৮ বছর আগে যে ছেলেকে রিজেক্ট করেছিলাম, ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে সেই ছেলেকে নিজের বস হিসেবে দেখতে হবে তা কখনো ভাবতে পারিনি আমি।সে আমার সামনে চেয়ারে বসে আসে।আর আমি তার সোজা সোজি বসে আছি।হাত পা ঘামছে। সে এখনো আমার দিকে তাকিয়ে দেখেনি।তার চোখ আমার ফাইলে।
চলুন পরিচয় দেওয়া যাক।
--" আমার নাম #আনায়াহ_ইফরাহ ।আমি অনার্স শেষ করে মাস্টাসে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছি। গায়ের রং না খুব ফর্সা আর না শ্যামলা,এর মাঝামাঝি পরে। উচ্চতা ৫"৪। লম্বা ঢেউ খেলানো চুল।কালো চুলের মধ্যে লাল রঙের আভা আছে যা সূর্যের আলোতে চিক চিক করে।আর আমার সামনে যে বসে আছে সে হলো #ইহসান_রায়েদ_সিকান্দার ।Ehsan Rayed Sikandar Corporation (ERSC) এর সিইও।লম্বা (প্রায় ৬ ফুট), প্রশস্ত কাঁধ, ছিপছিপে অথচ শক্তপোক্ত বডি। একেবারে জিম ফ্রিক নয়, তবে কনফিডেন্ট ভরাট গঠন, যেটা দেখলেই বোঝা যায় সেলফ-ডিসিপ্লিন্ড মানুষ।শ্যামলা বর্ণ, যেন সূর্যের আলোতে আরও গভীর ও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।কোকড়ানো চুল।গাঢ় কালো চোখ যা চশমার আড়ালে ঢাকা থাকে। সেই চশমা তাকে আরও বুদ্ধিদীপ্ত ও কর্পোরেট ব্যক্তিত্বের ছাপ দেয়।ধারালো চোয়াল, ঠোঁট শক্ত অথচ মাঝে মাঝে অবহেলার ভঙ্গিতে বাঁকানো থাকে। কপালের ডান পাশে কাঁটা দাগ আছে।"
উনাকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে মনে মনে বললাম এখনো চশমা পড়ে। তারপর চলে গেলাম অতীতে।
অতীত ___________
--"সাল ছিল ২০১৬। তখন আমি সবে মাত্র ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে রাজশাহী কলেজে পড়তাম। তখন আমি উনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলাম।আমি ছোট বেলা থেকেই পড়াশোনা নিয়ে খুব সিরিয়াস ছিলাম। পড়াশোনা ব্যাতিত সব কিছু আমার কাছে কেমন অসহ্য লাগতো।আর ইহসান রায়েদ সিকান্দার উনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সের শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। উনাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে না চিনলেও প্রায় রাস্তা ঘাটে দেখতাম।আমার বাড়ি উনাদের ইউনিভার্সিটির সামনে দিয়ে যেতে হয় তাই প্রাই দেখা হতো।আমি যখন নবম শ্রেণিতে পড়তাম একবার আমি তাকে সাহায্য করেছিলাম। কিন্তু কখনো ভাবতে পারিনি সেই সামান্য সাহায্যতেই সে আমাকে ভালোবেসে ফেলবে।জানলে কখনো সাহায্য করতাম না। সেই সাহায্যের পর থেকেই যতবার রাস্তায় দেখা হতো ততবারই জিজ্ঞেস করতো,,,
--"এই যে পিচ্ছি,কেউ বিরক্ত করে না তো?করলে কিন্তু আমাকে বলবে।আমি সব সামলিয়ে নিব।"
আমি ভদ্র মেয়ের মতোন শুধু মাথা নারতাম।আমি ভাবতাম হয়তো আমি তাকে সাহায্য করেছিলাম তাই সেও আমাকে সাহায্য করছে। কিন্তু আমি যখন ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে উঠলাম।তখন উনার বিশ্ব বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠান ছিল।উনাদের বিদায় অনুষ্ঠান।আমি বান্ধবী দের সাথে শাড়ি পরে হিজাব পরে তারপর অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সেদিন আমি হালকা টিয়া রঙের শাড়ি,হালকা ধূসর রঙের ব্লাউজ এবং হিজাব পরেছিলাম।