলি ওয়ান।"

ইফরাহ এইসব ভেবে কফি বানিয়ে রায়েদের কেবিনের সামনে গেল। এবং অনুমতি পেয়ে কেবিনের ভেতর ঢুকে গেল।

রায়েদ ল্যাপটপে কাজ করছিল। ইফরাহ কফি টেবিলের উপর রাখলো।সে আশা করছিল রায়েদ তার দিকে একবার তাকাবে। কিন্তু রায়েদ তার দিকে একবারও তাকালো না। এতে ইফরাহ না চাইতেও মনক্ষুণ্ণ হলো‌।সে রায়েদ কে খুব ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করলো।

রায়েদের পরনে সাদা রঙের শার্ট‌। কুকড়ো চুল গুলো ভেজা। হয়তো সবে মাত্র চোখে মুখে পানি দিয়ে এসেছে।কপালে এসে চুল গুলো পড়ছে।চুল থেকে টপটপ পানি পড়ছে। কপালের কাঁটা দাগ টাও এক অদ্ভুত সৌন্দর্য তৈরি করছে। ঠিক যেমন চাঁদে দাগ আছে তেমনি রায়েদের ফর্সা মুখে,ক্লিন শেভ মুখে কোনো ব্রণ বা দাগ নেই। কাজের ফাঁকে ফাঁকে বার বার নিজের চশমা ঠিক করছে। উফ্ ইফরাহ যেন ছোট খাটো ক্রাস খেল।

ইফরাহ মুখে লালচে আভা ফুটে উঠল।সে তারাতাড়ি নিজেকে সংযত করে কেবিন ত্যাগ করার জন্য পিছনে ফিরল তখনি রায়েদ বলে উঠলো,,,,

--"মিস ইফরাহ। কালকে এক মিটিং এর জন্য রাঙামাটি যেতে হবে তাই আজকে অফিস থেকে তারাতাড়ি বাড়ি গিয়ে সব গোছগাছ করে নিবেন কাল সকাল সকাল যেতে হবে।আমি আপনার বাড়ির সামনে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করব। সকাল ৬ টার মধ্যে বাড়ির বাইরে চলে আসবেন।"

রায়েদ কথা গুলো অফিসিয়াল ভঙ্গিতে বলল।

ইফরাহ অবাক হলো হঠাৎ এমন কথা শুনে।সে নিজেকে স্বাভাবিক করে মাথা নাড়ল। রুম থেকে বের হতে নিবে ঠিক সে সময় এক মেয়ে বিনা অনুমতিতে কেবিনে ঢুকে রায়েদ কে জরিয়ে ধরলো।

এমন আকস্মিক ঘটনা ইফরাহ এবং রায়েদ দুজনেই অবাক হয়ে গেল। ইফরাহ রায়েদের দিকে আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।রায়েদ তো এখনো অবাক।সে তারাতাড়ি নিজেকে স্বাভাবিক করে তাকে জড়িয়ে থাকা পেয়ে দূরে সারালো। মেয়েটি আর কেউই নয় বরং ঈশিতা।

রায়েদের বিরক্ত লাগলেও স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,,,,

--"এইটা আমার অফিস ঈশি।তোর নক করে আসা দরকার ছিল।আর এইটা কি ধরনের ব্যবহার। এমন আঠার মত চিপকে থাকিস কেন? নেক্সট টাইম থেকে আর যাতে এমন না দেখি।"

ইফরাহ এখনো দাঁড়িয়ে আছে।ঈতিশা রায়েদ কে ছেড়ে দিল। এমন সাফসাফ কথায় ঈশিতা অপমান বোধ করল।আরো পিছনে তাকিয়ে দেখল একটি মেয়ে দাড়িয়ে আছে তাই ঈশিতা চ শব্দ বের করে বিরক্তিকর ভঙ্গিতে বলল,,,,

বিজ্ঞাপন

--"এই স্টুপিড মেয়ে এখানে এই ভাবে দাড়িয়ে আছো কেন?কোনো কমনসেন্স নাই । এখানে এইভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন?কাজ করতে এসেছো কাজ করে চলে যাও। এখানে দাঁড়িয়ে আছো তোমরা ইরাদা তো ভালো লাগছে না।"

