হৃদয়ের অগোচরে

পর্ব - ৩

🟢

আজ ইফরাহার প্রথম দিন অফিসে।তার খুব ভয় হচ্ছে কারণ তার না কাছে কোনো অভিজ্ঞতা আর না আছে কোনো চেনা মানুষ। কিন্তু তার থেকে বেশি ভয় যে মানুষটিকে সে চেনে,তাকে নিয়ে।ইফরাহ বেশি কিছু ভাবল না সে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে গেল।সে চায় না তার প্রথম দিনেই লেইট হোক।

ইফরাহ একটি আকাশী রংয়ের জামা বের করল। তারপর জামা পড়তে যাবে সেই সময় তার মনে হল সে অফিসে যাচ্ছে স্কুলে না। নিজের এমন কথাই নিজেই হেসে উঠলো।

তারপর লাল রঙের একটি জামা বের করল। কিন্তু লাল রঙের জামা বের করে থমকে গেল। মনে পড়ে গেল অতীতের স্মৃতি।তার জন্য করা কোনো পুরুষের পাগলামি।ইফরা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো।তার যে কিছুই করার নেই।তাই লাল রঙের জামাটাও রেখে দেয়।

তারপর সাদা রঙের একটা থ্রিপিস বের করল তার সাথে সাদা রঙের হিজাব। ইফরাহ রেডি হয়ে খাবার খেয়ে তার মা বাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল। মাস্টার্সে ক্লাস রেগুলার না করলেও চলবে। শুধু নোটগুলো কালেক্ট করবে এবং পরীক্ষাগুলো দিবে ইফরাহ। ইফরাহ অফিসের উদ্দেশ্যে চলে গেল। খুব সাধারণ মেয়ে সে।আর বাড়ি থেকে অফিসের রাস্তার দূরত্ব ১ ঘন্টা। ইফরাহ রিকশা দিয়ে বাস স্টেশন যাবে এবং তারপর বাস দিয়ে তার অফিসে।

__________________

রায়েদ তার কেবিনে বসে আছে। মনে তার অদ্ভুত চঞ্চলতা। নিজের ভালোবাসার মানুষকে দেখার চঞ্চলতা। নিজের ভালোবাসার মানুষের মধুর কন্ঠ শোনার আকাঙ্ক্ষা।রায়েদ বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে এবং দেখছে কখন সময় হবে।

অফিস ৯ টা থেকে শুরু আর এখন ৮:৪০ বাজে। হয়তো সময় হয়ে গেছে তার Little Rosebud এর আসার সময় হয়ে গেছে।রায়েদ তার অফিসিয়াল ভঙ্গিতে ফিরল।যাতে ইফরাহ বুঝতে না পারে যে সে তার জন্য অপেক্ষা করছিল।

ঠিক ৮:৫০ এ ইফরাহ অফিসে আসল।এই অফিস চার তলা। এবং সম্পূর্ণ অফিসের সিইও রায়েদ।আর ইফরাহার অফিস চার তলাতেই।সে লিফটে উঠে তার ফ্লোরে চলে গেল।

ফ্লোরে ঢুকতেই রবিন তাকে অভ্যর্থনা জানাল। ভদ্র কণ্ঠে পরিচয় দিয়ে বলল—

— “তুমি নিশ্চয়ই মিস ইফরাহ? আমি রবিন, মি. ইহসান রায়েদ সিকান্দারের ম্যানেজার। এসো, তোমার কাজগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছি।”

তারপর বলল...

--"আজ থেকে আপনি সরাসরি মি. ইহসান রায়েদ সিকান্দারের পিএ হিসেবে কাজ করবেন।”

ইফরাহা ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে বসেছিল, যেন নতুন জীবনের দরজা খুলে যাচ্ছে।

রবিন ফাইল হাতে নিয়ে ধীর গলায় বুঝিয়ে দিতে লাগল—

— “তোমার দায়িত্ব হবে স্যারের সময়সূচি ঠিক রাখা। কোন মিটিং কখন, কোথায়—সবটা আগে থেকে ক্যালেন্ডারে ম্যানেজ করতে হবে। প্রতিদিন সকালে স্যারের কাজের অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করে দিতে হবে।

ফাইল, কাগজপত্র, ডকুমেন্ট—সব সময় ঠিকঠাক গুছিয়ে রাখতে হবে, যাতে স্যার প্রয়োজনে হাত বাড়িয়েই পায়। স্যারের ইমেইল আর কল ম্যানেজ করাটাও তোমার কাজের অংশ। অনেক সময় বাইরে মিটিং থাকলে আগে থেকে গাড়ির ব্যবস্থা করতে হবে, প্রেজেন্টেশনের স্লাইডস বা রিপোর্ট চেক করে দিতে হবে।

স্যার কাজের ফাঁকে কফি পছন্দ করেন, সেটাও তুমি দেখবে— তবে মনে রেখো, তোমার আসল কাজ শুধু কফি দেওয়া নয়, বরং তার চারপাশে পুরো কাজের পরিবেশটা গুছিয়ে রাখা।”