আর উনি হালকা ধূসর রঙের পাঞ্জাবি পরেছিলেন।জানি না কি করে জানি মিলে গেল।উনি দেখলাম আমার দিকে এগিয়ে আসছিলেন।আমি ভাবলাম হয়তো সবসময় এর মতোন স্বাভাবিক কথাবার্তা বলবেন। কিন্তু উনি আমাকে একদম ভুল প্রমাণিত করে আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন মাঠের মাঝখানে সবার সামনে।আমি অবাক হয়ে গেলাম।সেখান ইউনিভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রী সহ আরো অনেক মানুষ ছিল। সবার দৃষ্টি আমাদের দিকে।আমি ভিশন ভয় পেয়েছিলাম।
তিনি তার পিছনের হাত সামনের দিকে আনলেন।তার সেই হাতে ছিল লাল রঙের গোলাপ ফুলের তোড়া। আমার দিকে ফুলের তোড়া এগিয়ে দিয়ে বললেন,,,
--"ওহে আমার "Little Rosebud"যেদিন প্রথম তোমাকে দেখে ছিলাম সেদিন তোমায় নিষ্পাপ মুখশ্রীর মায়ায় আটকে যাই। কিন্তু তার থেকে বেশি আটকে যাই বয়সের ব্যবধানের কথা ভেবে।যেদিন তোমায় প্রথম দেখেছি সেদিন থেকে আমার জগত একদম বদলে গেছে। যেদিন তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম সেদিন তুমি লাল গোলাপের মতো একটি জামা পড়েছিলে এবং আমার জীবনে এসে সুভাষ দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছিলে আর তার জন্যই তোমাকে আমি "Little Rosebud" বলে সমন্বয় করতাম মনে মনে।তখন তুমি ছোট ছিলে তাই নিজেকে সামলিয়েছি।জান অনেক চেষ্টা করছি তোমাকে ভুলে যাওয়ার কিন্তু পারিনি। চোখ বন্ধ করলে তুমি চোখে ভাসতে। চোখ খোলা রাখলে তোমার চেহারা ভেসে উঠে।তাই অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিন্তু এখন আর অপেক্ষা করতে পারছি না। অনেক দিন যাবত অপেক্ষা করছিলাম কবে তোমাকে মনের কথা বলব। সবসময় তোমাকে না পেয়েই হারোনোর ভয় পেতাম।তাই ভাবলাম আর আজ থেকে ভালো সময় আর হবে না তোমাকে নিজের মনের কথা বলার। কারণ পড়াশোনার জন্য বাইরে চলে যাব। তাই ভাবলাম যাওয়ার আগে তোমাকে নিজের মনের কথা জানিয়ে যাই।"
এই বলে রায়েদ থামল তারপর আবার বলতে লাগলো,,
--"ওহে আমার Little Rosebud তুমি কি আমার জীবনের সুঘ্রাণের কারণ হবে? যার জন্য আমার বাকি টা জীবন সুখের এবং সুন্দর হবে। তুমি কি আমার প্রথম এবং শেষ ভালোবাসা হবে?কথা দিচ্ছি তোমাকে পেয়ে গেলে কখনো তোমাকে অবহেলা করব না। সবাই বলেই মানুষ তার পছন্দের জিনিস পেয়ে গেলে সেটির মূল্য দিতে জানে না। কিন্তু তুমি তো আমার পছন্দের জিনিস না। তুমি আমার শ্বাস-প্রশ্বাস, আমি সেই শুকনো মরুভূমি আর তুমি হলে বৃষ্টি, আমি হলাম আকাশ আর তুমি হলে বাদল, আমি হলাম পাহাড় এবং তুমি হলে সেই পাহাড়ের বুকে থেকে ঝরে পড়া ঝর্ণা। তুমি আমার চাহিদা না যে আমি অন্য কিছুর সাহায্যে বদল করে নিব। তুমি হলে আমার প্রয়োজন যা ছাড়া আমার বাঁচতে কষ্ট হবে। বলো একটু কি ভালোবাসার সুযোগ দিবে? আমাকে কি তোমাকে ভালবাসার অধিকার দিবে? আমাকে কি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তোমার হাত ধরে বাকিটা জীবন পার করার সুযোগ দিবে? বিয়ের পর তোমার সাথে মক্কায় গিয়ে হজ করার সুযোগ দিবে? মাঝ রাতে উঠে তোমার সাথে তাহাজ্জুদ পড়ার সুযোগ দিবে?"