ইফরাহ অপমানে চোখে পানি চলে এলো। কিন্তু সে তো প্রতিবাদি তাই সে নিজের জন্য কিছু বলতে দিব ঠিক তখনই রায়েদের হিংস কন্ঠ ভেসে উঠলো।সে হুংকার দিয়ে বলে উঠলো,,,,

--"Enough Is Enough. ঈশিতা তুই নিজের লিমিট ক্রস করছিস। তোর সাহস কি করে হলো ইফরাহ কে এত গুলো কথা বলার? তোর কোনো রাইট নেই ইফরাহ কে কিছু বলার জন্য।আশা করি তুই দ্বিতীয় বার এমন কিছু করার সাহস দেখাবি না ‌। আর নেক্সট টাইম থেকে আমার অনুমতি ব্যতীত আমার অফিসে আসার সাহস দেখাবি না। কাজিন কাজিনের মতোন থাক।বেশি অধিকার দেখানোর সাহস দেখাবি না।নাউ লিভ।"

ঈশিতা অপমান সহ্য করতে পারলো না।সে ইফরাহার দিকে রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে রায়েদের কেবিন ত্যাগ করল।

ইফরাহ এখনো দাঁড়িয়ে আছে।রায়েদ আস্তে আস্তে ইফরাহার দিকে এগিয়ে গেল। তারপর ইফরাহার সামনাসামনি দাঁড়িয়ে নরম স্বরে বলল,,,,

--"I'm Sorry. আসলে ও আমার ছোট বোন। জানি না কেন ও এমন ব্যবহার করেছে। কিন্তু কথা দিচ্ছি এর পর থেকে কেউ তোমাকে কিছু বলা তো দূরের কথা তোমার দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারবে না। প্লিজ কিছু মনে করো না।"

ইফরাহ কিছুটা নরম হলো।তার চোখ মুখে এতক্ষণ এক অদ্ভুত ভঙ্গিমা ছিল।সে মুচকি হেসে বলল,,,,

--"সমস্যা নেই স্যার। আমি কিছু মনে করি নি।"

রায়েদ নিশ্চিত হলো। তারপর ঘরির দিকে তাকিয়ে দেখল বিকেল ৩ টা বাজে।সে ইফরাহ কে উদ্দেশ্য করে বলল,,,

--"তুমি এখন যেতে পারো। বাসায় গিয়ে গোছগাছ করে নাও।আর হ্যাঁ দুদিনের ট্রিপ তো সবদিক টা খেয়াল রাখবে।"

ইফরাহ মাথা নাড়ল এবং রায়েদ কে বিদায় জানিয়ে কেবিন থেকে বের হয়ে গেল।

ইফরাহ যেতেই রায়েদ নিজের চেয়ারে এসে বসল। চোখের চশমা টা খুলে ফেলল এবং নিজের এক হাত দ্বারা গলায় টাই ঢিলা করে শার্টের প্রথম দুই বোতাম খুলে ফেলল। তার রাগে গাঁ গিজগিজ করছে। ইচ্ছে করছিল ঈশিতা কে ধরে থাবরাতে। শুধু মাত্র মেয়েদের গায়ে হাত তোলা তার স্বভাবের না বলে এটা করতে পারল না। টেবিলে উপর পানির গ্লাস ছিল। গ্লাস হাতে নিয়ে এক ঢোকে পানি পান করল। যখন সে পানি পান করছিল তখন তার পুরুষালি কণ্ঠনালী নড়ে উঠলো।

রায়েদ পানির গ্লাস শব্দ করে টেবিলে রাখলো।তার মাথা গরম আপাতত তাকে বাড়ি গিয়ে ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করতে হবে নয়তো মাথা গরমই থাকবে।

__________________

ইফরাহ সবে মাত্র মাগরিবের নামাজ পড়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল।তার বাড়ি ফিরতে ফিরতে ৪ টা বেজে গিয়েছিল। বাড়ি ফিরে আগে গোসল করে নামাজ পড়ে নিল তারপর খাওয়া দাওয়া করে বাবা মায়ের সাথে গল্প করে, রাঙামাটি যাবার কথা জানিয়ে রুমে আসতে আসতে মাগরিবের আজানের ধ্বনি শুনতে পেল তাই সে নামাজ শেষ করে একবারে বিশ্রাম নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

ইফরাহ চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে।তার মাথায় শুধু মাত্র রায়েদ এবং তার বলা কথা গুলো ঘুরছে।তার জন্য রায়েদ স্টেন্ড নিল তার কেমন জানি খুশি খুশি লাগছে।সে মনে মনে বলল,,,,