ইফরাহ মাথা নাড়ল।রবিন ইফরাহ কে তার ডেস্ক দেখিয়ে দিল।ইফরার ডেস্ক ছিল একদম রায়াদের কেবিনের সামনাসামনি।কেবিনটা কাচে ঘেরা, চকচকে গ্লাসের দেয়াল পুরোটা ঘিরে রেখেছে। ভেতর থেকে বস সহজেই বাইরের প্রতিটি নড়াচড়া দেখতে পারেন— কে আসছে, কে যাচ্ছে, কার মুখে কেমন ভাব— সব।

কিন্তু বাইরের কারো পক্ষেই কেবিনের ভেতরটা দেখা সম্ভব নয়। গ্লাসটা ওয়ান-ওয়ে মিররের মতো বানানো।

রবিন ইফরাহ কে বলল কাজ শুরু করার আগে যাতে বসের সাথে দেখা করে নেয়। ইফরাহ মাথা নাড়ল। সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিজেকে প্রস্তুত করলো স্যারের টেবিলে যাওয়ার জন্য। কারণ সে চায় বিষয়গুলো প্রফেশনাল থাকুক।

ইফরাহ রায়াদের কেবিনে নক করে জিজ্ঞেস করল,,,

--"May I Come Is Sir?"

ভেতর থেকে এক পুরুষালি গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসলো।

--"Yes Coming."

ইফরাহ ভিতরে ঢুকে গেল।রায়েদ তার মুখের সামনে ফোন রেখে ফোন স্ক্রল করছিল। মনে হচ্ছে তার সামনে যে কেউ আছে সেটা সে উপলব্ধি করতে পারছে না।

ইফরাহ বিরক্তিকর বোধ করলো এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে।সে মনে মনে ভাবল "লোকটি না তার দিকে তাকাচ্ছে,আর না কিছু বলছে"।

অথচ ইফরাহ জানেই না যে রায়েদ তার ফোন মুখে সামনে রেখে ফোনে ব্যাক ক্যামেরা দিয়ে তাকেই দেখছে।

রায়েদ বুঝতে পারল তার পিচ্চি বিরক্তবোধ করছে। রায়েদ মনে মনে বলল,,,,

--"Attitude কমেনি বরং বয়সের সাথে বেড়েছে। কিন্তু আজ Little Rosebud শুভ্রপরীর রূপে এসেছে।"

রায়েদ নিজের ফোন অফ করে টেবিলের উপর রাখল তারপর ইফরাহার দিকে তাকিয়ে শান্ত এবং প্রফেশনাল স্বরে বলল,,,

বিজ্ঞাপন

--"আজ তোমার প্রথম দিন। এবং তুমি সময় মতোন এসেছ ইটস্ ইম্প্রেসিভ। আই এ্যাপ্রিসিয়েট দিস। কিন্তু আমি আশা করছি তুমি সবসময় এমন অ্যাটেনটিভ থাকবে।আর আমি কাজে অবহেলা পছন্দ করি না।আর ভেবো না তুমি নতুন বলে তোমাকে ছাড় দেবো। তাই যাই করবে সাবধানে করবে। আর হ্যাঁ অফিসের কারো সাথে বেশি বন্ধুত্ব করবে না। বিশেষ করে ছেলেদের সাথে। বেশিরভাগ মানুষ নিজের স্বার্থ বোঝে। তারা ভাবে কি করে একজনকে পিছনে ফেলে তার সামনে যাওয়া যায়। আর যদি কোন কাজ বুঝতে অসুবিধা হয় তাহলে রবিনকে নিজের বড় ভাই মনে করে জিজ্ঞেস করবে।আর হ্যাঁ এখন যাও আর আমার জন্য ব্ল্যাক কফি বানিয়ে নিয়ে আসো। আর রবিন তোমাকে আমার টাইমটেবিলের সিডিউল দিয়ে দিবে।"

ইফরাহ শুধু পুতুলের ন্যায় মাথা নাড়ল। এবং রায়াদের অনুমতি নিয়ে তার কেবিন ত্যাগ করল।

ইফরাহ কেবিন ত্যাগ করতে না করতেই রায়েদ অসহায় এবং আফসোসের স্বরে বলল,,,

--"I'm so sorry Little Rosebud. আমার একদম ভালো লাগছে না তোমাকে দিয়ে এভাবে কাজ করানোর। হুম যদি কাজগুলা তুমি ভালবেসে আমার জন্য করতে তাহলে খুব ভালো লাগতো। কিন্তু এখন তুমি এইসব নিজের দায়িত্ব হিসেবে করছ তাই আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বাস কর যখন তোমাকে নিজের করে নেব তখন এইসব কিছু করতে আদেশ করবো না। কিন্তু হ্যাঁ যদি তুমি ভালোবেসে আমার জন্য কিছু কর তাহলে আমি খুব খুশি হব।"