আশেপাশের সবাই অবাক হয়ে দেখছে। যে নাকি ভার্সিটির ক্রাশ এবং সেলিব্রেটি বয়। যে সব সময় নিজের পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। আজ সেই ছেলেটি নিজের ভালোবাসার জন্য ভার্সিটির সবার সামনে হাটু গেড়ে বসে সেই মেয়েটিকে প্রপোজ করছে তাও এই ভাবে? ভার্সিটিতে উপস্থিত সবাই জোরে জোরে চিল্লিয়ে বলতে থাকলো ভাবি প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাও। সবার মুখে একই কথা।
ইহসান রায়েদের ফুটে মুচকি হাসি এবং চোখে এক আকাশ সমান আশা। আর আনায়াহ ইফরাহ? তার চোখে ভয় এবং যে তাকে এতটা ভালোবাসে তাকে প্রত্যাখ্যান করার খানিকটা কষ্ট।
আনায়াহ ইফরাহ নিজেকে ধাতস্থ করে বলল,,,,
--"আমি আপনাকে কখনো এমন চোখে দেখিনি। সেদিন শুধু আপনি বিপদে পড়েছেন বলে আমি আপনাকে সাহায্য করেছি। আপনার জায়গায় অন্য যে কেউ থাকলেও আমি তাই করতাম। তাই যদি আপনি নিজেকে স্পেশাল ভেবে থাকেন তাহলে এটা আপনার ভুল ধারণা। আর আমি এসবের ভেতর নিজেকে জড়াতে চাই না। আর আমার মনে হয় না আমি কখনো আপনাকে এরকম কোন ইঙ্গিত দিয়েছি যে আপনি এত বড় স্টেপ নিবেন। আপনার উচিত হয়নি সবার সামনে আমাকে ছোট করা। অন্তত আলাদা ভাবে আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারতেন?যাই হোক আমি একটি কথা স্পষ্ট ভাবে বলে দিচ্ছি আপনাকে আমি এরকম ভাবে কিছু মনে করি না। এবং আপনাকে নিয়ে এরকম কোন চিন্তা ধারণা না আমার মনে ছিল আর না আছে। আশা করি আপনি বুঝতে পেরেছেন।"
এই বলে আনায়াহ ইফরাহ সেখানে থেকে চলে এসেছিল।রায়াদের দিকে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করলো না।
তারপর,,,৮ বছর তাদের দেখা হয়নি। কিন্তু আজ।,,,
বর্তমান _____
আমি শুকনো ঢোক গিললাম।ভয় করছে।যদি উনাকে তখন উনাকে প্রত্যাখ্যান করার কারণে আমাকে চাকরি না দেয়?
কিন্তু ইফরাহার চিন্তা ধারা কে ভুল প্রমাণিত করে ইহসান রায়েদ সিকান্দার ইফরাহার দিকে প্রফেশনাল দৃষ্টি দিয়ে শান্ত স্বরে বলল,,,,,,