হৃদয়ের অগোচরে

পর্ব - ৬

🟢

রায়েদ নিজের ঘরের বারান্দায় বসে আছে। হাতে গিটার। আস্তে আস্তে টুংটাং শব্দ করে গাইতে লাগলো,,,,

--"ও জীবনের সব চাওয়া

কখনো কি পাওয়া যায়।

হাসিমুখে কিছু ব্যথা

মেনে তাই নিতে হয়।"

চোখ দিয়ে তার টপ টপ পানি গড়িয়ে পড়ল।রায়েদ নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করল,,,,

--"ছেলেরা কি এত সহজেই কাঁদে?"

তারপর নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দিল,,,,

--"হয়তো কাঁদে। ভালোবাসা তো ছেলে কিংবা মেয়ে দেখে বিবেচনা করা হয় না। ভালোবাসা মানেই তো নিজের মনের মানুষের কথা ভেবে হাসা, কাঁদা।আর যদি তা হয় একতরফা ভালোবাসা তাহলে তো এর ভবিষ্যৎ শুধু চোখের জল। কিন্তু এই চোখের জলেও এক তৃপ্তি আছে। পৃথিবীতে সবথেকে সুন্দর অনুভূতি হচ্ছে কাউকে ভালোবাসা।এর থেকে সুন্দর অনুভূতি কিছু হতেই পারে না। কষ্টতেও তৃপ্তি থাকে।এক তরফা ভালোবাসায় যেমন কোনো অধিকার থাকে না অপর পাশের মানুষটির উপর ঠিক তেমনি থাকে না কোনো অভিযোগ করার সুযোগ।এই ক্ষেত্রে নিজের ভালোবাসার মানুষটির উপর রাগ করে নিজেই নিজের রাগ ভাঙাতে হয়।আর ভালোবাসার মানুষের জন্য কান্না করা কোনো লজ্জার বিষয় না তো।আর পুরুষদের জন্য একদমই না।যদি কেউ বলে সে কাউকে ভালোবাসে কিন্তু তার জন্য নিরবে চোখের জল না ফেলে তাহলে তা ভালবাসাই না।"

এই বলে রায়েদ তার চোখের জল মুছে ফেলল। তখন তার পায়ের কাছে এসে কেউ ঘেঁষাঘেঁষি করছিল।রায়েদ নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। সেটি ছিল তার পোষা বিড়াল Momo.

এই বিড়ালটা Siberian প্রজাতির।শরীর ভর্তি লম্বা, নরম আর ফুরফুরে লোম। রঙটা ধূসর আর সাদা মেশানো।পান্না-সবুজ রঙের বড় বড় চোখ, আলোতে চকচক করে ওঠে।

রায়েদ Momo কে কোলে তুলে নিল।রায়েদ Momo কে নিজের বাচ্চা মনে করে।আর নিজেকে Momo এর বাবা।রায়েদ কে তার পরিবারের সদস্যরা এবং বন্ধুরা তাকে Cat Dad বলে ডাকে।রায়েদ বাড়িতে থাকলে বেশিরভাগ সময় কাটায় Momo কে নিয়ে।আর Momo রায়েদ কে ছাড়া আর কারো কাছে যায় না।

Momo রায়েদের গালের সাথে নিজের মুখ ঘষতে লাগলো। বিড়ালের ভাষায় এটিই আদর।রায়েদ Momo কে চুমু খেল তারপর বলতে লাগলো,,,,

--"জানিস Momo,তোর পাপা কে তোর হবু মাম্মা পাত্তা দেয় না।যখন আমি exist করিই না। আমার অবস্থা হয়েছে সেই গানের মতোন,,,,,

--" Duniya hai mere pichhe,

lekin mai tere pichhe

Apna bana le meri jaan,

hai re mai teri kurban."

