ইফরাহ তারাতাড়ি করে রেডি হচ্ছে অফিসে যাওয়ার জন্য। তারপর তার নজর গেল বিছানার পাশে ছোট্ট টেবিলের ওপর থাকা একটি ছবির ফ্রেমে। সেই ফ্রেমের ছবি ছিল তার এবং তার প্রিয় বিড়ালের। তার Momo।এই বিড়ালটি ছিল তার খুব প্রিয় কিন্তু হঠাৎ একদিন ঘুম থেকে উঠে সে দেখল বিড়ালটি তার পাশে নেই। সে সব সময় আগে নিজে ঘুম থেকে উঠত তারপর বিড়ালকে ঘুম থেকে উঠাতো। কিন্তু সেদিন Momo কে তার পাশে না পেয়ে সে ভেবেছিল হয়তো আশেপাশে কোথাও গিয়েছে। কিন্তু সেদিন তার Momo তার কাছে ফিরে আসেনি। সে অনেক কান্না করেছিল।
এইসব ভেবে ইফরাহ এক নিঃশ্বাস ছাড়লো। তারপর ছবিটির দিকে তাকিয়ে বলল,,,,
--"Momo তোর মাম্মাম যে তোকে অনেক মিস করে। আমি জানিনা তুই এখন কোথায় আছিস কার কাছে আছিস কিন্তু আমার মন বলছে তুই ঠিক জায়গায় আছিস এবং ভালো আছিস।"
ইফরাহ তারাতাড়ি খেয়ে মা বাবার সাথে কথা বলে বের হয়ে গেল অফিসের উদ্দেশ্যে। সময়মতো সে অফিসে পৌঁছেও গেল।
নিয়ম মতো তার ডেস্কে বসলো। ঠিক তখনই ইশা আসলো (ইফরাহার কলিগ)।ইশা ইফরাহার ডেস্কে হেলান দিয়ে বলল,,,,
--"হাই ইফরু।কি অবস্থা তোমার?কেমন লাগছে তোমার এই অফিস?"
ইফরা অবাক তার নামের এমন নাজেহাল অবস্থা শুনে। কিন্তু সে কিছু মনে করল না বরং হাসি দিয়ে বলল,,,,
--"এইতো আপু আমার অবস্থা ভালো।আর অফিসও খুব ভালো লেগেছে।"
ইশা মিছে রাগ দেখিয়ে বলল,,,,
--"আমরা তো সমবয়সী হবো অথবা এক দুই বছরের পার্থক্য তাই আপু বলবে না আমায়।"
ইফরাহ হাসলো তারপর বললো,,,,,
--"আচ্ছা ঠিক আছে বলব না।"
ইশা খুশি হয়ে বলল,,,
--"গুড মেয়ে।"
ইফরাহ শব্দ করে হেসে উঠলো।তখনি রবিন এসে ইশা কে উদ্দেশ্য করে বলল,,,,,
--"এইযে মিস, নিজে তো এক বাঁচাল আর এক জন কে বাঁচাল বানানোর কোনো প্রয়োজন নেই। গিয়ে নিজের কাজ করেন।"
ইশা মুখ ভেংচি কেটে বলল,,,,
--"সময় এখনো হয়নি। আমি আমার টাইম জানি। আপনার বলতে হবে না।যান গিয়ে নিজের কাজ করেন তো,আমাকে জ্ঞান না দিয়ে।"
রবিন ভাব নিয়ে বলল,,,,
--"জ্ঞান তো তাদের দেওয়া উচিত যাদের বুদ্ধি আছে। কিন্তু তোমার সেটা নেই। তোমার বুদ্ধি তো হাঁটু তে।তাই তোমাকে জ্ঞান দিয়ে আমি আমার মূল্যবান সময় নষ্ট করতে চাই না।"
ইফরাহ শব্দ করে হেসে উঠলো।ইশা রেগে গেল তারপর রবিনের দিকে তেড়ে এসে রাগান্বিত কন্ঠে বলল,,,,,
--"আপনাকে আমি,,,,, উফ্,,,, আপনার সাহস কি করে হয় আমাকে অপমান করার? আপনাকে আমি তো মিস্টার রবিন থেকে রবি সিম বানিয়ে দিব। এবং তারপর চিবিয়ে খাব।"