এইসব বলে রায়েদ এক দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। ৮টা বছর তো আর কম কথা না। আর বিষয়টি এমন না যে সে তাকে আট বছর ধরে ভালবাসছে। বরং আট বছর আগে সে নিজের ভালোবাসার কথা প্রকাশ করলে সেখান থেকে প্রত্যাখ্যান হয়। সে তো ইফরাহ কে ভালোবাসে ১১ বছর ধরে যখন ইফরাহ ক্লাস নাইনে পড়ত।

রায়েদ চলে গেল অতীতের ভাবনায়।

অতীত _________

সাল ২০১৪ তারিখ ছিল ১২,মাস ছিল জুন।রায়েদের জন্মদিন ছিল।

রায়েদ একদম ঝাল খেতে পারে না। তার বন্ধুরা তাকে ডিয়ার দিয়ে ছিল তার জন্মদিন তাই তাকে একদম কড়া ঝাল করে ফুসকা খেতে হবে।রায়েদও রাজি হয়ে গেল কারণ সে কখনো কোনো চ্যালেঞ্জে হারে নি।সে তার বন্ধুদের নিয়ে এক ফুচকা স্টোরে চলে গেল। তারপর তার বন্ধু রা ঝাল করে ফুচকা অর্ডার করল, ফুচকার মসলায়েও ঝাল এবং টকেও ঝাল।

রায়েদ এক ফুচকা তুলে মুখে দিল—মাথার ভেতর শীতল, মুখে আগুন। চোখ বন্ধ করে সে বলল,,,

— “এই… এক্সট্রিম ঝাল!”

তার বন্ধুরা হেসে হেসে বলল,

— “পানি খাবে না?”

রায়েদ মাথা নাড়ল না। চ্যালেঞ্জের জন্য তার অহংকার এতোটাই বড় যে, পানি খেতে সে রাজি নয়।

মুখ লাল হয়ে, কপাল ঘামে ভিজে, চোখ একটু জল চলে এল, সে এক ফুচকা নিল। কিন্তু খেতে তার খারাপ অবস্থা।

ঠিক সে সময়ে একটি পিচ্চি মেয়ে তার ব্যাগ থেকে পানির মামপোট বের করে এগিয়ে দিল এবং নরম স্বরে বলল ,,

--"ভাইয়া পানি খেয়ে নিন। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি ঝাল খেতে পারেন না। এমন কাজ করবেন না যেটার জন্য নিজেকে কষ্ট পেতে হয়। এই নিন আমি খেয়ে নিন।"

মেয়েলি কন্ঠ শুনে রায়েদ সামনের দিকে তাকিয়ে দেখল লাল রংয়ের জামা পরিহিত একটি রূপসী কন্যা মাথায় সুন্দর করে লাল রঙের হিজাব বাধা। গায়ের রং না খুব ফর্সা আর না কালো। গোলাপি ঠোঁট। টানা টানা চোখ।

রায়েদ যেন পরমুহূর্তেই তার ঝাল লাগার কথা ভুলে গিয়েছে।

এক দৃষ্টিতে সেই লাল জামা পরিহিত মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে।

মেয়েটি আবার বলল,,

-""ভাইয়া এই নিন পানি খান ঝাল কমবে।"

রায়েদের হোশ ফিরল সে তাড়াতাড়ি সেই মেয়েটির হাত থেকে পানির বোতল নিয়ে এক ঢুকে এক বোতল পানি সম্পূর্ণ শেষ করে দিল। তার ঝাল কিছুটা কমেছে।

তারপর মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল,,,

--"পিচ্চি তোমার নাম কি?"

সেই মেয়েটি জবাবে বলল,,,

--"আমার নাম না জানলেও চলবে। যাইহোক আমি আসছি ভাইয়া। আমার দেরি হচ্ছে।"

এই বলে সে তার পানির বোতল টি নিয়ে চলে গেল।রায়েদ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল যতক্ষণ পর্যন্ত সেই মেয়েটিকে দেখা যাচ্ছে। তারপর মনে মনে বলল,,,

--"Little Rosebud."এই বলে নিজে মনে মনে হিসে উঠলো.

বর্তমান ________

এইসব কথা মনে করে রায়েদের চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোঁটা।কি অদ্ভুত ভাগ্য তার। ২০১৪ সালে নিজের জন্মদিনের দিন প্রথমবার দেখেছিল এবং প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। এবং ২০১৬ সালে নিজের জন্মদিনের দিন প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে রিজেক্ট হয়েছিল। আর এই দুইটি ঘটনা ঘটেছিল তার জন্মদিনের দিন। রায়েদের ঠোঁটে তার ছেলের হাসি ফুটে উঠলো তার নিজের ভাগ্যকে দেখে।

বিজ্ঞাপন
হৃদয়ের অগোচরে গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও থ্রিলারভিত্তিক গল্প