গান গেয়ে রায়েদ থেমে গেল।Momo কি বুঝলো কে জানে। কিন্তু মেউ মেউ করে উঠলো।

হয়তো বলতে‌ চাচ্ছে,,,,

--"পাপা তুমি চিন্তা করো না। আমার এই হবু মাম্মা একদিন হবু মাম্মা থেকে সত্তিকারের মাম্মা মরে যাবে।"

রায়েদ হাসলো। নিজের চিন্তা ভাবনা দেখে সে না হেসে পারে না।

তারপর ভাবতে লাগল সে কি করে Momo কে পেয়েছিল।

অতীত _________________

যেদিন ইফরাহ রায়েদ কে সকলের সামনে রিজেক্ট করে সেখান থেকে দৌড়ে চলে গিয়েছিল,তখনও রায়েদ সেখানে হাঁটু গেড়ে বসে ছিল। সেখানে উপস্থিত সবাই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। রায়েদের বন্ধুরা কি করে তাকে শান্তনা দিবে তা নিয়ে চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল। তখনি রায়েদ বসা থেকে উঠে পড়ল। যে হাতে ফুলের তোড়া ছিল সেই হাত মুষ্টিবদ্ধ করলো। গোলাপ ফুলের কাটা হাতে ঢুকে পড়ল যার ফলে হাত থেকে রক্ত পড়তে লাগলো। রায়েদের চোখ লাল হয়ে গেল।রাগে?নাহ একদমই না। বরং কষ্টে। নিজের ভালোবাসার মানুষটির থেকে প্রত্যাখ্যানের কষ্টে।রায়েদ সেই মূহূর্তে জায়গা ত্যাগ করল।সোজা চলে গেল নিজের বাড়িতে।বাড়ি গিয়ে নিজের রুমে চলে গেল। রুমে গিয়ে সোজা বাথরুমে চলে গেল। বাথরুমে গিয়ে ঝর্ণা অন করল। এবং ঝর্ণার নিচে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। হয়তো ঝর্ণার পানিতে নিজের চোখের পানি ছাড়তে সুবিধা হবে। না বাইরের কেউ দেখবে তাকে কাঁদতে। আর সে নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারবে যে সে কান্না করছে না। পানিগুলো শুধু ঝর্ণা থেকে পড়ছে।

প্রায় ঘন্টাখানেক পর রায়েদ শাওয়ার নিয়ে বের হল। তার মাথা ঝিমঝিম করছে। হয়তো অনেকক্ষণ যাবৎ পানির নিচে থাকার জন্য এবং কান্না করার জন্য।

রায়েদ রুমে এসে কাপড় পরে নিল।তার চুল দিয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে।

রায়েদ মনে মনে বলল,,,,

--"কালকেই দেশ ছেড়ে চলে যাব‌। কিন্তু দেশ ছাড়ার আগেই আমাকে রিজেক্ট করার প্রতিশোধ নিয়ে যাব Little Rosebud ."

এই বলে রায়েদ এক সয়তানি হাসি দিল‌। তারপর চলে গেল নিচে।

বিজ্ঞাপন

রায়েদের পরিবারে রায়েদ কে নিয়ে আরো ৩ জন।রায়েদের মা মিসেস রুবিনা ।রায়েদের বাবা রিফাত সিকান্দার। এবং রায়েদের দাদি সুবানা আক্তার।রায়েদ সবাইকে ডাকল।

সুবানা আক্তার জিজ্ঞেস করল,,,,,,

--"কি হইছে কি দাদু ভাই এইবা ডাকতাছো কেন? কিছু কি কইবা নি?"

রায়েদ তার দাদির কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলো এবং বলল,,,

--"দাদিমা আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমি আমেরিকা চলে যাব আমার বাকি পড়াশোনা শেষ করার জন্য।"

তখনি রিফাত সিকান্দার বলল,,,

--"তো হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত নিলে যে?আগে তো কিছু বলো নি‌।"

রুবিনা বললেন,,,,

--"বিদেশে যাওয়া কি খুব জরুরী? তুই আমার একমাত্র ছেলে তোকে ছাড়া আমি কি করে থাকবো বাবা।"

রায়েদ বলল,,,

--"মা কয়েক বছরের ব্যাপার তারপর তো আমি এখানেই চলে আস। সারা জীবন তোমার কাছে থাকবো।"

সুবানা আক্তার বলল,,,

--"বিলাতে যাবি ভালা কথা। কিন্তু ওই হানে যাইয়া আবার কোনো সাদা চামড়ার পাল্লায় পরিস না‌।"

রায়েদের ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল।সে,আর ভালোবাসা।তার দ্বারা আর এইসব সম্ভব না।

রিফাত সিকান্দার বলল,,,,

--"তো কবে যাবে আর কোন ইউনিভার্সিটি তে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছো?