ইফরাহ তো এদের কান্ডে হাসতে হাসতে শেষ। অফিসের প্রথম দিন থেকে ইফরাহ এই দুজনের ঝগড়া দেখে যাচ্ছে। দুজনেই কিছু না কিছু নিয়ে একে অপরকে খোটা দিতে পিছুপা হয় না।পারলে রেসলিং শুরু করে দিবে।
রবিন এবং ইশা এখনো ঝগড়া করছে। ঠিক তখনই রায়েদ নিজের কেবিন থেকে বের হয়ে এলো। ইফরাহার ডেস্কের সামনে এসে দেখল ইফরাহ খিলখিল করে হাসছে।রায়েদ থমকে গেল।সেই পুরনো হাসি,সেই পুরনো হাসির শব্দ, সেই পুরনো ভঙ্গিমা। হাসলে চোখ কুঁচকে যাওয়া। শব্দ করে হাসা।যেন কেউ রায়েদের কানে তবলা বাজায়। কিন্তু রায়েদের ঘোর ভাঙলো রবিনের কথার শব্দে।
রবিন ইশা কে বলল,,,,
--"দেখতে তো টিকটিকির মতোন, চিকন এবং হাইটে ছোট। শুধু লেজের অভাব। আবার আসছে আমাকে রবিন থেকে রবি সিম বানাতে।"
ইশা যেন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো তাকে টিকটিকি বলার জন্য।সে ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল,,,,
--"আর নিজে কি?কুনো ব্যাঙ এর মতো ঢোল।খালি ভিন্নতা হলো কুনো ব্যাঙ ছোট আপনি ভুল বশত লম্বা।"
এইবার ইফরাহ এবং রায়েদ দুজনেই শব্দ করে হেসে উঠলো।
রবিন রেগে বলল,,,
--"আমার জিম করা বডি কে তুমি কুনো ব্যাঙের সাথে তুলনা দিচ্ছ?"
ইশা বলল,,,
--"I'm sorry কুনো ব্যাঙ,যে আমি এই রবি সিম কে আপনার সাথে তুলনা দিয়েছি।"
রবিন রেগে গিয়ে বলল,,,,
--"তুমি,,,,
তখনই রায়েদ পিছন থেকে বলে উঠলো,,,,
--"অনেক হয়েছে। এইটা Cartoon network Chanel না যে তোমরা Tom and Jerry এর মতো ঝগড়া করে বিনোদন দিবে।তাই টম এন্ড জেরি তোমরা বরং যার যার কাজে যাও।"
রবিন এবং ইশা মাথা নাড়ল কিন্তু দুজন দুজনের দিকে এমন দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো যা দ্বারা বোঝালো দুজন দুজনকে পরে দেখে নিবে। তারপর দুজনেই নিজেদের জায়গা চলে গেল।
ইফরাহ এখনো হাসছে।রায়েদের দৃষ্টি গেল তার দিকে। তারপর ভাব নিয়ে ইফরাহ কে শোনাতে লাগলো,,,,
--"এখন আর ভালোর দিন নাই।উনার সামনে যদি কেউ ঝগড়া করে খুনাখুনির পরিস্থিতিতে চলে যায় তখনও মনে হয় উনি নিজ হাতে দাউ,বঠি এগিয়ে দিয়ে তারপর খুনাখুনি দেখে হাসবে।"
ইফরাহার হাসি থেমে গেল। এবং হাস্যোজ্জ্বল চেহারা রাগান্বিত হয়ে গেল।সে বুঝতে পারল কথা গুলো তাকে বোঝানো হয়েছে।
সে প্রতিবাদে নাক ফুলিয়ে বলল,,,,
--"শুধু হাসব না বরং ভিডিও করবো এবং তারপর social media যে পোস্ট করব এবং ক্যাপশন দিব,,,, (ERSC) ইন্ডাস্ট্রিতে স্বয়ং The Great মিস্টার আক্করা,,,,Oops Sorry CEO Ehsan Rayed Sikandar এর উপস্থিতিতে হয়ে গেছে খুন খুন খুন।"