--"ইফরাহ রে আজ কাল দেখছি খুব বেশি মি. আক্করার কথা খুব ভাবছিস।তুই ও কি তার মায়া জালে আবদ্ধ হয়ে গেলি নাকি।"

এই বলে ইফরাহ নিজের দুহাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে নিল।তার কেমন জানি লজ্জা লজ্জা লাগছে। এইভাবে কিছুক্ষণ থাকার পর যখন ইফরাহ নিজের হাত নিজের মুখ থেকে সড়ালো তখন তার চোখের সামনে পড়ল বিছানার পাশে থাকা একটি ছোট কেবিনেটের উপর রাখা একটি সুন্দর কাঁচের পুতুল দেখে। কাঁচের পুতুলটি ছিল একটি মেয়ের যেখানে মেয়েটি Disney Princess দের মতো ড্রেস পরেছে এবং তার সামনে একটি ছোট কাচের বক্সের ভেতর একটি লাল গোলাপ ফুল।

এইটা রায়েদ তাকে ২০১৫ সালে দিয়েছিল যখন সে ক্লাস টেনে পড়তো।সে নিতে চায় নি কিন্তু রায়েদ তাকে অনেক জোর করে দিয়েছিল। এবং সে এখনো সেটা যন্ত্র করে রেখে দিয়েছে। এটা তার কাছে খুব প্রিয়। এই ১০ বছরে সে খুব বেশি যত্ন নিয়েছিল এই পুতুলটির। যখন রায়েদ তাকে উপহার দিয়েছিল তখন সে খুব ভাবতো যে পুতুলের ভেতর একটি লাল গোলাপ কেন। নিজের অজান্তেই তার মনে হাজারো প্রশ্ন ফুটে উঠত এই লাল গোলাপকে নিয়ে। কিন্তু যখন রায়েদ তাকে প্রপোজ করার সময় বলেছিল যে সে নিজের মনে মনে তার নিকনেইম দিয়েছে Little Rosebud তখন সে ক্লিয়ার হয় যে এই কারণে এই পুতুলটির মধ্যে একটি লাল গোলাপ আছে। যা রায়েদের ভালোবাসার প্রতীক। হয়তো এই কারণেই এই ১০বছরে সে এই জিনিসটির অযত্ন হতে দেয়নি।

ইফরাহ কোনো ছোট বাচ্চা না যে সে নিজের অনুভূতি সম্পর্কে অবগত থাকবে। সে নিজেও বুঝতে পেরেছিল যে রায়েদ তাকে হয়তো পছন্দ করে। কিন্তু রায়েদ তাকে যে এতটা ভালোবাসতো সে তা কখনোই ভাবতে পারেনি।রায়েদ যখন তাকে এত সুন্দর ভাবে প্রপোজ করেছিল তখন তারও খুব বেশি মন চাইছিল রায়েদের পাগলামিতে সায় দিতে। কিন্তু দায়িত্ব? তার মা-বাবার প্রতি দায়িত্বের কারণে সে পিছুপা হয়েছে। এবং নিজের মনকে বুঝিয়েছে যে রায়েদের জন্য তার মনে যা আছে তা শুধু দয়া এবং সহানুভূতি। এবং এই বুঝ দিয়েই সে নিজেকে এত বছর সামলে রেখেছে। কিন্তু আবার রায়েদ তার সামনে আসাতে সে দূর্বল হয়ে পড়ছে।যত যাই হোক সে একজন মেয়ে। যদি কোনো ছেলের নিজের ভালোবাসা অল্প একটু হলেও প্রকাশ করবে তখনই একটি মেয়ে গলে যায়। সেই জায়গায় তো রায়েদ তাকে পাগলের মত ভালবেসে এসেছে। এবং এখনও ভেসে যাচ্ছে। যা ইফরাহার বুঝতে একটু সমস্যা হচ্ছে না।

ইফরাহ সেই পুতুলটি হাতে নিয়ে এটির দিকে ভালোবাসাময় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আনমনে বলতে লাগলো,,,,

--"মি. আক্করা,আপনিও তো অনেক বছর যাবত আছেন আমার হৃদয়ের অগোচরে ।"

বিজ্ঞাপন
হৃদয়ের অগোচরে গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও থ্রিলারভিত্তিক গল্প