"

রায়েদ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,,,,

--"কাল চলে যাব। এবং yale university তে এপ্লাই করেছিলাম চান্স পেয়েছি।তাই চলে যাব।"

রিফাত সিকান্দার বলল,,,,,

--"যেহেতু সিদ্ধান্ত নিয়েছ তাহলে আর বাঁধা দিয়ে লাভ নেই।সব কিছু গোছগাছ করে নাও।"

____________________

রাত ১ টা।রায়েদ চোখে ঘুম নেই।তার মাথায় আছে শুধু প্রতিশোধের চিন্তা।সে বিছানা থেকে উঠে পড়ল।তার ফোন নিয়ে বের হলো ইফরাহ দের বাড়ির উদ্দেশ্যে।তার এক বন্ধু কে কল করে বলে দিয়েছিল যে ইফরাহ দের বাড়ির সামনে যেন একটা মই রাখে।

রায়েদের ইফরাহ দের বাড়ি পৌঁছাতে প্রায় ১:৪০ বেজে গেল। বাড়ির সামনে দারোয়ান ছিল।সে ঘুমিয়ে ছিল।রায়েদ এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিনা শব্দে বাড়ির ভিতরে চলে গেল।

তার বন্ধু আগেই বাড়ির সামনে মই রেখে গিয়েছিল।রায়েদ সেই মই নিয়ে ইফরাহার ঘরের কোণে রাখল। তারপর বিনা শব্দে মই দিয়ে উপরে উঠে গেল। ভাগ্যক্রমে সেদিন বেলকনির দরজা খোলা ছিল। রায়েদ চুপচাপ ঘরের ভেতর চলে গেল বেলকনি দিয়ে। গিয়ে দেখল ইফরা একটি বিড়াল ছানা জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে। রায়েদের ঠোঁটে শয়তানি হাসি ফুটে উঠলো। তারপর বলল,,,,

--"Little Rosebud আমাকে অনেক জ্বালিয়েছো,পুড়িয়েছো, অনেক কষ্ট দিয়েছো। ভাবলাম দেশ ছেড়ে চলে যাবার আগে তোমার কোন স্মৃতি নিয়ে যাই। তাই তোমার এই পছন্দের বিড়ালছানা আমি চুরি করে নিয়ে যাচ্ছি। চিন্তা করোনা আমি ওকে নিজের বাচ্চার মত রাখবো। যেহেতু তুমি ওর মা তাহলে অবশ্যই আমি তার বাবা।"

এই বলে রায়েদ শব্দহীনভাবে আলগস্তে বিড়াল বিছানা থেকে তুলে নিল। তারপর ইফরাহ দিকে তাকিয়ে বলল,,,,

--"Little Rosebud চলে যাচ্ছি তোমার থেকে বহুদূর। কিন্তু খুব শীঘ্রই ফিরে আসবো তোমার কাছে। এবং আমি অনুপস্থিত থাকাকালীন তোমার সেফটির সব দিকে খেয়াল রাখব।"

এই কথা বলে রায়েদ মই দিয়ে নেমে গেল। তারপর এক হাতে মই এবং অন্য হাতে বিড়াল নিয়ে চুপচাপ বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল। বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে একটি ঝোপের আড়ালে মই রেখে বিড়াল নিয়ে হাঁটতে লাগলো।

এবং একা একা কথা বলতে লাগলো,,,,

--"ভালোবাসা মানে এক প্যারা। কখনো পুরুষ থেকে দাদিমা হতে হয়। আবার কখনো সুপুরুষ থেকে চোর হতে হয়।আর কি কি জানি আছে কপালে "

বিজ্ঞাপন
হৃদয়ের অগোচরে গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও থ্রিলারভিত্তিক গল্প