রায়েদ শব্দ করে হেসে উঠলো। অনেক কষ্টে নিজের হাসি থামালো কিন্তু ইফরাহার রাগান্বিত চেহারা যার উপরে আবার নাক ফুলিয়ে থাকা দেখে আবার হেসে দিল।
রায়েদের হাসি যেন আগুনে ঘি ঢেলে দেওয়ার মতোন। ইফরাহ আরো রেখে উঠলো। রায়েদ তা বুঝতে পেরে নিজের হাসি থামিয়ে বললো,,,,
--"আমি তখনকার কথা কাউকে মিন করে বলিনি।যদি কারোর গায়ে লাগে তাহলে আমার কিছু করার নেই।"
ইফরাহ আগের মতোনই নাক ফুলিয়ে উত্তর দিল,,,
--"আমি ছোট বাচ্চা না যে কিছু বুঝতে পারবো না। আমি যথেষ্ট বড় আমার বয়স ২৪ বছর।"
রায়েদের টনক নড়লো তার ইফরাহার কথায়।সে মনে মনে বলল,,,
--"Little Rosebud তো বড় হয়ে গেছে।আর আমার তো নিজের বয়সের কথাও খেয়াল নেই। এতদিন তার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে নিজের বয়স গুনার কথা ভুলে গেছি। ৩২ বছর হয়ে গেছে।আর ইফরাহ যেহেতু এখন চাকরি শুরু করে দিয়েছে তার মানে অবশ্যই তার বাবা মা তাকে বিয়ে দিয়ে দিবে তার ২৫ বছর হওয়ার ভিতরে।নাহ আর দেরি করা যাবে না। ইফরাহ কে নিয়ে আর কোন রিস্ক নিব না।যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওকে বিয়ে করব।"
এইসব ভাবছিল রায়েদ। তখনি ইফরাহ আবার বলে উঠল,,,,,,
--"কি হলো কথা হারিয়ে ফেললেন?"
রায়েদের চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটলো।সে নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,,,
--" কি বলছিলে তখন? তুমি বড়,সব বুঝ? কচু বুঝ।"
ইফরাহ রাগ দেখিয়ে বলল,,,,
--"আমার ডায়লগ আমাকে শোনাবেন না একদম।আর ছোট থেকে বড় হয়ছি খেয়ে সুজি,তাই আমি সব বুঝি।"
রায়েদ হাসলো তারপর পকেটে হাত ঢুকিয়ে একদম সাহিত্যিক পুরুষের ভঙ্গিতে ইফরাহ কে পাত্তা না দিয়ে তার পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে গানের লাইন ধরলো,,,,
"এত কিছু বোঝো আর মন বোঝো না।
কত কিছু তুমি খোজো আমায় তো খোজো না।"
রায়েদ গান গেতে নিজের কেবিনের দিকে চলে গেল। ইফরাহ থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নিজেকে প্রশ্ন করল,,,
--"এইটা কি হলো?উনি তো সেই আগের আক্করা ভাইব দিয়ে গেল।আর আমিও কি পাগল।উনার সাথে সেই আগের মতোন রাগ, অভিমান এবং অধিকার দেখিয়ে কথাই বলে ফেললাম। ভুলেই গিয়েছিলাম যে এখন উনি আমার বস। ইশ্!!!আর উনিও তো আগের মতোনই আক্করা মার্কা কাজ করলো।আমকে কিছু না বলে আমায় মিন করে গান গেয়ে চলে গেলেন।"
এইসব ভেবে ইফরাহ অবাক হলো এবং হেসেও ফেললো। তারপর নিজে নিজে বলল,,,
--"আপনি একদম বদলান নি মি.আক্করা।"